কৌশিক সেন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কৌশিক সেন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

কৌশিক সেন


 বনসাই

 

তোমরা যখন মেঘের গল্প বল,

গোপের বালক আপনি বাজায় বাঁশি

শ্যামল দু’চোখ আপনি টলোমলো

ঠিক বুঝেছি, সে কোন সর্বনাশই!

 

দুষ্টু আকাশ কলমা পরে চোখে

উপচে পড়ে দু’পাড় ছলাচ্ছল,

কদম্ববন ঢাকলে সুরলোকে

আরেকটু পর থামলে কোলাহল।

 

সুর লেগেছে নিভন্ত কিংশুকে

স্বপ্নঘোরে অবাক ধুলোবালি

তোমরা যাকে মেঘ বলেছ সুখে,

তাকেই বলি পদ্য লেখার কালি।

 

শোক জমেছে কাজলাদীঘির পাড়ে

নাগকেশরের পাতায় ভেজে রোদ

আলগা পাঁজর বেঁধেছে মাল্হারে

তবুও কোথাও ভাঙছে প্রতিরোধ।

 

তোমরা যাকে স্পর্শসুধা বল

একলা ঘোরে যত্নে রাখি তাই,

তোমরা যখন মেঘের কথা বল

আমার ঘোরে ভিজেছে বনসাই।।

 

 

বহুদূরের বিন্তিকে...

 

ডুব দিয়ে দেখা তোর নামে যত শব্দ

কথা উড়ে গেলে ধরে ফেললেই পারতিস

কাটা ঘুড়ি মেখে মেঘেরা বিপ্রলব্ধ

চিঠি হয়ে যাক আকাশের যত আর্তি।

 

দুটি জুঁইফুল, টুলটুল করে সন্ধে

টিমটিম জ্বলা তেলকুপিটাই ভরসা

নীলাভ জ্যোৎস্না উঁকি দেয় কটিবন্ধে

দুটি গলি ছেড়ে তোর নামে ছিল বর্ষা।

 

আচমন সারা ফোঁটা ফোঁটা যত ঝুমকো

রতি রতি দাম গড়ালে বিকেল সন্ধ্যায়

কুচিকুচি কাচ, অভিমান যত ঠুনকো

প্রতিপদ ঢাকা নিবিড় রজনীগন্ধায়।

 

তবু সাঁতারের, ডুব সাঁতারের দিনটি

মৌসুমি বায়ু সব জানে অনাসৃষ্টি

ছাতা ভুলে গেছি। জানতিস বল্ বিন্তি

দুটি গলি পর... আমি, তুই আর বৃষ্টি!!

 

শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

কৌশিক সেন

              





 অবেলার খন্ডদৃশ্যগুলি

-১-

দৃশ্য পট থেকে শঙ্খচিল উড়ে গেলে তোকেই বসিয়ে রাখি স্বপ্নের কিনারায়। ভরদুপুরে গোলাপি বাতাবীলেবু ঠুকরে খায় নাম না জানা পাখিরা। জানলা দিয়ে দেখি বিক্ষিপ্ত রোঁয়া, রস, রমণ, রিরংসা।  নিস্তেজ হাতে চাকা ঘুরাই অস্তাচলের দিকে।

-২-

অনেকটা চাঁদের মতো।  অস্পষ্ট আলোয় বড়ই কাকতালীয় সে কলঙ্ক।  নিষাদের লক্ষ্যভেদী তীর ধেয়ে আসে নিষেককামী শুক্রবীজের দিকে। অধোবদনে দাঁড়িয়ে থাকে মায়ের দূরসম্পর্কের চাঁদভাই।  যাকিছু রিক্ততা, সবটাই রেখে আসি ভুবনডাঙার মাঠ বরাবর।

-৩-

চলে আসি। স্বাতিনক্ষত্রের আলোয় রেখে আসি অবধারিত বদনাম।  বেগুনী আলোয় স্নান সারে হলুদবনের হরিণীরা।  পথ ভুলে যায় নদীর ছায়াপথে।  আমি চলে গেলে আমার এঁটো রেকাবী নামিয়ে রাখে মা।  রূপকথার আলোয় স্পষ্ট হয় উচ্ছিষ্ট মাছের কাঁটা আর ক্ষুধার্ত আঙুলের দাগ।

