জয়া চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয়া চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২২

জয়া চৌধুরী

                           




Carta a dos desconocidas দুজন অচেনা মানুষকে লেখা চিঠি /  Octavio Paz ওক্তাভিও পাস/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

এখনও জানি না তোমার কী নাম। তোমাকে এত কাছের মনে হয় যে কোনো একটা নামে তোমাকে ডাকা যেন আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার মত মনে হয়। যে অক্ষর সাজিয়ে আমার নাম তৈরী হয় তার সারাংশ-র চেয়ে তুমি যেন একদম আলাদা… এমনটাই টের পাই। বরং ওর নাম আমি চিনি, বড় বেশিই চিনি, এবং আমাদের মাঝখানে এক অদৃশ্য ও নমনীয় দেয়ালের মত ওই নাম কতদূর অবধি যেতে পারে তাও জানি। 

এসব কিছু তোমার কাছে নিশ্চয় ধাঁধার মত লাগছে। তোমাকে ব্যাখ্যা করে বলতে চাইছি ওকে কী ভাবে চিনলাম, তোমার উপস্থিতি সম্বন্ধে কীভাবে সজাগ করেছি ওকে, এবং কেনই বা তুমি এবং ও দুজনে একই রকম আবার একরকম নয়ও বটে। 

প্রথমবারের কথা মনে পড়ে না আমার। আমার সঙ্গেই জন্মেছিলে নাকী সেই প্রথম দেখা হওয়ার বিষয়টা এত পুরনো যে সেটা আমার ভেতরেই পরিণত হওয়ার এবং প্রোথিত হয় যেন, সেটুকু সময় ছিল তোমার কাছে। 

আমার ভেতরে দ্রবীভূত থাকো তুমি। অন্দরের বাকীটুকুর থেকে কিচ্ছুই তোমাকে পৃথক করতে, তোমাকে স্মরণ করতে, তোমায় নতুন করে চিনতে অনুমতি দেবে না। কিন্তু নৈঃশব্দ্যের দেয়াল  দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু কাল ভাবনার পথ রুদ্ধ করে রাখে। নাভি থেকে কপাল পর্যন্ত বেয়ে ওঠে এক বর্ণনাতীত তরঙ্গ। শূন্যের সে তরঙ্গ এবং সেখানেই তা থেকে যায় এক আকাঙ্ক্ষা হয়ে যা সন্তুষ্টি আনে না। একপ্রকার দণ্ডাজ্ঞা যা টলে না। এক অদৃশ্য বোধগম্যতা যা কখনও কখনও খুলে যায় আমার সামনে। অনুপস্থিতির এক বিরাট মাতৃমুখ- এক জৃম্ভণরত যোনি। আমাকে গিলে ফেলে, গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করে, এবং বহিষ্কার করে- নির্দিষ্ট সময়ে; পুনর্বারও ঠিক সেই একই সময়ে। মাথা ঘোরানো এবং বমি আমায় যা প্রতিবার নিচে ছুঁড়ে দেয়। চোখের আন্দাজ অনুযায়ী প্রতিটি কন্ঠস্বর মিনারের ওই উঁচু স্তর থেকে চেয়ে থাকে আমার দিকে, আমার নিজের চোখদুটিও তাই… সবকিছু শেষ পর্যন্ত আমাকে যা শেখানো হয়েছে যে আমি এক অনুপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই নই। এই-ই প্রকাশিত হয়েছে আমার কাছে, এই-ই উন্মুক্ত করে দিত – কীভাবে যে বলব? - তোমার উপস্থিতি। তুমি আমার ভেতরে সেই যে অপ্রতিরোধ্য গিঁটগুলি মত বসবাস করতে তা মসৃণভাবে সরে যায় সূক্ষ্ম যান্ত্রিকতায়। এবং তুমি যদি এগিয়ে যেতে বাধা না দিয়ে থাকো, ওরা ওকে উন্মত্ত করে তোলে যতক্ষণে না এর কলকব্জা ক্ষয় হয়।

