মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুক্তগদ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

দীপঙ্কর বেরা,

                                         




বর্ষার জলছবি

বর্ষা মানেই বৃষ্টি। আর বৃষ্টি মানেই বর্ষা। বর্ষা সঙ্গে আমার সখ্যতা নেই তবে বৃষ্টির সঙ্গে আছে।
খুব ঝমঝমিয়ে যখন বৃষ্টি নামে ভিজতে খুব ভাল লাগে। খোলা আকাশের নিচে কেমন শন শন শব্দ করে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এঁকেবেঁকে বৃষ্টি পড়ছে। আর আমি একা। কোথাও কোন জনপ্রাণী নেই। সবাই ঘরে না হয় কোন ছাদের নিচে আশ্রয় নিয়েছে।
রান্না হয়ে গেছে, ঠিক স্নান করব করব, দুপুরের গা জ্বালানো গরমে হাঁসফাঁস এমন সময় আকাশ কালো করে একটু ঝোড়ো হওয়ার সাথে ঝেঁপে এল বৃষ্টি। ব্যাস, আমিও হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি গলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ভিজতে। কি ভাল লাগে?
এর সঙ্গে দু তিনটে ব্যাপার খুব গোলমাল বাঁধিয়ে দেয়। কি বলব? বাইরে বেরিয়ে যদি দেখি বিটকেল বৃষ্টি ঝমঝমিয়ে এল বটে কিন্তু হল না। হল রিমঝিম রিমঝিম। গা টা ভিজবে কি ভিজবে না করছে। ওই বর্ষাকালে যেমন হয় আর কি? কিন্তু আমার কি হল? বাড়ির যে ক'টা লোক আমাকে দেখছিল তারাও হাসাহাসি করতে লাগল। কি খুব শখ হয়েছে ভেজার? এখন ভেজো। প্রেস্টিজ পাংচার। আমিও ছাড়বার পাত্র নয়। আকাশের দিকে বার বার তাকাচ্ছি। আয় না, আয় না ভাই বৃষ্টি। আসে না তো আসেই না। গুঁড়ি গুঁড়ি ঝিরঝির। গা টা ভিজতেই চাইছে না। শেষ পর্যন্ত বিফল মনোরথে ঘরে এসে যেই বাথরুমে ঢুকেছি এসে গেল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আচ্ছা বলুন তো, কি রাগটাই না হয়? কিন্তু কিছু করার নেই। বর্ষার বৃষ্টি বলে কথা।
তারপর ধরুন খুব জোরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ভিজছি আর সঙ্গে সঙ্গে ধড়াম করে চড়াম করে কাছেই পড়ল বাজ। ব্যাস হয়ে গেল বৃষ্টিতে ভেজা। সব মাটি। বাড়ির লোক উপর থেকে চেঁচাচ্ছে। চলে আয় বলছি , চলে আয়। বৃষ্টির ঝাপটায় আমি শুনতে পাচ্ছি না। আমার বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠছে। বাপরে! কি বিদ্যুৎ! অনেক হয়েছে। চলো ভাই। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চল।বৃষ্টি ও বর্ষার এবং ভিজতে থাকা বর্ষার আমেজে এই এক সব থেকে বড় বিড়ম্বনা।
