মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায় লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

                                        


এই সংখ্যার গদ্যকার মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়৷জন্ম হাওড়া জেলায় । পড়াশোনা বাণিজ্য নিয়ে হলেও শৈশব থেকেই সাহিত্য প্রীতি ।  সাপ্তাহিক বর্তমান, আজকাল রবিবাসর, কথাসাহিত্য, গল্পপাঠ, পুরুলিয়া দর্পণ, ভবিষ্যত সহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক এবং অবাণিজ্যিক পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে একটি অণুগল্পের একক সংকলন শপিজেন বাংলা থেকে । তাছাড়াও বহু যৌথ সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা গল্প ও অণুগল্প । আসুন পড়া যাক তার একটি গল্প।



অন্তর্ধান

দূরে ঢালাই কারখানায় যখন ঢং ঢং করে বারোটা বাজলো, ঠিক সেই মুহূর্তে সুবর্ণ তার কাজ শেষ করে হাতটা ঝাড়লো । খুব নোংরা হয়ে হয়ে গেছে হাতদুটো । কিছুটা সময় নিয়ে প্রথমে হাতটা হাল্কা হাতে ঝেড়ে, তারপর পাশে জলের বালতিটার দিকে তাকালো । যাহ্‌, বড্ড ভুল হয়ে গেছে । তাড়াহুড়ো করে জলের বালতি আনতে ভুলে গেছে । এই তার মস্ত দোষ । কিছুতেই নিঁখুত হয় না তার কাজ । কিছু না কিছু ঘাটতি থেকেই যায় । যাকগে, আজকের কাজে এটা কোন ভুল হিসেবে ধরা যায় না । তবু মনটা খুঁতখুঁত করছে সুবর্ণর ।

তবে মনের মধ্যে একটা ফুরফুরে ভাব টের পাচ্ছে । ইচ্ছে করছে এখানে চিৎ হয়ে শুয়ে ছোটবেলার মতো চেঁচিয়ে কোন কবিতা বলতে । সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যেতে পারে ভেবে নিজেকে নিরস্ত করে সুবর্ণ । তবে এটা ঠিক, আর উঠতে-বসতে তাকে জ্ঞান শুনতে হবে না, মনে হবে না সে ছোট হয়ে যাচ্ছে কারো কাছে । শুধুই কী মনে হওয়া ? ভাবে সুবর্ণ । না কক্ষনো নয় । তাকে ডেলিবারেটলি ছোট করা হতো । চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হতো সে কতটা ছোট, কতটা নীচ মনের অধিকারী । শুধু কী তাই ? তার সঙ্গে যেভাবে কথা বলা হতো, তাতে পরিস্কার বুঝিয়ে দেওয়া হতো সে আসলে কতটা ব্যর্থ মানুষ । আর তারপর রিয়াক্ট করলে ?  শুনতে হতো, “তুমি অসুস্থ । তোমার ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন ।” চেষ্টা চলেছে প্রচুর সুবর্ণকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার । তবে সুবর্ণকে বাগে আনা এত সহজ নয় । 

এই তো দিন দশেক আগের কথা । সেদিন সে আর . . . আচ্ছা, প্রথম থেকে শুরু করব নাকি দশদিন আগের কথাটা বলে নিয়ে আরও পুরনো ঘটনায় যাব ? 

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে সুবর্ণ কে আর তাকে কার কাছেই বা জ্ঞান শুনতে হয় আর কার কাছেই বা ছোট হতে হয় । তাহলে একটু নিজের মতো করে বলি । দেখুন তো আপনাদের বুঝতে সুবিধা হয় কিনা ।  

সেদিন সুবর্ণদের বাড়িতে খুব খুশির দিন । দীর্ঘ সাত বছর পর সুবর্ণর মায়ের কোল আলো করে এই প্রথম নতুন অতিথি ওই বাড়িটায় আসতে চলেছে । সব ঠিকঠাকই ছিল । কিন্তু সুবর্ণর মা নার্সিং হোমের সামনে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে কীভাবে যেন পা জড়িয়ে পড়ে গেলেন । আশপাশ থেকে হইহই করে উঠল মানুষজন । শুধু সুবর্ণর বাবা বলে উঠলেন, ‘ক্যালাস একটা । কিছুই পারে না ।’ মায়ের গর্ভে সেদিন সুবর্ণ কেঁপে উঠেছিল । 

এই বিপত্তি সত্ত্বেও সুবর্ণর জন্মে কোন সমস্যা হয়নি । আর শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তও হয়নি সুবর্ণ । বাড়ির লোক থেকে ডাক্তার সবাই স্বস্তির শ্বাস নিয়েছিল ।

সেই সুবর্ণ এখন অ্যাডাল্ট । বিয়ে হয়েছে বছর দুই । আনন্দীর সঙ্গে । স্মার্ট, আধুনিকমনস্ক মেয়ে আনন্দী । চাকরি করে একটা সরকারী স্কুলে । তার সঙ্গে একটা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত । একে অপরকে ভালবেসে বিয়ে করেছে তারা । সুবর্ণর ইচ্ছাতেই ওরা বাবা-মাকে ছেড়ে এসে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে । কিন্তু আনন্দী চেয়েছিল সুবর্ণর বাবা-মা আর তারা একসঙ্গে সুবর্ণদের নিজেদের বাড়ি টালাতে থাকবে । 

বিয়ের পর থেকে সুবর্ণর মাকে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতো আনন্দীর । সব বিষয়ে ভয়, জড়তা, আড়ষ্টতা । আর সুবর্ণর বাবা প্রতি মুহূর্তে ওই মহিলার ওপর যেন মারমুখী হয়ে আছেন । সুবর্ণকে কিছু বলতে গেলে সে বলত, ‘বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা ঘামাতে যেও না ।’

‘কিন্তু তুমি ? তুমি তো মায়ের পাশে দাঁড়াতে পারো ।’

‘কেন ? কিসের জন্য ? মা-কে তুমি চেনো না । মায়ের সবকিছুকে গুবলেট করে দেওয়া স্বভাব । তাই বাবা ওভাবে রেগে যায় । ঠিক করে । আমার নিজেরও বিরক্ত লাগে ।’

অবাক লেগেছিল আনন্দীর । খুব খারাপ লেগেছিল সুবর্ণর কথা । কিন্তু নতুন জীবনের শুরু, চোখে স্বপ্নের মায়াকাজল, এই খারাপ লাগাকে স্থায়ী করতে পারেনি ।

আনন্দী আস্তে-আস্তে কেষ্টপুরে তাদের নিজস্ব দু-কামরার ফ্ল্যাটে নিজেদের জগৎ গড়ে তুলছিল । কিন্তু বাধ সাধল সেদিনের সেই ঘটনাটা । পার্টি ছিল সুবর্ণদের অফিসের । আনন্দী স্বীয়-স্বভাবের গুণে খুব অল্প সময়ে সবাইকে আপন করে নিতে পারে । আর অন্যেরাও বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাকে কাছে টেনে নেয় ।

