ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মানসী গাঙ্গুলী

                            


 গৃহপ্রবেশ 

       নির্ঝরের বাড়ির আজ গৃহপ্রবেশ। অনিতার নিমন্ত্রণ। কি উপহার দেবে ভেবে নিজের হাতে একটা টুকরো কাপড়ে ফেব্রিক রং দিয়ে আঁকা ছবি বাঁধিয়ে এনেছে সে। আরে, এটা তো সেই পুরনো বাড়িটাই, তবে কি নির্ঝর পুরনো বাড়িটা কিনে নিয়েছে! মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগলেও ওদের পুরনো বাড়ির নতুন রূপায়ন বাইরে থেকে দেখতে বেশ লাগছে অনিতার। দরজার দুপাশে দুটো ঘট ও কলাগাছ, দরজার মাথায় তেল সিঁদুর দিয়ে ওঁ চিহ্ন ও একপাশে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা। পুরোহিতমশায়ের মন্ত্রোচ্চারণে বাড়ী গমগম করছে। নির্ঝর কোনোদিনই পুজোপাঠে বিশ্বাসী ছিল না। এ নিয়ে মাসিমার কিছু ক্ষোভও ছিল, কিন্তু নির্ঝর হেসেই উড়িয়ে দিত।
       সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে নির্ঝরকে লাগছে বেশ। আর ওর বউ ঝুমা লালপাড় সাদা শাড়ি পরে পুরোহিতমশাইকে হাতে হাতে সব এগিয়ে দিচ্ছে, ধুনুচিতে হাওয়া দিচ্ছে। ঘর ধূপধুনোর গন্ধে ভরপুর, বেশ একটা পবিত্র, মাঙ্গলিক পরিবেশ।
        ওরা কলেজের বন্ধু, একসময় প্রায় নিত্য ওদের বাড়ি যাতায়াত ছিল অনিতা ও আরও চার বান্ধবীর। এখন অনিতার সঙ্গেই কেবল যোগাযোগ আছে নির্ঝরের, বাকিরা ছিটকে গেছে। ওদের দুজনের সঙ্গেই তাদের আর যোগাযোগ নেই। নির্ঝরের বাবা খুব অল্প বয়সে মারা যান, খুব কষ্ট করে বড় হয়েছে ওরা তিনভাই, তবু মাসিমার মুখে কখনও দুঃখ দেখেনি অনিতা, সর্বদা হাসিমুখ। ওদের বলতেন, "তোরা আসিস তাই একটু রঙিন কাপড় দেখি, এ বাড়ি থেকে তো সব রঙ হারিয়ে গেছে সেই কবে"। খুব শান্ত, ঠান্ডা কিন্তু বুঝদার মানুষ ছিলেন উনি, ছেলেদের নামকরণ থেকেই বোঝা যায় তা -নির্ঝর, কল্লোল, প্রবাহ। নির্ঝর কল্লোল তুলে প্রবাহিত হচ্ছে, আহা।
         ভাড়া বাড়ি, একটা ঘর, এক চিলতে বারান্দা আর ছোট উঠোন পেরিয়ে টালির চালের রান্নাঘর, আরেক দিকে অন্ধকার বাথরুম। এই একখানা ঘরের সংসারেই ছিল আনন্দ, হাসি অত অভাবের মধ্যেও। নিচের তলায় পাশে আরেকটি ঘর, খানিক বারান্দা আর রান্নাঘর ছিল বাড়িওয়ালার, উপরতলায় দুটি ঘর, বারান্দা যেখানে থাকতেন বাড়িওয়ালা ও তাঁর স্ত্রী। ওনাদের কোনো সন্তানাদি ছিল না। দুজনেরই যথেষ্ট বয়স হয়েছে, অসুস্থ হলে নির্ঝরই ডাক্তার, ওষুধ এসবের জন্য ছোটাছুটি করত, আর ওর মা তাঁদের সেবা, পথ্য, আহারের দায়িত্ব নিতেন নিজের থেকেই। এই বাড়িওয়ালার ছিল একদা সোনার দোকান আর বড়মা, মানে বাড়িউলি, নির্ঝররা তাই বলেই ডাকত, এক গা গয়না পরে থাকতেন সর্বদা।
        অনিতার আজ সব ধারাবাহিকভাবে মনে পড়ছে। শাঁখঘন্টার আওয়াজে মাঝে মাঝে সম্বিত ফিরলেও অল্প পরেই আবার অতীতে ডুবে যাচ্ছে ও। ওই অভাবের সংসারেও মাসিমা রোজ মুড়িমাখা, চা খেতে দিতেন ওদের সবাইকে, কখনও বা নিজে বাড়িতে চপ ভেজে খাওয়াতেন ওদের। তখন ওরা ছোট থাকায় অত ভাবত না রোজ রোজ ওদের কত খরচা হয়ে যায়, আজ অনিতা পরিণত মনে সেসব ভেবে লজ্জা পায়। মনে পড়ে শুভ্রা, রুমা, সুমিতা, গোপালি আর ও এই পাঁচজন বি.এসসি ফাইনাল পরীক্ষার পর প্রায় রোজ ওদের বাড়ি গিয়ে আড্ডা জমাত, তখন খুব তাস খেলার নেশা হয়েছিল ওদের। হৈ হৈ, হুল্লোড়, হাসি দারুণ ছিল দিনগুলো। শুভ্রার হাসিটা ছিল বিখ্যাত, মোড়ের মাথা থেকে শুনতে পাওয়া যেত। রবিবার ওরা যেত না, সবার বাবা বাড়ি থাকতেন, তাই আড্ডা বন্ধ, কিন্তু মাসিমা যেন হাঁপিয়ে উঠতেন। ওদের উচ্ছ্বলতা দেখে নিঃসন্তান বড়মাও ঘরে এসে বসতেন। বড়মা, মাসিমা সবাই ওদের আনন্দে খুশি হতেন, সমবয়সীর মত হইচই করতেন ওদের সঙ্গে। অত অভাবেও মানুষ অমন খুশি হতে পারে এ অনিতার কাছে রীতিমত বিস্ময়কর। ওরই মাঝে শুভ্রা একদিন দুম করে বলে বসল, "এ বাড়ি তো পরে নির্ঝরেরই হবে"। সেদিন থেকে বড়মা শুভ্রার ওপর খুব বিরক্ত, ওর সাথে ভাল করে কথা বলতেন না আর। আসলে ওনার দুর্বল জায়গায় আঘাত লেগেছিল। যেহেতু ওনার সন্তান নেই তাই নির্ঝর, এই জায়গাটায় উনি ব্যথা পেয়েছিলেন খুব।
