বৃহস্পতিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৭

প্রবীর বিকাশ সরকার

স্মৃতিবিষয়ক গল্প 

কপি 
প্রবীর বিকাশ সরকার 

আজও যখন কখনো কখনো জেরক্স কপিয়ার মেশিনে কপি করতে কোনো দোকানে যাই তখন হঠাৎ করেই শ্যামলদা এবং বিজয়ার মুখ মনে পড়ে যায়। একটি জেরোক্স কপি কীভাবে একটি উঠতি তরুণ-তরুণীর হৃদয়ঘটিত সম্পর্ককে ছিন্নভিন্ন করে দিল---ভাবলে যেমন দুঃখ হয় আবার দুঃখের মধ্যে হাসিও পায়। এমন ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সম্পর্কটা কলি থেকে ফোটার আগেই ঝরে যাবে এমনটি ধরে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। একেই বোধকরি বলে নিয়তি। মাঝে মাঝে শ্যামলদা ও বিজয়ার জন্য মনোকষ্টে জলাক্রান্ত হই। 

বিজয়ার সঙ্গে আমার দেখা না হলে এই ঘটনাটি জানতেই পারতাম না। ১৯৯৮ সালে ওর সঙ্গে হঠাৎ করেই আমার দেখা কমলাপুর রেল স্টেশনে। দুজনেই একই ট্রেনের যাত্রী হয়েছিলাম চট্টগ্রাম পর্যন্ত। ওর গন্তব্য দিদির শ্বশুরবাড়ি হালি শহর পর্যন্ত। আর আমার বন্ধুবর সাফায়াত খানের বাসা উত্তর নালাপাড়া। 

স্টেশনের প্লাটফর্মে মানুষের ভীড়ে নির্দিষ্ট কামরা খুঁজছিলাম। সিঁড়িতে পা রাখবো এমন সময় ডানপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠে চমকে উঠলাম। 
---
আরে প্রবীর না! 
ঘাড় ফিরিয়ে দেখি চেনা একটি তরুণী। আরে বিজয়া যে! দ্রুত পা নামিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম।
---
বিজয়া তুমি!
---
হে। আমি। চিনতে পেরেছো!চকবাজারস্থ বজ্রপুরের কাসারিপট্টি আমরা থাকতাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়তাম। তুমি ইতিহাসে। 
---
হে। চিনতে পেরেছি তো। কেমন আছো তুমি? যাচ্ছো কোথায়? আরেব্বা কত বছর পর দেখা! একা যাচ্ছো নাকি?
---
হে। অনেক বছর পর। তুমি ভালো আছো? তোমার বোন রীনার কাছে শুনেছিলাম তুমি জাপান চলে গেছো। ওখানে বিয়েসাদি করেছো। 
---
ঠিকই শুনেছো। তুমি বিয়ে করোনি বুঝি? বলে ওর মাথার দিকে তাকালাম। সিঁদূরের কোনো লাল চিহ্ন দেখতে পেলাম না। বেশ বড়সড় ধাক্কাই খেলাম বুকের মধ্যে। শ্যামলদাকে মনে পড়ে গেল। তবে কী ওদের বিয়ে হয়নি! 
---
সেসব অনেক কথা। তুমি কি চাঁটগা যাচ্ছো? 
---
হে। আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। চলো উঠে পড়ি। 

দুজনে উঠে সিট খুঁজে পেলাম ঠিকই কিন্তু ভিন্ন-ভিন্ন জায়গায়। বিজয়া বললো, তোমার সিট কোথায় সেখানেই বসবো। যার সিট সে এলে বুঝিয়ে বলবো চিন্তার কারণ নেই। এসব হরহামেশা ব্যাপার। 

পাশাপাশিই বসলাম। বিজয়া নিল জানালার পাশে আমার সিটটি। তেমন যাত্রী নেই তার কারণ হল মঙ্গলবার সবাই কাজে ব্যস্ত। বিকেলের ট্রেন। ঘড়িতে তিনটা বাজছে। প্লাটফর্মে বেশ কোলাহল। মানুষের ভীড়ও কম নয়। পরবর্তী ট্রেনে অনেকেই চড়বে বলে মনে হল। দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষমাণ। 

