উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

মলয় রায়চৌধুরী

                         

মলয়, ১৯৪১ সালে


 বাঁ দিক থেকে : মলয়ের বড়দি সাবিত্রী, দাদা সমীর, মেজজেঠিমা করুণা, মলয়, বড়জেঠিমা নন্দরাণী, মেজদা অরুণ, মা অমিতা, ছোড়দি ধরিত্রী

ধারাবাহিক

ছোটোলোকের জীবন

: মলয় রায়চৌধুরী


       চার বছর বয়সে ন্যাড়া ছাদে  উঠে ঘুড়ি উড়িয়ে পাতা-হাতে ছড়ির মার খেয়েও ওড়াতুম আর অন্যের ঘুড়ি কেটে নাচতুম  কপিলের দাদু একভাঁড় তাড়ি খাইয়েছিল আর মা মুখ শুঁকে গন্ধ পেয়ে ঘরে বন্ধ করে রেখেছিল “তাড়ি নিশা নহি হ্যায় খোখা  ভুখ সে বচাতা হ্যায় বদন মেঁ তন্দুরুস্তি” কি করেছি আর কি করতে পেরেছি তার জন্য আপশোষ নেই অনেক মন্দিরে দেখতুম উপস্হিত সবাই মাটিতে  একেবারে বোবা হয়ে বসে আছে ঈশ্বরের শব রাখা রয়েছে সামনে পুরুষের আধ্যাত্মিকতা ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক তখন থেকেই যদিও মা-বাবা আদরযত্ন করে মানুষ করেছিলেন তবু একা রয়ে গেছি ইমলিতলার ছাদে প্যাকিংবাক্সে মাটি ভরে তাতে ফুলের গাছ পুঁতে ফুলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম কেন্নোদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম উচ্চিঙড়ের সঙ্গে কাঠবিড়ালিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম গেঁড়ি-গুগলিদের সঙ্গে শুঁয়াপোকার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ফাঁদে পড়া ইঁদুরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম ঘরে আটক চড়ুইপাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করতুম বড়ো হওয়া মানে কুৎসিত অনিশ্চয়তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করা ।  

ইমলিতলা বাড়ির ছাদে : মেঝেতে বসে মলয়, চেয়ারে দাদা সমীর, দাঁড়িয়ে মেজদা অরুণ, দুইপাশে জাঠতুতো বোন ডলি আর মনু ( উকুন হতো বলে ন্যাড়া করে দেয়া হতো )



         পাঁচ বছর বয়সে রাস্তার কলে চান করার সময়ে যাকে ইচ্ছে কনভেন্টে শেখা  ‘ফাক ইউ’ বলতুম আর ইংরেজিতে তার সঙ্গে কথা বলেছি বলে তার আনন্দ উপভোগ করতুম  ইমলিতলার গঞ্জেড়িদের মানে যারা গাঁজাচরস টানে তাদের জমায়েতে ছিলিম টানতে গিয়ে কেশেছি শুয়োরের মাংসের ঝোল খাইয়ে বনসি দুসাধ কাশি থামিয়েছিল “জিনদিগি ববুয়া য়হাঁ সে ওয়াহাঁ” শুয়োরের মাংস হয়ে যায় কতো কি শিখেছি কনভেন্ট ইশকুলে হ্যাম বেকন প্রোসিয়েটো সসেজ টেরিনস জেলাটিনো সালামি বোলোনা জামবন ট্যাকব্যাক মোরটাডেলা উইনার শুয়োর মানে গোলাপি শুয়োর যারা ঠোঁটে লিপ্সটিক মেখে জন্মায় আঘাতহীন শৈশব হয় না কখনও মা কখনও বাবা কি মনে করিয়ে দেননি তুই বাতিলের দলে তুই একটা ফালতু উধাও হবার আগে কেউই বিদায় জানিয়ে হাত নাড়ে না যেমন-যেমন বুড়ো হও তেমন-তেমন তুমি তোমার বুড়ির মধ্যে তোমার মা-বাবাকে খুঁজে পাও যে তোমাকে চিপকে থাকবে যা বুড়ো বয়সে তোমার বড্ডো দরকার ।

         ছ’বছর বয়সে সারাদিনে একবস্তা কয়লা একা ভেঙেছি প্রায়ই প্রায়ই প্রায়ই আর মামার বাড়ি পাণিহাটির পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরেছি বঁড়শিতে আটকানো মাছের লাফানি-ঝাঁপানি সে কী মজা “দেখি কী মাছ ধরেছিস ? কী মা্ছ ওটা?” জানি না বঁড়শিতে আটকাচ্ছে তুলে নিচ্ছি  “খোট্টা মেড়ো কোথাকার, মাছের নাম জানিস না বিভাস ওকে আজকে মাছের বাজারে নিয়ে গিয়ে মাছেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিস” আসলে ইমলিতলার সব রকমের আনন্দে ভোগার প্রচুর সুযোগ পেয়েছি অথচ আমি আজও এই বুড়ো বয়সেও লেখালিখি করি তার কারণ আমি খুঁজে পাইনি যে আমি লোকটা কে প্রথম কবিতার বই “শয়তানের মুখ” কৃত্তিবাস প্রকাশনী থেকে বেরোলেও কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট এলাকার প্রেসগুলো আমার নাম দেখে ছাপতে চায়নি মানুষের মুখ আর শয়তানের মুখে পার্থক্য ছিল না  ছাপাতে হয়েছিল বহরমপুরে মণীশ ঘটক ব্যবস্হা করে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রকাশক কিন্তু যে-কবিতাগুলো ছাপার পর আমার ভালো লাগেনি তাতে “CANCELLED” রাবার স্ট্যাম্প মেরেছিলুম বলে সুনীল গাঙ্গুলি খাপ্পা অথচ নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় আমার কবিতার বই রিভিউ করাতে চাননি আমার গদ্য ছাপতে চাননি কেননা আমার “নামগন্ধ” উপন্যাসে যিশু বিশ্বাস নামে চরিত্রের বাবার মোটর গাড়ি চুরি হয়ে গিয়েছিল সেই থিয়েটার হলের সামনে থেকে যেখানে বিজন ভট্টাচার্যের “নবান্ন” অভিনয় হচ্ছিল ব্যাপারটা এতোই আনন্দদায়ক যে মনে হয় তা বুঝি দুঃখ সময়ের রঙ হয় কুচকুচে কালো চাইবাসার রোরো নদীর ঠাণ্ডা জলে  চান করতে গিয়ে একাকীত্বের মাতনে মেতেছি আসলে আমি তো একজন আউটসাইডার জেলের দেয়ালে কয়েদিরা যা লিখে রাখে তা আমাকে উদ্দেশ্য করে । আমি বুলগাকভ পড়িনি ।

         সাত বছর বয়সে ঘুঁটে ভেঙে তার তলায় প্যাকিং-বাক্সের কাঠের টুকরো সাজিয়ে কয়লা রেখে উনোন ধরাতে পারতুম  সকালে দাঁত মাজার জন্যে সাদা রঙের ছাই বড়োজ্যাঠার জন্যে আলাদা করে রাখতুম মহাদলিত গঞ্জেড়িদের তবেলায় হাতে তমঞ্চা নাড়িয়ে দেখেছিলুম তেমন ভারি নয় অনেক সময়ে দুর্ভোগ অদৃষ্টের কোপ থেকে বাঁচায় আদালতের জজ যখন জিগ্যেস করেছিলেন “আর ইউ গিল্টি” তখন মিথ্যে কথা বলেছিলুম যে না আমি গিল্টি নই কিন্তু কতো যে বেআইনি কাজ করেছি তমঞ্চার গুলি চালানোর মতন তা উনি জানতে চাননি  আসলে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল মানুষের নাম যা গাঁজা ফুঁকে বা পাঁড় মাতাল হয়েও মগজ থেকে যায় না তার জন্য বদ্ধউন্মাদ হতে হয় চুল কাটার সময়ে সেলুনের আয়নায় নিজেকে আগন্তুক মনে হওয়ার সেই শুরু সকলকেই যে বুঝে উঠতে পারি তা নয় এই যে লিখতে বসেছি নিজের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না শুনতে পাচ্ছি পাণ্ডুলিপির গলার আওয়াজ আমার নিজের জীবন আমি বেঁচে নিচ্ছি ব্যাপারটা ত্যাবড়ানো নিঃশেষ না করে ছাড়ে না অস্হির অপরাধবোধে টইটুম্বুর তবুও  আমার জীবন একেবারে টানটান ।