-৪-

এখন রবিবার।  কয়েকদিন ধরেই।  দুপুরের গরাদে দোল খায় মাসকাবারি মুদিখানার ফর্দখাতা।  খাতার পাতায় পাতায় এখন চড়াইপাখির মিথুনদৃশ্য।  তেল হলুদে ভিজে ওঠে পাড়ার বিধবা ঠাকুমারা।  মধ্যরাত পেরোলেই কাঁচাঘুম ভাঙিয়ে ছুট দেয় হারামজাদা সোমবার!

-৫-

পাশবালিশের গান শুনি।  পথের দুধারে গজিয়ে ওঠা শিয়ালকাঁটার ঝোপে প্রজাপতির মতো নির্ভার স্বরলিপি সব।  কানের ভেতর ডুগডুগি বাজিয়ে ভালুকনাচ দেখিয়ে গেছে দূরগাঁয়ের শাওনচাচা।  কোর্টের বাজারে বিণ বাজে আজকাল।  তালে তালে মাথা নাড়ে জাত খড়িশ।

-৬-

মৃত্যুর পূর্ববর্তী নিসর্গ এখন।  পলেস্তারা খসা দেয়ালে জায়গায় জায়গায় এখন মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস।  প্রশ্নাতীত কিছুই অবশিষ্ট নেই আর।  নিপাতনে সিদ্ধ সবকটি কবিতাই এখন প্রকাশিত হবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।  আমার নির্বাণলাভ হলনা আর!


 


রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

কৌশিক সেন

 



লখিন্দর


-১-


তোমাকে দেখবার আগে একবার যদি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতাম, বুঝতে পারতাম অন্ধকার কীভাবে

গাঢ়তর হয়, কীভাবে শোক ঝরে পড়ে সংক্রমিত ক্ষতস্থান থেকে!


-২-


আর চাইবো না আমি, এইসব রুটি-ভাত, গুড়-চিনি জীবন। আম কাঁঠালের শরীর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে

আসা উত্তপ্ত জ্যৈষ্ঠের ভালোবাসা। আমি এবার থেকে আমলকীর শোক কামনা করি।


-৩-


তোমার কাছে মধুমাস বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। শ্রাবণের শুক্লা পঞ্চমীতে শীতল সরীসৃপের ফণায়

ঢেলে দিয়েছি কালো গাইয়ের গরম দুধ। ছোবল খেয়ে বিষাক্ত হয় গোটা শরীর, বর্ষা নামলেই!


-৪-


নরম হাসনুহানার পর্দা লাগাও জানলায়। চৌকাঠে নিমীলিত গন্ধরাজ। আর একটু রাত নামুক,

বেলিফুলের স্বপ্ন বিছিয়ে দেবো বিছানায়। নইলে জতই লোহা দিয়ে মুড়ে দাও, এ বাসর অসুরক্ষিত!


-৫-


এর চেয়ে মরে যেতাম, বেশ হতো! মান্দাস ভাসিয়ে দিতে অনন্ত প্রবাহে! অন্তত ঢেউয়ে ঢেউয়ে

বিরহগাথা লিখে রাখতো কেউ! আমি নই, তুমিই নাহয় অমরত্ব লাভ করতে!


-৬-


বৃষ্টি নেমেছে অনেকক্ষণ। জলের ছাটে ভিজে যাচ্ছে পাতলুন, পাজামা। ঘন সবুজ অরণ্যের গন্ধ

আসছে হাওয়ায়। বুকের ভেতর মাতাল বীণ। বুঝতে পারছি, ঝাপান গাইছে কেউ, খুব খুব কাছেই!


-৭-


কেন ফিরিয়ে আনলে আমায়! এই ঘৃণা, ক্লেদ, জিঘাংসার স্মরণী বেয়ে কেন স্বর্গচ্যুত করলে,

বলো! তুমি যতই নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করো আমায়, জেনে রেখো এই শরীর প্রথম স্পর্শ

করেছে ওই কালনাগিনীই!


