মিনাক্ষী ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মিনাক্ষী ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

                                  


কোল্হাপুর ডায়েরী ৯

হোটেলে ঢুকতে ঢুকতেই মিমি দেখতে পেল লাউঞ্জে তিনটে টেবিলকেই পাশাপাশি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। লাঞ্চের প্রস্তুতি। মিমিকে দেখে বোসদা বললেন, লাঞ্চের অর্ডার কিন্তু দিয়ে দিয়েছি।মেনু কিন্তু আমরাই সিলেক্ট করেছি। মিমি সলজ্জ হেসে ঘাড় কাত করলো। -  'না দাদা,অসুবিধের কিচ্ছু নেই!চলবে চলবে। '
এ পাশে তাকিয়ে দেখলো বোস বৌদি
তার পাশের চেয়ারটা ফাঁকা রেখেছেন। মিমিকে ইশারায় ডাকলেন পাশে এসে বসবার জন্য। যেন স্নেহময়ী বড় দিদি
ছোট বোনের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছেন! মিত্র বৌদি বললেন, মিমি রূপা তোমার জায়গাটা আগেই সিলেক্ট করে রেখেছে। আমাদের নো চান্স!
এই স্নেহ এই মমতা মিমির প্রবাসজীবনের এক বড় সম্পদ।
লাঞ্চের পরে ঠিক হোলো রোদ একটু পড়ে এলে ফোর্টের বাকি অংশটা ঘুরে দেখা হবে সকলে মিলে।
এর মধ্যে হোটেলের ম্যানেজার এসে একবার ঘুরে গেলেন।
বোসদা বিশ্বাসদা সকলে যে পূর্বপরিচিত এবং সকলের সাথেই যথেষ্ট পরিমাণে হৃদ্যতা রয়েছে কথাবার্তার মাধ্যমে
মিমি  বেশ বুঝতে পারলো।
সকলেই বেশ আড্ডার মুডে রয়েছে। এত অল্প সময়ে সব আলোচনায় যোগ দেওয়া সম্ভব ও নয় অনেক বিষয়বস্তুই যদিও তার এবং সূর্যর কাছে অজানা  তবু খুনসটিগুলো দিব্যি উপভোগ করছিলো সূর্য আর মিমি দুজনেই।
ভটচাজ বৌদি বললেন,
-জানো মিমি' পান্হালা শব্দের অর্থ কি?  পান্হালা শব্দর মানে হোলো নাগেদের বাসস্থান।পান্হালার আসল নাম পান্হাল গড়। এছাড়াও এই ফোর্টটার নাম পান্হালা কারণ এর গঠনটাও  খানিকটা সর্পাকৃতি এর ভেতরে এত সর্পিল গলিঘুঁজি রয়েছে যে পান্হালা নাম সার্থক। বিশ্বাস বৌদিও এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন ওদের কথা। ভটচাজবৌদি
থামতেই উনি পাশ থেকে বলে উঠলেন, আর জানোতো মিমি পান্হালাতে একটা গুহা আছে এটাকে মহর্ষি পরাশরের গুহা বলা হয়। মনে করা হয় ব্যাসদেবের পিতা মহর্ষি পরাশর এখানে বাস করতেন।1730 খ্রীষ্টাব্দে লেখা কোল্হাপুর পুরাণ বা করবীরে  এই পান্হালার উল্লেখ আছে। পুরনো লিপিতে এর নাম পদ্মনাল বা পন্নগালয়। পন্নগ মানে হলো সাপ।  মহর্ষি পরাশর যে গুহায় বাস করতেন সেটা বোধহয় নাগেদের বাসস্থান ও ছিল বোধহয়  মিমি বিস্মিত ও অভিভূত হচ্ছিলো এদের কথায়। সেটা লক্ষ্য করে বিশ্বাসবৌদি বললেন, আসলে কি জানোতো, এই শহরটাকে এত ভালবেসে ফেলেছি যে এর সম্পর্কে যত  পৌরাণিক কাহিনী আছে সেগুলো ও জানবার আগ্রহে যতটা পেরেছি পড়তে চেষ্টা করেছি। আরে আমি ও হিষ্ট্রির ছাত্রী একটু কৌতূহল তো থাকবেই বলো! দু বছর বাংলার বাইরে এসে মিমি কেবল জীবনধারণের তাগিদে দৌড়েই গেছে, মনের খিদের যে পুষ্টি দরকার আজ যেন মনে হলো এখানে এই কোল্হাপুরে এসে তার কিছু আস্বাদ সে গ্রহণ করতে পারবে।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মে মাসের মাঝামাঝি তবু পান্হালার বাতাসে হাল্কা হিমেল হাওয়ার পরশ। প্রায় চারটে নাগাদ মিমিরা আবার যে যার নিজস্ব বাহনে। আশপাশটুকু ঘুরে দেখে আজকের মতো প্রত্যাবর্তন।
সারাদিনের ধকলে সকলেই কমবেশী পরিশ্রান্ত।একদিনে সবটা ঘুরে দেখা সম্ভব ও নয়। পরে আবার নাহয় আসা যাবে কোন একসময়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে  পশ্চিম দিগন্তে নেমে আসছে রক্তিম সূর্য।দিনান্তের ক্লান্ত রবি পাহাড়ী পথের কিনারে কিনারে ছড়িয়ে দিয়েছে  শেষ রশ্মি আভাটুকু। নিবিড় অরণ্যানীর বুক চিরে আসন্ন সন্ধ্যার পূর্বাভাস।  সেদিকে তাকিয়ে মিমির মন যেন তাকে এই পথের বাঁকে অজানা কোন দিকে যাবার সঙ্কেত ঘোষণা করে বলে গেল'হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনখানে।'
এই কথাই তো টেনে নিয়ে যায় অজানাকে জানার অচেনাকে চেনার হাতছানি দিয়ে। এই তো পরিক্রমা। এ পরিক্রমা সারা জীবনভর।
পাহাড়ী পথ ধীরে ধীরে নেমে আসছে সমতলে।এক অদ্ভুত ভাল লাগার রেশ নিয়ে মিমি ফিরলো তার নতুন বাসস্থানে।
ক্রমশঃ



রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

         