ট্রেন ছেড়ে দিলে পরে বেশ হিমহিম বাতাসের ঝাপ্টা শুরু হল। ডিসেম্বর মাসের শেষপ্রায়। শীত তেমন নেই শহরে। তবে খোলা জায়গার বাতাস বেশ ঠাণ্ডা। বিজয়ার মাথার কয়েকটি দীর্ঘ চুল উড়ছে সেই বাতাসে। সে চাদরটাকে টেনেটুনে ঠিক করে আমার দিকে ফিরে তাকালো। 

দেখলাম সেই বিজয়া। একদা খুবই সুন্দরী ছিল। বিশেষ করে ওর বড় বড় চোখ ও দীর্ঘ নাক অন্যান্য মেয়েদের থেকে আলাদা। দীর্ঘদেহী সুতনুকা দারুণ আকর্ষণীয় ছিল বন্ধুমহলে। গায়ের রং ফর্সা---মায়ের রংটি পেয়েছে। ওর বাবা তো বেশ কালো। ওর ছোটভাই বরুণ বাবার মতোই হয়েছে। 

বিজয়ার শারীরিক পরিবর্তন তেমনটি না ঘটলেও বড় বিষণ্ন মনে হলো। কেমন উদাস-উদাস দৃষ্টি। ও যে ভালো নেই বুঝতে আর বেগ পেতে হয়নি। 

বিজয়া মুখ খুললো, কত দিন পর এলে দেশে? এর আগে এসেছিলে বৌদিকে নিয়ে রীনা বললো। 
---
হে। ১৯৮৮ সালে মহাবন্যার সময় ওকে নিয়ে এসেছিলাম প্রথম। তারপর একাধিকবার এসেছি। ছুটিছাটা পাওয়া যায় না, অনেক খরচও লাগে ইচ্ছে থাকলেও দেশে আসা কঠিন। 
---
ওখানে কি চাকরি করছো? 
---
ও দেশে থাকলে কাজ করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পথ নেই বেঁচে থাকার। বড় কষ্টসাধ্য জাপানের জীবনযাপন। 
---
জানি। আমার ছোটমামা পিএইচডি করতে তিন বছর ছিল টোকিওতে। খুব ব্যয়বহুল দেশ আর অমানুষিক পরিশ্রম সেখানে করতে হয় বলেছে। বাঙালির শরীরের যে ধাত তাতে এত পরিশ্রম খাপ খায় না। পরিশ্রমী জাতি বলেই উঠতে পেরেছে জাপান। 
---
কুমিল্লায় কি তোমরা এখন থাকো না? তোমার মামাতো ভাই সুব্রত এখন কোথায়? ওই যে চকবাজারে ব্যবসা ছিল ওদের। 
---
বড় মামার ছেলে তো? সেই কবেই ওরা চলে গেছে কলকাতায়। সুব্রতদা বিয়ে করে তিন ছেলেমেয়ের বাবা। তোমার ক’ ছেলেমেয়ে?


ক্রমশ .....

ব্রততী সান্যাল

নেশাতুর

 ব্রততী সান্যাল

কিছু মুহূর্তের ঠোঁটে নেশা লেগে থাকে,
প্রাত্যহিকতা এসে থেমে যায় হঠাৎ, অকস্মাৎ.. 
:
ডুবো পাথরে ধাক্কা খেয়ে জাহাজ যেমন
জলসিঁড়ি বেয়ে অতলে বাসা বাঁধে,
তোমায় ছুঁয়ে দেখা বোধগুলো 
অচ্ছুৎ হয় ফ্রেমবন্দী মুহূর্তগুলোয়,
অবচেতনার দীঘিতে স্বেচ্ছায় ডুব দেয়—
ওপারে ভেসে ওঠে কিনা দেখা হয় নি আজও.. 
:
প্রত্যাশার দূরবীণটা ক্ষয়ে যায় রোজ,
ধূ ধূ বালুচরে ছুঁড়েই দেব একদিন—
অভিমানী সরিসৃপ হয়ে জন্মাবে যুগান্তরে, 
জঙ্গল ভেঙে খোদাই করবে তোমার নাম.. 
:
আবেগ ভুলে জোৎস্নায় হেঁটে যাব আমি,
ডালপালা বিস্তৃত পরিসরে 
পরিচয় হাতড়াবো— সম্ভ্রমের গুঁড়ো মাখবো দেহ জুড়ে.. 
:
ঘোর লাগা মুহূর্তগুলো এভাবেই
প্রাত্যহিকতা ছাপিয়ে গল্প লিখে যায়—
তুমি-আমি শোনার আশায় বসে থাকি,
:
সেই অবকাশ ফুঁড়ে গুপ্ত কিছু বিষাদ 
ডানা মেলতে চায় নিজস্ব নিয়মে মেনে,
ছাঁটতে গেলেই দমকা হওয়া হয়ে ভাসে.. 
আমি পথ ভুলে ব্যর্থ ফিরে আসি, 
প্রতিদিন প্রতিবার, অবিরাম.. 
ছবি : মলয় দত্ত 
  