এই বিড়ম্বনার জন্য এখন আর বৃষ্টিতে ভিজতে পাই না। গাছ কমে যাওয়ার জন্য নাকি পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার জন্য নাকি আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য বৃষ্টির হওয়ার আগে মেঘ ডাকতে শুরু করে আর বজ্রপাত শুরু হয়ে যায়।
সেই ছোট্টবেলায় বাবার সাথে মাঠে কাজ করতে করতে এই রকম ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসে যায়। মা বলেছিল মনে হয় বৃষ্টি আসবে মেঘ কালো হয়ে আসছে। চলো বাড়ি ফিরে যাই। বাবা বলেছিল - এই তো এইটুকু কাজ বাকী রেখে যাব। শেষ করেই যাচ্ছি। বৃষ্টি আসবে না। তারপর বৃষ্টিতে আমরা মাঠ থেকে দৌড়ে ফিরছি অনেকের মত। মাঠের ধারে এসে বড় বাঁধের ধারে বাবা মার মাঝখানে আমি। মা আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে আমার মাথা। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। জল জমছে পায়ের তলায়। বজ্রপাতও হচ্ছে অল্প অল্প।
তারপর বৃষ্টি থেমে যেতে মায়ের হাত ধরে কাদা রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফিরছি। চারিদিক কেমন ধোয়া ধোয়া জীবন। ঘর বাড়ি গাছপালা মাঠ ঘাট খাল বিল। ধুলোবালি ময়লা আবর্জনা সব ধুয়ে মুছে একসা। পৃথিবী যেন নোংরা মুক্ত।
এখন ড্রেন ভর্তি ময়লা উপচে মাঠ ঘাট রাস্তা বাড়ির চারপাশ ভরে যাচ্ছে। বাড়ি ঘর গাছপালা সব কিছু যেমন ধোয়া ধোয়া মনে হয় তেমনি পৃথিবী যেন জঞ্জালে একসা।
যাক গে সেব কথা। বর্ষার আগমনের কথা যখন আবহাওয়া দপ্তর বলে তখন বৃষ্টি আসবে জেনে আজকাল আর তেমন খুশি খুশি মনে হয় অথবা হয় না। বৃষ্টিতে ভিজতে পারব কি পারব না? দুপুরবেলা সেই বৃষ্টি আসবে কি আসবে না? চারিদিকে এত বাড়ি ঘরদোর সেই হাফপ্যান্ট গেঞ্জি পরে নিচে নামতে পারি না বয়স বাড়ছে। যদিও আমি তা মনে করি না। মনে করে বাড়ির লোক। কেন না অসুখ করলে কষ্টটা তাদেরকে পোয়াতে হয়।
তবু আজকাল অফিস থেকে ফেরার পথে যদি বৃষ্টি এসে যায় তখন আর সেই সুযোগ নষ্ট করি না। বাড়ির লোক জিজ্ঞেস করলে বলি, ছাতা নিয়ে যেতে ভুলে গেছি।
কিন্তু ছাতা যদি ব্যাগ থেকে খুঁজে পায় তো বলি, এমা! আমি ভেবেছি ছাতা নেই। কিংবা ঘরের ঢোকার একটু আগে ছাতা খুলে সেই ছাতা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বলি, ছাতা মাথায় দিয়েও আটকাতে পারলাম না। ভিজে গেলাম।
অন্য সবাই এটা ওটা বলতে থাকে। কিন্তু বাথরুমে টাওয়াল দিতে দিতে উনি একটু মুচকি হেসে বলেন - তোমার ভীমরতি আমি বুঝি না মনে করেছো?
আহা! আসুক বৃষ্টি! আসুক বর্ষা! আসুক না অসুখ বিসুখ! থোড়াই কেয়ার করি? এর জন্যই বেঁচে থাকি আমি হাজার হাজার জীবনের জলছবি।

