সৃজন শিল্প ও সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৃজন শিল্প ও সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

ভজন দত্ত



(প্রিয় পাঠক গত সংখ্যায় লেখা দিতে না পারার জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি।না,কোনো অজুহাত নয়।পারলে ক্ষমা করবেন।)
            ।।  পুরুলিয়ার মুখ ।।
                                     ভজন দত্ত
দ্বিতীয় পর্ব :
৪.
বর্তমানে বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। বিশ্বায়নের ধাক্কায় সবকিছুর মধ্যেই নানান পরিবর্তন এসেছে।এই বাংলার 'মুখোশ গ্রাম ' চড়িদাতেও লেগেছে সেই পরিবর্তনের ঢেউ। টিভি ও ফিল্মি দুনিয়ার প্রভাব এসেছে।যেমন, শিবের মুখোশের মধ্যে ব্যাটারির আলো জ্বালিয়ে তৃতীয় নয়ন বা কোমরে ব্লাডার বেঁধে শিবের জটায় গঙ্গার জলধার করা এসব। অনেকে আক্ষেপ করে বলেন,  মুখোশ ও বীরত্ব ব্যঞ্জনাই হল ছৌনাচের আসল। তা যেন এখন পুতুল নাচ হয়ে যাচ্ছে। মুখোশ তৈরির ব্যয় বাড়ছে দিন দিন তাই সাদা সাপ্টা স্বল্পব্যয়ে মুখোশের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে পর্যটন শিল্পের বিকাশের ফলে পর্যটকরাও মুখোশ স্মারক হিসাবে ক্রয় করছেন পুরুলিয়া শহর বা চড়িদা বা ঝালদা বা জয়পুরে।জয়পুরের ডুমুরডি গ্রামেও মুখোশ তৈরি হয় একই পদ্ধতিতে। তরুণদেব ভট্টাচার্য্য তাঁর পুরুলিয়া গ্রন্থে  ( প্রকাশ:১৯৮৬) লিখেছেন, " দশবছর আগে চোড়দায় মুখোস তৈরি করতেন ২৯ টি পরিবার।পরবর্তীকালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ টি। ডুমুরডিতে সংস্থা আছে তিনটি। বর্তমানে আরো কটি জাশগায় মুখোশ তৈরি সুরু হয়েছে।তাদের মধ্যে অন্যতম,পাড়া,ঝালদা ১নং ব্লক,সাঁতুড়ি ও আড়শা। "( বানান অপরিবর্তিত, পৃষ্ঠা  ৩৩৭-৩৩৮) বর্তমানে পুরুলিয়ার শিল্প মানচিত্রে এই মুখোশ শিল্প এক বিশেষ স্থান অধিকার করেছে সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিকমত বিপণন করতে পারলে মুখোশ শিল্প থেকে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
৫.
চড়িদা গ্রামে দত্ত,শীল ও পাল পদবীধারী সূত্রধররা সপরিবারে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।লোকশ্রুতি যে তাঁরা এসেছিলেন বর্ধমান জেলা থেকে।তাদের জমি দিয়েছিলেন, তখনকার বাগমুন্ডির রাজা।তা এমনি এমনি দেননি সে জমি । তার পিছনে জমিদারের শর্ত ছিল।সে শর্তটি হোল,জমিদারের দেবদেবীর মূর্তি গড়ে দিতে হবে।নানান দেবদেবীর মধ্যে ভাদুও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরাই পুরুলিয়ায় মুখোশ তৈরির সূচনা করেন। আর তার পিছনে বাগমুন্ডির রাজা বা জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। যতদূর জানা যায় এই চড়িদা গ্রাম থেকেই জয়পুর থানার ডুমুরডি ও অন্যান্য জায়গায় তারা বসতি স্থাপন করে।
৬.
প্রস্তরযুগের পরবর্তীকাল থেকেই মানব সভ্যতার সাংস্কৃতিক সকল পর্বেই ব্যবহৃত হয়েছে মুখোশ।মুখকে ঢেকে রাখাই তার কাজ। আর নৃত্যে মুখোশের ব্যবহার আদিম লোকসমাজের এক অভ্যেস।পৃথিবীর সবদেশেই তা  দেখা যায়। ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়ার জাভা,সুমাত্রা, বলীদ্বীপ, থাইল্যান্ড, আফ্রিকা মহাদেশে,সুমের সভ্যতায়,গ্রীক ও রোমান রাজত্বে, দক্ষিণ আমেরিকার পেরু অঞ্চলে ও পৃথিবীর আরো নানান জায়গায় নানান কারণে মুখোশের ব্যবহার দেখা যায়। প্রবহমান সেই  পরম্পরা বহন করে চলেছে পুরুলিয়ার মুখোশ।লোকায়ত স্তরে নৃত্যে বিশেষ করে ছৌ নৃত্য মুখোশ ছাড়া ভাবাই যায় না। বর্তমানে আজ তা বাস্তবিকই শুধু পুরুলিয়ার মুখ নয়, বাংলার রূপ হিসেবে স্থান লাভ করেছে। তো, কবি কী বলতেন, এই পুরুলিয়ার এই মুখোশ দেখে। আমাদের মুখোশ গ্রাম চড়িদা আজ বাংলার গর্ব।
ঋণ:
১/ পুরুলিয়া : তরুণদেব ভট্টাচার্য্য, ফার্মা কে এল এম, কোলকাতা : ১৯৮৬
২/ পশ্চিমবঙ্গ ( পুরুলিয়া জেলা সংখ্যা),জুন, ২০০৭
৩/অহল্যাভূমি পুরুলিয়া : সম্পাদনা, দেবপ্রসাদ জানা, দীপ প্রকাশন, কোলকাতা : জুলাই, ২০০৩
আলোকচিত্র : উজ্জ্বল দাস। 

বুধবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত



হামদের '' (ছো) 

বিশ্বায়ণের ধাক্কায় যখন সারা পৃথিবীর লোকসংস্কৃতি প্রায় বিপন্ন,বহুজাতিক কোম্পানীগুলি
  যখন বিজ্ঞাপনব্যয় কম করার জন্য পৃথিবীজুড়ে গড়ে তুলতে চাইছেন তাদের পছন্দমত একটাই সংস্কৃতি।  আরো নাফার ধান্দায় মগ্ন হয়ে গলা টিপে শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে, সেখানে একটি লোকসংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, বেশ অবাক করার মতোই সংবাদ বই কি! প্রিয় পাঠক , একটু অনুধাবন করলেই জানতে পারবেন সত্যতা। হ্যাঁ,আমি 'ছো' করবো বলে কথটা বলছি না, ' ছো ' সম্পর্কে আমার জানা কিছু কথা লিখবো বলেই এমনতর অবতারণা। 

বরফি সিনেমাটা মনে আছে ! মনে আছে সেই বধির হিরোটিকে! ২০১২তে রিলিজ এই সিনেমাটিতে নানাভাবে ছৌ নৃত্য ও তার মুখোশকে
  ব্যবহার  করেছেন চিত্রপরিচালক অনুরাগ বসু! যা সিনেমাটোগ্রাফিতে এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল।এর আগে ও পরবর্তীকালে আরো অনেক সিনেমায় ব্যবহার করা হয়েছে এই নৃত্যশৈলী ও তার উপকরণকে। এই নাচ মানভূম সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 



বিখ্যাত "মুকাবিলা হো মুকাবিলা " গানের সঙ্গে প্রভুদেবার নাচটি মনে আছে! শুধু দুটি পা বা হাত বা মাথার ছন্দময় সেই আন্দোলনের কথা। " Chou Dance of Purulia " গ্রন্থে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্য এই নাচের অঙ্গ-সঞ্চালনাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন। ১/ ছৌ নাচে সমস্ত শরীর স্থির রেখে মাথার মুকুটখানি নড়ানো - মস্তক সঞ্চালন ; ২/ সারা শরীর স্থির রেখে কাঁধটিকে শুধু নড়ানো। মাথা নড়বে না,শরীরের নীচের অংশটিও নড়বে না।শুধু কাঁধ দুটি নড়বে।এটি এই নাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ
  মুদ্রা- কাঁধ সঞ্চালন; ৩/ গতিতে নাচতে নাচতে লাফিয়ে উঠে পা দুটি জোড় করে এক বা একাধিকবার তালে তালে বসে পড়া বা সামনে পিছনে চলা।এটি এই নাচের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ।স্থানীয় ভাষায় এটিকে বলা হয় ' উলফা' যা উল্লম্ফনের অপভ্রংশ রূপ। - উল্লম্ফন ; ৪/ সমস্ত শরীর স্থির রেখে শুধুমাত্র বক্ষদেশ নড়ানো। বাজনার তালে তালে চরিত্রের ঝলমলে পোষাকও নড়ে।- বক্ষ সঞ্চালন। ৫/ সানাই ও ঢোলের তালে তালে পদসঞ্চার বা পদক্ষেপ। এটি নানা রকম হয়। যেমন দেবতাদের চলা - দেবচাল,বীরের মত চলা - বীরচাল, রাক্ষসের মত চলা - রাক্ষসচাল বা পশুর মত চলা - পশুচাল প্রভৃতি।
এই চালগুলির মধ্যেও আবার নানা ভাগ আছে। যেমন - ডেগা,ফন্দি,উড়ামালট, উলফা,বাঁহি মলকা বা বাহু নড়ানো, মাটি দলখা।
সানাইয়ের সুর, ঢোলের সূক্ষ্ম তাল, মাত্রা ও কাড়া নাকড়ার আওয়াজে এই নাচের চরিত্ররা নূপুরধ্বনির সঙ্গে প্রয়োজন মত অঙ্গ সঞ্চালন করে থাকেন। অদ্ভূত নিয়ন্ত্রণ নূপুরের! তারা প্রয়োজন মতন নূপুরধ্বনি করে থাকেন। বর্তমানে ক্যাসিও,গীটার,ক্যাবাকাশ ও অন্যান্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।


