সুবীর সরকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সুবীর সরকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

সুবীর সরকার

                  


রেডিওবার্তা


ভাঙা কিংবা ভরা হাট
ভিখিরিরা গান গাইছে
আমি জোত হারানো জোতদারকে দেখি রেডিওতে
                                            গান শুনছেন
জল শুকিয়ে যাওয়া এক নদী
হ্যাঙারে নৌকো ঝোলানো
ঘুম আর জাগরণের পাশে পা দোলাচ্ছে 
                                                  মৃত্যু
 হাঁসেদের নিজস্ব জলাশয় থাকে
 সার্কাস তাঁবুর পাশে সাতসকালের 
                                              রোদ
 জঙ্গলে প্রবেশ করলেই টুপি উড়ে যায়
 উড়ে যাওয়া টুপি কি কান্না আড়াল করে!
 আমরা বিমানবন্দরে পাখি ঢুকতে দেই না
 দেওয়ালে পেরেক,গাদাবন্দুক
 কফির মগ হাতে নেমে আসছেন প্রবীণ জোতদার
 ডাংগুলি খেলার মাঠে জড়ো হচ্ছে 
 সমস্ত উড়তে শেখা পাখিরা
 আমি কামানের মুখে দাঁড় করিয়ে দেব ক্রোধ
 ফিরে আসবে মৎসন্যায়।
 ফিরে আসবে বাহান্ন হাতির মিছিল।
 টুক করে একটু শিস রেখে আসবো
 কুড়িয়ে পাওয়া বেলুন রেখে আসবো
 যে শীতে কুয়াশা নেই আমি তার থেকে দূরে 
                                                            থাকি
 আঙুল ভালোবাসলে আঙুলের আংটিকেও
                                       ভালোবাসতে হয়
 কাঠের আগুনে পোড়ানো হচ্ছে আলু
 আলুতে লবণ মাখানো হচ্ছে
 এই সব দৃশ্য জড়িয়ে আমরা একটা নির্মীয়মান 
 সেতুর পাশে গিয়ে তো দাঁড়িয়ে পড়তেই পারি!
 মূলত সবকিছুতেই ম্যাজিক
 মূলত সবকিছুতেই গোপনতা
 আর রেডিওবার্তা শুনে হেঁসে ওঠে শীতদেশের 
                                                        কাকতাড়ুয়া
 
 
  
  
 
 

রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                             


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া



২৬.
গঙ্গাধর আর গদাধর নদীর পারে পারে কত কত হাট।বড় হাট মাঝারি হাট জৌলুস হারানো কিংবা জাকজমকের হাট।এই সব হাট ঘিরে ভূমিলগ্ন মানুষের বেঁচে থাকা।মানুষের জীবন ঘিরে এত এত হাটের কুহক।
সে আলমগঞ্জের হাট বলো, প্রতাপগঞ্জের হাট হোক,পাগলাহাট বা কাছারিহাট যাই হোক না কেন;
সব হাট ছাপিয়ে ভেসে উঠতে থাকে গৌরীপুরের হাট।গোলকগঞ্জের হাট।এই আখ্যানের প্রায় সব চরিত্রই একবার হলেও ঢুকে পড়ে গৌরীপুর আর 
গোলকগঞ্জের হাটের কেন্দ্রে।
আমরা দেখে ফেলি গৌরীপুরের হাটে গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়ানো ভিখিরিদের।তাদের মুখের লালায় জিভের শরীরে লেগে থাকে গৌরীপুরের খিলি পান।গোলকগঞ্জের মজা গুয়া।হাটের প্রান্তে প্রান্তে উড়ে বেড়াতে থাকে তাদের গান_
"নদীত ফোটে 
নদীয়া হোলা"

২৭.
"একবার হরি বল মন রসনা
মানব দেহাটার গৈরব কইরো না"

মালতিগুরির চর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই রহস্য মাখা অঘ্রান সন্ধ্যায় চরের কোন অন্দর থেকে এই গানের সুর হাহাকার জাগিয়ে বা হাহাকার জড়িয়ে ছুটে আসছিল নন্দকান্ত বায়েনের দিকে।কিন্তু তখন
নন্দকান্তর ঘাড়ে তার চিরদিনের সেই ঢোলটি ছিল না।কিন্তু এই গান নন্দকান্তর সমগ্র শরীরের পেশিতে কেমন এক উন্মাদনা এনে দিতে থাকে।তার ইচ্ছে করে ঢোল নিয়ে কুয়াশার ভেতর দিয়ে কোন এক গানের জুলুসে চলে যেতে।তারপর গানে গানে জীবনের মস্ত আখ্যান বয়ন করতে করতে জীবন মায়ায় কেবল কান্না আর কান্না বিছিয়ে দিয়ে একপর্বে মালতিগুরির চর অতিক্রম করে নন্দকান্ত বায়েন নেমে যেতে থাকেন নদী তোর্সার শীতল জলে।
আমরা জল ভাঙবার শব্দ শুনি।আর ভাঙা জলের সোতায় নন্দকান্তর ছায়া দুলতে থাকে।
এভাবেই জীবনের পর জীবন বাঁচে এই সব হাটপরিধী জুড়ে জুড়ে।আখ্যানের পর আখ্যানের পরিসরে তীব্র এক গঞ্জহাটের কোরাস!

(সমাপ্ত)

রবিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                 


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া



২৬.
গঙ্গাধর আর গদাধর নদীর পারে পারে কত কত হাট।বড় হাট মাঝারি হাট জৌলুস হারানো কিংবা জাকজমকের হাট।এই সব হাট ঘিরে ভূমিলগ্ন মানুষের বেঁচে থাকা।মানুষের জীবন ঘিরে এত এত হাটের কুহক।
সে আলমগঞ্জের হাট বলো, প্রতাপগঞ্জের হাট হোক,পাগলাহাট বা কাছারিহাট যাই হোক না কেন;
সব হাট ছাপিয়ে ভেসে উঠতে থাকে গৌরীপুরের হাট।গোলকগঞ্জের হাট।এই আখ্যানের প্রায় সব চরিত্রই একবার হলেও ঢুকে পড়ে গৌরীপুর আর 
গোলকগঞ্জের হাটের কেন্দ্রে।
আমরা দেখে ফেলি গৌরীপুরের হাটে গান গাইতে গাইতে ঘুরে বেড়ানো ভিখিরিদের।তাদের মুখের লালায় জিভের শরীরে লেগে থাকে গৌরীপুরের খিলি পান।গোলকগঞ্জের মজা গুয়া।হাটের প্রান্তে প্রান্তে উড়ে বেড়াতে থাকে তাদের গান_
"নদীত ফোটে 
নদীয়া হোলা"

২৭.
"একবার হরি বল মন রসনা
মানব দেহাটার গৈরব কইরো না"

মালতিগুরির চর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই রহস্য মাখা অঘ্রান সন্ধ্যায় চরের কোন অন্দর থেকে এই গানের সুর হাহাকার জাগিয়ে বা হাহাকার জড়িয়ে ছুটে আসছিল নন্দকান্ত বায়েনের দিকে।কিন্তু তখন
নন্দকান্তর ঘাড়ে তার চিরদিনের সেই ঢোলটি ছিল না।কিন্তু এই গান নন্দকান্তর সমগ্র শরীরের পেশিতে কেমন এক উন্মাদনা এনে দিতে থাকে।তার ইচ্ছে করে ঢোল নিয়ে কুয়াশার ভেতর দিয়ে কোন এক গানের জুলুসে চলে যেতে।তারপর গানে গানে জীবনের মস্ত আখ্যান বয়ন করতে করতে জীবন মায়ায় কেবল কান্না আর কান্না বিছিয়ে দিয়ে একপর্বে মালতিগুরির চর অতিক্রম করে নন্দকান্ত বায়েন নেমে যেতে থাকেন নদী তোর্সার শীতল জলে।
আমরা জল ভাঙবার শব্দ শুনি।আর ভাঙা জলের সোতায় নন্দকান্তর ছায়া দুলতে থাকে।
এভাবেই জীবনের পর জীবন বাঁচে এই সব হাটপরিধী জুড়ে জুড়ে।আখ্যানের পর আখ্যানের পরিসরে তীব্র এক গঞ্জহাটের কোরাস!
   



রবিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া



২৪.

এই পৃথিবীর সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ হতে চলেছে ভবতারণ বাবুর।পেছনে পড়ে থাকবে একটা চার কুড়ি পঁচাশি দিনের মস্ত জীবন।তার বন্ধ চোখের ভেতর এখন হেমন্তের মাঠের ছায়া।অগ্রহায়ণের খড় বিচালির ঘ্রাণ। বেঁচে থাকতে থাকতে একটা আস্ত জীবন কিভাবে ফুরিয়ে যায়!সরকারবাবুর জোত জুড়ে সেই কবেকার একুশ মহিষের ভইসা গাড়ি।
গাড়ির নিচে কালি পড়া লন্ঠন দোলে। পরনকথার গল্প ভেসে যায় আঞ্চলিক নদীতে।
জমে ওঠে হেমন্তের গানবাড়ি_
"দোলার জল থই থই
আছে মাগুর সিঙ্গী কই"
এই নদী টদি বাথান টাথান খেত খামার মানুষজন বাড়ি টাড়ি ঘিরে জমে ওঠা মানুষের জীবনযাপন থেকে দীর্ঘ হাই তোলে মানুষের জীবন।
যে জীবন ঘিরে থাকে মরণ।
মৃত্যুর স্বাদ তো নিতেই হয় মানুষ কে।
ভবতারণ বাবু তার মস্ত এক জীবন থেকে চলে যাচ্ছেন।তিনি তার শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রম জটিলতার ফাঁকে ফাঁকে মাঠে মাঠে ছড়িয়ে থাকা গান শুনতে শুনতে নুতন এক লোকপৃথিবীর দিকে পা বাড়াচ্ছেন।
মরণের ভেতরের বিষাদ থেকে তখন ভেসে আসে গান_
"পানিয়া মরা যাবার না দেয়
কেমন করিয়া যাং"
ভবতারণ বাবু চলে যাচ্ছেন।
সঙ্গ থেকে সঙ্গহীনতার দিকে।
আলো আর অন্ধকারের কুহক থেকে নিঃসঙ্গতার উপর ঝুঁকে পড়ে ভবতারণ বাবুর আস্ত আয়ুষ্কাল।
এই যাওয়া রাজকীয়।
এই প্রস্থান মহামহিম হয়ে জেগে থাকে।নুতন নুতন গল্প দিয়ে ভরিয়ে তোলা লম্বা আখ্যানের মতন।
এই চলে যাওয়া চিরকালীন শুন্যতার জন্ম দিতে থাকে।আর সেই জন্ম মরণের ভিতর শিস দেয় হেমন্তের পাখিরা।
২৫.
ছত্রশালের সিথানে কালডোবার হাটে অঘ্রাণ সন্ধ্যায়
ভরা সভায় গান গাইতে শুরু করেন আলাউদ্দিন গিদাল। মানে সেই আখ্যান থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে আসা আলাউদ্দিন এম এল এ।সঙ্গে দোতরায় সঙ্গত করছে আব্দুল জব্বার।আলাউদ্দিন গান ধরেন আর মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দোতরায় ঝড় তোলেন জব্বার।জমায়েতে মানুষ ঢুকে পড়ে।জমায়েত থেকে বেরিয়ে যায় মানুষ।এই যাতায়াতের
মাঝখানে,মানুষের প্রবেশ প্রস্থানের ভেতর খুব নিবিড়তা নিয়ে কেবল জেগে থাকে গান।মাটির গান।মাটিতে বসবাস করা মানুষের জীবনযাপনের গান।আমরা শুনি গান উড়ে বেড়াচ্ছে,ঘুরে বেড়াচ্ছে_
"বাইরা খোলান তোর ঝিকি রে মিকি
ঘরে জ্বলে ঘিয়ের পঞ্চবাতি
সোনার চান রে"
গানের পর গান চলে।গানের ফাঁকে কত গল্প করেন আলাউদ্দিন সাব।কত কত কিসসা শোনান।
রাজার হাতি পার করানোর সেই রাজড়াঙার ঘাটের কথা বলেন।একাব্বর ঘাটোয়াল আর তার "শিমুল খুটার" সেই মস্ত বাহারি নৌকোর গল্প বলেন।
এভাবেই মানুষের ঘন হয়ে আসাটা বেশ টের পাওয়া যায়।জমায়েতে উড়ে বেড়াতে থাকে বিড়ির আগুন,হুকা টানবার শব্দ, কোলার ছাওয়ার ডুকুরি
ডুকুরি কান্দন।রাত বাড়তে থাকে।গ্রামদেশে শেয়ালের ডাক ভেসে আসে।গঙ্গাধরের বাতাসে শীত প্রগাঢ় হয়।আলাউদ্দিন এম এল এ আর গীদাল জব্বার খুব খুব ডুবে যেতে থাকেন গানেরই ভেতর_
"হস্তীর সনে মাহুতের পিরিতি
হস্তী ছাড়া মাহুত চলে কেমনে"

রবিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                                  


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া



২২.
যাতায়াতের রাস্তায় কত রকমের মানুষের সঙ্গেই যে দেখা হয়!অন্তহীন কথা হয়।গল্প হয়।সেই গল্প জুড়ে পুরোন কোন ধনীবাড়ির খোলানে ঘুরে বেড়ানো হাঁস মুরগী কইতরের দল যেমন থাকে তেমন থাকে পাকঘর,পুরোন খড়ম আর ঢেঁকি পাড়ের শব্দ।
গঙ্গাধরের পারের চর গুলি থেকে ধান নিয়ে যান জামালউদ্দিন ভাই।তার জোড়া মহিষের "ভইসা গাড়ি"।সন্ধ্যের শেয়াল দৌড়ে বেড়ায়।একটা মেটাফিজিকাল ডার্কনেস জড়ানো পৃথিবীতে গান বাজে,গান ঘুরে বেড়ায়_
"আরে নবরঙ্গের ময়না
ময়না না যান গৌরীপুরে রে"
আর জামালউদ্দিন ভাইয়ের "ভইসা গাড়ি"_র নিচে দুলতে থাকে ভুসো কালি মাখা লন্ঠন।
আমি কূপি আর লন্ঠন হারানো হাটগুলোর কথা ভাবতে থাকি।
তখন ঘোড়া জোতদারের টাড়িতে চুপচাপ মস্ত এক ছায়াশরীরের মত এগিয়ে আসতে থাকেন মহি গিদাল।রাত ঘন হতে থাকে। নিশি পংখী উড়াল দেয় গঙ্গাধর পেরিয়ে বুঝি নদী গদাধরের দিকে।
মহি গীদাল তার দোতরার কান মোচড়ান আর গানের ভিতর ডুবে যেতে থাকেন_
"ফুলবাড়ীত ফুলমালার বাড়ি
হাট করিতে যামো হামরা গরুর গাড়িত চড়ি"
আমি গল্পের শরীরে হাত রাখি।
এভাবে গঙ্গাধরের পারে পারে জীবনের পর জীবন বেশ গুছিয়ে রাখা থাকে,হেমন্ত মাঠে শুয়ে থাকা পাকা ধানের আটির মত!
২৩.
তখন মরা দুপুরের  প্রাক শীতের নরম রোদে ভিজতে ভিজতে এমএলএর হাট থেকে হাতি হারানো জোতদারের জোতের দিকে হেঁটে যেতে থাকে ইজাজ মাস্টার। পাটের শনের মতন তার দীর্ঘ পাকনা চুল দোল খেতে থাকে হাওয়ায় হাওয়ায়।চার কুড়ির এক জীবনে বাঁচতে বাঁচতে ইজাজ মাস্টার দূরাগত বাতাসের ভেতর ঢুকে পড়তে থাকে।তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় মস্ত এক স্মৃতির খামার।
ইজাজ মাস্টার আসলে বাইচ খেলার দক্ষ বাইচার।
বাইচ খেলায় ইজাজের নাও কখনো হারে না।এই পঞ্চাশ সত্তর গ্রাম গঞ্জে সবাই তাকে ইজাজ মাস্টার বলেই ডাকে।জানে।চেনে।
ইজাজ তখন হাতি হারানো নরকান্ত জোতদারের
আখ্যানগুলির মধ্যে ডুবে যেতে থাকে।ইজাজ তখন ১৫/১৬।রূপসীর জমিদারের চড়ক মেলায় ইজাজ তার নানার সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।নানাই তাকে প্রথম জোতদারকে চেনায়।দীর্ঘ মেদহীন পেশীবহুল সেই জোতদারের রাজকীয় ছবি সুরত আজও ইজাজের
স্মৃতিতে জীবন্ত হয়েই রয়ে গেছে।
তারপর সেই বড় বন্যার বছর "লক্ষীমালা" নামের সেই জোতদারের হাতিটি হারিয়ে গেলে সেই জোতদার "হাতি হারানো জোতদারের" কিংবদন্তিতে
ক্রমে রূপান্তরিত হয়ে যান।
এখন ইজাজ মাস্টার তার বেটার ঘরের বেটি, বেটির ঘরের বেটাকে সেই জোতদারের গল্প শোনান।
আর জোতদারটাড়ি জুড়ে উড়ে বেড়াতে থাকে বাইচের গানের কলি_
"ওরে হাউসের মেলা জোড়া খেলা
গঙ্গাধরের  কাছাড়ে
ওরে মাস্টার বেটার নাও ফাইনালে"


রবিবার, ২১ নভেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                    


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া



২০.
নদী গঙ্গাধরের ভাটিতে চন্দ্রকান্ত দেউনিয়ার জোত জুড়ে এই হেমন্তে হেউতি ধান কাটার মরসুম।ধান নিয়ে গো_মহিষের গাড়ি চলেছে কৃষকের ঘরে। এ দৃশ্যে উৎসব জড়িয়ে থাকে।জীবনের মায়া জড়িয়ে থাকে।বগা বগির দল উড়ে যাচ্ছে রতিয়াদহর দিকে,বালাজানের দিকে, বিষখোয়ার দিকে,আগমনীর দিকে,গোলকগঞ্জের দিকে,আগমনী পেরিয়ে রূপসীর দিকে।মাঠ মাঠ ধানের মাঝখান থেকে মেয়ে বউদের সমবেত গান ভেসে আসে_
"আজি কার বা বাড়ির ভোন্দা বিলাই
দুয়রত করিলেক হায় ম্যাও"
ধান কাটতে কাটতে কণ্ঠে গান আসে,শরীরে পুলক জাগে।আর শরীরের পেশিতে জেগে উঠতে থাকে নাচের মুদ্রা।বাদ্য থাকে না।বাজনা থাকে না।কিন্তু নাচ থাকে।নাচের সাথে জড়িয়ে থাকে গান।চিরকালের সব গান,যা জীবন নিংড়ে উঠে আসা_
"ধর তো দ্যাওরা ছাওয়াটাক
মুই বিলাইওক সাজা দেও"
জীবন বয়ে চলে এভাবেই।দুর দুরান্তরে ছড়িয়ে পড়া বগা_বগি একসময় ফিরে আসতে থাকে।হেমন্তের ধানের মাঠে তাদের ডানার শান্ত ছায়া বিছিয়ে পড়তে থাকে।
২১.
জীবনের গল্প কখনো শেষ হয় না।হাটপর্ব ফুরোয় না কখনো!আসলে হাট হারানো একটা জীবনের কথা ভাবতেই পারে না মানুষ।গঙ্গাধর নদীর উজান ভাটি জুড়ে কত কত মানুষের জমায়েত।আসা যাওয়া।জমায়েতের ভেতর সারি সারি সাজানো সব গল্পেরা।
এক গল্প শেষ না হতেই নুতন গল্পের শুরু হয়ে যায়।
গল্পে গল্পে মানুষ বাঁচে।মানুষকে আসলে বেঁচে থাকতে হয়।জন্ম জন্ম জুড়েই।
আমরা আবার দেখি হেমন্তের ম্যাজিক জমে থাকা মাঠে আবার বাওকুমটা বাতাস।বগা_বগির হাহাকার মিশে থাকা কান্নার সুর।
আর মাঠের সিথানে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকা আবহমান কালের জোড়া মহিষ।ময়কান্ত ব্যাপারী।
আর গুয়া পানের মৌতাতে গান গাইতে থাকেন ফুলেশ্বরী আবো_
"ধান কাটে ধানুয়া ভাইয়া রে
ছাড়িয়া কাটে ওরে নাড়া
সেই মতন মানুষের দেহা
পবন গেইলে ওরে মরা জীবন রে"

রবিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                     


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়



১৮.
কবেকার কোন এক হেমন্তের হাটে হেমকান্ত দেখে ফেলেছিলেন সেই জোড়া কৈতর। আর হাটে ঢুকে পড়া মেয়েরা তাদের শরীরে নাচ নিয়ে শুরু করেছিল গান_
"আরে নবরঙ্গের ময়না
ময়না না যান গৌরীপুরে রে"
নাচের পর নাচ গানের পর গান চলে,চলতেই থাকে
হেমন্ত জুড়ে।মাঠে মাঠে সোনার ধান।
মানুষের ঘরবাড়ি থেকে দৈনন্দিন কথা বার্তা ভেসে।
হিমে ভেজে খোলানের নিঃসঙ্গ আখা।
দূরে কোথাও আগুন জ্বলে ওঠে।
আগুন ঘিরে মানুষের ছায়া আবছায়া।
আল ও আলি দিয়ে দৌড়ে পালায় হেমন্তের ছাইবর্ন শৃগাল।
রহস্যময় মনে হয়,মনে হতে থাকে দূরে কাছের গ্রামদেশ।
মস্ত চাঁদ ওঠে। জোড়াদিঘির জলে চাঁদ আর সুপুরি গাছের ছায়া।
কোথাও পুঁথি পড়া হয়।
আর গান জেগে ওঠে_
"বাপরে বাপ কি জাড়
মাওরে মাও কি জাড়
জাড়ত কাপে দেখং এল্যা
দিন দুখির সংসার"
এভাবে জীবন সেজে ওঠে।জীবন প্রবাহিত হয়।
জন্ম আর মরণের ঘোর জাগিয়ে রেখে
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন হেমকান্ত।
আর হেমন্তের মাঠে খেতে হাহাকারের মতন ছুটে
যায় গান_
ওরে মানুষের দেহা
পবন গেইলে হবে মরা"
১৯.
হেউতি ধান,পাখির পালক,শেষ হেমন্তের নদী,ধান নিয়ে ঘরে ফেরা কৃষক,নির্জন কলাগাছের পাতা_এই সব দৃশ্যের মায়া আর ম্যাজিক কেমন নিরিবিলি করে দেয়।
এই সব আসলে চিরকালীন,আবহমান।
যেভাবে জীবনের পর জীবন মানুষ বাঁচে,মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।
পুরোন মানুষ হারিয়ে যায় এই মর পৃথিবী থেকে।
নুতন মানুষ বেঁচে থাকাটাকে ছুঁয়ে থাকে।
জন্ম জন্ম জুড়ে এ এক ধারাবাহিক পক্রিয়া।
ছয় নদী আর নয় ফরেস্ট জুড়ে জুড়ে গল্প নির্মিত কিংবা বিনির্মিত হতে থাকে।শিমুল গাছের শরীরে নখের আচড় রেখে আসে চিতাবাঘ।
হাতির পাল নেমে আসে উত্তরের ধানবনে।
নদীর শিথানে খুব নির্জন হয়ে বসে থাকে সেই আবহমান কালের বগা বগি।
এই জীবন তো আদতে এক ফাঁদ।
আমরা সবাই "ফান্দে পড়িয়া কান্দি"!
আর কার্তিকের কুয়াশায় ভেসে আসে গান_
"চাষার মুখত আর
নাইরে সেই গান"।
জীবনের অদ্ভুত এক মায়া আছে।দূরাগত হাওয়ায় বুঝি জীবনেরই ঘ্রাণ ভেসে আসে!কত কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়।গল্প হয়।মানুষের জীবন জুড়ে না ফুরোন কত গল্প।রতিকান্ত পাইকারের গল্পে কখন বুঝি মিশে যেতে থাকে হাতি জোতদারের হলুদ খামারবাড়ি।আমি নদী পেরিয়ে,চরের পর চর পেরিয়ে হেঁটে যেতে থাকি এরাজ ধনীর জোতে।এইসব আসা যাওয়ার মাঝখানে ছায়া ফেলে জোনাকির আলো। কোথাও দোতরা বেজে ওঠে।দেহতত্ত্বের গান উঠে আসে আর ঘুরে বেড়াতে থাকে টাড়ি বাড়ি নদী উপত্যকা জুড়ে।
এভাবেই জীবন কিভাবে বুঝি উদযাপন হয়ে ওঠে!


রবিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                         


     

গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া
সুবীর সরকার

১৭.
ইয়াকুব ব্যাপারীর সঙ্গে আবার আমাদের দেখা হয়ে যায় ঘুঘুডাঙার হাটে।তখন মধ্য দুপুর।ভরা হাটের
গুমগুম শব্দ।ইয়াকুব গরুহাটির পাশে ঝাঁকড়া শিমুল গাছের নিচে ভবেন বৈরাগীর গান শুনছিল।ভবেনের গায়কখ্যাতি তিরিশ চল্লিশ গঞ্জ হাটে কিংবদন্তির মত।গৌরীপুরের লালজি রাজা তার গান.

ভালোবাসে।প্রতিমা বাইদর দলেও একসময় দোতরা
বাজাতো সে।
হাটে হাটে গান গেয়ে গেয়েই জীবন কাটিয়ে দিল ভবেন বৈরাগী।
ইয়াকুব আজ বায়না করেছিল দেহতত্ত্ব মনশিক্ষার
গানের।
আমরা যখন ইয়াকুবকে ভরা হাটের পাশে ঝাঁকড়া শিমুল বৃক্ষের নিচে আবিষ্কার করি,তখন সে ভবেনের
গানে উদ্বেল_
"ওরে টাকা পয়সা ভিটা বাড়ি
জীবন গেইলে সব রইবে পড়ি
সঙ্গের সাথী তোর কেউ তো হবে না"
গান শুনতে শুনতে ইয়াকুবের চোখ ভিজে যাচ্ছিল চোখের জলে।
সে কি দূরাগত হাওয়ায় মৃত্যুর ঘ্রাণ পেয়েছিল!
জন্ম কিংবা মরন নিয়ে কোন দার্শনিকতা তাকে আক্রান্ত করেছিল!
সমাধানহীন এই প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে গান কিন্তু বেজেই চলছিল_
"আরে হাতি মার্কা কেরাসিন তেল
কায় বা আইনছেন দ্যাশতে
বাপরে বাপ 
মাওরে মাও
আজি মোর গাও ঝনঝন করে রে"
১৮.
গঙ্গাধরের উজানে মাইল মাইল হাঁটতে হাঁটতে একসময় দাড়িয়েই পড়তে হয় বিমল মালিকে।
সে মুখ ফিরিয়ে পেছনে শীতের নদীকে দেখে।বিমলের কাধে ঢোল।গোয়ালপাড়ার কাঠি ঢোল।
এই ঢোলের জাদুতে অন্তহীন গানবাড়ির মানুষেরা উদ্বেল হয়ে ওঠে। বিমল মালির ঢোল কথা বলে।মানুষের দৈনন্দিন যাপন গানে আর ঢোলে ছড়িয়ে পড়ে দিক ও দিগরের দিকে।
"রাজার বেটির" দলে কত কত বছর জুড়ে বেজে চলেছে বিমল মালির জাদু ঢোল।
গত রাতে বিমল গিয়েছিল সিতানন্দ বুড়ার বাড়ি।
সীতানন্দর সারিন্দা আর বিমলের ঢোল_প্রায় সারারাত চলেছিল তাদের আসর।এমন আসর প্রায়ই বসে তাদের।সঙ্গে "চাওলা" আর "নাসিরউদ্দিন বিড়ি"।
গান চলে।গান থামে।
দুঃখ সুখের কথা হয়।দেশ গ্রামের কথা হয়।
এভাবে মত্ততা জাগে।স্মৃতিকন্দর থেকে ভুস করে জেগে ওঠে গানের কলি_
"বুড়া মাছ মারে রে
গঙ্গাধরের পারে
মাছ মারিতে মাছ মারিতে
বুড়াক নিল চিলে"
অন্যমনস্কতার ঘোর থেকে একসময় বেরিয়ে আসে
বিমল মালি।তারপর সে আবার হাটতে থাকে
গঙ্গাধরের উজানে।
এভাবে কত গল্প জমে ওঠে আমাদের এই চারপাশের পৃথিবীতে।

রবিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২১

সুবীর সরকার

                



গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া
সুবীর সরকার

১৫.
"গঙ্গাধরের পারে পারে রে
কাশিয়া ঝোপা ঝোপা
তারি তলে সোনার বন্ধু ডাঙায় দোতরা"