         আট বছর বয়সে আলোয় গড়া চামড়ার কালো তেলালো কুলসুম আপার সঙ্গে প্যাণ্টুল খুলে লেংটুর ঘষাঘষি খেলেছি “কোশিশ কর  উল্লু কহিঁকা কোশিশ কর নহিঁ তো গোস্ত নহিঁ খিলাউঙ্গি” ওনার গায়ে জংধরা লোহার গন্ধ নোনতা তন্দুরি-চিকেন বুক ওনাদের বাড়ির গোরুর মাংসর মোগলাই খেয়ে বাড়ি ফিরে মাকে মিথ্যে কথা বলেছি  টাটকা মাংস আর রাঁধা মাংসের লোভে প্রায়ই মিথ্যে কথা বলেছি ইউ আর গিল্টি ইউ কেননা আমি তো দার্শনিক মিথ্যে কথা বলার অধিকার আছে আর খিদে তো জীবনশৈলী জেনেছি অন্ধকারে চোখের চরিত্র পালটে যায় আঙুলের ডগায় চোখ গজিয়ে ওঠে গির্জা মন্দির আর মসজিদের মধ্যেকার গন্ধ কিন্তু এক নয় রোমান্টিক প্রেম হল একেবারে অবাস্তব ব্যাপার নয়তো তক্ষুণি-চেনাকে স্পর্শ করলেই দুপক্ষের কালো জঙ্গলে কেন তরল ব্যাপার খেলা করতে থাকে  বুঝতে পারছেন এই যে হ্যালো শুনছেন ছায়াদের ভুতুড়ে জগত সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি তাতে কালো রঙের মাত্রা বেশি তখন জানতুম না কী কোশিশ করতে বলছেন কুলসুম আপা প্রেম জীবনকে থামিয়ে রাখে কিছুক্ষণ কিছুদিন কয়েকমাস কয়েকবছর ব্যাস কাফেরের সঙ্গে যৌনসংসর্গ করে কুলসুম আপাকে জন্নতে লুকিয়ে-চুরিয়ে যেতে হবে ।

         নয় বছর বয়সে ব্লেড দিয়ে মুর্গির গলা কেটে গলা চিপে থেকেছি যাতে রক্ত বেরিয়ে স্বাদ না নষ্ট হয় চুড়িঅলা শিখিয়েছিল মুর্গির মাংস জায়ফল দিয়ে রাঁধলে গন্ধ কেটে যায় ছাদে দাঁড়িয়ে পালক ওড়া দেখেছি বুক-ওঁচানো মেয়েদের দিকে চোখ চলে গেলে ফিরিয়ে নিইনি মনে হয়েছে ওর হাতে কাতলা মাছের চোখ খুবলে আশীর্বাদী আংটি পরিয়ে দিই বলি উইল ইউ ম্যারি মি তুমি কি ঝড়ের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াও প্রতিটি প্রেম তার এক্সপায়ারি ডেট নিয়ে আসে তবু আমার মনে নেই শেষ কবে অবিবাহিতা যুবতীর আদর খেয়েছি পাহাড় ধ্বসে পড়লে তার চূড়াটা নামে সব শেষে অথচ তার ভারেই পাহাড়ের অধঃপতন সৎ আর সত্যবাদী হলে প্রেম উবে যায় যুক্তিতর্ক আমার সহজপ্রবৃত্তিকে দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভুতকিমাকার করে দিয়েছে কেউই ব্যাখ্যা করতে পারে না কাকে আলোকপ্রাপ্তি বলে অথচ মানুষ ভয় পেলেও বোকার মতন হাসে যারা ড্রিফটার তাদের আমি পছন্দ করি না ।  

         দশ বছর বয়সে নমিতা চক্রবর্তী মানে নমিতাদিকে ‘ভালোবাসি তোমাকে’ লেখা চিরকুট দিয়েছিলুম যা উনি যত্ন করে বারো বছর রেখে দিয়েছিলেন চুমু খেতে চাইলে দিতেন হয়তো কিংবা নিশ্চই ওনার-আমার দুজনেরই সাহস হয়নি ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে গোখরোও ভিতু হয়ে যায় অনেক সময়ে কেবল “পুঁজিবাদ নিপাত যাক”, “দুনিয়ার মজদুর এক হও” এই সব শুনতে নমিতাদির ভাল্লাগে ধুসসালা, “বই পড় বই পড় বই পড় বই পড় এই বইগুলো নিয়ে গিয়ে পড়” ফলে কাগজ পড়ি চিরকুট পড়ি ঠোঙা পড়ি পোস্টার পড়ি বাংলা হিন্দি ইংরেজি ভোজপুরি মৈথিলি আর দাদার সঙ্গে গঙ্গায় সাঁতার শিখতে গিয়ে ডুবে যাচ্ছিলুম বলে পরে চুমু খাবার মতনই সাঁতার শেখার সাহস হয়নি অথচ আমার জীবন আরম্ভ হয়েছিল নমিতাদির দেয়া প্রথম রবীন্দ্রনাথ থেকে তার আগে আনপঢ় ছিলুম ভাষাকে আক্রমণ করার গোপন চাবিকাঠি দিয়েছিলেন উনি  কর্তৃত্বকে আমি ইন্সটিংক্টিভলি ঘৃণা করি সমস্যা হল যে আমার নিজের কোনো বোন ছিল না ইসকুলের টিচাররা কোনোদিন শব্দের রহস্য বুঝিয়ে উঠতে পারেননি ।

              

বাবা রঞ্জিত ও মামা অমিতা


এগারো বছর বয়সে বাবার ফোটাগ্রাফির দোকানে বসে জিনিসপত্র বিক্রি করে তা ‘দিবসান্তে কতো টাকা রোজগার হইল’ ( Income ) বাঁদিকে আর  ‘দিনভর কি বিক্রয় হইল’ ( Items ) ডানদিকে খেরোর খাতায় লিখে রাখতুম বাবা কি পুঁজিবাদি উনি বলেন “বাড়িটা বানাবার জন্যে আর ভাইদের সংসারের জন্যে পুঁজিতে টান পড়ছে”  বাবা কি মজদুর আট ঘণ্টা ডার্করুমে কাটান অক্সিজেনের অভাবে প্লুরিসি হয়ে গেল মেজদা মারা গিয়ে আমাদের পরিবারে অমর হয়ে আছে জানেন কি আমার বাবা-কাকা-জ্যাঠা জীবন শুরু করেছিলেন ফিরিঅলা হিসেবে রঞ্জক সাবান জামের ভিনিগার পদ্মফুলের শুকোনো বিচি  নিচুতলায় বসবাস না করলে পুরো সমাজ সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না পর্ণোগ্রাফির ফিল্মের চরিত্রদের মতন সাংবাদিকরা তাদের মালিকের অনৈতিকতায় ভোগে তারা বিমূর্ত ভাবনাচিন্তাকে ভয় পায় বিশেষ করে দোজখ-নাজেলের আতঙ্ক ।

. বাবা-মায়ের সঙ্গে মলয় ও সমীর ( দরিয়াপুরের বাড়িতে তোলা 

(ক্রমশঃ)


শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

মলয় রায়চৌধুরী

                 
লয়ের ঠাকুরদা লক্ষ্মীনারায়ণ আর ঠাকুরমা অপূর্বময়ী



                               বাবা, মা ও দাদার সঙ্গে মলয়
ছোটোলোকের জীবন  ( ধারাবাহিক )

         
আমি আজও আমার প্রথম বইটা লেখার চেষ্টায় বাংলা ভাষাকে আক্রমণ করে চলেছি ।
         ইমলিতলায় ছিলুম বামুনবাড়ির মহাদলিত কিশোর ।দেখি খুল্লমখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি  তুলে আনতে পারি উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না জীবনকেচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ খেয়ে যেতে পারে তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত ।


 ক্লাস টেন-এ পড়ার সময়ে ক্লাসটিচার অধিকারী স্যারের সঙ্গে ; সিঁড়ির দ্বিতীয় সারিতে বাঁদিক থেকে দ্বিতীয় মলয়