মানভূমের মানুষ এই নাচকে বলেন " ছো "। কেউ কেউ আবার বলেন " ছ"। ভারতে যেকটি নৃত্যের মধ্যে বীররস পাওয়া যায় তারমধ্যে শ্রেষ্ঠ স্থানটি এই ছৌ নৃত্য দাবি করে থাকে। পৌরুষদৃপ্ত এই নাচটির বাংলা, বিহার,ওড়িশা -- কোথায়
  উৎপত্তি তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য আজও বর্তমান।
বর্তমানে এই নৃত্যের যেসব ঘরাণা দেখা যায় তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১/ ঝাড়খন্ড-সেরাইকেলা, ২/ পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও চিলকিগড় ( ঝাড়গ্রামের কাছে), ৩/ ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার।আবার ইন্দোনেশিয়া ও বালির ফ্রিশ ও বরং নৃত্যের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য আছে।কেরালার কথাকলি নাচের সঙ্গেও কিছুটা মিল আছে। মাথায় মুকুট ও চিত্রিত মুখ যেন মুখোশকে মনে করায়। পুরুলিয়াতেও প্রথমে কথাকলি নাচের মত রং মেখে 'একুড়া ছো ' নাচা হত।পরে কাগজের আবরণ তার অনেক পরে এসেছে আজকের মুখোশ। মাটির ছাঁচে বিভিন্ন আকৃতির মুখ তৈরী করে তার উপর কাগজ,কাপড়,মাটির আস্তরণ দিয়ে ভেতরের অংশ বের করে কাগজ ও কাপড়ের অংশটি নিয়ে হালকা ও নৃত্যের উপযোগী মজবুত মুখোশটি তৈরী হয়। চরিত্র অনুযায়ী
  নানা রঙে রাঙিয়ে শিল্পীরা মুখোশগুলিকে জীবন্ত করে তোলেন । আবার নানান রকম পুঁতি,কাঠি, মালা, চুমকি, টিকলি,চুল, অলংকার,  ময়ূরপালক দিয়ে চারপাশে সাজানো হয় চরিত্র মতন।সাজ অনুযায়ী একেকটি মুখোশের ওজন ২০০- ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। বেশ কয়েকটি গ্রামে মুখোশ তৈরী হলেও মুখোশ তৈরীতে পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রামটির খ্যাতি আন্তর্জাতিক। 

ছৌ নাচের মধ্যে সবদিক থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য, একথা প্রায় সকলেই স্বীকার করে থাকেন।বর্তমানেও এই খ্যাতি অব্যাহত রয়েছে।
পুরুলিয়ার এই খ্যাতির পিছনে আছে ছৌ নৃত্যের মুখোশ ও পোষাক।কথায় আছে, " জমিদারও ভিকারি হয় ছো নাচে "। কারণ এই নৃত্যের জন্য ব্যবহৃত মুখোশ ও পোষাক নির্মাণব্যয় বেশ বেশী।

পুরুলিয়া জেলার মধ্যে বাগমুন্ডিতেই এই নাচের উৎপত্তি তা গবেষকগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন।আর ছৌ নৃত্যের মহাগুরু হিসাবে যাঁর নাম সকলে একবাক্যে স্মরণ করেন তিনি হলেন গম্ভীর সিং মুড়া। জেলায় তাঁর পিতা চিপা সিং ও বাবুলাল মিস্ত্রিকে এই নাচের পথ প্রদর্শনকারী বলে মনে করা হয়।
পুরুলিয়া জেলার বাগমুন্ডি ছাড়াও ঝালদা, বলরামপুর,
  বরাবাজার, বান্দোয়ান, হুড়া, পুঞ্চাতেও এই নাচ দেখা যায়।তাদের নৃত্যশৈলীর মধ্যে সুক্ষ্ম পার্থক্যও বিদ্যমান। তবে ছৌ বিশারদ যাঁরা, তাঁরা মনে করেন ঠাটে এবং ভাবে বাগমুন্ডি ও ঝালদার ছৌ অনবদ্য। 

(পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় পর্বে)
 
চিত্রঋণ : উজ্জ্বল দাস


শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

ভজন দত্ত



নাচনী
                          

( দ্বিতীয় পর্ব ) 

নাচনীদের ভিত্তি:

" এ ছার দেশে নাহি রব পিরীতি নগরে যাব
বেছে লিব রসিক সুজনা প্রাণবন্ধু হে
পিরীতি রতন কাঁচা সোনা "

জনপ্রিয় মনোরঞ্জনী ঝুমুর ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা হল এই নাচনীদের নাচের ভিত্তি। আদিরসাত্মক ঝুমুর গানে জমজমাট হয়ে যেত আসর। অথচ রাধা-কৃষ্ণের প্রেমতত্ত্বাশ্রয়ী একটি পরিশীলিত নৃত্যশৈলীর বিকাশ ঘটানো যেতে পারতো এই নাচনী নাচকে কেন্দ্র করে। অনেক সাধক রসিক এই চেষ্টা করে গেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তা জনপ্রিয় না হওয়ায় সেই চেষ্টা প্রত্যাখাত হয়েছে বলা যায়। নাচে যৌন আবেদন থাকতো প্রচুর। পাব্লিক ডিমান্ড!
  
