রবিবার, ১৪ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                        



আমার মাথাতেও কিছু আসছে না মহারাজ। হতাশ গলায় হেফাস্টিয়ান কথাটা বলেই যোগ করলেন, এইসময় আমাদের দরকার ছিল গুরু অ্যারিস্টটলকে। তিনি সঠিক দিশা দিতে পারতেন।

ঠিক। একদম ঠিক বলেছ। আমার মাথাতেই আসেনি মাস্টারমশাইয়ের কথাটা। তাঁর পরামর্শ খুব জরুরি এখন। উনি আছেন এথেন্সে। তুমি দ্রুত যাও ওনার কাছে। ওনার মূল্যবান মতামত নিয়ে এসো।

এথেন্স এখান থেকে অনেক দূরে মহারাজ! সডগিয়ান থেকে সেখানে যাওয়া, তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা, আবার ফিরে আসা... বিরাট সময়ের ব্যবধান। এই মুহূর্তে আপনার পাশে আমার সবসময় থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আপনাকে ছেড়ে কোথাও গিয়ে আমি স্বস্তি পাব না। তার চেয়ে একজন বিশ্বস্ত সেনাকে পাঠানো যেতে পারে। তার ফিরে আসা পর্যন্ত আমরা যেভাবেই হোক এদের সামলাতে পারব।

কথাটা মনে ধরল অ্যালেকজান্ডারের। তিনি মনে মনে স্বীকার করলেন, হেফাস্টিয়ান সঙ্গে থাকা মানে মনোবল অনেকটাই বেড়ে যাওয়া। তাই বললেন, বেশ, তবে তাই করো। খেয়াল রেখো দূত যেন ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ না-করে। সে যেন গুরুর পরামর্শ ফাঁস করে না-দেয়।

আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ। আমি যাকে পাঠাব সে খুবই বিশ্বাসী। প্রাণ যাবে, তবু বেইমানি করবে না।

(২)

বিশ্বস্ত সেনা হেরাসকে পাঠানো হল এথেন্সে। সে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে, দীর্ঘদিন বাদে এসে পৌঁছল এথেন্সে। এখানে অ্যারিস্টটলকে সকলেই চেনে। তিনি একজন জ্ঞানী পুরুষ ও রাজা আলেকজান্ডারের গুরু হিসাবে পরিচিতি। তাই অতি সহজেই হেরাস পৌঁছে গেল অ্যারিস্টটলের গৃহে।

অ্যারিস্টটল তখন তাঁর ঘরে বসে আছেন। তাঁর চোখ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে। তবে তিনি যে কিছুই দেখছেন না তা বোঝা যাচ্ছে তাঁর বাহ্যজ্ঞানহীন দৃষ্টি দেখেই। কোনওকিছু নিয়ে তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। এমনকি ঘোড়ার পদশব্দও শুনতে পাননি তিনি, এতটাই নিমগ্ন হয়ে আছেন।

মহান রাজা আলেকজান্ডার আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। হেরাসের কথা অ্যারিস্টটলের কানে পৌঁছল না। তিনি ভেবেই চলেছেন কোনও গভীর বিষয়ে। হেরাস আবার বলল একই কথা। এবার বেশ জোরেই বলল সে।

সম্বিত ফিরল অ্যারিস্টটলের। তিনি মুখ ফিরিয়ে দেখলেন সেনাটিকে। হেরাস প্রায় একই কথা উচ্চারণ করল। তিনি তরুণ সেনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, আলেকজান্ডার তোমাকে কেন পাঠিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে? তার কোনও বিপদ ঘটেনি তো!

না মহামান্য। বিপদ তেমন নয়। আবার বিপদও বলতে পারেন।

ভ্রু কুঁচকে উঠল অ্যারিস্টটলের। বিপদ নয়, আবার বিপদও! তুমি বোসো এখানে। তারপর সবিস্তারে বলো ঘটনাটা কী। কথাটা বলেই একটি পাথরের বেদি দেখিয়ে দিলেন অ্যারিস্টটল।

মহারাজার গুরু। তাঁর সামনে বসতে একটু ইতস্তত করলেও অবশেষে বসে পড়ল সেখানে হেরাস। এরপর আলেকজান্ডার ও হেফাস্টিয়ান যেমন করে তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, হুবহু সেভাবেই বুঝিয়ে বলল অ্যারিস্টটলকে।

অ্যারিস্টটল কখনওই বক্তার কথার মাঝে কথা বলেন না। তিনি বক্তাকে বলতে দেন। তারপর নিজের মতামত দেন। এমনকি কারও ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়াও তাঁর নীতিবিরুদ্ধ। এক্ষেত্রেও হেরাসের কথা মন দিয়ে শুনলেন।

নিজের বলা শেষ হলে জিজ্ঞাসা করল হেরাস, এবার আপনি বলুন গুরুদেব, আমাদের মহান রাজার কর্তব্য কী? আপনার পরামর্শ নিয়ে দ্রুত ফিরে যাব সডগিয়ায়। সেখানে আপনার সুপরামর্শের আশায় অপেক্ষা করছেন আমাদের সম্রাট। 