কোল্হাপুর ডায়েরী ৮
ব্রেকফাষ্ট সারতে সারতে বেলা এগারোটা বেজে গেল। তিনটে টেবিলে যথাক্রমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল ওরা।
গার্ডেন চেয়ার বেষ্টিত দুটি রেক্ট্যাঙ্গুলার টেবিলে মিষ্টারবৃন্দ ও রমণীকুল অনতিদূরে একটা গোল টেবিলে জেনারেশন গ্যাপ! অর্থাৎ কিনা মিমির সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ পুত্র অভি আর কৈশোর সোপানে প্রথম ধাপে পা রেখে কন্যা ঝিনুক সঙ্গে ওদের নবলব্ধ দাদা বৌদি বোসদার পুত্র ও পুত্রবধু
তিন্নি।ওদের কলকল শুনে মনে হচ্ছে যেন  কতকালের পরিচিতি একে অপরের সাথে। বলা বাহুল্য এই নতুন পাওয়া দাদা বৌদির সাহচর্যে  মিমির ছেলেমেয়ের গলায় ফেলে আসা আত্মীয়তার স্বাদ।
মে মাসের মাঝামাঝিতে সূর্য যদিও এখন প্রায় মধ্যগগনে তবু পান্হালার তাপমাত্রা আশ্চর্যজনকভাবে সুখাবহ।
হিলটপ এই হোটেলটা একেবারে পাহাড়ের গায়ে ঘেঁষে। পাঁচিলের ওপারেই খাড়া নেমে গেছে গভীর খাদ। যদিও সে খাদ মোটেও রুক্ষ বা পাথুরে নয় বরং শ্যামলিমা ধাপে ধাপে নেমে গেছে শেষ সীমানা অবধি।
হোটেল থেকে মাত্র কয়েক পা দূরেই পান্হালা ফোর্টের ভগ্নাবশেষ। হিষ্ট্রি আর আর্কিওলজির প্রতি প্রবল ঔৎসুক্য এক অমোঘ আকর্ষণে মিমিকে টানছিলো ফোর্টের দিকে। কিন্তু সময়ক্ষেত্রে দেখা গেল সেই মূহুর্তে কারোর ই বিশেষ ইচ্ছে নেই আড্ডা ছেড়ে ইতিহাসের পথে হাঁটবার। তার আরো একটা কারণ অবশ্য ই মিমিরা বাদে আর সকলের অজস্রবার পান্হালা ভ্রমণ। দর্শন তাই গৌণ এখানে জমায়েতটাই মুখ্য।
যেহেতু আর সব বৌদিরা বহুদিন ধরে এখানে বসবাসের কল্যাণে দীর্ঘদিনের পূর্বপরিচিত এবং সকলেই প্রায় সমবয়সী। তাদের তুলনায় মিমি বয়সে অপেক্ষাকৃতভাবে অনেকটাই ছোটো। তাই  অন্যান্য বৌদিরা নিজেদের মধ্যে নাম ধরে সম্বোধন করলেও মিমির কাছে সকলেই বৌদি
আখ্যায় সম্বোধিত।
এরমধ্যে বোস বৌদি একটু মৃদুভাষী যদিও ভূমিকাটা খানিকটা স্নেহশীলা অভিভাবিকার মতো। সবরকম রসিকতাই উপভোগ করছেন বিনা বাক্যক্ষেপে ঠোঁটের কোণায় স্মিত হাসিটি ঝুলিয়ে রেখে। মিত্র বৌদিও কম কথা বলেন তবে ওঁর মধ্যে বেশ ছেলেমানুষী ভাবটুকু লক্ষ্য করলো মিমি। বিশ্বাস বৌদি ও ভটচাজবৌদি দুজনেই খূব প্রাণোচ্ছল। এর মধ্যে বিশ্বাসবৌদি কোথ্থেকে  অবতারণা করলেন ভূতের কারসাজি।এই হিলটপ হোটেলে নাকি রাতবিরেতে তেনারা দৃষ্টিগোচর হন মাঝেমধ্যেই। বোঝো কান্ড! তেনারা এখানে থাকুন চাই না ই থাকুন এই ভরদুপুরে নিশ্চয় তারা ঢ্যালা মারতে বেরিয়ে আসবেননা! মিমির বলে এখন পায়ের তলায় সর্ষে নাচছে ফোর্টের অন্দরমহলের জন্য। অস্ফুটে সেকথা একবার উচ্চারণ করাতে ভটচাজবৌদি যদিও বা একটু দয়াপরবশ হলেন বোস বৌদি দিলেন অমনি তাকে বকুনি! দুজনে যদিও
নেমসেক তবু পরস্পরকে নাম ধরেই সম্বোধন করেন তারা।
- থামোতো রূপা তুমি মোটেও এখন যাবেনা। এই শরীর নিয়ে আর সিঁড়ি ভাঙতে হবেনা তোমার!
কথাপ্রসঙ্গে মিমি জানলো অদম্য প্রাণশক্তি বিশিষ্ট এই মহিলাটির দু দু বার অ‍্যাজিওপ্ল্যাষ্টি হয়ে গেছে।হয়েছে হাঁটুর প্যাটেলা ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ও। ওনার কৌতুকপ্রিয় মুখভঙ্গি আর বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখলে সে কথা বোঝে কার সাধ্যি!
দূর  থেকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে বোসদার ছেলে আর ছেলের বৌ লক্ষ্য করছিলো এদিককার কথোপকথন। মিমির প্রায় হতাশ মুখের ভঙ্গিমা আঁচ করতে পেরে পুপু বললো,
- চলো আন্টি আমরা যাই তোমার সাথে। ওরা একটু বিশ্রাম নিক।'