          এরপর আবার সবার পড়াশোনা শুরু হল, রোজের আড্ডা তো বন্ধই, মাঝে মাঝে এক-আধদিন হতে হতে তাও বন্ধ হয়ে গেল। শুভ্রা কলকাতার এক স্কুলে চাকরি পেয়ে গেল। ও বাবা-মায়ের একই মাত্র সন্তান। তাঁদের দায়িত্ব তাই ওর, চাকরিটা ওর খুব দরকার ছিল। রুমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিয়ে করল বাড়ির অমতে, বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। সুমিতার এক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়ে সে জাহাজে ঘোরে বরের সঙ্গে, আর গোপালী যে বিয়ের পর কোথায় হারিয়ে গেল! অনিতারই কেবল কাছাকাছি বিয়ে হওয়ায় যোগাযোগটা আছে তাও ব্যস্ততায় খুব কম। আগে মাসিমা থাকতে তাও অনিতা স্বামীকে নিয়ে যেত ওদের বাড়ি মাঝেমাঝে, মাসিমা জামাইকেও বেশ পছন্দ করতেন, বড়মাও ভালোবাসতেন ওদের। বড়মা ওদের সবার মধ্যে অনিতাকেই বেশি পছন্দ করতেন। অনিতা কনসিভ করলে ওর বাচ্চার জন্য বড়মা একটি মোহর রেখেছিলেন কিন্তু নিজে হাতে দিতে পারেননি, তার আগেই উনি মারা যান। সেই মোহর পরে মাসিমা অনিতার হাতে দেন বড়মার নাম করে।
         ভাবনার সুর কাটল যখন নির্ঝরের মেয়েটা এসে গলা জড়িয়ে ধরল ওর, একটু আদর করল ওকে। বেশ মিষ্টি হয়েছে দেখতে, অনেকদিন পরে দেখল ওকে। এখন তো এখানে থাকে না, দিল্লীতে থাকে, JNUতে পড়ে। নির্ঝর ছেলেমেয়েদের ভালো জায়গায় দিয়েছে পড়াশুনার জন্য, গাড়ি কিনেছে, পরিবার নিয়ে বিদেশ ঘুরেছে, কলকাতায় ফ্ল্যাট কিনেছে, আজ ও একজন সফল মানুষ। 
           বাড়িতে অতিথিরা আসছেন, নির্ঝর আজ খুব ব্যস্ত। দিনের বেলায় পুজোপাঠ হয়েছে তাই রাতে প্রীতিভোজের আয়োজন। অনিতা সকাল থেকেই রয়েছে। নির্ঝর ওর খুবই বন্ধু, বন্ধুত্বটা খানিকটা ভাইবোনের পর্যায়ে, তাই ওর সাফল্যে অনিতা খুবই খুশি। তবু কেন বারবার চোখের জল চলে আসে, তবু কেন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। ওবাড়িতে যাতায়াত ছিল যখন রোজ তখন মাসিমা, বড়মা সবাই ছিলেন, অনিতা আজ ওঁদের হারাচ্ছে বড্ড বেশি ক্ষণে ক্ষণে আর দেখছে নির্ঝরকে, ওকে তো কতই খুশি দেখাচ্ছে, ওর কি মনে পড়ছে না মায়ের কথা! খুব চুপচাপ রয়েছ অনিতা, হঠাৎ ঝুমার ডাকে সম্বিত ফিরল। ঝুমা ওর নতুন কিছু বন্ধুদের সাথে আলাপ করিয়ে দেবার জন্য ডাকছিল ওকে। সেখানেও মাসিমার কথা উঠল, মাসিমা ঝুমার শাড়িতে ফলস পাড় লাগিয়ে দিতেন, নাচ শিখতে পাঠাতেন, ওর ঘুঙুর বেঁধে দিতেন, সেসব কথা। বউদের মেয়ের মতই ভালবাসতেন। সত্যি কোনো কোনো মানুষের অনুপস্থিতি বড্ড পীড়া দেয়, তেমনই একজন মানুষ ছিলেন মাসিমা। এই মানুষটার ছবিতে মালা দিয়ে দেয়ালে টাঙানো দেখাটাও বড্ড পীড়াদায়ক। মালা গলায় মাসিমার ছবিটা বড় জীবন্ত লাগছে আজ যেন। মনে পড়ছে অনিতার, একদিন দুঃখের দিনের কথা বলতে বলতে মাসিমার মত অমন হাসিখুশি মানুষটার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছিল, গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেসব অপমানের স্মৃতি উনি আমৃত্যু ভুলতে পারেননি। বরাবরই অভাবের ঘরে বাস, তবুও নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আত্মীয়ের বাড়ির বিয়েতে গিয়েছিলেন দু'দিনের জন্য  তিন ছেলেকে নিয়ে। সে বিয়েবাড়িতে এক আত্মীয়ের কানের দুল হারিয়ে যাওয়ায় আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল নির্ঝরকে। সেদিনের সে অপমান ওনাকে প্রতিমুহূর্তে দগ্ধ করেছে। পরে অবশ্য জানা গিয়েছিল যে কানের দুলের জন্য নির্ঝরকে ক্ষণিকের মিথ্যে আসামী হতে হয়েছিল তা তিনি বাড়ি থেকে আনেনইনি বিয়েবাড়িতে। আনতে ভুলে গিয়েছিলেন, পরে বাড়ি ফিরে পেয়েছিলেন। এসব মাসিমা শুধু  অনিতাকেই বলেছিলেন কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে। সেদিন  তিনি বলেছিলেন, অভাব মানুষের সবথেকে বড় শত্রু, তিনি যদি অবস্থাপন্ন হতেন, তাঁর ছেলেকে ওভাবে সবার কাছে ছোট হতে হত না ক্ষণিকের জন্য হলেও।
        কিন্তু নির্ঝরকে আজ খুব খুশি দেখাচ্ছে। আজ বৈভবের আতিশয্যে ওর সে অপমান হয়ত চাপা পড়ে গেছে, সে ক্ষতে হয়তবা প্রলেপ পড়েছে। ভাবে অনিতা, 'থাক নির্ঝর তুই খুশিই থাক'। মাঝে নির্ঝরের সঙ্গে একটা ভুল বোঝাবুঝিতে কিছুদিন দুজনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল না। নির্ঝর তার শ্রীরামপুরের বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় থাকবার জন্য মাসিমাকে সমেত নিয়ে যখন চলে যায় অনিতাকে সে কথা জানায় না সারপ্রাইজ দেবে বলে। আর অল্প কিছু দূরত্বে থাকা অনিতা তা জানতে না  পারায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে আর ওর সঙ্গে কথা বন্ধ করে দেয়। নিত্য হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। নির্ঝর ওকে কিছুতেই মানাতে পারেনি। এরপর যোগাযোগ বন্ধ থাকাকালীনই মাসিমা অগ্নিদগ্ধ হন আর সে খবর নির্ঝর আর জানায়নি অনিতাকে। অনেকদিন পর অনেক নিচে চলে যাওয়া নির্ঝরের নম্বরে ও দেখতে পায় একটা মেসেজ, "মা চলে গেলেন"। কি কারণে যেন সেদিন হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রল করতে গিয়ে অনিতার চোখে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে অনিতা, ততদিনে কাজ মিটে গেছে। খুব কষ্ট হয় অনিতার মাসিমাকে শেষ দেখা দেখতে পেল না বলে। আর আজ যখন নির্ঝরের বাড়িতে উৎসব, চারিদিক মুখর আনন্দ, হাসি, গান, বাজনা আলোর জৌলুসে, তখন অনিতার বুকের ভেতরটা হু হু করছে। ভীষণভাবে মাসিমার অভাব বোধ করছে ও। মাসিমা ওর কাছে মায়ের মতই ছিলেন। খুবই স্নেহশীলা, কাছে গিয়ে বসলে মনে হত যেন এক নিরাপদ আশ্রয়। সেই আশ্রয়টা আজ নেই অনিতার। আজ এত জৌলুসের মধ্যেও নিজেকে কেমন নিরাশ্রয় লাগছে ওর। দেওয়ালে বড় বড় চারটি ছবিতে চন্দন ও মালা পরানো, মাসিমা, মেসোমশাই, বড়মা ও জেঠুর। মেসোমশাইকে ও বরাবরই ছবিতেই দেখেছে, জেঠু ঘরেই থাকতেন, মাঝেমধ্যে দেখতে পেত কিন্তু মাসিমা আর বড়মার স্মৃতি যে বড়ই উজ্জ্বল। মনে পড়ে অনিতার সেদিনের শুভ্রার কথায় বড়মা রাগ করলেও, সে কথাই সত্যি হল। বড়মা তাঁর একঝুড়ি গয়না নির্ঝরের বউকে দিয়ে যান আর বাড়িটা নির্ঝরকে। ওঁদের অবর্তমানে নির্ঝরই হবে মালিক। ঝুমার কাছেই জানতে পারল একথা অনিতা। বড়মা নির্ঝরকে একটু বেশিই স্নেহ করতেন। নির্ঝরের অনেক গুণ ছিল, মায়ের দায়িত্ব, বড়মা জেঠুর দায়িত্ব, ভাইদের মানুষ করার চেষ্টা, নিজের পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে টিউশন করে সংসারটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা। কিন্তু আর দুজনের কোন হেলদোল ছিল না, তাই হয়তো বড়মা ওকেই বাড়িটা দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অত অভাবের মধ্যে জীবন কাটিয়েও একফোঁটা লোভ ছিল না ওর। ও নিজে ওই সম্পত্তির একক মালিকানা পেতে চায়নি তাই তিন ভাইয়ের নামে রেজিস্ট্রি করায় তা। একসঙ্গেই সংসার, মেজো ভাইটাও বেশ দাঁড়িয়ে গেছে কেবল ছোটটাই তেমন কিছু করতে পারল না। তবু একান্নবর্তী পরিবারে অসুবিধা কিছু ছিল না, নির্ঝরই দায়ভার বহন করত, কিন্তু মুশকিল হল এই ছোট ভাইটির বিয়ে দিয়ে। বনিবনা না হওয়ায় নির্ঝর তার অফিস থেকে পাওয়া ফ্ল্যাটে চলে গেল মাকে সঙ্গে নিয়ে। আগেই পেয়েছিল, তবু এতদিন একসঙ্গে থাকবে বলে যায়নি। মেজোভাই কর্মসূত্রে অন্য রাজ্যে, পড়ে রইল বাড়িতে কেবল ছোট ও তার পরিবার। আর বড়মার দেওয়া বাড়ি ও গয়না তিন সমান ভাগে ভাগ করেছে ও, ভাইদের বঞ্চিত করেনি। ছোটভাই কমজোরি, তাই তার দাবী মত বড়মার রান্নাঘর, সিঁড়ি যে দিকটা সেদিকটা তাকে দিয়েছে। উপরে নিচে একটা করে ঘর, বাড়ির সামনে ওপরে নিচে সরু বারান্দা আর পিছন দিকে ওপরে নিচে দুফালি দালান, যাতে ওকে আর কিছু পয়সা খরচ করতে না হয় বাড়ির পিছনে। ওর ক্ষমতাও নেই খরচ করার আর গয়না যা পেয়েছে তাতে ওর মেয়ের বিয়ের জন্য রেখেও বাকি বিক্রি করে বিয়ের খরচ উঠে যাবে। বাড়ির অর্ধেকটা নির্ঝর নিয়ে নিজের মত পিছন দিকে বাড়িয়ে নিয়েছে আধুনিক কায়দায়, ইন্টিরিয়ার ডেকরেটার দিয়ে বাড়ি সাজিয়েছে সুন্দর করে। মেজোভাই বাড়ির অংশ নিতে চায়নি বলে পিছনের জমিটা তার বরাদ্দ হয়েছে। সততার মূল্য আজও আছে, ভাবে অনিতা। মাসিমা ও নির্ঝর নিঃস্বার্থভাবে অসহায় বড়মা, জেঠুকে যেমন বিপদে আপদে দেখাশোনা করেছে নিজের মত করে, তার পুরষ্কারও তারা পেয়েছে। আজ মাসিমা নেই, কলকাতায় নির্ঝরের ফ্ল্যাটে থাকার সময় সন্ধ্যে দিতে গিয়ে প্রদীপের আগুন গায়ে লেগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কদিন কষ্ট পেয়ে মারা যান। বাকি সব দেখে গেছেন কেবল এই বাড়িটা আর দেখে যাওয়া হয়নি তাঁর, ভাগাভাগি অবধি জেনে গেছেন।
        নিজেকে আজ বড় অপরাধী মনে হচ্ছে অনিতার। নির্ঝরের ওপর নিছক অভিমানে পরোক্ষে তার প্রিয় মাসিমার কাছ থেকেও দূরে সরে গিয়েছিল ও, আর সেই ফাঁকে মাসিমাও ফাঁকি দিলেন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, আর কখনও প্রিয় মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকবে না। একা একপাশে চুপ করে বসেছিল অনিতা আনমনে। 'কিগো অনিতাদি খাবে চলো', ঝুমার ডাকে চমক ভাঙ্গল ওর। জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে চলল অনিতা ঝুমার সঙ্গে গৃহপ্রবেশের ভোজ খেতে।




সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

মানসী গাঙ্গুলী

                                                    




কিশলয়


     যতদূর চোখ যায় আকাশটা ঘোর কালো রঙ ধরেছে, বৃষ্টি এল বলে। জানলা দিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে নগেনের মনটা আজ হারিয়ে যাচ্ছে বারেবারে। ওর একটা অফিসঘর আছে, যেখানে বড় পর্দায় ষোলটা সিসি ক্যামেরায় নজর রাখে সারাক্ষণ ৪০ বিঘা নার্সারির চারিদিকে। তার স্বপ্নের নার্সারি।  এছাড়া পাশে একটা বড় ঘর। নানানরকমের সার বিভিন্ন গাছে দেবার জন্য, গাছের পোকা মারার ওষুধ, বিভিন্ন গাছের বাল্ব বস্তাবন্দি হয়ে সব ওই ঘরে আশ্রয় পেয়েছে। পাশে আরও একটা ঘর, সেখানে নানানরকম সৌখিন টব, ইনডোর প্ল্যান্ট রাখার স্ট্যান্ড, ছোট-বড়, গাছে জল দেবার রকমারি ঝাঁঝরি, গাছ ছাঁটাই করার কাঁচি, শাবল, কোঁদাল, কুড়ুল, খুরপি, কাস্তে, মানে গাছপালা করতে আনুষঙ্গিক যা যা প্রয়োজন সবই রয়েছে তার জিম্মায়। খদ্দেরকে যাতে শখের বাগান করতে এখানে সেখানে ছুটোছুটি না করতে হয়, একই ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে সবই যাতে তারা সহজে পেয়ে যায়। আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট ঘর, ছোটখাটো কিচেনই বলা যায়। সেখানে চায়ের সরঞ্জাম, একোয়া গার্ড, জলের বোতল, একটা ফ্রিজ, কিছু গ্লাস, প্লেট, চায়ের কাপ-প্লেট, এছাড়া হাঁড়ি, কড়াও রয়েছে, কখন কি প্রয়োজন হয় সেইজন্য। সামনে অনেকটা চত্বর ছাউনি করা। খদ্দের গাড়ি নিয়ে এলে, পার্ক করে নামলেই ছাউনির তলায় এসে যাবে, রোদবৃষ্টি স্পর্শ করবে না তাদের। ছাউনির নিচে অফিসঘরের ঠিক সামনে একটা টেবিল পাতা ও বেশ কয়েকটা চেয়ার। সম্মানীয় অনেক ব্যক্তিত্বই এই নার্সারিতে আসা-যাওয়া করেন প্রায়শঃই। তাদের সেখানে চা পরিবেশন করা হয়। নগেনের এখন বিরাট পরিচিতি। এলাকার সব থেকে বড় নার্সারি তার এই কিশলয়, কত বড় বড় মানুষের সঙ্গে তার ওঠাবসা এই গাছের খাতিরে। গ্রামের চাষির ঘরের ছেলে ১২ ক্লাস পাস করার পর বাবা বললেন, "আর পড়াতে পারব না বাবা, এবার আমার সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করবি চল। আমার বয়স হচ্ছে, একা একা আর পেরেও উঠি না, তুই পাশে থাকলে বড় সুবিধা হয়"। পড়াশুনার ওখানেই ইতি নগেনের।
         অফিসঘরে নিজের টেবিলে বসে কিছু জার্নাল নাড়াচাড়া করতে করতে আকাশের দিকে চোখ যায় নগেনের। রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে উঠে পড়ে সে। পায়ে পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে। ডানদিকে জমিতে ভাগ ভাগ করে কোথাও গোলাপ, কোথাও রংবেরঙের একপাটি জবা, কোথাও পঞ্চমুখী জবারা সব বাগান আলো করে রেখেছে। এরা নগেনের প্রাণ।  নগেনের যাবার সময় দুলে দুলে যেন তারা অভিবাদন জানায় তাকে। কতটুকুই বা সম্বল ছিল তার শুরুতে। বাবার সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করার সময় মাটি চিনতে শুরু করল সে। কোন মাটিতে কি ধরনের গাছ ভাল হয়, কোন মাটি কতটা জল চায়, এরকম চাষের নানান কথা। বাবা নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে থাকেন। নগেন বুঝতে পারে, এই অভিজ্ঞতালব্ধ শিক্ষাই হল আসল শিক্ষা। এই শিক্ষা পুঁথিগত শিক্ষার থেকে অনেক জোরদার। কিন্তু এও বুঝল, সে মাঠে এভাবে বাবার সঙ্গে ঘুরে চাষবাসকেই জীবিকা করে নিলে বাবার মতোই ছাপোষা হয়ে থাকতে হবে তাকে আজীবন। তাহলে ভবিষ্যতে সেও তার ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে পারবে না। না, এমন জীবন সে চায় না। টাকার অভাবে যখন তার পড়া বন্ধ হয়েছিল, কষ্ট হয়েছিল তার। খুব মেধাবী না হলেও আরও বেশ কিছুদুর এগোতে পারত হয়ত সুযোগ পেলে। বন্ধুরা শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হলে বুকটা বেদনায় ভার হয়ে গিয়েছিল তার, যা ও বাবাকে বুঝতে দেয়নি সেদিন। কিন্তু এবার যে বাবাকে কিছু কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন। মনের মধ্যে  কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে কিছুদিন থেকে যা ও বাবাকে খুলে বলতে পারছে না পাছে তিনি ব্যথা পান মনে। কিন্তু এভাবে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, বাবাকে বলতেই হবে। তার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে লাগল নগেন যাতে বাবা বুঝতে পারেন তার পরিকল্পনা, অযথা দুঃখ না পান মনে।
         বলি বলি করেও বলতে পারে না বাবাকে। বাবা রোজই ছেলেকে ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে চাষবাস শেখাতে থাকেন, বলার সুযোগ আর হয় না। সুযোগ এল অবশেষে। একদিন নগেনের এক বন্ধু বীরেন, ওদের গ্রামেরই ছেলে, কলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, নামী কলেজে পড়ে, এল ওদের বাড়ি। অনেকদিন পর বন্ধুর সঙ্গে দুটো গল্পগুজব করার ইচ্ছা। সেই সময় বাবা নগেনকে ডাকতে থাকেন ক্ষেতে নিয়ে যাবেন বলে। বীরেনকে দেখে ওর বাবা কুশল সংবাদ নেন আর একথা সেকথায় ওর কলকাতায় পড়াশোনার কথা জানতে পারেন। তিনি বীরেনের সামনেই দুঃখ করেন ছেলেকে আর পড়াতে না পারার জন্য। পরিবেশটা থমথমে হয়ে যায়। বীরেন বুঝতে পারে ও ভুল সময়ে এসে পড়েছে, ওর জন্য ওদের কাজের দেরী হয়ে যাচ্ছে। তাই, "আজ আসি রে" বলে উঠে পড়ে। ক্ষেতে যাবার পথে নগেনের বাবা বারেবারে বিলাপ করতে থাকেন, "আমি তোর অপদার্থ বাবা, তোকে একটু পড়াশোনা করানোর ক্ষমতাও আমার নেই। বীরেন কেমন সুন্দর কলেজে পড়ছে। আজ আমার সামর্থ থাকলে তুইও কলেজে যেতিস।" নগেন