অনিন্দ্যসুন্দর পাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনিন্দ্যসুন্দর পাল লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

                                   



 ধারাবাহিক- চর্যাপদ চর্যাগীতি ও সমীক্ষা


অলংকরণ- শ্রেয়সী ভট্টাচার্য্য

তৃতীয় পর্ব


চর্যা শব্দটির মূল অর্থ আচরণ। চর্যাপদে কবিতাগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ সহজিয়াদের আচার আচরণের বিধি নিষেধ ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা থাকায় পদকর্তারা চর্যা বলে থাকেন। তবে চর্যা শব্দটির অর্থ আচরণ হলেও গানগুলো বুঝানোর জন্য চর্যাশব্দেরই ব্যবহার হয়ে থাকে। চর্যাগীতিতে চর্যাপদের ব্যবহার অনেকটা এইরূপ। যেমন-
অই সনি চর্য্যা কুক্কুরী পাত্রঁ গাইড়।
এই উপরিক্ত বাক্যে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে এটি একপ্রকার গীতি বা গান। কিন্তু এটিকে চর্যাপদ বলা হচ্ছে। ধরে নেওয়া হয়, পদ কথাটি একমাত্র couplet বোঝাতেই গানে বা গীতিতে এর ব্যবহার। সুতরাং সে অর্থে বলা যেতেই পারে চর্যাপদ আক্ষরিক অর্থে চর্যাগীতি। যদিও প্রাচীন শাস্ত্রে চর্যাগীতি বলে বিশেষ একটি সঙ্গীত রীতির প্রচলন ছিল। কিন্তু একটি ভ্রান্ত ধারণা সবার মধ্যেই থাকে যে, চর্যাগীতি মানে সঙ্গীত বা গানকেই বুঝায়, আদতে তা নয়। মূল বিষয় এই, চর্যাগীতিগুলোর জনপ্রিয়তার জন্যই সঙ্গীতশাস্ত্রে একটি ভিন্ন ঘরানায় এই গীতিমণ্ডলীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, সেই সূত্রেই ধারণা- পূর্বে গান পরবর্তীতে গীতি-রীতির উদ্ভব। আচরণ অর্থে চর্যা শব্দের ব্যবহার বৌদ্ধ শাস্ত্রে প্রচুর থাকায় বলাই বাহুল্য চর্যা অর্থে সবার পূর্বে আচরণ ও পরবর্তীতে আচরণীয় বিধি ইত্যাদি বিষয়ক কবিতা এবং তারও পরবর্তীতে সেই গুলোকেই গীতিরূপে রূপনায়ণের চেষ্টা। এতদপরেও চর্যার প্রমাণ যেমন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে মেলে তেমনিই অন্যত্র এর বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। মনে করা হয় চর্যার ন্যায় এরূপ অনেক পদাবলীর অস্তিত্ব পূর্বে ছিল। বিভিন্ন পদকর্তার রচনা থেকে অনেক কয়েকটি অনুরূপ পদাবলীর সন্ধানও মেলে। বিভিন্ন রচয়িতাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় আসার আগে একটি বিশেষ তথ্য  জানিয়ে রাখা প্রয়োজন। পূর্বেই উল্লেখ করেছিলাম, চর্যাগীতিকোষ রচিত হওয়ার বহু কাল পরে মুনিদত্ত বৃত্তি লিখেছিলেন। সেইজন্য তার সময় কিছু পাঠান্তর হয়েছিল। অনেকক্ষেত্রে যা মূল পাঠ অনেকাংশে ভিন্ন যেমন -





         



তিব্বতীয় অনুবাদক প্রায় মনুদত্তকে অনুসরন করলেও তাঁদের পাঠান্তর সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা ছিল না এমনটাও বলার কোনো জায়গা নেই। কারণ সেই সমস্ত প্রমানাদির কোনো তথ্যই বর্তমানে অস্তিত্ব নেই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনুদত্তের পাঠান্তর উন্নতর। যেমন- অইসনি(২.৯), ভরিলী(৮.৯), দায়(১২.৯), চান্দেরি(৩১.৫) প্রভৃতি। কোনো কোনো স্থানে দুই পাঠই তুল্যমূল্য। যেমন- 'চ্ছূপই : খন্ডই' (৬.৫), 'উইত্তা : উইএ' (৩০.৩), 'ছাড়িঅ : ছাড়িল' (৩২.৭), 'বলদ : বলদা' (৩৩.৫) ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূলের পাঠ উন্নতর বটে। যেমন - 'হাড়ীত' (৩৩.১), 'নৌবানী' (৩৮.৪), 'আলে' (৪০.৫) ইত্যাদি।