মিমিকে নিয়ে ওরা চারজন পায়ে পায়ে এগোলো ফোর্টের দিকে। পুরোটাই প্রায় ভগ্নস্তূপ। ফোর্টের পাশ ঘেঁষে পরিখা কাটা যদিও এখন আর জল নেই তাতে। ভিতরে সিঁড়ি দিয়ে কয়েকধাপ নামলে  একটি গভীর কূপ।পুপু বললো এর নাম আন্ধার বাভড়ি।এই কূপটি একটি গুপ্ত কূপ। পান্হালা দুর্গের মূল জলের উৎস এইটাই। শত্রুপক্ষ  যাতে প্রবেশের পর পানীয় জলে বিষ মেশাতে না পারে তাই এই গোপনীয়তা। এর উপরে ত্রিতলবেষ্টিত ঘূর্ণ্যমান সোপানশ্রেণী ধাপে ধাপে নেমে গেছে কূপটির সন্নিকটে।এই কূপের নীচেও নাকি অজস্র গুপ্ত সুড়ঙ্গ রয়েছে যা পাহাড়ের অপরপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে। এমন আরো অসংখ্য গূুপ্ত সুড়ঙ্গ রয়েছে ফোর্টের ভেতরে শত্রু আক্রমণ করলে যাতে নিরাপদে দুর্গের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া যায়।
এ ফোর্টে প্রবেশের বেশ কয়েকটি দরওয়াজা রয়েছে তার মধ্যে মুখ্য দরওয়াজাটি হোলো চার দরওয়াজা। এছাড়াও র য়েছে  তিন দরওয়াজা ও বাঘ দরওয়াজা যদিও সব ই এখন প্রায় ভগ্নস্তূপে পরিণত।
এর উপরে একটি ছোট টিলার মতন। সিঁড়িগুলো খুব খাড়া খাড়া। মিমি আস্তে আস্তে উঠছিলো। মিমিকে ওভাবে কষ্ট করে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো তিন্নি। ততক্ষণে মিমির ছেলেমেয়ে পুপুর সাথে টিলার মাথায় উঠে গেছে। তিন্নি আর মিমি এসে দাঁড়ালো টিলার পাঁচিলের গা ঘেঁষে। অনভ্যাসের কারণে মিমি স্বভাবত ই একটু ক্লান্ত। সেটা বুঝতে পেরে তিন্নি বললো, চলো আন্টি
সামনের পাথরটার ওপর একটু বসি। ওখান থেকে নীচে
দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে সর্পিল পথশ্রেণী। তার ই একটি ঢুকে গেছে অনতিদূরে একটি গুহাভ্যন্তরে।হয়তো
এই পথেই একদা যাতায়াত করতো অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্য দল। পার্বত্য পথের সুচতুর ও কৌশলী যোদ্ধৃবৃন্দ। মিমি যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পেল সারি সারি মারাঠা ঘোড়সওয়ার হাতে তাদের উন্মূুক্ত ক্ষুরধার  অসি আর কন্ঠে হর হর মহাদেও শ্লোগান।
চমক ভাঙলো তিন্নির কথায়। -'জানো আন্টি, এই যে
ভটচাজ আন্টিকে দেখছো এর সবটাই নিজের যন্ত্রণাকে
লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। নাগো আমি ওনার শরীরের কথা বলছিনা। ওনার বুকের ভেতর যে গভীর ক্ষত লুকিয়ে রয়েছে উচ্ছলতার প্রলেপে তাকে ঢেকে দেন মাত্র।।
এর আগের দিন আলাপ পরিচয়ের সময় মিমি শুনেছিলো ওনার একটিই ছেলে। দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছিলো বোর্ডের পরীক্ষায়। ইঞ্জিনিয়ারির্  কম্প্লিট করে এখন প্যারিসে ম্যানেজমেন্ট পড়তে গিয়েছে। আজ জানলো ওর বড় ছেলের কথা। সে ও নাকি খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিল। কোল্হাপুর ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াকালীন ওর দুরারোগ্য লিউকেমিয়া ধরা পড়ে। সবরকম যথাসাধ্য ট্রিটমেন্ট ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোর্স শেষ হবার আগেই ও সকলকে ছেড়ে চলে যায় মহাকালের উদ্দেশে।বৌদি সন্তান হারানোর মাতৃহৃদয়ের ব্যথা কখনো প্রকাশ করেননা প্রকাশ্যে। তবু কখনো কোন অসতর্কমূহর্তে সেই বিয়োগব্যথা প্রকাশ হ য়ে পড়ে। যাকে তিনি মনে করেন সেতো হারায়নি। চোখের সামনে দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব তিনি তার মমতা দিয়ে উপলব্ধি করেন সবসময়।
এই ভগ্নস্তূপ কত বিয়োগব্যথার সাক্ষী। কত মায়ের স্ত্রীয়ের ভগিনীর অশ্রু লুকিয়ে রয়েছে এর পাথরের খাঁজে খাঁজে। তার সাথে আরেক মায়ের মর্মযন্ত্রণা মিশে গেল  এই খর মধ্যাহ্নের প্রাক্কালে।
শুনতে শুনতে কখন চোখের কোণায় জমা হয়েছিলো দুফোঁটা অশ্রুবিন্দু। হাতের চেটোয় মুছে নিতে নিতে মিমি দেখলো পুপুরা নেমে আসছে টিলার ওপর থেকে।
ক্রমশঃ



রবিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

                         


কোল্হাপুর ডায়েরী ৭

ঠিক হোলো রবিবার সকালে সকলে বোসদার বাড়িতে মিট করবে। সেখান থেকে একসাথে প্রত্যেকে নিজের নিজের গাড়ীতে রওনা হবে পান্হালার উদ্দেশে। ওখানে গিয়েই হবে ব্রেকফাষ্ট আর লাঞ্চ।
মিমি স্ন্যাক্স কিছু প্যাক করে নিয়েছিল। সাড়ে আটটা নাগাদ সপরিবারে  পৌঁছে গেল বোসদার ওখানে। মিমিদের সাথে সাথেই ভটচাযদা আর বৌদি এসে পৌঁছলেন। ভটচাযদা একটি নামী টেক্সটাইল কোম্পানীর জেনারেল ম্যানেজার। খুব  সুরসিক নিপাট একজন ভদ্রলোক। কম কথা বললেও সেন্স অব হিউমার প্রবল। আর ভটচাযবৌদিতো ভীষণ আমুদে মানুষ। একাই হৈ চৈ করে মাতিয়ে রাখেন সারাক্ষণ। জীবনের কঠিন যণ্ত্রণাকেও কিভাবে  নিজের প্রাণশক্তি দিয়ে ঢেকে রাখতে হয় এঁকে না দেখলে মিমি কোনদিন বুঝতেই পারতোনা।
জীবনের চলার পথে প্রতিনিয়ত জানবার শেখবার যে অপরিমেয় রত্নভান্ডার ছড়িয়ে রয়েছে জীবনবোধের পাতায় পাতায় মিমি কেবল তার সন্ধান করে গেছে
পরম শিক্ষার্থীর ঔৎসুক্যে। এই তার সঞ্চয়। মনের মণিকোঠায় এদের সযত্নে সাজিয়ে রাখে মিমি।নিজের সাথে একলা হবার অবকাশে নেড়েচেড়ে দ্যাখে তার অভিজ্ঞতা ঝুলি ভরে ওঠা সেইসব  দুর্লভ রত্নরাজি।
দেখতে দেখতে বিশ্বাসদা মিত্রদা বৌদিদের নিয়ে এসে পড়লেন কলকল করতে করতে। নেক্সট জেনারেশন বলতে মিমির দুই ছেলেমেয়ে বোসবদির ছেলে ছেলের বৌ। মেয়ে গেলনা ওর কিছু জরুরী কাজ পড়ে গেছিলো তাই।
সকলে মিলে বেরোতে বেরোতে সাড়ে ন'টা বেজে গেল। বোসদার ছেলে পুপু প্রস্তাব দিলো ওদের গাড়িতে মিমির দুউ ছেলেমেয়ে যাবে। পরিবর্তে বোসদা বৌদি যাবে মিমিদের গাড়িতে।।
কোল্হাপুর মিউনিসিপ্যালিটির পাশ দিয়ে খানিকটা পথ গেলে ডানদিকে একটা রাস্তা বেরিয়ে গেছে পান্হালার দিকে। শহর ছেড়ে বেরিয়ে খানিকটা যাবার পরেই শুরু হলো পাহাড়ী পথ পরিক্রমা।
দেখতে দেখতে পথের দু'ধারের বাড়িঘর ক্রমশ অপসৃয়মান সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে ঘন সবুজ অরণ্যানী।পূরো পথটাই খাড়া উপরে উঠে যাচ্ছে পান্হালার দিকে। বেশ খানিকটা যাবার পরে একটা রাস্তা ডানদিকে
চলে গেছে জ্যোতিবা পাহাড়ের দিকে। আর সোজা রাস্তাটা একেবারে পান্হালা। পথে বেশ কিছু  ক্ষীণতোয়া জলধারা নজরে পড়লো। সলজ্জ কিশোরীর মতো গাছগাছালির ফাঁকে নিজেকে আড়াল করে ভীরু পদক্ষেপে নীচে নেমে আসছে।
এই কুড়ি বাইশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে লাগলো
প্রায় একঘন্টা।সবার আগে চলেছে মিত্রদার গাড়ি। আর মিমিদের গাড়ি সবার শেষে। আর সকলের কাছে এই পথটা পরিচিত হলেও সূর্যর কাছে নতূন তাই তার গাড়ির গতিও ধীর।গাড়ির কাচের ফাঁক দিয়ে মিমি আস্বাদন করতে করতে চলেছে পাহাড়ি পথের অনুপম প্রাকৃতিক
সৌন্দর্য। অরণ্যানীর নিবিড়তা ক্রমশ কমে এলে পাহাড়ের
গায়ে প্রতিভাত হতে লাগলো ছোট ছোট বসতি। এইভাবে
পথের বিলাস পেরিয়ে একসময় পৌঁছে গেল পান্হালার দ্বারপ্রান্তে। এখানে ফোর্টে প্রবেশ করার আগে টিকিট কাটতে হয়। ড্রাইভারের টিকিট মকুব। তাই মিমিদের কাটতে হলো তিনটে টিকিট।
প্রবেশপথের  বহিরঙ্গটা গম্বূজাকৃতির অর্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টিত।  সামনের অংশে মারাঠা সম্রাট শিবাজীর একটি মুক্ত কৃপাণ হস্তে অশ্বারূঢ় প্রস্তরমূর্তি।
সহ্যাদ্রি পর্বতগাত্রে নির্মিত এই ফোর্টটি সমতল থেকে চারশো মিটার উঁচু। অসংখ্য সুরঙ্গ এই দুর্গের নীচে নির্মিত। এরমধ্যে একটি সুড়ঙ্গ এক মিটারের ও বেশী লম্বা।দুর্গের প্রাকার ত্রিভুজাকৃতির। এর ব্যাপ্তি সাত মিটারের ও কিছু বেশী।দুর্গের প্রাচীরগূলি একদম ঋজু খাড়া পাহাড়ের
গায়ে দন্ডায়মান।
অধিকাংশ স্থাপত্য বিজাপুরী স্থাপত্যের অনুকরণে নির্মিত।
কিছু কিছু স্থাপত্যে ময়ূরের  মোটিফ বাহমনী সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
কিছু কিছু স্তম্ভের গায়ে পদ্মের কারুকাজ রাজা দ্বিতীয় ভোজের সময় স্মারক। দুর্গের কিছু কিছু স্তম্ভ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর্চের আদলে নির্মিত দরওয়াজা দিয়ে একে একে প্রবেশ করলো মিমিদের সবক'টি গাড়ি। পান্হালার ভেতরে অনেক হোটেল রেস্তোঁরা ও খাবারের সুবন্দোবস্ত রয়েছে। এতক্ষণ টানা জার্নি করে সকলের খিদেও পেয়েছে প্রচন্ড।ফোর্টের সামনেই  একটি হোটেলে সকলের গাড়ি  দাঁড়ালো এক এক করে। খানিকটা গার্ডেন রেস্তোরাঁ মতো। তবে থাকবার সুবন্দোবস্ত ও আছে। ভটচাজ বৌদি  বিশ্বাস বৌদি মিত্র বৌদি সকলেই এত মিশুকে যে কিছুক্ষণের মধ্যে মিমির জড়তা একেবারেই কেটে গেল। কোল্হাপুরী মিসাল খেতে খেতে পান্হালা সম্পর্কে ভটচাজবৌদির কাছে মিমি শুনছিলো অজানা নতুন আরো অনেক গল্পকথা।

ক্রমশঃ





রবিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

                      