সেদিন সুবর্ণদের অফিস পিকনিক ছিল । খুব জমজমাট হাসিখুশি পরিবেশ । আলাপ হয়েছিল অনেকের সঙ্গে । তার মধ্যে সুমনদা একজন । প্রাণখোলা মানুষটার সঙ্গে আনন্দীর অনেক কথা হয়েছিল । সুমনদাকে বেশ ফ্যামিলিয়ার মনে হয়েছিল আনন্দীর । তার বাড়িতে কে আছে, ছোটবেলা কীভাবে কেটেছে, কী পছন্দ . . . একেবারেই ঘরোয়া আলোচনা । কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢুকেই সুবর্ণর আচমকা চিৎকারে চমকে যায় আনন্দী ।

‘এত কী কথা সুমনদার সঙ্গে ? পিকনিকে তো আরও অনেকেরই মিসেস গিয়েছিলেন । কই, তারা তো কেউ সুমনদার সঙ্গে গল্প করতে বসে যায়নি ?’

‘সেরকম কোন কথা নয় । এই ছোটবেলার কথা, বাড়িতে কে কে আছে এইসব জানতে চাইছিলেন ।’ থতমত খেয়ে বলে আনন্দী ।

‘ও, আচ্ছা ! সেরকম কোন স্পেশাল কথা হয়নি বলে আফশোষ হচ্ছে বুঝি ?’

‘ছিঃ ! কী বলতে চাইছ তুমি ?’

‘যা বলতে চাইছি সেটা ঠিক বুঝেছ । আর ন্যাকামি করতে হবে না ।’

স্তব্ধ হয়ে যায় আনন্দী । এ কোন সুবর্ণকে দেখছে ! বিয়ে ছমাস হলেও আগে এই মানুষটার সঙ্গে গত দেড় বছর মেলামেশা করেছে । কখনো তো এই ধরণের কথা শোনেনি ।

  হঠাৎ মনে পড়ে যায় আনন্দীর । তখন তারা চুটিয়ে প্রেম করছে । সিসিডিতে কফি খাচ্ছে । উল্টোদিক থেকে একটা ছেলে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছিল তাকে । আনন্দী বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল । কিন্তু সুবর্ণ দুম করে উঠে বলে উঠেছিল, ‘স্যরি ভাই, ম্যাডাম বুকড্‌ । চোখটা এবার সরিয়ে নিন ।’

তখন খুব জোরে হেসে উঠেছিল আনন্দী । কিন্তু আজ ? খুব খারাপ লাগছে সুবর্ণর কথাগুলো । কেমন অচেনা মনে হচ্ছে এতদিনের চেনা মানুষটাকে । একসঙ্গে চলার ছন্দে সেদিন প্রথম তাল কেটেছিল ।

এর মাসখানেক পরের কথা । আনন্দী হাসতে-হাসতে হাতে একটা কাগজ নিয়ে ঘরে সুবর্ণর কাছে আসে ।

‘এই, এটা দ্যাখো, একটা দারুণ খবর ।’ আনন্দী কাগজটা সুবর্ণর হাতে দেয় ।

‘ও আচ্ছা ! এখন মাস্টারনীর  সমাজসেবীর তকমা না পেলে চলছে না ?’ চিবিয়ে-চিবিয়ে বলে সুবর্ণ ।

‘মানে ! কী যা তা বলছ ? এটা আমার অ্যাচিভমেন্ট । এই কাজটা বিয়ের আগে থেকে করছি । আজ তার স্বীকৃতি পাচ্ছি । শুধু তাই নয়, এই পুরস্কারের সঙ্গে যে টাকাটা পাব তাতে ওই অসহায় বাচ্চাগুলোর ঠিক করে থাকা, ন্যুনতম খাওয়া, কিছুটা পড়ার খরচ উঠে যাবে । এটা কম কথা নাকি ?’

‘যাও, যাও । বেশি জ্ঞান দিতে এসো না ।’

সরে এসেছিল আনন্দী । কিন্তু বাধাটা এভাবে আসবে ভাবেনি । যেদিন তার পুরস্কার প্রাপ্তির অনুষ্ঠান, সেদিন বিকালে তৈরি হতে গিয়ে আলমারির চাবি কোথাও পায় না । তন্নতন্ন করে সারা ফ্ল্যাট খুঁজে ফেলে । কিন্তু না, কোথাও পায়নি চাবি । সুবর্ণকে ফোন করে । বারবার শোনে ফোন স্যুইচড অফ । কান্না পেয়ে যায় আনন্দীর । এই কাজ সুবর্ণ ছাড়া কেউ হতে পারে না । কেন এমন হয়ে গেল সুবর্ণ ! সেদিন সামনের ফ্ল্যাটের মাসিমার শাড়ি পরে গিয়ে কোনরকমে মান বাঁচায় আনন্দী । 

সুবর্ণর আচরণে ক্রমশ হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে আনন্দী । শ্বশুরমশাইকে সুবর্ণর কথা জানালে তিনি অক্লেশে বলে দেন, ‘অ্যাডজাস্ট করে চলতে শেখায়নি তোমার মা বাবা ? স্বামীর ত্রুটি না খুঁজে স্বামীর মনোমত হয়ে চলার চেষ্টা করো ।’

আনন্দী আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার চেষ্টা করে । সুবর্ণ যাতে রাগ না করে, তার সঙ্গে দূর্ব্যবহার না করে তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করত । আচমকাই এলো ওদের দুজনের জীবনে খুশির খবর । ওরা দুজনেই একেবারে খুশিয়াল হয়ে উঠল । মা হতে চলেছে আনন্দী । সুবর্ণ অস্থির হয়ে উঠল, কী ভাবে আনন্দীর সেবাযত্ন করবে । ডাক্তার, ওষুধ তো বটেই, নিজে হাতে রান্না করেও আনন্দীকে খাওয়াত । একদিন একটা ছোট্ট পুতুল এনে হাজির করল সুবর্ণ । আনন্দী তো খুব খুশি । কী দারুণ দেখতে পুতুলটাকে ! চোখদুটো পিটপিট করছে, একরাশ কোঁচকানো চুল, গাল থেকে গোলাপি আভা বেরোচ্ছে । পুতুলটাকে কোলের মধ্যে নিয়ে আনন্দী বলে, ‘এইরকম একটা তার মেয়েই চাই ।’ সেদিন সুবর্ণর চোখদুটো খেয়াল করে উঠতে পারেনি । পারলে হয়তো . . .

