সৌমী আচার্য্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৌমী আচার্য্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সৌমী আচার্য্য


 



আড়াল


কেওনঝড় থেকে ফেরার পথে ছোট্ট চায়ের দোকানটায় নেমে পড়েছিলাম। বৃষ্টি হয়েছে গতরাতে। মৃদুলা কিছুতেই থাকতে রাজি হল না ফলে আমার পরিকল্পনা জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরতে হল। এখানে রাস্তাটা বেশ উঁচু। পাহাড় ঠিক না তবে উঁচু টিলা। টিলার টঙে দোকানে পিছনে বেশ খাদ মতো, নীচে জলাটা বর্ষার জলে থৈ থৈ। ওড়িশার অন্দরে গাছের প্রাচুর্য যথেষ্ট। দোকানির চোখ কোটরগত তিক্ষ্ণ, বেঁটেখাটো তৎপর ভঙ্গি। মৃদুলা বহুক্ষণ থেকেই কিছু খুঁজছিল বুঝতে পারছিলাম। ড্রাইভিং সিটে থেকেও বিষয়টা বুঝতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি। ভাবলাম টয়লেটের প্রয়োজন হয়তো। যদিও মনটা খিঁচড়ে ছিল বলে আগ বাড়িয়ে কিছুই জিজ্ঞাসা করিনি। অনেকগুলো টাকার দণ্ড গেল। এখন আবার নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। চায়ের দোকানটা খানিকটা স্বস্তি দিল। গুছিয়ে বসে ঘন দুধের চা, বাদাম দেওয়া বিস্কুট আর ডবল ডিমের অমলেট খেতে শুরু করলাম। মৃদুলা উল্টো দিকের বেঞ্চে বসে লঙ্কা বেছে অমলেট খাচ্ছে। ওর সঙ্গে দূরত্বটা এখন অসহ্য হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে কিছুই মেলেনি আমাদের। তার উপর বছর বত্রিশের মৃদুলাকে এখন একটু বয়স্ক লাগে, বোধহয় ওজনটা বেড়েছে বলে। তাছাড়া সবেতেই তো অসন্তুষ্ট। মুখে সেই ছাপটাই বড় হয়ে ফুটে ওঠে। বিরক্ত লাগে বলেই তাকাই কম। এখন চা খেতে খেতে দেখি কিছু খুঁজেই চলেছে। বৃষ্টিটা শুরু হল আবার। টিনের চালে ঝমঝম শব্দ বাড়তে থাকল। দোকানি গলা তুলে বলল, দাদা আর কিছু লাগবে? আরেক কাপ চা চেয়ে নিলাম। ইতিমধ্যে একটা বাইক এল দুজন আরোহী নিয়ে। কালো রেনকোট পরা লোকদুটো নেমেই সিগারেট ধরাল, মনে হল লোকাল। অনর্গল ওড়িয়া ভাষায় তুমুল কথা বলছে। ওড়িয়া বুঝি কিন্তু বলতে পারিনা। কথাগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং।

-যাদের বেশি টাকা তাদের ওরম হয় আমাদের হয় না।

-বাজে কথা বলিস না, রঞ্জাকুমার টাঙি দিয়ে বউটাকে খাটো করে দেয়নি। কাটা মুণ্ডুটা বিস্ময়ে ভয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়েছিল। আর মুকুর! নিজের বাপকে মেয়ে হয়ে বিষ দিতে দুবার ভাবেনি। ওসব বড়োলোক গরীবলোক কোনো ব্যাপার না। শালার রিষ সকলের মধ্যেই।

-তবু ওরা সব পারে আমরা পারিনা। আমার বউয়ের ঢিলা শরীর, কষকষে গলা আর আবর্জনার মতো মন তবু কি এমন ভাবতে পেরেছি।

-হয়তো এমন কিছু আছে তুই আমি বুঝতে পারছি না।

-তুই শালা এদের হয়ে এত কথা বলছিস কেন?

ওদের কথা শুনে বেশ মজা পাচ্ছিলাম। পয়সা কড়ি থাকলেই লোকের জ্বালা ধরে অনেকখানি। তবে এদের ভিতর আরও কিছু গোপন কথা লুকিয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে। মৃদুলা খাওয়া শেষ করে মোবাইলে একমনে কিছু দেখছে। লিখছে। ছবি তুলছে। আমি ওর ফ্রেমে আসছি তবু সরছে না। সেই প্রথম দিনগুলোর মতো। একটু যেন হাসল। আমি ভুল হতেও পারি। এখনঢ়কটা বাজে? চমকে উঠলাম। এতক্ষণে সবটুকু সমাধান হয়ে যেত হয়তো। ছেলেদুটো মন দিয়ে মোবাইল দেখছে। আমাদের দিকেও একবার যেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। সেই হানিমুনের দিনের স্মৃতি ভেসে এল। 

রাবাংলায় এক মনোরোম পরিবেশে ছিমছাম হোমস্টেতে নতুন বউ নিয়ে উঠেছিলাম। পাশের ঘরে চার বেহেড মাতাল। মৃদুলা তখন মোটামুটি সুন্দর। সারাক্ষণ ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে মাতালগুলো। শেষে বউকে বগলদাবা করে সোজা গ্যাংটক। জমজমাট এমজি মার্গে বিখ্যাত হোটেলের তিনতলায়। আজও একটা অস্বস্তি হচ্ছে। চেয়ার ছেড়ে মৃদুলার দিকে এগিয়ে গেলাম।

-কিছু বলবে? কিছু লাগবে?

-নাহ্, এখানে তোমার পাশে একটু বসি।

-আমার পাশে? হঠাৎ! কেন তোমায় আজ কেউ ফোন করেনি, ওহো এখানে বোধহয় নেট ওয়ার্ক নেই না!

এত অপমান! ভুলে গিয়েছে নিজের যোগ্যতা! ওর বাবার দু কামরার ওই বাড়িতে কিছুই ছিল না অভাব ছাড়া। রানী করে রাখতে না চাইলেও অভাব কিছু দিইনি কিন্তু বিনিময়ে জুটল কেবল জ্বালা। একটু যদি নরম সরম হত এতকিছু ভাববার দরকার হত না।

-কী হল উঠে যাচ্ছ যে?

-আমি থাকলে তোমার বোধহয় ভালো লাগবে না।

-নাকি আমায় ভালো লাগছে না!

-আমি কিন্তু বসতেই এসেছিলাম।

-তাহলে যাচ্ছ কেন?

-তুমিই তো প্রশ্ন তুললে।

-প্রশ্ন তুললাম বলে চলে যাবে? আত্মপক্ষ সমর্থন করলে না?

-তোমাকে আমি বুঝতে পারিনা। কী চাও তুমি?

-বুঝতেই পারোনা যখন তখন আর জানতে চাইছো কেন? আমি বললেই কি তুমি বুঝবে?

কথা বাড়িয়ে লাভ নেই উঠে চলে আসি দোকানটার পিছনে। চমৎকার জায়গা। দূরে নীচে ছককাটা জমিতে কত রঙের বাহার। এখানে মাটির রঙ লালচে কাঁকুড়ে। রেনকোট পরা একটা ছেলে এদিকেই ঘুরছিল, পরিস্কার বাংলায় বলল, আপনার পিঠের উপর কাঁটাকাঁটা ধারালো খোলস আছে, আমি দেখতে পাচ্ছি। খুব চমকে উঠলাম। অপিরিচিত কেউ এমন ভাবে কথা শুরু করেনি কখনো। ওর মুখে বেশ পুষ্ট গোঁফ, চোখ দুটি আয়তাকার, উজ্জ্বল, গায়ের রঙ কালো। আমি বেশ মজা পেয়ে বললাম, তোমার গল্পের বড়োলোক মানুষদের এমন খোলস আছে? ছেলেটি চমকালো না, বলল, আপনার লুকানো সত্যিগুলোর মধ্যে একটা অবৈধ যৌনতার গাঢ় ছাপ। আপনি আদতে গিরগিটি। এবার একটু রাগ হয়ে গেল।

-কে মশাই আপনি না জেনে বুঝে যা খুশি বলছেন?

লোকটা গায়ের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, কত টাকা নষ্ট হল আপনার? এবার আর চমকে উঠছি না। কেবল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বললাম, আপনি বেয়ারা, অসভ্য। আমার এখান থেকে যান।

-যান বললেই যাওয়া যায়? ধুস্ কী যে বলেন আপনি। দেখুন কেসটা খোলসা করে বলুন দেখুন আমি ঠিক সমাধান বলে দেব। এটাই আমার কাজ।

-কী কেস কী সমাধান?

-ওই যে মুক্তি খুঁজছেন। আসলে মনের অন্ধকারে আপনি যা দেখতে পাচ্ছেন না তাকে খোঁজা এবং সমাধান দেওয়া আমার কাজ।

যত্তসব বলে লোকটাকে এড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। পিছু নিল নির্বিকার ভাবে। আবার গা ঘেঁষে এল। অণ্বেষা ম্যাডামের ডান গালের তিলটা সত্যি মারাত্মক। আপনাকে পুরোপুরি দোষ দিতে পারছি না। তবে ব্যালেন্স করে কিন্তু চলতে পারেন। অবশ্য আপনার একমাত্র জ্যেঠার ছেলে বলে কথা তাই এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এবার আমি ভয় পেলাম, ঘাড়ের নীচে একটা স্রোত বয়ে গেল। লোকটা বড্ড বেশি জানে কিন্তু কী করে? চোঁয়া ঢেকুর উঠে এল গলা বেয়ে। দিনটা চোখের উপর খোঁচা দিতে শুরু করেছে। 

-আপনার জ্যেঠতুতো ভাই অবশ্য যাকে বলে অপদার্থই ছিল। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো স্বভাব। বাপের অগাধ সম্পত্তি দিয়ে রাস্তার ছেলেপুলেদের পড়া শেখানো, আরে ছ্যা ছ্যা। তার উপর অমন সুন্দর বউ দিনের পর দিন একা। আচ্ছা অণ্বেষা ম্যাডাম দারুণ আবৃত্তি করে না! শুনেছি ওয়াইন এক্সপার্ট উনি? আবার ককটেল বানাতেও দক্ষ। তার উপর ওমন ফিগার। এমন বউ রেখে...আপনি বিরক্ত হচ্ছেন তাই না! তবে লোকটাকে বিষ না খাওয়ালে আপনার সত্যি চলত না, অত বড় সম্পত্তি একেবারে পথে চলে যেত। ভালোই করেছেন তবে অণ্বেষা ম্যাডামকে ট্যাকেল করা একটু কঠিন তাই না!

লোকটার একটা কথাও আমার কানে ঢুকছে না। কেবল মনে হচ্ছে আমার আর অণ্বেষার দীর্ঘ বছরের গোপন সম্পর্ক লোকটা জানল কী করে? জ্যোতিষ্ক বিয়ে করেছিল আমার আগে। বিয়ে শেষে বাসর ঘরে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। আমি তখন বরকর্তা। অণ্বেষা দাঁড়িয়েছিল ব্যালকনিতে। অপরূপ সুন্দর। ওর চোখে অপমানিত আহত কালনাগিনী। আমি পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, মন খারাপ করছে? বর ঘুমাচ্ছে বলে? ও সোজা আমার মাথা টেনে ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দিয়েছিল। হতভম্ব আমি সামলে নিতে সময় নিয়েছিলাম। ততক্ষণে সরে গিয়েছে অণ্বেষা। আমি চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, ভাইয়ের দোষে আমি শাস্তি পেলাম, তুমি আমার ছোটো এবার তোমায় আমি শাসন করি? 

-নাহ্ শাসনটা তুলে রাখুন, কাল, পরশু কাজে লাগবে।

সত্যিই কাজে লেগেছিল। যদিও আশ্চর্য উদাসীন অণ্বেষা। ইচ্ছে মতো পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যেত। হাতটুকুও ছোঁয়া যেত না। এদিকে বাড়িতে বিয়ের চাপ। 

-বিয়েটা করে নিন শশাঙ্কদা। বিয়ে করলে জীবন সুন্দর হয়। যেমন আমরা খুব ভালো আছি।

জ্যোতিষ্ক ক্যাবলার মতো বলেছিল, ধুর তুমি কোথায় ভালো আছো? আমি তো একটা ওয়ার্থলেস। বড়দার মতো লোক হলে তোমার জীবন সুন্দর হত। অণ্বেষা তিক্ষ্ণ তাকিয়ে বলেছিল, পারফেক্ট ম্যাচ বলে কিছু হয় না সবটাই প্রয়োজন। তোমার অর্থ আমার কাজে আসে জ্যোতিষ্ক। সেটা অস্বীকার করা যায় না। মৃদুলাকে পেয়ে প্রথম প্রথম সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করলেও একেবারেই ব্যর্থ হয়েছিলাম। তাই পরের দিকে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছিলাম। সেদিন খুব শীত ছিল। লোকটা আবার ঘন হয়ে এল।

-আচ্ছা সেদিন সন্ধ্যায় অণ্বেষাম্যাম আর আপনাকে কি হঠাৎ উনি দেখেন নাকি ওটাও আপনাদের দুজনের ছলনা। আসলে জ্যোতিস্ক বাবু সেদিন রাতে ফিরবেন এবং আপনাদের আবিস্কার করবেন এটাই চেয়েছিলেন? আচ্ছা আপনাদের ওইভাবে দেখার পরেও উনি আপনার সাথে বসে মদ খেতে রাজি হলেন?

লোকটার দিকে তাকিয়ে খানিক হাসলাম। সবজান্তা লোকটিকে বললাম, সব জানতে চান কেন? লোকটিও ব্যঙ্গ করে হাসল, আপনার মুক্তির জন্য। খ্যা খ্যা করে হেসে বললাম, ওই যে আমার স্ত্রী বসে আছেন যান গিয়ে ওকে বলুন আমার জীবন থেকে চলে যেতে তাহলেও আমার মুক্তি। লোকটা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ।

-অথবা আপনি সরে গেলে মৃদুলার মুক্তি।

-মানে?

-মানে মৃদুলা বিয়ের দিন থেকেই আপনার আর অণ্বেষার সম্পর্ক বুঝতে পেরেছিল। বুঝেছিল অমোঘ টান আপনার। তবু চুপ করে ছিল কারণ প্রয়োজন তারও আছে। আবার যেমন ধরুন সমীরণ আজও তাকে ভালোবাসে। বহুদূর থেকে ছুটে যায় তার মৃদুলাকে দেখতে একটু ছুঁতে। 

-কী কী বললেন আপনি? মৃদুলার গোপন প্রেমিক আছে?

-বাহ্ আপনার থাকতে পারে তার নয়?

-না ভাবছি এই ঢিলে, স্হূল, অকেজো শরীর কার হৃদয়ে দোলা দিল।

লোকটা হাহাহা করে হেসে উঠল। চমৎকার নাটকীয়তায় বলল, আপনি নিজেকে সুদর্শন ভাবেন তাই না! দাঁড়ান আপনাকে একটা রেকর্ড শোনাই। মোবাইল বার করে বোতাম টিপতেই ঘ্যাঁশঘ্যাঁশে শব্দ বেড়ে চলল, তারপর হঠাৎ ভেসে এল সুর, দানবের মৃত্যু হোক অঘটন। সূত্র থাকবেনা এমন দাবী করিনা তবে সূত্র হবে দুর্ঘটনার সপক্ষে। যার চরিত্র নোংরা, যার রূপ ভয়ংকর কদর্য, তার মৃত্যুও ভয়াবহ। মুখটুকু দেখবার মতো না থাকলেও চলে। আওয়াজ বন্ধ হতেই লক্ষ্য করলাম আমার খুব ঘাম হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি আবার দোকানের পিছনের দিকে হাঁটা লাগাই। লোকটা এগিয়ে আসে কাছে।

-গলাটা কার স্যার? আপনি চেনেন? আপনাকেই বলছে না তো এসব?