সোমবার, ২০ মার্চ, ২০১৭

বনবীথি পাত্র

রবীন্দ্রনাথ-বসন্তকাল এবং বাঙালী

বেশ কিছুদিন উত্তরভারত ভ্রমণের পর এবার ঘরে ফেরার ফেলা । চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে একে একে পিছনে সরে যাচ্ছে উচুঁউচুঁ পাহাড়ের সারি , পাহাড়ি সভ্যতা । আস্তে আস্তে নেমে আসছি সমতলে  প্রকৃতির রূপ-আবহাওয়া সব যেন পাল্টে যাচ্ছে ধীরে ধীরে । পাহাড়-ঝর্ণা-তুষার শুভ্র হিমালয়ের শোভায় দুচোখ ভরে গিয়েছিল , তবু বাংলার যেন এক অমোঘ টান আছে রক্তে । সবুজ ধানক্ষেত-নদী-শালবন-মেঠো পথ-চেনা পাখির ডাক সব যেন বড়ো বেশি আপনার ।
যদিও শীত চলে গেছে , তবু ভোরের দিকে এখনো হালকা ঠাণ্ডার হিমেল আবেশ থেকে গেছে যেন । ভালোবেসে একটু উষ্ণতার পরশ গায়ে জড়িয়ে ট্রেনের জানলাটা খুলতেই চোখ যেন জুড়িয়ে গেলো ।
শীতের রুক্ষ-বিবর্ণতা মুছে দিয়ে নব কিশলয় আর ফুলের সম্ভারে  বসন্ত এসে গেছে । জরাজীর্ণ শুষ্ক প্রকৃতি একটু একটু করে যেন সেজে উঠেছে নব তারুণ্যের সাজে । শীতের জড়তার মাঝে যেন এর অপেক্ষাতেই পথ চেয়েছিলাম এতোদিন ।
"এতদিন যে বসেছিলেম পথ চেয়ে আর কাল গুনে , দেখা পেলেম ফাল্গুনে । "
বসন্তকাল আর রবীন্দ্রনাথ , বাঙালী হৃদয়ে কখন যেন অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িয়ে গেছে । রবীন্দ্রভাবনায় বসন্ত যেন ত্যাগের ঋতু । সমস্ত জীর্ণতা-দীনতা ত্যাগ করে , নতুন করে বেঁচে ওঠার ডাক দিয়ে যায় বসন্ত । সকল বাঁধন ছেড়ে যেন উচ্ছ্বলতায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতেই বসন্তের আগমন ।
"ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।
আমার আপন হারা প্রান
আমার বাধন ছেঁড়া প্রান
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান,
ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান।
তোমার অশোকে কিংশুকে ,
অলক্ষ রঙ লাগলো আমার অকারণের সুখে ,
তোমার ঝাউয়ের দোলে
মর্মরিয়া ওঠে আমার দুঃখরাতের গান ।"
রবীন্দ্রনাথকে বোধহয় শ্রেষ্ঠ বসন্তবিলাসী বাঙালি বললেও বেশি বলা হবে না । তাঁর সৃষ্টিতে তিনি বসন্তকে নানা রূপে তুলে ধরেছেন । তিনি বসন্তের ফুলে ফুলে ছাপিয়েছেন আপন কবিতার কূল। কবিগুরুর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থে  "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে" কবিতায় বসন্ত দিনের জাগরণের সুর তুলেছেন আপন ভঙ্গিমায় ।
"আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে ,
কোরো না বিড়ম্বিত তারে ।"