'টাঁড় ' বা পাথুরে জমিতে যারা চাষআবাদ করেন, তাদের পরিশ্রমকেই যথার্থ "হাড়ভাঙা পরিশ্রম " বলা যেতে পারে। এই হাড়ভাঙা খাটুনিতে ক্লান্ত মানুষ যখন রাত জেগে নাচনীদের নাচ দেখতে যেতেন, তখন তাদের জাগিয়ে রেখে, মনোহরণ করার
  সব চাইতে সহজ পদ্ধতি যৌন সুড়সুড়ি । নাচনীরা গানের তালে তালে নাচের মুদ্রায় কোমর ও বুক নাচিয়ে,ঝাঁকিয়ে , জাগিয়ে রাখতেন  দর্শক- শ্রোতাদের। 
মঞ্চের একপাশে সাজিয়ে রাখা হত রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি। দর্শক,শ্রোতারা উঁচু মঞ্চের বা ঢিবির চারপাশে গোল হয়ে বসে, দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করত। যাদের হাতে কাঁচা টাকা থাকত বা কারুর যদি ভীষণ ভালো লেগে যেত কোনো নাচনীর নাচ তবে সে তার শেষ সম্বলটিও সেফটিপিনে (টাকা) গেঁথে দিত
  নাচনীর বুকের কাপড়ে,ব্লাউজে। সেই অছিলায় নাচনীর বুকে হাত দেওয়ারও যে চেষ্টা করতেন না কেউ কেউ, সেকথা বলা যায় না।
সাজপোশাক : 
নাচনীর সাজপোশাক বেশ রংচঙে হত। রং বেরঙের ঘাঘরা পরে তারা নাচ করত।সাধারণত তারা তিনটি বা তিন থাকের রঙিন ঘাঘরা ব্যবহার করত।সিল্ক বা সার্টিন জাতীয় চকচকে ব্লাউজ ও খোপায় রঙিন জরির ফিতা থাকত।মাথায় বেলকুঁড়ির মালা,নাকে বড় নথ ও হাতে থাকত রংবেরঙের চুড়ি।পাতলা উজ্জ্বল রঙের ওড়নার সঙ্গে দুহাতে ধরা থাকত দুটি রঙিন রুমালের কোণা।বাজনদারের বাজনার তালে তালে রসিক বা অন্য কোন 'ঝুমুরিয়া' গাইত গানের কলি। সেই কলির সুরে তালে নানান ভঙ্গিতে ঘুঙুর পায়ে নাচত কখনো সখনো গাইতও নাচনী।
বাদ্য: 
প্রধানত ঢোল,ধামসা,শিঙা,'কেড়কেড়ি', সানাই, ফ্লুট, হারমোনিয়াম, আড়বাঁশি, ঝুমঝুমি ও ঘুঙুর। পরে পরে এর সাথে সিন্থেসাইজারের মত অন্যান্য আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও যোগ হয়েছে।
দল: 
একেকটি দলে পাঁচ থেকে কুড়ি জন সদস্য থাকত।স্বাভাবিক ভাবেই দলের প্রধান হতেন রসিক।স্থানীয় ভাষায় ' রসক্যা '। বড় দল গুলিতে একাধিক নাচনী থাকত।