নাহ্‌, পারেনি আনন্দী মা হতে । আচ্ছা আনন্দী পারেনি, নাকি তাকে মা হওয়ার পরিপূর্ণতা থেকে বঞ্চিত করা হলো । আর সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে । সেদিন মনে না হলেও আজ আনন্দী নিশ্চিত । কিন্তু সে মুক্তিও চায় না । ভাবে সুবর্ণ ঠিক বুঝবে তাকে আগের দিনগুলোর মতো । নিজেকে ঠিক সংশোধন করে নেবে ।  আবার তারা সুন্দর করে তাদের জীবন কাটাতে পারবে । 

বাথরুমেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আনন্দী । অ্যামবুলেন্সে সারাটা রাস্তা তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিল সুবর্ণ । বুঝিয়েছিল, আবার সে মা হতে পারবে । তাদের জীবন একটা পুচকে আলো করে রাখবে । ওই পুতুলটার মতোই তাদের একটা মেয়ে হবে ।

শোক একটু হলেও সামলে উঠছিল আনন্দী । সুস্থ হয়ে নার্সিংহোম থেকে ফেরার দিন তিনেক পরে সুবর্ণ গভীর আদরের মাঝে যে কথাটা বলে উঠেছিল তাতে চমকে উঠেছিল আনন্দী ।

‘আমাদের মাঝে কেউ আসুক আমি চাই না । সে নিজের সন্তান হলেও …’ 

কথাটার শেষ পর্যন্ত নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি আনন্দী । দৌড়ে পাশের ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল । বাইরে সুবর্ণর চিৎকার আর গালিগালাজে ঘরের ভিতর বাকি রাতটা ঠকঠক করে কেঁপেছিল । ভোররাতে সুবর্ণ যখন কেঁদেকেটে ক্ষমা চেয়েছিল তখন আনন্দীর মন আবার দুর্বল হয়ে পড়তে চাইছিল তার ভালবাসার মানুষটার ওপর ।  

ইদানীংকালে সুবর্ণ তার আদরকে অত্যাচারের পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে ঠেকিয়েছে । কিন্তু আনন্দী সবটুকু সহ্য করছে নিজের ভিতর আর একটা প্রাণের উপস্থিতি পাওয়ার জন্য । তার আশা অলীক জেনেও বুক বাঁধছে । 

সেদিনের রাতের পর সুবর্ণর মধ্যে অনেকটা বদল লক্ষ্য করেছিল আনন্দী । তাদের জীবনের দিনগুলোর একঘেয়েমি কাটাতে আনন্দী একপ্রকার জোর করে সুবর্ণকে নিয়ে এসেছিল ওদেরই দেশের বাড়িতে । সুবর্ণদের দেশের বাড়ি ফাঁকাই পড়ে থাকে । বহুদিনের বিশ্বস্ত লোক বেণীকাকা বাড়ির দেখাশোনা করে । 

প্রথম দুটোদিন খুব ভাল কেটেছিল ওদের । কিন্তু গতকাল রাতে যা ঘটল তাতে শেষপর্যন্ত আনন্দী সব কিছু ধরে রাখতে পারবে কিনা সেই ব্যাপারে নিজেই সন্দিহান হয়ে পড়েছে । গতকাল রাতে চূড়ান্ত আদরের মধ্যে সুবর্ণ সজোরে তার গলা টিপে ধরে । ভীষণরকম ধ্বস্তাধ্বস্তির পর নিজেকে ছাড়াতে পারে আনন্দী । 


# # #


কাজ মিটিয়ে সুবর্ণ ঘরে এসে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে । খুব হাল্কা লাগছে তার নিজেকে । তার সঙ্গে একটা ছটফটানিও কাজ করছে তার মধ্যে । গুনগুন করে গানের এক কলি গেয়ে নেয় । তারপর বিছানা থেকে উঠে ঢকঢক করে বেশ অনেকটা জল খেয়ে নেয় । এবার সোফায় বসে কুশনটা বুকে টেনে নেয় । কাল রাত থেকে আজ মধ্যরাত পর্যন্ত যা যা ঘটেছে আরও একবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে করতে চায় সুবর্ণ । কিন্তু কেন ?

কাল রাতে চূড়ান্ত আদরের পর আনন্দী একটু-একটু করে একেবারে নেতিয়ে পড়ল । মনে হয় গলায় চাপটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল । এখন সেরকমটাই মনে হচ্ছে সুবর্ণর । ভাল করে বুকের ওপর মাথা রেখেছিল, নাকের নিচে হাত রেখে পরীক্ষা করেছিল । যা অনেক আগে করতে চেয়েছিল আজ প্রস্তুতি ছাড়াই সেই কাজ করে ফেলেছে সে । তবে তার জন্য কোন আফশোষ নেই তার । অনেকগুলো দিন হয়ে গেল আনন্দীকে একেবারেই সহ্য হতো না তার ।

কাল রাতেই মাটি খুঁড়ে ফেলেছিল । আনন্দীকে নিয়ে যেতে পারেনি । কেননা ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটে গেছে । আজ রাতে কাজটা সম্পূর্ণ করে ফেলেছে সে । কিন্তু জল না দিলে মাটিটা ঠিক মতো বসবে না তো । নাহ্‌, আজ রাতেও আর বিশ্রাম হলো না । ভাবে সুবর্ণ । 

 জলের বালতি নিয়ে পিছনের বাগানে আবার যায় সুবর্ণ । জলটা ঢালার আগে কী মনে হতে মাটিটা দুহাতে আবার খোঁড়ে । আসলে সুবর্ণর নিজের ওপর কনফিডেন্স চিরকাল কম । 

এটা কী হচ্ছে ! সুবর্ণ টের পায় তার হাতটা কেউ টানছে মাটির ভিতর থেকে । জলের বালতিটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় সুবর্ণ । 

রাতের অন্ধকার চিরে শুধুই একটা ভয়াল আর্তনাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ।