         ঘোঁচু ছিলুম স্বমেহন বলুন ম্যাস্টারবেশান বলুন আমাকে শুরু করতে হয়েছিল কলেজে ঢুকে আসলে জানতুমই না একদিন পাটনার গান্ধি ময়দানে বসে রুমালে চিনেবাদাম রেখে আমি সুবর্ণ তরুণ আর বারীন খাচ্ছিলুম সুবর্ণ তরুণকে বলল এই তুই বড়োগুলো খেয়ে নিচ্ছিস জবাবে তরুণ বলল কি করব বল চিন্তায় আছি আজকাল দিনে তিন বার হাত মেরে ফেলছি আমি জানতে চাইলে হাত মারা আবার কি ব্যাপার সুবর্ণ বললে শালা হাত মারা জানিস না নুনুর খোসার তলায় যে নোংরা থাকে তা পরিষ্কার করিস না বারীন বলল বাঞ্চোৎ মেয়ে ফাঁসিয়ে বেড়াচ্ছিস হাত না মারলে খোসার তলার নোংরা যদি কোনো মেয়ের লাবিয়া মাইনরায় ঢুকে যায় তার লাইফ হেল হয়ে যাবে বললুম আরে শালা চুতিয়া কাহিঁকা হাত মারা কী জিনিস সেটাই বলবি তো তাহলে খোসার তলাকার নোংরা পরিষ্কার করব সুবর্ণ বলল নুনুতে সাবান লাগিয়ে ডান হাতটা এইভাবে নিবি আর নুনুকে সাবান মাখাতে থাকবি ব্যাস ফণফণিয়ে বেরিয়ে পড়বে তোর লিকুইড ডায়মণ্ড কি লজ্জা কি লজ্জা নাইটফল নিয়েই ছিলুম মজায়  নিজেই পায়জামা পরের দিন সকালে কেচে ফেলতে হতো নয়তো ধোপাটা “ই কাহেকা দাগ লগলই” বলে টিটকিরি মারবে তাই কলেজে ঢুকে চেককাটা গাঢ় রঙের লুঙ্গি পরা শুরু করেছি যাক শুরু হয়ে গেল আমার ম্যাস্টারবেশানের কালখণ্ড সমস্যা হল যে বুড়ো বয়সে প্রস্টেটের জন্যে ইউরোলজিস্টকে দেখাতে গেলে ডাক্তার জিগ্যেস করলে আর ম্যাস্টারবেশান করেন না বললুম না কেন দরকার হয় না বউ আছে তো বউয়ের মেনোপজ হয়ে গেছে ডাক্তার বললে আপনাদের লোকে ভুল বুঝিয়েছে ম্যাস্টারবেশান পঞ্চাশ বছরের পর আবার শুরু করতে হয় যাতে প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড মরে না যায় আপনি ভাবলেন বউয়ের সঙ্গে শুলেই কাজ হয়ে গেল তা ঠিক নয় শোয়াটা মনের ব্যাপার দেহের ব্যাপার হল ম্যাস্টারবেশান যাকগে আপনি তো যে বয়সে পৌঁছেচেন আর ম্যাস্টারবেশান করে লাভ হবে না কেননা প্রস্টেট গ্ল্যাণ্ড অলরেডি মরে গিয়ে ফুলতে আরম্ভ করেছে শুধু ওষুধ খেয়ে ওর ফোলা থামিয়ে রাখতে হবে বছরে একবার সোনাগ্রাফি আর পেচ্ছাপের রিপোর্ট আনবেন তাহলেই হবে মনে রাখবেন ম্যাস্টারবেশনে প্রমোদকর লাগে না।
         সেক্স ? চিরকাল দিনের আলোয়  চোখ খুলে রেখে আমার ভালো লাগে  রাতের অন্ধকারে নয় রাতে হলে জোরালো আলো চাই । হাড়কাটা হোক, সোনাগাছি হোক, কালীঘাট হোক, খিদিরপুর হোক, পার্কস্ট্রিটের সন্ধ্যা হোক, ফ্রিস্কুল স্ট্রিট হোক, সব দিনে কিংবা আলোয় । খাটে নয়, চোটে ।
         যখন প্রথম পর্ণোগ্রাফিক ফিল্ম  দেখলুম তখন ভাবলুম যে কেন এদের ম্যাজিক রিয়্যালিস্ট ফিকশান বলা হয় না ।
         বাঙালি সাহিত্যিকদের চাঁদমারি ভাগ্য যে তাঁদের ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না বাংলা পাল্প ফিকশন হল ঘোলা জলের আয়নায় মুখদর্শন ।
         সাহিত্যজগত থেকে ছিঁড়ে নিজেকে আলাদা না করলে লেখালিখি করা যায় না  আমাকে বোঝার চেষ্টা করা হেঁয়ালি তাই আমার লেখালিখিকে বুঝুন ।
         আমি সাহিত্যিক লাউডগাগিরিতে ভুগি না বুঝলেন তো আমার লেখালিখি নিছক সাহিত্য নয় গণপাঠককে আনন্দ দেবার জন্যে নয় তা পাঠককে চৌচির করে তার ভেতরে সমাজরাষ্ট্রের গুগোবর ভরে দেবার জন্যে আর আমি শিল্প ব্যাপারটার বিরুদ্ধে কেননা আমাকে সারিয়ে প্রাচীন গ্রিক হেলেনিক সমাজের যোগ্য করে তোলা যাবে না  আমি চাই না যে আমার শবযাত্রায় কবি-লেখকরা ভিড় করুক একজনকেও চাই না সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার হলো যখনই মরি না কেন যুবাবস্হায় মারা যাবো মাঝে পনেরো বছর মরে গিয়ে যাচাই করে নিয়েছিলুম আমি লেখালিখি বেছে নিইনি লেখালিখি আমাকে বেছে নিয়েছে লেখকদের একেবারে তলায় নেমে গিয়ে ধাঙড় হতে হয় জানি পরের জন্মে ঘুর্ণিঝড় হয়ে জন্মাবো ।
         কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর কপি কৈলাস পর্বতে তুলে রেখে এসেছি দেখলুম আগেই কেউ মনুস্মৃতি রেখে গেছে  ।
         প্রথম আদিম মানুষ যেমন পাথরের ছোরা আবিষ্কার করেছিল  তেমনই আমি নিজের লেখালিখির অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছি  কিন্তু সার্কাসে যে লোকটা সিংহদের আগুনের ভেতর দিয়ে লাফাতে বাধ্য করত তাকে আমি ছোটোবেলায় মাফ করতে পারিনি আমার সবক’টা দুঃস্বপ্ন চোখ খুলে কেননা ঘুমে সবচেয়ে রসালো স্বপ্নগুলো দেখি ভোরের পুকুরে মৌরলা-ঝাঁকের মতন সুন্দুরীদের দল আমার উচ্চাকাঙ্খা ছিল একটা বিশাল বেশ্যালয় কিনি আর চোরাকারবারের মালিক হয়ে লুকিয়ে বেড়াই কিন্তু যখন ভারতীয় বাস্তবে পচতে থাকি তখন মগজে লেখা আসেনা মনে হয় সেসময়ে কেউ একজন আমাকে একটা শ্মশান বা গোরস্তান উপহার দিক হোমো স্যাপিয়েন মানুষের প্রথম যে করোটি পাওয়া গিয়েছিল তা যে আমার  লেখালিখিই তার প্রমাণ।
         দেশটা দিনকেদিন চুতিয়ায় ভরে উঠেছে গুয়ের সমুদ্রে ডানে পড়ি বা বাঁয়ে । একজন কমিউনিস্ট নেতাকে জিগ্যেস করেছিলুম, দেশভাগের সময়ে তো ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন ধর্ম বাঁচাবার জন্য, তা এখানে এসে নাস্তিক হয়ে গেলেন যে ? ঢাকাতেই নাস্তিক থাকতে পারতেন, এই ধর্ম হোক বা সেই ধর্ম, নাস্তিকের আবার ধর্ম হারাবার ভয় আছে নাকি । শুনে, তাঁর চটি হয়ে উঠলো স্পোর্টস শু ।
         আমার দু’রকম চোখ নিয়ে রাস্তায়-রাস্তায় হাঁটতে আমার ভালো লাগে আমি তখন তাকিয়ে থাকি কিন্তু দেখি না অন্য সময়ে তাকাই আর দেখি পৃথিবীর কতো-কতো শহর গ্রাম গঞ্জের পথে-পথে এই ভাবেই চকরলস কেটেছি ।
        আমাকে নিয়ে ঠাকুমা অপূর্বময়ীর অতিকথায় বলা আছে যে আমি দু’বছর বয়সে ‘কুজঝটিকা’ স্পষ্ট উচ্চারণ করেছিলুম কিন্তু  কনভেন্ট ইশকুলে ভর্তি হবার পর আর পারতুম না বলে রামমোহন রায় সেমিনারিতে ভর্তি হলে বাংলার মাস্টারমশায় এক্ষুনি নাম মনে পড়ছে না ও হ্যাঁ কর্মকারবাবু তবে  ওই ইশকুলে টিচারদের পদবি বা নামে বাবু যোগ করতে হতো ব্রাহ্মধর্মের ফিকে-রেশ হিসেবে বলেছিলেন “শব্দটা অরুন্ধুতী নয় রে অরুন্ধতী তুই কি ঘটি ” সহপাঠী তরুণ শূরকে জিগ্যেস করি ঘটি কী রে  গাণ্ডু ঘটি জানিস না পাটনাইয়া বওড়াহা ভঁয়সালোটন কোথাকার বাঙালের বিপরীত সমাস বাঙাল-ঘটি দ্বন্দ্বসমাস নীলাংশুবাবুর ক্লাসে জানতে পারবি উনি চাটগাঁর সত্যিই জীবনকে মরচে-পড়া থেকে বাঁচাতে হলে জিভে পালিশ দিয়ে রাখতে হবে ভালোবাসা এক রকমের কল্পনার অসুখ আর আমার ঠাকুমার নাম জানেন তো “অপূর্বময়ী” তাঁর শাশুড়ির নাম “মাতঙ্গিনী”। ঠাকুমার ছোটো বেয়ানের নাম বিবসনা । এমন অসাধারণ নামগুলোকে লোপাট করে দিয়েছে কসমোপলিটান আধুনিকতা ।
         তিন বছর বয়সে মহাদলিতদের পাড়া ইমলিতলার গলিতে লেত্তি দিয়ে লাট্টু ঘোরাতে শিখে যাই  হাতের তালুতে কেয়া চকরলস কাটিস হ্যায় বাঙালিয়া গিল্লি-ডাণ্ডা বা ড্যাংগুলি খেলার চেষ্টা করতে গিয়ে কপালে আলু নিয়ে ফিরি  তিন বছর বয়সেই কনভেন্টে ভর্তি হবার জন্য নটিবয় শু কিনতে গিয়ে জানতে পারি যে আমার বাঁ পায়ের চেয়ে ডান পা বড়ো পায়ের কড়ে আঙুলের পাশের আঙুল ছোটো জানতে পারি যে আঁস্তাকুড়ের দিকে একবার তাকালেই যেমন টের পাওয়া যায় তা বাতিল জঞ্জালের জমঘট  তেমনিই অনেক লোকের দিকে এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারি যে তার জীবনের গর্তে আছে শুধুই টাকাকড়ি শুধুই শুধুই ইমলিতলায় বসবাস না করলে ইমলিতলাকে জানতে পারা অসম্ভব ইমলিতলার নানা রঙের নানা কাপড়ের নানা পোশাকের তাপ্পি মারা ক্যাঁদরায় আমি মোড়া সমস্যা হল যে আমি আবার খোলের ভেতরে ঢুকে যেতে পারি না আর তো গুটিপোকা নই বদলে গেছি তবু আজও সুন্দরীদের দিকে তাকালে মন দুঃখে ভরে ওঠে । 