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

পিয়াংকী

                                                              



আঙুলের আড়াল আর ভরসন্ধ্যার পুরুষ 



কচুপাতায় জল। টলটল করে, ধরে রাখা যায়না। ঠিক যেন একমুঠ আদর।আলগা হলেই পড়ে যাবে অন্য কোনো বাড়ির ঠিকানায়,তখন টিনের চালে দুমদাম শিল পড়বে,টুপটাপ টিপটিপ লাখো মুদ্রায় নৃত্য হবে নটরাজের শরীরের সর্বত্র  

চুপচাপ বসে থাকা,জানালা খুলে রাখা  হাট করে।হুটহাট করে ঘরে ঢুকে পড়বে কেউ, সেই আকাঙ্খা দিয়ে ঘিরে থাকা হাজারো অলিগলি। 

আষাঢ়ের ভরসন্ধ্যা, দুপুরের গাকাপড় সংসারপাড়ায় অপবিত্র। ঘরে পুরুষমানুষের অবিরাম চলাফেরা, সাবানজলে উলঙ্গ নিজেকে ঘষে ঘষে ধুয়ে এসে জড়িয়ে নিয়েছ বারোহাত ধনেখালী তাঁত। সিংহাসনে নারায়ণ আর লক্ষ্মী।   কপালের সিঁদুর লেপ্টে গেছে একজনের বুকের ঘরে। তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ভক্তরা। এলোমেলো চুলে তেল পড়েনি অনেককাল,তবু উড়তে উড়তে সে পার করে ফেলেছে সাত সাত্তে ...

মহাদেশ মহাসাগরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছ,দূর থেকে দু'চোখে দেখে নিচ্ছ ভেজা-ভেজা কচুপাতা।কোঁচড়ভর্তি কাঁকর। রাস্তার ধার ঘেঁষে ফেলতে ফেলতে গেলে তার চিহ্ন নিয়ে ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে প্রিয় ঘর।  

ভীষণরকম বলতে কী বোঝায়?তীব্র শব্দের অর্থ কী? প্রবল কি বিশেষণ? বিশেষ্য বরং আপনাদের সাথে অনেকটা একাত্ম তাই না?

প্রশ্নের উত্তরে শুধুই দাবদাহ। 

দেখতে গেলে কতকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে   অথচ জীবনভর শুধু আলেয়াআলো থিতিয়ে রাখে সব।  ঘনিষ্ঠ হতে হতে ঘন হয়ে আসে চাহিদা। মধ্যের  দূরত্ব এক গজ থেকে একটা বিন্দু হয়ে যায়। তা সত্ত্বেও  গজগজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দু'জন, আরো একবার ধুয়েমুছে উঠিয়ে নেয় রান্নাঘরের বাসনকোসন, কানাউঁচু থালা ছাড়া সে ভাত খেতে পারে না।পায়েসে কিসমিস পড়লে বিরক্ত হয়ে তাকায়। কলাপাতায় ভেটকিপাতুড়ি আর ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতে দেশিমুরগির ঝোল পেলে নরম তুলতুলে নজরে চেটে নেয় রাঁধুনির আঙুল 

এভাবেই চলে যায় সাজানো-গোছানো মে।একটু একটু করে জুন আসে আর খনিতে পড়ে থাকে আমার স্লিভলেস ব্লাউজ কলমকারি শাড়ি তিনঝুমকো পায়ের নূপুর হাতের বালা। ছাদে ওঠার মাঝসিঁড়িতেই পেছন পেছন পা টিপেটিপে উনি আসেন, জড়িয়ে ধরেন তলকোমর। 

জুলাইয়ের পুকুরে তখন ভরপেট কচুরিপানা, খেজুর গাছের নোয়ানো ডালে মাছরাঙা খুঁটে খাচ্ছে কাকভেজা গাছের শরীর,  মাছেদের গায়ে শ্রাবণী তাপ।

...বর্ষা।ঝরছে অঝোরে। এই মধ্যযামেও জলের ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে শোবার ঘর।

আর্যপুরুষ, তুমি আমায় নদী বলে ডেকেছ, মেঘ বলেও ডেকেছ বহুবার।অথচ আমি তোমায় এজন্মে শুধু একপশলা ভারী বৃষ্টিপাত দিতে চেয়েছি

পেয়েছ কিনা, চিঠি দিও...