অ্যারিস্টটল উঠে দাঁড়ালেন। একটি শব্দও উচ্চারণ না-করে চলে গেলেন পাশের ঘরে। তাহলে কি লিখবার সরঞ্জাম আনতে গেলেন গুরুদেব? শিষ্যকে লিখে জানাবেন তাঁর মতামত? ভাবল হেরাস। কিন্তু বিস্মিত হয়ে সে দেখল অ্যারিস্টটল একটা বিরাট আকারের ছুরি নিয়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। সোরেস আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে তো কোনও অন্যায় বাক্য বলেনি! মহারাজার হুকুম তামিল করেছে মাত্র! অ্যারিস্টটল তার দিকে দৃকপাত না-করে ছুরি নিয়ে চলে গেলেন বাগানের দিকে। তাকে যে হত্যা করতে ছুরি হাতে নেননি গুরুদেব, তাতেই সে আশ্বস্ত হয়ে তাঁর পিছন পিছন চলে এল বাগানে। অবাক হয়ে দেখল অ্যারিস্টটল ছুরিটা দিয়ে একের পর এক গাছের শুকনো ডাল কেটে চলেছেন। হলুদ হয়ে যাওয়া ডালপালা ছেঁটে দিচ্ছেন তিনি। কী আশ্চর্য! একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয় জানতে সে এখানে এসেছে, সেসব গুছিয়ে বলেওছে। আর অ্যারিস্টটল সেসবের জবাব না-দিয়ে গাছপালা কাটছেন! হেরাসের মনে হল, আমাদের সম্রাট বদরাগী। আচমকা সেনা বা সেনাপতির ওপর রেগে যায়। যদিও সেই রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।  আর তাঁর গুরুদেব কেমন যেন আধ-পাগল। সবকিছু শুনেই নির্বিকার হয়ে বাগান পরিচর্যা করে চলেছেন। রাজার গুরু বলে কথা! তাঁর সঙ্গে তো আর খারাপ আচরণ করা যায় না। অপেক্ষা করতেই হবে তাকে। এই ভেবে হেরাস চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তফাতে।

কিছুক্ষণ পরে সমস্ত কেটে ফেলা ডালপালা জড়ো করে একটা গর্তের মধ্যে ফেললেন অ্যারিস্টটল। বিড়বিড় করে বললেন, এগুলো এখানে জমা থাক। এর থেকে ভালো সার হবে। এই বলে তিনি বাগানের মধ্যে থাকা একটা পাথরের ওপর বসে পড়লেন। বহুক্ষণ বাদে গুরুদেবের মুখে এইটুকু বাক্য শুনতে পেল হেরাস। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে বলল, আমাকে আপনার পরামর্শটা জানান মহামান্য। আমি দ্রুত ফিরে যেতে চাই। মহারাজা উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন।

অ্যারিস্টটল মুখ তুলে তাকিয়ে ভালো করে জরিপ করলেন তরুণ সেনাটিকে। তারপর কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, আলেকজান্ডার যা জানতে চেয়েছে, আমি তো তার জবাব দিয়ে দিয়েছি!

জবাব দিয়ে দিয়েছেন! কখন দিলেন! এই নিয়ে তো একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি গুরুদেব! এবার সে নিশ্চিত হয়ে গেল, সে যা ভেবেছিল, ঠিক তাই। এই বৃদ্ধ ছিটগ্রস্ত। তবু সে আর-একবার জানতে চাইল, তাহলে আমি মহারাজাকে গিয়ে কী বলব?

 

(ক্রমশ:)

চিত্র- অন্তর্জাল 

রবিবার, ৭ মার্চ, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                                                    






আলেকজান্ডারের স্বপ্ন


 

হেফাস্টিয়ান, অত্যন্ত জরুরি ব্যপারে তোমাকে ডেকেছি। আলেকজান্ডার তাঁর প্রিয় সহচর ও প্রধান পরামর্শদাতার দিকে তাকিয়ে বললেন।

বলুন মহারাজা! আপনি কি নতুন কোনও অভিযানের কথা ভাবছেন? বেশ কিছুক্ষণ আগেই রাজা আলেকজান্ডারের সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন আবার তাঁকে ডেকে পাঠানোয় একটু অবাকই হয়েছেন হেফাস্টিয়ান।

হুম। ঠিকই ধরেছ। এই কারণেই তোমাকে এত ভালোবাসি  হেফাস্টিয়ান।

স্মিতহাস্যে আলেকজান্ডারের প্রশংসা উপভোগ করলেন হেফাস্টিয়ান। তিনি জানেন ম্যাসিডোনিয়ার রাজা, সদ্য পারস্যজয়ী আলেকজান্ডার তাঁকে কতটা ভরসা করেন। তিনিও তার প্রতিদান দেন সর্বদা সুপরামর্শ দিয়ে। তিনি মহারাজের প্রায় ছায়াসঙ্গী বলা যায়। মুখের হাসি ধরে রেখেই হেফাস্টিয়ান বললেন, এবার কোনদিকে আমাদের বিজয়রথ এগিয়ে নিতে চান রাজা?