স্ত্রী সলিলার সঙ্গে মলয় । বিয়ের পরের দিন, ১৯৬৮ সালে

বাংলা অ্যাকাডেমিতে মলয় । দাদা, বউদি, স্ত্রী, নাসের হোসেন প্রমুখের সঙ্গে

(ক্রমশঃ) 


সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

মলয় রায়চৌধুরী


        
হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা : রবীন্দ্রনাথের দাদুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথের সমালোচনা 





হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না বিয়ের আগেও ছেলে-মেয়েরা ট্যাবলেট খেয়ে যতোবার  যতোজনের সঙ্গে ইচ্ছে সেক্স করতে পারে । ইচ্ছে মেয়েদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে ।
        তুই অতো ভাবছিস কেনো, দেখে যেতে পারিনি বটে, মেয়েদের স্বাধীনতা তো আমার জন্যেই সম্ভব হয়েছে, আমি যদি না অঢেল টাকা রোজগার করতাম, আমাদের বাড়ির মেয়ে-বউরা কি নারী স্বাধীনতা আনতে পারতো?
        হায়, রাজকুমার দেখে যেতে পারলেন না কানির বদলে মেয়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন বাঁধে ।
        তুই ভুল ভাবছিস, হুলি ।
        হায়, রাজকুমার এতো সাহসী ছিলেন হয়তো নিজেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের কারখানা বসাতেন ।
        হ্যাঁ, আমিই কারখানা বসাতুম, ওতে বিশেষ লগ্নির দরকার হয় না ।
         আমার মনে পড়ল যে বিশ শতকের সাতের দশক আমি একটা কলেজে সমাজবিজ্ঞান পড়াতুম, আমার নাম ছিল হুলিচরণ ভট্টাচার্য, স্নাতকোত্তর সিলেবাসে ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ নামে একটা বই ছিল, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড নিয়ে পৌঁছোতে মোটে এক সপ্তাহ বাকি,  আশঙ্কায়, কী করবে ঘাটে নেমে ঠিক করে উঠতে পারছিলুম না, কেননা রাজকুমারে এতো শত্তুর ছিল, তারা নিশ্চই জেটিতে এসে ব্যাগড়া দেয়া আরম্ভ করবে ।
        চোখ বুজে আঁচ করতে পারলুম, জেটির খালি-গা হেটো ধুতি বামুনগুলো আর অতিবামুন কাল্টের কোরাধুতি কাঁধে চাদর লোকেদের নির্ঘাত ভুতে পেয়েছে, জানি আমি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ডের দিকে এক ঠায় তাকিয়ে এক্কেবারে নিশ্চিত হলুম ।
          ‘ভুতবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র’ বইয়ের মন্তর মনে পড়ে গেল যা স্নাতোকোত্তরে ছাত্র-ছাত্রীদের মুখস্হ করাতুম যাতে ওরা জীবনে বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে কেউকেটা হয়ে উঠতে পারে, আইআইটি আইআইম-এ ভর্তি হতে পারে, বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশুনা করে সেদেশের মেম বিয়ে করে এদেশে মাবাপকে ভুলে যেতে পারে । জাহাজের জেটিতে পৌঁছে, যাদের ভুতে পেয়েছে, আর তাদের মগজে ঢুকে নানা উৎপাত করছে, তাদের কাছে গিয়ে চুপিচুপি এই মন্তরটা তিনবার পড়তে হবে আর ওদের শরীরে তিনটে ফুঁ দিতে হবে ।
        জেটিতে নামার পরে তো কাছ-ঘেঁষতে দেবে না ওরা, আমি যে শুদ্দুর, তাই জাহাজের কেবিনে বসেই এই মন্তরটা তিনবার পড়লুম :
ভুত কে ? আমি কে ? কে বলতে পারে ?
ভুতের সন্ধান করি বেড়াই ঘুরে ঘুরে ।
ভুতের দেখা পেলাম হেথা ।
ভুতের সঙ্গে কই কথা ।
শুনাই কানে হরেকৃষ্ণ হরেরাম ।
সজীব ছিল নির্জীব হলো শুনে রামনাম ।
ভুতের রাজা মহাদেব রাম নামেতে খেপা ।
ভুতকে ডেকে নিলেন কাছে বুকে পেয়ে ব্যথা ।
দোহাই শিবের, দোহাই রামনামের ।
জেটিতে যারা দাঁড়িয়ে থাকবে তাদের ঘাড় থেকে শিগগির যা ।
জয় ভুতনাথ জয় জয় শিবশঙ্কর ।
          মনে মনে মন্তরটা তিনবার আওড়ালুম ।
          রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড শুনতে পেলে চটে যাবেন, বলবেন তোদের এইসব ভুতপ্রেতে বিশ্বাস গেলো না, বিলেত ঘুরিয়ে নিয়ে এলাম, তবুও গেঁয়ো মুর্খ থেকে গেলি, সভ্য মানুষ হতে পারলি না ।
          না, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড সেসব কিছুই বললেন না । বয়ামে ফরম্যালিনের শরবতে হয়তো উনি এখন ঘুমোচ্ছেন, সমুদ্রের এমন ঢেউ, এমনিতেই ঘুম পায়, মনে হয় মায়ের কোলে দোল খাচ্ছি । আর ওনার তো নিজের মা ছিলেন না, যদিও সৎমা ওনাকে খুবই ভালোবাসতেন ।
         ভুত যার কিংবা যাদের ঘাড়ে ভর করে সহজে তাদের ছেড়ে যায় না । আমার মনে হতে লাগলো জেটিতে যারা হৃৎপিণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের ঘাড়ের ভুতগুলো হয়তো তাদের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, ছেলেপুলের ঘাড় থেকে নেমে তাদের ছেলেপুলের ঘাড়ে চাপবে, হয়তো কেন, নিশ্চই ঘাড়ের পর ঘাড়ে চেপে সব বাঙালির ঘাড়ে ভুতেরা ভর করেছে, তাদের আর যাবার নাম নেই, রাজকুমারকে হিংসে করার লোক কি কম আছে আজকের দিনে ? একজন আরেকজনকে হিংসে না করলে শ্বাস নিতে পারে না।

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

মলয় রায়চৌধুরী



হৃৎপিণ্ডের সমুদ্রযাত্রা : রবীন্দ্রনাথের দাদুর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্রনাথের সমালোচনা  