দুদিন পর খবরের কাগজে একটা ছোট খবর বেরোয় । 

দেশের বাড়িতে বেড়াতে এসে স্বামী-স্ত্রীর রহস্যজনক অন্তর্ধান…

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

ওদের কথা


খুব শীত করছে আমার । অনেকক্ষণ ধরেই করছে । কিন্তু কাউকে ডাকতেও ইচ্ছে করছে না । আর একটু দেখি । তারপর না হয়  . . .
তার থেকে বরং একটু গল্প করি আপনাদের সঙ্গে । না, না, বরং গল্প বলি । শুনবেন ? তাহলে হয়তো কিছুটা আমি অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে পারব । শীতটাও হয়ত এতটা করবে না । আর সময়টাও কেটে যাবে ।
তাহলে শুরু করি ? একটু ধৈর্য ধরে শুনবেন প্লিজ ।
গল্পটা দুজনের । আমার মনে হয় গল্পটা খুব সাদামাটা । শোনার পর আপনারাও হয়তো তাই বলবেন । তাও কেন জানি না, শোনানোর বড্ড ইচ্ছা করছে । বলছি কিন্তু তাহলে ।
গল্পটা নীলা আর রুমির । নীলা আর রুমি জন্মেছে আলাদা জায়গায়, ছোটবেলাটা কেটেছে আলাদা জায়গায় । ব্যস্‌, এটুকুতেই অধৈর্য হয়ে গেলেন তো ! ভাবছেন আলাদা হলে গল্পটা তাদের হয় কী করে ? মিল ছিল তো । দুজনে এক শহরের বাসিন্দা ।
খুব ছোট থেকে না হলেও কিশোরীবেলা মানে ক্লাস এইট থেকে একে অপরকে দেখে বড় হয়েছে । না,না, একটু ভুল হলো । নীলা কোনদিন রুমিকে দেখেনি । আরও ডিটেইলসে বলতে গেলে বলতে হয়, নীলা কোনদিন রুমিকে দেখার যোগ্য বলেই মনে করেনি । যে দিনগুলোয় চোখে চোখ পড়তে ভাললাগার রেশ ছড়িয়ে পড়ত যার মনে সে কেবল রুমি । ওই যে ক্লাস থেকে ঢোকা বেরোনোর সময়, ছুটির সময় গেটের সামনে । রুমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখত নীলাকে । কী সুন্দর নীলা । কত দারুণ করে কথা বলে । হাসিটা কী সুন্দর ! এত গভীরভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল কী করে বলুন তো ?  দুজনেই যে এক অ্যাকাডেমীতে নাচের প্রশিক্ষণ নিত ।
জানেন, আসল ব্যাপারটা কিন্তু অন্যরকম ছিল । রুমি অবশ্য পরে জেনেছিল । নীলা ওকেও লক্ষ্য করত ।  কিন্তু না দেখার ভান করাতে সে ছিল ভীষণ পটু । কি অদ্ভুত মেয়ে বলুন তো নীলা ! যাক গে, সে তো পরের কথা । আগের কথা তো আগে বলতে হয় । আমি না হয় গল্পের ল্যাজা মুড়ো সবটা জানি । আপনারা তো আর জানেন না । একেই কীরকম ম্যাড়মেড়ে গল্প । তার ওপর সাযুজ্য না রেখে বললে আপনারা শুনবেন বা কেন ?
 রুমি খুব সাধারণ মেয়ে । অন্তত রুমি তাই জানত । কিন্তু রুমির মধ্যে অনেক কিছু অসাধারণ ব্যাপারস্যাপার অনেকে লক্ষ্য করত । সেই নিয়ে বলাবলি করত । যেমন, রুমির চোখ দুটো খুব সুন্দর । ভীষণ মায়াবী । সেই চোখ সহজেই অন্যের নজর কেড়ে নেয় । রুমি অবশ্য তা কোনদিন বিশ্বাস করেনি । তাহলে নীলা তো তার দিকে ফিরে দেখত । রুমির ব্যবহার খুব ভাল । এটাও সবাই বলত । রুমি ভাবে এই মানুষগুলো তাকে ভালবাসে বলে তার নামে ভাল ভাল কথা বলছে ।
আপনারা হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন নীলার মধ্যে কী এমন আছে যে রুমি এত নীলা বলতে অজ্ঞান ।
হ্যাঁ । নীলা সুন্দর । দেখায়, চলায়, বলায়, লেখাপড়ায়, নাচে সব বিষয়ে দক্ষ । বড়লোক বাবার একমাত্র আদরের দুলালী । 
আসল কথাটা কী জানেন ? রুমি দেখেছে তাই নীলা সুন্দর । রুমি ভেবেছে তাই নীলা সুন্দর । রুমি চেয়েছে তাই নীলা সুন্দর ।
ও, একটা বিষয় তো বলা হয়নি আপনাদের । ওরা দুজনেই সমবয়সী । স্কুল আলাদা হলেও ক্লাস এক । দেখুন স্কুল তো আলাদা হবেই । নীলার বাবা একজন নামকরা বিজনেস ম্যান । তিনি যে তাঁর মেয়ে বেস্ট স্কুলিং দেবেন এ আর এমন কী কথা । আরে না, না । আপনারা যেন ভেবে বসবেন না, যে নীলা তার বাবার টাকার জোরে বেস্ট স্কুলে পড়ছে । নীলা নিজে দারুণ ইনটেলিজেন্ট । পড়াশোনাতে ভীষণ মনোযোগী । 
 রুমির বাবা একটা বেসরকারী অফিসে ক্লার্কের চাকরী করে । কিন্তু তাই বলে রুমিকে খুব কষ্ট করে বড় হতে হয়নি । ওর বাবা মাতৃহারা মেয়েকে বুক দিয়ে আগলে বড় করার সঙ্গে সঙ্গে যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য দেবার চেষ্টা করেছে । রুমি অবশ্য কোনদিন কিছু নিয়েই নালিশ করেনি তার বাবার কাছে । সে কিছুটা তার নিজের জগৎ নিয়েই থাকে । মানে, এই লেখাপড়া, নাচ আর নীলাকে দেখার পর থেকে নীলা ।
রুমি যা স্বপ্নে দেখত তা একদিন বাস্তবে পরিণত হলো । নীলার সঙ্গে কথা হলো, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নাচ প্র্যাকটিশ করলো । আর যেটা হলো নীলা চোখ তুলে রুমিকে দেখলো ।
ইস্‌, দেখেছেন, গল্পটা সুন্দর করে বলা তো দূর, ভাল করেও বলতে পারছি না । অন্য কেউ হলে এটা কত সুন্দর করে বলত । যাই হোক, সুন্দর করে না বলতে পারলেও একটু গুছিয়ে বলার চেষ্টা করছি ।
ওদের এই প্রথম আলাপ হলো অ্যাকাডেমীর অ্যানুয়্যাল ফাংশনে । যেখানে ওরা দুজনেই নাচ শিখছে অনেকগুলো বছর ধরে । কিন্তু আলাদা আলাদা ব্যাচে ।
তখন দুজনেই ক্লাস টেন । শাপমোচন নৃত্যনাট্যে দুই মুখ্য চরিত্রে দুজনে । নীলা কমলিকা, আর রুমি অরুণেশ্বর । সেই দুমাস রুমির জীবনে এক স্মরণীয় দিন । প্রতিদিন বিকালে দু থেকে তিনঘন্টা প্র্যাকটিশ ।
 ফাংশানের দিন । শাপমোচনের শেষ দৃশ্য । প্রদীপের আলোয় কমলিকা মুখ দেখে তার স্বামী অরুণেশ্বরের । রুমি মুগ্ধ হয়ে যায় নীলার অভিনয়ে । পর্দা পড়ার পরেও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নীলার দিকে । নীলার খিলখিল হাসিতে চমক ভাঙে ।
‘কী রে রুমি, হাঁ করে কী দেখছিস ?’
‘তোকে নীলা । কী সুন্দর রে তুই ।’
নীলা আবার দমকা হাসিতে ফেটে পড়ে ।
 এই সময় রুমি যেন নতুন করে চিনলো নীলাকে । নীলাও যেন রুমি বলতে অজ্ঞান । আসলে রুমি দেখলো নীলা অহংকারী একেবারেই না । বরং সবার সঙ্গে মন খুলে মিশতে তার কোথাও একটা সংকোচ কাজ করে । কিন্তু যার সঙ্গে মনের মিল হয়ে যায় সেখানে নীলা সাবলীল ।  রুমি সেটা বুঝতে পেরে নিজেই নীলাকে সহজ করে নিলো ।