ভারতবর্ষ! আমি এই মুহূর্তে ভারতবর্ষ অভিযান ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না। সোনার এক দেশ ভারতবর্ষ। এশিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।

বেশ মহারাজ। আমরা তাহলে তারই প্রস্তুতি নিই।

কিন্তু হেফাস্টিয়ান, শুধু ভারতবর্ষ অভিযানের কথা বলার জন্য তোমাকে ডেকে পাঠাইনি। তা নিশ্চিত তুমি বুঝতে পেরেছ। আমি সংবাদ পেয়েছি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে আমারই কয়েকজন সেনাপতি। সে ব্যাপারেই তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।

ষড়যন্ত্র? মুখের রেখায় যতটা সম্ভব বিস্ময় এঁকে বললেন হেফাস্টিয়ান। ইতিমধ্যে তাঁর কানেও এইরকম একটি সম্ভাবনার কথা এসেছে। কিন্তু নিশ্চিত না-হয়ে রাজাকে বিষয়টা বলতে চাননি তিনি। এদিকে জেনেও তাঁকে না-জানানোর ব্যাপার বুঝতে পারলে ক্ষুব্ধ হবেন রাজা। তাই বিস্ময়ের ভাব ফুটিয়ে তুলতেই হয়েছে। অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আপনাকে এই সংবাদ কে দিল মহারাজা?

গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি আমি। এবং নির্ভুল সংবাদ। বেশ জোরের সঙ্গে বললেন আলেকজান্ডার।

যে সূত্র থেকে হেফাস্টিয়ান ষড়যন্ত্রের কথাটা শুনেছেন, তার কথা ঠিক বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। আলেকজান্ডারের মতো এমন একজন রাজার বিরোধিতা কেউ করতে পারে! গভীর ভাবনায় তিনি যখন ডুবে আছেন, তখন আলেকজান্ডার বলে উঠলেন, আমি ম্যাসিডোনিয়ার সন্তান। তাই ম্যাসিডোনিয়ান ভাষায় কথা বলি। মাতৃভাষায় কথা বলতে আমার সবথেকে ভালো লাগে। গ্রিক সেনাপতিরা এতে নাকি ক্ষুব্ধ! তাদের জাত্যাভিমানে আঘাত লাগে! গ্রিক হল মহান কবি হোমারের ভাষা। আমার গুরু অ্যারিস্টটলের ভাষা। আমি তো সেই ভাষাতেও কথা বলি মাঝে মাঝে! তাও এদের এত ক্ষোভ?

মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন হেফাস্টিয়ান। তাঁর মনে পড়ে গেল, কয়েকদিন আগেই আলেকজান্ডার বিশাল সেনা সমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে একে একে সেনাপতিদের নাম ধরে ডাকছিলেন। গ্রিক সেনাপতিদের সঙ্গে গ্রিক ভাষাতেই কথা বলছিলেন। এসব ভেবেই হেফাস্টিয়ান বললেন, আপনি বিচলিত হবেন না মহারাজ! ম্যাসিডোনিয়ার সৈন্যসংখ্যা পঁয়ত্রিশ হাজার। আর গ্রিক সেনাদের সংখ্যা মাত্রই সাত হাজারের কিছু বেশি। গ্রিকরা খুব-একটা সুবিধে করতে পারবে না।

তা ঠিক হেফাস্টিয়ান। তবে শত্রু যত সামান্যই হোক তাদের অবহেলা করা যথাযথ মনে করি না আমি। আসলে আমি চাই ষড়যন্ত্রের বিনাশ হোক। ষড়যন্ত্র যদি সত্যিই দানা বাঁধে, তাহলে সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তখন সেনাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না ঠিকভাবে। আমি সেইরকম পরিস্থিতি আসুক চাইছি না।

ঠিক বলেছেন মহারাজ। সবার আগে প্রয়োজন এই ষড়যন্ত্রকারীদের শক্ত হাতে দমন করা।

ঠিক। ঠিকই তাই। তুমি ভাবতে পারো হেফাস্টিয়ান, অশ্বারোহী কমান্ডার ফিলোটাসকে আমি বন্ধু মনে করি। তাকে নানাভাবে সুযোগসুবিধা দিই। সেও কিনা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে! সেনাপতি ক্লোটিয়াস, আমারই মাতৃভূমি মেসিডোনিয়ার সন্তান। সেও ষড়যন্ত্র করছে আমাকে সরিয়ে দেওয়ার! আমাকে এরা হত্যা করতে চায়!

এদের কঠিন শাস্তি দিন মহারাজ। মৃত্যুদণ্ডই এদের প্রাপ্য।

এত দ্রুত কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না হেফাস্টিয়ান। আরও ভেবে দেখতে হবে। এতদিন ধরে এরা আমার সঙ্গে আছে। নানা যুদ্ধে আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। আচমকা তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। আরও একটু ভাবতে দাও। এদের অভিসন্ধি ভালোভাবে না-জেনে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে হেফাস্টিয়ান।

রাজার কথা শুনে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন হেফাস্টিয়ান। কিন্তু আর কোনও মন্তব্য করলেন না। আলেকজান্ডারের মতামতের অপেক্ষায় থাকলেন।

এরা আসলে ভারতবর্ষ অভিযানে যেতে চাইছে না। সৈন্যদেরও ভুল বোঝাচ্ছে। আমি স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছিলাম, ভারতবর্ষ অভিযানই আমাদের শেষ অভিযান। এই দেশ জয় করে আমরা ফিরে যাব আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে। এটুকু ধৈর্য তাদের থাকবে না! গ্রিকরা বীরের জাতি। তাদের পক্ষে যুদ্ধ না-করার বাহানা মেনে নেওয়া যায় না হেফাস্টিয়ান! অধৈর্য হয়ে বললেন আলেকজান্ডার।

সত্যিই তাই। আমাদের কাছে আছে বিশাল সেনাবাহিনী। তারা যুদ্ধে ভীষণ দক্ষ। এমনিতেই আমাদের বিশাল সাম্রাজ্য। আরও অনেক রাজ্য জয় করে অনায়াসে আমরা সাম্রাজ্য বাড়িয়ে নিতে পারি। বললেন আলেকজান্ডারের পরামর্শদাতা।

সেকথাই তো বলতে চাইছি হেফাস্টিয়ান। কত সৈন্যসামন্ত আমাদের। নানা দেশের। নানা জাতির। অথচ কী আশ্চর্য, সবচেয়ে বেশি ষড়যন্ত্র করছে আমার স্বদেশের মেসিডোনিয়ান আর গ্রিকরা! এই সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করতেই হবে। ভারতবর্ষ অভিযান আমার স্বপ্ন হেফাস্টিয়ান। একে সফল করতেই হবে। তারপর ফিরে যাব স্বদেশে। কিন্তু কীভাবে এদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় ভাবতেই হবে।


(ক্রমশ:)

চিত্র- অন্তর্জাল 

জয়তী রায় ( মুনিয়া

                                                                     




 পর্ব __৪

   মধ্যবয়স/ মুড সুইং/ যৌনতা

________


 মেজাজ হল আসল রাজা... এই প্রসঙ্গে লিখে চলেছি। মধ্যবয়স এখন বিষয়। মানুষের কঠিনতম সময়। না ঘরকা না ঘাটকা। না যৌবন না বৃদ্ধ। বিদেশে সমস্যা একটু কম। কারণ সেখানে মোটেই শুনতে হয়না - বুড়ো বয়সে লাল রঙ পরেছে! অথবা, প্রতি কথায় - আমি তো বুড়ো। 

 অথবা বুড়ি। 

    বয়স বাড়বে এটা যেমন স্বাভাবিক তেমন প্রত্যেক বয়সের একটা নাম থাকা স্বাভাবিক।  যেমন ছোটবেলা তেমন বুড়োবেলা। তাতে কি এলো গেলো? হ্যাঁ। শারীরিক সমস্যা বেড়ে যায়। সেটাও ঠিক রাখা যায় অনেকটা। চুলের রঙ সাদা হলে মনের রঙ কেন হবে বিবর্ণ? মনের সুবিধে বরং বেশি, তাতে রঙ না লাগিয়েও সবুজ থাকা যায়। 

 মধ্যবয়স নিয়ে মাথা ব্যথার অন্ত নেই সমাজের। যেমন: 

দ্যাখ, কেমন হই হই করছে। যেন পঁচিশ বছর। 

দ্যাখ, কেমন জোরে কথা কইছে। 

দ্যাখ, কেমন সেজেছে। যেন কুড়ি বছর। 

  কেন এমন হবে? পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এত ত্যাগ করতেই বা হবে কেন? হৈ হুল্লোড় আমোদ কেন পড়বে ফাঁকি? 

****

   বারংবার আপনজনেরা মনে করায় আসছে শীতলদিন। সত্যিই আসছে। বাতের ব্যথায় কাবু। সুন্দরী পত্নীর চোখে চশমা। শরীর ভারি। কথা বলতে এগিয়ে আসে না কেউ। একাকীত্ব ঘিরে ধরে। নিমতেতো মেজাজ। মুড খারাপ । রাতে ঘুমের ওষুধ । 

 ৪৫ থেকে ৬০ মানুষের সংকট বয়স। অনেকে বাইরে নিজেকে চাঙ্গা দেখাতে চান বটে, কিন্তু একলা দিনে চলতে থাকে দোলাচল। যেহেতু, নারী পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই শারীরিক পরিবর্তন আসছে, হরমোনের ওঠা পড়ার প্রভাব পড়ছে চুল ত্বক এবং যৌনক্ষমতায়... মানুষ ভুগতে থাকে নিরাপত্তাহীনতায়। অক্ষমতার অবসাদ। 

   ****

    সব বয়স নিয়ে যত্নবান হতে হয়।  বিষাদে ভুগে কোনো লাভ নেই। বয়স আসবেই। আপন মহিমায়।

   একাকীত্ব দূর করার চেষ্টায় নেতিবাচক পথ বেছে নেয় কেউ কেউ। তারুণ্য প্রমাণ করার চেষ্টা অথবা তরুণী প্রমাণের তাগিদ... এটাও কাম্য নয় আবার অযথা নিজেকে বুড়ো ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই।

অনেকেই দাম্পত্য জীবন নিয়ে হতাশায় ভোগেন। একঘেঁয়ে লাগে। বিয়ে যেন একটা কাজ।করে ফেলা হয়ে গেছে। ব্যাস। সেটা নিয়ে আবার ভাবার কি আছে? 

মুশকিল হল, সেটা নিয়েই ভাবতে হবে। ওই একটা জায়গা থাকে নিজের এবং সুরক্ষিত। দাম্পত্য জীবন বেশিরভাগ সময় এইবয়েসে এসে সংকটে ভুগতে থাকে। স্বামী স্ত্রী আলাদা বেডরুম ব্যবহার করেন। এ আলো জ্বালায় তো ও নাক ডাকে। ঠাণ্ডা মেশিন লাগে কারো কেউ বা ফ্যান চালাবে। কিটকিট। কুটকুট। স্বামী স্ত্রীর পরস্পরের স্পর্শ সুখ? দূর। বুড়ো বয়সে ওসব হয় না কি? এখন চুপ করে যেতে হবে। আশ্রম যেতে হবে। অঙ্ক কষে চলতে হয়। কে কি বলল? কে কি ভাবল? 