হৃৎপিণ্ড : আর কতো দূর হুলি ?
          আমি : আরও দুই মাস, রাজকুমার ।

         আমি এপর্যন্ত চারবার জন্মেছি, যা আমার মনে আছে, বাকিগুলো তেমন মনে রাখতে পারিনি, অ্যালঝিমারের রোগের দরুণ,  আর চারবারই আমি পাঁচের নামতায়  মারা গেছি, পঁচিশ থেকে পঁচাত্তরের মধ্যে, মানুষ হয়ে জন্মাবার কথা বলছি, হয়তো তার আগে কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ার হয়ে জন্মে থাকবো, সেসব স্মৃতি ধরে রাখতে পারিনি, কেননা কীট পতঙ্গ জন্তু জানোয়ারের পূর্বজন্মের স্মৃতি হয় কি না জানি না, আগের জন্মে কালেজে পড়ার সময়ে ডারউইন সাহেবের বই পড়ে দেখেছি তাতে উনিও কিছু লিখে যাননি ।
          আমার এখনকার জন্ম দিয়েই শুরু করি । আমি ছিলুম রাজকুমারের খাস-চাকর । উনি আমাকে হুকুম দিয়েছিলেন যেন আমি ওনাকে অন্য লোকের সামনে  হুজুর বলে সম্বোধন করি । উনি যেখানে যেতেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন, আমি না হলে ওনার গোপন ফাই-ফরমাস খাটার লোক ছিল না, সকলকে বিশ্বাস করতেন না, বলতেন ওরা সব হাফলিটারেট ইডিঅট ।
          রাজকুমারের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি ইংরেজি শিখে নিয়েছিলুম । উনি ফারসি আর ইংরেজিতে বেশ তুখোড় ছিলেন, সুতানুটি গোবিন্দপুরের বিলেতি সাহেব-মেমরাও ওনার ইংরেজি শুনে মাথা দোলাতো, নিজের চক্ষে দেখা । আফিম, চিনি, নুন, নীল, রেশম, কয়লার ব্যবসায় ওনাকে টক্কর দেবার মতন কোনো বাঙালি মাই-কা লাল ছিল না ।
          একটা মজার কথা তোকে বলি, রাজকুমারের হৃৎপিণ্ড বললেন, বাবর ওনার বাবরনামায় কতোকিছু লিখে গেছেন হিন্দুস্তান সম্পর্কে, উনি জানতেন না যে এদেশে কয়লা নামে এক রকমের পাথর মাটির তলায় পাওয়া যায় ; ওনারা কাঠকয়লার কথা জানতেন, গাছ পুড়িয়ে রান্নার জন্যে কাঠকয়লা তৈরি করতেন । আমিই তো ইরেজদের কয়লার কথা বললাম, এই বাংলার মাটির তলায় অঢেল কয়লা পাওয়া যায়, বিশ্বাসই করতে চায়নি ব্যাটারা ।
         বললুম, হুজুর, আমি এর আগে একটা জন্মে হুলিকাঞ্চন গুপ্তা হয়ে বেনের বাড়িতে জন্মেছিলুম, তখন আমরাই বাবর আর ইব্রাহিম লোদিকে মাল সাপলাই করতুম । নেড়েরা কয়লার কথা জানতো না, যুদ্ধু করতে গিয়ে ওদের কাঠ কয়লার দরকার পড়তো, সেগুলো আমরাই সাপলাই দিতুম, শুকনো আর কাঁচা মাংস, সেনাদের জন্যে মদ, আফিম সাপলাই দিতুম । শ্মশান থেকে অঢেল কাঠ কয়লা পাওয়া যেতো, শ্মশানের পাশেই আমাদের কাঠ কয়লার গুদোম খুলতে হয়েছিল ।
          হৃৎপিণ্ড কিম্বদন্তি হতে চাননি ।
          রাজকুমার ইতিহাস হতে চাননি ।
          ওনার পা ব্যথা করলে আমি অনেকক্ষণ পা-টিপে ঘুম পাড়াতুম ।
          পুরুতের পরিবার কেন ব্যবসাদার হয়ে গেল, সবাই জানতে চায় ।
          পুরুত না হয়ে কেন আমিন, মুৎসুদ্দি, সেরেস্তাদার, বানিয়ান, মহাজন, কোম্পানির দালাল, কমিশনখোর, গোমস্তা, আমলা, জাহাজের কারবারি হয়ে গেল, জানতে চায় ।
         কেন আবার ! সমাজের দেয়া চোট-জখম থেকে উচ্চাকাঙ্খার বোধ, সমাজ একঘরে করে দেয়ায় গভীর চোট-জখম, পরিবারের সদস্যদের দেয়া আঘাত, স্বদেশবাসীর রক্ষণশীলতা । সুতানুটি-গোবিন্দপুরের কোনো বামুন রাজকুমারের বাড়ি গেলে, তার জরিমানা ধার্য ছিল, সেই বামুন পুরুতদের পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে নিজের ব্রাহ্মণ পিঁড়িতে ফিরতো, বিগট, বিগট, বিগট, বিগট ! কে এক পুরুষোত্তম পীর আলি খানের রান্নাঘর থেকে  বিরিয়ানি রাঁধার খাইখাই গন্ধ পেয়েছিল, ব্যাস, কিম্বদন্তি চালু ।
         সুতানুটি-গোবিন্দপুরকে মেট্রপলিস কে বানালো ?
         মফসসলগুলোয় গথিক স্হাপত্যের জমিদারবাড়িগুলো, যা ভেঙে-ভেঙে চুনবালিসুরকির চুরো হয়ে গেছে, কার বাড়ির নকল ?
         দলপতির বিরুদ্ধতা কে করল ? রেনিগেড, রেনিগেড, রেনিগেড । দলপতির বাড়ি  থেকে নিজের বাড়ির দূরত্ব এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত আট নয় দশ করতে করতে একশো কোশ সরে গেলো।
         মেট্রপলিসের প্রথম প্রেমিকবয় ।
         হৃৎপিণ্ড : প্রেমিকবয় হওয়া ভালো, নাকি গুচ্ছের অ্যাণ্ডাবাচ্চা পয়দা করে দেশের জনসংখ্যা বাড়ানো ভালো, বল তুই ?
         আর কেউ রাজকুমারের পরিবারের পেডিগ্রির সমকক্ষ করে তুলতে পারেনি নিজের পরিবারকে ।
         রাজকুমার ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিলেন, সেই সুযোগে ওনার মাকে, যিনি রাজকুমারকে ছোটোবেলা থেকে নিজের ছেলের মতন মানুষ করেছিলেন, তাঁকে যখন গঙ্গার ধারে অন্তর্জলী যাত্রায় নিয়ে গিয়ে রাখা হল, বলেছিলেন, রাজকুমার বাড়িতে থাকলে তাঁকে এই জ্বালাযন্ত্রণা পোয়াতে হতো না, বাড়িতে নিজের ঘরেই মারা যেতাম ।
          হৃৎপিণ্ড বলল, আমার সম্পর্কে তুই যেসব গুজব শুনিস, সবই সত্যি হুলি, তুই তো আমার খাস চাকর, সবই দেখিস । হ্যাঁ, নুনের মোলুঙ্গিদের আমি চাপ দিয়ে টাকা আদায় করতুম । নিলামে পড়ন্ত জমিদারদের জমিদারি কিনে নিতুম, কড়া জমিদার ছিলুম, গরিব হলেও নীলচাষিদের রেয়াত করতুম না, কিন্তু আমার আইনি পরামর্শতেই তো যশোরের রাজা বরোদাকান্ত রায়, বাগবাজারের দুর্গাচরণ মুখার্জি, কাসিমবাজারের হরিনাথ রায়, পাইকপাড়া রাজ পরিবারের রানি কাত্যায়নি নিজেদের জমিদারির নিলাম হওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিল। আমাকে কোম্পানির কমপ্রাডর বললে আপত্তি করব না ।
        রাজকুমার চুপ করে গেলেন বেশ কিছুক্ষণের জন্যে ; সেই সুযোগে আমি ওনাকে আমার আগামি জন্মে ঘটে যাওয়া দেশভাগ, বাংলাদেশে বাঙলা ভাষার জন্যে লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ, লক্ষ-লক্ষ উদ্বাস্তুর যশোর রোডে চ্যাঁচারির চালায় ঠাঁই, সেই যশোর রোডের ছায়াকে কেটে ফেলার ঠিকেদারি, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে ভারতীয় সেনার আক্রমণ, পাকিস্তানিদের নব্বুই হাজারের বেশি সেনা ভারতের হাতে বন্দী, বাংলাদেশের গদ্দার বাহিনী রাজাকর, আল বদর, তাদের ফাঁসি আর পাকিস্তানের বিফল হয়ে যাওয়া রাষ্ট, সব গল্প শোনালুম । এখনকার বাংলাদেশে হিন্দুদের দেবী-দেবতার মন্দির ভেঙে ফেলার, বাঙালি মুসলমানদের গোঁপ কামিয়ে দাড়ি রাখার, হিন্দুদের তাড়িয়ে-তাড়িয়ে পুরোদেশটাকে নেড়েভূমি করার ঘটনা বললুম ।
        হৃৎপিণ্ড বলল, জানিস, কখনও ভাবিনি যে বাঙালিদের দেশটা পাকিস্তানের মতন একটা ফেলমারা এলাকা হয়ে যাবে, ইউরোপিয়রা যাকে বলে ফেইলড স্টেট ।
         আমি তো পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে কতো কমপ্রাডরকে দেখেছি, চীনের ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, রাশিয়ার ঘুষ খেয়ে দালালি করতো, তারাও তো বেনিয়ান, রেনিগেড, ভিনদেশের দালাল, সব ভোঁভাঁ, হামবড়াই ফুসকি, দেয়ালে লেখালিখি ফুসকি, দলপতি ফুসকি, দল ফুসকি ।
         আমিও যে একটা জন্মে প্রেমিকবয় ছিলুম, তা আর রাজকুমারকে বললুম না, মনে হবে ওনার সমকক্ষ হবার চেষ্টা করছি, প্রেমিকবয় মানে সেকেলে লোকেরা যাকে বলে দুশ্চরিত্র হওয়া, এই যেমন যারা চিরকুমার আর শাকাহারি তারা নিজেদের মনে করে সাত্বিক, তারা যদি কাউকে মদমাংস খেতে দেখে, বউ ভাড়ার কোঠায় যেতে দেখে, রেসের মাঠে যেতে, জুয়ার আড্ডায় যেতে, নাইট ক্লাবে গিয়ে নাচতে, কিংবা বছরে বছরে প্রেমিকা বদলাতে দেখে, তাদের মনে করে তামসিক, সোজা বাংলায় চরিত্রহীন, আমি তা-ই ছিলুম । দুর্গাপুরের বড়ো রাস্তায় মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলুম, সেই যে জায়গাটা দুর্ঘটনার জন্যে তৈরি হয়েছে, ফি বছর দুচারটে গাড়িতে মানুষ থেঁতো হয় ।
         দুশ্চরিত্র জীবনে, আমার নাম হুলিই ছিল, পদবি ছিল শিট, পদবিটা আমার পছন্দ ছিল না, শিট মানে তো গু, তাই আমি সবাইকে নিজের পরিচয় দিতুম হোলি শেঠ  নামে ; বাবা হুমকিপতি দলদাস ছিলেন, প্রচুর টাকাকড়ি গ্যাঁড়াতে পেরেছিলেন,  তোলাবাজি কমিশন ঠিকেদারি দালালি ঘুষ সিণ্ডিকেট থেকে, বাড়ির ওয়াশিং রুমের দেয়ালে যে আলমারি ছিল তা বাইরে থেকে দেখে টের পাওয়া যেতো না, রিমোট দিয়ে খুলতে হতো, সোনার বিস্কুটও সেখানেই রাখা থাকতো । আমি তখন বাঙালি গেস্টাপো গুণ্ডা-ক্যাডারদের পুষতুম ।
          আমার সম্পর্কে এক মহিলা, যার সঙ্গে কিছু দিনের প্রেমিকবয় সম্পর্ক পাতিয়েছিলুম, কমপ্লিকেটেড, সে আমার সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখে রেখে প্রচুর কোকেন নিয়ে  বাথটবে চান করার সময়ে ডুবে মারা গিয়েছিল :
          “হে ভগবান, কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই ।
          “হে ভগবান, হীরের আঙটি পরিয়ে আটকে রেখেছে ।
          “হে ভগবান, কিনারায় নিয়ে গিয়ে রেখে দিয়েছে ।
          “হে ভগবান, আমিই একমাত্র নই ।
          “হে ভগবান, ছেড়ে চলে যাওয়া যে সম্ভব হচ্ছে না ।
          “হে ভগবান, এ যে এক নম্বরের ফ্লার্ট ।
          “হে ভগবান, কাজকর্ম ব্যবসা দেখার এর আগ্রহ নেই ।
          “হে ভগবান এর যে কী কাজ আর কী ব্যবসা তাও জানতে পারলাম না এতো দিনে ।
          “হে ভগবান, সম্পর্কের বনেদ কেবল যৌনতা ।
          “হে ভগবান, এ যে ঢ্যাঙা ফর্সা রূপবান জলের মতন টাকা খরচ করে ।
          “হে ভগবান, এর কাজের সঙ্গে কথার মিল নেই ।
          “হে ভগবান, এ মূল প্রশ্নের উত্তর দেয় না, এড়িয়ে যায় ।
          “হে ভগবান, এর বাড়ির চাকরানি এতো সুন্দরী যে চাকরানি বলে মনে হয় না ।
          “হে ভগবান, এ যে সব সময়েই নিখুঁত ।
          “হে ভগবান, এর সব সময়েই এতো তাড়া কেন যে ।
          “হে ভগবান, এ রোজই একটা ফুলের তোড়া পাঠায়, সঙ্গে হাল আমলের গানের ক্যাসেট ।
          “হে ভগবান, এ প্রতিদিন নতুন পোশাক পরে থাকে, নতুন পারফিউম লাগায় ।
           এই সব ভাবতে ভাবতে রাজকুমারের বন্ধুনি কবি ক্যারোলিন নরটনের কথা মনে পড়ছিল আমার, অপরূপ সুন্দরী, রাজকুমারকে ভালোবাসতেন । বজরায় ওয়াল্টজ, কোয়াড্রিলো, গ্যালপ নাচতেন দুজনে । ক্যারোলিনের বরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল, তালাক নয়, এমনিই ছাড়াছাড়ি, ক্যারলিন লর্ড মেলবোর্নের সঙ্গে ইশক ওয়ালা মোহব্বত করতো,  তা ধরে ফেলেছিল ওর বর, ফলে ছাড়াছাড়ি, ছাড়াছাড়ির দরুন ক্যারোলিনের টাকাকড়ির এমন খাঁকতি পড়েছিল যে রাজকুমার মণিমুক্তো বিলিয়ে দেন শুনে আঁকড়ে ধরেছিল, রাজকুমারকে ফুসলিয়ে অনেক সোনাদানা আদায় করতে পেরেছিল ।
          রাজকুমার মারা যেতে মনের দুঃখে ক্যারোলিন একখানা কবিতা লিখেছিল, ‘আমার হৃদয় এক শুকনো বাদামশিরোনামে, তার গদ্য করলে এরকম দাঁড়ায় :

আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো
          ফাঁকা খোলের ভেতরে ঝুমঝুমির মতো বাজে
তুমি আমার বুকের ভাঁজ খুলে তার ভেতরে রাখতে পারবে না
          তাজা কোনো জিনিস যা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে
আশা আর স্বপ্নে ভরা ছিল এক সময় যখন
          জীবনের বসন্তগৌরব আমার দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে
বিদায় নিয়েছে আজ সেখানে আনন্দ নেই দুঃখ নেই
         আর শুকনো হৃদয় কখনও উদ্বেলিত হবে না

আমার জীবন এক শুকনো বাদামের মতো
          এক সময়ে প্রতিটি স্পর্শে জেগে উঠতো
কিন্তু এখন তা কঠিন ও বন্ধ হয়ে গেছে
          আমি তার হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করতে পারবো না
প্রতিটি কন্ঠস্বরের আলো  আমার ভ্রুপল্লবকে কাঁপাতে পারতো
          প্রতিটি মৃদু বাতাসে দুলে উঠতো গাছের ডাল
যে ডালে রোদের আলোয় দোল খেতো বাদামফল
          এখন তা শীতে আক্রান্ত, আমার মতো কঠিন আর দুঃখী

আমার হৃদয় এক শুকনো বাদামের মতো
          যে দেখতো সে-ই আকর্ষিত হতো এক সময়
কিন্তু যবে থেকে দুর্ভাগ্য আমাকে ভেঙেচুরে দিয়েছে
          তেতো হয়ে গেছে মুখের স্বাদ গন্ধ
তার চঞ্চল যৌবনের নতুন পরাগ
          শেষ হয়ে গেছে আর ফিরবে না কোনোদিন
আর আমি অনুভব করি আমার দুঃখী হৃদয়ের সত্য
         রোদ নেই, হাসি নেই, যা আমাকে ঔজ্বল্য দেবে ।