অসম্ভব রাগে কাঁপতে কাঁপতে লোকটার মুখোমুখি দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পা হড়কে গেল। খানিকক্ষণ শূন্যে হাতড়ে গেলাম। শেষবার ভাবতে চাইলাম গলার স্বর কার? মৃদুলার নাকি অণ্বেষার? আকাশের বুকে লোকটার মুখ দেখলাম, কানে ফোন নিয়ে চাপা স্বরে বলল, শিকারীর শিকার হল এইমাত্র।













রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 

                




শ্রাবণের ধারার মত



শেষ পর্ব

ঊশ্রীকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে এসে নিজেকে হঠাৎ অনাথ মনে হল দেবপ্রিয়ার। বাবা চলে গিয়েছিলেন যখন তখন সে সবে সেভেন, কষ্ট হয়েছিল কিন্তু মায়ের আঁচলের নীচে কখনোই অনাথ মনে হয়নি নিজেকে। অনুজ চলে গেলেও তেমন মনে হয়নি আর মা চলে গেলে ভীষণ ফাঁকা লাগলেও ঊশ্রী যেন জড়িয়ে নিয়েছিল সবটুকু। আজ সারা বাড়ি জুড়ে নৈঃশব্দ‍্য তাকে গিলতে আসছে। চলে যাবার আগে একটা সাংঘাতিক কাজ করেছে ঊশ্রী যার কোনো আভাস বা কল্পনা দেবপ্রিয়ার ছিলনা। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে ঝোড়ো কাকের মত মেয়ে ফিরেছে। চোখের জলের দাগ তখনো লেগে রয়েছে। দেবপ্রিয়া পড়ছিলেন। দ্রুত উঠে এসে মেয়ের কাছে আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

-সব আড়াল আজ ভেঙে দিলাম মা। সব আড়াল। এতদিন লড়াইটা আমাদের ছিল। এবার ওদের পালা।

-কী হয়েছেরে মুনিয়া? 

-আজ জোনাকমাসির কাছে গিয়ে নিজে সব বলে এসেছি। সাথে বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলাম। ওদের বাইরে দাঁড় করিয়ে ভেতরে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম যদি শুনিস বেশি চিৎকার চ্যাঁচ্যামেচি হচ্ছে এই বাড়িতে সোজা ঢুকে আসবি।

দেবপ্রিয়া স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে শুনে। কী করে করল মেয়েটা এমন! সব বলে দিল সব! সোফায় ডুবে রয়েছে। ঘোরের ভেতর বলেই চলেছে বিড়বিড় করে।

-মাসির জন্য কষ্ট হচ্ছিল খুব তবু বলে এসেছি। আর কতোদিন এভাবে ভয় পেয়ে বাঁচবো? ঐ বরুণ দত্তের চোখে চোখ রেখে বলেছি আমার ছবি ভাইরাল করুন আপনি, তারপর আমি পুলিশে জানাব সবটা। আমার মায়ের জীবন নিয়ে কী ভাবে খেলছেন সেটাও বলবো।

দেবপ্রিয়া আজ আর কাঁদতে চায়না। লবণস্রোতে জীবন যার তার নতুন করে আর কান্না আসে না। চুপ করে থাকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। ঊশ্রী হঠাৎ যেন ঝলমল করে ওঠে, 'মা আমি অনেক আগেই এটা করতে পারতাম, করা উচিৎ ছিল। আমার নিজেকে হালকা লাগছে মা। বোধহয় দীপ্তার্ককে এবার একটু স্পেস দিতে পারবো।' নতুন চরিত্রের আগমনে নড়ে বসে দেবপ্রিয়া। মায়ের কৌতূহল লক্ষ্য করে ঊশ্রী বলে, 'এমন কিছু না। হ্যাণ্ডসাম একটা ছেলে ঐ পুলিশেই চাকরী টাকরী করে। ডিজি ফিজি কিছু একটা হবে। ফেসবুক থেকেই আলাপ। একটু বেশি এ্যাটেনশান দিচ্ছে মাস ছয়েক তাই বললাম আরকি।' হেসে ফেলে দেবপ্রিয়া। যদিও ঊশ্রী কথা থামায়নি।

-মরুণকিশোর আছেন বলেই তুমি যাচ্ছো না মা! উনি কিন্তু আজো তোমায় ভোলেননি। কত বছর আগের কথা একবার ভেবে দেখো। আশ্চর্য জানো আমার চোখে উনি যেন তোমাকেই দেখছিলেন। তুমি আমার সাথে আসলে ভালো করতে মা। হয়ত একটু শান্তি পেতে, ভালো লাগত তোমার।

-মুনিয়া, মরুণ আমাকে কেন ভালোবেসেছিল? কতটা ভালোবেসেছিল আমি জানিনা। জানতে চাইওনা কারণ আজ আর তার কোনো মানেই হয় না। এই বয়েসে হৃদয় অপর কারো দুঃখের কারণ হবার দায় নিতে চাইবে না বোধহয়। তাছাড়া আমার এখানে কিছু কাজ আছে। সেসব না মিটিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। যদিও যাবনা কখনো একথা বলছি না।

-বেশ তোমার যা ইচ্ছে। তবে আমি বেশিদিন তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা এটা মনে রেখো।

মেয়েটা নিজেকে ঠিক সামলে নিল। চারিদিক কেমন যেন শান্ত হয়ে আসছে। এই ফাঁকা বাড়িতে একাই থাকতে হবে এখন থেকে। দিন কারো জন্য বসে অপেক্ষা করেনা। বয়ে যায়। ঊশ্রী যাবার পাঁচ ছদিন পর ছেলেটা এল। বেশ উঁচু লম্বা গায়ের রঙ ঈষৎ চাপা তবে তিক্ষ্ণ চোখ। বসার ঘরে কথা হল ছেলেটির সাথে। দেখা মাত্রই দুহাত তুলে নমস্কার জানাল বেশ কেতাদুরস্ত। বসতে বলল দেবপ্রিয়া।

-আমি দীপ্তার্ক সেন। ঊশ্রী আমাকে আপনার সাথে দেখা করতে বলেছিল। আমি কোলকাতায় এসেছি একটা বিশেষ কাজে। আজ এই বেলাটা অবসর আছে তাই এলাম।

-বেশ করেছো। আমাকে ফোন করেছিল মুনিয়া। তোমার পোস্টিং এখন কোথায়?

-কার্সিয়াং...

-বাহ্ সুন্দর জায়গা। মা বাবা কী তোমার সাথেই থাকেন?

-না মা বাবা থাকেন ব্যাঙ্গালোর। বাবা এখনো ইন সার্ভিস। মা প্রফেসার ওখানেই একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আছেন।

-বাহ্ খুব ভালো। 

ছেলেটি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দেবপ্রিয়া ওকে দেখতে থাকতে মন দিয়ে। এরমধ্যে ধলিদি চা, কুকিজ, কেক, কাজুবাদাম রেখে যায়। 'তুমি কিছু বলবে?' দেবপ্রিয়ার প্রশ্নে একটু চমকে ওঠে ছেলেটি। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলে, 'আমি ঠিক জানিনা কী ভাবে কথাটা বলা উচিৎ। আসলে ঊশ্রী আমায় সবটা শেয়ার করেছে। সবটা। গত কয়েক মাসে ওর জীবনের সবটুকু আমায় বলেছে। আপনাদের সকলকেই আমি চিনি ওর কথা থেকে। দেখুন ম্যাম বরুণ দত্তের বাড়িতে যাবার সাজেশনটাও আমার। এখন বিষয় হল ঊশ্রীর ধারণা হয়েছে আপনার এই একা থাকাটা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। মানে বরুণ দত্ত মরিয়া হয়ে কিছু একটা করতেই পারে। ম্যাম আপনি ঊশ্রীর কাছে আপাতত কেন যেতে চাইছেন না সেটাও আমি জানি। এখন বিষয় হল আমি পরশু কার্সিয়াং ফিরে যাচ্ছি। আপনাকে এভাবে একা রেখে যেতে চাইছি না।' দেবপ্রিয়া অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কে এই ছেলে? এত মায়া দিয়ে একথা বলছে কী করে? অধিকারটাই বা কী? ঊশ্রী ওর বিশেষ বন্ধু যদি হয় তাতেও কী এতটা উদ্বেগ স্বাভাবিক?

-আমায় ভুল বুঝবেন না ম্যাম। আসলে ঊশ্রী এত চিন্তিত থাকলে কাজ কিছুই করতে পারবে না। ইনফ্যাক্ট আমার মনে হয়েছে ও যে কোনো মুহূর্তে কাজ ছাড়তে পারে। রাতে তো ঘুমাচ্ছেই না। ওর রাত বাড়লে আতঙ্ক বাড়ছে।

-তোমায় বলেছে এসব ও?

-না ম্যাম বলেনি, তবে টেক্সট করেছে। আমি সকালে দেখেছি। আমি বলি কি আপনার তো নতুন লেখা শুরুর জন্য একটা চেঞ্জ দরকার চলুন না আমার সাথে। ভালো লাগলে ওখানে থেকে যান কয়েক মাস। প্রথমে আমার বাংলোয় উঠুন পরে নয় একটা ঘর ভাড়া করে নেবেন পছন্দ মতো। এতে মেয়েটা একটু স্বস্তি পায় এই আরকি।

-তুমি তো বেশিদিন ঊশ্রীকে চেনোনা দীপ্তার্ক। এতটা ওর জন্য ভাবছো কী করে?

-সন্তান গর্ভে আসা মাত্র মা তাকে ভালোবাসে, না দেখে না জেনে, দশমাস তাকে শুধু অনুভব করেই জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে গ্রহণ করে তবে একটা মানুষকে দেখে জেনে বুঝে সাতমাসে এটুকু ভালবাসা যায় না ম্যাম?

-কী সহজে বললে তুমি। তোমায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। বেশ আমি কাল তোমায় জানাচ্ছি। তুমি কখন ফ্রি হবে কাল?

-কাল ফ্রি হয়তো হব না তবে আমার লোক থাকবে আপনার এখানে।

-আমি যে ক্রমশ ভিআইপি হয়ে উঠছি।

-হওয়াই তো উচিৎ ছিল। এতদিন কেন হননি সেটাই ভাবছি। 


দীপ্তার্ক চলে গেলে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল দেবপ্রিয়া। একটা ফোন করল খানিক পর।

-কেমন আছো?

-ভালো আছি। তুমি?

-আমি বোধহয় এবার ভালো থাকব। তোমায় একটা কথা জানাতে ফোনটা করেছি।

-হ্যাঁ বলো।

-আমি কোলকাতা ছেড়ে যাচ্ছি অনুজ। একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি। দেখি জীবন নতুন কিছু শুরু করতে দেয় কিনা।

-কোথায় যাচ্ছ?

-সত্যি তুমি জানতে চাও? কিন্তু কেন?

-না ঠিক আছে না বললেও চলবে।

-আমি কার্সিয়াং যাচ্ছি। যে শহরে তুমি নিয়ে যাবে কথা দিয়েছিলে।

-অথচ কখনো নিয়ে যাইনি। ভালো থেকো। ঊশ্রীর কাজে মন বসছে তো? ফোন করলে ধরো।

সত্যিই যে কোনদিন সব ছেড়ে যাওয়া যেতে পারে দেবপ্রিয়া ভাবিনি। কেয়ারটেকার রনেন ছাড়া সবাইকে দুমাসের মাইনে সহ ছুটি দিয়ে দিল। চলে এল অচেনা এক ছেলের হাত ধরে কার্সিয়াং। ছোট্ট বাংলোর ডানদিকে দীপ্তার্ক থাকে বাঁয়ে দেবপ্রিয়া। বাংলোর চারিদিকে পাইনঘেরা উঁচুনীচু জমি। নাম না জানা ফুলের সমারোহ। একটা পাহাড়ের প্রায় মাথার কাছাকাছি বাংলো। সামনে দিয়ে বড় রাস্তা চলে গিয়েছে। ওপাড়ে যতদূর চোখ যায় উঁচু নীচু পাহাড় আর তার মাঝেমাঝে গ্রাম। রোজ ভিডিও কলে কথা হচ্ছে মেয়ের সাথে। মেয়ে আনন্দে আটখান। গতরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের কথা শুনেছে দেবপ্রিয়া।

-ম্যাডাম এবার নিশ্চিন্ত তো! আর কোনো হুকুম?

-ভাবছি ভেবে বলছি। 

-আমাকে নিয়ে কিছু ভাবলেন?

-হুম্! আমার মায়ের পাশে আপনাকে বেশ মানাচ্ছে। ফেসবুকের ছবি দেখে একটু পোড়া গন্ধ পেলাম নিজের দীর্ঘশ্বাসে। আসলে মহিলা এখনো বড্ড সুন্দরী।

-তা ঠিক তবে লেখিকার সাথে প্রেম করার মতো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আমার হয়নি ম্যাডাম। তাছাড়া উনি একটু বেশিইই সুন্দরী । আমার আরেকটু কম সুন্দরী পছন্দ।

-মানেটা কী? আমি সুন্দর না?

-না না সুন্দর তবে একটু কম।

-যাও কথা বলবো না। তুমি বাজে জঘন্য। 

-একটা কথা বলবো ম্যাডাম? একদিনের জন্য আসবো আপনার ওখানে? আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরেই পরের প্লেনে ফেরৎ আসবো, পারমিশান দেবেন এই জঘন্য লোকটাকে। বড্ড ছুঁতে ইচ্ছে করছে ঊশ্রী। তোমার ঘাড়ের কাছের লালচে তিল আর...