বিকেল আর সন্ধ্যের ফাঁকে এই গান গাইতে গাইতে নদী গঙ্গাধরের বিস্তীর্ণ চরের উপর দিয়ে হাঁটতে থাকেন বসন্ত মালি।বসন্তের কাঁধে মস্ত এক ঢোল। কাঠি ঢোল।এই জনপদের সকলেই এই ঢোল আর ঢোল কাঁধে হেঁটে যাওয়া বসন্ত মালিকে প্রায় সমার্থক ভাবেন।প্রায় তিন কুড়ি বছর জুড়ে এই ভূগোল পরিধী জুড়ে ঢোল নিয়েই কাটিয়ে দিলেন।তার ঢোল কথা বলে।গানের জুলুস জুড়ে এক তীব্র মাদকতা নির্মিত করতে থাকে বসন্তের ঢোল।
আজ বসন্ত যাচ্ছে কইমারির চরে।সেখানে "রাজার বেটির" গানের আসর।সারারাত ধরেই গানের জলসা চলে এই অঞ্চলে। গানবাড়ি জুড়ে মস্ত মেলা বসে যায়।আবার গান শুনে গঞ্জ গ্রামের বউ বিটিদের চোখ ভিজে যায়।আবার গানের মাঝে শরীরে পুলক জাগিয়ে দু চার পাক নেচেই ওঠেন শশীকান্ত,তারামোহন,চন্দ্রধরেরা।গান বুঝি তাদের জীবনের মস্ত উৎসব!অদ্ভুত যৌথতায় বেঁচে থাকা।
বসন্ত মালি যেমন ছাড়তে পারলেন না এই গানের মায়া।গান আর ঢোল তার জীবনকে কিভাবে পাল্টে দিল!
পুরোন দিনের স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে বসন্ত গঙ্গাধরের চর পেরোতে থাকে।স্মৃতি তাকে বিমনা করে।এত সবের মাঝে প্রায় সন্ধ্যের রহস্যময় পরিসর জুড়ে বসন্ত তার চোখের মায়াজল সামলাতে না পেরে পুনর্বার গেয়ে ওঠে গান_
"এপার থাকি না যায় দেখা রে
নদীর ওই পরের কিনার"
১৬.
জীবন খুব সুন্দর।জীবন আশ্চর্যরকম সুন্দর।ভরা সভায় যখন বসন্ত মালি ঢোল বাজায়, ঢোলে ঝড় তোলেন তখন জীবনের প্রতি মায়া বেড়ে যায়।
গঙ্গাধরের চর অতিক্রম করতে করতে কিংবা কইমারীর চরে প্রবেশ করতে করতে বসন্তের একটা প্রস্থানভূমির কথা মনে পড়ে যায়।কার্তিকের চর জুড়ে তখন দুধের সরের মতন হালকা কুয়াশায় পর্দা।আকাশে কুয়াশা মাখা অনবদ্য চাঁদ।বসন্তের অন্যমনস্কতা কাটে না! সে বুঝি অন্যমনস্কতার মধ্যে আবার গান টেনে এনে তার শরীরের পেশিসমগ্রতায়
কিরকম দূরাগত হয়ে পড়তে থাকে।আর চরের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে পরে গানের সুর_
"হামার দ্যাশত বড় বাঘের ভয়
রে সোনা রায়"
জীবনের পর জীবন এভাবেই বাঁচা। বেচেঁ থাকা।
জীবন আদর করে।জীবন নিয়ে যায় ভরা হেমন্তের খেত মাঠে শূন্যতায়।বসন্ত প্রবেশ করেন কইমারির
চরে।আর এই প্রবেশের অনুষঙ্গে অন্তরীক্ষে ঘুরে বেড়ায়,উড়ে বেড়ায় গান_
"তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে
আদর করিবে কায় জীবন রে"


শনিবার, ৯ অক্টোবর, ২০২১

সুবীর সরকার

            


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


১৩.
তামারহাটের ভেঙে যাওয়া হাটের বাইরে আসতে আসতে সিকান্দার মিস্তিরি তার ঝাঁকড়া চুল নাড়াতে নাড়াতে বেশ মজাদার এক ভঙ্গি তার দীঘল শরীরে বহন করে আনতে থাকে আর কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক হয়েই গানের দু এক কলি কিংবা গেয়েই ওঠে_
"ও কি মাহুত রে
মোক ছাড়িয়া কেমনে যাইবেন
তোমরা হস্তির শিকারে"
এই গানের হাহাকারের মতন সুর বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দ্রুত লয়ে।গঞ্জ বাজার খেত খামার আর মানুষের ঘরবাড়ি পেরিয়ে এই গান তার সুরসমেত মিশে যেতে থাকে গঙ্গাধর নদীর মস্ত বালার চরে।
সিকান্দারের চোখ ভিজে ওঠে।এই জীবন এই জীবন মায়া নিয়েই তো আবহমান বেঁচে থাকা মানুষের।
সিকান্দার হাঁটতেই থাকে।লিলুয়া বাতাসে দোল খায় সিকান্দারের মাথার বাবরি চুল।
ফাঁকা প্রান্তরে সে আচমকা দু তিন পাক নেচেই ওঠে আর ঝুঁকে পড়ে নুতন গানের ওপর_
"বিনা বাতাসে ভাসা
ঢোলে রে"
সিকান্দার সিকান্দার হয়েই থেকে যায়।দূরে ক্রমে আবছা হয়ে আসে তামারহাটের ভরসন্ধ্যাবেলা।
১৪.
গঙ্গাধরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সিকান্দার মিস্তিরির
শরীরের পুলক সহসা ভেঙে যায়।তার প্রাচীন কালের কালো পাথরের মত কপালে গভীর ভাঁজ পড়ে। সে কি তবে কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়!
সিকান্দার আসলে নৌকো বানানোর দক্ষ এক কারিগর।আর এই জল ও জলার দেশে ধনী বল জোতদার বল জমিদার বলো বা গৌরীপুরের রাজাই বলো,নৌকো বানাবার কাজে প্রায় সারা বছরই ডাক পড়ে সিকান্দারের।প্রায় পঞ্চাশ বছর জুড়ে এই কাজ করে চলেছে সে।এই জনপদ তাকে সিকান্দার    মিস্তিরি বলেই জানে।চেনে।একসময় সিকান্দার কালু বয়াতির দলে সারিন্দা বাজাতো।তার সারিন্দা কত কত ভরযুবতী নারীকে উন্মনা করেছে!কত নারীকে এক সংসার থেকে অন্য সংসারে ঠেলে দিয়েছে!কত চেংড়া কে বাউদিয়া করেছে!তার কোন ঠায় ঠিকানা নাই।
তাকে দেখলে এখনও কত মানুষ মজা করে গেয়ে ওঠে_
"কি ডাং ডাঙ্গালু বাপই রে
নাঠির গুতা দিয়া"
তবে কি সিকান্দার তার সারিন্দার জীবনের কথা ভাবছিল!না কি গয়েশ্বর ধনীর জোতজমি আর বাইচের নাও তাকে আরো আরো এক ভাবনার জটিলতায় ঠেলে দিচ্ছিল!

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                    


শিরোনামহীন


১.
শালি ধানের চিড়ার লোভে এই গঞ্জদেশে এসেছি
বিন্নি ধানের খই ছড়িয়ে পাখিদের ডেকে আনছি
আলপথ আর ঝাড় ঝোপে পড়ে থাকছে এন্টি এজিং
                                                            ক্রিম
২.
পুরোন ছবিতে সেই কবেকার রোদ ও হাওয়া
মানুষের ঘুম কমে গেলে 
মানুষের কান্না শুকিয়ে গেলে
পাখি আর বেড়ালের খুব খিদে পায়
মাঠে মাঠে নেমে আসে আস্ত একটা টাউন
                                                      ক্লাব
৩.
নারীর চোখে ছায়া ঘনিয়ে এলে
আঙুল থেকে আংটি খসে গেলে
হাত থেকে হাতঘড়ি খুলে গেলে
পরিচালক মন দিয়ে চিত্রনাট্য লিখতে শুরু 
                                                        করেন
 
সমস্ত রাত জুড়ে নৌকোডুবির গল্প।
গল্পে পাশ ফেরা নদীর হাহাকার।
কপালে চুল উড়ে এলে
অনেকেই তুলি দিয়ে আঁকতে শুরু করেন
                                                          ভুরু










 

শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সুবীর সরকার

                            


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া ( ষষ্ঠ পর্বের পর)
সুবীর সরকার 