কী করে বাবাকে চুপ করাবে ভেবে পায় না। বলে, "বাবা, তুমি যে কত ভালোবাসা দিয়ে আমায় হাতে-কলমে কাজ শেখাচ্ছ এটাই বা কম কী?" বাবার মন ভোলে না তাতে। চোখে তাঁর জল এসে যায়। চোখের জল মুছে বলেন, "তুই আমার বড় ভাল ছেলে রে, তাই আমার অক্ষমতাকে ঢাকবার জন্য এমন কথা বলছিস"। নগেন বলে, "বাবা অনেকদিন থেকেই তোমায় দুটো কথা বলব, বলেও বলতে পারছি না, পাছে তুমি মনে কষ্ট পাও। আজ ভাবছি কথাগুলো বলা বড় দরকার। আজ তুমি আমায় পড়াতে পারছ না বলে মনে যে কষ্ট পাচ্ছ, আমিও যদি এই চাষবাস নিয়ে পড়ে থাকি, ভবিষ্যতে আমাকেও তোমার মত এমন মনোকষ্টে ভুগতে হবে। চাষবাস করে আমিও আমার সন্তানদের পড়ার খরচ জোগাতে পারব না, তাই আমাকে অন্য কিছু ভাবতে হবে। ক'দিন থেকেই আমার মাথায় একটা কথা ঘুরছে। চাষবাস যেমন চলছে চলুক, আমি যতটা পারি তোমার সঙ্গে থাকব, প্রয়োজনে দু'একটা লোক রাখব, জানি তাতে তাদের রোজ দিয়ে আমাদের রোজগারে টান পড়বে, কিন্তু বাবা আমার ওপর ভরসা রাখো। কিছুদিন কষ্টেসৃষ্টে চালিয়ে নাও, আমার বিশ্বাস আমি তোমাদের সুখের মুখ দেখাতে পারব। তুমি আমায় চারশোটা টাকা দাও, আমি একটা জমি দেখে রেখেছি, সেটা কিনব। সেখানে আমি একটা নার্সারি করব। আজকাল মানুষের মধ্যে ফুল-ফলের গাছ লাগানোর একটা বেশ ঝোঁক এসেছে, সেটাই আমার মূলধন। এই নার্সারি সাজিয়ে-গুছিয়ে তুলতে যেটুকু সময়, তারপর আমার বিশ্বাস এই নার্সারি আমাদের সুখের মুখ দেখাবে।"
          বাবা হাঁ করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তার কথাগুলো শোনেন অবাক বিস্ময়ে। এ জীবনে সুখের মুখ তিনি দেখেননি। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুটো পেটের জোগাড় কোনরকমে করতেই তিনি হিমসিম খেয়েছেন।  তার পেটের তাগিদে লড়াই জারি রয়েছে আজও। ছেলের কথাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন তিনি। মনে মনে ভাবেন,  "ছেলের পেটে দু'কলম বিদ্যে রয়েছে বলে সে এভাবে ভাবতে পারছে। কই আমি তো এমন অন্য কিছুর কথা ভাবতেও পারিনি কোনোদিন! বাপ-ঠাকুরদাদার মত চাষবাস নিয়েই পড়ে আছি, এর বাইরে কিছু করতে পারি তা কখনও ভাবনায় আসেনি। তবে ছেলে যখন চাইছে করুক, আমার তরফ থেকে যতটা সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করব"। কিন্তু কিভাবে যে সাহায্য করবেন তা তার মাথায় আসে না। সে আমলে গরিব চাষির ঘরে এক কথায় চারশো টাকা বের করে দেওয়া বড় সহজ ছিল না। মুশকিল আসান হয়ে পাশে দাঁড়ালেন মা।  ছেলের স্বপ্ন চরিতার্থ করতে মা এতদিন আগলে রাখা তাঁর বিয়ের কাঁসার দানের বাসন বিক্রি করে, তাতে কষ্ট করে জমিয়ে রাখা লক্ষীর ভান্ডারের পয়সা মিলিয়ে চারশো টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।
           শুরু হল নগেনের নার্সারি। প্রথমে নিজে হাতে কাজ করত। লোক রাখবার, তাকে রোজ দেবার ক্ষমতা ছিল না। সকাল থেকে গাঁইতি, কোঁদাল চালিয়ে মাটি আলগা করে বিভিন্ন জায়গায় কোথাও পেঁপের বীজ কোথাও আমের আঁটি কোথাও নারকেল আবার কোথাও বা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা রঙবেরঙের জবা গাছের ডাল বসানো, রকমারি পাতাবাহারের ডাল সংগ্রহ করে চারা তৈরি করা শুরু হল। চাষবাসের জ্ঞান যা তৈরি হয়েছে তার ওপর নির্ভর করেই চলতে লাগল তার নার্সারি তৈরি। বড় যত্ন নিয়ে সে কাজ করে যদিও ফুল-ফল গাছ তৈরির জ্ঞান তার তেমন নেই, কেবল আছে অসম্ভব মনের জোর, আছে উদ্যম, আছে পরিশ্রম করার ক্ষমতা। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব তার, 'কিছু আমি করবই'। ছোট ছোট ডালগুলো যখন শিকড় দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরে, কচি কচি পাতা গজায় ডালের আগায়, খুশিতে নগেনের চোখ ঝলমল করে ওঠে। যখন বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হয়ে সবুজ উঁকি মারে মাটির ওপরে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় সে, ওইদিকে তাকিয়েই যেন তার দিন কাটে। এইভাবে একটু একটু করে ভরে ওঠে তার নার্সারি। নাম দেয় কিশলয়। দিনান্তে বেশিরভাগ সময় পড়ে থাকে ও কিশলয়ে। পাশেই আছে একটা পুকুর, সেখান থেকে জল তুলে গাছে জল দেয়। কত জায়গায় ছুটে গাছ সংগ্রহ করে, বিভিন্ন নার্সারি ঘুরে ঘুরে শেখে গাছেদের পরিচর্যা। পুঁথিগত কোনও শিক্ষা যে তার নেই, সবই হাতে-কলমে। সেই ছোট্ট কিশলয় আজ বিঘা বিঘা জমি নিয়ে বিস্তৃত। পাশের সেই পুকুরটাও এখন তার কিশলয়ের অন্তর্গত। পুকুরের চারপাশে ঘিরে রয়েছে নারকেল গাছের সারি। যতদূর চোখ যায় সবুজ, সবুজ আর সবুজ। ঐ সবুজের ঘেরাটোপে সারাদিন কাটায় ও মনের আনন্দে। বাড়িও ওকে তেমন টানে না। এ মাটির টান, সবুজের টান তার সাংঘাতিক। এদের ভালবেসেই জীবনে আজ সে প্রতিষ্ঠিত। অল ইন্ডিয়া নার্সারি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এখন সে। কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছে এই গাছ নিয়ে, গাছের ওপর বিভিন্ন সেমিনারে সে কত বক্তব্যও রেখেছে দেশে বিদেশে। একটুকরো বিদেশকে এনে ফেলেছে সে তার কিশলয়ে। বিভিন্ন দেশের নানারকম গাছ এনে আমাদের দেশের জলবায়ুতে, আমাদের দেশের মাটিতে তা কেমন হয় সেইসব তার এখন গবেষণার বিষয়।
            অতীত রোমন্থন করতে করতে অনেকদূর পৌঁছে গেছে সে। টিপটিপ করে বৃষ্টি হতে হতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসে আদ্যপ্রান্ত ভিজিয়ে দেয় তাকে। মনের সুখে ভিজছে নগেন। অনেকদিন প্রখর রোদের পর বৃষ্টি এল। নগেন ভিজছে আর দেখছে তার কিশলয়ের গাছপালারা কেমন তার সঙ্গে মহাসুখে বৃষ্টিস্নান করছে।