****

 মধ্যবয়স শরীরের হয়। মনের হয়না। তাই বলি, বুড়ো হতে থাকুন। বুড়োটে নয়। বদল আনতে হবে চিন্তায়। 

 সত্যি বলতে কি, মধ্যবয়স সবচেয়ে বেশি সুখী হওয়ার বয়স। সন্তান যদি সফল হয়, তবে স্বামী স্ত্রী নতুন করে নিজেকে চিনে নেওয়া ভালো। একসঙ্গে অনেকদিন থাকলেই একঘেঁয়ে হবে সম্পর্ক... কে বলেছে? দুজনের পছন্দের অমিল হতেই পারে। কবিতা ভালো নাই লাগতে পারে, কিন্তু সেই মানুষটাই মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। কম বয়সে শরীরের জোর থাকে কিন্তু মনে থাকে হাজার চিন্তা। সদ্য জন্মানো সন্তান, চাকুরীর টেনশন, বাড়িতে লোকজন... ওই সময় উপভোগ করা যায়না জীবন।  বরং মধ্যবয়স অনেক ফুরফুরে। এই বয়সে সুস্থ যৌনতা জীবন রঙ্গীন করে তোলে। সুগার প্রেশার কন্ট্রোল করে। ত্বক টানটান রাখে। সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহ যোগায়। মধ্যবয়সে পরস্পরকে নতুন করে চিনতে হয়।  এর ফলে,প্রতিদিন উজ্জ্বল থাকা যায়। অবসাদ কাটতে থাকে। বলা যায়না, খুঁড়িয়ে চলা স্বাস্থ্যবতী বউ চমকে দিল জিন্স পরে। সমস্যা হল, জীবন রঙিন করতে হোটেলে খাবার খেতে গেলে। পকেটে টান। পেট খারাপও হতে পারে। বাড়ির রোজকার ঝোল ভাত সাজিয়ে দেওয়া যাক নতুন কেনা বাসনে।  একটু বয়স বেড়ে গেলে, বাইরের রান্না কিন্তু বিপদ ডেকে আনতে পারে। ঝোল ভাত সুস্বাদু আর নিরাপদ ।  দাম্পত্য জীবন ঠিক তাই। এখানে চনমনে থাকলে, প্রতিদিনের কাজ সুন্দর হতে বাধ্য।  মনে রাখতে হবে, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তি নিয়েই জীবন। একজীবনে সবটুকু পাওয়া হয়না। ছাড়তে জানলে যেটুকু পেয়েছি তাই নিয়েই দিব্য থাকা যায়। 

কোনো কারণবশত ,একলা হয়ে গেলে পছন্দ মত বন্ধু অথবা বান্ধবী অথবা সমলিঙ্গের কাউকে সঙ্গী করা যেতেই পারে। অযথা একলা কাটিয়ে কি লাভ? 

 আমার পরিচিত একজন ৬৫ বয়সের পুরুষ, স্ত্রী মারা যাবার পরে স্বীকার করেছেন যে উনি আসলে পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হতেন বেশি। আজ উনি একজন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে সুখে আছেন। স্ত্রীর কোনরকম অমর্যাদা তাতে হয়নি। ঘটনাটা বিদেশের। স্বদেশ বিদেশ বলে কথা নেই, বাচ্চা ছেলে মেয়ে ধর্ষণ করার চাইতে অনেক ভালো প্রকাশ্য যৌনতা। সমীক্ষায় প্রমাণিত বয়স্ক মানুষ যৌনতা পছন্দ করেন। জীবনে একজনের আসন খালি হয়ে গেলে বাকি জীবন পড়ে থাকবে মরুভূমির মত? এটা অবশ্য নিজস্ব পছন্দের বিষয়।  পছন্দ প্রকাশ্য হওয়াই ভালো।

*****

মধ্যবয়সে নতুন করে বন্ধু খুঁজবেন না। নিরাপদ একাকীত্ব ভালো। কারণ, মতের অমিল থেকে শুরু করে আরো নানান ঝামেলা তরুণ বয়স নিতে পারে, এই বয়সে সম্ভব না। অনেকে প্রমাণ করতে চান নিজের জনপ্রিয়তা। তাই, বন্ধুত্ব করতে চান। সোশ্যাল মিডিয়া সুযোগ করেও দিয়েছে। মনের উপর চাপ না বাড়লে ঠিক আছে। তবে, উল্টোটা হলে বেরিয়ে আসুন বৃত্ত থেকে বা গ্রুপ থেকে। একাকীত্ব অভিশাপ নয়। কখনো কখনো আশীর্বাদ বটে। ইতিবাচক ভাবে নিতে হয়। বহু বই পড়া বাকি। গান সিনেমা... চেষ্টা করতে দোষ কি।

****

প্রথম কাজ হল, নিজেকে বুড়ো ভাবা ছেড়ে দিতে হবে। 

জীবন যাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। শরীরের যত্ন নিতে তো হবেই। সেইসঙ্গে মনের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। 