দুমাস পর যখন ফাংশন শেষ হলো তখন ওরা দুজনে একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু । বোর্ড এক্সামের পর দুজনে চুটিয়ে মজা করা যাকে বলে তাই করেছিল । নীলা তাদের বাড়ীতে প্রায় রুমিকে ধরে আনত । জোর করে সারাদিন আটকে রাখত । খাওয়াদাওয়া, হই-হুল্লোড় করে সারাদিন পর রুমি যখন নিজের বাড়ী ফিরত তখন সে যেন নিজের মধ্যেই নেই । যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে । নিজেকে তখন ভীষণ সুখী বলে মনে হতো রুমির ।
এমনই একটা দিনে নীলা হঠাৎ রুমির গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘তোকে আজ একটা কথা বলব । তুই শুনে যেন হেসে ফেলিস না ।’
নীলার আচরণে রুমি খুশীতে পাগল । উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলে, ‘বল । বল । এক্ষুণি বল ।’
‘তুই মাঝেমাঝে বলিস তো অ্যাকাডেমীতে ঢোকা বেরোনোর সময় আমায় দেখতিস আর আমি না কী তোকে দেখতাম না । কিন্তু কথাটা সঠিক নয় রে । আমিও তোকে বারকয়েক দেখেছি ।’ বলতে বলতে নীলা নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ে ।
খুশীতে রুমি দুহাতে আঁকড়ে ধরে নীলাকে ।
সেদিন বাড়ী ফেরে রোজদিনের সাধারণ রুমি নয়, ভাললাগা খুশীতে আচ্ছন্ন রুমি ।
রুমির বাবাও মেয়ের খুশী দেখে মনে মনে একটু শান্তি পেয়েছিলেন । মা-মরা মেয়েটা আজ মন খুলে কারোর সঙ্গে মিশছে, কারো বাড়ী গিয়ে সময় কাটাচ্ছে, এই বিষয়টা তাঁকে বেশ শান্তি দিয়েছিল ।
রেজাল্ট বেরোবার পর যে যার স্কুলে ভর্তি হলেও দুজনে নিজেদের মধ্যে কথা বলে নিলো, তারা আইএসসির পর এক কলেজে পড়বে । এই দুটো বছরে তাদের বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হয়ে উঠলো । রুমির খুশীর সীমা নেই । এক কলেজে তারা পড়বে, একসঙ্গে সারাদিন কাটাবে এই চিন্তাতেই যেন বিভোর হয়ে থাকত ।
নীলা ছাড়া তার আর দ্বিতীয় কোন বন্ধু-বান্ধবী নেই । সে চাইত নীলাও যেন তাই করে । কিন্তু নীলার বেশ কিছু বান্ধবী ছিল । রুমি মাঝেমাঝে অল্পস্বল্প রাগ দেখাত ।
‘থাক, থাক । তোর বান্ধবীদের গল্প আমার কাছে বলতে হবে না । তুই আর আমি যখন একসঙ্গে থাকব আমরা শুধু নিজেদের কথাই বলব ।’
নীলার একটু খারাপ লাগলেও চুপ করে যেত । পরে হেসে বলত, ‘ওরা তো বান্ধবী । এরপর আমার বয়ফ্রেন্ড জুটলে তোকে তার কথা বলে কান-মাথা ভোঁ ভোঁ করিয়ে দেব ।’
নীলার কথার উত্তর দিতো না রুমি । শুধু তার চোখদুটো রাগে মুহূর্তখানেকের জন্য ঝলসে উঠত ।
সেই তারা আইএসসি পাশ করে এক কলেজে অ্যাডমিশন নিলো । রুমি ভর্তি হলো ইকনমিক্সে অনার্স নিয়ে আর নীলা ভর্তি হলো জিওগ্রাফিতে অনার্স নিয়ে । রুমি কো-এড কলেজে পড়তে চায়নি । কিন্তু নীলার জোরাজুরিতে ভর্তি হতে বাধ্য হলো ।
‘দেখ রুমি, এতগুলো বছর সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে স্কুল, টিউশন করে আমি সো টায়ার্ড । কলেজটা অন্তত একটু রিল্যাক্স করে করতে দে ।’ হাসতে হাসতে বলে নীলা ।
‘ঠিক আছে । মেনে নিচ্ছি তোর কথা । তবে পড়া ফেলে যদি ছেলে দেখিস তাহলে তোর একদিন কি আমার একদিন ।’ চোখ পাকিয়ে রুমি উত্তর দেয় ।
রুমির কথায় নীলা হা হা করে হেসে গড়িয়ে পড়ে ।
সেই নীলা কিন্তু সেকেন্ড ইয়ারের শেষের দিকে প্রেমে পড়ল রুবাইয়ের । ওদের কলেজের পাশেই সরকারী ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট রুবাই ।  নীলা মাঝেমধ্যেই ক্লাস বাঙ্ক করে রুবাইয়ের সঙ্গে এদিক-ওদিক পালাত । আবার কলেজ ছুটির সময় ঠিক কলেজেই ফিরে আসত । নীলা ভাবত রুমি কিছু টের পাচ্ছে না । আসলে নীলা এই ব্যাপারটা রুমিকে জানাতে চায়নি । তার মনে হয়েছিল এই রিলেশনশিপটা রুমি মেনে নেবে না ।
নীলার ভাবনাই ঠিক ছিল । রুমি কিছুদিনের মধ্যেই কিভাবে যেন জানতে পেরে গেল । জানার পরেই সরাসরি নীলাকে চার্জ করলো ।
‘কী ব্যপার তোর ? এসব কী শুনছি ?’
‘যা শুনেছিস সঠিক ।’
‘তোর লজ্জা করে না । তুই এসব করে বেড়াচ্ছিস !’
‘লজ্জার কী আছে ? এটা তো জীবনের স্বাভাবিক ব্যাপার । তুইও প্রেম কর না । কেউ তো বারণ করেনি তোকে ।’
‘তোর মাথার ঠিক আছে ? যা বলছিস ভেবে বলছিস তো নীলা ?’
‘ভেবেই বলছি । একটা বয়সের পর একটা ছেলে একটা মেয়ে পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হবে ভালবাসবে এটাই তো স্বাভাবিক ।’
‘তাহলে তুই আজ এতগুলো দিন পর আমার ভালবাসাকে অস্বীকার করলি !’ হতাশায় ঠিকমতো গলায় আওয়াজ ফোটে না রুমির ।
‘কী পাগলের মতো বলছিস তুই রুমি ? তোকে আমি সারাজীবন ভালবাসব । কিন্তু রুবাই আমার প্রাণ । রুবাইয়ের কলেজে ক্যাম্পাসিং হয়ে গেছে । ও জব পেয়েও গেছে । আমি বলেছি মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর বিয়ে করব ।’
‘ও ! তাহলে তো সব পাকাপাকি বন্দোবস্ত করেই ফেলেছিস । আর আমি তোকে আঁকড়ে সারাজীবন থাকার স্বপ্ন দেখে চলেছিলাম ।’ চোখে জল চলে আসে রুমির ।
‘কী বলছিস রুমি ! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না ।’
‘তোর বোঝার কথাও না । আমিই বুঝতে ভুল করে ফেললাম রে । ভাল থাকিস । খুব সুখে থাকিস ।’
বলেই রুমি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রায় দৌড় দেয় ।
নীলা পিছন পিছন দৌড়ায় রুমির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে । কিন্তু আজ রুমি সাড়া না দিয়ে ছুটে বাসে উঠে পড়ে । পুরো ঘটনায় নীলা হতভম্ব হয়ে যায় ।
বাড়ী ফিরে রুমি সোজা নিজের ঘরে ঢুকে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় । সপাটে বিছানায় নিজের শরীরটাকে আছড়ে ফেলে । বালিশ আঁকড়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে ।
‘হে ঈশ্বর, চেহারাটা যদি মেয়ের দিলে তাহলে অনুভূতি, চাওয়াগুলো মেয়ের মতো দিলে না কেন ? নাহলে সেই চেহারাটা দিতে পারতে । যাতে আমি নীলার প্রাণ রুবাই হয়ে থাকতে পারতাম ।’
এরপর বলুন, রুমি কী আর বেঁচে থাকতে পারে ? না সে পারেনি । ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে পড়েছিল সে ।
আপনারা হয়ত বলবেন এত ডিটেইলসে আমি কি করে জানলাম ? জেনেছি । জেনেছি । আমি জানব না তো কে জানবে ? এবার আপনারা পালান । ওই দেখুন এসে গেছে ওরা । এই কনকনে ঠান্ডা থেকে গনগনে আগুনে ফেলার মাঝের প্রক্রিয়া শেষ করবে বলে । বুঝলেন না তো ? এবার আমার মানে রুমির বডিটা কাটাছেঁড়া করে দেখবে কেসটা সুইসাইড না হোমিসাইড ? 
 