আর দাঁড়ায়নি দেবপ্রিয়া ঘরে চলে এসেছে। সারা শরীর জুড়ে ভীষণ অতৃপ্তি তাকে ভেতর থেকে নিংড়ে নিয়েছে বারবার। আজ ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে কেবল সে রাতের কথাগুলোই মনে পড়ছে। কোনো মানুষের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়ে বেঁচে থাকায় কী ভীষণ তৃপ্তি। কতদিন কতদিন হল সে বৃষ্টিভেজে না! পাহাড়ের যে বাঁকটায় ধাপে ধাপে চা বাগান শুরু হয়েছে। সেখানেই রোজ চুপ করে বসে থাকে। যতদূর চোখ যায় সবুজ মনোরম শোভা। এখানেই একসাথে থাকবে কথা ছিল দুজনে। তবু অনুজ কিসের টানে সব ছেড়ে চলে গেল কে জানে সে কথা? সবাইকে যে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসার মত যোগ্যতা হয়ত দেবপ্রিয়ার ছিলনা। আর ঐ যে এক কিশোর তাকে আজো বাঁচিয়ে রেখেছে তাকেই বা সে ভালোবাসতে পারেনি কেন? কে জানে এই উত্তর? জীবন বয়ে চলে নিজের ছন্দে। আকাশ জুড়ে মেঘ আসে আপন খেয়ালে। একা মানুষী মধ্য যৌবনে হেঁটে যায় এই আশায় শ্রাবণের ধারার মতো কারো ভালোবাসা অঝোরে ঝরবে তার কল্পনায়। সে প্রেম বাঁচিয়ে রাখবে সে অক্ষরে অক্ষরে। নিজের সবটুকু অতৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে। ভালো থাকুক অনুজ, ভালো থাকুক মরুণকিশোর। ভালো থাকুক ঊশ্রী ভালো থাকুক তার সদ্য প্রেম। দেবপ্রিয়া হেঁটে যায় পাহাড়ি পথের বাঁকে একা।






রবিবার, ১২ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                   


পর্ব -১২
সৌমী আচার্য্য

আদিত‍্য ভাবিয়াছিল যেকথা কহিয়া সে চন্দ্রনাথের বাড়ি হইতে ফিরিয়া আসিয়াছে সম্ভবতঃ ইহারপর চন্দ্রনাথ আর কখনো সোহাগকে লইয়া তাহার অসূয়া ব্যঙ্গ বিদ্রুপে প্রকাশ করিবে না। যদিও তাহার বুকের ভিতর একটি সূক্ষ্ম ব্যথা জাগ্রত হইয়া আছে। চন্দ্রনাথকে সে হয়ত ভালোবাসে তাই কঠিন বাক্য বলিবার অভিপ্রায় হয়না। তবু চন্দ্রনাথ গৃহে আসিয়াই যখন চড়বড় করিয়া উঠিল, তাহার যথার্থই মনঃকষ্ট হইয়াছে। বাহিরের আকাশও তাই বুঝি গভীর কালো হইয়া উঠিয়াছে।

-তোমার পৌরুষত্ব সম্পর্কে আমি ভাবিত হইয়া পড়ি। যাহার বিবাহ তাহার হুঁশ নাই আর পাড়া পড়শির ঘুম নাই। যাহার স্ত্রী সে থম মারিয়া বসিয়া আছে আর তুমি কিনা পূর্ব নির্ধারিত কাজকম্ম ছাড়িয়া তাহার স্ত্রীকে লইয়া ডাক্তার বদ্দ‍্যি করিতেছ। অথচ তুমি জানিতে তোমায় ছাড়া আমি অসহায় হইয়া পড়িব বারাণসীতে।

-আমি আশ্চর্য হইতেছি চন্দ্রনাথ তোমার অনুভূতি নামক বস্তুটি সম্ভবত লোপ পাইয়াছে। কর্কট রোগ শুনিয়াও এত কঠিন বাক্য তুমি বলিতে পারিলে।

-দেখ আদিত্য আমি তোমাকে চিনি এহেন ঘটনায় বিচলিত হইবার পাত্র তুমি নও। বাহিরের ডাক উপেক্ষা করিয়াছ আসলে অন্য কাহারো প্ররোচনায়।

-তুমি কি সোহাগকে দোষারোপ করিতেছ? এই ভ্রমে থাকিও না যে সে আমারে কিছু কহিয়াছে। বস্তুত তাহার সহিত আমার বাক্যালাপ প্রায় বন্ধ। বিগত একমাসে সে আমার ঘরে নিজে হইতে আসে নাই পর্যন্ত।

-বাব্বা ইহা আবার সদর্পে ঘোষণা করিতেছ। ভালো।

-চন্দ্রনাথ আজ তোমারে একটি কথা স্পষ্ট জানাইতে সাধ হয়। তুমি আমার বন্ধু তবে আমার স্ত্রীকে উপহাস করা তোমার এক্তিয়ার নহে। এমনকি ঠাট্টা করিয়াও তুমি তাহাকে অসম্মান করিতে পারো না। তোমার স্ত্রীকে আমি বৌঠান বলিয়া সম্বোধন করি, তাহাকে উপযুক্ত সম্মান করিয়া থাকি। সুতরাং তুমিও এই শালিনতাটুকু বজায় রাখিবে এই আমার আশা।

-আমার স্ত্রী আমার বিষয়ে খবরদালালিটি কম করেন কিনা।

-চন্দ্রনাথ, সোহাগ আর দশটি স্ত্রীলোকের হইতে আলাদা বলিয়াই তাহাকে ছোট দেখাইতে চাহে কেহ কেহ। তাহাকে ঈর্ষা অথবা তাহার মতো স্ত্রী রত্ন না পাইবার জ্বালা হইতেই সম্ভবতঃ এই আচরণ, আমি তাহা বুঝি। সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করিতে চাহেনা। কেবল তাহার হৃদয় জুড়ে আমার অবস্হানটিকে সগর্বে ঘোষণা করিতে চাহে মাত্র। 

চন্দ্রনাথ ফোঁস করিয়া 'আচ্ছা' বলিয়া হাঁটা লাগাইল। আদিত্য ভারী বিব্রত হইয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল সত্যিই কি এত কিছু বলিবার প্রয়োজন ছিল।

-তুমি বলিতে পারিতে বারাণসীতে যাইবার কথা, আমি ঠিক সামালাইতে পারিতাম।

চমকে ওঠে আদিত্য। সোহাগ একটি রেকাবিতে সাদা নাড়ু, কুচো নিমকি আর খাস্তা কচুরী লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। মেঘরঙা শাড়ির সহিত ফিরোজা পাড় মায়া জন্মাইয়াছে চেহারায়। চোখের নীচে কালচে ছোপ গভীর হইয়া জাগিয়া আছে। আদিত্যকে রেকাবিটি আগাইয়া দিয়া কহিল, 'কহো নাই কেন?'

-বসো সোহাগ। বৌঠান কি ঘুমাইতেছেন?

-না জোর করিয়া ভাসুরঠাকুরকে উহার সম্মুখে বসাইয়া আসিয়াছি। কথা কহিতেছে।

-বাহ্, উত্তম।

-আপনি কহিলেন না।

অতি আবেগে সোহাগ আদিত্যকে আপনি সম্বোধন করিয়া থাকে। আদিত্য আপনি ডাকটি শুনিয়া মনে মনে আবেগতাড়িত হইয়া উঠিল। এ যেন পূর্বরাগের প্রকাশ।

-সোহাগ মানুষ কখনোই নিজের অন্তরকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করিতে সমর্থ হয়না। আজ তুমি নিজে হইতে কেন আসিয়াছ আমার ঘরে ইহা তুমিও জানো আমিও। আমি বারাণসীতে যদি যাইতাম তুমি আরো দূরে যাইতে।

সোহাগের চক্ষু হইতে টপটপ করিয়া জল ঝরিয়া পড়িল, 'আজ আপনি চন্দ্রনাথবাবুকে যাহা কিছু বলিয়াছেন আমি শুনিয়াছি। তবু মনে হয় আমি নিজেকে সঠিক ভাবে ব্যক্ত করিতে পারি নাই। আর আপনিও সবটা বোঝেন নাই।'

-আমিও পারি নাই সোহাগ।

-আপনি আমাকেও কখনো দূরদেশে সাথে করিয়া লইয়া যাইবেন। আপনি কখনো কখনো কেবল আমার জন্য সব ছাড়িয়া সবাইকে ছাড়িয়া আসিবেন। ঐ ছাদের আলসেতে আমরা দূর আকাশের ছায়াছবি দেখিব এইসব আশা করিয়াছি।

-সোহাগ!

আদিত্য সোহাগকে জড়াইয়া ধরিতেই সে বুকের উপর আছড়াইয়া পড়িল। আদরে আদরে পরস্পরকে অস্হির করিয়া তুলিতেই, বাহিরে শ্রাবণের ধারা ঝরিয়া পড়িল।

-----–------------------------------------------------------

এই প্রথমবার লেখা শেষ হতেই ঊশ্রীকে পড়ে শোনাল দেবপ্রিয়া। মেয়ে চেয়ে আছে বাইরে। দেওয়াল ঘড়িটা টিকটিক করেই চলেছে। নীচে ড্রাইভারের ঘর থেকে হিন্দীগানের সুর ভেসে আসছে।

-মা! জীবনের গল্পগুলো এত সহজে মেলেনা কেন?














রবিবার, ৫ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                  


শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব-১১

মরুণকিশোর কোলকাতা বিমানবন্দরে নেমেই থমকে গেল। বয়সের সাথে মনটা আরো একটু বাড়লে বোধহয় ভালো হত। এসব কাজ তার ভালো লাগেনা। আশাভরা মুখগুলির দিকে তাকিয়ে নিজেই কেমন হেরে বসে থাকে তবু সিদ্ধান্ত জানতে হয়। প্রত্যাখ্যান চিরকাল তাকে  এমন এক সুরঙ্গে নিয়ে যায় যেখান থেকে পরিত্রাণের পথ তার জানা নেই। কেবল দমবন্ধ করা পরিস্হিতিতে সময়ের উপর নির্ভর করে হাল ছেড়ে দিতে হয়। সাইন্সসিটির বড় অডিটোরিয়ামে একঝাঁক তরুণ ছেলেমেয়ে জড়ো হয়েছে। সেখানে পৌঁছে হলে ঢুকে মরুণকিশোর ভীষণ সংকুচিত হয়ে উঠল। উদ্যোক্তারা ভালো ভালো কথা বলেছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের উদ্দ্যেশ্য কী।

-আমরা চাই তোমরা যারা নতুন প্রজন্ম তারা প্রত্যন্ত এলাকা চেনো জানো। তোমাদের মধ্যে সবাই যে হায়ার স্টাডি করবে তেমনটা নয়। অনেকেই আছে বিভিন্ন কারণে এখনি উপার্জন করতে চায় অথচ তাদের রেজাল্ট আউট স্ট্যাণ্ডিং। আমরা চাই জিওলজিক্যাল সার্ভের বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলো তোমরা ভালো করে বুঝে নাও। ঘাটশিলার কপার মাইনের কর্মকর্তারা আমাদের এই কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন। তোমাদের মধ্যে থেকে দশজনকে নির্বাচন করবেন তারা। একবছরের কাজ শেষে তোমরা পেপারস্ জমা দেবে ওনারাই তোমাদের কাজের ভিত্তিতে তিনজনের হায়ার স্টাডিজের ব্যবস্থা করবেন বা স্হায়ী চাকরীর। এই একবছর তোমাদের গবেষণামূলক কাজটির জন্য ওনারা তোমাদের চারলক্ষ টাকা দেবেন। অর্থাৎ নিজে উপার্জন করবে এবং স্বনির্ভর হবে।

সারা হল হাততালিতে ফেটে পড়ল। আরো অসহায় হয়ে উঠল মরুণকিশোর। গোধূলিমাসির বাড়িতে গরমের ছুটিতে এসেছে সে। তার গল্প বেরিয়েছে নামকরা পত্রিকায়। হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে বলল, 'পড়ে দেখো আমাদের পুরীর গল্প আছে।'  পড়তে গিয়ে হতবাক হয়, এক এমন পুরুষের সাথে দেখা হয় এক অষ্টাদশীর যার গ্রেস স্টাইল সব যেন চমকে দেবার মতো। অষ্টাদশী যে দেবপ্রিয়া তা বোঝা যায় সহজেই কিন্তু পুরুষটি মরুণকিশোর নয়। বুকের ভেতর যে কারিগর নরম হাতে ছবি আঁকছিল আচমকা দুরমুশের শখ জাগে তার বুক মুচড়ে ওঠে। কী বলবে সে ঠিক কী বলা উচিৎ তার? ক্যারিয়ার সবার আগে! মন প্রেম মানুষ স্মৃতি সব ব্যর্থ?

-আমি আসলে খুব বাজে বক্তা। প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্ক নামক বস্তুটা আমার কমজোরি। তবে যদি সত্যিই অন্তরের তাগিদ অনুভব করো তবেই এসো এগিয়ে। টাকা সব নয় বলেই আমার অনুমান।

এটুকু বলে আবার গুটিয়ে গিয়েছে নিজের ভেতর। ছবি ছাড়া প্রোফাইল ও কেন কাজটা করতে চায় স্টুডেন্ট সেটাই জানতে চাওয়া হয়েছিল। সবচে ভালো লাগা কাগজের মেয়েটির নামটি ঊশ্রী রায়। মেয়েটি আসতেই মরুণ চোখ নামিয়ে নিল। এমন চোখ দেখলেই সে ভয় পায়।

-লিখেছো কুশ্রী অতীত থেখে মুক্তি চাও আর মাকে নিয়ে কোলকাতা থেকে দূরে যেতে চাও তাই এইকাজ চাই। পড়াশোনা বা অর্থ তোমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়?

-না নয়। আমার যতটুকু চাহিদা ততটুকু আমার মা ভালো মতো মেটাতে পারেন। আর পড়াশোনা আমি যতদূর চাই উনিই করাতে পারেন।

-হুম্! বাবাকে নিয়ে যাবেনা সাথে।

-জানিনা আপনার এই প্রশ্ন কতটা জরুরি তবু বলছি আমার ঠিকঠাক বুদ্ধি হবার আগে থেকেই বাবা মা আলাদা। আর কিছু জানতে চান?

-হ্যাঁ চাই। তুমি যদি কাজটা পাও কাকে জানাবে আগে?

-দিদামাকে।

মরুণ বলে, 'ওনাকে ফোন করো'। মেয়েটা ম্লান হাসে, 'ওখানে ফোন নেই।'

-কোথায়?

-স্বর্গে।

মরুণ তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিতেই মেয়েটি বলে, 'আর কিছু প্রশ্ন করবেন? নাহলে আমি যাব। মা আজকাল টেনশান করেন।'

-কী করেন তোমার মা?

-আমার মা লেখিকা। যদিও আরো অনেক কিছুই হতে পারতেন।

-তুমি তোমার মাকে খুবই ভালোবাসো মনে হচ্ছে।

-উনি ভালোবাসার মতোই। তাহলে আমি উঠি স‍্যার।

-হ‍্যাঁ এসো। এপয়েন্টমেন্ট লেটার পৌঁছে যাবে ঠিক সময়ে।

ঝলমল করে ওঠে মেয়েটা তবে আশ্চর্য সংযত। ওর চোখের ভেতর ছায়া জেগে আছে যার তাকে দেখার সাধটা নিষিদ্ধ বলে দেগে দিয়েছে সময়। মেয়েটা অপ্রস্তুত হচ্ছে হয়ত তাকে লম্পট ভাবছে। মরুণকিশোর চোখ নামিয়ে নেয়। ঊশ্রী যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়ায়।

-স্যার আপনি কৈশোরে পুরীর মন্দিরে কী কিছু খুঁজতে গিয়েছিলেন?

চমকে ওঠে মরুণ। উঠে দাঁড়ায় চেয়ার থেকে। ঊশ্রী আলতো হেসে বলে, 'মাস তিনেক আগে মা সমুদ্রের পাড়ে বসে আপনার কথা বলেছিলেন এমন অদ্ভুত নাম খুব বেশি মানুষের হবেনা বলেই আমার মনে হয়েছিল তাই একটা চান্স নিলাম। স্যার আসবেন আমাদের বাড়ি সময় পেলে মা আপনাকে দেখলে খুশি হবেন। চলি স্যার।

-শোনো ঊশ্রী তোমার মায়ের নাম...

-অবিশ্বাস্য লাগছে আপনার তাইনা! আমারো লেগেছিল এখানে এসে আপনার নাম জেনে।তবে এটাই সত্যি আমার মায়ের নাম দেবপ্রিয়া।

পায়ের নীচের মাটিটা দুলে ওঠে। ঊশ্রী বেরিয়ে যেতেই হেরে যাওয়া মরুণকিশোর মনে মনে পলাশগাছ জড়িয়ে ধরে সর্ব শক্তি দিয়ে। যতগুলো দিন যতগুলো রাত কেবল তার সাথেই পথ হেঁটেছে সে মনে মনে, সেই ক্রমশ ছোট হতে হতে বিন্দু হয়ে যাচ্ছে অথচ গোধূলিমাসিদের ছাদের পাঁচিলঘেঁষে যেখানে বকুল গাছটা আলসেমি করে জাঁকিয়ে বসেছিল, সেখানেই বলেছিল দেবপ্রিয়া, 'তোমার সাথে থাকলে মনে হয় বৃন্দাবনের পথে পথে কী যেন এক কান্না ভেজা  সময় খুঁজে চলেছি। এই বকুলফুলের গন্ধে ভেতরে ভেতরে রাধা হয়ে উঠছি। অথবা রাজস্হানের এক মেয়ে যে গিরিধারীর প্রেমে বিভোর সে বুঝি আমায় ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমার খুব কষ্ট হয় আবার আমার খুব ভালো লাগে। কী করবো বুঝি পাইনা কেবল ছুটে ছুটে গোধূলিমাসির বাড়ি আসি। তুমি মনে মনে আমায় পাগল ভাবছ তাই না?' মরুণ সরমে মরে যায়। এমন মাধুকরীর সঙ্গী হবে বলেই সে যে  পাল তুলে রেখেছে। পাগল হতেই তো চায়। পাগল ভাববার অবকাশ যে তার নেই। 

-আজ থেকে বহু বছর পর আবার যখন দেখা হবে, তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, আমিও। সেদিনো তোমাকে দেখলেই আমি বকুলের ঘ্রাণ পাবো মরুণ। কাকে খুঁজছিলে পুরীর মন্দিরে বলো না?