মেঘশ্রী ব্যানার্জী

                                            



বর্ষার একটি দিন"



(১)

নিজের নামটা এক্কেবারে পছন্দ নয় বর্ষার। কী ভীষণ চেনা নাম। ছোট্টবেলা থেকেই সবাই দুলে দুলে মুখস্থ করে নেয় ছয় ঋতু। তারই একটা বর্ষা। কেউ বলে না " কী সুন্দর নাম!" কেউ জিজ্ঞাসা করে না  "নামের মানে কী?" যেন নামটার কোনো গুরুত্বই নেই! অবশ্য বাবা-মা বলেন যুগে যুগে কবিদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান হল গিয়ে এই বর্ষা। গুচ্ছ গুচ্ছ কবিতা, ঝুরি ঝুরি গান - এগুলো তো আর এমনি এমনি নয়! সাহিত্যের অঙ্গনে বর্ষার  প্রাধান্যকে তো অস্বীকার করা যায় না! এইসব সান্ত্বনা বাক্য বহুবার শুনে শুনে যে একটু স্পেশাল ফিল হয় না তা নয়, তবু বর্ষাকালটাই তার মোটেও প্রিয় নয়। বিশেষতঃ যার বাড়ির সামনে ব্যাঙে ইয়ে করলেও এক কোমর জল দাঁড়িয়ে যায়, তার নাম বর্ষা হওয়াই উচিৎ নয়, কক্ষনো নয়। 