আর একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মনুদত্তের রচনার সঙ্গে মূল রচনার অনেক পার্থক্য আছে। যেমন , যেখানে লিপিকরের মূল চর্যার সব পদই ধ্রুব, সেখানে মুনিদত্ত কেবল দুটো চর্যায় ধ্রুপদ উল্লেখ করেছেন। একটিতে (২৮) চোদ্দ ছত্র ও অন্যটি (৪৩) আট ছত্র। আর বাকি সব পদকেই ধ্রুপদ বলে চালানো হয়েছে। এক্ষেতে মুনিদত্ত অনেক বেশি খাঁটি।
তবে চর্যাগীতিকোষে সংকলিত হয় নি এমন একটিমাত্র চর্যা সম্পূৰ্ণ ও কয়েকটি চর্যার কিছু পদ পাওয়া গেছে। এমনকি মুনিদত্তও তাঁর কিছু বৃত্ততেও বেশ কয়েকটি চর্যাপদ ও পদাংশ উদ্ধৃত করেছেন।

প্রসঙ্গত, পূর্বের আলোচনায় ফিরে গেলে, দেখা যাবে বিভিন্ন কর্তাদের অনুরূপ পদাবলীর মধ্যে দীপঙ্করের চর্যাগীতি, কঙ্কনের চর্যাদোহাকোষ গীতিকা ইত্যাদি বর্তমান। তাই বলা যায় চর্যাগীতিতেও ভনিতার রীতি ছিল। মুনিদত্ত যা নিজের টীকাতেও উল্লেখ করছিলেন।  তবে এর পাশাপাশি তিনি দু একটা চর্যাকর্তার নাম উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তা ভনিতা না। তবে কিছু কিছু চর্যা গুরুর নাম ভনিতারূপে গৃহীত। নিম্নে কিছু নাম দেওয়া হলো যা মূলে ও বৃত্তিতে পাই।

                 

বন্ধনীমধ্যে বৃত্তিতে উল্লেখ্য নাম ও নামরূপ

              

  




রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

                               


 চর্যাপদ চর্যাগীতি ও সমীক্ষা (দ্বিতীয় পর্ব)