নাচনী নাচে ব্যবহৃত মুদ্রা ও ঠাঁট : 
নাচনীর নাচের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় প্রধানত আটটি অঙ্গ। মাথা,ভুরু, চোখ, মুখ,বাহু, বুক বা ছাতি,কোমর ও পা। সুস্পষ্ট ভাবে কোনো মুদ্রার ব্যবহার এই নৃত্যে দেখা যায় না।হস্তক,বিভিন্ন গতি, চারী, ভ্রমরী প্রভৃতি ঠাঁটের লক্ষণ এই নৃত্যে দেখা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপট : 
আঠারো ও উনিশ শতকে ভারতের বিভিন্ন স্থানে রাজা ও জমিদারদের পৃষ্টপোষকতায় বাঈজী নাচের যে ধারা প্রবাহিত হয়েছিল,মানভূম অঞ্চলে তারই ক্ষয়িষ্ণু রূপ হল নাচনী নাচ। এই অঞ্চলের 'বৈভবহীন' রাজা ও            ' বিত্তহীন ' জমিদাররা তাদের অবসর বিনোদনের জন্য ব্যয়বহুল বাঈজীদের পরিবর্তে নাচে-গানে          'পাকা' নাচনীদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেছিলেন। আর জমিদারদের অনুকরণ করে স্থানীয় মানুষদের মধ্যেও সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই নাচ। যা কোনোদিন নৃত্যের মর্যাদা পায়নি। নৃত্যশৈলীর এক অবহেলিত শাখা হিসাবে স্বীকৃত না  হলেও,  লোকসংস্কৃতির এক শাখা হিসাবে যা আজও বর্তমান পুরুলিয়া জেলা ও ঝাড়খন্ডে। এখানের অনেক মানুষ আজও হাড়িয়া খেয়ে, মুখে বিড়ি জ্বালিয়ে, রাত জেগে উপভোগ করেন 'অশৌচ' এই নৃত্যশৈলীটি।
স্মরণীয় শিল্পী : 
এই নাচের প্রবাদপ্রতিম একজন শিল্পী হলেন সিন্ধুবালা দেবী। প. ব. সরকার তাঁকে      " লালন পুরস্কার " দিয়ে সম্মানিত করেছে। ১৯৮৬ তে রাজ্যপাল পুরুলিয়ায় এসে তাঁকে সম্মান  জানিয়েছেন। এছাড়াও গীতারাণি,বিমলা , রাজবালা, মালাবতী,পস্তুবালা, বুটন দেবী, জ্যোৎস্না দেবী, শিলাবতী,কাজল প্রমুখের নাম শোনা যায়।
রসিকদের মধ্যে খুদুভিরসু, চাঁদ মাহাতো,লালমোহন সিং,বুরুহাতুর দিবাকর সিং পাতর, চকহাতুর পদ্মলোচন সিং ও চামু সিং,উলুডির ভুদল সিং,ইছাডি( রাঁচি)র চক্রধর সিং প্রমুখের বেশ নামডাক ছিল বলে জানা যায়।
শেষ বলে কিছু নেই :
ঝুমুর গান ও নাচনী নাচের সম্পর্ক  সুগভীর। কালে কালে ঝুমুর গানের উত্তরণ ঘটলেও নাচনী নাচের ক্ষেত্রে তা হয়নি।এখনো নাচনীদের জীবন জীবিকার প্রশ্নে সামাজিক দৃষ্টিকোণের খুব একটা বদল হয়নি।সরকার এদের কয়েকজনকে স্বীকৃতি দিলেও সমাজ এদের আপন করে নিতে পারেনি। বাউল বাউলানিরা ধর্মের তকমা লাগিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারলেও,কিংবা সেবাদাসীরা রূপবতী হলে কোথাও রানির মর্যাদা পেলেও নাচনীরা তা পাননি। নাচনীর উপার্জিত অর্থে রসিক,বাজনদার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের পরিবার প্রতিপালিত হলেও তাদের ঘরে ঢোকার অনুমতি নাচনীরা কোনোদিন পাননি। আবার যারা নাচনীদের প্রতি মানুষ হিসাবে সহমর্মিতা দেখিয়েছে সমাজের রোষদৃষ্টি থেকে তারাও রেহাই পাননি। সুপ্রাচীন নাচনী নাচও স্থূল দৃষ্টিকোণ থেকে সূক্ষ্মমার্গে পৌঁছাতে পারেনি আজো।
প্রায় একদশক হল গ্রামগঞ্জে জনপ্রিয় হয়েছে "বুগিবুগি" নামে আর এক উদ্দাম যৌণ আবেদন মূলক নাচ। চটুল হিন্দি,ভোজপুরি বা পুরুলিয়ার ভাষার গানের সঙ্গে প্রায় নগ্ন ও যৌণক্রিয়ার ভঙ্গিতে সেই সব নাচের গুতোয় লোকসংস্কৃতি আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে। 
টিমটিম বাতির মত যে কজন আছেন তারাও অচিরেই হারিয়ে যাবেন কালের গর্ভে।কলেজ সোশ্যালের মঞ্চেও যখন এরকম
  "বুগিবুগি" নাচের ছবি ভাইরাল হয় তখন কি আর সে বিষয়ে সংশয় থাকতে পারে!
________________________________________
তথ্যসূত্র :
১) নাচনী নাচ জমিদারী ঘরানা, সুবোধ বসু রায়
২) পুরুলিয়া পরিচয়,অসিত বসু
৩)
  অহল্যাভূমি পুরুলিয়া (১ম খন্ড), সম্পাদনা - দেবপ্রসাদ জানা
৪) প্রসঙ্গ পুরুলিয়া ( ১ম খন্ড), সম্পাদনা - সুভাষ রায়
৫) পুরুলিয়া সাহিত্য সংস্কতি রাজন্য অবদান, প্রবীর সরকার
৬) ঝুমুরবালা ( উপন্যাস), শ্রমিক সেন
সাক্ষাতকার : 
১/ শ্যামল কিশোর তেওয়ারী,
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, "বর্ডার লাইন দি" , পুরুলিয়া।
  ২/ উমা মাহাতো, কবি ও শিক্ষিকা।
https://ssl.gstatic.com/ui/v1/icons/mail/images/cleardot.gif


মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

ভজন দত্ত


 নাচনী

                                 
১.
গভীর রাত।পূর্ণিমা। ছায়া ছায়া কয়েকটি গাছ নিশ্চুপ জেগে। দূর থেকে ভেসে আসছে এক নিঃসঙ্গ কুকুরের করুণ কান্নার শব্দ।পুরুলিয়ার টাঁড়জমিতে দাঁড়িয়ে ঐ কয়েকটি গাছের অস্পষ্ট ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক মানুষ।দূর থেকে বোঝা যায় কিছু একটা ঘষটে ঘষটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরা কাছে এলে বোঝা যায় সেটা একজন মানুষের। পাথরে, মাটিতে ঘষা খেতে দেখা যায় একটি শবদেহ। মাথার চুল,হাতের চুড়ি,পায়ের আলতা দেখে বোঝা যায় সেই শবদেহ একজন মহিলার। শবদেহ টানতে টানতে রুখুটাঁড়ে মিলিয়ে যায়  মানুষটি।আবহে জেগে থাকে একটি শবদেহ টেনে, হিচড়ে, ঘষটে নিয়ে যাওয়ার শব্দ। 