৭.
এত এত হাট,এত এত গঞ্জ,এত এত নদীপরিধির ভেতর মানুষের বেঁচে থাকা।বেঁচে থাকতে থাকতে আবহমান এক জীবনকে বারবার পাল্টে পাল্টে দিতে থাকা।ইয়াকুব মহিউদ্দিন লোকমান সাজু চোরা আরো কত বর্ণময় আর বিচিত্র মানুষের সমাবেশ দিয়ে সেজে ওঠে গঞ্জহাটের এক চিরকালের ভুবনজোত।
এক হাট থেকে মানুষকে চলে যেতে হয় অন্য কোন হাটে।নুতন নুতন হাটে।নয় ফরেস্ট আর কুড়ি নদীর দুনিয়ায় কত যে হাট!
ইয়াকুব একবার পানবাড়ি হাটে গিয়ে ফেরার পথে পথ ভুলে গিয়েছিল।তাকে কি তবে ভুলায় ধরেছিল!
বগরিবাড়ির যতীন ডাকাতের সাথে দেখা হবার পর পরেই ইয়াকুব যতীন কে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল চিকন চিড়ার হাটখন্ডের দিকে।সেখানে বসে দই চিড়া খেতে খেতে যতীন তার ডাকাতিয়া জীবনের রোমহর্ষক সব গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছিল।
লালজি রাজার ভাই প্রণবেশ সাহেবের সামনেই তো একবার ব্রহ্মপুত্রে জেগে ওঠা নয়া চরে চরদখলের লাঠালাঠিতে কি এক ভয়ানক লড়াই!সেবার মাথা ফেটেছিল যতীনের।
যতীনের ডাকাতিতে হাতখড়ি হয়েছিল বিজনির হামিদ মিদ্দার কাছে।তিরিশ বছর ডাকাতির জীবনে একবারই যতীনকে থমকে যেতে হয়েছিল!তার চোখ কান্নায় ভিজে গিয়েছিল!এবং এই প্রথমবার পুলিশের হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিল সে।
সেবার ডাকাতি করতে গিয়েছিল যতীন রূপসীর নন্দ ধনীর বাড়িতে।খবর ছিল তামাক বিক্রির প্রায় তিন লক্ষ টাকা ধনীর বাড়িতেই রাখা আছে।আছে প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার।ধনসম্পত্তি।
মধ্যরাতে দল নিয়ে যতীন হানা দিয়েছিল নন্দ ধনীর বাসায়।তারপর সে এক ধুন্ধুমার মারি ফেলা কান্ড!
হঠাৎ নন্দ ধনীর বছর পাঁচ বয়সী বাচ্চা ছেলে যতীনের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিতে এলে যতীন আত্মরক্ষার জন্য বন্দুক চালিয়ে দেয়।
চোখের সামনে ছটফট করতে করতে সেই বাচ্চাটির মৃত্যু যতীনকে হতভম্ব করে দেয়।
তারপর সব ইতিহাস।জেল থেকে বেরিয়ে যতীন ডাকাতি ছেড়ে দেয়।যোগ দেয় কুষাণ গানের দলে।
দোয়ারির ভূমিকায়।মাঝে মাঝে কীর্তন করে বেড়ায়।
আর ইচ্ছে মত দোতরা কাঁধে ঘুরে বেড়ায় কোন কোন হাটে।দাতের মাজন,হজমি গুলি,কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করে আর গান করে ফাঁকে ফাঁকে।
আর দেখা হলেই চেনা বা অচেনা লোকজনকে শোনাতে থাকে ডাকাতিয়া জীবনের নানান গল্পকথা।
জীবন কি অদ্ভুত!
ঘোর লাগা দুই চোখ জাগিয়ে রেখে যতীন বিড়বিড় করে গান তোলে_
"এপার থাকি না যায় দেখা রে
নদীর ওই পারের কিনার"
৮.
ইউসুফ মোল্লার বেশ মনে পড়ে শালমারার বড় বালার চরে বড় রাজকুমারীর গান নিয়ে নাচ নিয়ে বাদ্য বাজনা নিয়ে এক শীতের রাতে জমিয়ে তোলা গানবাড়ির কথা।ইউসুফ মোল্লা তখন সদ্য যুবক।পালতোলা নৌকোর দুরন্ত মাঝি।ব্রহ্মপুত্র শাসন করে সে।পণ্য পৌঁছে দেয় বন্দরে বন্দরে।আর নেশা বলতে গানবাড়িতে ঘুরে ঘুরে গান শোনা।
তখন রাজবহাদুর প্রভাত বড়ুয়া বেঁচে।
শিকারে যান মস্ত দাঁতাল হাতি জংবাহাদুরের পিঠে চড়ে।বড় রাজকুমারী আর ছোট রাজকুমারী তখন গঞ্জ গা হাট ঘুরে ঘুরে গান,নাচ, শোলোক খুঁজে বেড়াচ্ছেন।নিজেরাও নাচছেন।গাইছেন।
বালাবাড়ির চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে সেই সব গান।যা চিরকালীন।যা ভরভরন্ত জীবনের কথা বলে_
"কালা বাইগণ ধওলা রে
বাইগণের গোড়ায় কাটা"
এক হাট থেকে বেরিয়ে নুতন এক হাটে প্রবেশ করতে গিয়ে এই চার কুড়ি পেরিয়ে আসা জীবনে বারবার ইউসুফ মোল্লার মনে পড়ে সেই সব সোনার বরণ পাখির মতন দিনগুলির কথা।
হায়রে,কত তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে আসে মানুষের জীবনে!জলে ভিজে ওঠে ইউসুফের চোখ। সে দেখতে পায় "টলমল টলমল কচুপাতের পানি"।
ঠিক এখানেই একটা গল্প শেষ হয়ে যায়,নুতন এক শুরুর অপেক্ষায়!


রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

সুবীর সরকার

                           