         চাকরদের মুখ তুলে অতিথিদের দিকে তাকানো অনুচিত, তবু আমি ক্যারোলিন নর্টন এলেই ওনার দিকে তাকিয়ে দেখতুম, কী ফর্সা গোলাপি চেহারা, এখানের মেমরা কেউই ওনার মতন বুকের খাঁজ দেখানো পোশাক পরে না, আমি আড়চোখে খাঁজের দিকে তাকাতুম, বুকের পুঁইমেটুলি দেখতুম ।
          চাকরের দুর্বলতা শোভা পায় না, আমি বেশ দুর্বল বোধ করতুম, ওনাকে চোখ বুজে কল্পনা করতুম চান করার সময়ে । জমিদার আর কোম্পানি বাহাদুর ছাড়া মেমদের ছোঁয়াও অপরাধ, তবু আমি ছলছুতোয় ছুঁতুম ওনাকে, ফুলের তোড়া দেবার সময়ে, মদের গ্লাস এগিয়ে দেবার সময়ে ।  
          বিদেশিনীরা রাজকুমারকে ভালোবাসতেন বলে, বিদেশে গিয়ে নানা রকমের মাংস খেতেন বলে, সুতানুটি-গোবিন্দপুরে ওনাকে বামুনরা সমাজের বাইরে একঘরে করে দেবার তাল করেছিল, ওনার বাড়ির মেয়ে-বউরা যদি ওনাকে ছুঁয়ে ফেলতো,  তাহলে তারা গঙ্গাজলে চান করে পবিত্রতা ফিরে পেতো, রাজকুমার পবিত্রতার কেয়ার করেননি, বাড়িতে বৈঠকখানাঘর তৈরি করে সেখানেই থাকতেন, বন্ধুবান্ধবরা আর ব্যবসার লোকরা, দেশি হোক বা বিদেশি, সেই ঘরেই দেখা করতো, আরাম কেদারায় বসে হুঁকো টানতো ।
           রাজকুমার মারা যাবার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রতিদিন ক্লিভল্যাণ্ডের ডাচেস এসে ওনার সঙ্গে সময় কাটাতেন ।
           হৃৎপিণ্ড বহুক্ষণ চুপ করে ছিলেন, হয়তো সমুদ্রের ঢেউয়ের দোল খেতে খেতে শৈশবের কথা ভাবছিলেন, সৎমায়ের আদর-যত্নের কথা ভাবছিলেন, হঠাৎ বলে উঠলেন, বুঝলি হুলি, তুই যেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করিস, আমার বড়োছেলেও তেমন ম্যাজিকে বিশ্বাস করে, মঙ্গলকাব্যের কবিরা যেমন স্বপ্নাদেশ পেয়ে কবিতা লিখতেন, আমার বড়োছেলেও তেমন স্বপ্নাদেশ পায়, কোথা থেকে জ্ঞানের কাগজ ওর হাতে উড়ে এসে পড়ে, আর ও নিরাকার ব্রহ্মের খোঁজে লীন হয়ে যায়, তখনই  ব্রহ্ম ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপতে থাকে, ব্যবসা লাটে উঠিয়ে দিলে ।
          রাজকুমার রোমে গিয়ে পোপের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে গিয়ে রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, লণ্ডনে থ্যাকারে আর চার্লস ডিকেন্সের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্যারিসে ম্যাক্সমুলারের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন  এই দেখা করার কায়দা ওনার কাছ থেকেই তো শিখেছিলেন ওনার ছোটো নাতি ।
          আমি বললুম, হ্যাঁ, রাজকুমার, জানি, ব্রহ্ম ব্রহ্ম জপে জপে আলাদা স্বর্গে গেলেন  বিষয়সম্পত্তিকে উনি মনে করতেন বিষ, মন বিষিয়ে দেয়, অনেক লোককে জড়ো করেছেন ওনার অতিবামুন কাল্টে । ওনার সময় থেকেই দিকে দিকে ভদ্রলোক বিয়োবার যুগ আরম্ভ হলো । বাঙালি আর ব্যবসাবাণিজ্য করবে না, কারখানা খুলবে না, শুধু ভদ্রলোক হয়ে কেরানিগিরি করবে । আপনার সময়ে উনিশ শতকের আশির দশক আর নয়ের দশকটুকুই বাঙালির এগিয়ে যাবার সময় ছিল, কেরানি হবার আর সরকারি চাকুরে হবার দৌড়ঝাঁপ ছিল না, শুধু আপনার ছোটোছেলে ওই লাইনে চলে গিয়েছিলেন ।
         হৃৎপিণ্ড বললেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, হ্যাঁ, আধ্যাত্মিকতাই এখন বাঙালির ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
         আমি বললুম, এই আধ্যাত্মিকতা আপনার সময়ের আধ্যাত্মিকতা নয় । এই আধ্যাত্মিকতার কোনো দার্শনিক বনেদ নেই । দিকে-দিকে আকাট গুরুদেবের ছড়াছড়ি, গেরুয়া পোশাক পরে মাফিয়ারা বোকাদের ঠকিয়ে বিরাট বিরাট দল তৈরি করে সরকারি জমিজমা দখল করছে,  আর সেখানে মন্দির গড়ে মেয়েদের ফুসলিয়ে ধর্ষণ করছে । প্রতিদিন তার বিজ্ঞাপনও বেরোচ্ছে কাগজে, বাড়ি-বাড়ি হ্যাণ্ডবিল বিলি করছে তারা । এমন বাঙালি আর দেখতে পাবেন না যার হাতের আঙুলগুলোয় গ্রহরত্নের গোটা পাঁচেক আঙটি নেই, গলায় কিংবা বাহুতে মাদুলি নেই  
          হৃৎপিণ্ড বললেন, আমি সারাজীবন এই গুরু ব্যাপারটার বিরোধী ছিলাম, আমার কোনো গুরুর দরকার হয়নি, নিজে ঠেকে শিখেছি, নিজে নিজের রাস্তা গড়ে তুলেছি ।
          আমি জিগ্যেস করলুম, রাজকুমার আপনি শনিদেবতার নাম শুনেছেন ?
          হৃৎপিণ্ড বললেন, শুনেছি, কখনও শনিদেবতার পুজো হতে দেখিনি বা শুনিনি, আমার জমিদারিতে কতো চাষি থাকতো, বিপদে পড়তো, আমি তাদের চাপ দিয়ে পাওনা আদায় করতাম, তবুও তো তারা শনি নামে কোনো দেবতার আশ্রয়প্রার্থী হয়নি ।
         বললুম, আপনি জানেন না, মোড়ে-মোড়ে রিকশা স্ট্যাণ্ডে এখন শনি মন্দির, নাস্তিক মার্কসবাদীরা বসিয়ে দিয়ে চলে গেছে, এখন গান্ধিবাদীরা তাদের কাছ থেকে ফি-হপ্তায় চাঁদা তোলে । রিকশাস্ট্যাণ্ডগুলোয় আর মোড়ে মোড়ে আরেকটা পুজো হয়, বিশ্বকর্মা পুজো, আপনি জাহাজের মালিক হয়ে যে পুজো করেননি,  এখন কেউ  রিকশা টানলে বা কোনো সাঁড়াশি  নিয়ে কাজ করলেও লাউডস্পিকার বাজিয়ে পুজো করে, ইয়ে দুনিয়া পিত্তল দি, হো বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, হো মেরে হুস্ন দে কোনে কোনে দি, বেবি ডল ম্যায় সোনে দি, জয় বাবা বড়োঠাকুর, তুমি ঠাকুরদের মধ্যে সবচে বড়ো, পেন্নাম হই 
         হৃৎপিণ্ড জানতে চাইলেন, শরবতের বয়ামের দেয়ালে এসে, হ্যাঁরে, লাউডস্পিকার কি জিনিস, স্টিম ইঞ্জিনে চলে ?
        বললুম, না রাজকুমার, বিজলিতে চলে, তার ভেতরে একহাজারটা ষাঁড়ের গলার আওয়াজ লুকোনো থাকে, কেউ কোনো কথা বাজালে কিংবা গান করলে, সেই ষাঁড়েরা মানুষের মাথার ওপরে চেঁচাতে চেঁচাতে উড়তে থাকে। যে গান গায় বা বক্তৃতা দেয় তাকে তখন পাগলা ষাঁড় বলে মনে হয় ।
         হুলি, তুই কি বলতে চাইছিস, ওগুলো আমার বড়ো ছেলের প্রভাবের কুফল ? জিগ্যেস করলেন হৃৎপিণ্ড ।