আজকের বিষয় : পুঁথি ও পরিচয়

এই পুঁথি আবিষ্কার শুধু বাংলা নয় হিন্দী মৈথিলী ওড়িয়া প্রভৃতি অন্যান্য নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রথম আলোড়ন নিয়ে আসে। ফলে নেপালের সমস্ত গ্রন্থাগারের পুঁথিগুলির প্রতি ভারতীয় গবেষকদের ঝোঁক বাড়তে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। এই তৎপরতা যেমন একদিকে বাংলা ভাষার প্রতি পুরোনো ধ্যান ধারণা পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে ঠিক তেমনই অন্যদিকে হরপ্রসাদশাস্ত্রী মহাশয়ের আবিষ্কৃত তথ্যাদির বিশ্লেষণ সমস্ত গবেষকদের অন্তরে নিবিড়তার জন্ম দেয়। তারপর থেকেই শুরু হয়ে যায় আবিষ্কৃত পুঁথি সম্পর্কিত চমকপ্রদ বিশ্লেষণ। সেই ফলস্বরূপ বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন সব প্রমাণাদি ও ব্যাখ্যামূলক তথ্য। যেমন উল্লেখ করা যেতে পারে এই পুঁথিগুলির নামকরণের নামে একটি অপভ্রংশের ইতিহাস। এক, পুঁথিগুলির ভাষাকে বাংলা বলে মনে করা হলেও পরবর্তীতে দেখা যায় এর সমস্ত ভাষা বাংলা নয়, এর তিন চতুর্থাংশই পশ্চিমা অপভ্রংশের। দুই, এই লিপিকর সম্পূর্ণটিই টোকা বা copied। এর কারণস্বরূপ হিসাবে দেখানো হয় 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়' নামক একটি পুঁথি, যা এই কোপিডের প্রামাণ্য বিষয়। স্বভাবতই প্রমাণিত সমগ্র বিষয়টি যেহেতু মূল গ্রন্থ থেকে গৃহীত বা টোকা, তাই তাঁর নাম ভুলবশত চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়ের বদলে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়  রূপে নামাঙ্কণ ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে,অর্থাৎ নামটি ভুল করে লেখা হয়েছে- 'চর্য্যাচর্যবিনিশ্চয়' এই রূপে। এই মতানুসারে 'চর্য্যাচর্যবিনিশ্চয়' নামক অপভ্রংশে  পুঁথিটির পরিচয় টিকে যায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত। এছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, পরবর্তীতে নাকি জানা যায়, মূল বৃত্তাকারের আসল নাম মুনিদত্ত। অনুমান করা হয়, নেপালের গ্রন্থাগার থেকে পুঁথিগুলি সম্পূর্ণ রূপে সুরক্ষিত হিসাবে না পাওয়া যাওয়ায় শেষের দিক থেকে অনেকগুলো পাতা সন্ধান মেলে না, হয়ত এই কারণকেই গবেষকগণ মুনিদত্ত নামটি মুছে যাওয়ার জন্য প্রধান দায়ী করেছেন। তবে মুনিদত্ত মাত্র পঞ্চাশটি চর্যার ব্যাখ্যা করে গেছেন।এতদপরেও  পুরো নির্মাণটি ত্রুটিময় হলেও এর সম্পূর্ণ ভাবার্থটির একেবারেই  অর্থহীন বা ভ্রান্তময়, একেবারেই বলা যায় না। কারণ, জানা গেছে, এই সমস্ত অনুবাদের ভার প্রথমে শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় নিলে, তাঁর সূত্র ধরে ডঃ প্রবোধচন্দ্র বাগচীও পরের দিকে পরীক্ষা নিরীক্ষার পাশাপাশি অনুবাদও চালান, তাতে দেখা যায় তথ্যানুসারে মূল গীতিসংগ্রহের যে  আসল নাম উঠে আসে, তা হলো 'চর্যাগীতিকোষবৃত্ত'।

১৯১৬ সালে হাজার বছরের 'পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' প্রকাশের সময় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী পুঁথিটিকে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নামে আখ্যায়িত করেছেন কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রীয় অভিলেখায় পুঁথিটির নাম নাগরী হরফে 'চর্য্যাচর্য্যটীকা' হিসাবে উল্লেখ আছে। তাই তিনি হয়ত ১৯১৫ সালে তাঁর প্রকাশিত 'A catalogue of Palmleaf and selected Paper MSS  belonging to the Durbar Library Nepal' গ্রন্থে দুই জায়গায় ওই চর্য্যাচর্য্যটীকা নামটি ব্যবহার করেছিলেন। বিশেষত, পুঁথিটি তালপাতায় লিপিতাত্ত্বিকদের পরিভাষায় প্রত্ন বাংলা অক্ষরে লেখা এবং দীর্ঘতর পাতাগুলির মাপ হিসাবে লেখা আছে "লে ১২এবং৩/৪ চৌ ১এবং৯/১০ ও শাস্ত্রী উল্লেখিত ক্যাটালগ মাপ ১২ এবং ১/২  X ২ ইঞ্চি। এছাড়াও, পুঁথির প্রথম পত্রের সামনের পৃষ্ঠায় বাঁ দিকের উপরে লাল কালিতে নাগরী হরফে লেখা আছে: "৭৪১ ভাদ ষমবাত" = ভাদ্র ৭৪১ সংবৎ। আবার নেওয়ার সংবতের সূচনা কাল হিসাবে ধরা হয় ২০ অক্টোবর ৮৭৯সাল বা বর্ষারম্ভ কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদ। অর্থাৎ ৭৪১ সংবৎ + ৮৭৯ সংবৎ = ১৬২০ সাল। যা অনুমান করা হয় পুঁথিটির সংগৃহিত সময়কাল হিসাবে। তবে এখানে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ ভাষাবিচারে মুনিদত্তের জীবৎকাল ত্রয়ো শতাব্দী ধরে নিলে বলা যেতেই পারে, চর্যা পুঁথিটি ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিক বা চতুর্দশ শতকের একবারে গোড়ার দিকে রচিত। এক্ষেত্রে চতুর্দশ শতক সময়কালটি প্রমাণিত।