কিছুতেই এই সহজ উত্তরটা দেওয়া হয়না। বুড়ো হলে দেখা হবে কেন? কেন জীবনের আগত সময় তাকে ছাড়া কাটবে এই ধাঁধাঁ কিছুতেই কাটাতে পারেনা মরুণ। আজো পারেনি। প্লেনটা মেঘের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কোলকাতাকে আবছা করে দিচ্ছে ক্রমশ।



(ক্রমশঃ) 










রবিবার, ২৯ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 


শ্রাবণের ধারার মত
সৌমী আচার্য্য

পর্ব-১০

বিন্দুবালা সোহাগের আচরণ কোনদিনই সঠিক ভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারে নাই। কিছুদিন পূর্বে তাহার স্বামী যে সোহাগকে নিয়া মাত্রা ছাড়াইয়া দুর্বল হইয়া পড়িতেছে একথা সে বিলক্ষণ বুঝিতে পারিয়াছিল। প্রথমাবস্হায় সোহাগ তাহাকে ঘিরিয়া বেতসলতার মতো বাড়িয়া উঠিতেছিল কিন্তু অকস্মাৎ তাহার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে আসিয়া পড়িল বিন্দু। তাহার ভালোবাসা দুর্নিবার। বুকের ভেতর চাপিয়া ধরিয়া যখন সে ঠোঁট ছোঁয়াইয়া কাঁদে বিন্দু আশ্চর্য সুখে হতভম্ব হইয়া যায়। কিছুদিন পূর্বে আদিত্য আকস্মিক ভাবে ঘরের অভ্যন্তরে ঢুকিয়া যাহা দেখিয়াছে আর যাহা বুঝিয়াছে সবটাই সত্য নয়। গতবছর বিন্দুবালার তিন নম্বর বাচ্চাটাও গর্ভেই মারা যাওয়ার পর বামস্তনের একাংশ কচড়া ধরিয়া ফোঁড়ার মতো ফুলিয়া উঠিয়াছে। প্রায় রাতে কম্প দিয়া জ্বর আসে। ক্রমশ সে ক্ষীণকায়া হইয়া উঠিতেছে। সোহাগকে বলিতেই সে যারপরনাই উদ্বেগে তৎক্ষনাৎ দেখিবার জন্য উদ্বিগ্ন হইয়াছে। ভয়ে বিস্ময়ে সে যখন বেড়ে ওঠা মাংসপিণ্ডে স্নেহের পরশ বুলাইতেছিল। অকস্মাৎ দরজা খুলিয়া  আদিত্য ঘরে প্রবেশ করে। দরজাটি সোহাগ কেন ভেজাইয়া রাখিয়াছিল ইহা জানা দুঃসাধ্য। তবে বিন্দুবালা অনুমান করিতে পারে আদিত্যকে আঘাত করিবার দুর্দমনীয় প্রচেষ্টা সোহাগ ক্রমাগত করিতেছে। আজ মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় সোহাগের রূপ ছিল শান্ত। শাশুড়িমা সোহাগকে অধিক স্নেহ করেন একথা সকলেই জানে। আজ তিনি সকলের সামনেই আদিত্যকে তিরস্কার করিয়াছেন।

-এমন লক্ষ্মীমন্ত বউ ঘরে ফেলে তোমার যে কেন বাইরের এত সাধ সে আমি বুজিনা বাপু। এবার ঘরে থিতু হও। জমিদারী কাজকম্ম বুজতে শেখো।

সোহাগ মৃদু স্বরে কহিয়াছে, 'বাহিরের জগতের আনন্দ আপনি আমি কী জানিতে পারি মা! আমার ভুল ভাঙিয়াছে। ওনাকে আটকাইবার মতো ভুল আর করিবনা। উনি মুক্ত। বাহিরে উনি আনন্দ খুঁজিয়া লইবেন আমি গৃহেই আনন্দ খুঁজিয়া লইব।' সোহাগের কথায় উপস্হিত সকলেই চমকিত। আদিত্যকে বিন্দুমাত্র যে চোখের আড়াল করিতে পারেনা তাহার মুখে এই কথা বিশ্বাস করিতে সংকোচ হয়। অপরাহ্নে গা ধুইয়া ভালো শাড়ি পরিয়া বিন্দুবালা নিজেকে আয়নায় দেখিতেছিল। স্বামী সোহাগ বিহীন জীবন বুঝি হাজার প্রচেষ্টাতেও সুন্দর হইয়া ওঠেনা। দাসী আসিয়া কহিল, 'ছোটোবউ তোমারে ডাকতেছে ছাতে।' বিন্দুর অত সাহস নাই যে সেই ডাক উপেক্ষা করিবে। সিঁড়িতে দুপা উঠিতেই আদিত্য তাহাকে ডাকিল।

-বৌঠান, সোহাগ কোথায়?

-ছাতে, সেখানেই আমাকে ডাকিয়াছে।

-বৌঠান আপনি নীচেই থাকুন আমি উপরে যাইতেছি।

বিন্দু ইতস্ততঃ করিতে লাগিল, 'কিন্তু না যাইলে সোহাগ রাগ করিবে।' ভুরু কুঁচকাইয়া আদিত্য বলিল, 'কিঞ্চিৎ লজ্জা সরম রাখলেন না বৌঠান ছিঃ। দাদা সব জানিয়া চুপ করিয়া রহিয়াছেন বলিয়া আমিও চুপ করিব এতখানি কাপুরুষ নই। আপনি নীচেই যান। আমি যাইতেছি উপরে।' বিন্দু এ রাগের কারণ বুঝিতে না পারিয়া ঝরঝর করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। আদিত্য ছাদে গিয়া সুসজ্জিতা সোহাগকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। এই অপরূপ সাজ কিসের নিমিত্ত? যে রত্ন জীবনে পাওয়া হইয়াছিল তাহা বুঝি হারাইয়া ফেলিল সে। মৃদু স্বরে ডাকিল, 'সোহাগ।' সোহাগ গভীর ভাবনায় ডুবিয়াছিল যেন।

-ও তুমি!

-তুমি অন্য কাহকেও চাহিয়াছিলে।

-বিন্দুবালাকে ডাকিয়াছি। তাহার সহিত কিছু একান্ত আলাপ আছে।

-সোহাগ তুমি কি আমাকে যন্ত্রণা দিবার কারণে এইসব করিতেছ? বৌঠানকে নাম ধরিয়া ডাকিতেছ?

-তুমি সত্যিই জানো যন্ত্রণা কী? শোনো যে কোন কারণেই যে আমাকে ছাড়িয়া দিনের পর দিন অন্যত্র আনন্দ খুঁজিয়া পায় সে আমার কেহ নয়। যে আমার সুখে দুখে ছোটছোট রাগ অভিমানে পাশে থাকে সেই আমার সব। তুমি বোধকরি এইসব বুঝিবে না। উদার প্রকৃতি, মুক্ত পিছুটানহীন জীবন তোমায় অনেক বেশি আনন্দ দেয়। তবে এই মুহুর্তে আমার তোমার সহিত সময় নষ্ট করিতে ইচ্ছা নাই।

-এতখানি কঠিন হইতে তোমার বাধিল না? এত সহজেই বলিয়া ফেলিলে আমার অপেক্ষা বৌঠান তোমার অধিক আপনার?

-তোমায় একটা কথা বলি, দিদির বড়ো অসুখ, আমার সীমিত জ্ঞান বলিতেছে তাকে এইক্ষণে বড় ডাক্তার দেখানো আবশ্যক। আর শোনো দিদিকে বুকে জড়াইয়া যে সুখ পাইয়াছি সে সুখ তুমি কোনদিন দিতে পারিবে না। সে সুখ আশ্রয় দিবার। তুমি আমার কাছে আসিলে একটি মুখ ভাসিয়া ওঠে যাহার নিকট আমি হারিয়াছি। এই সত্য আমার। তোমার কোনো দায় নাই। তুমি চাহিলে আমায় ত্যাগ করিতে পারো।

আদিত্য সবটুকু শুনিয়া বলিল, 'সব কথার উত্তর সময় দিবে সোহাগ। আমি এখন আসি ডাক্তারের খোঁজ করি।'

রবিবার, ২২ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                 


পর্ব-৯


দেবপ্রিয়া ফোনটা কেটে খানিক সময় চুপ করে  চেয়ে রইল সমুদ্রের দিকে। সূর্য মধ্যগগনে। ঊশ্রী একা বসে রয়েছে হ্যামকে। কী ভাবছে কে জানে? ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে কাঁপা হাতে নম্বরটা ডায়াল করল।

-আমি দুঃখিত, উত্তেজনার বশে ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। আমি আজই কোলকাতায় ফিরে যাচ্ছি কিন্তু ঘটনাটার যে এখানেই শেষ এমন তো কোনো কথা নেই অনুজ।

-হ্যাঁ সেই গ্যারান্টি নেই বিশেষ করে তোমরা যখন একবার ওদের নজরে এসেছ তখন...আচ্ছা ঊশ্রীর এবার কোন ইয়ার?

-কেন বলোতো?

-ভাবছিলাম তোমরা যদি আমার এখানে আসো  মেয়ের সাবজেক্ট তো জিওগ্রাফি তাই না?

-এ খবর তুমি জানো? হ্যাঁ ওর এবছর বিএসসি ফাইনাল ইয়ার কিন্তু তোমার ওখানে যাবার প্রশ্ন উঠছে কেন?

-দেখ প্রিয়া আমার মনে হয় তুমি একা সবটা সামলে উঠতে পারবেনা তাছাড়া এখানে আমার অন্তত পাঁচ বছরের প্রজেক্ট। ততদিনে মেয়ের একটা চাকরীবাকরি হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় এই আরকি। আর শোন আপাতত বেশি ঘাবড়িও না, আমি ফোন করে দিয়েছি।

-কোথায়?

-যেখানে ফোন করলে কাজ হবে। হয়ত দেখতে পাবে দুজন ফলো করছে। দরকারে ওরা যোগাযোগ করে নেবে। ঘাবড়িও না। প্রয়োজনে ফোন করো। আর চিন্তাভাবনাটা মাথায় রাখো প্লিজ। অন্য কোনো ইস্যু নয় প্রিয়া তোমাদের সুরক্ষাটাই এখন আমার একমাত্র চিন্তা।

-এতদিন তো ভাবোনি অনুজ। আজো নাই ভাবলে। আমরা মা মেয়েতে ঠিক সব সামলে নেবো। আমি কোলকাতা ছাড়ব না অনুজ।

-প্রিয়া, এমন পরিস্হিতিও তো এতদিন হয়নি। প্লিজ।

ফোনটা রাখার পরে বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। যে মানুষটা একদিন তার ছিল কেবল আজ ষোলাটা বছর তাকে ছাড়াই কেটে গেল। জীবন কত কী যে দেখায়। বাইরে মেঘ করেছে। ঊশ্রীর তাতে যেন কিছু যায় আসে না। নির্বিকার ভাবে বসে রয়েছে। দেবপ্রিয়া গিয়ে দাঁড়াতেই জলভরা চোখে তাকাল।

-কেন ফোন করেছে লোকটা?

-তুই কথা না বলে ফোনটা কেটেছিস কেন? আর লোকটা আবার কী? 

-আমার কাছে তার আর কোনো পরিচয় আছে কি? সারা দেশের মানুষের জন্য তার ভাবনা কেবল আমি তুমি ছাড়া।

-তুই কি ওর খবর রাখিস নাকি?

-হ্যাঁ রাখি। কেন তুমি আপত্তি করবে?

-মোটেই না। তোমার বাবার সাথে তুমি সম্পর্ক রাখলেও আমার কিছু যায় আসবে না মুনিয়া। 

-সম্পর্ক না মা। আমার কেবল একটাই রাগ আজ বাবা থাকলে বরুণ দত্ত কি আমাদের সাথে ঘটনাটা ঘটাতে পারত?

-হয়তো না, তবে ঘটনাটার জন্য তোমার কি কোনো দায়িত্ব নেই মুনিয়া।

-আছে মা, প্রথমে ও আমার কাছে ফাদার ফিগারই ছিল কিন্তু আমার দিকে ওর তাকিয়ে থাকা, আমাকে স্পেশাল ফিল করানো, তোমার অনুপস্হিতিতে একান্তে আমায় ছুঁয়ে যাওয়া আমার মনে আশ্চর্য শিহরণ জাগিয়েছিল। বোধহয় আমার তোমাকে বলা উচিৎ ছিল কিন্তু আমার সত্যি খুব ভালো লাগত। 

-তুমি চুপ করো মুনিয়া আমি শুনতে চাইনা।

-তুমি কখনোই চাওনি মা শুনতে। যতটা ভেবেছ তোমার চরিত্রদের নিয়ে ততটা আমায় নিয়ে ভাবোনি। তাহলে দেখতে পেতে তোমার পনেরো বছরের মেয়ের গায়ে লাভ বাইটের চিহ্ন ছিল।

-শাট আপ প্লিজ। 

-প্রথম দিদামা দেখেছিল, বুঝেওছিল। তাই কাছ ছাড়া করতো না আমায় কিন্তু দু'বছর বাদে দিদামা চলে যাওয়ার পর তুমি আরো ডুবে গেলে নিজের ভেতর আর আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ঠিক তখন বরুণ দত্ত আবার আমাকে গিলে নিল। আমায় না দেখে সে নাকি থাকতেই পারছেনা তাই ছবি তুলে নিল আমার। এমন ছবি যা তোলার সময় আমার আয়নাও লজ্জা পেয়েছে।

যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে গেল দেবপ্রিয়া। ঊশ্রীর হাতদুটো জড়িয়ে হ্যামকের কাছে বালিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, 'মুনিয়া আমি যে আর পারছি না।'

-আমিও পারিনি মা যখন দেখলাম আমার গোপন ছবি তোমায় দেখিয়ে আসলে বরুণ দত্ত তোমায় ভোগ করতে চাইছে। সেদিন আমি দুভাবে হেরেছি মা। আর ভীষণ ভীষণ রাগ হয়েছে বাবার উপর। বাবা থাকলে আমি কাউকে ফাদার ফিগার করতে চাইতাম না আর না তো কেউ আমাদের এভাবে ভোগ্যপণ্য ভাবত মা।

মায়ের কোমড় জড়িয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে ঊশ্রী। বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি আসে। শ্রাবণের ধারায় ভিজতে থাকে দুই অসম বয়েসী নারী। যাদের দুজনের তীব্র অভিমান অনুজের উপর আর ভয়ংকর রাগ বরুণের প্রতি।



(ক্রমশঃ)

রবিবার, ১৫ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                      



শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব-৮

সমুদ্রের নোনা হাওয়া চিটেচিটে জল নিয়ে ঝাপটা দিচ্ছে মুখে, চুল এলোমেলো হয়ে চরম বিভ্রাটে ফেলছে দুজনকেই। চোখ পিটপিটে হয়ে যাচ্ছে লক্ষ‍্য করে দুজনেই মৃদু হাসল। সমুদ্রের দিকে পিছন ঘুরে বসতেই প্রথম মেঘের গুরুম্ গুরুম্ আওয়াজ শোনা গেল।মেয়েটি নিজের বিনুনিতে আঙুল জড়িয়ে বলল, 'অকারণ সুখে বুকের ভেতর এমন করেই মেঘ ডাকে তাইনা?' 

