ধারবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ধারবাহিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৫ মে, ২০২২

শ্যামলী আচার্য

                               


মৃত্যু অথবা  

অফিসে বার বার কাজে ভুল হচ্ছিল।  

মালতীর সঙ্গে দেখা করে বেশ খানিকটা গুলিয়ে গেছে দীপুর। মালতী কাঁদছিল খুব।  
“তুমি পালিয়ে এলে কেন?”
“আমি যে বৌমণিকে বাঁচাতে পারলাম না...। দিদি আমায় কী বলবে... আর...”
“আর?”
“মামাবাবু বললেন, আর থাকতে হবে না তোমার।” 
“মামাবাবু বললেন, আর তুমি চলে গেলে?”
“দাদাও বললেন।” 
“দাদা, মানে কিংশুকবাবু? কেন?”
মালতী ঢোঁক গিলে বলে, “আমি যে অনেককিছু শুনতে পেতাম... বৌমণি নিজেও আমাকে সব বলত। দিদির বিয়ে হওয়ার পর আরও একলা লাগত... আর শেষদিকে দাদা বুঝে গিয়েছিল আমি ওদের স্বামী-স্ত্রীর সব কথা শুনতে পাই... সেইজন্যেই হয়ত...”   
“কী শুনতে মালতী?”
রাণার চোখের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মালতী। “বিশ্বাস করুন, বৌমণির মতো সতীলক্ষ্মীর চরিত্র নিয়ে... ছি ছি ছি... সেসব বলতেও মুখে বাধে।” 
“চরিত্র নিয়ে এইসব কথা কি কিংশুকবাবু বরাবরই বলতেন?”
“না বাবু। বেশ কিছুদিন হল অফিসের এক পুরনো ম্যানেজারবাবুকে নিয়ে মামাবাবু এসেছিলেন। আর বৌমণি তাকে দেখেই খুব রেগে গিয়েছিলেন। আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ওই লোকটা কেন এসেছে আমাকে খবর এনে দে মালতী।” 
“সেই লোকটা কে?” 
“সেই লোকটার নাম প্রমথ। সেই লোকটা নাকি এককালে আমাদের ডাক্তারবাবুর কম্পাউণ্ডার ছিল।” 
“ডাক্তারবাবু মানে?”
“ওই যে, বুড়ো ডাক্তারবাবু। তার কাছে নাকি কাজ করত। মামাবাবু তাই বলেছিল।” 
“এই প্রমথবাবুকে কোথায় পাওয়া যাবে মালতী?” 
“মামাবাবুর কাছেই ওর নম্বর আছে। আমি জানি। বৌমণির কাছে ওকে মামাবাবু নিয়ে এসছিল।” 
মালতীর কাছ থেকে ফেরার পর সারারাত রাণা যে রাত জেগে কী কাজ করল, দীপুর পক্ষে জানা অসম্ভব। 
‘চা অ্যাণ্ড টা-তে চলে আয়। ওখানেই বসব। আমি আছি। কিরণমালা আসছে।’ 
রাণার নিরীহ মেসেজ দেখলেও দীপুর টেনশন বেড়ে যায়।    

টি-বুটিকে ঢুকে দেখে রাণা একটা বিশাল আকৃতির ফিশ কবিরাজির ওপর ঝুঁকে পড়েছে। দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘসময় না খেয়ে রয়েছে বেচারা। অর্ণব দীপুকে দেখে হেসে বলে, “আপনি বসুন দাদা, এক্ষুনি গরম গরম ভাজিয়ে দিচ্ছি। অর্ডার হয়েই আছে।”   
রাণা মুখ না তুলেই বলে, “এই কবিরাজি না খেলে জীবন বৃথা। আর মন দিয়ে খেলে কবিরাজিকে ঠিকঠাক চেনা যায়।”  
দীপু বুঝল, এখন অন্য কথার উত্তর পাওয়া যাবে না। আগে পেট শান্ত করা যাক।  
মিনিট পনেরো পরে দার্জিলিং চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দীপু জিগ্যেস করে, “কিরণমালা এলো না?” 
“আসবে। আসতে বাধ্য। আজ তাকে আসতেই হবে...”
“মানে?” 
“সব বলব। ধৈর্য ধরো। তিনি এলেন বলে। মেসেজ করেছেন, প্রায় এসে গেছেন।”
“আর কে আসবেন?”
“দেখা যাক...”  
বলতে বলতেই বৈঠকী ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় কিরণমালা। তাকে বসতে বলে চায়ের কথা বলে রাণা। 
“আমি কিচ্ছু খাব না রাণা। আগে বলো, কী জেনেছ তুমি?” 
রাণা হাসে। “যা জেনেছি, তার নাম সিস্টেম। তার আগে প্রথমেই বলি, কিংশুক রায়কে ফোনে কয়েক মিনিটের জন্য পেয়েছিলাম। তিনি স্ত্রীর মৃত্যুতে দুঃখপ্রকাশ করে আমাকে স্মরণসভায় যাবার নেমন্তন্ন করেছেন।” 
“আমার মায়ের ডেস্ক কিন্তু এখনও বন্ধ। আমি চাবি পাইনি। খোলার জন্য তালা ভাঙতে হবে।” 
“আপনি ভাগ্যিস আজ শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। এই সুযোগে ইরাবতীদেবীর ঘরে আজ সারা দুপুর আমি একাই ছিলাম। অনমিত্রবাবুকে বেশ জপাতে হল সেজন্য। সেখানে সবই রয়েছে। গয়নাগুলো ছাড়া। ওই গয়নার খোঁজ আপনাকেই নিতে হবে। ওটা পুলিশের সাহায্য লাগবে। আমার ধারণা, অনমিত্রবাবুর কাছেই ওগুলো রয়েছে।” 
“তালা ভেঙে চুরি?”  
“হতেই পারে। আমি আসলে ইরাবতীর লেখার খাতা আর কল্যাণবাবুর ডায়েরিটাই চাইছিলাম। 
“যে কারণে আপনাকে ডেকেছি। এবার আসি ইরাবতী সান্যালের অতীত জীবনে। যে জীবন উনি শেষের দিকে বসে লিখতে শুরু করেছিলেন। ওনার মনে হয়েছিল, অন্য কারও কাছ থেকে সবাই সব জানার আগে উনিই সব লিখে যাবেন। মা হিসেবে সন্তানের প্রতি দায় হয়ত। ছেলেবেলা বাবা-মায়ের মৃত্যু, বিধবা বোনের পালিয়ে গিয়ে আবার বিয়ে করা অবধি খুব ফ্ল্যাট সরল গল্প। কিন্তু ওনার জীবন অন্য খাতে বয়ে যায় কল্যাণ রায়ের সঙ্গে দেখা হবার পর। এই জীবনের সাক্ষী ছিলেন একমাত্র ডাক্তার বিশ্বেশ্বর রায়চৌধুরী। চব্বিশ-পঁচিশ বছরের ইরাবতী যখন কল্যাণ রায়ের কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে যান, তিনি তখন শুধু সংসার টানছেন। স্বপ্ন ছিল লেখক হবার। স্বপ্নটা হারিয়ে যাচ্ছিল অভাবে-অনটনে। এই সময় অবিবাহিত কল্যাণের সঙ্গে যোগাযোগ ইরাবতীর। কল্যাণ শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না। তাঁর ছিল সেনসিটিভ মন। তাঁর বিরাট লাইব্রেরি দেখলেই বোঝা যায় তিনি কীসে বেশি আসক্ত ছিলেন। কল্যাণের প্রাণের বন্ধু বিশ্বেশ্বরেরও তাই। ইরাবতী তাঁদের দুজনের থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট, কিন্তু মননে আর মেধায় দুজনকে টেক্কা দিতেন। একটা অসম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এই তিনজনের।   
“ইরাবতীর প্রতি কল্যাণের আসক্তি বিশ্বেশ্বরের নজর এড়ায়নি। তিনি আড়ালে ‘কল্যাণী’ বলতেন ইরাবতীকে। এমনকি কল্যাণও। ইরাবতীর বন্ধ ডেস্ক ছাড়াও বইয়ের তাক ঘেঁটে বহু বই পেয়েছি আজ সারা দুপুর ধরে, সেখানে প্রথম পাতায় কল্যাণী’র নাম। কল্যাণের ডায়েরিতে কল্যাণীকে নিয়ে তার গভীর অনুভূতির দীর্ঘ বর্ণনা। খটকা লেগেছিল ডাক্তারবাবুর বাড়ি গিয়েই। তিনি ইরাবতীর নাম মনে করতে পারছেন না, কিন্তু বহু অতীতের কল্যাণী নামটি তাঁর অবচেতনে রয়েছে।” 
কিরণমালা বলে ওঠে, “আমি জানতাম না জেঠু মা’কে কল্যাণী বলতেন... কিন্তু অনেক বইতে আমি কল্যাণী নামটি দেখেছি ...” 
“আর আপনাকে বউমা ডাকতেন, তাই না?” 
কিরণমালা চমকে উঠে চুপ করে যায়। 
রাণা আবার বলতে শুরু করে, “ইরাবতীও ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হন কল্যাণের প্রতি। কল্যাণের বইপত্রে আগ্রহ, নিয়মিত সংস্কৃতিচর্চা তার মনের লুকনো ইচ্ছেগুলোকে উসকে দেয়। এমন একটি জীবন পেলে মন্দ কী? আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য সরিয়ে নিশ্চিন্ত জীবন। নিজের পছন্দ আর স্বপ্নে পৌঁছনোর জন্য এমন জীবনসঙ্গী কে না চায়? কিন্তু তার অস্বস্তি একটাই। কল্যাণের বয়স তাঁর তুলনায় অনেকটাই বেশি। ডায়েরি বলছে, কল্যাণ ইরাবতীকে কখনও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেননি।   
“সম্পর্ক ব্যাপারটা গোপনীয়তার আড়ালে থাকলে তার ধার বাড়ে। ইরাবতী আধুনিকমনস্ক, সময়ের থেকে এগিয়ে। কল্যাণের চিন্তাভাবনাও পরিণত। দূরদর্শী কল্যাণবাবুর পরিকল্পনামাফিক কোম্পানির সমস্ত পুরনো স্টাফ হঠাৎ বিভিন্ন জায়গায় বদলি হতে থাকেন। পাছে একই জায়গায় থেকে গেলে কল্যাণবাবুর গতিবিধি চোখে পড়ে। ইরাবতীর বদলি হয় কোম্পানির প্রোডাকশন সেকশনে। কলকাতার হেড অফিসের বদলে এবার বহরমপুরের ইউনিটে। ইরাবতীর পিছুটান ছিল না। বারাসতের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে অতএব বহরমপুরে গিয়ে একা থাকতে শুরু করলেন ইরাবতী। আর মাঝে মাঝেই তখন বহরমপুরের প্রোডাকশন ইউনিট ভিজিট করার দরকার হত কল্যাণ রায়ের। তার সাক্ষী দেবার জন্য বহরমপুরের প্রোডাকশন ইউনিটের ম্যানেজার প্রমথ এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে।”    
এই অবধি বলে একটু থামল রাণা। গলা খাঁকারি দিল একবার। কিরণমালা নিস্পন্দ, তার  প্রতিক্রিয়া বোঝার কোনও উপায় নেই। 
“কল্যাণের সন্তান ধারণ করেন ইরাবতী। কিন্তু সমস্যা একটাই। তাঁরা আইনত বিবাহিত নন। এই অবস্থায় কাউকে কিছু জানানো মানে ব্লাণ্ডার। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, ইরাবতী সত্যিই আধুনিকমনস্ক ছিলেন, কিন্তু কল্যাণ এই সম্পর্ককে আইনী স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি মধ্যবয়সে এসে নিজের কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মীকে বিয়ে করার ঝুঁকি নিতে পারেননি। পুরো ঘটনাটি জানতেন দুজন। একজন ডাক্তার বিশ্বেশ্বর, আর কোম্পানির প্রোডাকশান ম্যানেজার প্রমথ।   
“কল্যাণ পরামর্শ দেন অ্যাবরশান। ইরাবতী বেঁকে বসেন। কল্যাণ তাঁর জীবনে না থাক, তাঁর সন্তানটিকে নিয়ে তিনি বাঁচবেন। এবার তিনি শরণাপন্ন হন বিশ্বেশ্বরের। বিশ্বেশ্বর বন্ধুকে জানান অ্যাবরশান করার সময় পেরিয়ে গেছে। ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব। অতএব একজন স্বামী-পরিত্যক্তা গর্ভবতী নারীর দায়িত্ব নিলেন বিশ্বেশ্বর। প্রমথ তার কাজে সঙ্গী। তাকে প্রচুর টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হল। কল্যাণ হেড অফিসে জানিয়ে দিলেন, ইরাবতী খুবই অসুস্থ। সে সবেতন ছুটিতে আর অসুস্থ ইরাবতীর সব দায়িত্ব নিচ্ছে কোম্পানি। ইরাবতীর ভাই অনমিত্রকে আর এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানানো হল না।    
“বহরমপুরে থাকাকালীন বিশ্বেশ্বরের সাহায্যে একটি প্রিম্যাচিওর বেবি হয় ইরাবতীর। কী অবিশ্বাস্য এক লুকোচুরি খেলা। সাত মাসে জন্মানো প্রাইভেট নার্সিং হোমের ইনকিউবেটরে থাকা সেই বাচ্চাটিকে মৃত বলে জানিয়ে দেওয়া হল ইরাবতীকে। শরীরে-মনে ইরাবতী তখন বিধ্বস্ত। কল্যাণকে তিনি ভালোবাসেন কিন্তু তাঁর এসকেপিস্ট স্বভাবকে তিনি মেনে নিতে পারলেন না। তিনি এবার ট্রান্সফার চাইলেন অন্য কোথাও। বহরমপুর তাঁর বহু কিছু কেড়ে নিয়েছে।     
“কল্যাণ কিন্তু অমানুষ নন। তিনি দায়িত্ব এড়াননি। প্রতি মুহূর্তে মানসিকভাবে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। এবার ড্যামেজ কন্ট্রোল। তিনি ইরাবতীর বিয়ের ব্যবস্থা করলেন নিজের ভাইপোর সঙ্গে। বাড়ি তোলপাড়। কিংশুককে কোম্পানির শেয়ার থেকে বঞ্চিত করার ভয় দেখিয়ে এই বিয়েতে রাজি করেন কল্যাণ। ইরাবতী তখন অভিমানে ফুঁসছেন, কিন্তু মনের মধ্যে চোরাস্রোতে বইছে একটা নিশ্চিন্ত জীবনের লোভ। তাঁকে যে বসে বসে লিখতে হবে, ওটাই তাঁর অক্সিজেন। আর তো নতুন কিছু পাওয়ার নেই। যা হারাবার সবই হারিয়ে বসে আছেন। প্রচণ্ড যন্ত্রণা বুকে নিয়ে একটি যুবতী বিয়ে করে তারই প্রেমাস্পদ মানুষটির ভাইপোকে। আর বিয়ের কয়েকমাস পরেই সুইসাইড করেন কল্যাণ। বোধহয় একই ছাদের তলায় বাস করে ইরাবতীকে প্রতিদিনের গ্লানি থেকে মুক্তি দিয়ে যান। নিজেও অপরাধের বোঝা আর বইতে পারছিলেন না।    
আর সেই সাত মাসে জন্মানো মেয়েটির ঠাঁই হয় অনাথ আশ্রমে।  
তার কথা জানতেন শুধু বিশ্বেশ্বর। আর জানতেন প্রমথ। বিয়ের বছর কয়েক পরে ইরাবতীকে এই সত্য জানিয়েছিলেন ডাক্তার রায়চৌধুরী। তাঁরও অপরাধবোধ কিছু কম ছিল না। কিংশুক-ইরাবতীর দাম্পত্যে কোনও বাঁধন ছিল না। কিংশুক অনিচ্ছায় বিয়ে করেন, নিজের কাজের জগতে আরও উন্নতির উচ্চাশায় ডুবে যান। আর ইরাবতীর খেলার পুতুল হয়ে ঘরে আসে ইরাবতী আর কল্যাণের সন্তান।”      
কিরণমালার গাল বেয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে চোখের জল। কোনও হুঁশ নেই তার। অস্ফুটে বলতে শুরু করে, “বাবা কিছু একটা আঁচ করেছিলেন। হয়ত কেউ বলে দিয়েছিল বাবাকে। বাবার সঙ্গে মায়ের কিছু উত্তেজিত কথা কাটাকাটি আমি শুনে ফেলেছিলাম। বুঝতে পারিনি। মা তখন থেকেই বলতেন, আমার হঠাৎ কিছু হলে খোঁজ নিস ভালো করে। এমনকি, বিতান... আসলে জেঠুর ইচ্ছে ছিল আমার আর বিতানের বিয়ে হোক। কিন্তু বাবা প্রায় জোর করেই... মা বাধা দেননি একবারও। মায়ের কী জানি, কী মনে হয়েছিল!” 
কিরণমালার দিকে একটা টিস্যু পেপার এগিয়ে দেয় রাণা।  
“আপনার মা বিচক্ষণ ছিলেন। একই সঙ্গে অভিমানী। আপনার পিতৃপরিচয় প্রকাশিত না হলে বিয়ে বিতানের সঙ্গেই হত। সমস্যা হল হঠাৎ প্রমথর সঙ্গে অনমিত্রর যোগাযোগ হওয়ার পর। প্রমথ ইরাবতীকে ব্ল্যাকমেল করতে আসে। তার কাঁচা টাকার প্রয়োজন। বিশ্বেশ্বর ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। অতএব, সে বলে, ইরাবতী আর কিংশুক রায়ের সোশ্যাল স্ট্যাটাস একমুহূর্তে ধুলোয় মিশে যাবে। কল্যাণ আর ইরাবতীর অবৈধ সন্তান নিয়ে সে সব সত্য ফাঁস করে দেবে। আমার ধারণা কিংশুক রায়কেও এরা চাপ দিয়ে কিছু আদায় করতে চেয়েছিল। কিংশুক রায় ভয় পাননি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ইরাবতীর সম্পর্ক আরও খারাপ জায়গায় চলে যায়। রোজকার ঝগড়াঝাঁটির সাক্ষী মালতী।    
ইরাবতী যেদিন মারা যান, মালতীর কথা অনুযায়ী তার আগের দিন সন্ধ্যায় প্রমথ এসেছিল ওই বাড়িতে। ইরাবতী ডেস্ক থেকে গয়না বের করে দেন ওকে। অনমিত্র দেখে ফেলে ওই ডেস্কে গয়না রয়েছে।  
“এই প্রমথবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছে তোমার?”
“হয়েছে। তবে কথা আদায় করতে একদম কষ্ট হয়নি। সে গুপ্ত তথ্য ফাঁস করতেই চায়। টাকার দরকার।” 
“ইরাবতীর মৃত্যু তাহলে হার্ট অ্যাটাক?”
দীপুর প্রশ্নে রাণা বলে, “নিঃসন্দেহে হার্ট অ্যাটাকেই। ওষুধপত্র নিয়মিত খেতেন না। অনমিত্র এবং প্রমথকে তাঁকে সামলাতে হচ্ছিল। কিংশুকবাবুর চেঁচামেচি...” 
কিরণমালা অস্ফুটে বলে, “আমার বিয়ের পরেই এত কিছু ঘটল।”   
“আপনার বিয়ের পরেই ইরাবতীর এই আত্মজীবনী লেখার কথা মাথায় আসে। তবে সে লেখা তিনি এখনও কোনও প্রকাশককে দেননি। তাঁর কম্পিউটারে রয়েছে কোথাও। একটু খুঁজলে গুগল ড্রাইভে পাওয়া যেতে পারে। বা কোনও মেলে অ্যাটাচ করে রেখেছেন নিশ্চয়ই।  
“ইরাবতীকে কেউ খুন করেনি ঠিকই। কিন্তু হার্টের পেশেন্টকে মানসিক চাপে রাখলে তার পরিণতি যা হয়, তাই হয়েছে। মালতী জানত, পরপর আট-দশদিন ধরে অনমিত্র আর কিংশুকের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঝগড়া চলছিল ইরাবতীর। ইরাবতীকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেল করছিল অনমিত্র আর প্রমথ। বারাসতের বাড়িটিও তাকে লিখে দিতে বলে। মালতী অনেক কিছু শুনে ফেলে। ফলে ইরাবতীর মৃত্যুর পরে মালতী অনমিত্রর ভয়েই বাড়ি ছেড়ে পালায়। বেশিদূরে যায়নি। কলকাতাতেই ছিল। আজ এখানে তার আসার কথা। তার মুখে শুনে নেবেন বাকিটা।”    
রাণা একটা সিগারেট ধরায়।  
কিরণমালা চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায়। 
“অনেক কিছু জানলাম। যা আমার মা নিজে মুখে হয়ত আমাকে কোনওদিনই বলতে পারতেন না... তোমাকে কী বলব জানি না...”
কিরণমালাকে থামিয়ে দেয় রাণা। “আমাকে কিচ্ছু বলতে হবে না। আপনার প্রথমদিনের কথাটি মনে আছে আমার। সিস্টেম। দুজনের মৃত্যুর কারণই সেই সিস্টেম। আমাদের সমাজের সিস্টেম। কল্যাণ রায় আর ইরাবতী নিজেদের সম্পর্ককে পরিণতি দিতে পারেননি। সিস্টেম ছাড়া আর কাকেই বা দায়ী করা যায়?  
“একটু খেয়াল রাখবেন, সাহিত্যিক ইরাবতী সান্যালের স্মৃতিসভায় কেউ যেন তাঁকে অসম্মান না করে। একজন মানুষ শুধু মন-প্রাণ দিয়ে লিখতে চেয়েছিলেন। সেই লেখাটুকুই তাঁর অবলম্বন। তাঁর একের পর এক স্যাক্রিফাইস কিন্তু ওই পরিচয়টুকুর জন্য। ওই সাহিত্যিক স্বীকৃতি তাঁর নিজস্ব অর্জন। সেটি যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি অর্থহীন।”  
কিরণমালা চোখ তুলে তাকায়। তার দুচোখ উপচে গাল বেয়ে নেমেছে জলের ধারা।      

রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

মীনাক্ষী ঘোষ

                            


কোল্হাপুর ডায়েরী ৫


রাতে নিজের বাংলোয় সকলকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়ে বাড়ির সামনে ড্রপ করে বৌদি বিদায় নিলেন।
মন্দিরের কাছাকাছি জায়গাটা দিয়ে যাবার সময়  মিমি  কোল্হাপুর শহরের পুরনো রূপটা যেন দেখতে পেল। মিমিদের ফ্ল্যাট যেখানে সেটা কোল্হাপুরের পশ এরিয়া। সেখানে কসমোপলিটান ভাবটাই বেশী। কিন্তু মহাদ্বার রোডের এদিকটায়  এলে কোল্হাপুরের আসল চেহারাটা প্রতিভাত হয়।পুরনো শহরের মতোই সরু সরু পথঘাট। পুরনো কেল্লার ভগ্নাবশেষ কেল্লার তোরণের মতো প্রবেশ ফটক মারাঠা ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।আর কোল্হাপুরকে বেষ্টন করে বয়ে চলেছে পঞ্চগঙ্গা নদী।
এই মহাদ্বার রোডেই বিখ্যাত চপ্পল গলি। ভারত বিখ্যাত কোলাপুরী চপ্পলের উৎপত্তিস্থল।   কোল্হাপুরি চপ্পল (ইংরেজি: Kolhapuri chappal) হল ভারতের মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকে প্রচলিত ও পরম্পরাগত হস্তশিল্পজাত একপ্রকার চামড়ার জুতো। স্থানীয়ভাবে উদ্ভিজ্জ বা প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে এই জুতোর চামড়া পাকা করা হয়। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কোলহাপুরি চপ্পল পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেড মার্ক নিয়ন্ত্রক জেনারেলের কাছ থেকে ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি লাভ করেছে।
ইতিহাস প্রাচীন এই শহরটার মূল সুরটি যেন ক্রমশ একটু একটু করে ধরা দিচ্ছে মিমির কাছে।
কোল্হাপুরে  মারাঠা সম্প্রদায়ের প্রাধান্য বেশী। মারাঠা হলো মূলত ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়। স্বয়ং শিবাজী মহারাজ ছিলেন মারাঠা কুলতিলক। ক্ষত্রিয়রা স্বভাবত
যুদ্ধপরায়ণ।কোল্হাপুরে এখনো মারাঠা গৃহে তলোয়ার দেখা যায়। এরা এমনিতে খুব নির্ঝঞ্ঝাট ও নির্বিবাদী। অকারণ কলহে এরা  পটু নয়। কিন্তু ক্রুদ্ধ হলে ওরা তলোয়ার বের করতে দ্বিধা করেনা।
দু'বছর পুণে থাকার সুবাদে মিমি  মারাঠি ভাষাটা একটু একটু বুঝতে পারে। কোল্হাপুরে মারাঠি বলার ধরণটা
একটু ভিন্ন। একটু গ্রাম্য টান থাকলেও আন্তরিকতার ভাবটা সুস্পষ্ট।
আজ সূর্য একটু তাড়াতাড়িই ফিরেছে অফিস থেকে। আজ প্রথম দিন। জয়েনিংয়ের যাবতীয় ফর্মালিটিজ মিটিয়ে অন্যান্য কলিগদের সাথে আলাপ পরিচয় সেরে রওনা
হ য়ে পড়েছে। আজ অফিসেই সবার সাথে লাঞ্চ সেরেছে। আগামীকাল থেকে আশীষ এসে লাঞ্চ বক্স নিয়ে যাবে।
সূর্যর কাছে দারুণ একটা মজার কথা  শুনলো মিমি। সূর্যর প্ল্যান্টটা কাগাল পরগণায়। বাড়ি থেকে সড়কপথে দূরত্ব পঁচিশ কিলোমিটার।  মহারাষ্ট্রের শেষ সীমানা ওইটাই। সূর্য যেহেতু প্ল্যান্ট হেড, প্রোডাকশন ও মেইনটেনান্সের দায়িত্বভার ওর ওপরেই। ওর কেবিনটাও তাই শপ ফ্লোরের ভেতরেই। লাঞ্চের পরে কেবিন সংলগ্ন ওয়াশরুমে যেতেই মোবাইলে টিংটং করে মেসেজ বেজে উঠলো। ' ওয়েলকাম টু কর্নাটক'।বাহ  এতো ভারী মজার ব্যাপার। কেবিন মহারাষ্ট্রে আর ওয়াশরুম কর্নাটকে!এ যেন ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বর্গচ্ছেদ। যদিও এখানে কাঁটাতার অদৃশ্য তবু এই ভাগাভাগিতে বেশ মজাই লাগলো।
সন্ধ্যার একটু পরেই মিমি সপরিবারে রওনা দিলো মিঃ বোসের বাড়ীর উদ্দেশে।
ক্রমশঃ


ছবিঃ কোলাপুরী চপ্পল
 

রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১

মীনাক্ষী ঘোষ

           



কোল্হাপুর ডায়েরী ৪

অ‍্যাপার্টমেন্টের নীচেই একটা সাউথ ইন্ডিয়ান রেষ্তোঁরা আছে সেখান থেকে লাঞ্চের অ‍্যারেঞ্জমেন্ট হোলো।
আগামিকাল সূর্যের জয়েনিং ডেট।
বিকেল চারটে বাজে। দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে অবস্থানের কারণে সূর্যাস্ত হয় দেরীতে। লাঞ্চের পরে সবাই যখন নিজের নিজের ঘরে বিশ্রামের আয়োজন করছে মিমি পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালো লিভিংরুম লাগোয়া বর্গাকৃতি ছোট্ট খোলা ছাদটার রেলিং ঘেঁষে। এখানে সবাই এই ধরণের সংলগ্ন খোলা ছাদকে টেরেস বলে।  ব্যালকনিকে
বলে গ্যালারি।
তিনতলার টেরেস থেকে নীচে ব্যস্ত সড়কের ছবি প্রতীয়মান। মিমি তার দৃষ্টি ভাসিয়ে দিলো সুদূরে। দূরে চক্রাকারে বেষ্টিত পাহাড়ের  অস্পষ্ট রেখা দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। আপাতশান্ত কোলাহলবিহীন এই শহরটির প্রতি এক অজানা ভালবাসা বুকের ভেতর জারিয়ে যাচ্ছিলো আস্তে আস্তে।
সম্বিৎ ফিরলো কলিংবেলের আওয়াজে। এইসময় আবার কে এলো? দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে সৌম্যদর্শন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক ও পাশে স্মিতহাস্যে মধ্যবয়সিনী  ভদ্রমহিলা। চকিতে মিমির মনে পড়লো সূর্য বলেছিলো বটে ওর নতূন অফিসের বস কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর মিঃ বোস আসতে পারেন।  ওর মাথা থেকে কথাটা একেবারেই বেরিয়ে গেছিলো।ইশশ ছি ছি। ওর অপ্রস্তূত মখ দেখে ভদ্রলোক হাতযোড় করে নিজের পরিচয় দিলেন। কোনরকমে অপ্রস্তুত ভাব সরিয়ে মিমি ওঁদের ভেতরে আসতে অনুরোধ জানালো। এই কোম্পানিতে সূর্য ছাড়া উনি আর একমাত্র বাঙালি।
অল্পক্ষণের মধ্যেই অপরিচয়ের দূরত্ব কমে অন্তঙ্গতার সুরটি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠলো। মিসেস বোস ক্রমশ হয়ে উঠলেন মিমির কাছে 'বৌদি'। স্নেহশীলা এই মানুষটি মিমিকে প্রথম থেকেই  নিজের ছোট বোনের মতো করে কাছে টেনে নিয়েছিলেন। মিমিও তাকে নিজের বড়দিদি  ভেবেই ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়েছিলো ধীরে ধীরে।
নানান আলাপচারিতায় মিমি জানতে পারলো কোল্হাপুরের মহালক্ষ্মীদেবীর মন্দিরের কথা।মিমির উৎসূক মন জানতে পারলো আরো অজানা কিছু তথ্য।করবীর তালুকার অন্তর্ভুক্ত কোল্হাপুরকে করবীর তীর্থ ও বলা হয়।
বৌদি প্রস্তাব দিলেন পরদিন সকালে সূর্য অফিসে বেরিয়ে এগেলে উনি মিমিকে নিয়ে মহালক্ষ্মী মন্দির দর্শন করাতে যাবেন। নতুন জায়গায় মাতা অম্বাবাঈয়ের কাছে পুজো দিয়ে শুভারম্ভ করা ভালো।
পরদিন সকালে সূর্য অফিসে বেরিয়ে গেলে মিমি স্নান করে
রেডি হয়ে রইলো। ছেলেমেয়ের ব্রেকফাষ্ট  টেবিলে ঢাকা দিয়ে বৌদি আসা মাত্র  বেরিয়ে পড়লো দেবী সন্দর্শনে।। বাড়ি থেকে খুব বেশী দূর নয় মন্দির। বৌদির সাথে গাড়ী ছিল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল মন্দিরের কাছে। মন্দিরের প্রবেশপথ মোট চারটি। পশ্চিমদিকের প্রবেশদ্বার দিয়ে মিমি আর বৌদি প্রবেশ করলো মন্দিরে।
মিমি অবাক বিস্ময়ে দেখছিলো মন্দিরের কারুকাজ।
পঞ্চগঙ্গা নদীটি কোল্হাপুরকে বেষ্টন করে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।আর এর তীরেই রয়েছে বিখ্যাত দেবী মহালক্ষ্মীর মন্দির।প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরনো এই মন্দিরটি কালো গ্রানাইট পাথরে গুহার আদলে নির্মিত। অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী ও ভাস্কর্যের মেলবন্ধনে এই মন্দিরটির শৈল্পিক গুরুত্ব ও অপরিসীম।
মূল মন্দিরটির শীর্ষদেশে পাঁচটি চূড়া। চূড়াগুলিতে যথাক্রমে পাঁচটি বড় ও ছোট সোনার কলস স্থাপিত।। এত সকালেও দূরদূরান্ত থেকে ভক্ত সমাগম যথেষ্ট।
,  হরি পুরাণের  কাহিনী অনুসারে তপস্বী ভৃগু বৈকুন্ঠে পদার্পণ করে কলহবশত বিষ্ণুর বুকে পদাঘাত করলে বিষ্ণুপত্নী কুপিতা হন। বিষ্ণুবক্ষেই যে দেবী লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান!স্বামীর অপমানে ক্রোধান্বিতা দেবী এত অপমানের পরেও শ্রী বিষ্ণুকে প্রসন্ন ও সহাস্য বদনে মহর্ষি ভৃগুর প্রতি ক্ষমার্হ নয়নে দৃষ্টিপাত করতে দেখে  বিষ্ণুধাম পরিত্যাগ করে মর্ত্যে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।মর্ত্যে দেবী যে স্থানটিকে নির্বাচন করেন সেটি হোলো এই কোল্হাপুর। স্বয়ং বিষ্ণু ও দেবীর সাথে বৈকুণ্ঠ  পরিত্যাগ করে শ্রীক্ষেত্রে বসবাসের সূচনা করেন।দেবীর অগণিত ভক্তের আকুল আবেদনে মাতা চিরকালের মতো এখানেই আপন অধিষ্ঠান স্থাপনা করেন।তদবধি তিনি সমস্ত রকম দৈব রোষ থেকে এই স্থানের রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে পূজিতা। এমনকি প্রলয়কালে যখন সমগ্র ধরিত্রী জলরাশিতে নিমজ্জিত তখনো শ্রী বিষ্ণু ও মাতা লক্ষ্মী ভক্তদের পরিত্যাগ করে বৈকুণ্ঠ গমনের ইচ্ছা পরিহার করেন। কোল্হাপুরে তাই বিষ্ণু এবং লক্ষ্মীর চিরকালীন অধিষ্ঠান। লোকশ্রুতি, কোল্হাপুরে কেউ কখনো অন্নাভাবে অভুক্ত থাকেনা।
অন্য মতানুসারে দেবাদিদেব মহাদেবের বরে অপ্রতিরোধ্য কোলাসুরকে দেবী যুদ্ধে পরাস্ত করে হত্যা করতে উদ্যত হলে অসুর মিনতি করেন তার মৃত্যুর পর এই স্থানটিকে যেন তাঁর নাম অনুসারে নামাঙ্কিত করা হয়।
তার নামানুসারে স্থানটির নাম হয় কোল্হাপুর।
দেবীকে মাতা ভবানী  উমা বা পার্বতী পক্ষান্তরে অম্বা মাতা রূপে পূজা করা হয়।
এই মন্দিরটি সপ্তম শতাব্দীতে চালুক্যবংশীয় রাজা কর্ণদেব নির্মাণ করান। সামনে দক্ষিণভারতীয় স্থাপত্যশৈলীর আদলে  একটি বৃহৎ দীপাধার। গুহার আদলে তৈরী মন্দিরটির প্রবেশাভিমুখে বাঁদিকে দেবীর চরণ চিহ্ণ যা শ্রীযন্ত্র নামে খ্যাত সেখানে প্রণাম করে মূল মূর্তির অভিমুখে যাত্রা। প্রবেশপথটি অত্যন্ত অপরিসর। সিংহদরজা পেরিয়ে মাতৃসন্দর্শনের স্থানটি অপেক্ষাকৃত পরিসরযুক্ত।
কালো পাথরে তৈরী মাতৃমূর্তিটি নাতিবৃহৎ। দৈর্ঘ্যে তিনফুট। নানানরকম দুর্মূল্য রত্নালঙ্কার ভূষিতা মূর্তির ওজন চল্লিশ কিলোগ্রাম।মূর্তির পিছনে  কালো পাথরে রচিত সিংহমূর্তি দেবীর বাহন। মূর্তির মস্তকোপরিভাগে শেষনাগ ছত্ররূপে বিরাজমান।
মাতৃমূর্তি চতুর্ভূজা।  দেবীর নিম্ন দক্ষিণহস্তে একটি ফল- মতুলিঙ্গ।দক্ষিণ উপরিভাগে একটি বৃহদাকার গর্ধভের মস্তক ভূমি নিবদ্ধ দৃষ্টি।বাম উপরিহস্তে একটি বর্ম ধৃত এটিকে খেতক বলা হ য়। ও বাম নিম্নহস্তে একটি পানপাত্র। দেবীমূর্তি পশ্চিমমুখী। বৎসরের তিনদিন পশ্চিম দেয়ালের একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ থেকে অস্তগামী সূর্যের  বিদায়রশ্মি দেবীর মুখে  আলো প্রদান করে দেবীকে প্রনিপাত জানায়।
মুগ্ধ হয়ে মিমি মন্দিরের অনুপম ভাস্কর্য দেখছিলো। এই পাথরের গায়ে গায়ে কত অজানা কাহিনী লিপিবদ্ধ হয়ে আছে তার কথা আর কে বলবে! নির্বাক অথচ বাঙ্ময় যেন প্রতিটি গাত্র শৈলী।
শুধু দেবীমূর্তি নয় এই অদেখা ভাস্করদের  অনুপম কারুনৈপুণ্যের প্রতি প্রণাম জানিয়ে মিমি মন্দির থেকে বেরিয়ে এল।
ক্রমশঃ