আর পারি না। হচ্ছে না... এই ধরণের নেতিবাচক সংলাপ কম ব্যবহার করলে ভালো হয়। 

সঙ্গ এমন হোক, যে উৎসাহ দেয়। যার বোধ পরিষ্কার।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হল সুস্থ দাম্পত্য জীবন। বেশির ভাগ মনের রোগ এখান থেকেই হয়। নারীরা আক্রান্ত হন বেশি। কারণ তারা সংবেদনশীল প্রাণী। পুরুষের মনোযোগ তাদের কাম্য। আবার, নারীরাই দূরে ঠেলে দেয় স্বামীদের। সন্তান হয়ে যাবার পর, বেশিরভাগ স্ত্রী আর প্রেমিকা থাকে না। মা হয়ে যায়। 

মনে রাখতে হবে, মাতৃত্ব মানে নারীত্ব বিসর্জন দেওয়া নয়। তিরিশ বছর বিবাহ বার্ষিকীর ছবি সোশ্যাল মিডিয়া না দেখলেও চলবে। বরং, সন্ধ্যে সাতটায় দুই কাপ চা নিয়ে বসে পড়া যাক। কাপদুটোর মধ্যে কিছু রঙিন কারিকুরি থাক। 

জীবন সবসময় রঙ দিয়ে ভরিয়ে রাখতে চায়। দোষ জীবনের নয়। ভাবনার। 

আজ থেকে তাই বুড়ো হতে রাজি। বুড়োটে হতে নয়।



রিনি গঙ্গোপধ্যায়

                                     


                   

 

 



এই সংখ্যার কবি রিনি গঙ্গোপধ্যায়। পেশায় অধ্যাপক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ৷আসুন পড়া যাক কবিতা।

অননুমোদিত - কবিতা

 

 

অনুমোদনের পরোয়া করে না যে দ্রোহকাল

আমি কখনো ছিলাম না সেখানে

আমি চিরকেলে বাধ্য, সতর্ক, সাবধানী

তাই সম্পর্কের সৎকারকরিনি আমি

গ্রহণ করিনিমৃতদেহ

শুধু প্রতি রাতে নিয়ম করে সঞ্চয় করেছি বিষ।

 

ব্যাকুলতার ধ্বনি বাজে মন্দিরে

নিঃস্ব প্রেম আসলে ঈশ্বরের মতো

তাই বারবার ফিরতে হয়ভালোবেসে

এ জীবন বৈষ্ণব পদাবলী নয় জেনেছি বহুমূল্যে

তাই বুঝি ভালোবাসার চিৎকারে লজ্জা মাখা থাকে 

মুহূর্ত স্মরণে থাকে ফিরে যাওয়ার আর্জি

একটিমাত্র ছাতার তলায়আধভিজে শরীরের গন্ধ ক্লান্ত করে ভীষণ

ইজাজত চায় কবরের মাটি

যোগিনীর সতীত্বের শ্লাঘা অপার

আমি তাই বিসর্জন দিলাম যোগিনীপনা এবং সতীত্ব।

 

আজকাল আঘাত পেতে পরিসর বানাই

 কড়াপড়ে যাওয়া আঙুলে রাখি অপেক্ষা

সঙ্গের পুরুষটিকে উত্যক্ত করি

বলি ভাদ্র মাসের কুকুর

প্রবল যৌনতার মুখে নুন পড়ার মতো সে ছিটকে ওঠে

কিন্তু ছেড়েযায় না, প্রাণান্তকামড়বসায়

রক্ত চুঁইয়েপড়ে পাথরে পাথরে নিঃশব্দে

নরম পলির স্তর কেমন করে পাথর হলো জানতে চেও না

শুধু জেনো রক্তধারায় ভেসে যায় আমার ব্যাকুল শোক।

 

 

 

রক্ত জমাট বেঁধে হাসপাতালের চাতালে ছড়িয়ে থাকে জন্মদাতা

শেষ কথা বলার রাতেও যিনি খানিকটা ঘৃণা উগরেদিয়েছিলেন আমার হাতে

ঘুটিসাজিয়ে বসে আমি অপেক্ষা করি দান দেওয়ার

এবারেনিশ্চিৎ জিতেরপ্রত্যয় থাকে অবিরাম চলাচলে

এ চলাচল তাঁর পরিচিত

তাই এই শেষবার তিনি নিজেকে তুলে নেন

আমার জন্য সাজিয়ে রাখেন হাড়ের মালা

মৃত পিতার শেষ সম্বল

 বহন করে আমার আমৃত্যুপরাজয়ের চিহ্ন।

 

 

আর কিছু ভাবিনি আমি

শুধু বইয়েদিয়েছি আমার পৈশাচিক উল্লাস

আমারই মৃতদেহঘিরে।

 

 

শীতল থাপ্পড়উড়ে আসে হৃদয়ক্ষতে

এ ক্ষতের মার্জ্জনা নেই

দুর্বলতাবড়ো নিদারুণ অপরাধ।

 

 

তুমি নাই বা জানলে

তবু থাকবে আমার প্রেম

প্রতিহিংসা ভরা খাতায়।

 

 

কোনো স্মৃতির কাছে কখনো ভিক্ষে চাইব না

ভুল করেও গেয়ে উঠবো না কোনো বিরহ-গান

যন্ত্রণার মধ্যে যে অসহায়চিৎকার ছিল, তার জন্য আমি লজ্জিত

আর যাই হোক, পায়ে ধরে যে প্রেম পাওয়াযায় না,

দু-দশকে তা সম্যক জেনেছি।

 

