সিলভিয়া ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সিলভিয়া ঘোষ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

সিলভিয়া ঘোষ

অভ্যাস বদল
--------------------

 সিলিং ফ্যানের গুলোর গায়ে লেগে আছে   কত জন্মের ধুলো, মাকড়সার জাল বিস্তার  করেছে দেওয়ালে টাঙানো পুরস্কার প্রাপ্ত ফটোগুলির গায়ে।
        তবে আগেও কি  সব এমনই ঝাঁ চকচকে ছিল ?না তা কখনই নয়, কিন্তু যে জিনিসটা ছিল তা খুঁজে  বেড়ায় অনন্য রায়।
   ইলেভেনে পড়া যে মেয়ে বেলা ৯ টার আগে ঘুম থেকে ওঠেনা,  সেই  কি না আজ সকাল  থেকে রান্না ঘরে ! অন্তরা  রান্না করে এনে দিচ্ছে  বাবা ,দাদা কে! মায়ের হাতে সকালের খাবার  খেতেই  যে ছেলেটা আজীবন অভ্যস্ত, সে মুখটা হা করেই বলে ওঠে,  'অনু  একদম  দূরে  সরে যা, কেমন গা গুলিয়ে উঠছে,  আমি খেতে পারব না'!  কথা শেষ হতেই বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্টুডেন্ট অন্তর।
           আপাত দৃষ্টিতে যিনি উদাসীন, শান্ত, বেখেয়ালী মানুষ, মিনিটে মিনিটে  চা চাওয়া যার বাতিক, তিনি কেবল ঘরময় ছড়িয়ে  ছিটিয়ে থাকা শাড়ি,  ব্লাউজ , নাইটি,  চুরিদারে হাত বুলাচ্ছেন  আর নাকের কাছে সব ধরে নিয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিচ্ছেন  যা  একসময় অভ্যেস ছিল অনন্যার। তার স্ত্রীর।
        বারো বছর বিছানায় পড়ে থাকা একটা প্রাণ যার সঙ্গী ছিল চব্বিশ ঘণ্টার , ঐ ফ্রেমে বাঁধানো মানুষ টা, যে কি না এক আধদিন বিছানা নোংড়া হলে বলে উঠত 'আর কতদিন এভাবে জ্বালাবেন,  এবার মুক্তি দিন'..তারও দুচোখের গোড়া দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। মনে মনে বলেন ভগবান আর কথা নিষ্ঠুর হবে তুমি! মা হয়ে  লক্ষ্মীহীন ছেলের সংসারে জঞ্জালের মতোন পড়ে আছি অথচ আমার ঘরের লক্ষ্মী কে তুমি এভাবে কাছে টেনে নিলে! আমার মুক্তি আর কবে দেবে...!
ঠাকুর ঘরের লাল সাদা গরদের শাড়ীটা থেকে এখনও ধূপ ধূনোর গন্ধ বের হয়। মাঝে মাঝে  অরণ্য বাবু সকলের দৃষ্টিগোচরে তার ঘ্রাণ নিয়ে থাকেন। টের পান যেন পাশেই স্ত্রী অনন্যা রয়েছেন।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯

সিলভিয়া ঘোষ


#অভিমান



অফিস থেকে ফিরেই মনামী পাঁচ বছরের ছেলের সারাদিনের দুষ্টুমি, বায়না,  অপকর্মের কথা বাবার মুখ থেকে শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে  ছেলের স্কুল ব্যাগের থেকে ডায়েরিটা বের করেই মাথায় হাত দেয়। আগামী কালই  গার্ডিয়ান কল  হয়েছে। কিন্তু কাল যে  ইউনিয়ন মিটিং আছে  অফিসে।  না গেলে এবার চাপ হবে।  উমাপতি বাবু এবার সবাই কে বলে রেখেছেন মিটিং এ না এলে পরবর্তী কালে কোন রকম  সমস্যায় সাহায্য করবে না ইউনিয়ন।  এদিকে জরুরী  গার্ডিয়ান মিটিং কেন ডাকলো সে টেনশনে মনামী ছেলে কে ধরে বিভিন্ন রকম ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগায়,  প্রণবেশ ( মনামীর বাবা)  মেয়ে কে বারে বারে বোঝানোর চেষ্টা করেন ঐভাবে বকাবকি  করলে হবে না  বরং খেলার ছলে গল্পের ছলে ওর  কথাগুলো জানার চেষ্টা করতে হবে। মনামীর  কোন উপদেশই মাথায় কাজ করছেনা।  এটুকু ছেলে যে কতটা অবাধ্যতা করতে পারে  সেটা বাড়িতে দেখেই  সে বুঝেছে। সে রকমই নিশ্চয় স্কুলেও এমনটাই করে... 
    তিতান  বাড়িতে  এটা তুলছে,  ওটা ভাঙছে, জল ঘাটছে , দাদুর সাথে কুস্তি করে দিন কাটাতেই ভালোবাসে।  একটা জিনিস  লক্ষ্য  করেছে  মনামী, তিতান যেন তাকে সহ্য করতে পারছেই না। সারারাত আজেবাজে স্বপ্ন আসে  ঘুমের মধ্যে মনামীর। সকাল হতে না হতেই ফোন করে তিতানের ক্লাস টিচার কে,  জানতে চায় কতটা দরকার আজকের মিটিং টার। ক্লাস টিচার  সুদেষ্ণা রায় একটু যেন অসুন্তুষ্ট হয়েই বলেন "না এলে জানবেন কি করে ছেলে কি করছে না করছে? শুধু মাসে মাসে টাকা ফেলে দিলেই তো আর  বাচ্চা মানুষ হয় না! তাকে সময়ও দিতে হয়।" কথাটা শেষ হতে না হতেই  ফোনটা কেটে দিল মনামী। আজকাল এতটুকু জ্ঞান নিতে পারেনা সে।  অফিসে কানাঘুষো তাকে নিয়ে আলোচনা চলে সেটা অভিষেকই  প্রথম জানিয়েছিল।  মনামী জানে পরিবারের সবাই তার আড়ালে  তাকে নিয়েই ঠাট্টা তামাসা করে তবুও সব সহ্য করে সে একজনের মুখের দিকে চেয়ে।   সেই ছোট্ট তিতান কে মাথায় রেখেই আজকাল  সব কিছু মানিয়ে নিয়েছে  সে। তবুও... 
        
        স্কুলে যেতেই  হবে জেনে মনামী  তাড়াতাড়ি  ছেলের পুলকারেই চলে গেলো স্কুলে। ক্লাস টিচার বললেন একটু  ব্যক্তিগত কথা জানতে চাইছি আপনার কাছে, তার কারণ বাচ্চার উপর তার পরিবেশের প্রভাব পড়ে বেশী তাই।  তিতান  এমনিতে নরম্যাল কিডস তবুও ওর মধ্যে কিছু কিছু অ্যাবনর্মালিটি আছে। যেমন এক জায়গায় বসে না সে কখন,  অন্য বাচ্চাদের বাবাদের সাথে আসতে যেতে  দেখলেই ও তাদের সাথে মারামারি  করতে  উদ্যত হয়। এর কারণগুলো জানা দরকার। 
       ঘণ্টার  শব্দে  বাইরে বেরিয়ে আসে মনামী। মনে মনে ভাবে হায়রে জীবন!  যে বিশ্বাসঘাতক , লম্পট,  মাতালের  জন্যে  পালিয়ে এলাম   কলকাতার মায়াবী আলো ছেড়ে  এত দূরে ছেলে মানুষ করতে,  আজ সেই ছেলের  মনেই এতটা অভিমান জমা হয়ে আছে তার  মায়ের প্রতি,  না কি হারিয়ে যাওয়া বাবার প্রতি !  যাকে  মনামীও ভুলতে চায়  রোজ রাতে  বালিশের মধ্যে রাখা  শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ লাগানো   (নির্ঘুমভাবে আগলে রাখা)  একটা ছুরির বিনিময়ে... 