কাট। কাট।কাট।

না।

কোনো ছায়াছবির বর্ণনা নয়।নাচনীদের জীবনের অন্তিম ছবিটা আরো মারাত্মকভাবে দৃশ্যায়িত হতে পারে।
এদের জীবন বড়ো কষ্টের, বেদনার। রসিক, যিনি নাচনীর মালিক,তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসাবে যতদিন তাদের যৌবন থাকে, ' গতর' থাকে,মজা,আনন্দ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে ততদিন তাদের খাওয়াপরা,চিকিৎসার সুযোগ থাকে।কিন্তু বার্ধক্যে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় লোকচক্ষুর আড়ালে নাচনীদের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।  সমাজে এরা     ' বিষকন্যা ', 'অস্পৃশ্য' হিসাবে গ্রামে থাকার সুযোগ পেতেন না। গ্রামের এক প্রান্তে তাদের কোনোরকম ঠাঁই হোতো।কোনো সামাজিক স্বীকৃতি তাদের ছিল না। নাচনীদের সঙ্গে রসিকরা বা তারই ঠিক করে দেওয়া কোনো খদ্দের বা ইয়ার শয্যাগমন করলেও কোনোদিন জীবনসঙ্গিনীর মর্যাদা তাদের জুটত না। তারা যাতে সন্তান ধারণ করতে না পারে তার জন্য দেশীয় উপায়ে তাদের বন্ধ্যা করে দেওয়া হোতো। এরপরেও কারো যদি সন্তান হয়ে যেত,  তার পিতৃ পরিচয় জুটত না। সমাজে  সেই শিশুটির পরিচয় হোতো 'বেদ্উাবাচ্চা ' বলে। সমাজের ভোগলালসার শিকার হয়ে, 'নীলকন্ঠ ' হয়ে যেদিন তারা " অমরলোকে" যাত্রা  করতো,তখন কেউই  তার শবদেহ সৎকার করতেও আসতেন না ।রাতের অন্ধকারে গরুর জোয়ালের সঙ্গে শবদেহের পায়ে দড়ি বেঁধে সম্পূর্ণ অবজ্ঞার সঙ্গে ফেলে আসা হত ভাগাড় থেকে আরো দূরে। শ্মশানেও তাদের ঠাঁই হত না।স্বর্গে যাওয়ার জন্য তাদের কাছে ধোঁয়ার রথের স্বপ্ন দ্যাখাও ছিল নিষিদ্ধ। এ অভাগীদের কাছে স্বর্গের স্বপ্নও ছিল নিষিদ্ধ। 

#
নাচনী শব্দটি কানে 'প্রবেশিলে' তথাকথিত  'ভদ্দরনোক'দের গা টা যেন রি রি করে উঠে এখনো। একসময় মানভূম অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল এই নাচনীদের 'লাচ'। বাঈজীদের নিকৃষ্ট বা অপভ্রষ্ট রূপ এই নাচনীরা। জনপ্রিয় ঝুমুর গানের সঙ্গে, তালে তালে এই নাচের বিস্তার।
পুরুলিয়ার 'ছো' বা 'ছৌ' নাচ যেমন পৌরুষদৃপ্ত তেমনি নাচনী নাচ হল রমণীস্নিগ্ধ।

#
সাধারণত সামাজিক, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেনির মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত নাচনী। অনেকক্ষেত্রে তারা কিছু পুরুষের লালসার শিকার হয়ে বা সামন্তশ্রেনির কিছু মানুষের উচ্ছৃঙ্খলতার শিকার হয়ে, ভারতীয় নৃত্যকলা শিল্পের এই ব্রাত্য শাখায় যোগ দিতে বাধ্য হত। অভাবের তাড়নায় বা কোথাও আবার প্রেমের ফাঁদে পড়েও নাচনী হওয়ার ঘটনা শোনা যায়।মূল 'নাটেরগুরু' বা ' কলকাঠি'র কাজটি করতো  'রসিক'। রসিকদের একাজে সাহায্য করতো সমাজের নানানজন।এব্যাপারে মহিলারা ছিলেন অগ্রণী। একজন মহিলা 'কানাঘুঘু'র ভূমিকায় অভিনয় করে সহজেই আরেকজন মহিলাকে রসিকের হাতে তুলে দিতেন,সব জেনে বুঝেই। প্রতিটি নাচনী, রসিকের অধীনে ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে ব্যবহৃত হত।

#
মানভূমের সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে দেখা যায় অনেকক্ষেত্রে ছোট ভূস্বামী নিজেরাই ছিলেন রসিক। নাচনীরা যেহেতু রসিকের ব্যক্তিগত সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হত  সেহেতু নাচনীদের পারিশ্রমিকের সিংহভাগ বা পুরোটাই রসিক নিজে আত্মসাৎ করত।
 জমিদার বাড়িতে সেই সময় ঝুমুর গান সহযোগে নাচনী নাচ সাদরে আমন্ত্রিত হত ও প্রত্যাশিত পারিশ্রমিক পেত। নাচনীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য,তার 'গতর'টিকে আকর্ষণীয় রাখার জন্যই নাচনীদের খাওয়া-পরা-চিকিৎসার দেখভাল ও যোগাড় করত রসিক। বিনিময়ে তারা ইচ্ছেমত নাচনীদের ব্যবহার করত। রূপ- যৌবন-শরীর ক্ষয় হলে তাদের ত্যাগ করে রসিকরা আবার সন্ধান করত অন্য এক নাচনীর।অনেকে না হলেও কয়েকজন রসিকের কথা জানা যায় যারা নাচনীকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিলেও ' রাখনী' হিসাবে রেখে দিতেন। শোনা যায় আবার নাচনী লুঠের ঘটনাও। চুরির উপর তো বাটপাড়ি হয়। হয়তো সেই নাচনীর এত সুনাম,আকর্ষণ ছিল যে লুঠ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। গায়ের জোর,ক্ষমতা বা 'পৌরুষ' দেখানোর জন্য অনেক সামন্তপ্রভু বা রসিক বা অর্থবান মানুষেরাই যুক্ত থাকতেন এই  "নাচনীলুঠ" করার ঘটনায়।


(আগামী সংখ্যায় শেষ হবে )


মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০১৭

ভজন দত্ত



.
পৃথিবী জুড়ে টেরাকোটা শিল্পের বিকাশের পিছনে অর্থনৈতিক অগ্রগতি টেরাকোটা শিল্প ধরে যদি মানব সভ্যতার বিকাশের ধারা লক্ষ করা হয় তবে আশ্চর্য হতেই হয় সেই সময়ে পৃথিবীজুড়ে একটা শিল্পের বিকাশ ঘটছে ভারতে মগধকে কেন্দ্র করে যে শিল্পের বিকাশ ঘটেছে তা আস্তে আস্তে সারা ভারতেই ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে সব শিল্পেরই নিবিড় যোগাযোগ টেরাকোটাও তার ব্যতিক্রম হয় নিঅর্থবান  শৌখিন মানুষ চিরকালই এর কদর করে আসছেন
বাঁকুড়ায় 'মাল'( মল্ল)রা বিষ্ণুপুর সংলগ্ন ঘাট রক্ষার মাধ্যমে একটি সামন্ত রাজ্যের সূচনা করেন আদিমল্লের নেতৃত্বে  ঘাট যারা দেখা শোনা করতেন তাদের বলা হোত ঘাটোয়াল সেই সময় বনের ভেতর পথগুলি সুরক্ষিত  নিরাপদ রাখা,অবাঞ্ছিত লোকজনব্যবসায়ী,পর্যটক,অনুপ্রবেশকারী দের প্রতি নজর রেখে রাজাকে খবর দেওয়াযুদ্ধের সময় রাজাকে সশস্ত্র সাহায্য করা ছিল ঘাটোয়ালদের কাজরাজারা এজন্য ঘাটোয়ালদের জমিবন দিতেন কর ছাড়া 'গিভ এন টেক পলিসি ' এই ব্যবস্থা ঘাটোয়ালি বলে পরিচিত বনের মধ্য দিয়ে যেতে হলে পথিক বা বণিক বা অন্য কাউকে প্রধান ঘাটোয়ালের কাছে ছাড়পত্র নিতে হত নজরানা দিয়ে না নিলেই লুঠ হবার আশঙ্কা ছিল এক ঘাটোয়ালের এলাকা থেকে আরেক ঘাটোয়ালের এলাকায় ঢুকতে আবার নজরানা দিলেই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যেতমাল রাজা দের প্রতিষ্ঠিত মল্লরাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তিটি ছিল এই ব্যবস্থাপ্রাচীন কাল থেকে 
অরণ্য অধ্যুষিত এই সব অঞ্চলে রাজাদের খাজনা আদায়ের ব্যাপারে ততখানি মাথাব্যথা ছিল না তাই এসব এলাকা নিয়ে সাধারণভাবে তাদের লক্ষ্য থাকতো কম এই সুযোগেই এই এলাকায় ঘাটোয়ালরাই ছিলেন ' রাজা ' মোগল আমলেষোড়শ শতক থেকে যে মল্লরাজ্যের যাত্রা শুরুআদিমল্লের হাত ধরে
এই সময় থেকেই বাঁকুড়া জেলায় টেরাকোটা শিল্পের বীজ বপনের কাজ শুরু হয়েছিল বলা যায়কারণ পরবর্তীকালে মল্লরাজারা উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে এক দূর্গনগরী বিষ্ণুপুরকে টেরাকোটা মন্দির দিয়ে সাজিয়ে তোলেন তাঁদের রাজবাড়ীর ধ্বংসস্তুপে কোনো একটি প্রাচীর দাঁড়িয়ে না থাকলেও মন্দিরগুলি আজো অপার বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে আছে



