মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

সঞ্জীব কুমার

মহানিষ্ক্রমণ
__________

.....বেলা তিনটের সময়ে কেমন যেন কথা জড়িয়ে গেল ওঁর কিছুক্ষণের জন্যে। সে সময়ে অনেক কথা বলেছেন, কিন্তু আমি সেই জড়িত কথা ধরতে পারিনি।একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনেছি কেবল।

বেলা পড়ে এলো। ওঁর শ্বাসের কষ্ট হচ্ছে।সবাই ছুটোছুটি করছে। কোথা থেকে এলো অক্সিজেন সিলিন্ডার - অক্সিজেন দেওয়া হতে লাগলো।

সেই মূহুর্তে আমি স্পষ্ট করে বুঝলাম উনি চলে যাচ্ছেন। এ জগৎ থেকে লোকান্তরে। আমাদের ফেলে চলে যাচ্ছেন। ছিঁড়ে পড়েছে পৃথিবীর বন্ধন।

ছুটে গেলাম ঠাকুরপোর ঘরে। ক্লান্ত শরীরে দাঁড়িয়ে কি ওষুধ তৈরী করছিলো ও দাদার জন্য। বললাম - ঠাকুরপো! সত্যি করে বলো, তোমার দাদা আর বাঁচবেন না?

দেখলাম ঠাকুরপোর চোখ ভেজা। বললো - আমার কাছে স্পষ্ট করে আর কি শুনতে চাও বৌদি?

ফিরে এলাম এ ঘরে। অক্সিজেন দেওয়া চলছে। দু এক সেকেন্ড যেন নিশ্বাস নিতে পারছেন না, চমকে চমকে উঠে শ্বাস নিচ্ছেন কষ্ট করে। কপালের একটি শিরা স্ফিত হয়ে উঠেছে কষ্টে।

আমি অবুঝের মতো কাঁদছিলাম। সেই কষ্টের ভেতরেও উনি বলেছিলেন - সবাই বোঝাও ওকে। কাঁদবার কি আছে। ওকে তোল।

আমার মন শক্ত হয়ে উঠলো হঠাৎই। বলে নিই শেষ কথাগুলো। বললাম - খুব ছোটবেলায় তোমার কাছে এসেছিলাম। কখনো বেশীদিন থাকিনি তোমাকে ছেড়ে। এখানে আমাকে ফেলে রেখো না। তাড়াতাড়ি ডেকে নিও।

উনি বললেন - বাবলু ছোট। আমি ফেলে গেলাম। তুমি ওকে মানুষ কোর।

আমি আবার বললাম - তুমি এতো ভালবাসতে ইছামতী নদী, দেশে আর যাবে না? আর ইছামতীতে স্নান করবে না তুমি?

- তুমি যাবে। আমি অলক্ষ্যে থাকবো তোমার পাশে, তোমার সব কাজে।

আর সময় নেই, সময় নেই। সব কথাই যে আজ সেরে নিতে হবে।

বললাম - আমাকে কার কাছে রেখে গেলে তুমি?

উনি নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় বললেন - ভগবানের কাছে কল্যাণী। তোমাকে ভগবানের পায়ে রেখে গেলাম। তিনি ছাড়া কেউ নেই দেখবার।

উনি গীতা শুনতে চাইলেন ঠাকুরপোর কাছে। ঠাকুরপো পড়তে পড়তে কেঁদে উঠে বলল - আমি আর পারছি না বৌদি।

আমি বললাম - ঠাকুরপো তুমি সরো। আমি পড়ি গীতা। কে যেন আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল গীতা। বলল - শান্ত হোন। গীতা অন্য কেউ পড়ছে।

সবাই নাম শোনাচ্ছে ওঁকে। শেষ সময় সমাগত। উনি বলছেন - তোমরা আমাকে রামপ্রসাদের নাম শোনালে না?

রামকৃষ্ণ আশ্রমের স্বামীজী ওঁকে বললেন - বিভূতিবাবু আপনার ইষ্ট দেবতার নাম মনে আছে? নাম করুন। উনি বললেন - হ্যাঁ।

মৃত্যুর সামান্য আগে যেন ছিলাছেঁড়া ধনুকের মতো কিছুটা উঠে পড়লেন বিছানা থেকে। বিস্মিত দৃষ্টিতে পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন - ওখানে অত আলো কেন? অত আলো?

বাবলু পাশের ঘরে ঘুমিয়েছিল। এই সময়ে হঠাৎ জেগে গিয়ে কেঁদে উঠলো সে। আমি ওঠাতে চাইনি, কাঁদুক ও - কাঁদবার জন্যেই তো রইলো সমস্ত জীবন।

সেই অবস্হাতেও আমার আঁচল টেনে বললেন উনি, তখন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে, - যাও, বাবলুকে নিয়ে এসো। বাবলু কাঁদছে।

হে ঠাকুর! এই কটা মুহূর্ত জীবিত রেখ ওঁকে। আমি বাবলুকে নিয়ে আসি। বাবলুকে নিয়ে এসে ওঁর পাশে দাঁড়ালাম। বাবলু হকচকিয়ে গেছে।

ওর খেলার সাথী বিছানায় শুয়ে কেন? উনি হাসিভরা মুখে তাকিয়েছেন তার দিকে, অভয়ভরা দৃষ্টি নিয়ে, আশীর্ব্বাদ নিয়ে।

সেই হাসির সঙ্গে সঙ্গে বিভূতিভূষণের চোখ মুদিত হয়ে গেল চিরদিনের জন্য।

রাত আটটা পনেরো মিনিট, বুধবার, কার্ত্তিক মাস, তিথি ষষ্ঠী।

চলে গেলেন বিভূতিভূষণ!
_________

(বিভূতি-জায়া রমা বন্দ্যোপাধ্যায় এর স্মৃতিকথা থেকে সংকলিত।  )

২টি মন্তব্য:

  1. এই লেখায় আর নতুন করে কিছু লেখার নেই। সঞ্জীবদার এই লেখা পড়ার পর একটাই কথা বলতে হয়, 'প্রণাম'।

    উত্তরমুছুন