চিত্র সমরেন্দ্র মণ্ডল 

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

সিলভিয়া ঘোষ




গুচ্ছ অণুগল্প



(১)  ড্রয়িং খাতায় আঁকা নতুন ছবিটা দেখানোর জন্যে ডান  হাতে করে অধীর আগ্রহে  অপেক্ষা করছে পাঁচ বছরের  ছোট্ট সালমা, বন্ধু সুনেত্রার জন্যে।  বাঁ হাতটা টনটন করছে।  ব্লাড চলছে যে।  বড় হয়ে সেও বন্ধুর  মতোন  হবে।  হাসি খুশিতে ভরা থ্যালাসেমিয়া ডাঃ সুনেত্রার দেওয়া ড্রয়িং খাতায় সেই ছবিটাই এঁকেছে সে। 

(২)  মেয়ে কে  পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে শিখিয়ে দিয়েছেন যশবিন্দর।  সেই কথা অনুযায়ী  পরিণতি   ঐ 
ইজি রিভলভিং চেয়ারটাতে বসে থাকা বৃদ্ধের পা ছুঁতে-ই  সম্বিত ফিরে পেলেন  ডাঃ চক্রবর্তী। তার হাতে তৈরী 
 প্রথম টেস্ট টিউব বেবী যশবিন্দরের মুখের আদলটা হুবহু কেটে বসিয়ে দিয়েছেন  ভগবান তার  মেয়ে পরিণতির শরীরে।  জীবনে প্রথম টেস্টটিউব বেবীর অাত্মজার  মুখোমুখি  তিনি।

(৩) ভিড় লাইন ঠেলে এর ওর সাথে মতানৈক্য করতে করতে  গ্রামের সরকারি  ডাক্তারখানার ভাঙা  টেবিলের  সামনে  যে মহিলা  এগিয়ে  এলেন অর্থোপেডিক্স সার্জেন ডাঃ সব্যসাচী ঘটকের সামনে তাকে চিনতে এতটুকু ভুল করলেন না ডাক্তার বাবু। কুড়ি বছর  আগে এই  টেবিলেই  প্রসূতি নীলোফারের ক্রিটিক্যাল  ডেলিভারি কেস যে তাকেই সামাল দিতে হয়েছিল প্রতিকূল পরিবেশে। মুখ তুলে চোখের ইশারায়  জিগ্যেস করলেন কি দরকার? নীলোফার একটা কার্ড রেখে বললেন মৃণালের বিয়েতে আপনাকে  আসতেই হবে ডাক্তার বাবু। তার আগে মৃণাল আর তার হবু স্বামী রাজার একটা রক্ত পরীক্ষা করাতে চাই  আপনার হাসপাতালে। 'মৃণাল' নামটা যে ডাঃ ঘটকেরই দেওয়া, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট এক প্রতিবাদী চরিত্র। ডাক্তার বাবুর চোখে জল

সোমবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৮

সিলভিয়া ঘোষ


সরেজমিনে


সকাল থেকেই দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে  পার্বতী নিবাসে। বাড়ির কর্তার তো কোন হুঁশ নেই । সব দায় শেষ  মুহূর্তে বাড়ির কর্ত্রীর উপর  এসে পড়ে।  আর তাতেই শুরু হয়  এই  কাণ্ড। যাকে নিয়ে হৈ চৈ  সে ব্যক্তির  সাড়া শব্দটিও  পাওয়া যাচ্ছে না । তাতেই মাথা গরম হয়ে গেছে বাড়ির গিন্নির। 
    'গণশা...এই গণশা...  বলি গেলি কোথায়?  ডেকে ডেকে অপদার্থ গুলোর টিকি পাওয়া যায় না বাছা!  এরা কি মা বাপের ডাকেও সাড়া দেবে না?  বলি,  আমরা তো মরি নি গজু,   একটু মুখ খুলে উত্তর নিতে কতটা কষ্ট হয় শুনি?  না কি  কাল রাত থেকেই  বারকোষের কাছে হত্তে দিয়ে পড়ে আছিস বাছা ...'
মায়ের এরকম রুদ্র মুর্তি দেখে সার সার দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে গেছে বাকী সন্তানেরাও! মা যেন গণশা কে হাতের কাছে  না পেলেই এদের কেই প্রায় এক হাত নেবেন... ঠিক সেই সময় মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে গণশা এসে দাঁড়াতেই পিছে পিছে  বদ্ধিমান চ্যালাটিও  এসে উপস্থিত। 
  মুখের ভিতরের মাল মশলা গুলোকে কোন রকমে গলধকরণ  করে গণশা উত্তর করল ঃ 'মা , মা গো তুমি ওমন ক্ষিপ্ত হয়োনা মা।  আজ যে চতুর্থী । তুমি  মামবাড়ি যাবার আগে দেখে আসি গিয়ে সেখানে কতটা পরিবর্তন  হয়েছে রাস্তাঘাটের , দোকান পাটের,  ব্যওসা পত্তর কেমন চলছে তবেই না তুমি  সাঁ সাঁ করে পৌঁছাতে পারবে  সেখানে।  কে.এফ.সি তে শুনলাম আজকাল হেব্বি ছাড় দিচ্ছে। একটু ঝিমিয়ে পড়েছে  অার্সেনাল,  আমেনিয়া, লাজিজ এর বিরিয়ানি ব্যওসাটা। ঐ যে ,  ঐ ভাগাড় কেসটার জন্য কটা মানুষের কাজ কর্ম কমে গেল গো মা, এসব নিয়েই একটু ডিসকাস করছিলুম আমার সার্কিটের সাথে'। 

মা এতক্ষণ  গণশার বক্তৃতা শুনছিলেন মনযোগ  সহকারে। বললেন ঃ  'গণশা শোন বাবা , তুই লাড্ডু  , দরবেশ খাচ্ছিস খা বাবা,  কিন্তু দেখে নিবি হলদীরামের এক্সপায়ারি ডেট আছে  কি না। তোর যা লোভ বাছা, আর শোন তোর সার্কিট কে  একটু নজরে নজরে রাকিস বাপু। কোনদিন না ভাগাড়ে চালান হয়ে যায়। ভাগড়ের মাংস তো এরা সেই কবে থেকেই খাচ্ছে,  সে কি আমি জানি নে !  গেরুয়া, নীল, লাল রঙেদের  নিজেদের ভাগ বাটোয়ারা আর ঐ রাজনীতি- ফিতির   সব চাল আর কি। যাগ্গে বাবা,  কে এফ সি  ম্যাগ ডি তে বেশী যাস নে। শুধু নতুন কি কি আইটেম এসেছে আর অফার টফার কি আছে দেখে আসিস। গতবার তো সেই পঞ্চমী টু দ্বাদশী থাকতে হয়েছিল, এবার আবার ব্রিজ কেসের জন্য ক'দিন আটক রাখবে কে জানে। এই দ্যাখো ব্রিজের কতায় মনে এলো,  ও বাবা গণশা এবার কি বেয়ালর দিকের থীমের মামাবাড়ি গুলোতে যেতে পারবো রে বাবা?  একটু দেখে আসিস তো বাবা। আর যাই হোক  ভাঙা ব্রিজের তলা দিয়ে যাস নে,  কে যেন বলছিল  বঙ্গোপসাগর হয়ে ডায়মণ্ড হাবরা হয়ে টোটো নিয়ে গেলেই  হবে। ওটা বরং সহজ হবে বাবা। তাই করিস  কেমন!  বাবা ওদিকের সব নীল সাদা রঙের  ব্রিজ গুলোর থেকে দূরে থাকিস সোনা। তোকে নিয়ে আমার মহা জ্বালা। একটু ভালোমন্দ খাবার দিল কি দিলোনা তুই সব বাজে সিমেন্ট, বালি,  স্টোনচিপস সাপ্লায়ার গুলোর উপর কৃপার দৃষ্টি দিবি, তারপর ঐ ঘুষখোর ইঞ্জিনিয়ার গুলোর বাড়িতে লাইটিং,  নতুন , জামা কাপড়,  একটু খিচুড়ি,  লাবড়া, নারকেল নাড়ু, চাটনী, লাড্ডু দেখে গলে জল হয়ে যাস। এবার থেকে একটু শক্ত হ বাবা। এদের ছল চাতুরির দিকে নজর রাখ। বাছা রে ঐ ব্রিজের তলায় চাপা পড়া সাধারণ দিন মজুর গুলো কিন্তু একটা তিনটাকা দামের লাড্ডু অনেক ভক্তি করে তোকে দেয় বাবা '।