কোল্হাপুর ডায়েরী ৬
কোল্হাপুর শহরটা আড়ে দৈর্ঘ্যে খুব বড় নয়। মিঃ বোসের বাড়িও খুব কাছেই। ঠিকানা ও ডিরেকশন মিলিয়ে
বাড়ি খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হলোনা। এই অঞ্চলটা কোল্হাপুরের অন্যতম পশ এরিয়া। অনেক
ধনী লোকের  বাস এই অঞ্চলে। প্রায় সব বাংলো ধরণের বাড়ি।কোল্হাপুরে এসে মিমির আরো একটা
জিনিস নজরে পড়লো এখানে সব বাড়িতেই সবুজের খুব আধিক্য। বাংলোতে তো বটেই ছোট ফ্ল্যাটেও লোকে একটু হলেও সবুজ চারা রোপণ করে। উপত্যকা শহর হওয়ায় এখানে আবহাওয়া সারা বছর নাতিশীতোষ্ণ।
আরো একটা জিনিস মিমি লক্ষ্য করেছে প্রায় সব বাড়িতেই পোষ্য রয়েছে। বোঝা যায় এখানে সারমেয় প্রীতি
নিতান্ত অবহেলিত নয়।
কোল্হাপুর মহারাষ্ট্রের শ্যুগার বেল্ট হওয়ায় এখানে  পার ক্যাপিটা ইনকাম অনেক বেশী। বেশির ভাগ  লোকের অনেক খেতি জমি রয়েছে। মূলত আখের ফলন হয়। আখের চাষ খুব লাভজনক। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পয়সা উপার্জনের চিন্তা না থাকায় এখানকার জীবনযাত্রা
অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক শ্লথ ।
বৌদির বাড়িতে পৌঁছে দেখলো সেখানে আরো বেশ কিছু বাঙালি পরিবারের সমাগম। একে একে সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন বোসদা ও বৌদি।
আলাপ হলো ওনার পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গেও
ওনাদের পরিবারে ওনার ছেলে ছেলের বউ ও অবিবাহিতা মেয়ে রয়েছে। অনেকটা মিমির মতোই ছেলে বড় মেয়ে ছোট। ছেলে সদ্য বিবাহিত। ছেলের বউটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মিশুকে স্বভাবের। মেয়েকেও ভারি মিষ্টি দেখতে। সকলেই খুব সহজ সরল আর আন্তরিক।
এই পরিবারটির সাথে ক্রমে ক্রমে হৃদ্যতা আরো বেড়েছে। সম্পর্কটা আর অফিসের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।বরং নিকটাত্মীয়ের রূপ নিয়েছে।
ওখানে পরিচয় হোলো আরো কিছু সম্ভ্রান্ত বাঙালী পরিবারের সাথে। প্রায় সবাই ওখানে অনেক বছর ধরে আছেন। মিশে গেছেন ওখানকার রীতিনীতি সংস্কৃতির সাথে। কোল্হাপুরের সংস্কৃতির নিজস্ব একটা স্বাতন্ত্র্য
আছে।মিমি ধীরে ধীরে তার পরিচয় পেয়েছে।
সেদিনের ঘরোয়া আড্ডায় ঠিক হোলো আগামী রবিবার সকলে মিলে পান্হালা যাওয়া হবে। বাঙালীরা সাধারনত আড্ডাপ্রবণ জাতি।প্রবাসে এই সম্মিলিত আড্ডার মেজাজটাই আলাদা। এর স্বাদও মিমির কাছে নতুনত্বের।
পান্হালা কোল্হাপুর শহর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট্ট পাহাড়ী শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা 3177 কিলো মিটার।মহারাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা
ক্ষুদ্রতম শহর এইটি।প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পান্হালার গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে কোল্হাপুর মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের অন্তর্গত হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণে মহারাষ্ট্র সরকার যথেষ্ট যত্নশীল এর মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পান্হালা দুর্গটি মারাঠা সাম্রাজ্যের ও ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।
ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ তার বাল্যকাল ব্যতিরেকে পাঁচশত দিনের অধিক এই দুর্গে জীবন অতিবাহিত করেছেন।১৭৮২ থেকে১৮২৭ পর্যন্ত মারাঠা সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পান্হালা।
কোল্হাপুর শহরের উত্তর পশ্চিমে কুড়ি কিলোমিটার দূরে সহ্যাদ্রি পর্বতের  বহির্স্তরে সমতল থেকে ৪০০মিটার উচ্চতায় পান্হালা দুর্গটি অবস্থিত।দাক্ষিনাত্যের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দুর্গ হলো এইটি।
কূটনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে ও এর গুরুত্ব অপরিসীম।এই দুর্গের প্রাকার থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার প্রধান সড়ক যোগাযোগ পথগুলি নিরীক্ষণ
করা যেত। শুধু তাই নয়, এই দুর্গের প্রাকার থেকে সমগ্র উপত্যকাটি দৃষ্টিগোচর হয়।
১১৭৮ থেকে ১২০৯ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত এই দূর্গটি প্রথমে শীলহার রাজ ভোজের প্রসাশনিক কেন্দ্রস্থল ছিলো।  ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে এটি কর্ণাটকের বিজাপুর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।  পরে মুঘলসম্রাট ঔরঙ্গজেব এটি করায়ত্ত করেন।এই দুর্গের উন্নতিসাধন প্রকল্পে মূলত আদিলশাহীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।  ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে শিবাজী এটি দখল করেন।  পরে ১৬৮৯ খ্রীষ্টাব্দে
আওরঙ্গজেব পুনরায় এই দুর্গটি অধিকার করেন। তার অনেক পরে মহারাণী তারাবাঈয়ের অনুগামী রামচন্দ্র এটিকে নিজ অধিকারভুক্ত করেন ও কোল্হাপুরের  প্রশাসনিক আওতায় পান্হালাকে  নিয়ে আসা হয়।
১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে এই দুর্গটি ব্রিটিশদের অধীনস্থ হয়।
ক্রমশঃ



 