আবার কখনো বসন্তের রিক্ততা ধরা পড়েছে তাঁর ছন্দে ।
"ঝরা পাতা গো , আমি তোমারি দলে ।
অনেক হাসি অনেক অশ্রুজলে
ফাগুন দিল বিদায়মন্ত্র
আমার হিয়াতলে ।"
শীতের শেষে বসন্তের সূচনায় কবিগুরু কখনো আবার নব জীবন-যৌবনের উন্মাদনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন। প্রকৃতির সবখানে চৈত্রের উতল দখিন হাওয়ায় নবজীবনের জয়গান বেজে ওঠায় কবিও একই চেতনায় উদ্বেলিত। শিরীষের হিন্দোল, ঝুমকোলতার সজীবতা , নব কিশলয়ে বাতাসের হিল্লোল , যে আনন্দ-উল্লাস , সবুজের এই আয়োজনে কবির মন উচ্ছ্বসিত ও গুঞ্জরিত হয়ে উঠেছে । অন্যদিকে পলাশ-শিমুল-কৃষ্ণচূড়ার রক্তরাগ, মল্লিকার সৌন্দর্য, আমের মুকুলের মাতাল করা সুবাস , দোলনচাঁপার শুভ্রতা, চম্পার পুলককবির সুপ্ত প্রাণমনকে চঞ্চল ও উতলা করে তুলেছে বারবার । শাখায় শাখায় বনে বনে ফুলে ফুলে দখিন হাওয়ার স্পর্শে প্রাণের আগমন । উতলা উত্তরীয় উড়িয়ে কবি তাই বারবার আহ্বান করেছেন বসন্তকে । প্রেমের অনুভূতি ও আবেগ এই উতল হাওয়ায় কবির মাঝে জাগ্রত। ফাগুন তাই কবির কাছে নবজীবনের সাতরঙের বিচ্ছুরণ, অকারণে চঞ্চলতা , প্রাণের দীপ্তি-কোলাহল , জীবনের জয়গান , ঝর্ণার নিরন্তর আনন্দধারা , জীবনের পল্লবিত সবুজছায়া ; যেন নবযৌবনের দৃপ্ত পদযাত্রা । তাই তো বিশ্বকবি বলেছেন ,
"ওরা অকারণে চঞ্চল
ডালে ডালে দোলে 
বায়ুহিল্লোলে নবপল্লবদল ॥
বাতাসে বাতাসে প্রাণভরা বাণী
শুনিতে পেয়েছে কখন কী জানি ,
মর্মরতানে দিকে দিকে আনে
কৈশোর কোলাহল ॥
ওরা কান পেতে শোনে গগনে-গগনে 
মেঘে মেঘে কানাকানি ,
বনে বনে জানাজানি ।
ওরা প্রাণঝরনার উচ্ছলধার
ঝরিয়া ঝরিয়া বহে অনিবার ,
চিরতাপসিনী ধরণীর ওরা শ্যামশিখা হোমানল ॥"
তাঁর ‘রক্তকরবী’র প্রাকৃতিক পটভূমিও নির্মিত হয়েছে বসন্তের আবহাওয়ায় ও অনুষঙ্গে ।
বসন্তের এই রূপ দীর্ঘস্থায়ী নয় । তবু যতটুকু ক্ষণ থাকে , প্রাণবন্ত ভাবে ছুঁয়ে থাকে আমাদের , ভরিয়ে দেয় নব আশ্বাসে ।
"একটুকু ছোঁওয়া লাগে , 
একটুকু কথা শুনি--
তাই দিয়ে মনে মনে 
রচি মম ফাল্গুনী।
কিছু পলাশের নেশা, 
কিছু বা চাঁপায় মেশা,
তাই দিয়ে সুরে সুরে 
রঙে রসে জাল বুনি॥
যেটুকু কাছেতে আসে 
ক্ষণিকের ফাঁকে ফাঁকে
চকিত মনের কোণে 
স্বপনের ছবি আঁকে
যেটুকু যায় রে দূরে   
ভাবনা কাঁপায় সুরে,
তাই নিয়ে যায় বেলা
নূপুরের তাল গুনি ॥"
রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বসন্ত আর বসন্ত ছাড়া বাঙালী যেন তাই অসম্পূর্ণ । 

ছবি : গুগুল