এতক্ষণ সার্কিট মায়ের সব কথা মনযোগ সহকারে শুনছিল। শেষে ফুটনোট কেটে বলল ঃ 'মা গো বিষ্ণুমাতাও মনে হয় এবারে  স্থান পাচ্চে  প্যাণ্ডেলে প্যাণ্ডেলে ... এ কে নিয়ে মামারা সবাই বড়ই  উদগ্রীব, তোমার আপ্যায়ণ   যে কতটা হবে সে বিষয়ের চিন্তাটাই গণশা দা আর আমার  বেশী হচ্ছিল মা, সে কতা গণশা দা মুখ ফুটে তোমারে কইতে পারছেল না তা আমি কয়ে দিলাম , নিজগুণে ক্ষমা করে দিও মা গো '...

শুক্রবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৮

সিলভিয়া ঘোষ


#অভিশাপ



 ইতিহাসের পাতা থেকে
------------------------------------
নাটকীয় অযোধ্যা কাণ্ডের পর রাম, সীতা লক্ষণ চৌদ্দ বছর বনবাসের উদ্দেশ্যে রওনা হতেই অযোধ্যার সকল খবর জ্ঞাত হয়ে ঋষিভর্ষা অর্থাৎ মাতুলায় থেকে 
ফিরে আসেন ভরত ও শত্রুঘ্ন। সেই সময় রাজা দশরথের মৃত্যু ঘটেছে, কৈকেয়ী অনুশোচনা ও আত্মগ্লানিতে ভুগছিলেন, নিজেকে দোষারোপ করতে করতে ভূমিশয্যা নিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে মন্থরা কে 
কৈকেয়ীও অবজ্ঞা, অবহেলা, দূর-চ্ছাই করতে থাকেন, জনরোষে ভেঙে পড়েছে অযোধ্যা পুরী। সময়ও সুযোগের সদ্ ব্যবহার করেন শত্রুঘ্ন। তিরস্কার ও চুলের মুঠি ধরে বের করে দেন জন সমক্ষে মন্থরা কে। জনরোষেই মারা যায় মন্থরা। রাম ভক্ত ভরত তখন মায়ের কৃতকর্মের জন্য ধিক্কার জানচ্ছেন মাতা কৈকেয়ীকে। মাতা কৈকেয়ী তাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন যে যা করেছেন সবটাই তার ভালোর জন্য। কিন্তু ভরত শেষমেষ মাতা কৈকেয়ী কে অভিশাপ দিয়ে বলেন তার এমনতর অভীপ্সার জন্য কোন দিন কোন পিতা আর কৈকেয়ী নাম রাখবে না কোন দেশে। মাতা কৈকেয়ীকে পুত্রের দেওয়া সে অভিশাপ আজও বহমান।

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

সিলভিয়া ঘোষ



অনুভব



বর্ষার জল শার্শী বেয়ে বেয়ে  নামছে তরতরিয়ে।আবছায়া কাঁচের জানালার দিকে অপলক দৃষ্টিতে দূরের রাস্তার দিকে চেয়ে  রয়েছেন মিসেস শর্বরী  মুখার্জী। আজকাল হলদেটে অতীতগুলো কেমন যেন টানে তাকে। দুই  মেয়েকে বিয়ে দেবার পর যেটুকু সঞ্চয় ছিল তার সেটুকুর জোরেই বাকী জীবনটা কাটাবেন ভেবেছিলেন কিন্তু জীবন যে কত রকম ভাবে পরীক্ষা নেয়  তার হিসেব কেউ কোনদিন দিতে পারেনি হয়তো আগামীতে পারবেও না।
   স্বামীর মৃত্যুর পর একহাতে গ্রিলের  কারখানাটাকে সামলানো,  সংসারে দেওর, ননদ সকলের সঙ্গে যথাসম্ভব যোগাযোগ রক্ষা করা লোক লৌকিকতা এমন কি অসুস্থ  সৎ শাশুড়ির দেখাশোনার ভারও তিনি সামলেছেন কড়া হাতে এবং মমতার সঙ্গে। তখনও তো কেউ কোন আঙ্গুল তুলতে পারেনি তার দিকে । সকলেই বৌদি,  দিদি,  শর্বরী করে করে মাথায় তুলে রাখতো। অথচ আজকাল... আজকাল কেউ আর তার খোঁজ নেয় না,  নেয় শুধু সঞ্চিত অর্থের হিসেব নিকেশ আর খোঁচা দিয়ে দিয়ে মেয়েদের উস্কে দেয় তাদের সৎ মায়ের অস্তিত্বের কথা।
       অনেকটা দেরী হয়ে গেলেও আজই সিদ্ধান্ত নিলেন মিসেস মুখার্জী সঞ্চিত সম্পত্তি  ট্রাস্টি করে দেবেন তার তৈরি বৃদ্ধাশ্রমের জন্য।শেষ ঠিকানার নাম হবে  তার 'বানপ্রস্থ'। সবাই জানুক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এ মিসেস মুখার্জী হেরে যাবেন না।


শনিবার, ৩০ জুন, ২০১৮

সিলভিয়া ঘোষ

মন  খারাপের বিকেলগুলো



মেঘ করে আসা বিকেলগুলোতে হঠাৎ যখন সন্ধে নেমে আসে মন খারাপীরা চেপে বসে অনির্বাণের। 

বহুতলের জানালার বাইরে তখন শ্রাবণ নেমছে একটু একটু করে। এই নিয়ে তিন কাপ কফি হয়ে গেছে তার, কম্পিউটারে নতুন প্রজেক্টের আউট লাইন সবে ড্র করা হয়েছে, কিছুতেই আজ মন বসছে না প্রজেক্টে। খড়খড়ি দিয়ে বাইরে তাকাতে অনি দেখতে পেল সুধা মানে সুধাময়ী (সেই ক্লাস নাইনের মতো দুই বেনুনী করে লাল পেরে সাদা শাড়ী পরে) ছাতা মাথায় মেয়েকে সঙ্গে করে আলুকাবলী খেতে খেতে ফুটপাত ধরে যাচ্ছে। কত বছর পর সুধা কে দেখলো অনি। আজ সুধা কে দেখে পুরোন দিনগুলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে অনির। সেই সব বৃষ্টির দিনে এক ছাতার ভিতর ভিজতে ভিজতে গল্পের চোটে পাপড়ি চাটটা মিইয়ে যেত কতবার...


সুধাকে দেখে আজ হিংসা হচ্ছে অনির। ও তো শুধুমাত্র সুধার  এক এবং একমাত্র  প্রেমিক হয়েই থাকতে চেয়েছিল অথচ ভাগ্য তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কোথায়...

আজ অনির কাছে সব আছে। টাকা পয়সা, গাড়ি, বাড়ি সব সওব। নেই শুধু বাড়িটাকে ঘর বানাবার লোক। নেই পুরোন কোন বন্ধু! সময়ে সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যারিয়ার তৈরিতে হারিয়ে ফেলেছে সে সব, আর যারা ছিল তারাও ছেড়ে গেছে আজ! পড়ে রয়েছে মুঠো বন্দী এক কাপ কফি আর সে! পুরানো  সব  স্মৃতি কে ভুলতে চায় অনি কিন্তু  আষাঢ়ের  হঠাৎ মেঘ করে আসা  দিনগুলো সব এলোমেলো করে দেয় সমস্ত হিসেব নিকেষ। তখনই মনে পড়ে যায়  কবীর  সুমনের সেই বিখ্যাত গান 'মনখারাপ করা বিকেল মানে  মেঘ করেছে ...'




শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

সিলভিয়া ঘোষ ,স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক

দ্বিচারিনী


©সিলভিয়া ঘোষ
©স্বাতী চ্যাটার্জী ভৌমিক


চৈত্রের ঠা ঠা রোদের পর বিকেলের লাল আকাশ, এলোপাথারি হাওয়ায় ধুলোঝড়, মাঝে মাঝে কড়াৎ কড়াৎ শব্দে  বিদ্যুতের চমক ফাঁকা ক্ষেতের উপর যখন পড়ছে,  শুকনো আলের উপর চলাফেরা করা হাতেগোনা মানুষ গুলির হৃদক্ম্পন দু এক সেকেণ্ডের জন্য প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়  অনন্ত ঠাকুরের হাত ধরে রাণু বোষ্টমী প্রায় হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে এ গাঁয়ের  শেষপ্রান্তে থাকা সনাতন মহান্তর আখড়ার পাশে  নিজের ছোট চালা ঘরে।

রাণু বোষ্টমী এই গাঁয়ে এসেছে তা প্রায় পাঁচ বছর। বয়স তার এই এক কুড়ি পাঁচ কিম্বা সাত হবে। তবে মুখটা আজও ষোড়শী। গায়ের রঙ কালো, দাঁতগুলি ঝকঝকে,  নাকটি টিয়া পাখির মতোন, কণ্ঠস্বরে মধু ঢেলে দিয়েছে যেন শ্রীহরি। সনাতন মহান্ত তাই তাকে এক ফালি জায়গা দিয়েছে আখড়ার পাশে। সকাল সাঁজে তার আরতিতে আখড়া যেন মেতে ওঠে। সে সুর কোন চলতি সিনেমার গানের সুর নয়, সে সুর তার আকুল হয়ে ডাকা শ্রীহরির চরণে সমর্পিত সুরাধনা। একটু মনোযোগ দিয়ে শুনলেই আপনা থেকেই দু চোখে জল ভরে আসে। সেই সুরের সঙ্গে সঙ্গত করতেই তো অনন্ত  ঠাকুরের এখানে আগমন আর তারপর থেকেই রাণুর একান্ত বাউল সে। সে কথা বাঁধে একের পর এক তাতে সুর দেয় রাণু  বোষ্টমী, এভাবেই মাধুকরীতে দিন কাটে তাদের। 

তবে অনন্ত বেশ বুঝতে পারে  এ কালবোশাখী তাদের জীবনের মূল্য নিতেই এসেছে, নইলে এতবছর এগাঁয়ে বাস করেও আজকের মতো ঝড়ে তো কোনদিন তার বুক কাঁপেনি, তবে আজ কেন এমনটা হচ্ছে! সে কি তবে ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনছে ? নিজের মনের ভিতর প্রশ্নগুলো  তাকে বারেবারে খোঁচাচ্ছে। রাণু বোষ্টমী  হাত ধরে টানতেই প্রায় হুড়মুড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিল অনন্ত, তা দেখে রাণু বেশ করে হেসে বললে, 'কী গো ঠাকুর, খোয়াব বুনছো না কি দিনে? নাও নাও পা চালাও দেহি। ঝড় জলের আগে ঘরকে চলো,  দুটো চালে ডালে ফুটিয়ে নেবোখন।'
অনন্ত যেন মনে মনে হেসে সব হিসেবটা মিলিয়ে নেয়। 
একটু  আস্তে করে রাণুর প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলে, 'আজকাল তুই আর পানী বলিস না তেমন, নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিস বেশ। আমারো স্বপ্ন বুনতে বেশ লাগে। তোকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখি রে পাগলী, বাঁধবি আমার সঙ্গে ঘর?' 
হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেলো রাণু কি যেন ভাবলো  মিনিট দুয়েক ,তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে  নিয়ে চলল অনন্ত ঠাকুরকে তার ঘরে। শুধু চোখগুলো তার অন্ধকারের মধ্যে বাঘিনীর  মতোন জাজ্বল্যমান হয়ে রইল ঐ শুকনো আলপথের মধ্যে। অনন্ত ঠাকুরের  ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বলছে, 'অন্ধকানাই আজ তুই মৌচাকে সঠিক ঢিল মেরেছিস ইনামও আজই পাবি।'

দুজনে জোরে জোরে হাঁটতে হাঁটতে গাঁয়ের পথের শেষ সীমানায় পা রাখতেই অন্ধকার থেকে এক লম্বা চওড়া,লুঙ্গি ,ফতুয়া পরিহিত শ্যামবর্ণের এক মানুষ রাস্তা অাটকিয়ে দাঁড়িয়ে রাণু কে উদ্দেশ্য করে বলে, 'তারপর! কেমন চলছে সব কিছু জারিনা বিবি?'
আচমকা ভয় পেয়ে থমকে যায় রাণু। বিদ্যুতের আলোয় তার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ দেখতে পায় অনন্ত। মুহূর্তে মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে রাণু, 'কে গা তুমি ভরা দুর্যোগের দিনে পথ আটকাচ্চ? কাকে দেকতে কাকে দেকেছো? সরো দেকি বাপু যেতে দাও আমাদের।' তারপর ব্যস্ত হয়ে অনন্তর দিকে ফিরে ডাকে, 'হ্যাঁ গা তুমি  দাঁইরে দেখছ কি, পা চালাও না। আকাশের অবস্তা দেকছ নি!' লোকটা কিছু না বলে পথ ছেড়ে দেয়। হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। দুজনেই ভিজে যায়। অনন্তর হাত ধরে একরকম প্রায় উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ে ঘরে ঢুকে দোর দেয় রাণু বোষ্টমী। তারপর দরজার খিল ধরে হাঁপাতে থাকে। অনন্ত একটু সময় দেয় ওকে। তারপর এগিয়ে যায় আস্তে আস্তে। রাণুর ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে ডাকে, 'এমন হুড়ো দিয়ে নিয়ে এলি কেনে রাণু?' রাণু যেন কোন অন্য জগতে ছিল এতক্ষণ, অবাক হয়ে ফিরে তাকায় সে অনন্তর দিকে। আবার এক লহমায় নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, 'রোসো বাপু, উঠোনে যেয়ে দেখি কি হাল হয়েছে। এমন ঝড়জল হবে কে জানত বলো দিকি। সকালে কেমন কাঠফাঁটা রোদ্দুর ছিল আর একন আকাশ ভেঙে বিষ্টি নামলো!' বলতে বলতে রাণু উঠোনে চলে যায়। মিনিটখানেক পরে ঘরে ঢুকে দেখল অনন্ত বাউল জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে। গামছাটা এগিয়ে দেয় রাণু, 'নাও মাথাটা মুছে জামাখানা পাল্টে ফেলো দিকি ঠাকুর। খাটের ওপর একটা কাপড় আর চাদর রেখেচি। পুরুষ মানুষের পোশাক তো আর আমার ঘরে পাবে নে। আমিও কাপড়টা বদলে আসি গে।' কিছুক্ষণ পরে রাণু কাপড় বদলে ঘরে ঢোকে। অনন্ত তখনও একইভাবে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে। ব্যস্ত হয়ে রাণু কিছু বলতে যাবে এমন সময় অনন্ত তার সামনে দাঁড়ায়, 'ওই লোকটা কে ছিল রাণু? তুই ওকে চিনিস তাই না?' চোখ সরিয়ে নেয় রাণু, 'কাকে আবার চিনি, কি যে বলো তুমি ঠাকুর। যাও কাপড়টা বদলে এসো। আমি একটু চালে ডালে চড়িয়ে দিই।' রাণুর হাত ধরে তাকে আটকায় অনন্ত, 'কথা ঘোরাস নি রাণু, কে ওই লোকটা? ও তোকে কোন নামে ডাকলো? আর তুই অমন ভয় পেলি কেন?' চোখ তোলে রাণু, সেই চোখে ভয় নেই, ছলনা নেই, বিরক্তি নেই, আছে শুধু আকুতি, 'আগে কিছু খেয়ে নাও ঠাকুর। কতা বলার জন্য তো অনেক সময় পড়ে রয়েচে। আমি ভাতটা বসিয়ে দিই। সব বলবো তোমায়। বলবো বলেই তো ডেকে এনিচি গো।' অনন্ত নারাজ, জোর দিয়ে বলে, 'এখনই বল। আমি বাড়ি ফিরে যাব। এখানে থাকতে আসিনি।' অনন্তর হাতের ওপর হাত রেখে আলতো চাপ দেয় রাণু, 'দোহাই তোমার ঠাকুর, সব বলবো আমি, কিন্তু এই ভিজে কাপড়টা তুমি ছেড়ে এসো। শান্ত হয়ে বসে সবকথা শুনো আমার।' অগত্যা রাণুর জেদের কাছে হার মানে অনন্ত। রাণুর দেওয়া কাপড়টা ধুতির মতো করে পরে গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘরের চৌকির ওপর বসে। 