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

                     


কোল্হাপুর ডায়েরী ৬
কোল্হাপুর শহরটা আড়ে দৈর্ঘ্যে খুব বড় নয়। মিঃ বোসের বাড়িও খুব কাছেই। ঠিকানা ও ডিরেকশন মিলিয়ে
বাড়ি খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হলোনা। এই অঞ্চলটা কোল্হাপুরের অন্যতম পশ এরিয়া। অনেক
ধনী লোকের  বাস এই অঞ্চলে। প্রায় সব বাংলো ধরণের বাড়ি।কোল্হাপুরে এসে মিমির আরো একটা
জিনিস নজরে পড়লো এখানে সব বাড়িতেই সবুজের খুব আধিক্য। বাংলোতে তো বটেই ছোট ফ্ল্যাটেও লোকে একটু হলেও সবুজ চারা রোপণ করে। উপত্যকা শহর হওয়ায় এখানে আবহাওয়া সারা বছর নাতিশীতোষ্ণ।
আরো একটা জিনিস মিমি লক্ষ্য করেছে প্রায় সব বাড়িতেই পোষ্য রয়েছে। বোঝা যায় এখানে সারমেয় প্রীতি
নিতান্ত অবহেলিত নয়।
কোল্হাপুর মহারাষ্ট্রের শ্যুগার বেল্ট হওয়ায় এখানে  পার ক্যাপিটা ইনকাম অনেক বেশী। বেশির ভাগ  লোকের অনেক খেতি জমি রয়েছে। মূলত আখের ফলন হয়। আখের চাষ খুব লাভজনক। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পয়সা উপার্জনের চিন্তা না থাকায় এখানকার জীবনযাত্রা
অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় অনেক শ্লথ ।
বৌদির বাড়িতে পৌঁছে দেখলো সেখানে আরো বেশ কিছু বাঙালি পরিবারের সমাগম। একে একে সকলের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন বোসদা ও বৌদি।
আলাপ হলো ওনার পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গেও
ওনাদের পরিবারে ওনার ছেলে ছেলের বউ ও অবিবাহিতা মেয়ে রয়েছে। অনেকটা মিমির মতোই ছেলে বড় মেয়ে ছোট। ছেলে সদ্য বিবাহিত। ছেলের বউটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি মিশুকে স্বভাবের। মেয়েকেও ভারি মিষ্টি দেখতে। সকলেই খুব সহজ সরল আর আন্তরিক।
এই পরিবারটির সাথে ক্রমে ক্রমে হৃদ্যতা আরো বেড়েছে। সম্পর্কটা আর অফিসের চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।বরং নিকটাত্মীয়ের রূপ নিয়েছে।
ওখানে পরিচয় হোলো আরো কিছু সম্ভ্রান্ত বাঙালী পরিবারের সাথে। প্রায় সবাই ওখানে অনেক বছর ধরে আছেন। মিশে গেছেন ওখানকার রীতিনীতি সংস্কৃতির সাথে। কোল্হাপুরের সংস্কৃতির নিজস্ব একটা স্বাতন্ত্র্য
আছে।মিমি ধীরে ধীরে তার পরিচয় পেয়েছে।
সেদিনের ঘরোয়া আড্ডায় ঠিক হোলো আগামী রবিবার সকলে মিলে পান্হালা যাওয়া হবে। বাঙালীরা সাধারনত আড্ডাপ্রবণ জাতি।প্রবাসে এই সম্মিলিত আড্ডার মেজাজটাই আলাদা। এর স্বাদও মিমির কাছে নতুনত্বের।
পান্হালা কোল্হাপুর শহর থেকে বাইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট্ট পাহাড়ী শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা 3177 কিলো মিটার।মহারাষ্ট্রের সর্বাপেক্ষা
ক্ষুদ্রতম শহর এইটি।প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পান্হালার গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে কোল্হাপুর মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের অন্তর্গত হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণে মহারাষ্ট্র সরকার যথেষ্ট যত্নশীল এর মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু পান্হালা দুর্গটি মারাঠা সাম্রাজ্যের ও ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।
ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ তার বাল্যকাল ব্যতিরেকে পাঁচশত দিনের অধিক এই দুর্গে জীবন অতিবাহিত করেছেন।১৭৮২ থেকে১৮২৭ পর্যন্ত মারাঠা সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পান্হালা।
কোল্হাপুর শহরের উত্তর পশ্চিমে কুড়ি কিলোমিটার দূরে সহ্যাদ্রি পর্বতের  বহির্স্তরে সমতল থেকে ৪০০মিটার উচ্চতায় পান্হালা দুর্গটি অবস্থিত।দাক্ষিনাত্যের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দুর্গ হলো এইটি।
কূটনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে ও এর গুরুত্ব অপরিসীম।এই দুর্গের প্রাকার থেকে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার প্রধান সড়ক যোগাযোগ পথগুলি নিরীক্ষণ
করা যেত। শুধু তাই নয়, এই দুর্গের প্রাকার থেকে সমগ্র উপত্যকাটি দৃষ্টিগোচর হয়।
১১৭৮ থেকে ১২০৯ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত এই দূর্গটি প্রথমে শীলহার রাজ ভোজের প্রসাশনিক কেন্দ্রস্থল ছিলো।  ষোড়শ শতাব্দীর প্রারম্ভে এটি কর্ণাটকের বিজাপুর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।  পরে মুঘলসম্রাট ঔরঙ্গজেব এটি করায়ত্ত করেন।এই দুর্গের উন্নতিসাধন প্রকল্পে মূলত আদিলশাহীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।  ১৬৫৯ খ্রীষ্টাব্দে শিবাজী এটি দখল করেন।  পরে ১৬৮৯ খ্রীষ্টাব্দে
আওরঙ্গজেব পুনরায় এই দুর্গটি অধিকার করেন। তার অনেক পরে মহারাণী তারাবাঈয়ের অনুগামী রামচন্দ্র এটিকে নিজ অধিকারভুক্ত করেন ও কোল্হাপুরের  প্রশাসনিক আওতায় পান্হালাকে  নিয়ে আসা হয়।
১৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে এই দুর্গটি ব্রিটিশদের অধীনস্থ হয়।
ক্রমশঃ



