মৌসুমী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মৌসুমী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

মৌসুমী

কলকাতার পথচলা #


কোম্পানির শাসনের শুরুতে কলকাতায় রাস্তা বলতে পায়ে চলা পথ | বনজঙ্গল নদীর পাশ দিয়ে কিংবা এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় মানুষ পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করতো | যদিও বেশ কিছুটা দূরের পথে যেতে হলে যানবাহন বলতে গরুর গাড়ি আর পালকি |  কলকাতার বাবুরা পালকি চড়েই যাতায়াত করতো |বলা যায় বাবুকালচারের প্রতীক ছিল পালকি| তাদের বাড়ির মেয়েরা সে কালে পরপুরুষের চোখের আড়ালে গঙ্গাস্নানে যেত পালকি চড়ে| সব সমেত বেহারারা পালকি জলে ডুবিয়ে তুলে নিতো | বড় ঘরের মেয়েদের সঙ্গে পুণ্য অর্জন থেকে পালকিও বাদ পড়তো না|

1798/99 সাল নাগাদ প্রথম বড় চওড়া খোয়া বাঁধানো রাস্তা সার্কুলার রোড তৈরী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার রাস্তায় ছুটতে লাগলো ঘোড়ায় টানা গাড়ি| গতি পেলো কলকাতার নগরজীবন | ব্রাউনলো তার আদরের পালকিতে চাকা লাগিযে তার সামনে ঘোড়া জুতে দিতে বানিয়ে ফেললো ব্রাউনবেরি গাড়ি|তাঁর মস্তিস্কপ্রসূত এই ব্রাউনবেরি নামক ঘোড়ার গাড়ি সেকালে খুবই জনপ্রিয় ছিল | আসতে আসতে সাবেকি পালকির জায়গায় সাহেবদের জন্য দামি  আর কর্মচারীদের জন্য সাদামাটা ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয় | নানান নামের এই সব ঘোড়ার গাড়ি| চেরট,ফিটন,ল্যান্ডো, টমটম,এক্কা গাড়ি যাকে হয়তো ছ্যাকড়া গাড়ি বলা হয়| “এক্কা গাড়ি ঐ ছুটেছে ঐ দেখো ভাই চাঁদ উঠেছে”---আধুনিক কলকাতার রাস্তায় যা আজ অতীত |

এখনো আমরা কথায় কথায় বলি রাস্তায় গাড়ি ঘোড়ার খুব চাপ | সেই ঘোড়ায় টানা জুড়িগাড়ির কথা কে না জানে?? কিন্তু পাথুরিয়াঘাটার যদু মল্লিকের নাতি মন্মথ মল্লিকের  ট্রটিং গাড়ি টানতো দুটো জেব্রা | তাঁর আস্তাবলে ঘোড়া নেই তা নয় নিজের আভিজাত্য জাহির করতে বলা যায় বড়োলোকি খেয়াল চরিতার্থ করার জন্যই তিনি আলিপুর পশুশালা থেকে ছ হাজার টাকায় দুটি জেব্রা  আনান| তাকে ট্রেনিং দিয়ে গাড়ি টানাবার উপযুক্ত করানো হয় | সালটা খুব দূরেরও নয় 1935 এর ঘটনা | কলকাতার রাস্তায় সেদিন মহা ধুমধামের মধ্যে দিয়ে জেব্রা টানা সেই গাড়ি ছোটে, মহানগরের রাস্তায় তা দেখার জন্য ভিড় উবচে পড়ে| হয়তো সেখান থেকেই পরবর্তীকালে জেব্রা ক্রসিংয়ের  সূত্রপাত |

এই জেট গতির যুগে ভাবলে অবাক লাগে, দেড়শো বছর আগে বিবেকানন্দের মাতা ভুবনমোহিনী দেবী শিশু বিবেকানন্দকে নিয়ে কলকাতা থেকে মধ্যপ্রদেশের  রায়পুরে যাচ্ছেন স্বামীর কাছে গরুর গাড়িতে চেপে |
সালটা 1873 এর 24শে ফেব্রুয়ারী সে এক বিস্ময়কর মজার দিন | ঐ দিন ব্রিটিশ সরকার ঠিক করেছে পণ্য  সরবরাহের সুবিধের জন্য ট্রাম চালাবে |ইংলিশম্যান পত্রিকার খবর অনুযায়ী ওই দিন মাল নয় সেকেন্ড ক্লাসের  টিকিট কেটে মানুষই ট্রামে চেপে বসে | তা বসলে হবে কি! গাড়ি তো মোটেই এগোয় না| অস্ট্রেলিয়া থেকে তেজি ঘোড়া আমদানি করা হয়েছে, তাসত্ত্বেও ট্রাম একচুল  নড়ে না | এদিকে ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে শিয়ালদা স্টেশন ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর লোক টিকিট কেটে ট্রামে চেপে বসেছে| সেদিন থেকেই কোম্পানি বুঝে গেছে এই ভূতের বোঝা বয়ে নিয়ে যেতে হবে| যত না লোক ট্রামে চড়েছে  তার থেকে অনেক বেশি মানুষ জড়ো হয়েছে সেদিনের মজা দেখার জন্য | ইংলিশম্যান পত্রিকায় সেদিন যারা ট্রামে চড়তে পারেনি তাদের দুঃখের কোথাও বর্ণনা করা হয়েছিল |