-হ্যাঁ, খানিকটা তেমনি। তবে কারো মায়াভেজা চোখ দেখলেও এমনটাই হয়।

-মায়া ভেজা চোখ! সে কেমন জানিনা, তবে তোমার চোখের দিকে তাকাতে ভালো লাগে। কী ভীষণ নিষ্পাপ। তুমি লজ্জা পেলে? আমি সত‍্যি বলছি।

-যদি ভুল না বোঝ একটা অনুমতি চাইব?

-তোমায় ভুল বুঝব? অসম্ভব! বলো কিসের অনুমতি?

-একবার তোমার মাথার গন্ধ নিতে পারি?

-মাথার গন্ধ!

-না মানে তোমার চুলের।

খিলখিল করে হেসে মেয়েটি দুটো বিনুনি খুলে ফেলে। সমুদ্রের প্রবল হাওয়ায় রাশিরাশি নরম রেশমের মতো মেঘ চোখমুখ আবৃত করতেই দমবন্ধ হয়ে যাবার তীব্র অনুভবে উঠে বসে মরুণকিশোর। পাশে মিষ্টি অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বিছানা থেকে নেমে বাইরে এসে একফালি বারান্দার বেতের চেয়ারে চুপ করে বসে মরুণকিশোর। যা কিছু শেষ পর্যন্ত পাওয়া হয় না, তার আকর্ষণ বা মোহ বোধহয় চিরকাল বিভ্রান্ত করে রাখে। ঘরের ভিতর যে নারী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে তাকে সে গ্রহণ করতে পারল না কেন? বন্ধু চীরঞ্জীব তাকে মুখ খারাপ করে বলেছিল, 'চুপ কর শালা ন্যাকা। নিজের বউকে উপোসী রাখিস ভাবের ঘোরে! থাম শালা! আসলে শালা তুই নিমুরাইদ্যা। মিষ্টি যদি আমায় দাদা বলে রাখী না পরাত, তাহলে আমিই শালা...। তোকে না জ্যান্ত কবর দেওয়া উচিৎ।' মরুণকিশোর নিজের বুকের উপর হাত বোলাতে থাকে। চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পায় মায়াচোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, 'কী খুঁজছ তুমি মরুণ?' ভীষণ বলতে ইচ্ছে করে 'তোমায় খুঁজছি, সেই কবে থেকে।'

"কি লাগিয়া ডাকরে বাঁশি আর কিবা চাও।
বাকি আছে প্রাণ আমার তাহা লইয়া যাও।"

গানের মৃদু সুরে মিষ্টির ঘুম ভেঙে যায়। বিছানায় বসে চাঁদের আলোয় প্রেতের মতো বসে থাকা মানুষটার জন্য বুক হুহু করে ওঠে। খুব জানতে ইচ্ছে করে এমন মানুষকে কোন মেয়ে ফিরিয়েছিল? তার চোখ চোখ রেখে প্রশ্ন করবে মিষ্টি, 'আমার বরকে হয় ফেরৎ নাও নয় ফেরৎ দাও।' বেয়ারা চোখের জল ঘর বারান্দা ভাসাতে থাকে সঙ্গে কাঁদে চণ্ডীদাস।

-------------------------------------------------------------

আদিত্য পাগল হইয়া উঠিয়াছে অপরদিকে সোহাগ অনড়। এতবড় অনাচার আর কাহাকেও বলিবার মতো শক্তি সে অর্জন করিতে পারে নাই। স্ত্রীর উপর শারীরিক জুলুম করিতেও তাহার রুচিতে বাধে। দাদার সহিত বাক্যালাপে সে কোন পথ দেখিতে পায় নাই বরং সৌমাদিত্য যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছে কিছু। তার অন্যমনস্কতা দিশাহীন নৌকার পাল তুলিয়া ছুটিয়া বেড়াইতেছে। 'কেহ বোধকরি ডাকিল আমায়।' আকস্মিক এমন কিছু বাক্য বলিয়া চলিয়া গিয়াছে আদিত্যর সম্মুখ হইতে।'  তবে কি দাদা সকলি জানেন? আজ সে আসিয়াছে মায়ের ঘরে। মেঝেতে মায়ের পার্শ্বে বসিবামাত্র তিনি বলিয়া উঠিলেন, 'এইবার কতদিনের জন্যে এয়েচ। এয়েচ কেন? টাকার দরকার? চুপ করে রয়েচ যে!'

-মা সোহাগ!

-শোনো বাপু গরীব ঘরের মা মরা মেয়ে সে, তাকে যদি আজ তোমার আর মনে না ধরে তুমি আবার বে করতে পারো কিন্তু এবাড়িতে তার ভাগ এতটুকু কমবে না এ আমি বলে দিচ্চি। এখন যাও নিজের ঘরে যাও।

-না!মা! তাহা নহে আমি জানিতে চাহিতেছি সোহাগের আচার আচরণ কী রূপ!

-দেকো বাছা, আমি শুদু এটুকু জানি সে তোমার চেয়ে দশগুণ ভালো। সংসার ধর্ম নিয়ে সকলের সাথে মিলেমিশে সে ভালো আচে।

-এর চাহিতে অধিক কিছুই আপনি দেখেন নাই!

-আমি ঠিক ততটুকুই দেকেচি যাতে আমার পরিবার সঠিক থাকে।

-না, আপনি দেখেন নাই। আর আপনার পরিবার সঠিক নাই।

এই বলিয়া আদিত্য প্রস্থান করিতেই যমুনাবতী চিন্তিত হইয়া উঠিল। কী ইঙ্গিত দিয়া গেল সে? তবে কী সোহাগের সহিত সৌমাদিত্যের ঘনিষ্টতা বাড়িয়াছে? তবে যে বড়বউ কহিয়াছিল ছোটবউ  সৌমাদিত্য কে দূর দূর করিয়া খেদাইয়াছে। আদিত্য কি নতুন কিছু দেখিয়াছে? 

আদিত্য বেগে ঘরে প্রবেশ করিয়া সোহাগকে দেখিয়া খানিক বিহ্বল হইয়া গেল। সোহাগ তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিল না। গলা ঝাড়িয়া কহিল, 'আমি বাড়ি ছাড়িয়া যাইতেছি, এরূপে বসবাস করা আমার দ্বারা অসম্ভব।' ভারী নরম করিয়া সোহাগ বলিল, 'বাড়ি ছাড়িবার কারণটি যদি আমি হই, তাহা হইলে তুমি অবলীলায় বলিতে পার, আমি চলিয়া যাইব। আর যদি কারণটি চন্দ্রনাথবাবু তবে আর বিলম্ব করিও না এখনি যাত্রা করো।' আদিত্য সোহাগের কাছে আসিয়া হাত ধরিয়া বলিল, 'কেবল উহার সহিত ভ্রমণে গিয়াছি বলিয়া তুমি এতখানি সর্বনাশ করিতে পারিলে সোহাগ? আমার ভালোবাসা ভালোবাসা রহিলনা কেবল কিছুদিনের নিমিত্ত মুক্তি চাহিয়াছি বলিয়া!' সোহাগ রঙ্গ করিয়া বলিল, 'একটি নারী শরীরের মাঝে আনন্দ পাইয়াছি বলিয়া আমার ভালোবাসা ভালোবাসা রহিল না নাথ! অন্য পুরুষ শরীর তো কামনা করি নাই।' আদিত্য থরথর করিয়া কাঁপিয়া বসিয়া পড়িল। সোহাগ উন্মাদের মতো উচ্চস্বরে হাসিয়া গড়াইয়া পড়িল খাটের উপর।






রবিবার, ৮ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                                 


শ্রাবণের ধারার মত


পর্ব -৭

ঝাউবনের মাঝে মা মেয়েতে দীর্ঘসময় চুপ করে বসে আছে। দূরে সমুদ্রে দু তিনটে জেলিনৌকা। টকটকে লাল ছোট পাল তুলে মনের আনন্দে ঢেউ ভাঙছে যেটা তার দিকে তাকিয়ে ঊশ্রী বলল, 'মা ঐ নৌকাটা আমি। আর দূরের বড়োটা তুমি।' দেবপ্রিয়া মৃদু হাসল। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, 'হ‍্যাঁ রে, এইসব ছেলেমানুষী তোর বন্ধুদের আছে?' 

-কেন থাকবে না! আমরা তো ছোটোই।

-তাই বুঝি! 

-একদম। আচ্ছা মা তোমার উপন‍্যাসের সোহাগ তো আমাদের বয়েসী তাই না!

-মুনিয়া আমার উপন‍্যাসের চরিত্র নিয়ে কথা বলবে না।

-কেন তুমি এত রিজিড বলোতো! তোমার মাথায় যে কী ঘুরছে জানিনা বাপু । বলোনা প্লিজ আদিত‍্য কী দেখল বাড়ি ফিরে? বলোনা।

-না একদম না, কিছুতেই না।

ঊশ্রী অভিমানে উঠে চলে গেল। ঝাউবন পেরিয়ে বালির উপর হেঁটে সমুদ্রের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। দেবপ্রিয়া উঠে দাঁড়ায়। মেয়েকে নজরে রেখে দূর দিয়ে হাঁটে। যতই অভিমান করুক কিছুতেই নিজের লেখার উপর কারো প্রভাব পড়তে দিতে ও রাজি নয়। আর ঊশ্রী রীতিমতো নিজের প্রভাব খাটায়। বিন্দুবালা আর সৌম‍্যাদিত‍্যের সম্পর্কের মাঝে সোহাগ যে কাঁটা হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে কান্নাকাটি পর্যন্ত করেছে। 

-কেন তুমি সোহাগকে খল নায়িকা বানিয়ে দিচ্ছ মা! প্লিজ ওর এমন ভালোবাসা ভরা মনটা বিষিয়ে দিও না। ওমা! শোনো না এমন কিছু করো না যাতে সৌম‍্যাদিত‍্য আর আদিত‍্য দুজনেই জব্দ হয়।

দেবপ্রিয়া কোনো কথা না বলে উঠে গিয়েছিল মেয়ের সামনে থেকে। চরিত্রগুলোর উপর সে নিজেই কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখতে রাজি নয়। আর এই মেয়ে সব পাল্টে দিতে চায়। পুরুষের উপর ওর এত রাগের  কারণ বোঝে তবু এড়িয়ে যায়। সবচে অবাক লাগে গত দু তিন বছরে যন্ত্রণার একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। সব সময় পজেটিভ মানসিকতা মেয়েটার। দেবপ্রিয়া যেন দেখতে পায় ওর মায়ের এক টুকরো রয়ে গেছে মেয়ের ভেতর। তবে আজ এই ঝাউবনে বসে প্রথম কথাটাই বলেছিল, 'আচ্ছা মা একটা মেয়ের পুরুষ সঙ্গী কেন লাগে? নিরাপত্তার জন‍্য নাকি সেক্সের জন‍্য? না মানে আমি বলতে চাইছি এই দুটো কারণ ছাড়া বিয়ে করার আর কোনো কারণ আছে কী?' চমকে গিয়েছিল দেবপ্রিয়া। মেয়েটা ঠিক কী ভাবছে জীবন নিয়ে। সমুদ্রের ঢেউ পায়ে এসে ভাঙছে ওর।স্কার্টটা বাঁহাতে সামাণ‍্য উপরে তুলে অল্প দৌড়াচ্ছে ঊশ্রী যেন ভাসছে। দেবপ্রিয়ার চোখটা জ্বালা করে উঠল।

--------------------------------------------------------------
ধর্ণামঞ্চ থেকে বক্তৃতা শেষ করে মহেশ  নেমে আসতেই ত্রিচি এগিয়ে এল। হাতের মোবাইলটা এগিয়ে দিল মহেশের দিকে। একটা কফি রঙা লিপস্টিক আর সাদা মুক্তোর দুল। মুহূর্তে একটু দুলে উঠল মহেশ। ধর্না মঞ্চে ইংরেজিতেই চলছে ভাষণ। ত্রিচি কঠিন মুখে বলল, 'অনুজবাবু, নাম ভাঁড়িয়ে পরিচয় গোপন করার অপরাধেই আপনাকে পুলিশে দেওয়া যায় কিন্তু তারচে অনেক বেশি জরুরি অন‍্য কিছু। গাড়িতে উঠুন। কথা হবে।' মহেশ মোবাইলটা ফিরিয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, 'আমার নাম অনুজ রায় এবং মহেশ আমার ডাকনাম। মহেশ নামেই এই অঞ্চলে আমি পরিচিত। এতে পুলিশে ধরার মত অন‍্যায় আপনি দেখতেও পেলেও আমি পাচ্ছি না। চলি।' ত্রিচির শান্ত সুন্দর মুখে হিংস্রতা খেলা গেল। 

-ছবিটা গতকালকের মহেশবাবু। বুঝতেই পারছেন আমরা কতটা মরিয়া। আপনি এসব আন্দোলন বন্ধ করুন। পুরুলিয়ায় আপনার জন‍্য আমাদের বড় প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে নাক গলাতে এলে আমরা বোধহয় আর সভ‍্যতা ধরে রাখতে পারব না।

মহেশ ওরফে অনুজ নির্বিকার ভাবে পেছন ফিরে হাঁটতে যাবে এমন সময় ত্রিচি আর ধৈর্য রাখতে পারে না।

-আপনার স্ত্রী মেয়ের ছিন্নভিন্ন লাশের ছবি আজ সন্ধ‍্যেতেই আপনার মোবাইলে চলে যাবে মহেশবাবু। আপনি এমন ভাবেই গাছপালা পশুপাখি বাঁচাতে থাকুন।

মহেশের মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। মোবাইলটা কানে লাগিয়ে বলে, 'মিস্টার.কুট্টি আশাকরি এইটুকুই যথেষ্ট মিস্ ত্রিচিকে এই মুহূর্তে গ্রেফতার করার জন‍্য। আর ধন‍্যবাদ আমি কল করেও কথা বলিনি তবু যে আপনি কিছু একটা আন্দাজ করে ফোনটা অন রেখেছিলেন তার জন‍্য। এবার আপনার যা করণীয় করুন।' ত্রিচির হতভম্ব ভাব কাটার আগেই কর্ণাটক পুলিশ চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে ত্রিচি ও তার সাঙ্গপাঙ্গর গাড়ি। মহেশ কাছেও যায় না কিছুই বলে না। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ত্রিচির হিংস্র ফুঁসতে থাকা মুখটা দেখতে দেখতে ফোন করে। রিং হয়ে যাচ্ছে ধরছে না। বিরক্ত হয়। আবার কল করে এবার ফোনটা রিসিভ হয়। অপর প্রান্তের হ‍্যালো শুনে বোঝে কাঙ্খিত ব‍্যক্তি নয়। আরেক প্রস্থ বিরক্তি দাঁতে চেপে নেয়।

-আমি অনুজ রায় কথা বলছি। দেবপ্রিয়ার সাথে কথা বলতে চাই। বিষয়টা জরুরি, প্লিজ।

(ক্রমশ:)





রবিবার, ১ মে, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                                 


শ্রাবণের ধারার মত (পর্ব-৬)

গৃহের দিকে আসিতেই আদিত‍্যনাথ প্রথম বাঁদরলাঠি গাছটির দিকে চোখ ফেলিয়া মুগ্ধ হইয়া গেল।আহা কী করিয়া যে এমন সুন্দর ফুল বাংলা সাহিত‍্যে স্হান পাইল না কে জানে?প্রকৃতি যে কত সৌন্দর্য অকৃপণ ভাবে বিলাইয়াছে তাহা গুণিয়া শেষ করা যায় না।কী মনে করিয়া আদিত‍্য কয়েকখানি ফুল পাড়িয়া লইল তাহা বলা মুশকিল।গৃহে প্রবেশ করিয়াই মোতির মার সহিত সাক্ষাৎ হইল।আদিত‍্যকে দেখিয়া তাহার মুখখানি সহসা আলোকিত হইয়া উঠিল।