দ্বিতীয় দফাঃ একদিন তুমি আমার মাংস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলে। সাদা পোশাক পরা এক দীর্ঘকায়া স্বর্ণকেশীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলে, এক ছো্ট জেটিতে সে হাসিমুখে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিল।  মনে পড়ে চকচকে কালো কাঠ, ধূসর জল ওর পায়ের কাছে খেলা করছিল। সেখানে বিপুল পরিমাণ মাস্তুল, পাল, নৌকো, পাখি ও সামুদ্রিক পাখিরা কিচিরমিচির করছিল। তোমার পিছু পিছু গিয়ে সেই নাম না জানা মেয়েটির কাছে গেলাম। কোনো কথা না বলে আমার হাতখানি ধরল সে। নির্জন বালুভূমিতে হাতে হাত ধরে দুজনে দৌড়েছিলাম যতক্ষণ না পাহাড়ের কাছে পৌঁছই। সমুদ্র ঘুমোচ্ছিল। ওখানে গান গাইলাম, নাচলাম। ওখানেই কোন এক ভাষায় ঈশ্বরের নিন্দা করলাম। এখন সে ভাষা ভুলে গিয়েছি। আমার বান্ধবী প্রথমে হাসছিল- পরে কাঁদতে শুরু করল। শেষে পালিয়ে গেল। প্রকৃতি আমার চ্যালেঞ্জের সামনে অত নির্মম ছিল না। সমুদ্র যখন তার হাত মুঠো করে আমায় ভয় দেখাচ্ছিল, সূর্য তখন ঠিক উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে সরল পথে নেমে আসছিল আমার দিকে। নক্ষত্র যখন আমার রুক্ষ মাথায় থাবা বসাল, আমায় পুড়িয়ে দিতে শুরু করল। তারপরে নিজের শৃঙ্খলা পুনস্থাপন করল। সূর্য তার নিজের জায়গায় ফিরে গেল অস্তে, সমস্ত চরাচর অসম্ভব একলা হয়ে গেল।  পাথরের ফাঁকে, ওই যেখানে পাখিরা তাদের ছোট্ট ছোট্ট ডিম লুকিয়ে রেখেছিল, সেখানে আমার ছাই খুঁজেছিল বান্ধবী।    

সেইদিন থেকে ওর পিছু পিছু যাই আমি। (এখন বুঝি আমি তোমাকেই খুঁজছিলাম)। বহু বছর পরে, অন্য কোন দেশে কোন এক মন্দিরের লাল দেয়ালগুলো গোধূলির আলোকে যখন গিলে ফেলছিল, সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে ফের ওকে দেখলাম। ওকে আটকালাম, কিন্তু আমায় ও চিনতে পারল না। যাতে ও টের না পায় তেমন এক কৌশলে নিজেকে পালটে ফেললাম ওর ছায়ায়। সেদিন থেকে ওকে ফেলে যাই নি কোথাও। বছরের পর বছর মাসের পর মাস, নৃশংস মুহূর্তগুলোয় লড়েছি, ওর ভেতরে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি আমাদের সেই প্রথম দেখা হওয়ার স্মৃতি। ব্যর্থ চেষ্টা করেছি বোঝাতে কীভাবে ওর ভেতরে বাস করতে চেয়ে তুমি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে আমার থেকে। সমুদ্রের ধারে আমাদের একসাথে হাঁটা, আমার বীভৎস বোকামি। তুমি আমার কাছে যতখানি ছিলে আমি ওর কাছে ঠিক ততখানি বিস্মৃতি। 