 

রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                     


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়



১৮.
কবেকার কোন এক হেমন্তের হাটে হেমকান্ত দেখে ফেলেছিলেন সেই জোড়া কৈতর। আর হাটে ঢুকে পড়া মেয়েরা তাদের শরীরে নাচ নিয়ে শুরু করেছিল গান_
"আরে নবরঙ্গের ময়না
ময়না না যান গৌরীপুরে রে"
নাচের পর নাচ গানের পর গান চলে,চলতেই থাকে
হেমন্ত জুড়ে।মাঠে মাঠে সোনার ধান।
মানুষের ঘরবাড়ি থেকে দৈনন্দিন কথা বার্তা ভেসে।
হিমে ভেজে খোলানের নিঃসঙ্গ আখা।
দূরে কোথাও আগুন জ্বলে ওঠে।
আগুন ঘিরে মানুষের ছায়া আবছায়া।
আল ও আলি দিয়ে দৌড়ে পালায় হেমন্তের ছাইবর্ন শৃগাল।
রহস্যময় মনে হয়,মনে হতে থাকে দূরে কাছের গ্রামদেশ।
মস্ত চাঁদ ওঠে। জোড়াদিঘির জলে চাঁদ আর সুপুরি গাছের ছায়া।
কোথাও পুঁথি পড়া হয়।
আর গান জেগে ওঠে_
"বাপরে বাপ কি জাড়
মাওরে মাও কি জাড়
জাড়ত কাপে দেখং এল্যা
দিন দুখির সংসার"
এভাবে জীবন সেজে ওঠে।জীবন প্রবাহিত হয়।
জন্ম আর মরণের ঘোর জাগিয়ে রেখে
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন হেমকান্ত।
আর হেমন্তের মাঠে খেতে হাহাকারের মতন ছুটে
যায় গান_
ওরে মানুষের দেহা
পবন গেইলে হবে মরা"
১৯.
হেউতি ধান,পাখির পালক,শেষ হেমন্তের নদী,ধান নিয়ে ঘরে ফেরা কৃষক,নির্জন কলাগাছের পাতা_এই সব দৃশ্যের মায়া আর ম্যাজিক কেমন নিরিবিলি করে দেয়।
এই সব আসলে চিরকালীন,আবহমান।
যেভাবে জীবনের পর জীবন মানুষ বাঁচে,মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।
পুরোন মানুষ হারিয়ে যায় এই মর পৃথিবী থেকে।
নুতন মানুষ বেঁচে থাকাটাকে ছুঁয়ে থাকে।
জন্ম জন্ম জুড়ে এ এক ধারাবাহিক পক্রিয়া।
ছয় নদী আর নয় ফরেস্ট জুড়ে জুড়ে গল্প নির্মিত কিংবা বিনির্মিত হতে থাকে।শিমুল গাছের শরীরে নখের আচড় রেখে আসে চিতাবাঘ।
হাতির পাল নেমে আসে উত্তরের ধানবনে।
নদীর শিথানে খুব নির্জন হয়ে বসে থাকে সেই আবহমান কালের বগা বগি।
এই জীবন তো আদতে এক ফাঁদ।
আমরা সবাই "ফান্দে পড়িয়া কান্দি"!
আর কার্তিকের কুয়াশায় ভেসে আসে গান_
"চাষার মুখত আর
নাইরে সেই গান"।
জীবনের অদ্ভুত এক মায়া আছে।দূরাগত হাওয়ায় বুঝি জীবনেরই ঘ্রাণ ভেসে আসে!কত কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।গল্প হয়।মানুষের জীবন জুড়ে না ফুরোন কত গল্প।রতিকান্ত পাইকারের গল্পে কখন বুঝি মিশে যেতে থাকে হাতি জোতদারের হলুদ খামারবাড়ি।আমি নদী পেরিয়ে,চরের পর চর পেরিয়ে হেঁটে যেতে থাকি এরাজ ধনীর জোতে।এইসব আসা যাওয়ার মাঝখানে ছায়া ফেলে জোনাকির আলো। কোথাও দোতরা বেজে ওঠে।দেহতত্ত্বের গান উঠে আসে আর ঘুরে বেড়াতে থাকে টাড়ি বাড়ি নদী উপত্যকা জুড়ে।
এভাবেই জীবন কিভাবে বুঝি উদযাপন হয়ে ওঠে!


শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

         


ইলুশিও



তুমি দেখো অকালমৃত্যু, আমি জানি বিচ্ছেদের আতঙ্ক কতদূর তীব্র হলে প্রেমিকের করতলে হত্যারেখা জাগ্রত হয়- আমাদের এক অদ্ভুত সংস্কার, যে কোনো শব্দের বহুমুখীনতাকে আমরা জেদে অস্বীকার করি অথবা যে উপেক্ষার প্রয়োজন ছিলো বন্দিত্ব আরোপের প্রক্রিয়ায়, তা বরাদ্দ হয় ঝাঁকের কৈ হতে গিয়ে, লালন ভাসেন লালনের জলে, আবাদহীন জমি পড়ে থাকে রামপ্রসাদী খরায়। কমলিনী নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন বহুক্ষণ ধরে (এই ইথারে কাউকে স্মরণ না করা অব্দি সে এসে অনধিকার চর্চা করে না) । যদি শরীরে প্রাণের অভাবের পরিভাষা 'মৃত্যু' হয় তবে হৃদে নয় কেন? কালরেখা প্রতিটি আয়ুতে ভিন্ন হলে অকালের সংজ্ঞা কী? যদি আত্মরক্ষার্থে হত্যা আইনসিদ্ধ হতে পারে তাহলে আজও ইউথেনেশিয়া অস্বীকৃত কেন? এত প্রশ্নের ক্ষত যে উদ্ধারণ পালার বিবেক পলাতক। আজ দেখতে যাবেন স্বধাকে, এই স্ফুরণে এখন লেডি ম্যাকবেথও যদি তার সঙ্গে কফিতে আসে, খুব ক্ষতি? কার ক্ষতি?


"মরলে ভাই? বেশ... এ রাসের ঘোর ভাঙাবো না আজ, ভাঙবেও না"


কমলিনীর তো সুখের কথা হবেই, স্বধার গ্রীবায় অভ্রান্ত স্কারলেট, চলনে গর্ভিণী কাছিম। তাকে সমাজ যারপরনাই ভৎর্সনা তো করতোই নাগালে পেলে এই মুহূর্তে রাবাবের যে তারে তার আঙ্গুল ছুঁয়ে আছে পাপ সাব্যস্তে, কিন্তু তিনি তো কমলিনী, একশো আট তার সংস্কারে। তার মানসী আজ এমন আশ্লেষে যা পেতে প্রতিটি অবতার শরীরে, ঔরস-যোনির চক্রে, কোটি কোটি জন্ম ধরে মাথা ঠোকে শ্রী ভগবান।


নাড়িতে যে নৌকা ছিঁড়ে ভঙ্গুর পদ্ম কিছু রসস্থ থেকে গেলো, ঘাতক রাজহাঁস সে ঘুণ বিস্মৃত হলো না- তত্ত্বগত অভিজ্ঞান আর প্রকৃত উপলব্ধিতে যে ফারাক তাকে আসমান জমিন বলে নিতান্তই লঘু করে ফেলা হয়, আসলেই তারা দুই মেরুর। প্রতিলিপি বা ছবি কল্পনায় অরোরা বেরিয়ালিস ভাবাতে পারে কিন্তু তা বিশ্বরূপের বিদ্যুত সঞ্চালনে ব্যর্থ। অদ্ভুত ঘোরের ভিতর ঘাড় গুঁজে ভাবছিলো স্বধা। তাকে শীতল রক্তের সরীসৃপ বলে ব্যঙ্গ শুনতে হয় বিস্তর, একেবারেই তাপ সহ্য করতে পারে না বলে অথচ গত কয়েক ঘন্টা সে প্রায় ফার্নেসের ভিতর ছিলো বলা যায়। অব্যবহার্য-পরিত্যক্ত জিনিস বোঝাই একটা ঘর যাকে গুদাম বললে বিন্দুমাত্র নামকরণ বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। স্বেদবিন্দুর স্রোত ছাড়া চন্দন পালঙ্কের থেকে ব্যবধান বোঝেনি তো অথচ এই প্রলয়, প্রবল প্রার্থিত হলেও তার প্রস্তুতি ছিলো না কোনো, পরবর্তী ধারণাও, ঠিক এইখান থেকেই তার বিস্ময়যাত্রা। 


কোথাও একবারের জন্যেও স্বধার দ্বন্দ্ব আসেনি এতোদিন শৈবলিনী-কমলিনীর আধ্যাত্মিকতা আর ট্যাঙ্গো সালসার উন্মাদ আবেগের মধ্যে। দুইই ছান্দ্যোগ্য, দুইই এক সত্যের কথা বলে, শকট ভিন্ন, পথ এক। প্রথমটি মূলাধার-স্বাধিষ্ঠান-নাভি-হৃদ-বিশুদ্ধ-আজ্ঞা-সহস্রারকে জাগ্রত করে সূক্ষ্মতায় বিলীনে বিশ্বাসী। দ্বিতীয়টি নির্মেদ আধারকে ভেঙেচুরে মিলন ও মুক্তি বিন্যাসে শরীরকেই অতিক্রম করে চলে। কোথায় বিরোধ? বাউলাঙ্গে রজ-রক্তও তো সেই দিকই নির্দেশ করে। সবই 'ইত্থুসে ব্রহ্ম'। এই মতবাদ স্বধার স্নায়ুতে বিশ্বস্ত আশ্রয়ে ছিলো ফলত সে শরীরকে কোনোদিন অস্বীকারের চেষ্টামাত্র করেনি, অবদমন এক আত্মঘাত মাত্র জেনে অপেক্ষা করেছে। অথচ তবুও আজ মনে হলো সে কিছুই জানতো না এতদিন, একে চন্দ্র থেকে চন্দ্রবিন্দু, কিছুই নয়।


শ্বেতপাথরকে জড়িয়ে থাকো আগুনের সাপ, দেখো নাভি থেকে কিছু ব্যথা ফ্লেমিংগো হয়ে উড়ে যাচ্ছে শেষ সন্তের খোঁজে- নিশ্ছিদ্র যন্ত্রণা স্বধার সর্বশরীরে। সেই অনুভূতিকে ছাপিয়ে যাচ্ছে যে পশমে মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্টারলিউড শ্রান্তিতে, এই ক্ষণে তার অনুপস্থিতি। দংশন... এতো নিষ্ঠুর হয়? বজ্রের শক্তিতে বেঁধে রাখা উর্দ্ধবাহুদ্বয়ের ভিতর মাথা থাকলে, শ্বাসরোধী চিৎকারটিও কি নিস্তেল প্রাপ্তির? তার অতলে প্রোথিত হচ্ছিলো যার নৃশংস স্তম্ভ, উপসংহারী তন্দ্রায় তাকেই অসহায় পেয়ে এতো আদরের আলপনা কীভাবে আঁকলো সে? শরীরে এভাবে মায়ামেঘ ঘনায়? এইই কি সেই বিশালাক্ষীর থান শৈবলিনী যাকে নির্দেশ করতেন পঞ্চভূতের ফাঁদ নামে? কাঁদছে স্বধা আপাতত... শৈবলিনী দেখছেন কুয়াশার আলোয়... ভাঙছে, নামছে, অঘোর বর্ষা...


যখন শারীরিকভাবে পুরুষ নারীকে চায় অথবা নারী পুরুষকে, সেই আকর্ষণে বহু স্তরবিন্যাস থাকে, শ্রেণীভেদও, কোনোটিই বিচারাধীন নয় কারণ যে কোনো শরীর আসলেই এক আশ্চর্য আলাদিন। জাদু কি প্রদীপে থাকে? সম্ভব? প্রতিটি মানুষের ভিতর বসত করে যে দুর্দম শক্তি সেই তো রূপকে চিরাগ। যে বোঝে সে খোঁজে, যে বিশ্বাস করেনা, পায় না, এতো জলবৎ অঙ্ক মাত্র। শরীর নিয়ে এতো শুচিবায়ুগ্রস্ত যারা, একবারও যে কেন তারা ভাবেনা- "যদৃচ্ছা লাভ"। তেষ্টাকে প্যারামিটার ধরলে আরও সহজ হয় ধারণের আদল। জলের সন্ধানে কেউ পুকুরে অভ্যস্ত, কেউ খোঁজে নদী, যার তৃষ্ণা মেটেনা সে ডোবে, তলিয়ে যেতে যেতে এল ডোরাডো। আর বাকি অংশের কিছুই লাগেনা, বন্ধ বোতল থেকে প্রয়োজন মিটিয়ে নেওয়া, সুতরাং বিচার খাটে না, খাটতে পারে না। অযথা উৎকর্ষ অপকর্ষ ন্যায় অন্যায় নিয়ম নীতির খাপ। 


কিন্তু আজ একথা স্বধা নিশ্চিতভাবেই বলবে যেহেতু শরীরের দূরত্ব শেষ হওয়ার ঠিক পর থেকে টান বিদ্ধংসী হতে শুরু করলো সুতরাং গন্তব্য "দ্যা থার্ড শিপ"। যুক্তি সাজাচ্ছিলো সে সাদা কালো চৌষট্টি খোপে। এখানে ভিজে যাওয়া তালুতে চুমু রাখতে তোলপাড় এসেছে, তুরপুন নখে তৈরী হওয়া আঁচড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে সাধ গেছে, বরাবরের সম্বোধন 'তুই' অতর্কিতে বার কয়েক 'তুমি' হয়ে গেছে। মানুষের ভিতরের মানুষটা বীজতলার পরেই যেন পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। ছিন্নভিন্ন করে চলে যাওয়ার পর বার্তা এসেছে "বুকে আয়, এবার ঘুমো, ঘুমিয়ে পড়, মাথায় হাত দিয়ে রেখেছি"। বারবার প্রশ্নেরা এসেছে "শরীর ঠিক আছে? ঠিক করে কথা বল, শরীর কি ঠিক আছে?" সে উত্তর দেয়নি কারণ এই উৎকণ্ঠায় শরীর যতটুকু থাকে তার থেকে অযুত মাত্রায় বেশী থাকে শরীরের অপ্রাসঙ্গিকতা। 


এখন মণিমালা'কাল। বারিধারা শঙ্খ শরীরের হাঁসুলি বাঁক ছুঁলে অনুপ্রবেশ বোধ হচ্ছে। স্পর্শের স্মৃতি- যারে হেরিলে এ দেহলতা তাবিজ বোধ হয় যেমত। হাওয়ায় বৃন্দাবনী সারং উড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছেন সেই অনন্ত লম্পট। অজস্র ময়ূরের পালক উড়ে বেড়াচ্ছে দিগন্ত বিস্তারে। স্বধার মনে করতে ইচ্ছে করলো তার নাম যিনি লিখেছিলেন "নারী নরকের দ্বার"। তিনি কি কৃষ্ণভক্ত ছিলেন? জানা নেই তার। তিনি সম্ভবত ময়ূরও দেখেননি। স্বধা হেসে উঠল। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতিবিদটি প্রতারকই তো ছিলেন। ফেরেননি গোকুলে না? কেনই বা ফিরবেন? অথচ নশ্বর শেষ মুহূর্ত তক স্বর্ণমুকুটে শিখিপাখা যে কেন গুঁজে রাখলেন? স্টাইল স্টেটমেন্ট? যেভাবে ক্রাইস্টের ট্যাটুর ভিতর দিয়ে ইদানীং নিপুণ শৈল্পীতে আঁকা থাকে বিলাভেডের নাম, আপাত অদৃশ্য। "বুঝে লহো মন যে জানো সন্ধান"। শ্রীমতির যোনিচিহ্ন আজীবন মস্তকে ধারণ করে মহাভারত সৃষ্টি আর দ্বাপর ধ্বংসের লীলা করে গেলেন যাদবকুলপতি অথচ কেউ টেরটিও পেলো না। স্বধাকে যে নীল নীল দহনে আজ ছেড়ে গেলো সে তবে কে? কেদার মনে পড়ছে তার। ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে উত্থিত ব্যপনে কস্তুরীঘ্রাণ। শুভ্র পাথরে আছাড় খেয়ে ভেঙেচুরে যাচ্ছে অজস্র পিতলের ঘন্টাধ্বনি। কৃষ্ণসর্পটি কাকে আঁকড়ে আজ প্রস্তরীভূত হলো?