প্রসঙ্গত, পুঁথি পরিচয়ের আরো গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যাবে অনেক জায়গায় পুঁথিতে উল্লিখিত গানের পাঠের সঙ্গে টীকা পাঠের বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা রয়ে গেছে। উহাহরণ হিসাবে বলা যেতে পারে "লাড়ীডোম্বীপাদানাং সূনেত্যাদি চর্যায়া ব্যাখ্যা নাস্তি" টীকাটি। যেখানে দশম চর্যার মূল পাঠ ও টীকার পরবর্তীতে এবং একাদশ চর্যার পূর্বে লাড়ীডোম্বীপাদের একটি চর্যা ও সেটির সূচনা সূন শব্দ দিয়ে হলেও নির্দিষ্ট টীকার অভাবে গানটি ব্রাত্য হয়েছে, যা এখানে একটি Collated text বা যুক্ত সংকলন হিসাবে নির্মিত। যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় অসামঞ্জস্যতার কারণসমূহ। তাই হয়ত লিপিকর পুঁথিকে দুইভাগে ভাগ করেছিলেন- ১. শুধু গানের পুঁথি যা টীকাহীন আর ২. শুধু টীকা পুঁথি যা গীতিহীন। এক্ষেত্রে এই শুধু গানের পুঁথি বলতে আমরা চর্যাগীতিকোষের কথাও বলতে পারি যা বুধগণের অনুদিত চর্যাগীতিকোষবৃত্তি একপ্রকার রতিব্বতি অনুবাদ, কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়এই গানের পুঁথি মুনিদত্ত ব্যবহার করেন নি। সেকারণেই হয়ত তাঁর লেখার মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। তবে অনুমান করা যায় এই ধরনের collated text ধরনের পুঁথিগুলি বৌদ্ধ পন্ডিত ও বিদ্যার্থীদের ভীষণ প্রিয় ছিল। তাই এগুলো হয়ত অন্যভাষাতেও অনুবাদ হয়। যেমন- কাশ্মীর পন্ডিত কীর্তিচন্দ্রের উপদেশানুসারে চতুর্দশ শতকের তিব্বতীয় অনুবাদ Grags-pargyal-mchan ও Kvarne ১৭৪১ থেকে ১৭৪৯ সালের মধ্যে চীনের মঙ্গোলীয় অনুবাদ। সুতরাং বলা যেতেই পারে শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিটি চর্যাগীতির একমাত্র পুঁথি কিন্তু নয়, যা আসলে অন্যতম পুঁথির একটি রূপ।



ক্রমশ...........

রবিবার, ১১ জুলাই, ২০২১

অনিন্দ্যসুন্দর পাল

                                   