-ছোটখোকা এয়েচ?আহা বাছার মুকখানা যে শুকিয়ে গিয়েচে।যাও মার সাতে দেকা করে উপরে যাও।

আদিত‍্যর হাতের ফুলগুলিকে মোতির মা লক্ষ‍্য করিল না দেখিয়া সে খানিক বিচলিত হইয়া বলিল,'ফুলগুলি কেমন মোতির মা?' হাসি চাপিয়া সে বলিল,'ভালোই তো যাও ভেতরে যাও।'প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের এই উদাসীনতা মোটেই পছন্দ করিতে পারেনা আদিত‍্য।এই রূপ রস আস্বাদন করিতে অধিক শিক্ষার কী প্রয়োজন?আসলে অধিকাংশ মানুষের বাঁচিয়া থাকাটা আদতে পশুপাখির মতোই বাঁচিয়া থাকা।গভীরতা নাই,প্রেম নাই,দর্শন নাই।এমনকি চন্দ্রনাথের কিছু বোধ আদিত‍্য ঠিক বুঝিয়া উঠিতে পারে না।মাস ছয়েক আগে একদিন সোহাগের সহিত সাক্ষাতের সময় চন্দ্র কী এক কথার পৃষ্ঠে মুখ বাঁকাইয়া বলিয়াছিল,'বৌঠান তোমার ন‍্যায় স্বামী লইয়া, সাহিত‍্য লইয়া সময় অতিবাহিত করা বা কল্পনায় ভাসিয়া যাইবার মতো সৌভাগ‍্য অথবা অভিপ্রায় সকলের থাকে না।আমাদিগের আবার সাংসারিক বিষয়ের উপরেই অধিক টান।'সোহাগ এরূপ কঠিন কথায় আঘাত পায়।মুখ কালো করিয়া কহিয়াছিল,'তবে যে আপনি আপনার বন্ধুটিকে কেবলি দেশ ভ্রমণে বাহির হইতে প্ররোচনা প্রদান করেন তাহাও কী সাংসারিক কর্ম?'চন্দ্রনাথের রক্তিম মুখমণ্ডল,কম্পিত ওষ্ঠ আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস জানাইতেই আদিত‍্য পরিবেশ শান্ত করিবার অভিপ্রায়ে বলিয়া বসিল,'দেখ সোহাগ যে যাহার মত করিয়া সঠিক।আর তাহা ছাড়া চন্দ্র আমারে বাড়ির বাহির করিতে প্ররোচনা প্রদান করে নাই কখনো। প্রকৃতি নিজেই সেই কাজটি করিয়াছে।'সোহাগ তীব্র বিদ্বেষে দৃষ্টিপাত করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিল।এই সকল অকারণ কথাগুলি ভাবিতে ভাবিতে কখন যে দোতলার বারান্দায় উপস্হিত হইয়াছে তাহা আদিত‍্য খেয়াল করিতে পারে না।দুপুরের রোদ মরিয়া আসিয়াছে,আকাশের কোলে কালবৈশাখীর ঘনকৃষ্ণ মেঘখানি হাতছানি দিতেছে।এমন সময় হাসির মৃদু মধুর শব্দে আকৃষ্ট হইয়া ডান পার্শ্বের ঘরখানিতে উঁকি দিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেল আদিত‍্য।যাহা দেখেতেছে তাহার অর্থ খুঁজিয়া না পাইয়া ডাকিয়া উঠিল,'এ সব কী সোহাগ?'

--------------------------------------------------------------

-গোধূলিকাকিমা ঠিক কী বললেন তোমায় ফোনে?সেই থেকে গুম মেরে রয়েছ যে?

মরুণকিশোর দুহাতে চুলমুঠি করে ধরে খানিক বসে রইল।তারপর একটু ম্লান হেসে বলল,'একটা রামধনু রঙা অতীত পথ খুঁজছে মিষ্টি।আর কিছু না।'

-দেখ,খবরদার বলছি আমার সাথে হেঁয়ালি করবে না।

-এই দেখ হেঁয়ালি করলাম নাকি।সত‍্যি বলছি।

মিষ্টি অত সহজ মেয়ে নয়।নাম মিষ্টি হলেও মনে খটকা লাগলে যুতসই উত্তর না মেলা পর্যন্ত কাউকে তিষ্ঠতে দেয় না।মরুণকিশোর ততধিক সরল।ঠিক যেন সকালের প্রথম আলো।এমন নরম এমন পবিত্র যে কিছু দিয়েই তাকে ময়লা করা যায় না।মিষ্টি নানা প‍্যাঁচের প্রশ্ন শুরু করলে সে বোকার মতো হাসে।

-ঐ যে গো আমাদের ছোটবেলায় হত না সবাই মিলে বাসে করে ঘু্রতে যাওয়া!একবার তেমন একটা বেড়াতে যাওয়া হল পুরীতে।বিশাল বাসে বাহান্ন জন যাত্রী।আমার চোখ যা দেখে তাতেই অবাক হয়ে কেবলে যায়।পুরীর মন্দিরে গিয়ে কী যে হল মনে পড়ে গেল তাঁকে।

-কাকে?

-শ্রীচৈতণ‍্য মহাপ্রভুকে।কী যে হল মনে হল আমায় খুঁজে বার করতেই হবে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে তাঁকে।শুরু করলাম খোঁজা।আর পরেরদিন পেয়েও গেলাম।

-কাকে?

-একটা মেয়েকে।ভীষণ গম্ভীর।চোখে চশমা আঁটা।সে যে ঠিক কেমন সুন্দর তোমায় বোঝানো মুশকিল মিষ্টি।সে সরস্বতী নাকি অপ্সরা?সূর্য নাকি চন্দ্র?সমুদ্র নাকি নদী?শুধু এটুকু জেনে রাখো তাকে যে একবার দেখেছে সে কোনোদিন ভুলতে পারবে না কিছুতেই নয়।আমাকে গম্ভীর মুখেই বলল,'গতকাল থেকে দেখছি কিছু খুঁজছ,কী খুঁজছ বলো,সাহায‍্য করতে পারি।'আমি ভয় পেয়ে ছুট্টে পালিয়ে গেলাম।

-পালিয়ে গেলে?কেন?তোমার তখন কত বয়স?একটা মেয়েকে ভয় পেলে?

-বয়েসটাই ভয় পাবার মত ছিল যে।সতেরো অথবা আঠারো।কিন্তু তুমি কি ভাবলে সে আমায় ছেড়ে দিল?না সে আমায় ছাড়েনি।ঠিক আবিস্কার করেছে ভর দুপুরে একা বালির ঢিবির আড়ালে আমি চৈতণ‍্য মঙ্গল পড়ছি।তারপর...তারপর...

-কী হল কথা বলছো না কেন?এই!

মরুণকিশোর মায়াভরা চোখদুটো দিয়ে মিষ্টিকে দেখল।তার বিয়ে করা বউ।তার জীবনকে ছন্দে ফেরাতে চেয়ে পরিবারতন্ত্রের ঘটানো এক মস্ত ভুল।ভুল কারণ সে মিষ্টিকে কিচ্ছু দিতে পারেনি।আদৌ কোনদিন হয়তো পারবে না।দেবপ্রিয়া আজ এত বছর পরেও মনের গভীরে প্রদীপ জ্বেলে বসে রয়েছে।কিছুতেই অন্ধকার হয়নি।সে প্রদীপ টিমটিমে আলোর মায়ায় জাগিয়ে রেখেছে স্মৃতি।কিন্তু এত বছর পর কেন তাকে খুঁজছে দেবপ্রিয়া?অনুজের সাথে তাকে তো বেশ মানিয়েছিল।তাছাড়া অনুজের কত নামডাক।দেশের কথা দশের কথা ভাবে যে সুপুরুষ সেই তো তার মতো নারীর যোগ‍্য।এই নিতান্ত সাধারণ গড়পড়তা এলেবেলে মরুণকিশোর কে আজ এত বছর পর কী দরকার তার?মিষ্টি তাকিয়ে দেখে ঘাড় নুইয়ে চোখ মাটিতে প্রায় মিশিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে তার মানুষটি।তার মানুষ!মনে মনে একটু হেসে নিল মিষ্টি।এ মানুষ কোনদিনই তার নয়।ঘাটশিলার কপার মাইনের প্রোডাকশন ম‍্যানেজার মরুণকিশোর দাস মিষ্টির জীবনের সাথে বয়ে চলে মাত্র।না ঠিক বয়ে চলে না।বয়ে চলায় মিশে যাওয়া আছে।তাদের জীবন তো মেশেনি।মরুণকিশোর উদাস হয়ে বলেছিল,'মন জাগলে শরীর জাগবে মিষ্টি।তাকে জোর করে সংসারী করতে চাওয়া মুর্খামি।শরীর ছাড়াও এ জগৎ সংসারে কত গভীর সম্পর্ক আছে তাই না!আমরা বরং বন্ধু হতে পারি।আর যদি তুমি স্বাভাবিক কর্তব‍্যের দায়ে আমায় পেতে চাও তাহলে মনের আরামটুকুও থাকবে না।'মিষ্টি সাধারণ বিএ পাশ করা সাধারণ মেয়ে।এত কথা বোঝে না।তবে এটুকু বোঝে বন্ধু পাওয়া এ পৃথিবীতে সবচে কঠিন।অতীতের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মরুণকিশোরকে একটিবার দেখে গভীর নিশ্বাস ফেলে ঘরে যায় মিষ্টি।

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 

                                 

   












শ্রাবণের ধারার মত
(পঞ্চম পর্ব)


তাজপুরের রিসোর্টটি বেশ সাজানো গোছানো।ঊশ্রী এখনো বেহুশের মতো ঘুমোচ্ছে।ওর কপালে আলতো করে হাত রাখল দেবপ্রিয়া।ঘুমোক আরেকটু।এই ছোট্ট প্রাণটায় আঘাত তো কিছু কম নয়।ভোরের আলতো আলোর মায়ায় মন যেন জুড়িয়ে যেতে লাগল।অথচ গোধূলি মাসি বুকের ভেতর আস্ত সূর্য বসিয়ে দিয়েছে।সবাইকে আঘাত দিয়েছে দেবপ্রিয়া?বরুণ চিরকাল তার অন্ধ ভক্ত ছিল।তার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক।আকারে প্রকারে ইঙ্গিতে সরাসরি সব রকম ভাবে মুগ্ধতা জানিয়েছে।আর তারপরেও ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়েছে।আর অনুজ সে তো থেকেও ছিলনা।ঊশ্রীর পাঁচ বছরের জন্মদিনেই অনুজকে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল দেবপ্রিয়া।অনুজ কথাটা শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি মন দিয়ে কিছু পেপারস্ দেখছিল।দেবপ্রিয়া বহুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘরে ফিরেছে ঊশ্রীর কাছে।খানিকপর অনুজ ধীর পায়ে বেডরুমে এসে বলে,'ঠিক আছে আজকের রাতটা থাকছি,আগামীকাল চলে যাব।তুমি উকিলের সাথে নিশ্চই কথা বলেছো।মিউচুয়াল ডিভোর্স ফাইল করো আমি সই করে দেবো।'এতটা নির্বিকার হতে পারে কোনো মানুষ!দেবপ্রিয়া ভাবতে পারেনা।অনুজ পরদিন চলে গিয়েছে।আর কখনো বাড়িতে ফেরেনি।কোর্টে এসে সই করেছে চলে গেছে।একবার কোনো খবর জানতে চায়নি ঊশ্রীর বা মায়ের।ডিভোর্সের পর বরুণ এগিয়ে আসার রাস্তা খুঁজেছে সব রকম ভাবে।মাত্র একদিন দেবপ্রিয়া দুর্বল হয়েছিল।সেও তো মানুষ সবাই কি সেটা ভুলে গিয়েছে।ঊশ্রী ভাইরাল ফিবারে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল সে সময়, এদিকে দুটো বড়ো হাউসের লেখা জমা দিতেই হবে।রাত জেগে জেগে মাইগ্রেনের পেন বেড়েছে।ঠিক তার মধ‍্যেই ওর মা দিপালীর সিঁড়ি থেকে পড়ে বাঁ দিকের ফিমার ভেঙে গেল।অসহায় দেবপ্রিয়ার পাশে বরুণ এসে দাঁড়াল ত্রাতার মত।লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ডাক্তার, নার্সিংহোম, ওষুধ বাড়ির দায় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল।ক্লান্ত ধ্বস্ত দেবপ্রিয়া।

-এভাবে একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছ যে?কী হয়েছে কাঁদছ নাকি তুমি?প্রিয়া?

-নাহ্ আমার কাঁদবার অধিকার নেই বরুণ।একজন মানুষ সারাজীবন বাইরের টানে ঘরের দিকে ফিরেও চাইল না।আমার ভালোবাসা, ইচ্ছে,জীবন সব একা গহীন রাতের তারা হয়ে জেগে রইল।কোণঠাসা হতে হতে ছেড়ে যাবার কথা উচ্চারণ করলাম কী করলাম না,সব শেষ হয়ে গেল।আমার হাত শূন‍্য হয়ে গেল।তবু আমায় কাঁদতে নেই।মেয়ে আর মা এই তো সম্বল।দুজনাই অসুস্থ অথচ আমায় কাঁদতে নেই।

-এমন ভাবে বলছো কেন প্রিয়া?

-কারণ আছে বরুণ,আজ তথাকথিত পড়াশোনা জানা সংস্কৃতি মনস্ক এক মানুষ আমায় বলেছেন,'তোমার মনটা খুব স্ট্রং দেবপ্রিয়া,অন‍্য কোনো মেয়ে হলে কেঁদেকেটে শেষ হয়ে যেত।ভালো ভালো।যে ভাবে লিখে যাচ্ছো মনটা পাথর না হলে এ পরিস্হিতিতে লিখতে পারতে না।অবশ‍্য হ‍্যাঁ রবীন্দ্রনাথ পারতেন।' ভাবতে পারছ আমি কতটা নির্দয়?

কথাটুকু শেষ করতে পারেনা ফুলেফুলে ওঠে।ভীষণ আবেগ পথ খোঁজে বাইরে বেরিয়ে আসার।বরুণ এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখে।আঙুল দিয়ে মোলায়েম ভাবে মাসাজ দিতে থাকে।

-মানুষ আঘাত কাকে করে জানো?যাকে সে ঈর্ষা করে,তার মতো হতে চায় কিন্তু তার সাধ‍্যে কুলায় না।আর তুমি!তোমার মেধা ঈর্ষণীয় তোমার রূপ লোভনীয়।অথচ তোমাকে কেউ ছুঁতেও পারে না।তো তোমাকে আঘাত করবে না?

বরুণের আঙুলের ছোঁয়া ধীরে ধীরে নেমে আসছে ঘাড় বেয়ে।বহুদিন পর সুখে জারিত হচ্ছে দেবপ্রিয়া।পদ্মকুঁড়িতে মৃদু সুখ কাঁটা।ডুবছে জাগছে।বরুণ দীর্ঘদিনের অপেক্ষা প্রবল আশ্লেষে পূর্ণ করতে লাগল।ভেসে গেল একটা রাত।ছাদের গন্ধরাজ ফুলগাছটা সাক্ষী কী ভীষণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছিল দেবপ্রিয়া।


-চলে যাও বরুণ প্লিজ।এসব আমি চাইনি।ছিঃ ছিঃ।

-কেন প্রিয়া?আমি তো কাওকে বঞ্চনা করছি না।তোমার কাছেও কিছু চাইছিনা।তোমার পাশে থাকতে চাই।তোমার সঙ্গ চাই।তোমার মনন,মেধা আমার বেঁচে থাকাটা সুন্দর করে।প্লিজ প্রিয়া।

-নাহ্ বরুণ!জোনাক আমার পিসতুতো বোন কেবল নয়,ও আমাকে ভীষণ মান‍্য করে আমি কিছুতেই ওকে ছোট করতে পারবো না।প্লিজ বরুণ।আর এগোনোর চেষ্টা করো না।

এসব ভাবতে ভাবতে কেঁপে উঠল দেবপ্রিয়া এরপরেও বরুণ কতবড়ো সর্বনাশে মেতে উঠেছিল।এরপরেও গোধূলিমাসির মনে হয় সেই সবাইকে আঘাত দিয়েছে।এই কি জীবনের পরিহাস!









রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                                            



শ্রাবণের ধারার মতো



পর্ব-৪

মাদিকেরীর বুকের ভেতর পাহারের কোলে ছোট্ট জনপদ কাদাগাদাল।কফি বাগানের মাঝেমাঝে পাহাড়ের ঢালে ছোটছোট ছিমছাম বাড়িঘর।সহজ সরল মানুষজন।সকলেই প্রায় কর্ণাটকের আদিবাসিন্দা।মহেশ এখানে মানিয়ে নিয়েছে খুব ভালো ভাবে।গ্রামের সকলেই তাকে বিশেষ ভালোবাসে।সদ‍্য গড়ে ওঠা রিসর্ট,হোমস্টে,হোটেল সবকিছুর উপর তার কড়া নজরদারি।কোনভাবেই অঞ্চলের স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে দেবেনা।নেচার মাদার এনজিওর কর্মী হিসেবে বছর তিনেক হল এখানেই রয়েছে।ধীরে ধীরে নিজের আধিপত‍্য বিস্তার করে চলেছে।যে ছোট্ট বাড়িটার একতলায় মহেশ থাকে তারপাশেই কুভান আলভার বাগানবাড়ি।সেখানেই আজ বিকেলে নিমন্ত্রণ।এমনিতে এসব নিমন্ত্রণ এড়িয়ে থাকতেই স্বচ্ছন্দ সে তবে কুভানকে এড়িয়ে যেতে পারেনা।প্রভাবশালী বলেই নয় বছর সত্তরের মানুষটা জ্ঞানের ভাণ্ডার।বিশেষ স্নেহ করেন তাকে।সন্ধ‍্যে সাতটা নাগাদ ওর বাড়িতে গিয়ে উপস্হিত হতেই দেখল গোটা বাগানটা সাদা মলমল কাপড়ে মুড়ে হালকা বেগুনি অর্কিডে সাজানো হয়েছে।মহেশ হাতে করে বই নিয়ে এসেছে।কালেকশান অফ্ ও হেনরি।কুভান স্মিতমুখে বইটা বুকে চেপে ধরলেন।

-এরচেয়ে বড়ো কিছু নেই রয়।তুমি ভেতরে এসো একজন তোমার সাথে আলাপ করতে আগ্রহী।

ঘরের ভেতর খুব লো ভল্যুউমে সারেঙ্গী বাজছে।মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে ঘরটায়।কুভান কাওকে চাপা গলায় ডাকলেন।সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এল হলদে জমির উপর ছোট ছোট লাল বুটিদার শাড়ি,লাল ব্লাউজ আর সাদা ফুলের মালায়,মুক্তোর সেটে এক নারী। মহেশ খানিক মুগ্ধ না হয়ে পারলনা।শুভেচ্ছা বিনিময় ও নাম জানার পর ধীরে ধীরে ত্রিচি, মহেশ গল্পে মেতে উঠল।বাগানের মাঝখানে রাখা ছোট্ট গোল টেবিলে কথোপকথন এগিয়ে চলল।সাথে কন্টিনেন্টাল খাবারের সমাহার।

-আপনাদের রাজ‍্যের দার্জিলিং আমার সবচে প্রিয়।একাধিক বার গিয়েছি কর্মসূত্রে।

-হ‍্যাঁ দার্জিলিং অসামাণ‍্য তবে পারলে একবার পুরুলিয়া,বাঁকুড়া ঘুরে আসবেন।ভালো লাগবে।

-আমার ইচ্ছে আছে।বিশেষ করে লাল কাঁকুড়ে মাটির জৌলুস দেখাটাই উদ্দেশ‍্য।আপনার নানা রকম কাজকর্মের প্রশংসা শুনতে পাই মিস্টার রয়।তাই আমি সরাসরি একটি প্রস্তাব আপনাকে দিতে চাই।

-কী বিষয়ে?

-কুভান একটি ইকো রিসোর্ট চাইছেন দুবরা এলিফ‍্যান্ট ক‍্যাম্পের কাছাকাছি।আপনি আমাদের উপদেষ্টা মণ্ডলীতে যোগ দিন।আপনার সাজেশান অনুযায়ী আমরা রিসোর্টটিকে সাজাতে চাই।

মহেশ ত্রিচির চোখে চোখ রেখে বুঝতে চাইল কী উদ্দেশ্য এই নারীর।ঠিক তখন সামাণ‍্য ঝুঁকে হাত ধরে বলল,'মহেশ আমরা সত‍্যিই চাইছি দুবরা ইন্টারন‍্যাশানাল পরিচিতি পাক।'মহেশ উঠে দাঁড়াল।গভীর খাঁজের অমোঘ আকর্ষণ সহজেই এড়িয়ে বলল,'ম‍্যাডাম ত্রিচি,আমরা চাইছি দুবরা ক‍্যাম্পে হাতিদের সুরক্ষা আরো বাড়ুক।দর্শকের চাপ কী করে কমানো যায় সেটাই আমাদের লক্ষ‍্য।আচ্ছা চলি ভালো লাগল আলাপ হয়ে।ভালো থাকবেন।'চলে যাওয়া মহেশের পায়ের রেখায় চোখ রেখে কুটিল হাসল ত্রিচি।দূর থেকে মহেশের কুভানের সাথে করমর্দন দেখে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।টেক্সট করল,'ইউ আর রাইট হিয়ার হি ইজ!অনুজ।'


--------------------------------------------------------------

চন্দ্রনাথ আদিত‍্যর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বাঁকা হাসিল।দই চিঁড়া কলা ভালো করিয়া মাখিয়া বৃহৎ একখানি গ্রাস মুখ পুড়িয়া চকাম চকাম আওয়াজ বজায় রাখিতে রাখিতেই কথা বলিতে শুরু করিল।

-তুমি বাপু স্ত্রী লোককে কিঞ্চিৎ অধিক গুরুত্ব দিয়া থাক।আমার শ‍্যালিকার সহিত সারাদিনে যে পরিমাণ বাক‍্যব‍্যয় করিয়া থাক তাহা দৃষ্টিকটূ।

আদিত‍্যনাথ হতভম্ব হইয়া কহিল,'এ কী রূপ দোষারোপ।তোমার শ‍্যালিকাটিই বরং পায়ে পায়ে ঘুরিয়া বেড়ায়।সোহাগের কথা শুনিতে চাহিয়া ব‍্যতিব‍্যস্ত করিয়া তোলে আর তুমি কিনা চন্দ্র আমাকে দুষছ!'

-আহা চটো কেন?আসলে অমরকন্ঠক হইতে আসিয়া ইস্তক তুমি ব‍্যাকুল হইয়া রহিয়াছো।বিশেষ করিয়া স্ত্রীরত্নটির জন‍্য বোধকরি মন উচাটন হইয়াছে।তাহাই স্বাভাবিক।তুমি বরং কয়দিন বাড়ি হইতে ঘুরিয়া আইস।আমি আবার দিন পাঁচের ভিতর জয়পুর যাত্রা করিব ব‍্যবসাটিকে আরো ঢালিয়া সাজাইতে পারিলে তোমার কর্জটিও চুকাইতে পারি।

আদিত‍্য শেষের বাক‍্যগুলি শুনিয়া যারপরনাই অসন্তুষ্ট হইল কিন্তু চন্দ্রনাথকে কঠিন কথা শোনানোর হিম্মত তাহার কোনদিন হয় নাই।বরং খানিক চুপ করিয়া থাকিবার পর তাহার মনে হইতে লাগিল,চন্দ্রনাথকে সে হয়ত না বুঝিয়া কখনো আঘাত করিয়াছে তাই সহসা কর্জ শোধ করিবার প্রসঙ্গ আসিয়া পড়িল।বসারঘরটিতে চন্দ্রনাথের ফলার খাইবার আওয়াজ ব‍্যতীত অন‍্যকোন শব্দ নাই।আদিত‍্য অনেক সময় চুপ করিয়া থাকিল।তারপর কথা বলিয়া উঠিল।

-চন্দ্র তোমার আপত্তি না থাকিলে আমি জয়পুর যাত্রায় তোমার সঙ্গী হতে চাই।

ডানহাতের কনুই পর্যন্ত মিষ্টি রস গড়াইয়া যাওয়ায় সেই রস জিভ দিয়া চাটিয়ে লইবার কাজটির অবসরে এক ঝলক আদিত‍্যকে দেখিয়া চন্দ্রনাথ বলিল,'সে তো আমার পরম সৌভাগ‍্য।তবে কিনা মহিলা মহল তোমাকে ছাড়িতে রাজি হইবে কিনা সেটি বিচার্য।তোমার যত্ন আত্তি করিয়া তাহারা সবিশেষ সুখ লাভ করেন কিনা।'আদিত‍্য বুঝিল গতরাতে চন্দ্রর স্ত্রী রুক্মীনি তাহার খাদ‍্যের প্রতি অধিক মনোনিবেশ করিবার কারণেই চন্দ্র তাহার সহিত মশকরা করিতেছে।তবু সে বিবেচনা করিল,রাগ করিয়া ফল কী,বরং গৃহে প্রত‍্যাবর্তন করিয়া সকলের সহিত সাক্ষাৎ করা ভালো হইবে।সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল,'চলি চন্দ্র জয়পুর যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করিয়া খবর পাঠাইও।'চন্দ্রনাথ উদাসীন মুখ বলিল,'গৃহে যাইতেছ যাও সোহাগবালার খপ্পরে নিজেকে বাঁধিয়া ফেলিও না।অতি কষ্টে মুক্তি পাইয়াছ,ভুলিও না।'সোহাগবালার নামটি চন্দ্রর মুখে শুনিয়া আদিত‍্যর বুকটা মোচড় দিয়া উঠিল।

রবিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                                




শ্রাবণের ধারার মতো


পর্ব-৩

বিন্দুবালা কিছুতেই স্বস্তি লাভ করিতে পারিতেছে না। যাহা ঘটিতেছে তাহার জন্যে কাহাকেও দোষারোপ করিবার উপায় নাই অথচ মনের ভিতর অভিমান ফেনাইয়া উঠিতেছে। সোহাগ নিজ হাতে ডাল বাটিয়া গয়না বড়ি বানাইয়া রান্না করিয়া দ্বিপ্রহরে সৌম‍্যাদিত‍্য খাইতে বসিলে তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছে, বিন্দু সেইক্ষণে মাছের মুড়ার ঝোল সবে আগাইয়া দিয়াছে।

-মাছ খাইবার পূর্বে একবার দেখুন তো ইহা খাইবার যোগ‍্য হইয়াছে কিনা।

বিন্দু অবাক হইয়া দেখিল তাহার স্বামী পরম মমতায় গয়না বড়ির আলু ঝোল খাইয়া ঢেকুর তুলিয়া বলিল, 'আজ আর কিছু খাইতে ইচ্ছে করিবে না। বিন্দু মাছের মাথা আজ খাইব না।' বিন্দু ঘাড় নাড়িয়া উঠিয়া যায় তবে বুঝিতে পারেনা ইহা কী করিয়া সম্ভব। মাছের মাথা যাহার না খাইলে একটি দিনও চলে না সে কিনা বড়ির ঝোল চাটিয়া খাইয়া উঠিয়া যাইতেছে! একখানি গরম বাতাস সহসা ঘরময় দৌরাত্ম্য করিয়া বাহির হইয়া গেল। সোহাগের নিকট গিয়া বিন্দু চুপ করিয়া দাঁড়াইল।

-তুই ছোটো জাদু জানিস ভাই। আমার সোয়ামির মাছের মাথা খাওয়া ঘুচিল।

-জাদু জানি কিনা জানিনে। তবে তোমার সোয়ামিটির মাছের মাথার চাইতে অন‍্যকিছুর মাথা খাইতে সাধ জাগিয়াছে কিনা খোঁজ রাখিও। 

কথাটি বলিয়া দীর্ঘ বিনুনিটি দুলাইয়া নরম পায়ে হাঁটিয়া চলিয়া গেল। বিন্দু এসব দুর্বোধ‍্য কথা বিশেষ বোঝেনা। খাইতে বসিয়া অখাদ‍্য গয়না বড়ির ঝোল খাইয়া তাহার মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। ঘরে আসিয়া সৌম‍্যাদিত‍্যের দিকে তাকাইয়া কহিল, 'এ তোমার ভারি অন‍্যায়, অখাদ‍্য খাইয়া নিজের শরীরকে কষ্ট দিবার কোনো কারণ বুঝিনে।' 

-সব কারণ বুঝিবার মতো বুদ্ধি ঈশ্বর যদি তোমায় না দিয়া থাকেন তাহাতে তোমার কিছু করিবার নাই।

-সব সময় ঠাট্টা ভালো লাগেনা বাপু!

সৌম‍্যাদিত‍্য হাসিয়া কোলবালিশটিকে জড়াইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। বিন্দুর মনে অস্বস্তি বাড়িয়া চলিল। স্বামীর পাশটিতে বসিয়া বাম হাতখানি পিঠের উপর রাখিতেই টের পাইল, সে ঘুমাইয়াছে। চোখের কোণ দুইটিতে জল আসিয়া সব ঝাপসা করিয়া দিতেছে। সোহাগের প্রতি এই বিশেষ পক্ষপাতিত্ব কী স্নেহ না অন‍্যকিছু ইহা জানিবার কোনো উপায় কি নাই!

--------------------------------------------------------------
গোধূলি মাসির কথায় হতবাক হয়ে গেল দেবপ্রিয়া।ফোনের ভিতর দিয়ে গালে যেন সপাটে চড় পড়ল।

-মরুণকিশোরকে মনে পড়ছে কেন তোর? ওর ভিতরে আর কি কিছু বাকি আছে নিঃড়ে নেবার মত? 

দেবপ্রিয়া খানিকক্ষণ চুপ করে যায়। এত রোষ নিয়ে কথা বলছে কেন মাসি? কোনদিন তো এমন ভাবে কথা বলেনা।

-তুই যতদিন ওর কথা তুলিসনি আমার তোকে বলার মত কিছু ছিল না। কিন্তু একটা আত্মভোলা খ‍্যাপাকে আবারো খুঁচিয়ে তুই যন্ত্রণা দিবি সেটা আমি হতে দিতে পারিনা।

-মাসি আমি কখনো কাউকে যন্ত্রণা দিতে পারি? সে ক্ষমতা আমার কোনদিন ছিল?

-হাসালি প্রিয়া, তুই যন্ত্রণা ছাড়া আর কাউকে কিছু দিয়েছিস? মরুণকিশোর, অনুজ, তোর মা এমনকি বরুণকে পর্যন্ত তুই যন্ত্রণা দিয়েছিস। আমার তো ভয় হয় তুই নিজের মেয়েটাকে ছাড়বি তো!

কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছে দেবপ্রিয়ার। এত রাগ, ঘৃণা তার প্রতি গোধূলি মাসির? ফোনটা রাখার আগে আশ্চর্য নরম গলায় বলল, 'কিছু মনে করিস না প্রিয়া, মরুণকিশোরের নাম তোর মুখে শুনতেই বড্ড রেগে গিয়ে এসব বললাম। ওর বিয়ে হয়েছে। ভালো আছে দুটিতে। তুই আর ওর ঠিকানা খুঁজিস না মা। আমি সামনের মাসে পারলে একবার যাব তোর কাছে। আদর করে আসব একটু। বড্ড কঠিন কথা বলে ফেললাম না রে মা?' 