খানিক চুপ করে বসে থাকে রাণু। তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে শুরু করে।
-'আমাকে আজ তোমরা যেমন দেখতাসো আমি তেমনি ছিলাম না। আমার আসল নাম জারিনা। বাপের এক মেয়ে ছিলাম। বড় আদরে মানুষ করছিল আমারে বাপটা। আমার যখন চোদ্দ বছর বয়স তখন একদিন শহর থেকে বাড়ি ফেরার সময় খালের ধরে বাস উল্টে বাপটা মরে গেল। আমি আর মা খুব কাঁদলাম কদিন। তারপর একদিন মা বললো সে আসলাম চাচারে নিকা করতে চায়। শুনে খুব রেগে গেছিলাম আমি। আসলাম চাচা আমাদের গ্রামেই থাকতো। আব্বা কোনদিন ওরে দেখতে পারতো না। খালি বড় বড় কথা বলতো। আমারও ভাল লাগতো না। মায়ের কি করে ভাল লাগলো জানিনা। আব্বা মারা যাবার এক বছর কাটতেই মা আবার নিকা করলো। আমি বুঝলাম আমার সুখের দিন শ্যাষ হয়েস ।

আসলাম চাচার নজর আমার ভাল লাগতো না। আমি চাচা কইরাই বলতাম। মা বলতো আব্বা বলতে। আমি শুনতাম না। একদিন মা বাড়ি ছিল না। চাচা জোর করে আমারে বিছানায় লয়ে গেল। আমি কত কাঁদলাম কেউ বাঁচাতে এলো না। মা ফিরলে সব বললাম। মা বললো পুরুষমানুষের খিদে একটু বেশি হয়, অত উতলা হবার কিছু নেই।' বলতে বলতে ডুকরে কেঁদে ওঠে রাণু। তাকিয়ে দেখে বিস্ফারিত চোখে অনন্ত তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ মুছে সে আবার বলতে শুরু করে।

-'এরপরে একদিন রাতে মায়ের সামনেই লোকটা আমারে ঘরে ডাকে। আমি তখন কুটনো কুটছিলাম, যাইনি। মা জোর করে যাবার জন্য। আমি জেদ করে বসে থাকি। লোকটা এল আমাকে জোর করে নিয়ে যেতে। আমি কোনরকমে এক ধাক্কা দিয়ে লোকটাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে আসি। নাম পাল্টিয়ে এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরতে ঘুরতে এই মাঝেরপাড়ায় আসি। মহান্ত ঠাকুর আমার গান শুনে আমারে আশ্রয় দেন। সেই থেকে এখানেই রয়ে গেচি। আজ যারে দেখলে সে আসলাম চাচার ভাই, করিম আলী। ওরও নজর খারাপ। কি করে জানিনা আমারে এখানে খুঁজে পেয়েছে। কদিন ধরে দেখতাসি লোকটারে। আমারে বোধহয় এখানকার পাট উঠাতে হবে এইবার।' একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে রাণু একটু হাঁপায়।

অনন্ত একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। এবার সে মুখ খোলে, 'তুই বিধর্মী হয়ে এখানে এসে ঠাকুরের নামগান করছিস? পরকালের ভয় করিস নে? এখানে জানাজানি হলে তোর কি হবে জানিস? পুঁতে ফেলবে তোকে গ্রামের লোকজন। মহান্ত ঠাকুর তোকে বিশ্বাস করে থাকতে দিয়েছে আর তুই নিজের পরিচয় লুকিয়ে এতবড় নাটক করে যাচ্ছিস রোজ!' রাণু ওরফে জারিনা এবার সোজাসুজি তাকায় অনন্তর দিকে, 'ঠাকুরের আবার জাত কি গো? তুমি না বাউল! জাত কি কেউ সাথে নিয়ে জন্মায়? জাত যদি গায়ে লেগেই থাকতো তাহলে অন্য জাতের ছোঁয়ায় তা নষ্ট হয় কি করে? জাত যদি গায়ে আঠার মতো সেঁটে থাকে তাহলে কেউ নিজের ধর্ম পাল্টায় কি করে গা? মানুষ আগে না জাত আগে? আমি এখনে এসে নাম পাল্টে না থাকলে আমার মা আর ওই লোকটা মিলে আমারে তো মেরেই ফেলতো। আমি জানি ওরা করিম আলীর সঙ্গেও আমাকে শুতে বলতো। জানোয়ারটা কি এমনি এমনি আমারে খুঁজতাসে নাকি!' 
অনন্ত গম্ভীরভাবে বলে, 'আর মহান্ত ঠাকুর? ওই দেবতার মতো মানুষটাকে তো তুই ঠকাচ্ছিস?' 
অট্টহাস্য করে ওঠে রাণু, 'দেবতা! হ্যাঁ গা তাই বটে। আমারো মনে হতো এমনটাই। বড় অপরাধী লাগতো নিজেকে। কাল  সন্ধেয় করিম আলী এসে মহান্ত ঠাকুরকে আমার নামে কি বলেছে জানিনা, কাল রাতে আমার ঘরে এসে তোমার দেবতা বলে গেলেন উনি করিম আলীকে বলেছেন আমাকে উনি ছোট থেকে চেনেন। আমি ওনার নিজের গাঁয়ের মেয়ে। করিম আলী কোনদিন সত্যিটা জানবে না যদি আমি ... আমি...থাক সে কথা। 
  অনন্ত বলে 'না থাকবে না,  এখনি বল আমি শুনবো'!
   রাণু বলে 'যদি আমি  মহান্ত ঠাকুরকে মাঝে মাঝে রাতে ঘরে আসতে দিই। আর যদি না আসতে দিই তাহলে দুদিন বাদে সারা গাঁয়ের লোক জেনে যাবে রাণু বোষ্টমীর আসল পরিচয়।'
হতভম্ব হয়ে যায় অনন্ত, 'মহান্ত ঠাকুর! মানুষ এমনও হয়? এর চেয়ে উনি তোকে বার করে দিতেন তাও বুঝতাম ধর্মভীরু। ছিঃ! ছিঃ! কিন্তু তুই আমাকে এসব বলতে গেলি কেন? আমিও তো গাঁয়ের লোককে বলে দিতে পারি।' 
চুপ করে থাকে রাণু। তারপর চোখ না তুলেই বলে, 'কারণ তুমি এমন এক মানুষ যাকে আমি আমার নিজের মতো করে বুঝতে পারি। যে আমারে ভালবেসে শাদি করতে চেয়েছে। প্রথম কেউ যে আমারে শুতে বলেনি, শাদি  করে ঘরে তুলতে চেয়েছে। তোমারে বলব না তো কারে বলবো আর।'