 ছবি পান্হালা দুর্গ

রবিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২১

মিনাক্ষী ঘোষ

               


দেখতে দেখতে হৈ হৈ করে কেটে গেল একটা সপ্তাহ। এরমধ্যে এল পিজি ট্রান্সফার ও ব্যাঙ্কের আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় কাজকর্ম মেটাতেই অনেকটা সময় কেটে গেল। ছেলের টুয়েলভ ফাইনাল হয়ে গেছে।মেয়ের স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট ও নেওয়া হোলো। কোল্হাপুরে খুব নামকরা একটা কনভেন্ট রয়েছে মেয়েকে সেখানে গিয়ে অ‍্যাডমিশন করাতে হবে।  তার একটা চিন্তাও মাথায় আছে বৈকি! মিমি জানে একটা উপায় ঠিক হবেই।যত সমস্যাই আসুকনা কেন মিমির স্থির বিশ্বাস তার থেকে সে বের হয়ে আসতে পারবেই। এ বিশ্বাসটুকুকে ভর করেই অনেক দুরূহ বাধা সে অতিক্রম করেছে এখনো পর্যন্ত।
প্যাকার্স অ‍্যান্ড মুভার্সের দায়িত্বে মালপত্র  ন্যস্ত করে রবিবার মিমিরা রওনা হোলো নতুন শহরের উদ্দেশে।
সূর্য ই ড্রাইভ করছিলো। মিমি পাশে বসে  সমস্ত যাত্রাপথের ছবিটা কেবল বুকের ভেতর এঁকে রাখার চেষ্টা করে গেছে।
পুণে থেকে কোল্হাপুরের দূরত্ব প্রায় দুশো পঁচিশ কিলোমিটার। সহ্যাদ্রি পর্বতমালার ধার ঘেঁষে এই  উপত্যকা শহরটি হোলো কোল্হাপুর।  মারাঠি ভাষায় 'কোল্হা'' শব্দের অর্থ হোলো উপত্যকা। কোল্হাপুরের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হোলো উপত্যকার শহর বা 'সিটি অব ভ্যালিজ'।
 মূলত ব্যাঙ্গালোর পুণে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরেই পুরোটা পথ চলা। এই দু' বছরে মিমি পুণের বাইরে কোথাও যায়নি। পুণে থেকে সাতারা পর্যন্তযেতে পথে দুটি ঘাট সেকশন পেরোলো ওরা। পাহাড়ী রাস্তা। খুব শার্প  চড়াই উৎরাই যদিও নয় তবুও চুলের কাঁটার মতো পাকদন্ডী পথ পেরোবার  সময় বুকের ভেতর শিরশির করে উঠছিল। এরপর কতবার এ পথে মিমি যাতায়াত করেছে তবু প্রতিবার ই বুকের ভেতরটা পাহাড় পেরোতে ধুকপুক করতে থাকে। নীচে অতলস্পর্শী খাদ। যদিও রাস্তা বেশ চওড়া তবু মূহুর্তের অসতর্কতায় খাদের গভীরে তলিয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। সূর্য ড্রাইভিংটা যথেষ্ট ভাল করে। পাহাড়ি রাস্তাতেও নিয়মকানুন মেনেই ফার্ষ্ট গীয়ারে আস্তে আস্তে পাহাড়ে উঠছিলো। একপাশে ঘন সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা পাহাড় অন্যদিকে খাদ। বেশ অনেকটা রাস্তাই সাতারা ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টের আওতায় পড়ে।  যদিও প্রচুর গাড়ি চলাচল করছিলো পাহাড়ি পথ বেয়ে মিমির মন কিন্তু ওই নিবিড় অরণ্যানীর মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলো একটু একটু করে। এই পাহাড়ী পথেই শিবাজীর মারাঠা সৈন্যদল মোঘলশত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছে। 
তবু বশ্যতা স্বীকার করেনি।  এসব ভাবতে ভাবতে মিমি কখন ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছিলো চমক ভাঙলো
সূর্যর ডাকে। সূর্যর গাড়ি ততক্ষণে সমতলের মাটি ছুঁয়েছে।
- 'মিমি সামনে একটা চায়ের দোকান আছে চলো একটু
দাঁড়িয়ে চা খাই।'
টানা দু ঘন্টা ড্রাইভ করে সূর্য একটু ক্লান্ত। আরো ঘন্টা
তিনেক ড্রাইভ করতে হবে। চা খেয়ে একটু ফ্রেশ হ য়ে নেওয়া এই আর কি! কাছের দোকানটায় একজন ভদ্রমহিলা চা  বিক্রি করছিলেন।
- 'কাকু দৌ কাপ চায়ে'
মারাঠীতে  কাকিমাকে কাকু বলা হ য়। সম্বোধনটির মধ্যে অপরিচয়ের আধিক্যের চাইতে অন্তরঙ্গতার আবেদনটুকু
অনেক বেশী। মিমি মারাঠি ভাল বলতে না পারলেও বুঝতে পারে একটু একটু। কাকুর কাছে শুনে বুঝলো বাকি রাস্তাটা মোটামুটি সমতল  আর ঘন্টা দেড়েক পথ পেরোলে কারাড শহর। এটিও বেশ বর্ধিষ্ণু একটি শহর।
কারাড থেকে কোল্হাপুর আরো ঘন্টা খানেকের পথ।
 কাকুর কাছে গরম গরম বড়া পাও পাওয়া গেল। পাঁউরটির ফাঁকে আলুর বড়া। এটা এখানকার খুব জনপ্রিয় খাদ্য। ছেলেমেয়ের ও খুব প্রিয়।
এরপর টানা ড্রাইভ। দেখতে দেখতে কারাড পেরিয়ে গেল। এরপর এলো ইচলকরঞ্জি। এখানে বেশ কয়েকটি টেক্সটাইল ইন্ডাষ্ট্রি নিয়ে টেক্সটাইল হাব তৈরী করা হয়েছে।
ছোট্ট ছোট্ট টিলার ওপর বাড়িগুলো ছবির মতো সুন্দর।
পথে কয়েকটি টোল পড়লো। মহারাষ্ট্র গভর্ণমেন্ট রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে খানিকদূর পরপর এই টোল ট্যাক্স ধার্য করেছেন। রাস্তা যেমন চওড়া তেমন মসৃণ। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রকল্পিত সোনালি চতুর্ভূজ সড়ক যোজনা বা গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারাল 
ন্যাশনাল হাইওয়ের অন্তর্গত এই মহাসড়কটি।
কোল্হাপুর পৌঁছতে পৌঁছতে সূর্যদেব  ততক্ষণে পশ্চিম দিগন্তের পথযাত্রী।
কোল্হাপুর প্রবেশের আগে মিমি দেখলো অদূরে বিরাট আকৃতির গণেশ মূর্তি। পরে জেনেছে এটি চিন্ময় গনেশ নামে খ্যাত।বিঘ্নহর্তা সমস্ত রকম আসন্ন বিপদের  হাত থেকে শহরটিকে রক্ষা করবার জন্য প্রবেশপথের নিকটে দন্ডায়মান।
ব্যাঙ্গালোর পুণে হাইওয়ে সোজা চলে গেছে ব্যাঙ্গালোরের দিকে। আরেকটা রাস্তা বাঁদিক ঘেঁষে নেমে গিয়েছে কোল্হাপুরের দিকে। সেই পথ ধরে মিমিদের গাড়ি এবার প্রবেশ করলো কোল্হাপুরের তোরণদ্বারে। সুন্দর একটি ফটকের ভেতর দিয়ে কোল্হাপুর শহরের  প্রবেশপথ।উল্টোদিকের রাস্তাটা চলে গেছে গান্ধীনগরের দিকে। মূলত সেটি বস্ত্রবিপণীর জন্য বিখ্যাত।
কোল্হাপুর শহরে ঢুকতেই মিমির চোখে পড়লো একেবারে কেন্দ্রস্থলে অশ্বপৃষ্ঠে আরূঢ়া এক নারীমূর্তি।হাতে সুউচ্চ উন্মুক্ত তরোয়াল। পরণে মারাঠি কায়দায় পরিহিত ন' ওয়াড়ি শাড়ি। মহারাণী তারাবাইয়ের মূর্তি এটি।
মহারাণী  তারাবাই ছিলেন  অসীম সাহসিকতার প্রতিমূর্তি।তিনি বিখ্যাত মারাঠা জেনারেল হাম্বিতরাও মোহিতের  কন্যা,মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজী পুত্র রাজারাম ভোঁসলের  পত্নী এবং  শিবাজী দ্বিতীয়ের মাতা।তিনি স্বামী রাজারামের সম্পর্কিত ভগ্নী ও ছিলেন। উপস্থিত বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় মহারাণী তারাবাই ছিলেন অতুলনীয়া।অশ্বচালনায় ও যুদ্ধবিদ্যায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুচতুর।
১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে স্বামী রাজারামের মৃত্যুর পরে তিনি  তাঁর নাবালক  শিশুপুত্র শিবাজী দ্বিতীয়কে উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা করেন ও আওরেঙ্গজেবের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেন।এবং মোগলবাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। ১৭০৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মোগল বাহিনীকে শর্তাধীন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলে মুঘল শাসক সেটা প্রত্যাখ্যান করেন।১৭০৭ পর্যন্ত তারাবাই তার সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করে মোগল বাহিনীকে প্রতিরোধ করেন। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তারাবাইয়ের নেতৃত্বে মারাঠা অঞ্চল বিপন্মুক্ত হয়। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকার বলেছিলেন ১৭০০ -১৭০৭পর্যন্ত মহারাণী তারাবাইয়ের অসীম সাহসিকতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা মারাঠা জাতিকে ভয়াবহ সংকটের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।এবং এই সময়ের মধ্যে মহারাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বাহিনীর নির্দেশক রূপে বিধবা রাণী তারাবাই মোহিত ভিন্ন সেইসময় সঙ্কটকালীন উপদেষ্টা হিসাবে আর কোন মন্ত্রী ছিলোনা।
ক্রমশঃ


রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মিনাক্ষী ঘোষ

                     




 ভান

যে মেয়েটি

মালসায় আগুন আর নাভিমূলে

শ্বেতপদ্ম রেখে ভেবেছিল একদিন

মৃত্যু আর অমরত্বের মাঝখানে

সেতু নির্মাণ করা যায় অনায়াসেই!

শুন্যতার অতল খাদে

মনটাকে অনায়াস গড়িয়ে দিয়ে

প্রথাসিদ্ধ নিয়ম জলে আচমন সেরেছিল

এক কমন্ডলু বিবমিষায়!