মায়ের ঘরে ঢুকে ঊশ্রীর ভুরু কুঁচকে গেল। দেবপ্রিয়া রাইটিং টেবিলে মাথা নীচু করে বসে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে কেঁপে কেঁপে উঠছে শরীর।

-মা!

ছোট্ট ডাকটায় মুহূর্তে সচেতন দেবপ্রিয়া।নিজেকে কুড়িয়ে নেয় অতীত থেকে। চোখটা আলতো হাতে মুছে বলে, 'বেড়াতে যাবি মুনিয়া?'


রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                     





শ্রাবণের ধারার মতো


পর্ব ২


এই অবধি পড়ে ঊশ্রী ভীষণ মন খারাপ করে মাকে বলল,'মা তুমি কি ওদের আলাদা করে দেবে?'দেবপ্রিয়া মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,'সে তো ওদের উপর নির্ভর করছে রে।ওদেরকেই বুঝতে হবে কি ওরা চায়?'

-ইস‍্যুটা তো খুবই সাধারণ।

-সেটা তোমার মনে হচ্ছে,ওদের নয়।

-কিন্তু মা...

-উহু আর নয়।আমার লেখাকে প্রভাবিত করবে না।তুমি এবার নিজের কাজে যাও।

বৃষ্টি ঝরে পড়ছে অবিরাম।ঊশ্রী মায়ের চোখে কিছু খুঁজতে চেয়ে একবার তাকাল।দেবপ্রিয়া ততক্ষণে মন ডুবিয়ে দিয়েছে সোহাগে।

ঊশ্রী পা ফেলে এগিয়ে আসে বারান্দায়।বাবার কথা ভাবতে চায় কিন্তু অস্পষ্ট ছবিটাতে আলো ফেলতে পারেনা।'নিরাকার অবয়ব নিয়ে ঘর করা যায়না'বহুবার মা একথা বলেছে,নিজেকেই হয়তো।তবু শুনেছে সে।ছোটোবেলায় যতদিন ওর দিদা বেঁচে ছিলেন জিজ্ঞাসা করেছে,'এর মানে কি দিদামা!'

-ওরে বাবা ঊশ্রী এত কঠিন কথা তুই পুরোটা বললি কি করে হ‍্যাঁ?আমি তো মনে রাখতেই পারতাম না।

-আহ্!তুমি অন‍্য কথা বলছো কেন?

দিপালী নাতনীর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কেবলি কথা নিয়ে খেলতে খেলতে ওর মনটা সরিয়ে দিত অন‍্য দিকে।বড় হবার সাথে সাথে ঊশ্রী দেবপ্রিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ক্রমশ।মায়েতে মেয়েতে খোলা বারান্দা আবিষ্কার করেছে নিজেদের মধ‍্যে।বাবাকে নিয়ে আগ্রহ দেখালে দেবপ্রিয়া স্পষ্ট করে বলেছে,'অনুজ সত‍্য গোপন করত।যে সত‍্য আমার জানা দরকার ছিল।সম্পর্কের শুরু থেকেই এই লুকোচুরি আমি বুঝতাম।'

-তাহলে বিয়ে করলে কেন?

-কি জানিস মুনিয়া!মানুষ কি চায় সেটা বোধহয় সে নিজেই জানেনা।অনুজের গ্রেসফুল ব‍্যক্তিত্ব আদর করার ধরণ সব এত পছন্দ ছিল যে অনেক কিছু উপেক্ষা করে গিয়েছি।যখন একসাথে থাকতে এলাম তখন সব বদলে গেল।দমবন্ধ লাগতে শুরু করল।চলে এলাম।

ঊশ্রী মায়ের চোখে কখনো কোনো আক্ষেপ দেখেনি।কেন!মা কি বাবাকে ভালোবাসত না।একটা মানুষের জন‍্য মায়ের মনে কেন কোনো উত্তাপ নেই?

               ---------------------------------

সোহাগের পিত্রালয়ে ফিরিয়া যাইবার কোন উপায় নাই বলিয়া সে ধীরে ধীরে পরিস্হিতির সহিত মানাইয়া চলিবার রাস্তা খুঁজিতে লাগিল।বড় জা বিন্দুবালার সহিত সময় কাটাইতে লাগিল।বড়ির ডাল বাটা,পিঠে পুলির রকমারি কায়দা আয়ত্ত করিবার অভিপ্রায়ে নিজেকে ডুবাইয়া রাখিল কিন্তু সপ্তাহ পরেই তাহার প্রাণ যায় যায়।দক্ষিণের বারান্দায় আরাম কেদারায় হাত রাখিয়া কাঁদিয়া উঠিল।

-তুমি ফিরিবে না!আমার প্রেম মিথ‍্যা করিয়াই তোমার আহ্লাদ!ঐ চন্দ্রনাথের সঙ্গ তোমার এত প্রিয়।আজ সাতদিন হইল তুমি ফিরিলে না?

দাসী খুঁজিয়ে খুঁজিয়া আরাম কেদারার পার্শ্বে আলুথালু সোহাগবালাকে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া মুখ বাঁকাইয়া গৃহিনীকে সংবাদ দিতে একতলায় নামিয়া আসিল।গৃহকত্রী যমুনাবতী রান্নাঘরে তদারকিতে ব‍্যস্ত।

-মাগো তোমার বৌ যে সোয়ামির দুককে আরাম কেদারা জড়িয়ে ঘুমুচ্চে।আর কত পোচ্ছয় দেবে গো মা?

-বেশি দুঃসাহসের কথা বললে তোর মুকে নুড়ো জ্বেলে দুবো হারামজাদি।দূর হ।মোতির মা একবার এদিক পানে এসো তো বাপু।

মোতির মা এই বাড়িতে দীর্ঘ তিরিশ বৎসর অতিক্রম করিয়াছে।যমুনাবতীর সুখ দুঃখের সঙ্গী।নীরবে আসিয়া দাঁড়াইতেই যমুনাবতী রেকাবিতে সামাণ‍্য সন্দেশ আর ফল দিয়া বলিলেন,'সামনে বসিয়ে খাইয়ে আসবে।আর জটিকে বলবে ওকে আজ সন্ধ‍্যায় যেন সাজিয়ে যায়।'মোতির মা কিছু বলিবার অভিপ্রায়ে তাকাতেই যমুনাবতী গম্ভীর স্বরে বলিয়া ওঠেন,'যাও মোতির মা,বিলম্ব আমার অপছন্দ।'মুখে যাহাই বলুক ছোটোছেলের আচরণ তাহার নিকটেও সুবিধার লাগে না।কি হইলে যে তাহার অন্তর পূর্ণ হইয়া ওঠে কে জানে?অমন সুন্দরী,বিদূষী স্ত্রী ছাড়িয়া জলহস্তীর ন‍্যায় চন্দ্রনাথের সহিত যত্রতত্র ভ্রমণে কি সুখ লাভ করে সে কেবল ঈশ্বরেই জানে।বড়োছেলে সৌম‍্যাদিত‍্য অপেক্ষায় নীরিহ আর তাহার স্ত্রী বিন্দুবালা নেহাতই সাধারণ।উহাদের জীবন ঘটিতে তুলিয়া রাখা জলের ন‍্যায়।গড়াইয়া খাইলেও হয় আবার নষ্ট করিলেও কারো কিছু যায় আসেনা।সোহাগবালা ইহাদের অনেক ঊর্ধ্বে।যমুনাবতী অন্তরে ছোটবৌটিকে স্নেহের অধিক ভালোবাসেন।মায়া দিয়ে গড়া মেয়েটির চোখ।শুধু হাতের বাঁধন আলগা বলিয়াই সব গড়াইয়া যায়।উজাড় করিয়া ভালোবাসিতে জানে ঝগড়া করিতে তার সাধ নাই।অভিমানে ফুলিয়া ওঠে কেবল অধিকার দাবী করিতে বিমুখ।এমন মেয়েকে ভালো না বাসিয়া উপায় কি?মোতির মা আসিয়া দাঁড়াইল।

-মা,ছোটবৌ খেয়েচে।

-বাঁচালে বাপু।তা সে কি করচে?কি হল মুকে কুলুপ আঁটলে যে।সে কি করচে?

-পুকুরঘাটের দিকে গিয়েচে।সাথে রাজ‍্যির জামাকাপড়।

-ওমা,সেকি কতা!শিগগিরই দাসীকে পাটাও।আদরের দুলালী সে অনতথো হবে মোতির মা।যাও যাও।

মোতির মা নিজেই পা চালাইয়া পুকুরঘাটের দিকে আগাইয়ে যাইতেই কাঁঠালতলা হইতে দেখিতে পাইল,সৌম‍্যাদিত‍্য সোহাগের হাত হইতে কাপড় গুলি লইতেছে আর দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সোহাগ কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে।মোতির মা প্রসন্ন মনে ফিরিতে গিয়াও পুনরায় পিছন ফিরিতেই আকাশ কালো করিয়া আসিল।কে জানে কিসের ইঙ্গিত!ঝড় বৃষ্টি পৃথিবী তোলপাড় করিতে আগ্রহী হইয়া উঠিল।

--------------------------------------------------------------
দেবপ্রিয়া লেখা বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল।কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে সে সোহাগকে?নিজেকে কখনো কখনো অচেনা লাগে।এমন বিচ্ছেদ কেন পরিকল্পনায় আসছে?কোন ভাবে কি এই ধূসরতার মধ‍্যে সে নিজেকে মগ্ন করে তুলেছে?অনুজের কথা কোনভাবেই সে মনে রাখতে চায়নি কিন্তু সত‍্যি কি সম্ভব ওকে ভুলে থাকা?এতটা উদাসীন কোন মানুষ কী করে হতে পারে?কোথায় আছে অনুজ?বল্লভপুরের কোনো মাটির ঘরের দোচালায়?নাকি পাহাড়ের কোলে কোথাও টেন্ট করেছে।আদিত‍্যনাথ কি অনুজের ছায়া?নাহ্ কিছুতেই এটা হতে দেওয়া যায় না।আদিত‍্যকে ভিন্ন শেড দিতে হবে যেভাবেই হোক।মরুনকিশোর কোথায় থাকে খোঁজ নিতে হবে।ওর নামের মানেটা জানা হয়নি।কি খুঁজছিল ও পুরীর মন্দিরে?কে জানে?গোধূলি মাসি ওর খবর দিতে পারবে।কালই একবার ফোন করতে হবে।বুকের বাঁদিকটা বড্ড চাপ ধরে আসে আজকাল।একটা ডাক্তার না দেখালেই নয়।ঊশ্রী এখনো কলেজ থেকে ফেরেনি বোধহয়।ফিরলেই আগে এইঘরে আসবে,'মা সোহাগের কি হল?ওর বর ফিরলো?মা আদিত‍্য কি গে?'প্রশ্নে প্রশ্নে পাগল করে দেবে।একা থাকাটাই এখন অভ‍্যাস।তবু মেয়েটা এলে মনে হয় যেন স্নান সেরে ঠাণ্ডা শরীরে এসে বসল নিশ্চিন্ত হয়ে।দুপুরের এই শেষ রোদের তেজে একটা মায়া গন্ধ আছে।বাড়ির পাশের আমগাছটায় এবারো মুকুলের বৃষ্টি নেমেছে।মা থাকলে ঠিক ঘরের ফুলদানিতে ওরা কেউ না কেউ ঠাঁই পেত।দেবপ্রিয়া জানে মা চলে যাবার আগে ভীষণ ভাবে চেয়েছিল অনুজকে জানানো হোক।কোনভাবেই এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে চায়নি সে।বহুকষ্টে যে মোহ ছেড়ে বেরিয়েছে সেখানে আর ফিরতে চায়না।এই সময়টায় গোটাবাড়ি ঘুমিয়ে থাকে।কাজের লোকেরা,ধলিদি সবাই ঘুমায়।কেবল ড্রাইভার ছেলেটা গান শোনে রেষ্টরুমে বসে।অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোনটা বাজছে।ল‍্যাণ্ডলাইন।কেউ বোধহয় ধরার নেই।রকিং চেয়ারটায় গুটিসুটি দিয়ে বসল দেবপ্রিয়া।মেয়েটা ফিরছে না কেন?চারটে প্রায় বাজতে চলল অথচ অন‍্যদিন ফিরে যায়।আবার বাজছে ফোনটা।ভুরু কুঁচকে উঠল তবে কি মেয়ের কিছু!তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে ড্রইং রুমে ছুটল দেবপ্রিয়া।নাহ্ আবার কেটে গেল।কে হতে পারে?কেন ফোন করছে?ঘরে ফিরে মেয়েকে ফোন করল।সচরাচর ফোন করে জানতে চাওয়ার মানসিকতা ওর নয়।মেয়েকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেই তার আগ্রহ।তবু...

-হ‍্যালো ঊশ্রী!

-হ‍্যাঁ মা বলো।

-ফিরছিস?

-একটু কাফে তে আছি মা,কিছু বলবে?দরকার আছে কিছু?

-না না,দরকার কিছু নেই।সাবধানে ফিরিস।

-আমি আধঘন্টার মধ‍্যে ঢুকে যাব।

-আচ্ছা বেশ।

ফোনটা রেখে দেবার পর অস্বস্তিটা বেড়ে গেল।কে হতে পারে এই সময়?আত্মীয় স্বজন কারো সাথেই তো তেমন যোগাযোগ রাখেনি সে।কিবা হত রেখে?একই উত্তর দিতে আর ভালো লাগতনা।কলিংবেলটা বাজছে।ধলিদি নিশ্চই উঠবে।চুপচাপ অপেক্ষা করে দেবপ্রিয়া।কানে আসে দরজা খোলার আওয়াজ।ফিসফিস শব্দ এবং আবার নিস্তব্ধতা।খুব মৃদু পায়ের আওয়াজ।খানিকপর ধলিদি ডাকে দরজার বাইরে থেকে।

-দিদি,এসেছে।

-কে?

-তোমার পিসতুতো বোনের বর।

-কি?বের করে দাও এখুনি।যাও।স্কাউন্ড্রেলটাকে ঢুকতে দিলে কেন?

কথা শেষ হবার আগেই পর্দা সরিয়ে ঢুকে এল বরুণ দত্ত।মাথার চুল ধুলো ভরা,পোশাক জীর্ণ,ময়লা,চোখ লাল।

-প্রিয়া,নিরুপায় হয়ে এসেছি।একটিবার কথা শোনো।তারপর যা সিদ্ধান্ত হয় নিও।

-তুমি এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও।তোমার কোনো কথা শুনতে চাইনা আমি।যাও বলছি।

-একটু শোনো,তারপর...

-বরুণ আমি পুলিশে ফোন করব।

বরুণের চোখের আকুতি,অসহায়তা মুহূর্তে উবে গেল।এক ভয়ংকর শয়তানিতে হলদে হয়ে উঠল চোখ।গলায় মিথ‍্যে কান্না রেখে তাকাল।

-ঊশ্রীর কিছু ছবি এখনো আমার কাছে আছে।যদিও আমি সেসব তোমায় বলতে চাইনা।তোমার মন চঞ্চল হলে লেখালিখি আবার বন্ধ হয়ে যাবে আগের মতো।তারচে আমায় একটু সময় দাও প্লিজ।

মাথা চেপে ধরে দেবপ্রিয়া।জীবন কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে না।সামাণ‍্য বিচ‍্যূতি সামাণ‍্য ভুল এত দীর্ঘ কালো ছায়া ফেলে কি করে?সাড়ে চারটে প্রায় বাজে।মেয়েটা ফেরার আগে এই আপদকে বিদায় করতে হবে।কিন্তু এভাবে কতদিন আর কতদিন।একটা স্হায়ী সমাধান খুব প্রয়োজন।দেওয়ালে টিকিকিটা টিকটিক করে উঠল।

(ক্রমশঃ)