 


রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

কৌশিক সেন

                                                      



এই সংখ্যার কবি কৌশিক সেনজন্ম ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ বহরমপুর, মুর্শিদাবাদে। ছাত্রজীবন ও বেড়ে ওঠা বহরমপুর শহরেই। কলেজ উত্তীর্ণ হওয়ার পর কঠোর জীবন সংগ্রাম। সাতাশ বছর বয়সে দিল্লীতে আগমন।  কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারী। সতেরো বছর ধরে দিল্লীর বাসিন্দা।  দিল্লী, কলকাতা ও বহির্বঙ্গে বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত ও প্রশংসিত।  প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : রাই জাগো গো।


সফেদ ফুলের লেফাফা

 

 

-১-

 

সকালের ডাকে এসেছে

সফেদ ফুলের লেফাফা এক।

পাপড়ি খোলবার আগেই বৃষ্টি নামলো যখন,

ছাতাটা ফুটাইনি আর;

রাজ কাপুর সাজবো আজ, নার্গিস বাহারে...

 

-২-

 

আমি দরজা খুলে দেখেছি

মাথায় ফুলের মুকুট পরা মেয়েটি

এগিয়ে গেছে রোদ পার হয়ে...

তাকে পিছু ডাকিনি আর

যদি পথ ভুলে যায় ও!

 

-৩-

 

কালো ছাতার ভাঁজে ভাঁজে মুড়িয়ে রেখেছি

রঙিন ছাতাটি,

সাদা চশমার ভেতর রোদ চশমা;

গ্রীষ্মে, বর্ষায় কাজে আসবে

এইসব ছায়াময় ষড়যন্ত্র...

 


 

-৪-

 

রাত জড়ো করে রাখা ছিল বালিশের নীচে

ঘুম থেকে উঠে দেখি

বালিশ ডানা মেলেছে পূর্বদিগন্তে;

আমি চাঁপার গন্ধে

সকালের স্কেচ আঁকি...

 

-৫-

 

ডিটিপি তে বেঁধে রেখেছি দুষ্টু প্রজাপতি

ফুলে ফুলে আগুনের ফটোশপ;

টোনারে সিয়ান কমে গেলে

আকাশকে বোলো,

রামধনু লাগবেনা আর!

 

-৬-

 

ঝিঙে মাচায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে বড়

হলুদ মালঞ্চে দোলন লেগেছে কি লাগেনি,

ভেতর থেকে উঁকি মারে লাউডগা...

শহরে কুয়াশা নামলে

চেরাজিভ লুকানো থাকে শীতঘুমে।

 

-৭-

 

স্যানিটারি প্যাডের মঙ্গলছাপ আজ আকাশের লালিমায়।

এসো, প্রণাম করি এই গোধূলির নারীবেলা...

তুলসীমঞ্চে দীপ জ্বেলে দিই,

উত্তরনারীদের আসবার পথ

আলোকিত হোক আজ!

 

-৮-

 

প্রেমিকার ফিরিয়ে দেওয়া চিঠির থেকেও

বিষণ্ণ ছিল সে বিকেল

তবুও ঝরে যাওয়া বিবর্ণ তেঁতুলপাতায়

কান পেতেছি,

স্পষ্ট শুনেছি, বসন্তের কান্না!

-৯-

 

পৃথিবীর দূরতম নক্ষত্রকে ভালবেসেছিলাম, একদিন

তাই বোধহয় এত সুগন্ধ এ নাভিতে,

এত আশ্লেষ শরীরে নিয়ে ছুটে চলেছি

অনন্ত খাণ্ডব অরণ্যে!

এত দহন কেন দিলে আমায়, মাগো!

 

-১০-

 

নীল দীঘির ওপর সূর্য উঠবে একদিন।

জলের গর্ভে এইমাত্র বপন করলাম

শ্বেতপদ্মের বীজ,

অতলে ভাসিয়ে দিলাম নির্বিষ জলঢোড়া

আমিও মরাল হলাম আজ থেকে...