অমরত্ব পাবে ভেবে

 অবিনাশী পাথরজন্মকে

আগুনে পোড়াতে চেয়ে বারবার

পদ্মের মৃণালে  ঢেকেছিল তার সমস্ত ক্ষত

বল্কল অথবা লজ্জাবস্ত্র

কোনটিই আজ আর গ্রহণযোগ্য নয় তার

 সেতুহীন অমরত্ব পেতে গেলে

মৃত্যুর আগুনে স্নাত হতে হয়।


মাভৈঃ



নিকষকালো গুহায় দাঁড়িয়ে থেকেও

বুকের ভেতর সহস্র সূর্যকে পুষে রাখি

 যত ই ঝঞ্ঝা ভাঙুক শাখা সম্বল

অন্য কোথাও নীড় খুঁজে নেবে পাখি

 

অন্ধকারের প্রাচীরগাত্রে ক্ষয়

জানি,জানি তাও নিশ্চিত হবে কোনদিন

ততোদিন চোখে জোনাকি জ্বালিয়ে রাখি

ভাদ্রের নদী যদিই উজানে বয়


ফাটলের গায়ে ক্ষীণ যে স্রোতস্বিনী

এতদিন ছিল একলাই নিরিবিলি

জোয়ার প্লাবনে বাঁধ ভাঙে উচ্ছ্বাস

পাথর ভাঙতে প্রয়োজনে রঙ তুলি


নাগপাশে আরো যতই কঠিনে বাঁধো

কান পেতে থাকো,শুনতে আর্তনাদ

হাজার আলোর ঝাড়বাতি তবু জ্বেলে রাখি

ধরেছি মুদ্রাতে আনন্দ বিষাদ যুগপৎ ।


কথা দিলাম


বর্ষার আগে

জমিতে নিড়েন দিতে হবে বলে

তুমি ঠা ঠা রোদ্দুর টুকু উড়ানিতে বেঁধে

মাঠে নেমেছিলে!


বর্ষা নামার আগে

ভাবী ফসলের আগমন

সুনিশ্চিত করা চাই!

জৈষ্ঠ্যের তীব্র পরাক্রম তোমায় ক্লান্ত করলেও

হতোদ্যম করেনি তাই

জানিনা,কতটা প্রদাহ তুমি

সয়েছিলে এই অবকাশে

শাখাহীন গাছের আড়ালে

এতটুকু বিশ্রাম চেয়েছিলে বুঝি!

তাই কি আভাসে

অনাহুত অতিথির মতো

মেঘ হয়ে উড়ে আসি

তোমার আকাশে

যদি এতটুকু ছায়া দিতে পারি

এই খরতপ্ত জীবন প্রদোষে

সেকথা অজানা থাক

আমার চিবুক জুড়ে ছড়ানো বিষাদ

আজ বাঁধভাঙা বৃষ্টি হয়ে

সোহাগ ছড়াক

পরিতৃপ্ত ঘুম নেমে আসা

তোমার নিবিড় দু'চোখে

একে যদি সামিয়ানা বলো

আমৃত্যু তাই হবো আমি


কথাদিলাম।

নদীজন্ম



আকাশের রূপোলী সিঁথিতে চলকে ওঠা আলো

নাকি আরণ্যক বিষাদ

কোনটা জন্ম দিয়েছিল হিরণ্যগর্ভ মেঘের 

সেকথা বুঝতে বুঝতে

কেটে গেল আরো এক নদীজন্ম

নুড়িপাথরের ঠোকাঠুকি,আর

গাছগাছালির ফিসফিসানি

সূর্যাস্তের সবুজকে যে গভীরতা দিয়েছিল 

সেকথা কেবলমাত্র  যুবতী নদী জানে

অবধারিত সমুদ্রস্নানে 

যদি আর না ই যেতে হয়

সম্পর্কের কাটাকুটি খেলা তবে

তার শেষ জন্মশোধ 

আর কোনো দায় নেই তার বহতা হবার

নিজের সাথে বোঝাপড়া সাঙ্গ হলে

মেনে নেওয়া

চিরস্থায়ী একলার বসবাস 

শ্যাওলায়,পাথুরে গুহায়


তবু

সহস্র প্রাচীন সেই 

কোটর জমানো জলে

ফাটলের চোরাপথে

 ক্ষণজন্মা মেঘেরাও

মাঝেমাঝে

বৃষ্টি হয়ে নেমে আসে

চিরায়ুষ্মতী হবার নেশায়।


সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

মিনাক্ষী ঘোষ

                           






                                           


মন বাঁধন



রোদমুলুকে মেঘ অতিথি, আকাশ মাপে কুনকেতে
আউলিয়া মন অচিন পাখি, দিক ভুলেছে শুন্যেতে

পালক ঝেড়ে দুঃখগুলো এক এক করে কৌটোতে
রাখছে মুড়ে পশম ভরে রোদবালিকার ইচ্ছেতে

প্রহর ভাঙা বিষণ্ণতা,আঙুল ছুঁলো একতারায়
মরচে পড়া খুচরো সুখ আজ, আগুনতাতে মন গলায়

মাপতে চেয়ে আকাশখানা মনবাঁধুনি কুনকেতে
অচিন পাখি পথ হারালো দিক ভোলানো শুন্যেতে



.খবর
মীনাক্ষী ঘোষ

অনেক খবর দেবার ছিল আমার
মেঘের খামে জমিয়ে রাখা হিমে
অনেকদিনের পরে এল আষাঢ়
ডাকের খোঁজে এই ভরা মরসুমে

রুপালী ভ্রু ঝলসে ওঠে যেন
মেঘের গায়ে বাঁকানো বিদ্যুতে
আখরগুলো দোমড়ানো মোচড়ানো
আঁক কেটেছে বিভিন্ন ভঙ্গীতে

লিখনলিপি পড়তে যদি পারো
দেখবে উজান তোমায় নেবে টেনে
বানভাসি মন বৃষ্টিফোঁটায় আরো
উৎসুকী হোক আমার খবর জেনে

আমার যেসব খবর ছিল দেবার
কাজল কালোয় তাইতো গেলাম রেখে
শ্রাবণ যদি হঠাৎ ভাঙে দুয়ার
দেখবে আগেই কেউ গিয়েছে ডেকে

দহনবেলার পরেও এ কালবেলা
বৃষ্টিসুতোয় শব্দমালা গাঁথে
খবরছুতোর এই যে খেলা খেলা
মরুর জলে ভরলো সাহারাতে



আর ফেরা যায়
মীনাক্ষী ঘোষ

ঠিক দুপুরে
জলসা হলো মেঘের শহরে
বাজলো কাঁসর ঘন্টা সব ই বিপুল বহরে
দ্রিম দ্রিমা দ্রিম

বজরা চড়ে
বৃষ্টিরা সব আসতে আসরে
লাজুক পায়ে গমক চালে আকাশবাসরে
হাট্টিমা টিম 

হঠাৎ জোরে
বাজলো সানাই মিঞাঁ কি মল্লারে
রুপোলী তার তড়িৎপ্রভা বিলাোয় অকাতরে
দিগ্বলয়ে

রাণীর সাজে
উড়িয়ে আঁচল হীরের কারুকাজে
বর্ষা এলো বর্শা হাতে জমকালো মন্তাজে
আর ফেরা যায়!

এমন করে জলনূপুরে,বর্ষা যদি জলসাঘরে
ডাকেই আমায়, স্থির থাকা যায়!