 চর্যাপদ চর্যাগীতি ও সমীক্ষা



প্রথম পর্ব

অনুসন্ধান


চর্যাপদ বা চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয় আবিষ্কার বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। সমগ্র উনিশ শতক তো বটেই, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত এই অমূল্য ঐতিহাসিক উপাদানটির অস্তিত্ব শিক্ষিত সমাজের অনেকটা অগোচরেই ছিল বলা যায়। যখন দিকে দিকে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষার জন্য গজিয়ে উঠছে স্কুল বা প্রতিষ্ঠান এবং তারই সাথে বর্ণপরিচয়, কথামালা, চরিতাবলী ইত্যাদি হয়ে উঠছে বাংলা ভাষাশিক্ষার প্রাথমিক হাতিয়ার তখনও কারো ধারণাই ছিল না বিদ্যাসাগরের পূর্ব্বেও রামমোহন রায়, গুড়গুড়ে ভট্টাচার্য্যের মত প্রমুখ ভাষাপন্ডিত এই বাংলা সাহিত্যেই তাঁদের প্রচুর সৃষ্টি বা নিদর্শন স্থাপন করে গেছেন অন্তরালে, এবং সেইসব সৃষ্টি-কর্মের বহু প্রমাণাদি পুঁথি আকারে এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। পরের দিকে রামগতি ন্যায়রত মহাশয়  বাংলা ভাষা ইতিহাস নিয়ে লেখালিখি বা উৎসাহ প্রকাশ করলে, সেই লেখায় কাশীদাস, কৃত্তিবাস কবিকঙ্কণ প্রভূত কয়েকজন প্রাচীন কবির সন্ধান মেলে। এ থেকে একপ্রকার ধারণা উদ্ভব হয় তিনশ বছরের পূর্ব্বে যে কয়েকটি কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে তা কেবল সংস্কৃতের নিম্নরূপ বা সংস্কৃতের অনুবাদ ব্যতীত আর কিছুই নয়। আরও পরে ন্যায়রত মহাশয়ের অনুকরণে আরও কয়েকটি সাহিত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় ঠিকই, বলাই বাহুল্য সেগুলির মধ্যে নতুনত্বের ছোঁয়া বলতে কিছুই পাওয়া যায় না। তাই এইসকল ইতিহাস অস্তিত্বের দরুণ আশি শতকে সাধারণ ধারণা ছিল যে বাংলা এমনই একটি ভাষা যা কেবল অনুবাদেই সীমিত, অর্থাৎ, আক্ষরিক ভাষায়- বাংলা ভাষা শুধুমাত্র ইংরেজি অথবা সংস্কৃত সাহিত্যের একটি অনুবাদীরূপ মাত্র।