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া
সুবীর সরকার


৫.
সব হাট কি একরকম!সোমবারের হাটের ভেতর কি খুঁজে পাওয়া যাবে বুধবারের হাট! তামারহাটের রঙের সাথে কি পুরোপুরি মিল থাকা সম্ভব রতিয়াদহ
হাটের!ছত্রশালের হাটের পাখিদের কি দেখা মেলে পানবাড়ির কোন এক শনিবারের হাটে!
সব হাট একরকম হয় না।সব গান একরকম হয় না।
সব গঞ্জ আর গাঙ একরকমের হতে পারে না।
প্রবেশ আর প্রস্থান দিয়ে এক একটি হাটপর্ব রচিত হতে থাকে।আর লোকমান পাগলার হাটে ধুলোর ঝড়সমেত ঢুকে পড়ে জোড়া মহিষ।গদাধর নদীর কোন বা চর থেকে বাথান ভেঙে এরা বুঝি চলে এসেছে এই হাটে ভেতরে।সমস্ত হাট জুড়ে একটা হুড়াহুড়ি লেগে যায়।মানুষের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ।তখন কোথায় ইয়াকুব ব্যাপারী কোথায় মহিউদ্দিন ওস্তাদ কোথায় লোকমান!ভরা হাটের কোলাহল থেকে সরে আসতে আসতে ময়কান্ত মৈশাল তখন খুঁজতে শুরু করে বাথান পালানো সেই জোড়া মহিষদের।তার হাতে দীর্ঘ পেন্টি।মাথা গামছা দিয়ে পাগড়ির মত করে বাঁধা।প্রায় তিন কুড়ির পেশীবহুল সুঠাম শরীরের পেশীগুলো একত্রিত করে 
ময়কান্ত তার কণ্ঠে তুলে আনেন মহিষের কণ্ঠের আকুতি।এই ডাক শুনে সেই জোড়া মহিষ কেমন থমকে দাঁড়ায়।তাদের বড় বড় চোখে কেমন মেঘের ছায়া!একটু বাদের দেখা যাবে সেই জোড়া মহিষ অদ্ভুত আহ্লাদ নিয়ে হেলে দুলে ময়কান্তর পিছনে পিছনে সেই বাথানের পথ ধরে ফেলেছে।গদাধর নদীর কোন বা চরের খুব অন্দর থেকে ভেসে আসছে 
হাহাকার ভরা গানের সুর_
"আরে ও  মৈষের  দফাদার ভাই
ডালা সাজাও ডালা সাজাও
চল মৈষের বাথানে যাই রে"
ময়কান্ত তার জোড়া মহিষ নিয়ে বাথানে চলে যেতে থাকে।কিন্তু হাট ভেঙে যায়।
৬.
ইয়াকুব ব্যাপারী মহিউদ্দিন ওস্তাদ লোকমান পাগেলাকে ভুলে গিয়ে আপাতত আমরা ঢুকে পড়তেই পারি বালাজানের হাটে।গঙ্গাধরের বাতাসে নদীর বালু উড়ে আসছে হাটের মস্ত খোলের ভেতর।শরীর ভরতি বালুকণা মেখে গরুহাটির উত্তর শিথানে
চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে সাজু  চোরা।না,সাজু চোর নয়।তার নাম সাজু মোহাম্মদ। হাটে হাটে গরুর দালালি করে বেড়ায়।আর "চোর চুন্নি" পালাগানে
সাজু চোরের ভূমিকায় অভিনয় করে।তার শরীরের পরতে পরতে তীব্র এক নাচের ছন্দ লুকিয়ে আছে।সাজু চোরার পালা দেখার জন্য মানুষ হামলে পড়ে গানবাড়িতে।সাজু মোহাম্মদকে এখন আর কেউ চেনে না।সবাই সাজু চোরাকে একনামে চেনে।সাজু যখন নেচে নেচে শরীরে অদ্ভুত পাক দিতে দিতে গেয়ে ওঠে_
"ও কি হায়রে হায়
আজি মনটায় মোর পিঠা খাবার চায়"
তখন সমগ্র গানবাড়ি জুড়ে কি এক উন্মাদনা!
সাজু চোরা ছিল গানমাস্টার মঈনুদ্দিন এর শিষ্য।
মঈনউদ্দিন আবার ছিল আলাউদ্দিন এমেলের সাকরেদ।সারাজীবন এই গান,এই নাচ,রাতের পর রাত গানবাড়ি নিয়েই জীবন কাটে সাজু চোরার।
গরুর দালাল সাজু চোরা গরুহাটির ভেতর দাঁড়িয়ে 
কি ভাবছিল!রহস্যমোড়া গানবাড়ির কথা।নাকি সওদাপাতি নিয়ে বাড়ি ফিরবার কথা!তার শরীর জুড়ে নাচের ছন্দ ক্রিয়াশীল থাকে আর হাটের অন্ত মধ্যে সাজু ছড়িয়ে দিতে থাকে গুনগুন সুরের কোন এক গান,যা দূরাগত হওয়ার ডানায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে সমস্ত হাটের পরিসরে_
"ওরে ফুলবাড়ীত ফুলমালার বাড়ি
হাট করিতে যামো হামরা গরুর গাড়িত চড়ি"
এইভাবে পুরোন হাটপর্ব শেষ হয়ে যায়।নুতন নুতন হাটগুলোর হাট হয়ে উঠবার জন্যই হয়তো বা!

          



ক্রমশঃ
(চিত্রঋণ- সুবীর সরকার)

শনিবার, ২১ আগস্ট, ২০২১

সুবীর সরকার

                              


গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া ( দ্বিতীয় পর্বের পর)

৩.
ইয়াকুব ব্যাপারী আর মহিউদ্দিন ওস্তাদের দেখা হয়।হয়তো দৃষ্টি বিনিময় হয় তাদের।কিন্তু কোন কথা হয় না।হাট তখন কেন্দ্রচ্যুত হয়ে টুকরো টুকরো ভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।হাটের মধ্যে জেগে ওঠে কত কত রকমের হাট।ইয়াকুব চলে যায় তামাকহাটির দিকে।আর মহিউদ্দিন ধানহাটির গহিনে মিলিয়ে যেতে থাকেন।আমরা ঠিক তখন দেখে ফেলি আসারিকান্দির লোকমান পাগেলা কে। সে তখন মাথায় গামছার পাগড়ি বেন্ধে চুপচাপ বসে আসে গিয়াস হেকিমের হেকিমি ওষুধ বিক্রির জমায়েতে।আসলে ওষুধ নয়।তার আগ্রহ গিয়াস হেকিমের ওষুধ বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে দুলে দুলে গান করবার প্রতি।
আশেপাশের বিশ তিরিশ হাটে আজ প্রায় তিন কুড়ি বছর ধরে এভাবেই গান আর হেকিমী ওষুধ নিয়েই ছুটে চলেছেন গিয়াস হেকিম।এর আগে তার বাপের সাথে,তার বাপ আবার তার বাপের সাথে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন হাটে হাটে।গিয়াস হেকিম আর তার গান আর তার শিকড় বাকর ছাল বাকলার ওষধি সামগ্রী নিয়ে এক রঙ্গিলা জীবনের ভেতর কাটিয়ে যাচ্ছেন তার আয়ুষ্কাল।আমরা দেখতে পাই গিয়াস হেকিম
তার বাবরি ছাটা চুল দোলাতে দোলাতে গাইছেন_
"ছাড়িবার না পাং 
এই গানের মায়া"
গানের পর গান চলতে থাকে।গান থামে।কিছু কথা তথা হয়।ওষুধের গুণকীর্তন হয়।মজা গুয়া পান বিড়ি  তামাকু সেবন হয়।হাসি মস্করা হয়।লোকমান পাগেলা
শরীরের আড়মোড়া ভেঙে তার পেশিসমগ্রে একটা মত্ততা বইয়ে দিতে দিতে একটা নাচের তীব্রতা ক্রমে নির্মিত করতে থাকেন।গিয়াস হেকিম তখন দোতরা বাজিয়ে গাইছেন_
"গান গান করিয়া সর্বনাশ
তবু না মেটে গানের হাউস "
এইভাবে হাটের মধ্যে জেগে ওঠে নুতন এক হাট।
৪.
আর একসময় প্রসঙ্গ হারিয়ে কিরকম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে থাকে লোকমান।লোকমান পাগেলা।চরে চরে বালাবাড়ির কাশিয়ার ঝোপে ঝোপে হাটগঞ্জের মস্ত পরিধির ভেতর ডুবে যেতে যেতে কত কত পুরাতন আর নুতন গল্প সে তুলে আনে।সাজিয়ে দেয়।ছড়িয়ে দেয়। হাটে হাটে লোকমান হাটুয়া পাইকার ব্যাপারীদের শোনায় সেই সব গল্প।মানুষ ভালোবেসে তাকে পাগেলা বলে ডাকে।লোকমানের বাবা নইমুদ্দিন ছিল পান গুয়ার দোকানি।গোলকগঞ্জের আর আসারিকান্দির হাটে সপ্তাহে তিন দিন তার দোকানদারি।বাকি চারদিন সে বিবাগী।কখনো গৌরীপুরের বড় রাজকুমারীর বেটা মৃণাল বড়ুয়ার সাথে গানবাড়িতে,কখনো লালজি রাজার হাতি ধরার ফান্দিদের দলে মিশে যাওয়া,কখনো আসগর বয়াতির পালাটিয়ার দলে ঢোল বাজানোর কাজে ডুব দেওয়া।এইভাবেই একটা জীবন কখন কিভাবে বুঝি ফুরিয়ে গেল।নইমুদ্দিনের ইন্তেকালের পর প্রায় হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল তার জানাজায়।এসেছিলেন লালজি রাজা।রঘুনাথ মাহুত।বয়ান শেখ।
আজও,মরণের প্রায় চল্লিশ বছর পরেও মানুষের স্মৃতিতে খুব খুব বেঁচে আছেন নইমুদিন।লোকমানের রক্তেও বাপের রক্তের ধারা। পীরনানার জীন।
ঘুরে ঘুরে জীবন দেখার জীবন লোকমানের।গানের জীবন।নাচের জীবন।বাদ্য বাজনার জীবন।চিরকালের সব মানুষের গল্পের জীবন।আসলে মানুষ তো গল্প জড়িয়েই বেঁচে থাকতে চায়।
হাটের জমে ওঠা কিংবা ভাঙা হাটের স্তব্ধতার ভিতর লোকমান গতিয়েই দেয় না ফুরোন গল্পের ভাড়ার।
টোকন ব্যাপারী আর তার মত্ত হাতি জংবহাদুরের গল্পকে ভরা হাটে ডুবিয়ে দিয়ে লোকমান একমনে গুনগুন করে_
"ওরে কামাই কাজে যেমন তেমন
মানুষ মারার যম"
হাট এভাবেই লোকমান পাগেলার হাটে রূপান্তরিত হয়ে যেতে থাকে।