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

সোনালী মিত্র


মা ও জন্মদিন
আমার মায়ের কোন জন্মদিন নেই। 'একবার মা হয়ে গেলে , মায়েদের জন্মদিন আর থাকে না' , জানতে চাইলে এটাই বলে মা । আমার অবশ্য একটা জন্মদিন আছে । ভ্যানিলা কেক আর দিল্লির গরমাগরম শিক কাবাবে আমার জন্মদিন আছে। ভাই যেহেতু বংশরক্ষাকর্তা তাই ওর জন্মদিন আমার চেয়েও মস্ত । মুম্বাই রেস্তোরাঁয় গ্রান্ডপার্টির শ্যাম্পেনের মিশে থাকে ওর বার্থ ডে কেকের ফ্লেভার।

#
আমাদের লালচোখ ও মধ্যরাত্রির উল্লাস গাঢ় হলে,আকাশে উড়িয়ে দিই রঙিন ফানুস, অনেকটা এম্বিশনের মতো ।চকলেট আর ফুলের বুকে পাশাপাশি শুয়ে থাকে।তখন ক্লান্ত শরীরে লাট খেতে থাকে অনেক হাওয়া বেলুন।এসব নিভে এলে ফোনের  ওপ্রান্তে জেগে বসে থাকে,কাজু,কিশমিশহীন ফ্যাকাসে বাটির পায়েস। আর উপেক্ষা জনিত শব্দে হাত পাকিয়ে আমরা সুইজারল্যান্ড  বরফ স্বপ্ন চোখে গুঁজে  তলিয়ে যাই ভোরঘুমে।
#
মায়ের জন্মদিন বলতে খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠা । উঠেই বাবার জন্য চায়ের জল বসানো প্যানে । ফুটন্ত জলে  আদারকুঁচি আর হাফ চামচ চা-পাতা দিয়ে অপেক্ষা করা । মা জানে , আগুনে সঠিক মাত্রায় না ফুটলে স্বাদ আসে না । সকাল থেকে মাঝরাত পর্যন্ত মা সংসারের আগুনে ফুটতে থাকে বিভিন্ন স্বাদে । আমরা জানি , ফুটন্ত মায়ের স্বাদ অপূর্ব ।
#
মায়েদের কোন জন্মক্ষণ নেই।মা বলেছিল,তুখোড় তাপে-তীব্র শীতে রাস্তার পাশে পড়ে থাকে তাবৎ  মুখ, অবিকল মায়েদের মতো।তমাম রুমালে ঢাকা নাকে প্রতিটি সন্তান জানে সন্তানের সুখে জন্ম নেওয়া মায়ের জন্মলিপি,খোদিত থাকে না মধ্যবিত্ত উনুনের তাপে।অবশ্য অনিবার্য ভাবেই সময়ের দেওয়াল ফ্রেমে মায়ের পায়ের আলতা ছাপ সাজিয়ে বিজ্ঞাপিত থাকে এক একটা মাতৃমৃত্যু দিবস।
#
মায়ের জন্মদিন নিয়ে এরবেশি জানি না । একদিন মা বলেছিল , মায়ের জন্ম হয়েছিল ফেব্রুয়ারির ২৯ । আমরা মায়ের ছানাপোনারা প্রতিবছর ২৯ শে ফেব্রুয়ারির অপেক্ষা করতে থাকি , কিন্তু ২৯ আর আসে না । একটা দুটো  ২৯ শে ফেব্রুয়ারির অপেক্ষা করতে করতে আমরা বড় হয়ে যাই । অফিস খুলে যায় । কাজের বাজারে হাহাকার আসে । ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লে দেখি মার্চের সকাল এসে হাজির হয়েছে । মা বাবার জন্য চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে । মায়ের মুখে লেগে থাকা হাসির দিকে চেয়ে থাকি । মাকে পৃথিবীর মতো মনে হয় । সংসারের অক্ষে ঘুরছে । নিজে জানে না ঘুরন্ত ইতিহাস , আমরা শুধু খাতায় লিখে রাখি জন্মদিন , জন্মদিনের দিন মনে থাকে না ।