সুবীর সরকার

            


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


১৩.
তামারহাটের ভেঙে যাওয়া হাটের বাইরে আসতে আসতে সিকান্দার মিস্তিরি তার ঝাঁকড়া চুল নাড়াতে নাড়াতে বেশ মজাদার এক ভঙ্গি তার দীঘল শরীরে বহন করে আনতে থাকে আর কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হয়েই গানের দু এক কলি কিংবা গেয়েই ওঠে_
"ও কি মাহুত রে
মোক ছাড়িয়া কেমনে যাইবেন
তোমরা হস্তির শিকারে"
এই গানের হাহাকারের মতন সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দ্রুত লয়ে।গঞ্জ বাজার খেত খামার আর মানুষের ঘরবাড়ি পেরিয়ে এই গান তার সুরসমেত মিশে যেতে থাকে গঙ্গাধর নদীর মস্ত বালার চরে।
সিকান্দারের চোখ ভিজে ওঠে।এই জীবন এই জীবন মায়া নিয়েই তো আবহমান বেঁচে থাকা মানুষের।
সিকান্দার হাঁটতেই থাকে।লিলুয়া বাতাসে দোল খায় সিকান্দারের মাথার বাবরি চুল।
ফাঁকা প্রান্তরে সে আচমকা দু তিন পাক নেচেই ওঠে আর ঝুঁকে পড়ে নুতন গানের ওপর_
"বিনা বাতাসে ভাসা
ঢোলে রে"
সিকান্দার সিকান্দার হয়েই থেকে যায়।দূরে ক্রমে আবছা হয়ে আসে তামারহাটের ভরসন্ধ্যাবেলা।
১৪.
গঙ্গাধরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সিকান্দার মিস্তিরির
শরীরের পুলক সহসা ভেঙে যায়।তার প্রাচীন কালের কালো পাথরের মত কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে। সে কি তবে কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়!
সিকান্দার আসলে নৌকো বানানোর দক্ষ এক কারিগর।আর এই জল ও জলার দেশে ধনী বল জোতদার বল জমিদার বলো বা গৌরীপুরের রাজাই বলো,নৌকো বানাবার কাজে প্রায় সারা বছরই ডাক পড়ে সিকান্দারের।প্রায় পঞ্চাশ বছর জুড়ে এই কাজ করে চলেছে সে।এই জনপদ তাকে সিকান্দার    মিস্তিরি বলেই জানে।চেনে।একসময় সিকান্দার কালু বয়াতির দলে সারিন্দা বাজাতো।তার সারিন্দা কত কত ভরযুবতী নারীকে উন্মনা করেছে!কত নারীকে এক সংসার থেকে অন্য সংসারে ঠেলে দিয়েছে!কত চেংড়া কে বাউদিয়া করেছে!তার কোন ঠায় ঠিকানা নাই।
তাকে দেখলে এখনও কত মানুষ মজা করে গেয়ে ওঠে_
"কি ডাং ডাঙ্গালু বাপই রে
নাঠির গুতা দিয়া"
তবে কি সিকান্দার তার সারিন্দার জীবনের কথা ভাবছিল!না কি গয়েশ্বর ধনীর জোতজমি আর বাইচের নাও তাকে আরো আরো এক ভাবনার জটিলতায় ঠেলে দিচ্ছিল!

শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                       


মেটামরফসিস 





অবশেষে এক আশ্চর্য ছায়াসম্ভব আলো আমায় নিষ্কৃতি দেয়- বেতস সুষুম্না ভিজে উঠছে স্নানজলে, শৈবলিনী চোখ বুজে সদ্যোজাত তাপে স্বস্তি খুঁজছিলেন অথবা আঁকতে চাইছিলেন। একাই যে পথ পেরিয়ে এলেন এতোদিন, যার শুরু ছিলো যৌথতার প্রতিশ্রুতি দিয়েই, এমনও বলা যায় যৌথতার নিমিত্তেই মন্ত্র দিয়ে গেঁথে যে জীবন নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিলো, শুধু কি তার একারই দায় ছিলো তাকে ধারণের? বহমান রাখার ? এমনকী হয়তো শেষ সমাগত, এই শ্বাসেরও? প্রশ্ন আসে না আর। পথ দীর্ঘ হলে তার ক্লান্তি পথিককে গন্তব্য প্রসঙ্গে উদাসীনতা দেয়, যে কোনো দীর্ঘতর দৈর্ঘ্যের এইই সাফল্য। 




খুব সহজ ছিলো না। অনভিজ্ঞ ষোড়শী ছিলেন। সতেরোতে মা, উনিশে দ্বিতীয় সন্তান, তেইশে কাশের রঙে প্রায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এও এক রহস্য। যে মেয়েটি লাল রঙ ভালোবেসে বড় হলো, আমিষ গন্ধ ছাড়াও যে ভাত মাখা যায়, বিশ্বাস করতে শিখলো না, তার নর্ম সহচর পঞ্চভূতে বিলীনের সঙ্গে সঙ্গে সেই রঙ সেই অন্নঘ্রাণই তার কাছে নিষিদ্ধ, কী করে যে এই ফতোয়া দেওয়া যায়...কই জায়া বিয়োগে তো এমনটি হয় না, এমনকী প্রভু-ভৃত্য পরম্পরাতেও নয়, তাহলে এই অদ্ভুত নীতি শুধুমাত্র এক ব্যতিক্রমে কেন? শৈবলিনী এভাবে ভাবেননি, তার সন্তানেরা ভেবেছিলো। ধ্রুপদী সুন্দর মা'কে বোধ হওয়া ইস্তক শুধুই শুভ্রতায় দেখতে দেখতে তাদের ক্ষোভ এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছিলো বিস্তীর্ণ বাগান আলো করে থাকা জুইঁ আর কুন্দ ঝাড়ের একটি ফুলকেও রোদ্দুর ওঠার পরে গাছে দেখা যেতো না। ঋজু ব্যক্তিত্ব অভেদ্য প্রাচীর হয়ে তার সঙ্গে তার সন্তানদের অনাবিলে বাধা হয়ে থেকেছে বরাবর। মা'কে তারা তাদের হাস্য পরিহাসের অংশে পায়নি কখনো। ভাবতে ভাবতে শৈবলিনী ভিজে ওঠেন ভিতরঘরে। তিনি অপরাধী কি? বিশাল এক জীর্ণ অট্টালিকা, অকালপ্রয়াত স্বামীর অপরিকল্পিত সামান্য সঞ্চয় দিয়ে দুই সন্তানকে যে নারীর একা হাতে 'মানুষ' করে তুলতে হয়েছিলো সত্তরের দশকে, চৈতন্যে পুঁতে দিতে হয়েছিলো অর্থের সঙ্গে আভিজাত্যের কোনো সম্পর্ক থাকে না, থাকে আত্মাভিমানের- এই দর্শন, শুধু সেইই জানে নিরেট গাম্ভীর্য কোনো বর্ম বা মুখোশের মতো আত্মরক্ষার অধিক প্রত্যাঘাতের নাম। এ বাসরে ছিদ্রের অধিকার তিনি দেবতাদের দেননি ফলত দানবেরা অনুপ্রবেশের পথ পায়নি। 



মাটি যে কতদূর ভারী ঠেকলে কেউ স্বেচ্ছায় জলজ হতে চায় শৈবলিনী সেদিন টের পেয়েছিলেন যেদিন তার বাইশ বছরের ছেলে ইণ্ডিয়ান নেভির  নিয়োগপত্র হাতে মায়ের অনুমতি নিতে এসে দাঁড়িয়েছিল। শৈবলিনী বন্দরের থেকে বেশী বাতিঘর হতে চাওয়ায় সে বাধা পায়নি কোনো। তিনি জানেন, সামান্য বিরোধ প্রত্যাশিত ছিলো মায়ের তরফ থেকে স্বয়মের, অপত্য হলেও সে পুরুষ, যাদের দৃষ্টি বুঝতে তার এক পল মাত্র লাগে। কিন্তু শৈবলিনী বিশ্বাস করেন বিচ্ছেদ তুল্য মায়াবিস্তার কোনো বন্ধনই নির্মাণ করতে পারে না, সুতরাং অবিচল ছিলেন। 



 গত বছর শ্রী'কে সম্প্রদান করেছেন। সেই শূন্যতায় পুরোপুরি ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই স্বয়ম তাকে জানিয়ে গেলো ঘোর অরণ্যেও প্রতিটি বৃক্ষের একাকী থাকাই বিধি। এখন তার দিলরুবায় অসীম নৈশব্দ্য। অবশ্য এই দেওয়ালেরা প্রগলভতার অভিজ্ঞতা পেলোই বা কখন? বড় শান্ত মেয়ে ছিলো তার শ্রী। মায়ের কাঠিন্য তার নরমে আঁচড়ের অবসর পায়নি কোনোদিন। কথা সে প্রায় বলতোই না। তার আনন্দ অভিমান যে কোনো তরঙ্গের সামান্য সরণ তাকে রেওয়াজে বসাত। সেই সুরই সম্ভবত তাকে নীলাদ্রীর কাছেও পৌঁছে দিলো, ভাবছিলেন শৈবলিনী। যতটুকু তিনি তাকে দেখেছেন, শ্রী যতই অনিন্দ্যসুন্দরী হোক, "রূপে তোমায় ভোলাবো না" এই স্বীকারোক্তির জায়গা অন্তত নীলাদ্রী নন, এইটুকু বুঝেছেন তাই আশ্বস্ত বোধ করছেন। রিপুজয়ের কথা যারা বলে থাকে তারা সম্ভবত প্রথম ইন্দ্রিয়টিকে নিরীহ জ্ঞানে রাখে। অথচ যাবতীয় ভ্রম ও ভ্রমভঙ্গের দায়ভাগ যদি কিছুকে দেওয়া যায় তবে তা 'চোখ'ই। শৈবলিনীর ব্যক্তিগত বিচারে গান্ধারীর অপরাধ অনেক বেশী ধৃতরাষ্ট্রের সাপেক্ষে। জন্মান্ধের অজুহাত যদিও বা গ্রহণীয় কিন্তু সক্ষমের ভাণজনিত বিকার কোনোভাবেই নয়।




বেলা গড়াচ্ছে। স্বয়ম আর শ্রী থাকার সময় বহুসময় তার উনুনের আঁচে কাটতো। রন্ধনশিল্পে বিক্রমপুরের মেয়ের নৈপুণ্যের খ্যাতি মূলত লক্ষ্মীপুজোর ভোগ হেতু পাড়ায় সুবিদিত ছিল। অবশ্য সে এক এমন সময়ের কথা যখন কোনো সংসারের সব ক'টি তৈজস দিনান্তে নিজের আস্তানাতেই থেকে গেছে, এ'ঘটনাকে বিরল মানা হতো। প্রতিবেশীরা শুধু একটি তথ্য জানতো না, একটা সময়ের পর হাজার চেষ্টাতেও শৈবলিনী তার হেঁসেলে আমিষ রাঁধতে পারেননি। এই একটি বিষয়ে ভাই-বোন দুজনেই অসম্ভব জেদে তাকে হারিয়ে দিয়েছে বারবার এবং প্রতিবার। সামান্য বোধের বয়সে পৌঁছে যেদিন থেকে তারা বুঝতে শিখেছে কী এমন অসুস্থ তাদের মা রোজই এমন হয়ে পড়ে যে তাদের রান্না সেরে স্নান করে ভিজে কাপড়ে নিজের জন্য একটা পাত্রে সিদ্ধ ফুটিয়ে নিতে হয় সারাদিনের নামে, তারা সেই সমস্ত কিছুর স্বাদকে অস্বীকার করতে চেয়েছে যাতে মায়ের অধিকার নেই। ফলে শৈবলিনীকেও হার মানতে হয়েছে। আঁশহীন অজস্র প্রণালীতে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতে হয়েছে। 'ঘাটতি' - সঠিক শব্দ হলো কি? শৈবলিনীর অহং জাগল। কখনো 'ভালোবাসি' শব্দ উচ্চারণ করেনি তার কাছে তার সন্তানেরা। হাজারো প্রাপ্তিতে উচ্ছল হয়নি। সহস্র অপ্রাপ্তিতেও অভিযোগ আনেনি। অথচ তাদের সংবেদন এতো সূক্ষ্ম যে কীভাবে কবে হয়ে উঠলো তিনি কর্তব্যের ভারে ঠাহরই করে উঠতে পারলেন না। পিতৃহীন সন্তানদের সব মা'ই কি পৃথা?