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

সুবীর সরকার

                             


  
গৌরীপুরের পান আর গোলকগঞ্জের গুয়া


 

আর সেই নদী গঙ্গাধরের চরে চরে হাঁটতে হাঁটতে কত কত ভাবনাই যে ভাবতে হয়!ভাবনা স্থির থাকে না।সে একরকমভাবে শুরু হয়।আর গতিপথ বদলাতে বদলাতে চিরনুতনের দিকে চলে যেতে থাকে।ইয়াকুব ব্যাপারীর দুই চোখে আকাশের নীল ছায়া ফেলে।বালুবাড়ি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াকুব খুব পুরোন কোন এককালে শোনা একটা গানকে নিজের খুব গহিনে টেনে নিতে থাকে_

‘মন মোর কান্দেরে

গঙ্গাধরের ওই ভাঙনি রে দেখিয়া’

এই গান থেকে কি তীব্র এক বাইস্যাকালের ছবি উঠে আসে।নদীপাড়ের মানুষের যাপনের দুঃখ,যন্ত্রণার ছবি ক্রমে বিচুর্ণ হয়ে উঠতে থাকলে ইয়াকুব ব্যাপারির মনে পরে ছত্রশালের হাটে আলাউদ্দিন এমেলের ভোটের জুলুসের কথা!সে এক মজার নির্বাচনী সভা।ইয়াকুব ভাবে,এ কেমন ভোটের মিটিং!কেননা আলাউদ্দিন এমেলের মিটিঙে তো কোন ভাষণ থাকে না।বাইরে থেকে আসা কোন নেতার ঘর তো সেই সভায় থাকে না!থাকে খালি গান আর গান।ঢোল আর বাঁশি।আলাউদ্দিন মাস্টার নাকি আলাউদ্দিন এমেলে নাকি আলাউদ্দিন গিদাল হাতে দোতরা নিয়ে;দোতরা বাজাতে বাজাতে কোমরে নাচ নিয়ে গাইতে থাকেন গানের পর গান।লোকগান।মাটি ছুঁয়ে বেঁচেবর্তে থাকা সহজ সরল মানুষের প্রানের গান।জীবনের গান।মানুষ ঘিরে ধরে এক ভোটের নাকি গানের মিটিং!আর ভোটের পরে দেখা যায় আলাউদ্দিন এমেলে এক্কেবারেই পাশ।কি আজব কিসিমের মানুষ ছিলেন এই আলাউদ্দিন মাস্টার!সারাজীবন লোকগান আর মানুষের ছায়ায় ছায়ায় কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি তার জীবন।লিখেছেন গানের পর গান।গঙ্গাধরের চর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াকুব আচমকা উদাস হয়ে যান।তার চোখ জুড়ে জলের মত কিছু একটা বুঝি আসতে চায়!আর চরের উত্তর শিথান থেকে ভেসে আসে আলাউদ্দিন গিদালের গানের সুর_

‘হাত্তি মার্কা কেরাসিন তেল

কায় বা আইনছেন দ্যাশতে

বাপ রে বাপ মাও রে মাও

মোর গাও ঝমঝম করে রে’

বিকেল ক্রমে ঘন হতে থাকে।আর গান গড়াতেই থাকে।





২।

শেষ বিকেলে জমে ওঠা তামারহাটের মস্ত ভিড়ের মধ্যে নেমে যেতে যেতে মহিউদ্দিন ওস্তাদের মনে পড়ে যায় গৌরীপুরের সাচি পান আর গোলকগঞ্জের গুয়ার কথা।তার জিভে আটকে থাকা সেই পান আর গুয়ার স্বাদের আহ্লাদ তাকে বিমনা করে তোলে।তার শরীর জুড়ে কেমন এক নাচের ছন্দ চলে আসে।সে হাটের ভেতর নিজেকে ছড়িয়ে দিতে দিতে কন্ঠে গান নিয়ে দু’চার পাক নেচেই ওঠে!হাটের মানুষ তার গান শোনে,শুনতেই থাকে;হাটের ব্যাপ্ততা হাটের ব্যাস্ততায় নুতন এক হাট জেগে উঠতে থাকে।হাট বুঝি গানের হাট কিংবা নাচের হাট হয়ে ওঠে!মহিউদ্দিন মাস্টার তকন গেয়েই চলেছেন গঞ্জহাটজনপদের খুব গহন থেকে উঠে আসা গান_

‘ও কি বাপ রে বাপ

ও কি হায় রে হায়

এল্যা কেনে আসিলুং মুই গৌরীপুরের হাট’

তখন হাটের চারদিক থেকে গোয়ালপাড়ার উন্মাদ করে দেয়া কাঠিঢোল বাজতে থাকে।সারিন্দা বাজাতে বাজাতে দীননাথ বর্মণ তার বাবড়ি ছাটা চুলের আন্দোলনে হাটের মধ্যে নুতন এক রঙ্গিলা হাট জাগিয়ে তুলতে থাকে।ধনকান্ত বড়ুয়া তার বাঁশিতে সাজিয়ে দিতে থাকেন অদ্ভূত এক ম্যাজিক।এক মায়া থেকে আমরা দেখি জীবন জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকা মায়াসমুদ্র।মহিউদ্দিন গানে গানে তার জীবনকে কিছুটা বুঝি গঞ্জ আর হাটের ঢলেই বিছিয়ে দিতে থাকে,কেননা এ ছাড়া তার আর কোন উপায় নেই।নিয়ন্ত্রণহীন পরিসরে একটা অবসাদের বিলাপের বিষণ্ণতার গোলকধাঁধায় মহিউদ্দিন তার সমস্ত গান,নাচ,সঙ্গীসাথী নিয়ে ক্রমে প্রবেশ করতে থাকে।

এই পর্বে আমরা কিন্তু ইয়াকুব ব্যাপারিকেও দেখে ফেলি।কেননা,ইয়াকুব তখন হন্তদন্ত প্রবেশ করতে চাইছেন মহিউদ্দিন ওস্তাদের গানের ভুবন আর তামারহাটের গানবৃত্তান্তের খুব খুব ভেতরেই!





(ক্রমশঃ)