   

বৃহস্পতিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়


অপরাধবোধ


ছোট্ট সানাকে স্কুল দিতে যাবার সময়ই আজ তপতী ভেবে নিয়েছিল কিছুতেই স্কুলের পাশের গলির দিকে তাকাবে না । একটা উটকো সমস্যা শুরু হয়েছে দিন পনেরো হলোতবে তার আগেও হতে পারে । কিন্তু তপতী নোটিশ করেছে পনেরো দিন আগে । সানাকে স্কুলের গেটের ভিতর ছেড়ে দিয়ে মনটাকে শক্ত করে ফেরার পথ ধরে তপতী । কিন্তু শেষমুহূর্তে নিজের অজান্তেই পিছন দিকে তাকিয়ে ফেলে তপতী । আর ঠিক চোখাচোখি হয়ে যায় বয়স্ক ভদ্রমহিলার সঙ্গে ।
পরেরদিন গিয়ে দেখে যথারীতি ওই মহিলা দাঁড়িয়ে আছে আর তার দিকে একদৃষ্টে দেখছে ।  দেখেও না দেখার ভান করে সানাকে গেটের ভিতর ছেড়ে দিয়ে ফেরার পথ ধরে । আজ মহিলাটি তার সামনে রাস্তা আটকিয়ে দাঁড়ায় ।
বলে,সুমনাপিসিকে মনে আছে ? তোমাদের বাড়িতে থাকত একটা সময় ।
তপতী ভাল করে দেখে মহিলাটিকেহ্যাঁ, ইনি সুমনাপিসিই । বয়সের ছাপ পড়লেও চেনা যায় ।
কি গো বুড়িমা, চিনতে পারছ না ?
আর তো কোন সংশয়ের জায়গা নেই । বুড়িমা বলেই সুমনাপিসি তাকে ডাকত । আর সুমনাপিসিকে সে তো কোনদিন ভুলতে পারবে না । ভোলা সম্ভব না ।তার দশ বছরের জন্মদিনে দিদার থেকে সোনার রিং উপহার পেয়েছিল । কিন্তু তার পরের দিন মা দুষ্টুমি করার জন্য বেশ বকাবকি করে সেই রাগে কান থেকে রিং খুলে জানলা দিয়ে বাড়ির পাশের হাই ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল । কিন্তু একটা রিং খুলে ফেলে দেওয়ার সময়েই সুমনাপিসি ঘরে চলে আসে । দেখেই ছুটে আসে । বলে, এটা কী করলে বুড়িমা ! বৌদি জানলে খুব রাগ করবে ।
পরে মায়ের আদরে রাগ ভাল হয়ে গেলে সে রিং ফেলে দেবার কথা ভুলেও গিয়েছিল । গোলমাল বাঁধলো পরেরদিন স্কুল যাবার সময় মা যখন চুল বাঁধতে গিয়ে একটা কানে রিং দেখতে পেলো না । তাকে জিজ্ঞাসা করলে ভয়ে সত্যি কথাটা মাকে বলতে পারেনি তপতী ।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সুমনা পিসিকে দেখতে পায়নি । পিসি কোথায় জানতে চাইলে মা বলে দিয়েছিল, পিসি আর এ বাড়িতে থাকবে না । 
পরে বাবা মায়ের আলোচনায় বুঝতে পেরেছিল কানের রিং না পাওয়ার জন্য মা পিসিকে দায়ী করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে ।
আজ সেই সুমনাপিসি সামনে দাঁড়িয়ে । কী করবে সে ? সে তার পুরোনো অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে, নাকি চিনতেই অস্বীকার করবে মানুষটাকে ।
বেশ কিছুটা সময় মুখোমুখী দাঁড়িয়ে থাকার পরে সুমনাপিসি নিজে থেকেই বলে, আমিই বোধহয় চিনতে ভুল করেছি । কিছু মনে করো না । তোমার অনেকটা সময় নষ্ট করে দিলাম ।
সুমনাপিসি চলে যাবার পর তপতী মনে প্রশ্ন জাগে  এতদিন পর সুমনাপিসি কেন এলো তার কাছে ? কী করে খোঁজ পেলো তার ? তাহলে কী কোনো প্রয়োজনে  . . .
চোখটা ভিজে যায় তপতীর । ভাবে, সেদিনের অপরাধ না আজকের অপরাধ, কোনটা বেশী ?



শনিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৮

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

মাতৃত্ব


‘হ্যাপ্পী উইমেনস ডে মাই গ্রেট মম ।’ ঘুম থেকে উঠে মাকে উইশ করে তানিয়া ।
ভুরু কুঁচকে মেয়েকে লক্ষ্য করেন শ্রীপর্ণা । বলেন, ‘বেশ তো । আজকে তোর কী কাজ শুনি ।’
‘ও মম, আমার আবার কী কাজ ! কাজ তো তোমার । নিশ্চয়ই তোমার অর্গানাইজেশনের কোন গুডি গুডি ওয়ার্ক আছে ।’
‘আচ্ছা, তোর সমস্যাটা কী বলতো তানি ? তুই তো এখন যথেষ্ট বড় হয়ে গেছিস । এখন সেভাবে আমার কি প্রয়োজন আছে তোর জীবনে ? যখন ছিল তখন তো যতটা পেরেছি দিয়েছি । আর কত চাস তোরা !’
‘আরে রিল্যাক্সড মম । বাপিকে আবার টানছ কেন ? বাপি কটা দিনই বা বাড়ি থাকে । কিন্তু যখন থাকে তখনকার সময়টা অস্বীকার কোরো না তুমি ।’
‘হ্যাঁ, সেই তো । তোমার বড় হবার জন্য যা যা করণীয় সব তোমার বাপিই করেছেন । আর আমি ঘোড়ার ঘাস কেটেছি ।’
‘ও রিয়্যালি মম, তোমার এই ধরনের কথাগুলো যদি তোমার সংস্থার লোকজন শুনতো, তাহলে বোধহয় এতটা প্রতিপত্তি তোমার থাকতো না ।’
‘তানিইই !’
‘চিৎকার কোরো না মম । এখন আমি সেই আগের ছোট্ট তানি নেই । এখন আমার যথেষ্ট বোধবুদ্ধি হয়েছে ।’
‘হ্যাঁ, তা তো হয়েইছে । আর কী ! এবার আমার মাথার উপর উঠে নাচো ।’ রেগেমেগে ভিতরের ঘরে চলে যান শ্রীপর্ণা ।
আমি তোমার মাথায় নয় মম, তোমার কোলের মধ্যে থাকতে চেয়েছি চিরকাল । কিন্তু তুমি সেটা কোনদিন বুঝলে না । কথাগুলো বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তানিয়া ।
ঘরে ঢুকেও অস্থিরতা কমে না শ্রীপর্ণার । ভাবেন, এবারে সবটুকু সত্যি বলে দেবেন তানিকে । আবার পিছিয়ে যান । তাহলে যে বাপি তানির আদর্শ, সে তো ছোট হয়ে যাবে তানির চোখে । কী করে বলবে, আজ থেকে আঠারো বছর আগে তানির বাবার অপকীর্তির মাসুল হিসাবে তানিকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসেছিলো । আর হাসপাতালে বাড়ির কাজের মেয়ে রমার মৃত্যুশয্যায় কথা দিয়েছিল যে তার মেয়ে এ বাড়ির মেয়ের মতই মানুষ হবে ।
এ বাড়ির মেয়ে হিসেবেই মানুষ হয়েছে তানি, কিন্তু মন থেকে মেনে নিতে তিনি তো কোনদিন পারেননি । স্নেহকে তিনি দমন করেছেন । আজ তানির উইশ মনটাকে নাড়িয়ে দিয়েছে । রমাকে দেওয়া কথার মর্যাদা তিনি ঠিক করে রাখতে পারেননি ।
পায়ে পায়ে তানির ঘরে ঢোকেন শ্রীপর্ণা । দেখেন মেয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে । পাশে বসে খুব আদরের সঙ্গে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন । মাকে এভাবে পেয়ে কোলের মধ্যে মুখ গুঁজে আকুল হয়ে কেঁদে ওঠে । আর শ্রীপর্ণার এতদিনের জমে থাকা ক্ষোভ দুঃখগুলো আশীর্বাদের মতো ঝরে পড়ে তানির মাথায় ।