 

 

মৃতের সামনে বসে অভ্যেস করি নির্লিপ্তি

শরীর জুড়ে থাকে রামধনু

বৈরাগ্য দিয়েঢাকি।

 

 

১০

প্রেম তো বটেই

এই কবিতাগুচ্ছেরপায়ে

প্রতিহিংসাও বিসর্জন দিলাম আমি।

 

রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

অধ্যাপক, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ

 

ঠিকানা-

রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

 

 

অননুমোদিত - কবিতা

 

 

 

অনুমোদনের পরোয়া করে না যে দ্রোহকাল

আমি কখনো ছিলাম না সেখানে

আমি চিরকেলে বাধ্য, সতর্ক, সাবধানী

তাই সম্পর্কের সৎকারকরিনি আমি

গ্রহণ করিনিমৃতদেহ

শুধু প্রতি রাতে নিয়ম করে সঞ্চয় করেছি বিষ।

 

ব্যাকুলতার ধ্বনি বাজে মন্দিরে

নিঃস্ব প্রেম আসলে ঈশ্বরের মতো

তাই বারবার ফিরতে হয়ভালোবেসে

এ জীবন বৈষ্ণব পদাবলী নয় জেনেছি বহুমূল্যে

তাই বুঝি ভালোবাসার চিৎকারে লজ্জা মাখা থাকে 

মুহূর্ত স্মরণে থাকে ফিরে যাওয়ার আর্জি

একটিমাত্র ছাতার তলায়আধভিজে শরীরের গন্ধ ক্লান্ত করে ভীষণ

ইজাজত চায় কবরের মাটি

যোগিনীর সতীত্বের শ্লাঘা অপার

আমি তাই বিসর্জন দিলাম যোগিনীপনা এবং সতীত্ব।

 

আজকাল আঘাত পেতে পরিসর বানাই

 কড়াপড়ে যাওয়া আঙুলে রাখি অপেক্ষা

সঙ্গের পুরুষটিকে উত্যক্ত করি

বলি ভাদ্র মাসের কুকুর

প্রবল যৌনতার মুখে নুন পড়ার মতো সে ছিটকে ওঠে

কিন্তু ছেড়েযায় না, প্রাণান্তকামড়বসায়

রক্ত চুঁইয়েপড়ে পাথরে পাথরে নিঃশব্দে

নরম পলির স্তর কেমন করে পাথর হলো জানতে চেও না

শুধু জেনো রক্তধারায় ভেসে যায় আমার ব্যাকুল শোক।

 

 

 

রক্ত জমাট বেঁধে হাসপাতালের চাতালে ছড়িয়ে থাকে জন্মদাতা

শেষ কথা বলার রাতেও যিনি খানিকটা ঘৃণা উগরেদিয়েছিলেন আমার হাতে

ঘুটিসাজিয়ে বসে আমি অপেক্ষা করি দান দেওয়ার

এবারেনিশ্চিৎ জিতেরপ্রত্যয় থাকে অবিরাম চলাচলে

এ চলাচল তাঁর পরিচিত

তাই এই শেষবার তিনি নিজেকে তুলে নেন

আমার জন্য সাজিয়ে রাখেন হাড়ের মালা

মৃত পিতার শেষ সম্বল

 বহন করে আমার আমৃত্যুপরাজয়ের চিহ্ন।

 

 

আর কিছু ভাবিনি আমি

শুধু বইয়েদিয়েছি আমার পৈশাচিক উল্লাস

আমারই মৃতদেহঘিরে।

 

 

শীতল থাপ্পড়উড়ে আসে হৃদয়ক্ষতে

এ ক্ষতের মার্জ্জনা নেই

দুর্বলতাবড়ো নিদারুণ অপরাধ।

 

 

তুমি নাই বা জানলে

তবু থাকবে আমার প্রেম

প্রতিহিংসা ভরা খাতায়।

 

 

কোনো স্মৃতির কাছে কখনো ভিক্ষে চাইব না

ভুল করেও গেয়ে উঠবো না কোনো বিরহ-গান

যন্ত্রণার মধ্যে যে অসহায়চিৎকার ছিল, তার জন্য আমি লজ্জিত

আর যাই হোক, পায়ে ধরে যে প্রেম পাওয়াযায় না,

দু-দশকে তা সম্যক জেনেছি।

 

 

 

মৃতের সামনে বসে অভ্যেস করি নির্লিপ্তি

শরীর জুড়ে থাকে রামধনু

বৈরাগ্য দিয়েঢাকি।

 

 

১০

প্রেম তো বটেই

এই কবিতাগুচ্ছেরপায়ে

প্রতিহিংসাও বিসর্জন দিলাম আমি।

 


 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                        





মধ্যবয়স/ নাচ / মেজাজের পারদ


________________________

 মধ্যবয়স। মরুভূমির মত। অতিক্রম করা মুশকিল। নতুন যৌবনের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকানো। চলে যায়... চলে যায়... বসন্তের দিন চলে যায়... ! 