ভাবতে ভাবতে উঠছিলেন, প্রায়োবেশনে স্পৃহা নেই প্রমাণে পুরনো একাহারী অভ্যাসে ফিরতে। সিংদুয়ারের কড়া তাকে বিচলিত করল। প্রাচীন আবলুশ, লোহার ভারী শিকল, নির্জন ছিঁড়তে যথেষ্ট সক্ষম। হতেই পারে আত্মীয় পরিজন অথবা ফেরিওয়ালা কিন্তু নৈঋতে কাকের কর্কশ তাকে অদ্ভুত অসামঞ্জস্য দিয়ে গেলো। এমনটি যেন হওয়ার কথা ছিলো না। আয়ুর প্রথমার্দ্ধে সামর্থ্য, দ্বিতীয়ার্দ্ধে প্রয়োজন তাকে পরিচারকহীন করেছে। সুতরাং কিছু সময় লাগলো জানতে সদর সংবাদ।


-- " একী ! শিয়া তুমি? চিঠি দাওনি তো আজ আসবে... কী হয়েছে? "


বরাবরের ধীর মেয়ে তার বরফ এখনো


--" ভিতরে আসি? "



হাজারো ঝঞ্ঝাতেও যে নন্দিনীকে তিনি অভিভাবকহীন চারণের অনুমতি দেননি বহু শঙ্কায়, অনেক দ্বিধায়, সে আজ আটপৌরেতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখের দীঘল বলে ঘুম হয়নি বিগত বেশ কিছু প্রহর, অবিন্যস্ত চুল হাতপ্যাঁচে ঘাড়ের উপর ফেলা। সঙ্গে সামান্য হাতব্যাগটিও অনুপস্থিত। তার বুক বসে যেতে লাগলো চোরাবালির গতিতে।



স্নান সেরে শ্রী ঘুমোতে চাইলে শৈবলিনী জিজ্ঞাসার চৌহদ্দিও পেরোননি। কুম্ভক তার নিয়ন্ত্রণে। ঘুমোক, যতক্ষণ সম্ভব। যে কোনো বিপর্যয়ে এইই বিশল্যকরণি শরীর মনের ভারসাম্য রাখতে। সন্ধ্যায় শ্রী জানিয়েছিলো অতি সংক্ষেপে। মধুপুরের চ্যাটার্জি ফ্যাক্টরি আর সংলগ্ন বাগান ঘেরা বাংলোটি গত রাতে রাজনৈতিক হিংসার বলি হয়েছে। বোমা, গুলি কিছুই বাদ থাকেনি। বিশ্বস্ত এক সূত্র সামান্য আগে খবর পেয়ে তাদের কাছে লুকিয়ে রাখায় নীলাদ্রি ও শ্রীয়ের প্রাণ দুটি রক্ষা পেয়েছে মাত্র। বাকি সর্বস্ব নিতান্তই ভগ্নস্তূপ এখন। ভোর রাতের প্রথম ট্রেনে শ্রীকে তুলে দিয়ে নীলাদ্রি নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গেছেন অনির্দিষ্ট কাল সময় চেয়ে নিয়ে। বেনারসের আদি বাড়ি অথবা আসানসোলে দাদার কাছে যাবেন, এমন শিরদাঁড়া তার নয়। সুতরাং, তিনি কোথায়, শ্রী জানে না।



কিছু রাত কুরুক্ষেত্রের, কিছু জোনাকির, আর কিছু সংজ্ঞাহীনতার। শৈবলিনী জানতেন না ঠিক কোন স্তরে সে রাতকে ফেলা যেতে পারত। শৈশবে শ্রী'র জ্বর হলে যেভাবে রাতপাহারা দিতেন শিয়রে, ফিরে গেলেন সেই সময়ে। হঠাৎ শিয়ার ঘুমন্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে জন্মদাত্রীর অভিজ্ঞ স্নায়ু তাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করল। এই প্রবল অন্ধকারের ভিতরে কি কোনো তীব্র আলোর সংকেত লুকিয়ে যা তিনি অনুমান করছেন? ডাক্তার এসেছিল। ধারণা অভ্রান্ত, আনন্দে জানিয়ে ফিরে গিয়েছিল।  




শৈবলিনী ঠিক তিনদিন আগের মতো, আজও সেই সময় একই ভাবে দাঁড়িয়ে। শুধু সেদিন যে 'নিষ্কৃতি' শব্দোচ্চারণ করেছিলেন, তাকে প্রত্যাহার করছেন আজ সজ্ঞানে। যার লগ্নে সংগ্রাম, এত সহজে কি তার মুক্তি আসে? অনির্ধারিত অজ্ঞাতবাসে যাওয়া নীলাদ্রির আগামীকে গর্ভে ধারণ করে শ্রী এসেছে তার কাছে। তার যাবতীয় ছায়া আজ আলোময়। আজ সত্যিই তিনি সিংহের প্রয়োজন বোধ করলেন, রাশি থেকে খুবলে হৃদয়ে প্রতিস্থাপন নিমিত্তে। সন্তান সংকটাপন্ন হলে কোন গর্ভধারিণী অবিকল সিংহবাহিনী নয় আর তিনি তো শৈবলিনী, গায়ত্রীজল সবিতাকে অর্পণ করে বীজস্বার্থে মহাতেজা রূপ পরিগ্রহ করলেন।

চিত্র - অন্তর্জাল

শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                            


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া ( ষষ্ঠ পর্বের পর)
সুবীর সরকার 


৭.
এত এত হাট,এত এত গঞ্জ,এত এত নদীপরিধির ভেতর মানুষের বেঁচে থাকা।বেঁচে থাকতে থাকতে আবহমান এক জীবনকে বারবার পাল্টে পাল্টে দিতে থাকা।ইয়াকুব মহিউদ্দিন লোকমান সাজু চোরা আরো কত বর্ণময় আর বিচিত্র মানুষের সমাবেশ দিয়ে সেজে ওঠে গঞ্জহাটের এক চিরকালের ভুবনজোত।
এক হাট থেকে মানুষকে চলে যেতে হয় অন্য কোন হাটে।নুতন নুতন হাটে।নয় ফরেস্ট আর কুড়ি নদীর দুনিয়ায় কত যে হাট!
ইয়াকুব একবার পানবাড়ি হাটে গিয়ে ফেরার পথে পথ ভুলে গিয়েছিল।তাকে কি তবে ভুলায় ধরেছিল!
বগরিবাড়ির যতীন ডাকাতের সাথে দেখা হবার পর পরেই ইয়াকুব যতীন কে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল চিকন চিড়ার হাটখন্ডের দিকে।সেখানে বসে দই চিড়া খেতে খেতে যতীন তার ডাকাতিয়া জীবনের রোমহর্ষক সব গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছিল।
লালজি রাজার ভাই প্রণবেশ সাহেবের সামনেই তো একবার ব্রহ্মপুত্রে জেগে ওঠা নয়া চরে চরদখলের লাঠালাঠিতে কি এক ভয়ানক লড়াই!সেবার মাথা ফেটেছিল যতীনের।
যতীনের ডাকাতিতে হাতখড়ি হয়েছিল বিজনির হামিদ মিদ্দার কাছে।তিরিশ বছর ডাকাতির জীবনে একবারই যতীনকে থমকে যেতে হয়েছিল!তার চোখ কান্নায় ভিজে গিয়েছিল!এবং এই প্রথমবার পুলিশের হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিল সে।
সেবার ডাকাতি করতে গিয়েছিল যতীন রূপসীর নন্দ ধনীর বাড়িতে।খবর ছিল তামাক বিক্রির প্রায় তিন লক্ষ টাকা ধনীর বাড়িতেই রাখা আছে।আছে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার।ধনসম্পত্তি।
মধ্যরাতে দল নিয়ে যতীন হানা দিয়েছিল নন্দ ধনীর বাসায়।তারপর সে এক ধুন্ধুমার মারি ফেলা কান্ড!
হঠাৎ নন্দ ধনীর বছর পাঁচ বয়সী বাচ্চা ছেলে যতীনের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে এলে যতীন আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক চালিয়ে দেয়।
চোখের সামনে ছটফট করতে করতে সেই বাচ্চাটির মৃত্যু যতীনকে হতভম্ব করে দেয়।
তারপর সব ইতিহাস।জেল থেকে বেরিয়ে যতীন ডাকাতি ছেড়ে দেয়।যোগ দেয় কুষাণ গানের দলে।
দোয়ারির ভূমিকায়।মাঝে মাঝে কীর্তন করে বেড়ায়।
আর ইচ্ছে মত দোতরা কাঁধে ঘুরে বেড়ায় কোন কোন হাটে।দাতের মাজন,হজমি গুলি,কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করে আর গান করে ফাঁকে ফাঁকে।
আর দেখা হলেই চেনা বা অচেনা লোকজনকে শোনাতে থাকে ডাকাতিয়া জীবনের নানান গল্পকথা।
জীবন কি অদ্ভুত!
ঘোর লাগা দুই চোখ জাগিয়ে রেখে যতীন বিড়বিড় করে গান তোলে_
"এপার থাকি না যায় দেখা রে
নদীর ওই পারের কিনার"
৮.
ইউসুফ মোল্লার বেশ মনে পড়ে শালমারার বড় বালার চরে বড় রাজকুমারীর গান নিয়ে নাচ নিয়ে বাদ্য বাজনা নিয়ে এক শীতের রাতে জমিয়ে তোলা গানবাড়ির কথা।ইউসুফ মোল্লা তখন সদ্য যুবক।পালতোলা নৌকোর দুরন্ত মাঝি।ব্রহ্মপুত্র শাসন করে সে।পণ্য পৌঁছে দেয় বন্দরে বন্দরে।আর নেশা বলতে গানবাড়িতে ঘুরে ঘুরে গান শোনা।
তখন রাজবহাদুর প্রভাত বড়ুয়া বেঁচে।
শিকারে যান মস্ত দাঁতাল হাতি জংবাহাদুরের পিঠে চড়ে।বড় রাজকুমারী আর ছোট রাজকুমারী তখন গঞ্জ গা হাট ঘুরে ঘুরে গান,নাচ, শোলোক খুঁজে বেড়াচ্ছেন।নিজেরাও নাচছেন।গাইছেন।
বালাবাড়ির চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সেই সব গান।যা চিরকালীন।যা ভরভরন্ত জীবনের কথা বলে_
"কালা বাইগণ ধওলা রে
বাইগণের গোড়ায় কাটা"
এক হাট থেকে বেরিয়ে নুতন এক হাটে প্রবেশ করতে গিয়ে এই চার কুড়ি পেরিয়ে আসা জীবনে বারবার ইউসুফ মোল্লার মনে পড়ে সেই সব সোনার বরণ পাখির মতন দিনগুলির কথা।
হায়রে,কত তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে আসে মানুষের জীবনে!জলে ভিজে ওঠে ইউসুফের চোখ। সে দেখতে পায় "টলমল টলমল কচুপাতের পানি"।
ঠিক এখানেই একটা গল্প শেষ হয়ে যায়,নুতন এক শুরুর অপেক্ষায়!


সোনালী চক্রবর্তী

                                



মহাফেজ



'অনুভূতির অনুবাদ সম্ভব নয় বলে কখনো কবিতা পড়িনি'- প্রিয় অধ্যাপকের সঙ্গে দেখা করতে আসা এক কৃতির সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন নীলাদ্রির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাদের মধ্যে শুধুমাত্র এটিরই বিক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিলো সেদিন স্বধার। "কানের ভিতর দিয়া মরমে" পৌঁছানো সব কিছুই যে ধনাত্মক হবে এমন আইন না থাকায় স্বধার তাকে আত্মিকরণে সমস্যা হয়নি বরং সে ভাবতে চেয়েছিলো যে সাতটি স্তর অতিক্রম করে কোনো ছেলেকে পুরুষ হয়ে উঠতে হয়, তা পেরনোর পর পরিখা বুজিয়ে দেওয়া হয় কেন? অথবা 'মেধা নাড়ি' জাগ্রত হলে যে কোনো পুরুষই কি প্রস্তর?


ইডেনের কেবিন ওয়ানে অদ্ভুত সুন্দর কুট্টি একটা ব্যালকনি আছে। খুব বেশী হলে চার পাঁচজন সেখানে একসঙ্গে দাঁড়াতে পারে। গ্রিলের ওপারে কোনো এক কালে প্রতিষ্ঠিত, বর্তমানে মৃত ব্যবসায়ীর গোলা, পরিত্যক্ত গ্যারেজ। বাঙালীর ব্যবসা এখনো 'এক পুরুষের' এই বদনাম ঘোচাতে পারেনি এই শহরতলিতে অন্তত, সেহেতু দীর্ঘ দীর্ঘ গাছেরা ক্রমেই দীর্ঘতর হয়ে শিকড়ের দিকের আগাছাকে জঙ্গল করে তোলার বন্য আনন্দ পেয়েছে। সাত পা একসঙ্গে হাঁটলে বন্ধু হয় অথবা সপ্তপদীতে যাপনের সঙ্গী? প্রথম সাত মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর স্বধার মনে হয়েছিলো অরণ্য ভালবাসে বলে তার সাতজন্ম লতা গুল্মে জড়িয়ে থাকার সুযোগ পায় নিয়ত। তবে তখনো সে জানতো না আগামী প্রায় সাতশ ঘন্টায় চাণক্য মতে প্রকৃত বান্ধব তার এই ছোট্ট নির্জনটুকুই হয়ে উঠবে। এই মুহূর্তে এই মধ্যরাতে এখানেই দাঁড়িয়ে কেন হঠাৎ সেদিনের ভাবনার কথা তার মনে পড়লো, কারণ খুঁজতে গিয়ে সে অন্ধকারেই হারাতে চাইল।


আলেকজান্ডার পোপ নামের কবিটি সেই অগাস্টান পিরিয়ডে যে অসামান্য কিছু কথা লিখে গিয়েছিলেন স্বধা সেগুলোকে মানে ভীষণভাবে, নিজেকে দিয়েই। "A little learning is a dangerous thing" পাতি বাংলায় যাকে বলে "স্বল্পবিদ্যা ভয়ংকরী"। নিজেকে বাচাল মেনে নিয়েছে এই কারণেই। পূর্ণ কলসে শব্দ হয় না। সে অত্যন্ত অগভীর, ফাঁকা তাই এত এত কথা আসে তার, এমনই মনে হয়। সেও ঐ মনতস্ত্ব বিষয়ে বিশেষ পড়াশুনা না করেই ফ্রয়েডিয় কোট আউড়ানো লোকগুলোর দলে যারা অবসাদগ্রস্ত কাউকে পাগল আখ্যা দিয়ে দেয় নির্বিচারে, উড়ে উড়ে আসা গল্প কবিতায়, ইউ টিউবের লিঙ্ক দেখে ওয়েদিপাউস আর ইলেক্ট্রার প্রসঙ্গ এনে ফ্যালে, অথচ একটু তলিয়ে ভাবলে, সামান্য অনুধ্যানেই স্পষ্ট হতো যে কোন নারী তার প্রার্থিত পুরুষের মধ্যে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তার পিতাকেই সন্ধান করে এবং ভাইসি ভার্সা। কমপ্লেক্স ভিন্ন বিষয়। অতি সরলীকরণ কোনো জটিলতার না হওয়াই যুক্তিযুক্ত। 


স্বধার মনে হলো যেভাবে জয়েস নোরাকে লিখেছিলেন "তোমার সমাজ আমার শত্রু, তুমি নও", ঠিক সেভাবেই সে যে যে 'পুরুষ' দেখেছে এই তিরিশ অবধি তাদের অধিকাংশই পুরুষমাত্র, তন্ত্রধারী নয়। তাদেরকেও তার বলতে ইচ্ছে হয়েছে- 'আমি পুরুষতন্ত্রকে প্রতিপক্ষ মেনেছি, তোমাকে নয়'। পারেনি কারণ প্রকৃতি আর পুরুষের মূল ব্যবধান বাড়বাগ্নিতে। নারী এক জলজ সত্ত্বা, যে কোনো অভিঘাতের প্রতিসরণ তার আধারে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। পুরুষ নিরেট এক অস্তিত্ব, উদ্বেদী শিলাকে ধারণ করে থাকা আপাত প্রতিক্রিয়াহীন ঘন অবস্থান। অভিমান শব্দ মাত্রেই রমণীয় মেঘ ভেসে আসে অথচ তার প্রকৃত স্বরূপ হয়তো পুরুষেরই করায়ত্ত। সে স্থির হয়ে যায়। মন্দ্র নিনাদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিস্তব্ধ কাঠিন্যে। যেমন কস্তুরীর বধবিন্দু তার শরীরস্থ ব্রহ্মকুণ্ডলীটিই ঠিক সেভাবেই পুরুষের অসহায়তা সে একজন পুরুষ'ই। একথা নীলাদ্রীকে পড়ে প্রথম জেনেছে স্বধা, পরবর্তীতে প্রতিটি ঈশ্বরসত্ত্বা, পরিযায়ী কিছু ঘনিষ্ঠরা তার পাঠকে নিবিড় করেছে, আপাতত ক্রাইস্ট শেখাচ্ছে আর একদম স্বচ্ছতায় আজ আরেকজনের বোধে দেখল। একটা গান মনে পড়লো- "একলা পুরুষ কর্তব্যে, একলা পুরুষ পিতায়"।

রিসেপশন থেকে আর্জেন্ট কল আসার পর দেখা করতে গিয়ে সে জেনে ফিরেছিলো ডক্টর সেনের বিশেষ নির্দেশের কথা। যেমত সে নিশাচর হলেও পাখি নয়, অসম্ভব বিধ্বস্ত মাথা আর শরীরের ইন্সট্যান্ট এলাইনমেন্ট সম্ভব হয়নি। বসে পড়েছিল। সামনে প্রবল অন্ধকার কড়কড়ে রোদ্দুরে, যতটা দৃশ্যময় তার থেকে অনেক বেশী অনিশ্চয় অদৃশ্যে। সে কোথায় নিয়ে যাবে এখন এই নিদ্রিত, অসুস্থ মানুষটিকে? তাবড় সেলিব্রিটিদের যেখানে আই সি ইউ পাওয়ার অপেক্ষা করতে হচ্ছে, স্বাস্থ্যভবন নথিকরণ বন্ধ করে দিচ্ছে ওয়েটিং লিস্ট মুনওয়াক হয়ে গেছে বলে, লকডাউনের রাস্তা দিয়ে যাওয়া প্রতি দশ মিনিটের ছটা গাড়ির মধ্যে তিনটে এম্বুলেন্সের, একটা শববাহী যানের। সে কোথায় নিয়ে যাবে? সে এমন রাষ্ট্রে বাস করে যা বিশ্বব্যাপী অতিমারির প্রথম ঢেউ প্রত্যক্ষ করার পর দেড় বছর সময় পায় পরবর্তী আঘাত আসার আর সেই অন্তবর্তী সময়টুকুকে উপভোগ্য করে তোলে শুধুমাত্র কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনী আমোদে। একশন প্ল্যান, হসপিটাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তো দূর, একটিও অতিরিক্ত বেড, এক বোতল রক্ত, একটামাত্র সিলিন্ডারের সরবরাহকেও উপেক্ষা করে দিয়ে হত দরিদ্র জনসাধারণের করের অর্থভাণ্ডার দেউলিয়া করে দেয়  কোটি কোটি টাকার কপ্টার ভাড়ায়, ব্যাক্তিগত প্রচার বরাদ্দ খাতে। হায় দেশ... সে কোন দুয়ারে কড়া নাড়বে এখানে? নীলাদ্রীর ছাত্ররা ছড়িয়ে আছেন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়, সামান্য হলেও কিছু মন্ত্রী সান্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক স্বধাকে স্নেহে রাখেন কিন্তু তারা কি মহানগরীতে ময়দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন? না রক্তবীজি প্রজননে চিকিৎসকের জন্ম দেবেন কেন্দ্র রাজ্যের প্রশাসনিক মান রক্ষার্থে? থাকলো বাকি এই মহকুমা মফস্বল। যে হাজারে হাজারে গ্রামবাসীদের দুইদিন আগেও ট্রাক বোঝাই করে এনে এনে তারকা খচিত মঞ্চের মাঠ ভরানো হয়েছে ক্যাডারদের বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধানে, তারা তো জানতেও পারেনি মাস্ক কী, দূরত্ববিধি কাকে বলে? অজান্তেই তাদের আয়ুর সুতো ছিঁড়ে গিয়ে এখন কাতারে কাতারে মাথা জমছে সরকারী হাসপাতালে ফলে নরককেও প্রতিযোগীতায় নামতে হচ্ছে ন্যূনতম পরিষেবার প্রেক্ষিতে। এ বস্ত্রহরণ পালার দুর্ভাগ্য রুখতে মাধবও প্রতিবন্ধী। তাহলে নীলাদ্রি কোথয় যাবেন? বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে তাকে? উদ্ভ্রান্ত স্বধার কল লিস্ট জানে পরপর সত্তর টি ফোন সে করেছিলো ইডেনেরই দুই তিনজন ওয়ার্ড বয় এমনকী সুইপারের হাতে মোটা টাকা গুঁজে দেওয়ার বিনিময়ে নম্বর জোগাড় করে (রাজপথে অন্ধকারের বিকিকিনি হয়না বলেই কানাগলি গুলো টিঁকে থাকে) সম্ভাব্য সমস্ত নার্স আর আয়াদের, পায়নি, একজনকেও নয়। 

নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়ার পর ঘুম তারও আসেনি। খুব ভোরে ডিউটি থেকে সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিলেন ইডেনে। কেন, এর উত্তর জানা থাকা বলেই আয়নার সঙ্গে পুরুষদের বড়ই বৈরিতা। ভিতরে ঝড় বইলেও তাদের চোয়াল, ভাঁজ ফুটিয়ে তোলার বিশ্বাসঘাতকতা করে না। একবার পূর্ণ দৃষ্টিতে কেবিন ওয়ানের দিকে তাকিয়ে রিসেপশনে যা জানানোর জানিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন যেখানে অপেক্ষায় তার আত্মা ও রক্তের পুত্তলিরা। রিসেপশন থেকে প্রতিনিধি এসে স্বধাকে জানিয়ে গিয়েছিলো, পূর্ব পরিচিত নীলাদ্রীর দায়িত্ব ডক্টর সেন অন্য কোথাও, কারোর হাতে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃত হয়েছেন, তাকে ডিসচার্জ করা যাবে না। যখন স্বধা শুনছিলো এই কথা, দেখতে পেলো সায়রের গাড়ি পোর্টিকো ছেড়ে রাস্তায় নামলো সদ্য। 

নীতি, আদর্শ সব সব কিছুকে শব্দ মাত্র ধরে নিলেও সিংহের হৃদয় জানে 'একা' চারণের ক্ষমতা ধারণ করে বলেই সে নৃপতি। কাকে কৈফিয়ত দিয়ে এলেন সায়র আজ? নিজেকে? "ধরিত্রী দ্বিধা হও"- এক নারী উচ্চারণ করতে পারে, পুরুষ নয়। সে জানে তাকে নিয়ম গড়তে হবে, ভাঙতেও হবে অথচ কলঙ্কমাত্র যেন স্পর্শ না করে, সে দূরত্বও গাঁথতে হবে। 'টান' -অলীক এই শব্দকে পাঁজরে আটকে রেখে গলিয়ে নিতে হবে নীতিমালার শৃগালচর্ম। নাহলে তার ঘ্রাণে সহস্র হারপুন হাতে উল্লাসে ঘিরে ধরবে শ্বাপদদুর্লভ নৃশংসতারা। সে গরল নিজে নিয়ে নীলকণ্ঠ হবেন, এমনও এক্তিয়ার নেই। তিনি যে কারোর স্বামী, কারোর পিতা। তার সর্বস্ব দিয়ে হলেও স্বধাকে প্রত্যক্ষে আগলে রাখার অধিকার বা অনুমোদন কোনটাই তিনি নিজেকে দিতে পারেন না। শুধু আড়ালে থেকে নিরাপদ গণ্ডী টুকু কেটে দিতে পারেন মাত্র। কেউ যেন টের না পায়, যে লক্ষ্য সেও নয়। বজ্র দৃঢ় অথচ অসহায় এই পদক্ষেপের সংজ্ঞা- পুরুষ জানে, তার যমুনা নেই, কলসীও না। 


শুধু তাদের এটুকু জানা হয় না, সায়রেরও হলো না, 'ইনটিউশন' বলে যে শব্দটি আছে অথবা ষষ্ঠেন্দ্রিয়, তা নারীর অজ্ঞাত কিছু রাখতে দেয় না বলেই "স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা না জানন্তি, কুতো মনুষ্যা:"- এই প্রবাদ এসেছে। একটিও শব্দ উচ্চারণ না করলেও পুরুষের প্রতিটি আচরণের সুলুক সন্ধান নারীর কাছে প্রিজমের উজ্জ্বলতায় ধরা পড়ে। তার মনে পড়লো ভ্রূণহত্যা বা কন্যাসন্তান জন্মানোর অপরাধে খুনের খবরেরা যেদিন সংবাদপত্র আঁধার করে থাকতো, নীলাদ্রী লুকিয়ে রাখতেন। নৃশংস ধর্ষনকান্ডেরা যখন প্রচারমাধ্যমের খাদ্য হতো, স্বধার ঘনিষ্ঠ বান্ধবেরা চুপ হয়ে যেত কিছুদিনের জন্য হলেও। আজ সায়রকেও দেখলো সে, অবিকল হংলি, নিষ্পাপ জেনেও রুয়িকে কোল্ড প্যালেসে পাঠিয়ে ব্যাক্তিগত প্রহরায় রাখা সম্রাট। একটিই নরমে প্রত্যেকে বিদীর্ণ, পুরুষোচিত সংবেদন। নপুংসক পুরুষত্ব প্রমাণের দায়ে যখন যে মুহূর্তে কোনো মেয়ে আহত বা নিহত হয়, যে বা যারা মাথা নিচু করেন লজ্জায়, দীর্ণ হন আত্মসংকটে, সংগোপনে- অতি সংক্ষেপে তাদেরকেই স্বধা 'পুরুষ' নামে ডাকে। সম্ভবত সেই কারণেই কোনো এক সেমিনারে পেপার পড়ে নামার পর যখন এক বিশিষ্ট গবেষক তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন "Proud to see an emerging feminist" , সে গ্রহণ করতে পারেনি। কাষ্ঠ হেসে জানিয়েছিলো- "Thanks a ton but I would love to call myself a humanist as I have seen pangs of the first sex before learning mine" 


বেধড়ক সবুজে দুটো কাঠবিড়ালির বাসা। অষ্টপ্রহর ঝিলিক দিয়ে লাফিয়ে বেড়ায় শাখা থেকে প্রশাখায়। স্বধা তাকিয়ে আছে। ভাঙা রেমিঙটন পড়ে আছে জীর্ণ শেডের আড়ালে। অনেকদিন কিছু লেখেনি সে, অনেকদিন। মনে হয় কিছু দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থাকে বলেই তারা অনন্ত আকর্ষণের, যেমন পুরুষ ও প্রকৃতির অথবা জল ও প্রস্তরের।

কে কাকে বোঝে?
কে কাকে বোঝায়?
কে কাকে বুঝতে দেয়? 

ছবি - অন্তর্জাল

রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

সুবীর সরকার

                           


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া
সুবীর সরকার


৫.
সব হাট কি একরকম!সোমবারের হাটের ভেতর কি খুঁজে পাওয়া যাবে বুধবারের হাট! তামারহাটের রঙের সাথে কি পুরোপুরি মিল থাকা সম্ভব রতিয়াদহ
হাটের!ছত্রশালের হাটের পাখিদের কি দেখা মেলে পানবাড়ির কোন এক শনিবারের হাটে!
সব হাট একরকম হয় না।সব গান একরকম হয় না।
সব গঞ্জ আর গাঙ একরকমের হতে পারে না।
প্রবেশ আর প্রস্থান দিয়ে এক একটি হাটপর্ব রচিত হতে থাকে।আর লোকমান পাগলার হাটে ধুলোর ঝড়সমেত ঢুকে পড়ে জোড়া মহিষ।গদাধর নদীর কোন বা চর থেকে বাথান ভেঙে এরা বুঝি চলে এসেছে এই হাটে ভেতরে।সমস্ত হাট জুড়ে একটা হুড়াহুড়ি লেগে যায়।মানুষের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ।তখন কোথায় ইয়াকুব ব্যাপারী কোথায় মহিউদ্দিন ওস্তাদ কোথায় লোকমান!ভরা হাটের কোলাহল থেকে সরে আসতে আসতে ময়কান্ত মৈশাল তখন খুঁজতে শুরু করে বাথান পালানো সেই জোড়া মহিষদের।তার হাতে দীর্ঘ পেন্টি।মাথা গামছা দিয়ে পাগড়ির মত করে বাঁধা।প্রায় তিন কুড়ির পেশীবহুল সুঠাম শরীরের পেশীগুলো একত্রিত করে 
ময়কান্ত তার কণ্ঠে তুলে আনেন মহিষের কণ্ঠের আকুতি।এই ডাক শুনে সেই জোড়া মহিষ কেমন থমকে দাঁড়ায়।তাদের বড় বড় চোখে কেমন মেঘের ছায়া!একটু বাদের দেখা যাবে সেই জোড়া মহিষ অদ্ভুত আহ্লাদ নিয়ে হেলে দুলে ময়কান্তর পিছনে পিছনে সেই বাথানের পথ ধরে ফেলেছে।গদাধর নদীর কোন বা চরের খুব অন্দর থেকে ভেসে আসছে 
হাহাকার ভরা গানের সুর_
"আরে ও  মৈষের  দফাদার ভাই
ডালা সাজাও ডালা সাজাও
চল মৈষের বাথানে যাই রে"
ময়কান্ত তার জোড়া মহিষ নিয়ে বাথানে চলে যেতে থাকে।কিন্তু হাট ভেঙে যায়।
৬.
ইয়াকুব ব্যাপারী মহিউদ্দিন ওস্তাদ লোকমান পাগেলাকে ভুলে গিয়ে আপাতত আমরা ঢুকে পড়তেই পারি বালাজানের হাটে।গঙ্গাধরের বাতাসে নদীর বালু উড়ে আসছে হাটের মস্ত খোলের ভেতর।শরীর ভরতি বালুকণা মেখে গরুহাটির উত্তর শিথানে
চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সাজু  চোরা।না,সাজু চোর নয়।তার নাম সাজু মোহাম্মদ। হাটে হাটে গরুর দালালি করে বেড়ায়।আর "চোর চুন্নি" পালাগানে
সাজু চোরের ভূমিকায় অভিনয় করে।তার শরীরের পরতে পরতে তীব্র এক নাচের ছন্দ লুকিয়ে আছে।সাজু চোরার পালা দেখার জন্য মানুষ হামলে পড়ে গানবাড়িতে।সাজু মোহাম্মদকে এখন আর কেউ চেনে না।সবাই সাজু চোরাকে একনামে চেনে।সাজু যখন নেচে নেচে শরীরে অদ্ভুত পাক দিতে দিতে গেয়ে ওঠে_
"ও কি হায়রে হায়
আজি মনটায় মোর পিঠা খাবার চায়"
তখন সমগ্র গানবাড়ি জুড়ে কি এক উন্মাদনা!
সাজু চোরা ছিল গানমাস্টার মঈনুদ্দিন এর শিষ্য।
মঈনউদ্দিন আবার ছিল আলাউদ্দিন এমেলের সাকরেদ।সারাজীবন এই গান,এই নাচ,রাতের পর রাত গানবাড়ি নিয়েই জীবন কাটে সাজু চোরার।
গরুর দালাল সাজু চোরা গরুহাটির ভেতর দাঁড়িয়ে 
কি ভাবছিল!রহস্যমোড়া গানবাড়ির কথা।নাকি সওদাপাতি নিয়ে বাড়ি ফিরবার কথা!তার শরীর জুড়ে নাচের ছন্দ ক্রিয়াশীল থাকে আর হাটের অন্ত মধ্যে সাজু ছড়িয়ে দিতে থাকে গুনগুন সুরের কোন এক গান,যা দূরাগত হওয়ার ডানায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমস্ত হাটের পরিসরে_
"ওরে ফুলবাড়ীত ফুলমালার বাড়ি
হাট করিতে যামো হামরা গরুর গাড়িত চড়ি"
এইভাবে পুরোন হাটপর্ব শেষ হয়ে যায়।নুতন নুতন হাটগুলোর হাট হয়ে উঠবার জন্যই হয়তো বা!

          



ক্রমশঃ
(চিত্রঋণ- সুবীর সরকার)

শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

          


    
মঞ্জিরা 



বন্দিশেরা নামছে সহস্রধারায় কৃষ্ণ অন্তরীক্ষ থেকে। নীলাদ্রি শুনছেন। বলা ভালো, শুষছেন। এই একটিই প্রেম তাকে কখনো গার্হস্থ্য চাওয়া পাওয়ার সরলবৃত্তে প্রবেশাধিকার দিলো না। উস্তাদ আমির খান যখন বিলাসখানি টোড়িতে "বাজে নিকি ঘুংঘরিয়া" ধরেন, ধর্মাচরন থেকে বহুদূরে থাকা নীলাদ্রির জগত, বৃন্দাবন হয়ে যায়। তিনি স্পষ্ট দেখতে পান খান সাহেব "রহিয়ে অব এয়সি জাগা" গাওয়ার সময় গজলের শেষ মীরটি শুনতে স্বয়ং গালিব এসে দাঁড়ান তার পানপাত্র ফেলে রেখে। অশ্রুই তো সেই নিরপেক্ষ বহতা যা যে কোন স্থান কাল পাত্রকে নিমেষে অপ্রাঙ্গিক করে দিতে পারে অপ্রতিরোধ্য তাড়নায়।
 

নীলাদ্রির বিশ্বাস মানুষ তার মানবিক পৃথিবীতে যাবতীয় বিগ্রহ এবং ধর্মের রূপকল্প নির্মাণ করেছে সঙ্গীতের স্বার্থে। একমাত্র সুরই সেই অতীন্দ্রিয় শক্তি যা শরীরে অবস্থান করেও আত্মাকে ত্রিলোকের উপলব্ধি দিতে পারে যদি আদৌ অদ্বৈতের অস্তিত্ব থাকে। শ্যামসুন্দর তার কাছে নজরুলের কৃষ্ণসঙ্গীতের বাইরে কিছুই নয়। তিনি হরিকে জানতে ব্যগ্র হননি শুধু "সে হরি কেমন বল" শুনে ভেসে গেছেন। তার হরি ঐ সৃষ্টিজারিত তুমুল আবেগটিই, কোনো আধার নয়। 


সময় কী কখনো ভাবার মতো সময়ের সন্ধান নীলাদ্রি করেন নি। ওয়ার্কহোলিক নয়, কর্মযোগও নয়, গণিত আর শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, এই দুই গহীন তাকে এতোটাই দুর্গম করে রেখে দিলো এত বয়স অবধি যে, সেই অরণ্যে তার নিবিড়ে বসা পাখিরা কতটা অভিমান জমিয়ে মেঘ হয়ে উড়ে গেলো, জানতে পারলেন না। কী বিচিত্র দ্বন্দ্ব আকীর্ণ সংবেদন। গওহরজানের ঠুংরির একটা মুড়কি যাকে তোলপাড় করে দেয়, বড়ে গুলাম আলীর "প্রেম যোগন বনকে" যাকে প্রেমিক করে তোলে লাজিজ মরহুমে, তিনি একবার তাকিয়েও দেখলেন না এতগুলো বছর ধরে দাবানল খুঁজে না পেয়ে পাথর হয়ে যাওয়া বৃক্ষবিষাদের শরমকে। অজস্র সূঁচ বিঁধে থাকা চামড়ার ব্যথাবোধ শরীর হারালে সম্ভবত মেধাবী মস্তিষ্ক অধিক সক্রিয় হয়ে ওঠে অচেতনে। হয়তো তাই আখতারী বাঈ- এর একটি আলাপ মনে পড়ছে তার অতিরিক্ত, ঘুরে ফিরে, "ইয়ে না থি হামারি কিসমত" ।