ইতিহাসে আছে ঠাকুর বাড়ির মেয়ে বৌরা হ্যাটকোট পরে ঘোড়ায় চড়ে ময়দানে হওয়া খেতে বেরোতেন | রাস্তা  দিয়ে তাদের যেতে দেখে চিতপুরের অঞ্চলে বাড়ির মহিলারা জানলার কপাট বন্ধ করে দিতো ঝটাস ঝটাস| সেযুগের প্রেক্ষিতে ওই দৃশ্য দেখাও ছিল মহাপাপ| জানতে পারলে স্বামী গঙ্গাজলি হবে | কিন্তু ঘটনাটা মোটেই মিথ্যে নয় | জ্যোতিরীন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রী কাদম্বরীদেবীকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ময়দানে বৈকালিক ভ্রমণে বার হতেন |
সেইসময় গগনেন্দ্রনাথতার কন্যাকে স্বয়ং ঘোড়ায় চড়া শিখিয়ে ছিলেন | এই ঘোড়সওয়ারীদের দের হাওয়া লাগে পটুয়া  পাড়াতেও| সে পাড়ার মেয়েরা দেখে পোটো তার হাতের মুন্সিয়ানায় বানিয়েছে ঘোড়ায় চড়া এক নারী | তখন তারা বলাবলি  করে এ নিশ্চই ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের পট | তা দেখে কেউ কেউ হিংসায় মুখ বেঁকালো, কেউ আবার তার স্বামীর কাছে বায়না জুড়লো ওরকম একটা পট কেনার | কিন্তু এ ছবি কোথায় যেন মুক্তির আলোকবর্তিকা  স্বরূপ | হয়তো এভাবেই অন্দরমহলের খিলটা ধীরে ধীরে খুলে যায় প্রবেশ করে এক ঝলক টাটকা বাতাস |

সব যুগেই যারা সময়ের থেকে এগিয়েছিলেন তাদেরকে সমসাময়িক  সময়ের অনেক নিন্দা সমালোচনার ঝড় সামলে এগোতে হয় যার সুফল ভোগ করে পরবর্তী প্রজন্ম |
ভাগ্গিস তাঁরা সমসাময়িক নারী সমাজের জড়তা কাটিয়ে সম্মুখের ঐ বাঁধনছেঁড়া রাস্তায় পা ফেলেছিলেন | যে পথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছে আজকের নারী| সেই জয়যাত্রার পথ ধরেই আমার প্রিয় শহর কলকাতারও অগ্রগতি | আজও সে  ক্রমাগত নিজেকে ভাঙা গড়ার মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলছে | তাইতো এ নগর চির যৌবনা, চির নবীনা | চলায় তার ক্লান্তি নেই | তার এই বিরামহীন চলার সাক্ষী হয়ে আছে সেই সময়ের মাইলফলক সভ্যতার চাকা| চাকা আবিষ্কার যেমন একটা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় তেমনি কোনো শহরকেও  অগ্রগতির সোপানে আরোহন করতেও সাহায্য করে ||