স্তব্ধ হয়ে যায় অনন্ত। কি বলবে ভেবে পায়না। রাণুই বলে, 'আমি জানি গো ঠাকুর কি ধর্ম সংকটে তোমারে আমি ফেলেছি। কাল অবধি যে রাণু বোষ্টমীরে তুমি চিনতে আজ সেই এমন অচেনা হয়ে গেলে তারে কি আর শাদি করন যায়? তুমি ভেবো না, আমি তোমারে জোর করুম না। তোমার যা ইচ্ছা যায় তাই করো। তবে আমিও বলে রাখি তোমায় ঠাকুর, আমি পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ আদায় করা আসলাম  চাচারে দেকসি, আবার পৈতে পরা হাতে জপের মালা নেওয়া মহান্ত ঠাকুরকেও দেকসি। ও আল্লাই বলো আর কৃষ্ণই বলো কেউই অবলা নারীরে বাঁচায় না। বাঁচতে হলে নিজেকেই বাঁচতে হয়। আর আমি যে করে হোক নিজেকে বাঁচিয়ে নেব। বাঁচতে আমার বড় ভাল লাগে। জারিনা হয়ে না পারি রাণু হয়ে বাঁচব, তাতেও না পারলে অন্য কোথাও অন্য কোন নামে বাঁচব। বাঁচতে আমারে হবেই।' 
অনন্ত উঠে পড়ে ধীরে ধীরে। বলে, 'আজ আমি আসি। বৃষ্টিটা ধরেছে। কাল আসবো 'খন। তুই সাবধানে থাকিস। আমরা তো বাউল মানুষ। এখানে নয় অন্য কোথাও গিয়ে ঘর বাঁধব নাহয়। এখানে এমনিও বেশিদিন থাকা তোর ঠিক হবে না। নিজেকে বাঁচিয়ে চলিস কয়েকটা দিন। আমি দেখি কি ব্যবস্থা করা যায়।' 
অনন্তর জন্য দরজা খুলতে গিয়ে কেঁদে ফেলে রাণু। অনন্ত তাকে কাছে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে সাবধানে থাকতে বলে নিজের ঝোলাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। 

পরেরদিন ঝলমলে আকাশ দেখে মনটা ভাল হয়ে যায় অনন্তর। মহান্তর বাড়ির দিকে যাবে মনে করে ঝোলাটা কাঁধে তুলতে যাবে এমন সময় গাঁয়ের ছেলে গোপাল দৌড়ে এসে বলে, 'শিগগির চলো অনন্ত দাদা, মহান্ত ঠাকুর খুন হয়েছে।' 
-'কি বললি? খুন? কোথায়?' চমকে যায় অনন্ত।
-'রাণু বোষ্টমীর ঘরে। কেউ কাটারী দিয়ে গলার নলি কেটে দিয়ে গেছে গো।'
-'সেকি! বোষ্টমী কোথায়?'
-'তারে পাওয়া যাচ্ছে না। পালিয়েছে মনে হয়।'

অনন্ত ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়। মহান্তর বাড়ির কাছে আসতেই জটলাগুলো চোখে পড়ে। সেখান থেকে জারিনা নামটা দু-একবার কানে আসে। গাঁয়ের বয়স্ক মানুষ নারায়ণ গাঙ্গুলিকে এদিকে আসতে দেখে তার দিকেই এগিয়ে যায় অনন্ত। 
-'কি হয়েছে গো দাঠাকুর?'
-'আর বলো কেন, এসব নোংরা মেয়েছেলেদের কারবার। মেয়েটা আসলে নাকি মুসলমান। নাম জারিনা। ওর মা দ্বিতীয়বার বে করলে সেই বাপকে এই একইভাবে খুন করে পালিয়ে আসে এই মেয়ে। এখানে এসে বছর পাঁচেক হলো বোষ্টমীর ভেক ধরে ছিল। কেউ কিচ্ছুটি বুঝতে পারে নি। মহান্ত ঠাকুর বোধহয় বুঝে গেছিল, তাই তাকেও সরিয়ে দিল। পুলিশে খবর দেয়া হয়েছে। দেখা যাক কি হয়।'
রাগে জ্বলে যায় অনন্তর মাথাটা। ধীরে ধীরে বলে, 'বোষ্টমীকে তুমিও তো খুব স্নেহ করতে দাঠাকুর। আর আজ সে নোংরা মেয়েমানুষ হয়ে গেল? কেন একটা মেয়ে দুটো পুরুষকে খুন করলো সেটা বুঝতে পারছো না? একটু ভেবে দেখো কখনো।'
রেগে যায় নারায়ণ গাঙ্গুলী, 'তুমি থামো তো বাউল। তোমাদের জাতধর্ম না থাকতে পারে, আমাদের আছে। মুসলমান মেয়েটা আমাদের সবার ধর্ম নষ্ট করে দিয়ে গেল। রোজ ওর হাতে প্রসাদ খেয়েছি আমরা। এখন গ্রামসুদ্ধু লোককে প্রায়শ্চিত্তির করতে হবে। তুমি মেলা জ্ঞান দিও না। এত তো গান গাইতে একসঙ্গে, তুমি নিজে যদি জানতে যে মেয়েটা বিধর্মী তাহলে গাইতে পারতে?'
মাথা নিচু করে অনন্ত নিজের ঘরের দিকে হেঁটে চলে। মহান্তর মৃতদেহ দেখতে চায় না সে। কাল রাতে কি ঘটেছে সব সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে। না, বাউল হয়েও সে জাতধর্মের ওপরে উঠতে পারেনি। গতকাল হলেও নারায়ণ গাঙ্গুলীর কথার সঙ্গে সে একমত হতো বোধহয়। কিন্তু একটা মুখ্যু মেয়েমানুষ কাল তাকে মনুষ্যত্বের পাঠ দিয়ে গেছে। আজ আর কিছুতেই সে তার রাণুকে দোষী ভাবতে পারে না। যতই রাণু আসলামকে খুনের ঘটনা তার কাছে লুকিয়ে যাক। যা করেছে সে নিজেকে বাঁচাতেই করেছে। এতে কোন অপরাধ থাকতে পারে না। সত্যিই তো ঠাকুরের আবার জাত কিসের? আর সেই ঠাকুর, সেই আল্লাকে নিয়ে বড়াই করা মানুষগুলোর তো একটাই জাত, খাদক। একটা অসহায় মেয়েকে আশ্রয় দিতে গিয়ে যারা বারবার মানুষ থেকে জানোয়ার হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই ফিসফিস করে অনন্ত, 'এ গাঁয়ে আমিও আর থাকবো না। বেরিয়ে পড়ব আবার, দেখি যদি আমার সুরের জুড়িদার, আমার বোষ্টমীকে খুঁজে পাই।'

শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

শুভশ্রী সাহা, সিলভিয়া ঘোষ

প্রেমে অপ্রেমে 

  

কলিংবেলটা  বাজাতেই  সাউন্ড অফ মিউজিকের শব্দ ভেসে এলো  পার্থর কানে। মনে মনে ও বলে উঠল বাহ সত্যি দারুণ রুচি তো। এসব এলাকায় এমনটাই আশাকরা যায়। দরজা খুলতেই বের হয়ে এলো বছর সতেরোর শ্যাম বর্ণের একটি মেয়ে। ঠোঁট ফাঁক করে জিজ্ঞাসা করল 'কাকে চাই?' দোহারা চেহারার,  চোখে মুখে দারিদ্র্যতা থাকা সত্ত্বেও একটা বুদ্ধিদীপ্ত  ভঙ্গীমা কাজ করে। পার্থ গলাটা একটু ঝাড়া দিয়ে বলল ঃ  ' মিসেস দেব বাড়ি আছেন? আমাকে এই সময় আসতে বলা হয়েছিলো! ' মেয়েটি চোখের ইশারায় ভিতরে ঢুকে হাত দেখিয়ে সোফায় বসতে বলল।  নরম সোফায় বসার পর সেন্ট্রাল এসির ঠাণ্ডায় পার্থের চোখটা  একটু  লেগে এসেছিলো  প্রায়, তার মিনিট তিনেক পর মিস্টার দেব এসে বললেন 'হ্যালো ইয়ং ম্যান হাউ আর ইউ? আসলে তোমাকে ডেকেছি আমি, মিসেস দেবের জন্য।' পার্থ খুব মন দিয়ে মিস্টার দেবের কথা গুলো শুনছে। কেমন যেনো রাজা  রাজরার মতোন  চালচলন ভদ্র লোকের ।কথার মাঝেই পার্থ বলে ওঠে ঃ ' হ্যা, বলুন তো আসল অসুবিধাটা কি মিসেস দেবের!' 