এও এক বিস্ময় স্বধার কাছে। সারা জীবনে হারমোনিয়াম, তানপুরা অথবা তবলার মতো নিরীহ, সহজপাচ্য বস্তুগুলি, বাঙালী সংসারে বাসনপত্রের মতোই যাদের উপস্থিতি ছিলো অন্তত কুড়ি পঁচিশ বছর আগেও, কোনোদিন ছুঁয়ে দেখেন নি নীলাদ্রি অথচ এক পলের অধিক সময় তিনি কখনো নেন নি খমক আর একতারার পার্থক্য বলে দিতে। তড়পেছেন সঙ্গোপনে যখন মিউজিক ট্যালেন্ট হান্টে অংশগ্রহণকারী কোনো শিশু তার কাছে বলতে পারেনি সেতারে ১৭ টি তার থাকলেও সুর নিয়ন্ত্রণের অধিকার থাকে মাত্র তিনটিতে, বাকিগুলি 'তরপ'। নীলাদ্রির চরম শত্রুরাও তাকে প্রজন্মবিরোধী দলের শরিক এই অপবাদ দিতে পারবে না কিন্তু স্বধা তার উপর ক্রমবর্ধমান হতাশার ছায়ার অধিগ্রহণ দেখেছে নিয়ত যখন হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া, শিবকুমার শর্মা, উস্তাদ নিশাত খান, পাঁচুগোপাল দত্ত, শুভলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণার মতো ব্যক্তিত্বরা নিছক কতগুলো নাম হয়ে বন্দিত্ব নিয়েছে কম্পিটিটিভ এক্সাম প্রার্থীদের বৃত্তে।


এক ফাল্গুনী সন্ধ্যা তিনি উপহার দিয়েছিলেন স্বধাকে। সে তখন এক কলিগের বিয়েতে না গিয়ে উপায় নেই বলে তৈরী হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলো বাবার স্টাডিতে। নীলাদ্রি শুরু করেছিলেন "ফ্রী স্পিরিট" দিয়ে।

--"এসো, এসো, না হয় দেরীই হবে খানিক"


তারা পৌঁছেছিলো তারপর "ঘাট অব বেনারস" এ।

--"তুমি বিয়েবাড়ি যাচ্ছিলে না?
    অ্যারেঞ্জ না লাভ?
    বেশ, এই দুটো পরপর শোনো             তাহলে,
     "বিলাভেড কল" আর
     "মিসিং অব হার্ট"


ফল্গুর উচ্ছ্বাস স্মরণ করিয়ে স্বধাকে যখন শেষে শুনিয়েছিলেন নীলাদ্রি "হোলি ম্যাট্রিমনি", স্বধার জানা হয়ে গিয়েছিলো ভালোবাসা আর বিবাহের সংজ্ঞা শিখিয়ে দিতে একা বিসমিল্লা জন্ম জন্মান্তরের দায়িত্ব নিয়ে রেখেছেন। বিয়েবাড়ি আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কী প্রয়োজন লোকসমাগমের? তার তো অভিসার অধিগত হয়ে গেছে সদ্য, সিঁদুরের রঙও মাখা শেষ। 


--"তোমার আনুষ্ঠানিক সম্প্রদান আমি করবো না কখনো। সেই অধিকার আমার নেই। কোনো নারীকেই দানের অধিকার কোনো পুরুষের থাকে না আরেক পুরুষের হাতে। স্বধা, আমি ব্রাহ্মণ যে। ব্রহ্মজ্ঞান না হোক, আত্মার বর্ণকে অশুক্ল করি কী ভাবে? তুমি আমার অংশবীজ। গ্রহন বা অর্পণের দায় মানুষের হাতে থাকে কি? যোগসূত্রকে অস্বীকার করে, অজ্ঞাত যেমত, অনুষ্কাকে শুনো, নোরাকেও। পন্ডিতজীর অবয়ব ভাসবে না? দ্যুতির আহুতিতে অঙ্গুলিত্রাণ জরুরী, শিরস্ত্রাণ নয় "


বহুবার জানতে চেয়েছে স্বধা, নীলাদ্রি উত্তর দেন নি। আজ মনে হলো বড় দেরী হয়ে গেছে। হয়তো জানিয়ে দিলেই পারতেন। হিন্দুস্থানী মার্গসঙ্গীতের একনিষ্ঠ শ্রোতা কিন্তু অভিনিবেশে স্পষ্ট হয় নীলাদ্রির ঝোঁক আবদুল করিম আর ফায়েজ খানের গমকে যতটা, তার থেকে অনেক বেশী তাদের গোবিন্দ বন্দনায়। কেন? নীলাদ্রি মনে মনে উচ্চারণ করলেন, জানেন স্বধা বুঝে নেবে একদিন ঠিক। ঈশ্বরের অর্থ যদি নিখাদ ব্রহ্ম হয় তাহলে নীলাদ্রি তীব্র আশ্বাস রাখেন সেই সমস্ত সুরসাধকদের গায়কীতেই অধিক যারা ধর্মকে শুধুমাত্র একটি শব্দে পরিণত করতে পেরেছেন। অতিক্রম করে গেছেন লোকায়ত ও প্রচলিত ধারণা ও আচরণ। পৌঁছে গেছেন অনাদির সেই অভেদ অবস্থানে যেখানে রসুলের সর্বনাম সরস্বতী। 


মাঝে মাঝে স্বধার মনে হয় চেতন অবচেতন থেকে ক্রমশ অচেতনের দিকে সরে যাওয়া তার বাবার এই পরিণতি হয়তো সিদ্ধান্ত মাত্র। এই মুহূর্তে যে রাষ্ট্রে তাকে শ্বাস নিতে হচ্ছে তা তার অপরিচিত ও অসূয়ার কারণ। তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন নিজেকে ক্রমেই। যেভাবে মুছে ফেলা হচ্ছে নগরীদের নাম, হয়তো তার প্রাণপ্রিয় ঘরাণাদেরও বদলে ফেলা হবে তাদের স্রষ্টাদের ধর্মবিচার করে। জয়পুর আত্রাউলি, পাতিয়ালা, রামপুর মহাস্বন, ইন্দোর, কিরাণা, আগ্রা, গোয়ালিয়র, দিল্লী, ভেন্ডিবাজার, মেওয়াটি, শ্যাম চৌরাশিয়া- সবকটি এবং প্রতিটিরই প্রতিষ্ঠাতা প্রো-হিন্দুত্ব সাম্রাজ্যবাদীর ষণ্ড দৃষ্টিতে অপরাধী, যেহেতু বিধর্মী। সেই নরকজল বাইতে পারবেন না, এই আতঙ্কেই কি যাবতীয় চিকিৎসাকে প্রার্থিত ফলপ্রসব করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন তিনি নিজেই?

বহুর মধ্যে বিশেষ করে একটি বিতর্ক বাকী থেকে গেছে স্বধা ও নীলাদ্রির। কেন এক জমিনে দুজনেই বিচরণ করেও তারা, পিতা ও কন্যা, মূল আদর্শগত কেন্দ্রে এতো বিরোধী। তাদের ফোর্ট এক নয়, আঙ্গিকও নয়। সেই কারণেই কি? নীলাদ্রি মানুষ থেকে ক্রমে দূরত্বে গেছেন যে পন্থায় ঠিক সেই প্রকরণে কেন স্বধা মানুষেরই মধ্যে খুঁজে ফিরছে পরশপাথর? পৃথিবীর যে তিনটি জায়গায় তাদের যাওয়ার কথা ছিলো অবরোধ উঠলেই, তাদের মধ্যে এই মুহূর্তেই তার পৌঁছে যেতে ইচ্ছে করছে সিস্টিন চ্যাপেলে। নীলাদ্রি বারবার শেখাতেন স্বধাকে শিল্পীর জীবন নিয়ে না ভাবতে। শিল্পই শিল্পীর সাক্ষর। যন্ত্রণা, অর্জন ও প্রাপ্তি-প্রাকাম্যের। সৃষ্টি ও স্রষ্টা একীভূত। যখন নীলাদ্রির ডোবার কথা ছিলো "ও গ্রেসিয়াস লাইট" অথবা অন্যান্য ভেসপারের অতলে পিয়ানোয় চোখ রেখে, স্বধা দেখে বেড়াতো ফ্রেস্কো, এঞ্জেলোর মায়া ধার করে। এর কারণ কী? নিজেকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে সামান্য কাঁপলো সে। তাহলে কি ব্যবধান রেখার কাছাকাছি পৌঁছাতে চাইছে সে ক্রুশ আর ক্রাইস্টের? ছুঁয়ে দেখতে চাইছে ইন্দ্রিয় সম্বল করে ফ্যান্টাসি আর স্পর্শযোগ্যতার লাইন অব কন্ট্রোল? বাবাকে বলা হলো না। আর কখনো সুযোগ আসবে কি?


ভোর হয়ে আসছে। ইডেনের কেবিন ওয়ানে ধ্রুপদে ভৈরবী ধরলেন আল্লাদিয়া খান। কে বলে 'হংসধ্বনি' রাগ মাত্র? কে বলে শুধু 'মিঞা কি মল্লার' পাবক শান্ত করে? অসংখ্য ভেজা ভেজা সাদা ডানা উড়ে যাচ্ছে কাদের তাহলে কাচ পেরিয়ে দিগন্তের দিকে? স্বধা দেখছে। অক্সিমিটারের নেমে যাওয়া কাঁটা তাকে বাধ্য করছে ডক্টর সেনকে ফোন করতে অথচ টের পাচ্ছে এ অন্যায়। যাত্রাপথে বাধা হতে নেই। হটাত তার সমস্ত কোষে জিহাদ জ্বলে উঠলো নৃশংস মাত্রায়। কেন প্রতিবার নির্লিপ্তিতে নীলাদ্রি পেরিয়ে যাবেন প্রতিটি সম্ভাব্য সংঘাত? অসীম নিস্তব্ধতা দিয়ে এড়িয়ে যাবেন অনিবার্য প্রতিরোধ? আজ তাকে ফিরতেই হবে। নাড়া স্বধার হাতেও বাঁধা হয়েছিল তিন বছর বয়সে ইলাহাবাদে। সে অন্য ইতিহাস। ইনশাল্লাহ, আজ সে হারবে না তার পঞ্চগুরুর প্রথম জনের কাছে।

ছবি - অন্তর্জাল 


শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                               


 

আতিশ






" কিছুকে ভাঙা বা গড়ার জন্যে ডেলিবারেট বা ইনটেনশনাল হতে হয় না। অন্তরঝাঁপিতে উঁকি দিতে হয়। রূহ কী চাইছে। যদি তোমায় দিয়ে নির্ধারিত থাকে ধ্বংস বা সৃষ্টি, সে তন্ত্র হোক বা সংস্কার, তা ঘটবেই, সময় করিয়ে নেবে। কিন্তু শুধুমাত্র ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকা বা ট্রেন্ডসেটার হতে গিয়ে মানুষ বড় নিষ্ঠাবান হয়ে পড়ে উদ্দেশ্যে। প্রয়োজন হয় সলিউবিলিটি, তারল্য অর্জন। আয়নার মত স্বচ্ছ সে মাধ্যমে অনায়াস খেলতে পারে তখন কালপ্রতিমার ছায়া " 



রাজহাঁসরঙা শাড়িগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাদের অধিশ্বরী কমলিনীর কথাগুলোর প্রতিধ্বনি পাচ্ছিলো স্বধা। বহুদিন হলো চারটে দেওয়াল থেকে পাথরের ছায়া ঝরাতে ঝরাতে এমন অদৃশ্য পাষাণ গেঁথে তুলছিলো সময়, ভুলে যাওয়া ডানাগুলো খোঁজা হচ্ছিলো না। অথচ এক দুপুরে, পলাতক রোদ্দুর আর কাঠবিড়ালির মধ্যে পার্থক্য কীভাবে করবে বুঝে উঠতে না পারায় তার মনে পড়লো প্রতিটি অপেক্ষার নিজস্ব সৌন্দর্য থাকে আর অপেক্ষা ঘন হতে থাকলে তার গায়ে যে সলিচিউডের পশম জড়িয়ে যায়, সে ওম থেকে খুব সহজে আর বেরনো যায় না। মুশকিল হলো তার অপেক্ষা আছে কিন্তু সে অপেক্ষার বর্ণ নির্ধারণ করতে বসলে নিজেকে রংকানা ঠাহর হচ্ছে। স্মরণে এলো সেই সঙ্কটে তার মাথায় হাত রেখে বলা কমলের (এই নামেই সে তার ঠাম্মিকে ডেকে এসেছে বরাবর) শেষ কথাগুলো।

(বেনারসে দশেরার ধুম শেষ হলে পঞ্চদশী স্বধার মেঘেদের দেশে ফেরার মেঘলা সকালে যা তিনি বলেছিলেন... আর দেখা হয়নি। ইউক্যালিপটাস ঘেরা নির্জন প্রিন্সিপাল রুমের ভারী কালো ল্যান্ডলাইনটা বেজে ওঠার বহু আগে সে টের পেয়েছিলো কমলের মুক্তি সংবাদ। অদ্ভুত কমলা রঙের আলো পিঠে ছড়িয়ে তার বেডের লাগোয়া  শার্সিতে এসে বসেছিলো সেই সকালে যখন এক গোল্ড নেপড ফিঞ্চ। এ পাখি বিরল নয় এই প্রদেশে কিন্তু অরণ্য ছেড়ে সে খুব কমই বেরোয়। বহু সাধ্য সাধনায় তার দর্শন পায় সারা পৃথিবী থেকে আসা অর্ণিথোলজিস্টরা। সে পড়তে পেরেছিলো কমলের বার্তা। বিশ্বাস অবিশ্বাসের সীমা অতিক্রম না করতে পারলে এই মায়াদিগন্তে পা রাখা যায় না, যুক্তি যাকে কাটতে পারে না, ব্যাখ্যা যার নাগাল পায় না, যেখানে নীলকন্ঠ উড়ে যায় দর্পণ বিসর্জনের পর খাঁচা থেকে আত্মারাম নিষ্কৃতির রূপকে)


--" কমফোর্ট জোন থেকে বেরোতে তোমার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে তুমি নিজেকেই প্রতি মুহূর্তে পাবে দিদিভাই। আপাত অজ্ঞাত প্রতিকূলতা তোমায় আলস্য দেবে আর সেই ই তোমায় ধীরে স্থবিরও করবে। আমি চাইবো এমন যখনই হবে, ছিঁড়ে দিও নিজেকে, ডিকন্সট্রাক্ট কোরো লিয়ারকে ভেবে নিয়ে। জানো তো সেই বিখ্যাত সাধক কখনো একই বৃক্ষের নিচে দুই বার ধ্যানে বসতেন না, যেন মায়া না বসে। অবিদ্যাকে না ভাঙলে বিদ্যা অর্থাৎ মহামায়া চৈতন্যে পা রাখেন না। তাই সতর্ক থেকো "


সুতরাং সে আজ আবার পথে, একবার ছুঁয়ে যাচ্ছে শুধু কমলভূমি। দেশ দেখা যে কী প্রবল ব্যঞ্জনাময় তা বোধ করি ঋতুপর্ণের মতো জানতে ও জানাতে কেউ পারেন নি ভারতীয় চিত্রপরিচালকদের মধ্যে। এই বিতর্কিত মন্তব্য বহুবার প্রকাশ্যে করে সমালোচিত হয়েছে স্বধা। বারবার তুলনা আনা হয়েছে কাশবনে অপু দুর্গার ট্রেন দেখাকে ঘিরে। কিন্তু সে এটা কিছুতেই বুঝতে পারে না যে, কোনো মতকে পোষণ করা সিদ্ধান্ত আর মৃগদৃষ্টির মধ্যে আদতেই কোনো পার্থক্য আছে কিনা। অতএব সন্ধ্যার গঙ্গাবক্ষ থেকে আলোকউজ্জ্বল ঘাটের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসে ব্যাসকাশীর দিকে তাকানো সে নিজস্ব সিদ্ধান্তেই ভিজে নিল আরেকবার। 


বোহেমিয়ানা যাদের অকৃত্রিম একমাত্র তারাই বোধ হয় বোঝে কেন গালিব বলতেন "নশা অগর শরাব মে হোতি তো নাচতি বোতল" । আসলে নেশা হলো স্নায়ুর সেই আশ্চর্য অবস্থান যেখানে নেশারু নিজের ভিতর ঈশ্বরসত্ত্বাকে আবিষ্কার করে, দ্যা সুপ্রিমো। ফলে যে কোনো মূল্যে বারবার পৌঁছাতে চায়। সুর, সুরা, শিল্প, সাহিত্য, একাকীত্ব, দেশ দেখা সব, সব তারই অনুসন্ধান মাত্র, যে যেভাবে পায়। যে যত সংখ্যক মাধ্যম ছুঁতে পারে, তার সংবেদন ততো সূক্ষ্ম। এসব একান্তই স্বধার ব্যাক্তিগত বিচার যদিও। যে স্বাধীন চিন্তার বীজ কমল পুঁতেছিলেন প্রথম কপালে হাত রেখে তার পৌত্রীর, তাই আজ তার সমস্ত শরীর বেয়ে উঠে মস্তিস্কের কোষে কোষে ছড়িয়েছে। এই কথা সে টের পায় একা হলেই অপূর্ব একা যখন হতে পারে আর কী। সর্বদা কী আর পারে? রক্তে লবণ কার না থাকে? নাভি থেকে পারাবত কার না উড়ে যেতে চায়? পৃথিবীতে এমন আনন্দ অথবা শোকের অস্তিত্ব আছে কি যে খিদে ভোলাতে পারে? ক্ষুধাপ্রবণ নশ্বরতা, কে পারে বিনা সাধনে তাকে অতিক্রম করতে। সে তো সামান্য নারী মাত্র। উদাসীন জাস্কর উপত্যকা থেকে নির্লিপ্তির চাদর জড়িয়ে তার ক্রাইস্ট যতই তাকে ঈশ্বরী হয়ে উঠতে বাধ্য করুক, নূপুর খুলছে কই? এও আরেক সমস্যা। ঈশ্বরবোধের ভিতর স্বধা কখনো ফুল ধূপকাঠি নৈবেদ্য ঢোকাতে পারলো না। অসম্ভব শরীরী তার আধ্যাত্মিকতা। রাসজ শ্বাসে তার ভক্তি আসে না, রমণস্পৃহা জাগে।