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

মৌসুমী






তখন বেশ ছোট | স্কুল থেকে ফিরে নেশার মতো খেলার মাঠে চলে যেত মেয়েটি | জানতো কেউ খেলতে নেবেনা, এই বোকা সোকা রুগ্ন শান্ত মেয়েটাকে | তবুও যায় যদি ডাকে ভুল করে কিন্তু তা হয়না কোনো দিনই | খেলা যখন জমে ওঠতো, সে তখন মনমরা হয়ে আস্তে আস্তে মাঠ থেকে একলা ফিরে এসে বারান্দার রেলিং ধরে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকতো | যতক্ষণ না মাঠের শেষে নিম গাছের মাথার কমলা আলোটা আস্তে আস্তে গাঢ় হচ্ছে | একদিন মা দেখে তার মেয়ে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে, বারান্দার গ্রিলে চিবুক ঠেকিয়ে | আলতো ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করে,
-- “ কি হলো সোনা ? খেলতে যাওনি ??”
 মেয়ে ফোঁপায় তারপর মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে বলে,
--” আমারতো বন্ধু নেই, কার সাথে খেলবো ! কেউ আমায় খেলতে ডাকে না |”
-- সত্যি সত্যি বন্ধু চাস ? যে কোনোদিন ছেড়ে যাবে না | বড়ো বড়ো চোখ করে ছোট মেয়েটা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “ সত্যি !! কোথায় পাবো তাকে ???”
মা তখন মেয়ের হাত ধরে নিয়ে যায় তাদের বইয়ের আলমারির কাছে | হাতে তুলে দেয় অবন ঠাকুরের ‘রাজ কাহিনী’ | সেই থেকে শুরু বন্ধুত্বের, আজও সে বন্ধন অটুট | আর কোনোদিন মেয়েটা ভেবেও দেখেনি তার বন্ধু আছে কিনা !! সে যত বড় হয়,যত বাড়তে থাকে তার মনের খিদে পাল্লা দিয়ে তার বইবন্ধুও ভিন্ন স্বাদের ব্যঞ্জনা পরিবেশন করে| সে মনে মনে তৃপ্ত হয় | বাহ্যিক অতৃপ্তি তাকে গ্রাস করতে পারেনা | সেই আত্মমগ্ন বালিকা আসতে আসতে বড় হতে থাকে| সবার মাঝে থেকেও মনে মনে সে বই বন্ধুর সান্যিধ্যের জন্য উতলা হয়ে ওঠে | জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আজও সেই টান এতটুকু কমেনি |
কিশোর সাহিত্য শেষ করে মনে তারুণ্যের রং লাগে এই বন্ধুর হাত ধরেই | কত কবিতা, কত উপন্যাস - গল্প যে সারাদিন তার মন জুড়ে থাকে তার ইয়ত্তা নেই | একদিনের কথা মনে পড়লে এখনো সে  লজ্জার পায়, আবার আপনমনে হেসেও ফেলে | সে তখন ক্লাস নাইন, ক্লাসে বাংলা স্যার রচনা লিখতে দেয় বিষয় “তোমার প্রিয় উপন্যাস “--- মেয়েটি তখন শরৎসাহিত্যে বুঁদ সে আবেগের বশে কলম বাগিয়ে লিখে দিলো ‘দেবদাস’ এবং প্রিয় হবার কারণটিও সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলো | স্যার পড়ে যথারীতি ‘থ’| শুধু গম্ভীর মুখে বললেন তুমি একটি অকালপক্ক মেয়ে, বোর্ডের পরীক্ষায় যেন এটি আবার লিখে বসনা !! কোনো শিক্ষামূলক গ্রন্থের নাম লিখো দয়া করে |

এই বই তাকে শিখিয়েছে জীবনের পাঠ , শিখিয়েছে উচিত অনুচিতবোধ , দিয়েছে সংস্কারমুক্ত দৃষ্টি, খোলা মনে সব কিছু বিচার করার শিক্ষা | বইয়ের হাত ধরেই  লাবণ্যর ব্যক্তিত্ব তাকে মুগ্ধ করে , সুবর্ণলতার জেদের সাথে তার পরিচয় হয় দীপাবলির লড়াই তাকে শিক্ষা দেয় নিজের পায়ে দাঁড়াবার সাহস | মনে মনে রম্যানিবীক্ষ’র গোপালদার সাথে ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণ সেএকসময়  চষে বেড়িয়েছে | বই ভালোবাসার জন্যই ভবিষ্যতে ইতিহাসে অনার্স পড়তে বিন্দুমাত্র ভয় পায়নি |

ছোটবেলায় বর্ষা কাল ভীষণ প্রিয় ছিল মেয়েটার | ঝমঝম বর্ষায় কাঁথা মুড়ি দিয়ে বইএর জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলার পিছুটান আজও তাকে বড় লোভাতুর করে তোলে |
 সে তখন কলেজ, যেতে আসতে হাতে বই ধরা | ট্রেনের অপেক্ষায় স্টেশনের বেঞ্চে বসে আছে হাতে বুদ্ধদেব গুহ | অচেনা একজন প্রায় দেখে মেয়েটিকে ট্রেনের অপেক্ষার ফাঁকে বইয়ে ডুব দিতে | কৌতূহলবসত একদিন  জিজ্ঞেস করে বসলো কি বই? মেয়েটি বলে ‘কোজাগর’| ছেলেটি তারিফ সূচক ঠোঁট মোচড়ায়  | পরদিন আবার স্টেশনে হাজির সেই অচানক| এবার তারও হাতে বই | মেয়েটি চোখ মেলে তাকালে ছেলেটি বলে পড়বেন ‘বাংরিপোসির দুরাত্রি’ বুদ্ধদেব গুহর | --  হঠাৎ বই !
--  আপনার জন্য | আপনি পড়েন দেখি তাই!! ইচ্ছে না হলে থাক |
মেয়েটি হাত বাড়ায় | বোধহয় সেদিন বইয়ের সাথে আঙুলটাও অজান্তে ছুঁয়ে ছিল , যা আজও ধরা আছে যার যোগসূত্র সেই বই  …...