প্রায় এক সপ্তাহ এ বাড়িতে আসছে পার্থ। এই চৈত্রের দুপুরে তেতে পুড়ে বাইক চালিয়ে কামালগাছি থেকে বালিগঞ্জ প্লেসের এই বাড়িতে আসতে জীবনটা বের হয়ে যাবার জোগাড়। আজকাল  এখানে এসেই মিনিট পাঁচেক বসে যতক্ষণ না পিউ (কাজের  মেয়েটি) এসে এক গ্লাস ঠাণ্ডা সরবত না দেয়। পিউ এর সাথে চোখাচোখি হতেই আজ কেমন যেনো  ও রহস্যের হাসি হসলো চোখ দিয়ে  সেটা খেয়াল করল পার্থ। সরবতটা শেষ করতে করতে ও ভাবলো গত পরশু ফিজিওথেরাপির জন্য না কি অন্য কিছুর জন্য  সর্বাঙ্গ প্যারালাইজড এবং আংশিক  জিভের আড়ষ্টতা নিয়ে মিসেস দেব যে কথাটা বলেছিলেন,  প্রথম তিনবার বুঝতেই পারেনি ও ,পরে অবশ্য ওনার  মুখের কাছে  মুখ নিয়ে শুনতে পেয়ে  পঞ্চাশোর্ধ  অসম্ভব সুন্দরী নারীর সামনে কান লাল হয়ে  দাঁড়িয়ে থেকেছে মিনিট পাঁচেক। পার্থর পঁচিশ  বছরের জীবনে অনেক অভিজ্ঞতাই জমেছে। 

পিজিতে ট্রেনিং নেবার সময় স্যর অজয় পণ্ডিত  বলেছিলেন,  'তোমাদের কাছে এমন অনেক  পেশেন্টই আসতে পারেন যারা সেক্সচুয়াল অ্যাটাচমেন্ট আশা করেন বা বলতে পারো তাই চান। তখন কিভাবে তাকে হ্যান্ডেল করবে তাও জানতে হবে তোমাদের। এটাও শিক্ষার একটা অঙ্গ।' বছর বিশেক এক অঙ্গ প্যারালাইজড মিসেস  ঋক্তা দেবের  চেহারার গ্ল্যামার দেখে পার্থ ফিদা। তবুও ওমন প্রস্তাবে কেমন যেনো গুঁটিয়ে নিয়েছে দু দিন। 

শরীরের চাহিদা বড় অসহায় করে তোলে মানুষ কে। পার্থর জীবনে কী তার প্রভাব কম!  বছর পনেরো আগের কথা মনেহয়  পার্থর। মাঝ রাতে ছোটক্কু কে দেখতে পেয়েছিল বড় মামনির ঘরে যেতে,তখন মামনির বয়স প্রায় ৫৫। জ্যা এর সাথে  মামনির কোনদিন তেমন অন্তরঙ্গ মুহূর্ত  পার্থর মনে নেই। জ্যা মারা গেলেন তাও বছর দশেক হবে। আর ছোটক্কু ম্যানেনজাইটিস এ মারা  গেলো বছর চারেক আগে,  ওর  মুখাগ্নি  পার্থকেই করতে হলো, গত বছর মামনি মারা যেতে মা বলল 'এখানেও মুখাগ্নি  তোকেই করতে হবে ধরা পরতে হবিষ্যান্ন রান্না করে খেতে হবে বড়দার সাথে।' বড়দা কথা বলেনা তেমন পার্থের সাথে, যবে থেকে ছোটক্কু তার ভাগের সম্পত্তি পার্থের নামে দিয়ে গেছে...  
আজ পার্থ প্রস্তুত হয়ে এসেছে দরকারে যা যা করণীয় তাই তাই করবে...  শুধু  শুধু  লোভ সম্ভরণ করে কী লাভ! 

দরজা দিয়ে ঢুকতেই পরিচিত রুম ফ্রেশনারের গন্ধ নাকে এল পার্থর, বিশাল বেডরুম এর মাঝখানের একদম রোজউড কালারের খাট। এ ঘরের সব কিছুই ভিক্টোরিয়ান স্টাইল এর আগেই দেখেছে সে ,হয়ত মিসেস দেব কিছুটা পুরোনো দিনকে যেন মনে রাখতে চান। সম্বিত ফিরতেই পার্থ দেখল মিসেস দেব তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে, চোখের কোণে কিছু কি চিকচিক করছে!! দূর এমন সেক্সি আইজ এ যৌনতার আমন্ত্রণ ছাড়া আর কিই বা হতে পারে... 

অস্থির লাগছে পার্থর নিজের, অসহ্য ছটফটানি ।কেউ জানবে না  বলে  মিস্টার দেব কথা দিয়েছেন, কিন্তু তার বিবেক আছে তো, তৃণা কে কি বলতে  পারবে সে কোনদিন  একথা !! তৃণা লড়াকু মেয়ে, মরালিষ্ট সে কখনো মেনে নেবে না। কিন্তু পার্থর এখন টাকার দরকার...নিজের পায়ে তাকে দাঁড়াতেই হবে,  যতই ছোটক্কুর দেওয়া  পয়সা কড়ি থাকুক না কেন , তৃণা নিজের পায়ে  না দাঁড়ালে  বিয়ে তো দূরের কথা বাড়িতেও জানাবে না বলেছে!! ওর মনে এখন দোলাচল, পজেটিভ নেগেটিভ কারেন্ট! সে বুঝতে পারছে, প্রতিটি মুহূর্ত সে শকড...

ক্রমে গোঙানির শব্দ বেড়ে যাচ্ছে, মিসেস দেব কি যেন বলতে চাইছেন, পার্থ এগিয়ে আসতেই যে দিক টি একটু সবল হয়েছে সেই হাত দিয়ে নিজের বুকটাকে স্পর্শ করাতে  চাইছেন যেন, ঈঙ্গিত টা স্পষ্ট।  পার্থ কেঁপে উঠল-- পাতলা নাইটির ভেতর দিয়ে করমচার মত লাল স্তন টি সুস্পষ্ট তার বৃন্ত আর সেটি উদ্ধত, পার্থ র সেদিকে চোখ পড়তেই নিজেকে শক্ত অনুভব করল সে-- একি হচ্ছে এমন তো সে চায় নি-- গরীবের ছেলে সৎভাবে রোজগার করতে চেয়েছিল। মিসেস দেব ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন,  উত্তেজনা তার জন্যে একদম নিষেধ...পার্থ ছুটে গেল কাত হয়ে যাওয়া মাথা বালিশে তুলেদিল। ঋক্তা তাকে আঁকড়ে ধরে কি যেন বলতে চাইল -- গোঙানিটা হঠাৎ আস্তে হয়ে যেতেই মনে হল সে যেন শুনল জয়'-- চমকে উঠল সে, এবার ঋক্তার দিকে তাকাতেই দেখল হ্যাঁ তিনি কাঁদছেন -- হাঁপাচ্ছেন পালস বিট বেড়ে গেছে অনেক বেশি।ছুটে গিয়ে বন্ধ দরজায় ধাক্কা দিতেই মিস্টার দেব নিজেই বাইরে থেকে খুলে দিলেন।
ভেতরে ঢুকে নিজেই গিয়ে মিসেস দেবের হাত ধরলেন আর বলতে লাগলেন, ঋক্তা,  ঋক্তা স্থির হও-- আমি বলছি, আমি বলছি ওকে....
ঘরের আলমারীর ড্রয়ার খুলে একখানি বাক্স নিয়ে এলেন, হাতির দাঁতের কাজ করা। তার মধ্যে থেকে একটি সাদা কালো ছবি বার করে সোজা করে ধরতেই পার্থ চমকে উঠল। তার ছবির মতন লাগছে। সে জানে এই ছবি জয়প্রভ বসুর-- তার  ছোটক্কুর...