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

মৌসুমী বন্দ্যোপাধ্যায়

পরিস্থিতি


‘শর্মিলা, এই শর্মিলা, একটু শুনে যাও না ।’ ঘুম জড়ানো গলায় ডাক দেয় অলক ।
ময়দা মাখা হাত নিয়েই ঘরে ঢুকে শর্মিলা চোখ পাকিয়ে বলে, ‘কী হল, উঠবে, তবে তো চা দেব নাকি ?’
‘না গো, চা নয় । সে তো উঠেই খাব ।’ বলে অলক ।
‘তবে এত হাঁকডাক কেন ?’ শর্মিলা ছদ্মরাগে বলে ।
‘তুমি বড্ড কুঁড়ে হয়ে যাচ্ছ । কদিন ধরে এত জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে আর তুমি কম্বলগুলো রোদে দেবার নামগন্ধও করছ না ।’ একটু নিচুস্বরেই বলে অলক । জানে এর পরের কথাগুলো খুব একটা সুখকর হবে না ।
কিন্তু অবাক করে দিয়ে বিপরীত প্রতিক্রিয়া পায় শর্মিলার কথায় ।
‘আরে জানি তো । কিন্তু লতা আজ নিয়ে চারদিন আসছে না । হিমসিম খেয়ে যাচ্ছি সামলাতে । ঠিক আছে দেখছি । আজ যেভাবেই হোক রোদে দেব । কিন্তু তুমি উঠে পড়ো । নাহলে কিন্তু অফিসে লেট হয়ে যাবে ।’
অলক অফিসে আর কুন্তলা কলেজে বেরিয়ে যেতেই শর্মিলা ভাবে, আগে কম্বলগুলো ছাদে রোদে দিয়ে আসি । অলকটা খুব শীতকাতুরে । ঠান্ডায় বেচারা বড্ড কাবু হয়ে যায় ।
ছাদে উঠতে পাশের বাড়ির সিক্তাদির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় । এই ভদ্রমহিলাকে শর্মিলা একটু এড়িয়ে চলারই চেষ্টা করে । যত রাজ্যের পিএনপিসির খবর মজুত ওনার কাছে ।
সামান্য হেসে উল্টোদিকে পা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ডাক দেন সিক্তাদি ।
‘শুনেছ শর্মিলা, রাজীবের ছেলেটা চোর হয়ে উঠেছে ! নিজের বাড়ির আলমারি থেকেই টাকা চুরি করেছে । রাজীব কী মারটাই না মারল ছেলেটাকে । আর কী অদ্ভুত ব্যাপার জান, ছেলেটা দাঁতে দাঁত চেপে মার খেল, তবু একটা কথা তো দূর, চোখ দিয়ে একফোঁটা জলও পড়ল না ।’
স্তম্ভিত হয়ে যায় শর্মিলা । হাত থেকে কম্বলগুলো আপনাআপনিই পড়ে যায় ।
বুবান এই কাজ করেছে ! এই তো সবে দশে পড়ল । কয়েকমাস আগেই কত ধুমধাম করে উপনয়ন হল । বাড়িতে এসে রাজীব আর মালা দুজনেই নিমন্ত্রণ করে গেল । মালা বলল, ‘জানোই তো শর্মিলাদি বুবানের অন্নপ্রাশনে কিছু হয়নি । রাজীবের মা তার একমাস আগে মারা গিয়েছিলেন । তাই আমার ইচ্ছে ওর পৈতেটা একটু ধুমধাম করে হোক । আর আমার বাবা-মায়েরও বয়েস হচ্ছে । ওনাদেরও একটা ইচ্ছে যে নাতির পৈতেটা দেখে যাবে ।’
‘আরে সে তো খুব ভাল কথা । কিন্তু বুবানটা যে বড্ড ছোট । এই তো নয় বোধহয় । পারবে তো সব নিয়মকানুন মানতে ?’ বলে শর্মিলা ।
‘হ্যাঁ গো পারবে, পারবে । ছেলেটা তো বড় বাধ্য, জানোই তো । জন্ম ইস্তক তো দেখছ । আর তুমি হলে ওর স্পেশাল মানুষ । জেঠিমা হয়েও মাসুন ।’ বলেই হেসে ফেলে মালা ।
ঠিকই তো । ছোট্ট বুবান একদিন কচি কচি গলায় ডেকেছিল মাসুন বলে । শর্মিলা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ওরে আমি তোর জেঠিমা হই ।’
দুটো গোলগোল চোখ মেলে মিষ্টি গলায় বলেছিল, ‘মাসুন !’
সেই বুবান নাকি চোর ! বুবানের মায়াভরা মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল শর্মিলার চোখের সামনে । রাস্তায় দেখতে পেলেই দৌড়ে কাছে চলে আসবে । বলবে, ‘মাসুন ভাল আছ ? কোথায় যাচ্ছ ? সাবধানে যাবে । কুন্তলাদিদি কি কলেজ গেছে ?’
মেলাতে পারে না শর্মিলা । সব কিরকম তালগোল পাকিয়ে যায় । সিক্তাদি আরও কত কী বলে যায় । কানেই ঢোকে না শর্মিলার । শুধু বলে, ‘আমি আসছি সিক্তাদি । অনেক কাজ পড়ে আছে ।’
নিচে ঘরে এসে গুম হয়ে বসে পড়ে শর্মিলা । মনের মধ্যে একটা তোলপাড় চলে । বুবান তো সামনের রাস্তাটায় রোজ বিকেলে সাইকেল চালায় । গত দুদিন দেখেনি । তাহলে এইজন্যেই বুবান বাইরে বেরোয়নি !
রাতে অলককে সব কথা বলে শর্মিলা । অদ্ভুত এক নির্লিপ্ত মানুষ অলক । বলে, ‘ছাড়ো তো ওসব । ছেলে অন্যায় করেছে, বাবা তাই মেরেছে । এই নিয়ে এত মাথাব্যথার কিছু নেই ।’
কিন্তু শর্মিলা এত সহজে ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলতে পারে না । মনে মনে ভাবে, আজ হোক, কাল হোক, বুবানকে বাইরে বেরোতে দেখলেই ব্যাপারটা বুবানের মুখ থেকেই জানবে ।
কিন্তু একদিন, দুদিন, তিনদিন, এই করে সাতদিন কেটে গেল, বুবানের দেখা মিলল না । অথচ বুবানদের বাড়িতে গিয়েও খোঁজ নিতে পারল না । যদি মালা কিছু মনে করে ।
আটদিনের মাথায় বাইরের জানলা দিয়ে শর্মিলা দেখল বুবান সাইকেল চালিয়ে ওদের বাড়ির দিকেই আসছে । অবশ্য এই ছোট রাস্তাটা, এটাই বুবানের সাইকেল চালানোর রুট । নিজেদের বাড়ি থেকে শর্মিলাদের বাড়ি ।
বুবান কাছাকাছি আসতেই শর্মিলা ডাকে, ‘বুবান, একবার আয় ।’
বুবান সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কিন্তু কাছে আসে না । মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ।
‘আয় না সোনা, দরকার আছে আমার ।’ আবার ডাকে শর্মিলা ।
গুটিগুটি পায়ে  ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়ায় । কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘কী হয়েছিল রে ? বাবা মেরেছিল কেন ?’
চোরের ঠ্যাঙানি খেয়ে যে ছেলে কাঁদেনি, সেই ছেলে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল ।
বলল, ‘কী করব মাসুন, বাপি তো ঠিক করে খেতে দেয় না । অর্ধেকদিন রান্নাই করে না । খিদে পেয়েছে বললে, বলে বিস্কুট খা । তুমিই বলো মাসুন, বিস্কুটে কি খিদে মেটে ?’
‘এই দাঁড়া দাঁড়া । তোর বাবা রান্না করবে কেন ? তোর মা কোথায় ?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে শর্মিলা ।
বুবান বলে, ‘তোমরা তো কেউ জানো না মাসুন । মা তো মামারবাড়ি চলে গেছে । অনেকগুলো দিন, মনে হয় একমাস হবে । বাপি আর মায়ের তো খুব ঝগড়া হত অনেকদিন ধরে । শেষকালে মা চলে গেল । আমাকেও নিয়ে যেতে চেয়েছিল । কিন্তু বাপি কিছুতেই যেতে দেয়নি । মা বলেছিল, ছেলেটা তো তোমার পথের কাঁটা হবে । তার থেকে আমি নিয়ে যাই আমার ছেলেকে । তাও বাপি যেতে দেয়নি । আবার এখন বাপি কী বলে জানো ? আর কিছুদিন পরেই নতুন মা আসবে । তখন পেট ভরে খাস । আচ্ছা মাসুন, নতুন মা মানে তো স্টেপমাদার, তাই না ?’
শর্মিলা কী বলবে, সে তো স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে ছোট্ট ছেলেটার মুখের দিকে ।
বুবান নিজের মনেই ঘাড় নেড়ে বলে যায়, ‘আমি জানি, স্টেপমাদাররা খুব খারাপ হয় । খেতে দেয় না, ভালবাসে না । শুধুই মারে । আমি তো তাই টাকা চুরি করেছিলাম । ভেবেছিলাম পেট ভরে খাব । তারপর ট্রেনে করে মামারবাড়ি চলে যাব । কিন্তু হল না গো মাসুন । আর আদর করে ভালবেসে কেউ আমায় খাওয়াবে না । আধপেটা খেয়ে, মার খেয়েই থাকতে হবে ।’ অঝোরে কাঁদতে থাকে বুবান ।
শর্মিলা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে । ভাবে, এ কোন্‌ বুবান ? নির্দয় পরিস্থিতির চাবুক কী করে এইটুকু সময়ের মধ্যে এত পালটে দিল ছোট্ট ছেলেটাকে !
চিত্রঋণ : পাবলো পিকাসো