বারান্দায় গ্রিলের ফাঁকে নাকটা ঢুকিয়ে দিয়ে কানের পাশের গোছা চুল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে পেঁচার মত মুখ করে এইসব সাত-পাঁচ ভাবছিল বর্ষা। কখন বাবাই এসে পাশে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি,
"আজ নাই বা গেলি…"
"অসম্ভব! আজ যেতেই হবে।" 
"এত জল রাস্তায়… টোটো পাবি না, অটোও পাবি না।"
"বাস পেয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। আজ… খুব জরুরি ক্লাস আছে"
"তাহলে চল। ঠাম্মি ভাত বেড়েছে…"
টেবিলে এসে দেখে মা খেতে শুরু করে দিয়েছে। বাবাইও বসে পড়ল। বৃষ্টির দিনে একটু সময় হাতে নিয়ে না বেরোলেই নয়। শুনতেই রোডের কাছে বাড়ি। জল জমলে রিক্সার টিকিও পাওয়া যায় না। ঠাম্মি শুধু ধোঁওয়া ওঠা ভাতই বাড়েনি সাথে ইলিশ মাছ ভাপাও বেড়েছে। এই দুর্ধর্ষ যুগলবন্দী দেখেও মনটা ভালো হল না। এত তাড়াহুড়োতে ইলিশ খাওয়া যায়? ওই যে কথায় বলে চাঁদেরও কলঙ্ক আছে, তেমনই কাঁটা হল ইলিশের কলঙ্ক! মাছভাজার তেল দিয়ে অর্ধেক ভাত সাবড়ে উঠে পড়ল বর্ষা। 
"কিরে...মাছ খেলি না?" মায়ের হতবাক গলা ভেসে আসে, যেন বর্ষা নয় এতক্ষণ বিড়াল বসেছিল চেয়ারে। 
"রাত্রে খাব মা। কাঁটা বাছার সময় নেই।"
"বলবি তো.. আমি বেছে দিচ্ছি… বোস এসে"
"না মা দেরি হয়ে যাবে"
"আজ আর বেরোস নি বর্ষা। রাস্তাঘাটের অবস্থা মোটেও ভালো না…আর তোর যে জায়গায় কলেজ..." মায়ের গলায় বাবার সুর।
"আজকে যেতেই হবে। আজ বৃহস্পতিবার!" 
"বৃহস্পতিবার তো কী হয়েছে? কলেজে নিরামিষ খিচুড়ি ভোজ নাকি?"
"উফফফফ মা… "
"উফফ আবার কী? প্র্যাকটিকালও তো নেই আজ! শুধু ওই ইংলিশ ল্যাবটা আছে। ডুব মেরে দে"
উফফফফফ্! কী বিরক্তিকর! মায়ের সব মনে থাকে কবে কী ক্লাস! আজ সত্যিই কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্র্যাকটিকাল ক্লাস নেই। থিওরি ক্লাসের নোট কারুর থেকে পেলে ম্যানেজ করাই যায়…কিন্তু বর্ষাকে যে আজ যেতেই হবে! কী করে বোঝাবে মাকে? উত্তর না দিয়ে রেডি হতে শুরু করে চুপচাপ। ফার্স্ট ইয়ার। ইউনিফর্ম পরাও জরুরি। একে এই জল, তার উপর সাদা ড্রেস। ভেবে পায় না বর্ষা ইউনিফর্ম মানেই সাদা সাদা কেন? কালো লাল সবুজ বাদামী খয়েরী নয় কেন? এগুলো কী রঙ নয়? যদি নাই হবে, তাহলে বিয়ের সময় সাদা বেনারসী কেন পরে না? যত্তসব। গোটা দুনিয়াটাই গোলমেলে। আর এই যখনতখন বৃষ্টিটাও। 

(২)

যা ভেবেছিল ঠিক তাই! অটো নেই একটাও। টোটোও নেই। অবশ্য নেই বলাটা ঠিক হবে না। রোজ যাত্রী পাওয়ার জন্য মারামারি-কাড়াকাড়ি করা অটো আর টোটোগুলো আজ রাস্তার দু'ধারে জলমগ্ন হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করছে। বাবাকে তো দুম করে বলে বসল বাস পেয়ে যাবে, কিন্তু বাস এলে তো! যদি ভুল করে এসেও পড়ে তার গতি তিনশো বছরের বুড়ো কচ্ছপকেও হার মানায়। ইসসস…. ক্লাসটা মিস হয়ে যাবে!! রাস্তা বেশ ফাঁকা। এতটাই ফাঁকা যে বাজিমাত সিনেমা হলের সামনে দিবারাত্র বদন প্রদর্শনকারী বখাটেগুলোও আজ নেই। বর্ষা একাই পাগল যে কিনা এই বৃষ্টি মাথায় করে কলেজ যাচ্ছে। বাবা-মা পই পই করে আজ বেরোতে মানা করেছিল। তবু তাকে যে আজ আসতেই হতো। কিন্তু… একটা চিন্তা মনে আসতেই পেটের ভিতর গুড়গুড় করতে লাগল। এত বিশ্রী ওয়েদারে এত তোড়জোড় করে, এত জল ভেঙে যার জন্য আকুপাকু করে কলেজে ছুটছে… সে আজ আসবে তো? মুহূর্তে  মুখটা আকাশের চেয়েও কালো করে এলো। যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়বে। 