         বললুম, একবার আধ্যাত্মিকতার গাড়ি চালিয়ে দিলে স্পেনের ধর্মধ্বজাধারীরা যে পথে সমাজকে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথেই সমাজটা দৌড়োতে থাকে, গড়াতে থাকে, জানেন তো । স্পেন ওই ধ্বজাগুলো লাতিন আমেরিকায় নিয়ে গিয়ে পুঁতেছে আর সেখানকার মানুষদের হতভাগ্য করে দিয়েছে, দক্ষিন আমেরিকা হয়ে গেছে উত্তর আমেরিকার চেয়ে গরিব ; এখন উত্তর আমেরিকা ভাবছে দক্ষিণ আমেরিকার লোকদের আসা বন্ধ করতে দেয়াল তুলবে ।
         হৃৎপিণ্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ফরম্যালিনের শরবত দুলে উঠল, বললেন, আমেরিকায় যাবো ভেবেছিলুম, কিন্তু তার আগেই মারা গেলুম রে ।
          আমি আমার বাকি কথাগুলো বললুম, আপনি বলুন না, এসব এলো কোথা থেকে, এই যে শীতলা পুজো, মনসা পুজো, কার্তিক পুজো, আরও কতো অজানা অচেনা দেবীদেবতার পুজো ? মাঝ রাস্তার ওপরে, লোকের বাড়িতে ঢোকার দরোজা বন্ধ করে, নর্দমার ওপরে পাটাতন পেতে, খেলার মাঠে খুঁটি পুঁতে ? বাজারগুলোয় লাটে-লাটে মূর্তি বিক্রি হয়, দরাদরি হয় ।
          কিন্তু আমার বড়োছেলের প্রভাব তো কবেই মুছে গেছে, টিকে আছে শুধু আমার নাতির গান, বললেন হৃৎপিণ্ড, আর সবায়ের নামে লেজুড় হিসাবে নাথ আর ইন্দ্র জুড়ে দেবার রেওয়াজ ।
          ঘণ্টাখানেক পরে রাজকুমার বললেন, কার্ল মার্কস লিখে গেছেন যে চিরস্হায়ী বন্দোবস্তের কারণে বাঙালিদের পুঁজি ব্যবসাবাণিজ্য আর শিল্পোদ্যোগ থেকে জমিজমায় নিবেশের  দিকে চলে গিয়েছিল ; আমি তা নিজের জীবন দিয়ে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছি । আমি যেমন বেশ কয়েকটা জমিদারির মালিক ছিলাম, তেমনি ব্যবসাবাণিজ্যও করেছি, ব্যাঙ্ক খুলেছি, জাহাজ চলাচল শুরু করেছি,  খবরের কাগজ শুরু করতে সাহায্য করেছি, মেডিকাল কলেজ শুরু করার চেষ্টা করেছি, বিলেতে যাতে ভারতীয়রাও পার্লামেন্টে সিট পায় তার চেষ্টা করেছি, আরও কিছুকাল বেঁচে থাকলে দেখতিস গঙ্গায় স্টিম ইঞ্জিনের স্টিমার চলতো, বর্ধমান থেকে কলকাতা রেলগাড়ি চলতো, কলকাতায় জাহাজ তৈরির কারখানা বসাতাম, স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে যে-যে কারখানা বসানো যায় তার চেষ্টা করতাম ।
            আমি বললুম, হুজুর, কার্ল মার্কস তো আর জানতো না যে বাঙালিবাবু আর বাঙালি ভদ্রলোক নামে একরকমের জীব জন্মাবে যারা আস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো-কালীপুজোয় পুরুতকে নাচতে বলবে, নিজেরা ধুনুচি নাচ নাচবে, মিষ্টি দই খেয়ে ডায়াবেটিসে ভুগবে, আর বলবে যে এটা ধর্মবিশ্বাস নয়, এটা হলো গণতন্ত্রে মানুষের কৌম আনন্দ ।
          রাজকুমার বললেন, আমিই তো আমার পরিবারের পুরুতের বাংলা পদবিকে ইউরোপীয় করে তুলেছিলাম ; সেই পদবি নিজেদের নামে লেজুড় হিসেবে সেঁটে পরের প্রজন্মে সবায়ের কতো গর্ব দেখেছিস তো ? উপযোগীতাবাদ, খোলা বাণিজ্য, প্রবুদ্ধ করে তোলার উদ্যোগ, স্বাধীনতাবোধ, একেশ্বরবাদে বিশ্বাস, এসব আমিই তো এনেছিলাম।
          আমি শুনছিলুম রাজকুমারের কথা, তার দুশো পঁচিশ বছর পরে দুনিয়ায় যা ঘটছে তা জানিয়ে ওনাকে ওয়াকিবহাল করতে চাইলুম, বললুম, যে পথে আপনার জাহাজ গিয়েছিল, সেপথে এখন জোর যুদ্ধু চলছে, মোচরমানরা দলাদলি করে কার ব্যাখ্যা কার চেয়ে বড়ো প্রমাণ করার জন্যে নিজেদের মধ্যে লড়ে মরছে, মিশর আর পাশাদের দেশ নয়, মিলিটারির দেশ, সেখানে খ্রিস্টানদের গির্জায়, খ্রিস্টান ছাত্রছাত্রীদের বাসে  বোমা মারছে মোচোরমান ধর্মের মানুষ, যতো বেশি পারে খুনোখুনির রেশারেশি চলছে ।
         আমার মনে পড়ল যেঅপরবলতে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যে অর্থগুলো পুরোনো বাংলা কাব্য থেকে যোগাড় করেছেন, তার মানে অন্য, ভিন্ন পৃথক, ইতর, অর্বাচীন ,নিকৃষ্ট, অশ্রেষ্ঠ, বিজাতীয়, অন্যজাতীয়, প্রতিকূল, বিরোধী, শত্রু ইত্যাদি । অথচ উনি লিখেছেন যে অপর বলতে আত্মীয় স্বজন মিত্রও বোঝাতো ।
           শত্রুও আবার মিত্র ।
          একই শব্দের যে এরকম উলটো মানে  হতে পারে তা ইংরেজি-শেখা বাঙালিরা ভুলে গেছে । ইংরেজি শেখা বাঙালিরা নিজেদেরই ভুলে গেছে । মার্কস এঙ্গেলস লেনিন মাও তারা ইংরেজিতেই পড়েছে, বাংলায় অনুবাদ করে চল্লিশ বছর আগে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে বিক্রি হতো সেসব বই । যারা বিক্রি করতো তারা সকলেই পেল্লাই বাড়ি তুলে ফেলেছে, গাড়ি হাঁকাচ্ছে, আর বই বিক্রির স্টল খোলে না, অপমান বোধ করে ।
         একটা জন্মে যখন আমি সংস্কৃতের শিক্ষক ছিলুম তখন জেনেছিলুম, ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে অপর ভাবনার কিছু মিল আছে । উপনিষদ বলছে, ব্যক্তির নিজস্ব বা অহংবোধ বহু কিছুকে অবলম্বন করে গড়ে ওঠে । আত্মন বলতে যদিও নিজেকেই বোঝায়, কিন্তু শুধু এইটুকু বললে তার যথার্থ সংজ্ঞা নির্দেশিত হয় না । আত্মন এমন এক অস্তিত্ব যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র পরিব্যপ্ত । এই জায়গা থেকে উপনিষদ চলে গেছে অদ্বৈত দর্শনের দিকে ।
         আশ্চর্য যে মানুষ নিজেকে মাপে বড়ো করে আর অপরকে মাপে ছোটো করে । এক পক্ষের অপর তৈরি হয় অপর পক্ষের অপরকে বাদ দিয়ে । অপরীকরণে তারাই সক্রিয় পক্ষ যাদের হাতে নির্ণায়ক ক্ষমতা থাকে । অপরীকরণে এক পক্ষ নিজ, আরেক পক্ষ অপর । এই নিজ যতোই ব্যক্তির সত্বা হোক, তার মূলে আছে সমাজ । মানুষ নিজের সমাজ, ও সম্প্রদায়ের সংস্কার, বিদ্বেষ, ভীতি, পছন্দ-অপছন্দ, ক্ষোভ, আশা-নিরাশা, ধর্মচেতনা, ন্যায়-অন্যায়বোধ, ঘৃণা-লালসা, পুরোনো ইতিহাস, বন্ধুতা-শত্রুতা, রাজনীতি দ্বারা সব সময়েই প্রভাবিত হয় । সমাজ মানুষকে যে-ছাঁচে গড়ে তোলে, সে তারই আকার নেয় । পরিবার, পরিবেশ, নানা রকমের মিডিয়া, সভা-সমিতি, সরকার, রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সঙ্গঠন, শিক্ষাব্যবস্হা, রাজনৈতিক আর সামাজিক মতবাদ, হুজুগ, ধর্মীয় উন্মাদনা, এ-সবেরই কিছু-না-কিছু ছাপ পড়ে তার ওপর -- চেতনা-অবচেতনার নানা স্তরে তা ছড়িয়ে পড়ে ।
         আমি তো শুদ্দুর, তাই বাদ দেয়া অপর ।