জীবন খরচ করে ফেলেছি তোমাকে ভুলতে চেয়ে, তোমায় মনে করতে চেয়ে। তোমার কাছে থেকে পালাতে চেয়ে এবং তোমাকেই অনুসরণ করতে গিয়ে। যখন ছোট ছিলাম তোমাকে আবিষ্কার করেছিল সদ্য বৃষ্টি ধোঁয়া এক বাগানের ছোট্ট পুকুরে তখন যেমন ছিলাম এখনও ততখানি একলা। যখন বয়ঃসন্ধি তোমাকে দুটি ভাঙা মেঘের ফাঁকে দেখেছিলাম, এক বিকেলে ধংসের ভেতরে। তখন যেমন ছিলাম এখনও ঠিক ততখানি একলা। কিন্তু আমার নিজস্ব তুরপুনে আমি পড়ব না। অন্য শরীরে গাঁথব। অন্য কোন চোখে যা প্রসারিত এবং সংকুচিত হয়, আমাকে গ্রাস করে, আমায় অবহেলা করে, এক কালো উন্মোচন আমায় স্পন্দিত করে, জীবন্ত প্রবাল যেন, শীতল ক্ষতের মত লোভী। শরীর যেখানে হারিয়ে ফেলি শরীর, অনন্ত শরীর। কখনও যদি আমার পতন শেষ হয়, ওখানে, পতনের ওই অন্য প্রান্তে, হয়ত জীবন আমার দিকে উঁকি দেবে। এক সত্য জীবনে। যেখানে রাত কিংবা দিন কোনটাই নয়, সময় ও উসময় কিছুই নেই, স্থাবর ও জঙ্গম কোনটাই নয়, জীবনের এক ফুটন্ত প্রাণ, এক বিশুদ্ধ প্রাণ। তবে হয়ত এসব কিছুই মৃত্যুকে আহ্বান করার এক পুরনো ধরন হতে পারে। যে মৃত্যু আমার জন্মের সঙ্গেই জন্মেছিল, যা অন্য শরীরে বাস করতে আমার শরীরে ছেড়ে চলে গিয়েছে। 

রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জয়া চৌধুরী

                       






Fernando Denis ফেরনান্দো দেনিস (কলম্বিয়া)-

কবি পরিচিতি- ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সিয়েনাগায় জন্ম গ্রহণ করেন এই কবি। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য জগতে সমসময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। এতাবৎ প্রকাশিত সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ La criatura invisible en los crepúsculos de William Turner বা বিকেলের আলোয় উইলিয়াম টার্নারের অদৃশ্য ভূত ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। এটির প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সে দেশের সাহিত্য জগতে আলোড়ন পড়ে যায়। বিংশ শতকের সে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কীর্তি হিসাবে পরিগণিত হতে থাকে এটি। এই বইটি লেখার সময় ব্রিটিশ চিত্রকর উইলিয়াম টার্নারের আঁকা কিছু গোধূলির ছবি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি। ২০১৭ সালে প্রকাশিত LOS MOSAICOS DE BABILONIAবা ব্যাবিলনের মোজাইক কারুকাজ  y সেই সালেই LOS CINCO SENTIDOS DEL VIENTO  বা ঝড়ের পাঁচ অনুভূতি, ২০০৪ সালে Ven a estas arenas amarillas বা এই হলুদ বালুকায় আপনারা আসুন, একই সালে El vino rojo de las sílabas পদাংশের রক্তলাল ওয়াইন ইত্যাদি তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির স্বনতার সঙ্গে বহিঃ প্রকৃতির রূপের মেলবন্ধন ধরা পড়ে। সমসময়ের অন্যান্য বিখ্যাত কবি রোমুলো গাইয়েগো পুরষ্কার বিজেতা উইলিয়াম ওসপিনা বা খোসে রামোন রিপোলি ম খোসে লুইস রিভাস ইত্যাদিরা স্বীকার করেন বর্তমান লাতিন আমেরিকার কন্ঠ বিধৃত হয় তাঁর কবিতায়। ভারতে সাহিত্য অকাদেমী ইতোমধ্যেই তাঁকে সে কলম্বিয়ার শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। ২০০৯ সালে তাঁর লেখা ১১৩ টি কবিতা সম্বলিত Geometry of Water” বা জলের জ্যামিতি বইটি অনূদিত হয়েছে ভারতে সাহিত্য অকাদেমীর মাধ্যমে ।  বর্তমান কবিতাগুলি তাঁর সাম্প্রতিকতম  LA MUJER QUE SUEÑA EN LAS MURALLAS বা দেওয়ালে তন্দ্রারত মেয়েটি থেকে নেওয়া। 