 দীর্ঘ যাত্রাপথ। ধীরে ধীরে চলতে হয় বার্ধক্যের দিকে। শরীরে বাসা বাঁধে হরেক রোগ। ডাক্তার ভরসা। বেঁচে থেকে আর কি হবে... এমন বোধ। কেউ মনোযোগ দেয়না। কেউ বসে কথা শোনে না। 

কিছু কিছু সেলিব্রেটি,  আরো করুণ অবস্থায় পৌঁছে যান। বয়স ভুলে থাকার নানারকম প্ররোচনা কাজ করে তাদের চারিদিকে। জেনে বুঝে হলেও সেই ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেন, সাময়িক উত্তেজনার জন্য। এটা মহিলা পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়। 

 বার্ধক্য গুটিগুটি এগিয়ে আসে। অবোধ মানব ব্যায়াম করে, পার্লার যায়, সাজুগুজু করে। খুব ভালো করে। তারপর দিনের শেষে একাকীত্বে ভুগতে থাকে। কুয়াশার মত ঘিরে ধরে একাকীত্বের বোধ। 

 *****

  মধ্যবয়সে বিষাদ, খুব স্বাভাবিক। আমি যেটা বারবার বলি...সেটা হল, সমস্ত কিছু স্বাভাবিক ভাবতে হবে। আমার কিছু ভালো লাগছে না... এটা কখনো অকারণ নয়। তুচ্ছ করার নয়। বিলাসিতা নয়। ভালো না লাগার পিছনে কারণ আছে। এবার দেখতে হবে সেই কারণ কতখানি গুরুতর? বা, কেন হল সে কারণ? কোনো মৃত্যুশোক? সন্তানের কঠিন ব্যবহার? পারিবারিক অসাফল্য? চূড়ান্ত অবমাননা? প্রতারণা? ক্যান্সার? মৃত্যুর পরোয়ানা? 

সেইসঙ্গে বয়সের প্রকাণ্ড ভার! 

হতাশ মানুষ ভাবে, আর পারা যায় না! সত্যিই তাই। আর পারা যায় না! মনের জমি ধূ ধূ করছে। শূণ্য। সে জমিতে একটি গাছ নেই, যার নিচে আশ্রয় নিতে পারে তাপিত মধ্যবয়স! সুতরাং... ! দারুণ দুঃসহ দিন। প্রতিদিন!

******

 তবে উপায়? আছে বইকি। বৃদ্ধ বয়স নিরাপদ করতে ব্যাংকে টাকা রাখি। ফিক্সড ডিপোজিট করি। আরো কি কি জানি করি।

 অথচ,  বৃদ্ধ হতে থাকে সময়ও। তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য চল্লিশ বছর বয়স থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমে তৈরি করতে হয় মনের জমি। তাতে লাগাতে হবে কিছু গাছ। দিনে দিনে বেড়ে উঠুক। ডালপালা মেলে দিক। 

যৌবন থেকে বর্ধ্যকের দিকে যেতে যেতে সেই সব চেতনার বৃক্ষ আশ্রয় হোক আমার। দুঃখের ঝড়, বিষাদের বৃষ্টি... ওদের ডালপালা ভেদ করে পড়বে হয়ত দু এক ফোঁটা অশান্তি। কিন্তু, ক্ষতি হবে না বিশেষ। 

********

 মধ্য বয়সে অনেকেই লাফিং ক্লাবে যোগ দেন। সুগার প্রেসার ভালো থাকে। আমি বলি কি, নাচবেন একটু? কোমর দোলাবেন? লজ্জা পাবেন না। আদিমযুগ থেকেই নাচ একটি অদ্ভুত থেরাপি। মহিলার হাত ধরে নাচ মানেই অসভ্যতা নয়। ভালো থাকা। অসভ্যতা করে ভালো থাকা যায় না। কিন্তু, একটা সুন্দর মিউজিকের সঙ্গে পা মেলালেন, সঙ্গী হল বিপরীত লিঙ্গের কেউ, খুব খুব ভালো থাকা যায়। লিঙ্গ দেখবেন না। মানুষ দেখুন।

  আজকাল অনেক কফি হাউস হয়েছে। গম্ভীর মুখে কফি খায় তরুণ প্রজন্ম। এমন এক ভাব, যেন কোনোদিন তারা আর বুড়ো হবে না! কেন এমন? কেন গিটার বাজে না? কেন কোনো বয়স্ক সেখানে অনাহুত? কেন হাতে হাত মিলিয়ে পায়ের ছন্দে মেতে উঠবে না দুই প্রজন্ম? তরুণ আর মধ্যবয়স? 

 এতে মস্তিষ্ক সতেজ থাকে। অ্যালজাইমার দূরে যায়। বিষাদ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। আমি যার সঙ্গে সপ্তাহে দুই দিন নাচি, সেই মেয়েটি আর আমার ছেলে একই সালে জন্মেছে। ছেলে লন্ডনে। তাতে কি? সে মেয়ে আর আমি নাচি। শেষ হলে হালকা  হয় শরীর এবং মন। 

  সমাজ সুন্দর হয় সকলকে নিয়ে। তারুণ্যের মত সুস্থ বার্ধক্য প্রয়োজন। তাই, বৃদ্ধ মানুষের মন ভালো থাকা জরুরি। মেজাজের পারদের ওঠা নামা নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে। প্রেসার সুগার কন্ট্রোলে আসবে।

 একটু নেচে ওঠো। বদলে যাবে দুনিয়ার রঙ। লজ্জা নয়। প্রয়োজন।