.
বাঁকুড়া জেলায় টেরাকোটার সবচাইতে প্রাচীন নিদর্শন একটি যক্ষীমূর্তি,পাওয়া গেছে পখন্না গ্রামে
বিশেষজ্ঞদের মতে এটি খ্রিপূ তৃতীয় শতকের অর্থাৎ টেরাকোটা চর্চা বাঁকুড়া জেলায় প্রাচীনত্বের দাবি রাখে বিষ্ণুপুর থেকে কাছেই ডিহর গ্রামেও অনুরূপ মূর্তি পাওয়া গেছে বাঁকুড়া বিষ্ণুপুর রাস্তার উত্তরে বালিয়াড়া গ্রামের উপকন্ঠে সোনাতপলের মন্দিরবহুলাড়ার মন্দির বহুচর্চিত,প্রশংসিত কিন্তু পরবর্তীকালে সপ্তদশ শতকে মল্ল আমলে নির্মিত মন্দিরগুলি সব আলো টেনে নিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে যা সম্ভব হয়েছিল মল্ল রাজাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় যেগুলির নির্মানকাল ১৬২২-১৭৫৮ খ্রিঃ
বহুলাড়ার মন্দিরটি প্রায় হাজার বছরের পুরানোএখনো দৃশ্যমান সিদ্ধেশ্বর মহাদেবের এই মন্দিরটি পোড়া ইটের তৈরীজেডিবেগলার সাহেব বলেছেন " The finest brick temple in the district, and the finest though not the largest brick temple that I have seen in Bengal... "
মন্দিরটি মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরী করে সুদৃশ্য ভাবে নির্মিত হয়েছে তার প্রশংসা করেছেন সকলেই মন্দিরটির জৈন ধর্মের বেশ কিছু লক্ষণ থাকলেও ( inside a naked Jain standing figure)
দীর্ঘদিন ধরে এটি শিবমন্দির হিসাবেই খ্যাতি লাভ করেছে 
সম্প্রতি  বৈশাখ২৪ সোনাতপল ঘুরে এসে আমার এক বন্ধু জানালেন
সেখানের মন্দিরটিতেও শুরু হয়েছে শিবপূজা যেটি সূর্য মন্দির হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে বিভিন্ন গবেষকের লেখায়জেলায় শিল্পসুষমামন্ডিত টেরাকোটা মন্দির নির্মানের আগে এই দুটি বিখ্যাত মন্দির কি টেরাকোটা শিল্পীদের ভাবতে সাহায্য করেনিপরবর্তী নির্মানকৌশল নির্ধারণে তো সাহায্য করেছিল একথাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় মাটি পোড়ানের কৌশল ভালোভাবেই রপ্ত হয়েছিল বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি নির্মানের আগেই
১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা রঘুনাথ মল্লদেবের সময় তৈরী হয় পাঁচচূড়া মন্দিরযেটি শ্যামরায়ের মন্দির নামেও পরিচিতএর বারো বছর পর তৈরী হয় এখনকার জগদ্বিখ্যাত কৃষ্ণরায় জোড়বাংলা মন্দিরটি
এই পাঁচচূড়া শ্যামরায়ের মন্দিরের দেওয়ালের অলংকরণ কালের কালো কালিতে ঢেকে আছেবিশেষজ্ঞদের মতেশ্যামরায়ের মন্দিরটি, " লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মূর্তি  কারুকলার সমাবেশ যেন লক্ষ কোটি তরঙ্গভঙ্গিম কারুকার্যময় সমুদ্র অপরদিকে কৃষ্ণ রায় জোড়বাংলায় আছে সাধারণ নরনারীদের তালবাদ্য বাজানো  সঙ্গীতচর্চার দৃশ্য  বাস্তব যুদ্ধদৃশ্যের কাজ
বিষ্ণুপুরে এখনো সেল্ফি তোলার পজিসনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি আগের দুটি ছাড়াও রাধাবিনোদমদনমোহন  শ্রীধর মন্দিরএর মধ্যে বসুপাড়ার শ্রীধর মন্দিরটি ( অষ্টাদশ শতকে নির্মিত)বাদ দিলে বাকিগুলি সপ্তদশ শতকেই নির্মিত
.
বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা নিয়েঅসাধ্য সাধন করে একটি গ্রন্থ লিখেছেন শ্রদ্ধেয় চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত মহাশয় "বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা " নামেবন্ধু,ভাই প্রদীপ কর অত্যন্ত যত্ন সহকারে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছেন ১৪২২এর কার্তিক মাসে মানে ডিসেম্বর২০১৫ তে এটিতে লেখক বিপুল সংখ্যক ফলকের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করেছেনসেখানে বিভিন্ন নকশি  মূর্তি মোটিফ  দৃশ্যের বর্ণণা যেমন করা হয়েছে তেমনি সেগুলির উৎস  তাৎপর্য সম্পর্কে গভীর আলোচনা করেছেনউৎসাহী  আগ্রহী পাঠকপাঠিকাগণ উক্ত গ্রন্থটি সংগ্রহ করে বিশদ জানতে পারেন
টেরাকোটা শিল্পটি একটি গোষ্ঠী শিল্প দিনের পর দিন পেটে ভাতে বা জমির বন্দোবস্তে সৃষ্টির নেশায় ফুটিয়ে অপরূপ সব শিল্পকর্ম সেই সৃষ্টিতে পৃষ্ঠপোষকদের প্রভাব থাকবে না তা হতে পারে না সে কারণেই বৈষ্ণবধর্ম অনুরাগী রাজাদের ইচ্ছামত মন্দিরগুলির অলঙ্করণে কৃষ্ণলীলার চিত্রগুলি প্রাধান্য লাভ করেছে লোকায়ত সংস্কৃতির ভাবনাও আছে তাতে পারসিক,মোগল,রাজপুতবৃন্দাবন,গুজরাটি,ওড়িষ্যার প্রভাব আছে চিত্রগুলিতেযে 'বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য' কথা বলা হয় ভারত সম্পর্কে তা এখানেও দেখা যায় 
উক্ত গ্রন্থটির ৫২ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ থেকে-- " একদিকে শ্রীমদ্ভাগবতের চিত্রগুলির ধর্মীয় স্পর্শ অন্যদিকে গীতগোবিন্দ রসিকপ্রিয়া  রাগমালার লিরিক চিত্রগুলির গীতিময়তা ষোড়শসপ্তদশ শতকের রাজপুত চিত্রে কৃষ্ণলীলার যে বর্ণাঢ্য জগৎ সৃষ্টি করল তারই প্রভাব পড়ল রাজপুতানা তথা উত্তর ভারতে ললিত গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম;..... " এই প্রভাব অতিক্রম করা ছিল তখন প্রায় দুঃসাধ্য
বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পেই শুধু নয় এর প্রভাব পড়েছিল পট,পাটা চিত্রে এমনকি সঙ্গীতেও
সারা বাংলাদেশে একটি মাত্র মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর বাংলার একমাত্র সঙ্গীত ঘরাণাও বিষ্ণুপুরী ঘরাণা

(ক্রমশ )

------------------------
তথ্যসূত্র  সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী আগামী সংখ্যায় ]


ছবি কৃতজ্ঞতা স্বীকার : অরিণ রায়