La mujer del fuego আগুনে মেয়ে/ ফের্নান্দো দেনিস ( কলম্বিয়া) 


১০

আমি নিজস্ব গোলকধাঁধায় বন্দিনী, গোপন যত

প্রলাপ যা আমার যাত্রীর ট্রাংকে সযত্নে বয়ে চলি,

আমার ত্বকের বর্তুলতায় , আমার মধুভান্ডে,

আমার আঙুলের কুসুমগুলিতে যারা বড় খারাপ ভাবে হয়েছে ক্ষতবিক্ষত

নীরবতা, গোধূলিতে তার চড়চড় করে ফাটা;

এক গভীর প্রভার কাছে বন্দিনী,

তার জেলকুঠুরীতে যন্ত্রণা সয়ে যাই। 


গ্রহের অনপনেয় সূর্যাস্তের নিচে সময়

ঘোরে আমার সাথে,

আমিও ছিলাম রাজকুমারী আরিয়াদনা- এক ইন্দ্রজালের ভেতরে বাস করি বদ্ধ

এবং নিজে রূপকথাও বটে; 

ষাঁড় মুখো কোন রাক্ষস আমায় তাকিয়ে দেখে না,

আমার ভেতর আরো বেশি সুন্দর কিছু করে বসবাস…,

তবে একইসাথে বড় ভয়ানকও বটে।  


১১

ঝড়ের চারপাশ ঘিরে থাকা রহস্যময়ী লতাদের ভেতরে থাকে

আমার সঙ্গীতের রূপ,

আমার শ্রবণের আগুনে থাকা ল্যুট গিটারের রূপ,

তার অনন্ত একাকীত্ব এবং জনশ্রুতির পাথরকুচিরা, তার চিত্তভ্রংশ।


তার মথিত করা স্মৃতির অবয়ব থেকে সেরে উঠি-

তার অহং, তার আনন্দ,

তার ছলনাময়ী কোমলতা যা স্ফটিকের যন্ত্রণায় 

স্বতন্ত্র বাস করে ,

সে আলোর প্রলেপ তেজীয়ান পরিবেশ রেখে যেতে যেতে

বিদীর্ণ হয় হিমঋতুর বরফপ্রদাহে,

ঝঞ্ঝাবাত্যা ভেদ করতে করতে, তামার অজানা মহাদেশ 

খাঁড়ির প্রবেশ দ্বারে মারা যাবে যারা, পবিত্র মৃত্তিকায়,

রক্তিম গতিরুদ্ধ উপত্যকায় যাদের প্রান্তরেখায়

প্রমিথিউসের স্বপ্ন থামে নি এখনও ,

দেহভস্ম এখনো যেখানে হয় না জয়ী।


প্রমত্ত, উদ্যমী, কমনীয়তার দিকে চেয়ে বুজে ফেলি চোখ,

নিখুঁত, অচেনা সুখে এবং অপ্রশমনীয়

সৌন্দর্যের শক্তিতে আমায় যে পরাভূত করে

এবং নীলার মত অগ্নিশিখা আমায় সময়কালকে প্রজ্জ্বলিত করে ঝড়ের আড়ালে। 


রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

জয়া চৌধুরী

                                                                      



Aplastamiento de las gotas / Julio Cortázar

বৃষ্টিফোঁটাদের ভিড়/ খুলিও কোর্তাসার/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

আমার জানা নেই, ও দেখবে, বৃষ্টি কী ভয়ংকর ভাবে পড়তে থাকে। সর্বক্ষণ বৃষ্টি পড়ে, বাইরে নিস্তেজ,

ধূসর, এখানে বারান্দায় বড় বড়, অখন্ড কঠিন দানায় এবং টপটপ করে ঝরে ও একটির পিছুপিছু আর একটি

চড়ের মত জড় হতে থাকে একঘেঁয়ে। এখন জানলার ওই উঁচু গরাদ থেকে টুপ করে এসে পড়ে ছোট্ট জলের