অলীক এই অন্তর্দাহ স্বধার মধ্যে প্রত্যক্ষ করতেন কমলিনী। লিখে গেছেন। বহুবার পড়েছে সে। আজ সেই ডায়েরি বরাবরের মতো নিজের কাছে নিয়ে যেতেই তার পীতাম্বরপুরার পাথরে পা রাখা, হয়তো শেষবারের মত। 

--" দিদিভাই,

তীব্র অহং ও যন্ত্রণা সমানুপাতে সম্বল করে আমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে এই জন্মের মেয়াদটুকু আজ। ভেবেছিলাম মুক্ত হয়েছি, পারলাম না। আমার প্রকৃত অংশের দায়টুকু তুমি নিয়ে রাখলে। তুমি বাঁচবে আমি জানি অথচ হেঁটে যাবে যে যে ভিস্তা দিয়ে তাতে নির্ধারিত আছে এমন কাঁটারা, পা থেকে রক্ত ঝরবে না, ক্ষতরা মারিয়ানা হবে। তুমি প্রেমে বিশ্বাস করো না, সম্পর্ক মানো না, অথচ নতজানু হয়ে থাকো ভালোবাসতে। তুমি মানুষের শরীরে প্রত্যাশা রাখো ঐশ্বরিক ধারণ আর ঈশ্বরের থেকে আশা করো মানবিক বোধ। এ কি সম্ভব? আমি যতটুকু দেখছি সামনের দিকে তাকিয়ে, প্রতিবার নি:স্ব হয়ে যাচ্ছ সমর্পণ ও প্রত্যাহার শেষে। আমি নিশ্চিত জানি আধারেরা টের পাবেনা। এক উত্তরই তো প্রতিবার পেয়েছি তোমায় বুঝতে গিয়ে 'ইশক কোই সনম ইয়া আপ খুদা কমল?' এ আমার হাহাকার, তোমার প্লাবনের মতো কাঙালপণাকে তীর থেকে তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে নোঙর ফেলতে দেখছি মাঝ দরিয়ায় যেখানে সূর্যও উদয় অস্তের নীতিহীনতায়। সদ্য রজস্বলার কী'ই বা বোধ থাকে মনের শরীর আর শরীরের মন নিয়ে অথচ তুমি সেই সময়েই আমার কাছে স্পষ্ট উচ্চারণ রেখেছিলে 'যাকে নিয়ে উত্তাল হবো আগে তো তাকে আমার মাথা পেরিয়ে আসতে হবে। চামড়ায় কিছু থাকে কি? মেটিয়াবুরুজের ট্যানারিতে শত শত ঝুলতে দেখেছি। হৃদমাঝারে রাখতে আর কাকে পারি সোনার গৌর ছাড়া? হৃদি গো হৃদি, সে না জাগলে আর এগোই কী করে?' দিদিভাই কাকে চাইবে তুমি অথবা অজস্র চাইবে। প্রতিটা চাওয়া একটা করে ভাঙনের উত্তরণ রেখে যাবে। না মানুষ কখনো ঈশ্বর হবে না ঈশ্বর কোনোদিন মানুষ। দুই'ই তো শব্দমাত্র, গড়ে নেওয়া আলেয়ার, আরোপিত সংজ্ঞার। অথচ এই দ্বন্দ্ব থেকেই উৎক্ষিপ্ত মহাজাগতিক কণার মতো আবর্তিত হতে থাকবে তুমি সমগ্র আয়ু। নিজের উপর ক্ষোভ আসছে আজ আমার। কেন চেয়েছিলাম তোমায় ব্যতিক্রমী? সাধারণ হলে না, অসাধারণ হতে চাইলে না, স্বধামাত্র হয়ে রইলে।



কমল "
চিত্র - অন্তর্জাল 

শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

সোনালী চক্রবর্তী

                      


নিজা 


মাউন্ট মৌনালোয়া, ফুজি না নিছক পোপো? বৃষ্টি কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক করে দিয়েছে সায়র সেনকে নাহলে এই সব অহৈতুকী দৃশ্যকল্পের তুলনা মাথায় আসার মতো অবসর কোনো মফস্বলের সরকারী হাসপাতাল তার ডক্টর অন ডিউটিকে দেয় না। সপ্তাহের সিংহভাগ এখানেই কাটাতে হয় তাকে। অন্যান্য অপ্রাপ্তি সেভাবে গুরুত্ব না পেলেও একমাত্র মেয়েকে ছেড়ে থাকাটা মনখারাপেই রাখে। যে আসার পর তার চরাচরে তিনি অন্য রংধনু দেখেছেন তার থেকে দূরত্ব বিষণ্ণতা তো দেয়ই তার মতো মানুষকেও যার জীবন ও তার যাপন সম্পর্কে ধারণাটা মেডিক্যাল ফ্রেটারনিটির বাকি পাঁচজন সমসাময়িকের সঙ্গে মেলেনা। হয়তো মেধা, দক্ষতা এইসব কোন'কে অনালোচিত রাখলে একমাত্র নিয়তি নির্ধারিত বলেই তাকে এই পেশায় আসতে হয়েছে, থাকতে হচ্ছে, হয়তো বা নিজেকেও ভুলতেই হচ্ছে। সদ্য তিরিশ পেরিয়েছেন অথচ তাকে দেখলে কেউ বলবেই না ক্যাম্পাসে বসে কিছুক্ষণ আগেও আড্ডা মারছিলেন না। হয়তো প্রাণশক্তি, হয়তো উদ্দাম স্বাতন্ত্র, সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না এক নজরে দেখে কী তাকে এতটা আলাদা করলো। তবে যদি কেউ তাকে লক্ষ্য করে নিপুণভাবে, বুঝতে ভুল হবে না আসলে এখনো তিনি তার আবেগ ও সংবেদনকে কাটিয়ে উঠতে পারেন নি, এর উল্টোটা ঘটলেই বরং স্বাভাবিক হতো, পেশার সঙ্গে মানানসইও বটে। অথচ সায়র বেহিসাবি সফল। অদ্ভুত শুনতে লাগলেও অত্যন্ত বিতর্কিতও। সেসব অন্য প্রসঙ্গ। এই মুহূর্তে বৃষ্টি বাড়ছে। অন্যমনস্ক থেকে অন্যমনস্কতর হতে হতে সায়রের মনে পড়ছে তার ব্যাক্তিগত মালিকানার নার্সিংহোমগুলোর মধ্যে বিশেষ একটিকে, আরও নির্দিষ্ট করতে গেলে ইডেনের কেবিন ওয়ানকে। কিছু সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হয় নাহলে নিজেকে নৈর্ব্যক্তিক রাখা দুষ্কর হয়ে ওঠে। সায়র ফোন করে নির্দেশ দিলেন, আগামিকাল থেকে ইডেনে কোনো কোভিড পসিটিভ থাকবে না। প্রত্যেককে রেফার, প্রপার প্লেসমেন্ট দিয়ে ডিসচার্জ করে দিতে হবে। প্রয়োজন ছিলো না, কিছুটা স্বগতোক্তির মতো করে জুড়ে দিলেন,

--"গভর্নমেন্ট গাইডলাইন প্রোভাইড করতে গেলে যে অমানবিক আচরণ করতে হবে, পিপিই ইত্যাদি পরে ট্রিটমেন্ট, তা সম্ভব নয়। এতে পেশেন্ট মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সাইটোকাইন তাকে সেখানেই শেষ করে দেয়। আমায় তো দেখেছেন, একটা মাস্ক ছাড়া কোনো গ্লাভসও আমি ব্যবহার করি না। সুতরাং সকলের স্বার্থে এই ডিসিশন নিতে আমি বাধ্য হলাম।"


জ্যা থেকে শরকে মুক্ত করার পর ব্যাধ ভিন্ন ধনুক নিয়ে ভাবিত হয় না বিশেষ কেউ অথচ ফোন রাখার পর থেকে এক বিচিত্র প্রশ্ন সায়রকে তাড়া করতে শুরু করলো। কেন এই স্টেপ? গতরাতে এডমিশন নিয়ে আজ বিকেলে একজন বলিষ্ঠ মধ্য তিরিশের যুবক স্যাচুরেশন শূন্যে পৌঁছে লাশ হয়ে গেছে বলে? চারঘন্টা যাবত এই আকস্মিকতা নিতে না পেরে তার স্ত্রীর আর্তনাদ ইডেনের সব কটা ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়েছে বলে? নাকি সেই একই অলীক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এডমিট হওয়া এক প্রৌঢ়ের একই পরিণতি কাল ঘটলে তিনি দায় নেওয়ার কথা ভাবতেও পারছেন না বলে? জন্ম ও মৃত্যু জনসাধারণের কাছে যতটা প্রবল উদযাপনীয়, ঠিক ততটা প্রেডিক্টেবল নয় অনুভব সাপেক্ষে। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে বিষয়টা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এত জন্ম এত মৃত্যু, সংখ্যাধিক্য অথবা প্রতিটিতেই অংশীদার হওয়ার কারণে সম্ভবত জীবনের থেকেও অত্যন্ত সহজ ঠেকে তাদের কাছে জীবনে প্রবেশ ও প্রস্থান। তবে কেন তিনি এত অস্বস্তিতে ভুগছেন?

নীলাদ্রি চক্রবর্তীকে ঠিক দুদিন আগে যারা প্রথম ইডেনে নিয়ে এসেছিলো, পরের দিন কথা বলতে এসেছিলো, তাদের কারোর মধ্যে সে ছিলো না। যে মুহূর্ত থেকে যাবতীয় রিপোর্টে অভ্রান্ত প্রমাণিত হলো আপাতত তার আর বাড়ি ফেরার সম্ভাবনা নেই, শরীরের ভিতরের যন্ত্রপাতি ভয়ংকর ক্ষতিগ্রস্ত যেহেতু একদম জ্ঞান হারানোর আগে কাউকে কিছু বুঝতেই দেননি সদাব্যস্ত ব্যক্তিটি, ছায়ার মত সে এসে দাঁড়ালো, নীলাদ্রির একমাত্র সন্তান। সায়র অসংখ্য সুন্দরী দেখেছেন জীবনে, রূপ তাকে আর প্রভাবিত করে না। আর সবচেয়ে বড় বিষয়, একজন প্রৌঢ় পেশেন্টের মেয়েকে কীরকম দেখতে সেই অনুসন্ধানের পর্যাপ্ত আগ্রহ, ইচ্ছে বা উদ্যোগ সবেরই বিপুল ঘাটতি ছিলো তার দিক থেকে। তিনি শুধু এড়াতে পারেন নি একজোড়া চোখকে। চোখও নয় ঠিক, দৃষ্টিকে। মুখের নব্বই শতাং মাস্কে ঢাকা অথচ সেই আয়নার উপর আলো পড়লে আর এক শতাংশেরও প্রয়োজন হয় না বুঝে নিতে মালিকানা পৃথিবীর তিনভাগের থেকে আলাদা। অসম্ভব অসহায় অথচ অন্তর্ভেদী। সায়র যতক্ষণ কেবিনে ছিলেন স্পষ্ট বুঝছিলেন, সেই নি:স্ব রকসলিড দৃষ্টি তাকে অনুসরণ করছে। তার প্রতিটি কথা, মুভমেন্ট, শরীরী ভাষা সব কিছু স্ক্যান হচ্ছে। কথা হয়নি কোনো। কথার প্রয়োজন ছিলো না। একথা নির্মম সত্য পৃথিবীর যে কোনো ভাষা চতুর্থ ইন্দ্রিয়ের উচ্ছিষ্ট হলে অর্থহীন হয়ে যায়। সায়র অন্ধ নির্ভরতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ফলত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন অবশ্যই। উচ্চারণ করতে পারেন নি খুব বেশী আশা তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না কারণ তার মাথায় ভাসছিলো নিজের মেয়ের মুখ। বছর খানেক আগেও তিনি একথা জানতেন না এখন যা অনায়াসে বোঝেন, একমাত্র মেয়েদের কাছে তাদের বাবারা ঠিক কোন অবস্থানে থাকে। আঘাত করা যায়না সেই শক্তিস্থল অথবা দুর্বলতম বিন্দুতে, চিকিৎসক হিসেবেও নয়। তার চেয়ে এই ভালো, প্রফেসর অন্য কোথাও শিফট হয়ে যান।


নীলাদ্রি ঘুমোচ্ছেন, তাকে নিয়ে এত উথালপাথাল, অজ্ঞাত তিনি। চাঁদের বিন্দু বিসর্গ উদয়ের সম্ভাবনা আপাতত নেই অথচ তার অবচেতন জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। বিস্তীর্ন দিগন্তের একপ্রান্তে এক রাজপুত্তুর, মুকুট তরোয়াল পক্ষীরাজ কিছু নেই, সদ্য দেখেছেন অথচ মনে হচ্ছে বহু চেনা, আরও বহুবার বহু সময় ধরে তাকে দেখতে ইচ্ছে আসছে তার। আর বহুদূরে স্বধা, মেয়ে হিসাবেই তার পরিচয় অথচ নীলাদ্রি বিশ্বাস করেন তার প্রয়াত মায়ের প্রায় সমস্ত বৈশিষ্ট্য মননে বহন করা চলা আত্মজাটি প্রকৃতই তার আত্মারই পরিবর্ধিত রূপ। দৈর্ঘ্য, রঙ ইত্যাদি জাগতিক মাপকাঠিতে যতই স্বধা তার মায়ের জলছবি হোক না কেন, একটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করলে অথবা কাগজে হিজিবিজি কাটলেও জনকের সিলমোহর নিয়েই করে, এ তার অপ্রকাশিত অহং জীবনভোর যেদিন থেকে তিনি 'বাবা' ডাক শুনেছেন। রক্তের দোষেই তারা বংশপরম্পরায় গ্রন্থকীট। গণিতশাস্ত্রে যতটা ব্যুৎপত্তি তার ছিলো বা আছে, সাহিত্য তাকে সেভাবে টানেনি কখনো অথচ মেয়ে উল্টো হয়েছে। বিজ্ঞান স্বধার কাছে বিরক্তিকরই থেকে গেলো। ঘুমের মধ্যে স্মিত এক হাসি তার যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে ফুটে উঠল। স্বধা দেখলো তাকিয়ে। এই এক্সপ্রেশন জন্মইস্তক তার আর বাবার ব্যাক্তিগত ও পারস্পরিক সংলাপ। সকলেই বলে সে আর তার বাবা দুই ভিন্ন গ্রহের অধিবাসী। কিছুতেই কোনো সামঞ্জস্য নেই, মতের মিল তো নৈব নৈব চ। অথচ সে আর তার বাবা'ই শুধু জানে কেন্দ্রাতীগ বলের সংজ্ঞা। সাধারণ চোখে তা অনুধাবনযোগ্য নয়, প্রমাণের তো নয়ই। সেই সূত্রে সে আজও জানতে পারলো তার বাবা এখন কী দেখছে। 

স্বধা চোখ বন্ধ করে ছায়াপথ ভাবল একবার। নিমেষে শহরতলীর যাবতীয় বারিষকে মেক্সিকোর রক্তাভ মাটির ধোঁয়া ঢেকে দিল। নীলাদ্রি আর ফুয়েন্তেসের গ্রিঙ্গো একাকার হয়ে গেলেন। লড়ছে তার বাবা। কর্তব্যের চাঁদমারিতে দাঁড়ালে কোন পুরুষ ভাড়াটে সৈনিক নয়? বিরোধে বিরোধে বাবাকে জর্জরিত করা সে দাঁড়িয়ে আছে সামনে আর অবাস্তব মায়া আগলে তার বাবা খুঁজে চলেছে সেই পুরুষ যে তার অবাধ্য আর অসামাজিক সন্তানটাকে ধারণ করতে পারবে পূর্ণ যোগ্যতায়, মর্যাদা দিতে পারবে আপাত পাথুরে স্তর পেরিয়ে অসম্ভব তরল সেই জলাভূমির যেখানে যখন তখন তুফান ওঠে বিনা সংকেতে। প্রতিপক্ষ মাত্রেই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় তার স্বধার সামনে এ তার কাছে বিষম যন্ত্রণার কারণ তিনি জানেন প্রতিটি আঘাত দেওয়ার আগে স্বধার নিজের ক্ষত হয় চতুর্গুণ, আত্মধ্বংসী নন্দিনী তার। কে বুঝবে তার এই মেয়েকে? 


ভোর হয়ে আসছে।
ইডেনের রিসেপশন স্টাফ কেবিন ওয়ানের পেশেন্ট পার্টিকে ডেকে পাঠালো, জরুরী ইনফরমেশন আছে, স্যার ফোন করেছিলেন...

চিত্রঋণ: অন্তর্জাল