মিস্টার অশিন দেব তার পর তাকে এক গল্প শুনিয়েছিলেন-- সিনেমার মত হলেও তার জীবনের চরম বাস্তব। জয়প্রভ আর ঋক্তার কলেজ জীবন থেকেই ভালোবাসা, জয়প্রভ আর্ট কলেজের কৃতি ছাত্র হলেও খ্যাপা আধ পাগলা, খ্যাপামী দিয়ে তো জীবন চলে না, আর আজ থেকে বত্রিশ বছর আগে আর্টে পেট ও চলত না। চা বাগানের মালিক দেবদত্ত রায় মানেন নি, আর জয়প্রভ যেন আগে থেকেই হেরে বসে ছিল। বিয়ে হল ধনীর পুত্র সুবিখ্যাত ব্যবসায়ী দেব পরিবারের ছেলে অশিনের সাথে। অশিন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছিল ঋক্তাকে, ঋক্তা পারেনি একদিন ও। বেড়াতে গিয়ে লোকে জানত দুর্ঘটনা কিন্তু আসলে , ঋক্তা পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে মরতে চেয়েছিল, কোনক্রমে পয়সার জোরে প্রান বাঁচলেও তার সাড় চলে যায় চিরতরে।  স্বামীকে তিনি বিয়ের রাতেই বলে দিয়ে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন-- অশিন চেষ্টা করব ভেবে নিয়ে জেদ ধরে ছিলেন, ঋক্তা নিজে মুক্ত হতে চেয়ে বন্দী হয়ে গেলেন বিছানায়-- তার একটাই আবদার ছিল স্বামীর কাছে 'জয়প্রভ' -- একটি বার আসবেন তার বুকে মাথা রাখবেন। অনেক চেষ্টা চরিত্র করে অশিন ঠিকানা জোগাড় করে জানতে পারেন জয়প্রভ মৃত। ঋক্তাকে বলতে পারেন নি। বদলে পার্থ কে এনে দিলেন ঋক্তার কাছে। পার্থ র চেহারার সাথে প্রচুর মিল জয়প্রভর। নতুবা পার্থর মতন অল্প বয়েসী ফিজিওথেরাপিস্ট  তারা নেবেন কেন!!

পার্থ চুপ হয়ে গেল হঠাৎ। মিস্টার দেবের সামনে দিয়ে উঠে গিয়ে জড়তা হীন ভাবে আলতো করে বালিশ থেকে মাথা ঊঠিয়ে নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন ঋক্তাকে-- আজ যেন চোখের সামনে  ভেসে উঠল তার  জন্মদাত্রী মায়ের  মৃত্যু শয্যার চেহারাটা । পরিষ্কার গলায় ডাকলো-- মামনি--
কুল ছাপিয়ে জল কি এমন ই ভাবে আসে!! ঋক্তা বত্রিশ বছরে এমন ডুকরে কেঁদে উঠলেন প্রথম। নির্বাক দুটি পুরুষের সামনে। পার্থ জোড়হাত করল মিস্টার অশিন দেব কে।  "আর কোন দিন ডাকলে আসতে পারব না কিন্তু, মামনি কে দেখবেন" এই কথা বলে -- পার্থ বেরিয়ে এসেছিল...
 ছমাস বাদে তাদের কামালগাছির বাড়িতে চিঠি এসেছিল ঋক্তার মৃত্যু সংবাদের।যাবার আগে,  বেশ কিছু টাকা আর পাইক পাড়ার একটি বাড়ী তার পুত্র সম পার্থ বসুর নামে উইল করে দিয়ে যান।পার্থ বসু এখন পাইক পাড়ায়,' ঋক্তা ফাউন্ডেশন এ নিয়মিত চেম্বার করেন।'

শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৮

শুভশ্রী সাহা , সিলভিয়া ঘোষ


 বার্ডস হাব
------------------


সম্পর্ক টা দুলছে ফুলছাপ পর্দার গায়ে
সেই আকাঙ্ক্ষিত পর্দা ,যা একসময় আমাদের  অবিন্যস্ত জীবনের আড়াল করতো বারেবারে
:
ভেতরে   সোনালী ফ্রেমে সুখী মুখের শিশু
যার দুচোখ ঠিক তোমার মতোন,  ভাসা ভাসা
:
একরত্তি বারান্দার চারদিকে বাগান করেছো তুমি
টবে সাজিয়েছো   চন্দ্রমল্লিকা বেগুনী  রাঙা বোগান ভেলিয়া , লাল গোলাপ 
:
আরো একটু দূরে ,টবেই রেখেছো আমার প্রিয় বন তুলসী, 
শুধু আমি নেই কোথায় এতোটুকু---
:
এমন কি কথা ছিল অংশুমান
বেলাভূমি পেরোনোর সময় ধরেছিলে তো হাত
বলেছিলে, হারিয়ে যেতে দেবে না আর ...
:
খোলা নীলাকাশের নীচে তারা খসা দেখেছি দুজনে কতবার,
 গোপন ইচ্ছাদের জানতে চেয়েছি বারবার, মনেপড়ে তোমার? 
:
উপত্যকার গভীরে যেতে যেতেও তৃষ্ণার্ত তুমি
শুনিয়েছো সলিটারি রিপারের গান--
:
জ্যোৎস্না রাতে রূপালী ক্যানোপীতে গাইতাম আমি,  তোমার অনুরোধের গান 
'আরও  দূরে চলো যাই'
:
ঘরের মধ্যে ঘর সেই ছিল তোমার পর
চৈত্রের আগুনে একমুঠো শ্রাবণ নামিয়েছে কতবার
:
শ্রাবণ নামিয়েছে  প্লাবন বুকের ভিতর  বহুবার 
শুধু,  সম্পর্কটা আজও এলোমেলো... দুজনের অলীক অঙ্গীকার
:
পলাশ করোঞ্জ পেরিয়ে নিমতলা বার্ডস হাব
ছুঁয়ে থাকা ধূপছায়াতে স্বপ্ন দেখেছি সুখী গৃহকোণের অসংখ্য বার... 
:
শুধু বলতে শক্ত করে---- তৃনা আমায় ধর
হারতে চাই  তোমার কাছে আরো একবার...



 

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

সিলভিয়া ঘোষ

হোমাপাখি 
-----------------

নীলআকাশ  আমার ভীষণ প্রিয় 
তোমার আমার সংসার বসাব সেখানে
:

উঁচুতে উড়ান দিতে জানো তুমি মেয়ে?
হোমাপাখির মতোন উড়বো অনেক অনেক উঁচুতে

:
জন্ম দেবো নতুন আশাকে
যারা পৃথিবীর আলো, মাটি ছোঁবে না কখনও
:

আবার আমরা বাসা বাঁধি মাচায়
দূরবীন চোখে চেয়ে থাকি নতুন আশাদের দিকে
উচ্চাশারা ফিরে আসেনা এই মাচাতে