1858 সালে রাজেন্দ্রলাল মিত্র 'বিবিধার্থ সংগ্রহ' পত্রিকায় 'বঙ্গভাষার উৎপত্তি' নামে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন সেখানে বাংলা ভাষার উৎসরূপ হিসাবে হিন্দির পূর্বী  শাখাকে নির্দেশ করা হয় এবং আদি নিদর্শন হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় বিদ্যাপতির রচনাবলী। এছাড়াও 1911  সালে প্রকাশিত হয় দীনেশচন্দ্র সেনের 'The History of Bengali Language and Literature', সেখানে বহু বৌদ্ধ প্রভাব সম্পর্কীয় তথ্যাদি সম্পর্কে ধারনা মেলে। যদিও এই তথ্যগুলোর সত্যতা প্রমাণের অভাবে সেভাবে এগুলোর প্রশস্ততা বিচার করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে নি। তাই ইতিহাসের এই শূন্যস্থান পূরণ ও পূর্ব অনুমিত সূত্রের পুনর্মূল্যায়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থভাণ্ডার। প্রকৃতপক্ষে, যেকারণে নেপাল ও তিব্বতে রক্ষিত বিভিন্ন বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থের পুঁথির দিকে দৃষ্টি নির্বাপিত হয় সব্বার, সর্বপ্রথম বিশেষ করে  বিদেশী গবেষকদের উৎসাহ এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রসঙ্গত বলা যায়, প্রচলিত আছে Brian Hodgsen নামক এক জনৈক ইংরেজের তত্ত্বাবধানে নেপাল থেকে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বেশ কয়েকটি পুঁথি আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই নাকি তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস রচনা ও শাস্ত্র সম্পাদনার ব্যাপারে গবেষকদের অন্দরে একপ্রকার ঢেউ উঠতে শুরু করে। সেই সূত্র ধরে প্রথমে ১৮৪৪ সালে Eugene Burnouf, পরে Deniel Wright ও Cecil Bendall প্রভূত  গবেষকের নাম একে একে উঠে আসতে থাকে। প্রসঙ্গত, জানিয়ে রাখা ভালো ১৮২৮ সালে সর্বপ্রথম ইংরেজ গবেষক Brain Hodgson নেপাল থেকে সর্বপ্রথম তান্ত্রিকবৌদ্ধধর্ম বিষয়ক তাঁর আবিষ্কৃত পুঁথিগুলোর তালিকা প্রকাশ করেছিলেন 1784 সালে প্রতিষ্ঠিত স্যার William Jones এর 'The Asiatic Reseaches' নামক পত্রিকাটিতে এবং 1844এ ফরাসি পন্ডিত Eugene Burnouf প্যারিস থেকে প্রকাশ করেন Introduction a I' histoire du Buddisme Indienনামক একটি বৌদ্ধ-ধর্মমূলক গ্রন্থ ও আরেক ইংরেজ গবেষক Daniel Wright তাঁর (Cambraige University) এর জন্য পুঁথি সংগ্রহ করতেও নেপালে যান বলে জানা যায়। এছাড়াও বাঙালি গবেষকরাও এইব্যাপারে মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না, যেমন এক্ষেত্রে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনিও 1882 সালে নেপালে গিয়ে বৌদ্ধ-সংস্কৃত পুঁথি অনুসন্ধান করার পরে 'Sanskrit Buddhist Literature In Nepal' নামে একটি পুঁথির তালিকা প্রকাশ করতে সচেষ্ট হন এবং পরবর্তীতে রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর সরকার হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর উপর বাংলা-বিহার-আসাম-উড়িষ্যার পুঁথিসন্ধান ও সংগ্রহের দায়িত্ব এসে পড়লে সেই সূত্র ধরেই শাস্ত্রী মহাশয় শুরু করেন তার নতুন অনুসন্ধান। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের দীনতার বিষয়টি বুঝতে পেরে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রাজেন্দ্রলালের তালিকা ও নবাবিষ্কৃত পুঁথির ভিত্তিতে নেপালের নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৌদ্ধ-সংক্রান্ত নানা পুঁথির ও তথ্যের সন্ধানে সম্পূর্ণ মননিবেশ দিতে থাকেন। এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই দৈনতা থেকে মুক্ত পেতে হলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এইসব বৌদ্ধ উপাদান একান্ত অনস্বীকার্য। তাই বলা হয়, 1886 সালে বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের একটা নতুন নবজাগরণের সূচনা হয়।

                          


  

    বেঙ্গল লাইব্রেরির বৈষ্ণব গান ও সংকীর্তনের বিরাট সংগ্রহের পাশাপাশি জীবনচরিত  ও ইতিহাস সম্পর্কিত পুঁথির সংগ্রহ দেখে তিনি শুধু বিস্মিত হন নি, এই সংগ্রহশালার সম্ভার দেখে তাঁর লিখিত পুঁথির প্রতি তাঁর আগ্রহ বা ঝোঁক অনেকাংশে বেড়ে যায়, যা স্পষ্টভাবে বললে- তাঁর বাংলা ভাষার প্রতি একপ্রকার অমোঘ আকর্ষণ জন্মাতে শুরু করে। যার ফলস্বরূপ আকৃষ্ট হয়ে পড়েন শাস্ত্রী ধর্মঠাকুর সম্পর্কে। তাঁর ধারণা হয়- বৌদ্ধ ধর্মের শেষ দেবতা একমাত্র ধর্মঠাকুরই। তাই এই ধারণা সত্যতা প্রমাণের জন্য মননিবেশ করেন ধর্মমঙ্গল পুঁথির সন্ধানে এবং তার কিছুদিনের মধ্যেই পেয়ে যান মাণিক গাঙ্গুলীর 'ধর্মমঙ্গল' ও রামাই পন্ডিতের 'শূন্যপুরাণ'। যার ফলস্বরূপ  তিনি মনস্থির করেন নেপালে গিয়ে এই পুঁথি ও তথ্যাদির ব্যাপারে নতুন নতুন অনুসন্ধান শুরু করবেন।
            