ফোঁটাটি। নিভে যাওয়া হাজার ঝিলিকের মাঝে যেন এক টুকরো ফোঁটা থিরথির করে কাঁপছে আকাশের গায়ে,

বেড়েই চলেছে, টলমল করে কাঁপছে, এই এখনই ঝরে পড়বে এবং পড়বে না, এখনও সে পড়ে নি।

সবকটি নখের পোশাক পরে আছে সে, ঝরে পড়তে চায় না, ওকে দেখা যায় দাঁত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে এবং

ইতিমধ্যে বেড়ে উঠছে গর্ভ, এ তো এক বিপুল বৃষ্টিফোঁটা, মহিমময় ঝুলন্ত এবং মুহূর্তে ঝুপ করে পড়ে ওই

যে, টুপ, অসম্পাদিত এক, কিচ্ছু না, মর্মরে কোন ঘনসংবদ্ধতা।

কিন্তু, এটা দরকারী ওরা আত্মহত্যা করে এবং পর মুহূর্তেই সমর্পণ করে, গরাদে অঙ্কুরিত হয় এবং ওই

এক জায়গায় ডুবে যায়, লাফ দেবার থরথরানি দেখা যায়, তাদের পা গুলি আবরণ খুলে ফেলতে থাকে এবং ওই

পতন ও আত্মধ্বংসের ভেতরে চিৎকার ওদের নিষ্ক্রিয় করে দেয়। বিদায় বৃষ্টি ফোঁটারা, বিদায়।


Tala পতন খুলিও কোর্তাসার/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

এই চোখদুটি নিন, রঙিন নুড়ি যত,

টোটেম উপজাতির মত নাক, এইসব ঠোঁট যারা জানে

গুণক্রিয়ার সবকটি গুণিতক এবং সবচেয়ে বাছাই করা কবিতাদের।

আপনাকে সম্পূর্ণ মুখখানি দিই, জিভ এবং চুল সুদ্ধ,

এভাবে ভাবলে

কোন কাজ হয় না। চোখ বা আঙুল কিছুই নয়।

ফের গরম করা ওই খাবারও নয়, স্মৃতি নয়,

মনোযোগও না, হুকুমের চাকর তোতাপাখিটির মত।

সব কটা ইনডাকশন উনুন ও হ্যাংগারগুলি নিয়ে নিই

যেখানে ধোয়া ও ইস্ত্রী করা পরিপাটি শব্দেরা ঝোলে।

সবকিছু থেকে দূরে, বাড়ির সাথে সাথে,

শূন্য গর্তের মত আমায় ছেড়ে দাও, কিংবা ঝুঁকির মত।

হয়ত তখন, যখন ঈশ্বরের উদারতা


আমায় মূল্য দেবে না, ওই বয়-স্কাউট,

আর এই কার্পেটের মত সমতল যা তিনি সহ্য করেছেন

আশি বছরের পুরনো জুতোয় ঝরে পড়া তার ধীর বৃষ্টিফোঁটা

এবং তা পাক খোলা ব্যস আর কিছু নয়, পরিষ্কার কঙ্কাল যেখানে

টাকাওয়ালা রূপোর ময়ূরেরা মুছে ফেলেছিল,

এমন হতে পারে যে তোমাকে ছাড়াই তোমার নাম নিশ্চিত বলে উঠবে

এমনও হতে পারে যে হাত ছাড়াই তোমার কোমরে পৌঁছে যাবে।


Hablen, tiene tres minutes আপনারা কথা বলে যেতে পারেন, তিন মিনিট হাতে আছে আপনার/ খুলিও

কোর্তাসার/ অনুবাদ- জয়া চৌধুরী

আপনারা কথা বলে যেতে পারেন, তিন মিনিট হাতে আছে আপনার

এক চক্কর হেঁটে এসে

আঙুলের মাঝে তোমায় এক মুহূর্ত পাবার জন্য যেখানে একটি ফুলের সঙ্গে জুড়ে ছিলাম,

এবং এক বোতল বেয়াউখোলাইস রেড ওয়াইন পান করেছিলাম, কুয়োর তলায় নামার জন্য

যেখানে নেচেছিল লুনা ওসো কোম্পানির একজোড়া চপ্পল,

লম্ফবাতির সোনালি গোধূলিতে ঝুলিয়ে দিই আমার ত্বক

এবং জানি পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল

এ শহরে একলা থাকব আমি।

আকুলতার এই ভারসাম্য তুমি মাফ করে দেবে, ইঁদুরের মত পালানো ও মরফিন অভিযোগের মাঝখানে,

বড্ড ঠান্ডা এ কথা খেয়াল করতে করতে, আমার কফির পেয়ালায় বৃষ্টি ঝরতে থাকে,

এবং তার পায়ের স্পঞ্জে প্রতি টুকরো ক্রসেন্টে রুটির গায় আর্দ্রতা মসৃণ হয়ে যায়।

গোঁড়ার মত, অন্ধ যন্ত্রের মত, জ্বরের গং-এর মত অবিরাম পুনরাবৃত্তি করতে থাকে যে সংকেত,

আমি তোমাকেই ভেবে চলি একথা,

বিশেষভাবে জানতে জানতে

হাতের ভেতর চেটোয় আশ্রয় দেয় যে উন্মাদ, ঘন্টার পর ঘন্টা আদর করতে থাকে


স্রেফ এক নরম টুকরোয় মিশিয়ে ফেলে পালক এবং আঙুল।

ভাবি তুমি সন্দেহ করবে কী হল হঠাত এই ভেবে,

যেমন তোমার শহরে বসে দূরে থেকেও অনুভব করতে পারি তোমাকে,

চক্কর কেটে ফিরতে ফিরতে ওখানে হয়ত তুমি যোগ দিতে পারো

একই ফুলের সাথে, কিছুটা উদ্ভিদবিদ্যার খাতিরে,

কিছুটা যেহেতু তুমি এখানে আছ বলে

কেননা এটি অমূল্য

আর আমরা যে তত একলা নই, আমাদের মধ্যে

গড়ে উঠেছে এক পাপড়ি, সেটা যদিও ছোট্ট এক পা এগোনো, একটা শণ স্রেফ।



কবি পরিচিতিঃ খুলিও কোর্তাসার

তর্ক সাপেক্ষে আর্জেন্টিনা র সর্ব কালের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক খুলিও কোর্তাসার

১৯১৪ সালে বেলজিয়াম এ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা তখন সেই দেশেই

আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত পদে নিযুক্ত ছিলেন। কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক,

প্রাবন্ধিক, অনুবাদক কোর্তাসার ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যে বুম জুগের

অন্যতম অগ্রপথিক। আর্জেন্টিনার ই নোবেল জয়ী সাহিত্যিক খোরখে লুইস

বোরখেসের ভাবশিষ্য ছিলেন তিনি। যদিও তাঁকে নোবেল পদক না দেওয়া নোবেল

পুরস্কারেরই মান খোয়ানো বলে মানা হয়। কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর অসামান্য

লেখনীর জন্য মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বলেছিলেন ‘আধুনিক ছোটগল্পের মাস্টার’ আর

‘উপন্যাসের সিমন বলিভার’। ফরাসী ভাষার অনুবাদক হিসাবে তিনি ইউনেস্কোর

সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। এডগার এলান পো-র রচনাবলী ফরাসী ভাষায় তাঁর কৃত

অনুবাদ কেই সর্ব শ্রেষ্ঠ মানা হয়। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘রাইউয়েলা’ বা

‘এক্কাদোক্কা’কে স্প্যানিশ ভাষার বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলা

হয়। মৃত্যুর অব্যবহিত আগে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ “সালভো এল ক্রেপুসকুলো”

বা ‘সন্ধ্যা ব্যতিরেকে’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য কীর্তি। প্রবল রোগভোগে

১৯৮৪ সালে মারা যান তিনি।