সেইমতো, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথমবারের মতো নেপালে যান 1887 সালে, দ্বিতীয় বারের জন্য যান তার ঠিক পরের বছরেই। দ্বিতীয় বারের যাত্রায় লাভ হিসাবে পান 'ডাকর্ণব'  নামে একটি পুঁথি। এই পুঁথির ভাষাটি তাঁর অজ্ঞাত হওয়াও তাঁকে বেশ সমস্যার মধ্যেই পড়তে হয়। যদিও তিনি বিচলিত না হয়ে সেই পুঁথি অবিলম্বে নকল করে নিয়ে আসেন। বিশেষ উল্লেখযোগ্য, সুভাষিত নামে আরও একটি পুঁথির ভাষা তাঁর নজর কারলেও, পরে অজান্তে ইংরেজ পন্ডিত Cecil Bendall সেটি নকল করে নিলে তাঁর এটি হাতছাড়া হয়ে যায়। এছাড়াও 'দোহাকোষপঞ্জিকা' নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁথিও এই ইংরেজ গবেষকের কারণেই নাকি পুনরায় হাতছাড়া হয়েছিল বলে সূত্র মারফত জানা যায়। প্রমাণ আছে,পরবর্তীতে  ঘটা করে বেন্ডেল 1905 সালে সেই পুঁথিগুলোর ভাষাকে Òdifficult Apabhramsa Prakrit” নামে প্রকাশও করেছিলেন। পুনরায় নতুন তথ্য উন্মোচনের আশায় শাস্ত্রী মহাশয় তৃতীয়বারের জন্য নেপাল যান 1907 সালে। এইবার নেপাল গিয়ে তিনি পেয়ে গেলেন তাঁর জ্যাকপট। এই সেই বহুকাঙ্খিত স্বর্ণভান্ডার- বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের পুঁথি 'চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়' ও তার পাশাপাশি খুঁজে পান সরোরুহপাদের দোঁহা ও অদ্বয়বজ্রের সংস্কৃতে রচিত 'সহজাম্নায়পঞ্জিকা' এবং কৃষ্ণাচার্য্যের দোঁহা ও আচার্য্যপাদের সংস্কৃতে রচিত 'মেখলা' নামক প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত টীকা সমগ্র। এই অসম্ভব সৃষ্টির আবিষ্কার সম্পর্কে তাঁর একটি উক্তি এক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য্যপূর্ণ-

" ১৯০৭ সালে  আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানিক নাম 'চর্য্যাচর্য্য-বিনিশ্চয়', উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে ও তাহার সংস্কৃত টীকা আছে। গানগুলো বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম 'চর্য্যাপদ'। আর একখানা পুস্তক পাইলাম তাহাও দোঁহাকোষ, গ্রন্থাকারের নাম সরোরুহবজ্র, টীকাটি সংস্কৃতে, টীকাকারের নাম অদ্বয়বজ্র। আরও একখানি পুস্তক পাইলাম, তাহার নামও দোঁহাকোষ , গ্রন্থাকারের নাম কৃষ্ণাচার্য্য, উহারও একটি সংস্কৃত টীকা আছে। "

বাংলা ১৩২৩ সনে অর্থাৎ ইংরেজি সাল1907-এ আবিষ্কৃত 'চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়' এর পাশাপাশি 'সরোরুহবজ্র' ও 'কৃষ্ণাচার্য্য' নামে দুটি দোঁহাকোষ এবং 1887 ও 1888 মধ্যবর্তীতে কোনো একসময়ে পূর্বপ্রাপ্ত 'ডাকার্ণব' এই চারটি পুঁথি একত্রে নিয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী 'বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ' থেকে প্রকাশ করেন একটি সম্মিলিত সাহিত্য সংকলন, যার নাম - "হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোঁহা।" যার ফলে এই গ্রন্থ প্রকাশের পর একদিকে যেমন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বিষয়ক পূর্বের সিদ্ধান্তগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়লো আবার তেমনই অন্যদিকে নেপালের পুঁথির প্রতি ভারতীয় গবেষকদের আগ্রহের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও তার উদ্ভব নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণের প্রারম্ভ হয়েছিল বলা যায়।



ক্রমশ..............