এরকমভাবে আর কতক্ষণ একটা স্ল্যাবের উপর দাঁড়িয়ে থাকা যায়? সেটাও স্টেডি নয়। ঢকঢক করছে। নিচে নেমে দাঁড়ালে হাঁটু অবধি জল। সেই সাদা জামায় কাদা কবেই লেগে গেছে শুধু 'কেনে কাদা দিলি?' বলে  চিল্লানোর উপায় নেই। পুরোটাই হয়েছে বর্ষার মর্জিতে। গোমড়া মুখে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে একটা আশার বিন্দু দেখতে পেল - বহুদূরে। বিন্দু ক্রমশঃ বড় হতে হতে সিন্ধু থুড়ি একটা রিক্সার আকার নিচ্ছে। এখনও বোঝা যাচ্ছে না রিক্সাটা খালি নাকি লোক আছে! যদি খালি থাকে আর না দাঁড়ায়? রিক্সাটা এবার বেশ কাছাকাছি এসে গেছে। চালকের চোখে সানগ্লাস। অথচ রোদ ওঠে নি। মাথা মুখ সব উত্কট গোলাপী গামছায় ঢাকা। গায়ে রেইনকোট। যদিও বৃষ্টি নেই। সিটের ওপর শ্যাওলা রঙের ত্রিপল ফেলা। চোপসানো মতো। মানে কেউ বসে নেই। বর্ষা প্রাণপণে হাত নাড়াচ্ছে, এত জোরে যে কব্জি খুলে জলে তলিয়ে গেলেও আশ্চর্য হবে না, "রিক্সা….. অ্যাই রিক্সা….আ…. আ...রে দাঁড়াও দাঁড়াও…."  নাঃ ফস করে বেরিয়ে গেল রিক্সাটা। এদিকে উত্তেজনায় বর্ষা যে কখন হাঁটু জলে নেমে পড়েছে সে নিজেও জানে না। ধুর ধুর ধুর ধুর…! বুকের ওপর ব্যাগপ্যাকটা চেপে স্ল্যাবে ফিরে যাবে না এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে ভাবতে ভাবতে দেখে উল্টোদিক থেকে একটা রিক্সা আসছে। এমনিতেই উল্টোদিকের রিক্সাগুলো দাঁড়াতে চায় না, তার উপর এত জল। ও মা! রিক্সাটা তো ওর দিকেই আসছে… আগের রিক্সাটাই না? যেটা এইমাত্র বর্ষাকে ডিচ করে বেরিয়ে গেল? হ্যাঁ ওইটাই তো! চালকের মাথায় সেই গোলাপি গামছা... রিক্সাটা জমা জলে ঢেউ তুলে এক্কেবারে বর্ষার সামনে এসে থামল, যেন পক্ষীরাজ নিয়ে রাজপুত্তুর।  
"আমার নাম রিক্সা নয়…" হকচকিয়ে যায় বর্ষা! এবার থেকে প্রত্যেকটা রিক্সাকে ডাকার আগে ওদের নাম-ধাম জেনে নিয়ে ডাকতে হবে নাকি! 
"আমি পাল...সুশীল পাল!"
এইরকম জেমস বন্ড মার্কা পরিচয় পর্বে বর্ষার নিচের চোয়াল একহাত ঝুলে পড়তে না পড়তেই ধেয়ে এলো পরের প্রশ্ন
"তুমি চশমা পরোনি কেন?"
এই বর্ষায় ছাতা নেই কেন বা রেইনকোট নেই কেন - এসব প্রশ্নের একটা জাস্টিফিকেশন আছে, কিন্তু চশমা? লোকটা কী পাগল? রিক্সাটা ছেড়ে দেবে? কিন্তু আধ ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে এই অগতির গতি পালবাবুকে পেয়েও ছেড়ে দেওয়াটা কী ঠিক হবে? আশেপাশে যতদূর পারা যায় চোখ বুলিয়ে নিয়ে আর কোনো খড়কুটো না পেয়ে অগত্যা জিজ্ঞাসা করে বর্ষা 
"কলেজ যাবে?"
"নাঃ! এই বয়সে আর…"
"উফফফফ্ লিলুয়া ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, যাবে?"
"ও হ্যাঁ! যাব তো। দেখেই বুঝেছি তুমি কলেজেই যাবে। তাই তো ফিরে এলাম…"
বর্ষা বোঝে না যে সে কী দেখে বুঝল! ব্যাগপ্যাক না উইনিফর্ম! আর কথা না বাড়িয়ে ঘাড় ঝুঁকিয়ে ত্রিপল সরিয়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে। রাজ্যের নোংরা ত্রিপলে। বোঁটকা গন্ধ! এই সময়েই আরেকটা গন্ধ ধক করে নাকে এল। এইবার লোকটার এলোমেলো কথার একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেল। মদ্যপ ব্যাটা। এমনিদিনে হলে এই রিক্সায় কিছুতেই চড়ত না বর্ষা। কিন্তু আজ….
"কত নেবে?"
"যা খুশি দিও.." মানেই পরে গিয়ে ঝামেলা করবে। যাক গে যা হয় হবে… ভাড়াটা নেমেই ঠিক করবে না হয়। তবু কলেজের কাছে নামলে চারটে লোকজনের মাঝে বল ভরসা। 

পালবাবু প্যাডেলে চাপ দিয়েই গান ধরেছেন, "জানা অজানা পথে চলেছি…." 
মোবাইলটা চেইন থেকে বের করে টাইম দেখে বর্ষা। এখনও সময় আছে। ক্লাসটা ধরা গেলেও যেতে পারে। আচ্ছা, যাজ্ঞসেনী কি এসে গেছে এতক্ষণে? আলবাত এসে গেছে। আর ফার্স্ট বেঞ্চে থাবা গেড়ে বসেছে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে। শুধু বৃষ্টি কেন! ভূমিকম্প হলেও অর্জুন স্যারের ক্লাস মিস করবে না। দরকার পড়লে হেলিকপ্টারে করে কলেজের ছাতে নামবে! বড়লোকদের সবই ভালো। নামটাও কী ভালো! যাজ্ঞসেনী! নাম শুনে অর্জুন স্যার শুদ্ধুও ইম্প্রেসড! বলেছেন "হোয়াট আ বিউটিফুল নেম!" তারপর থেকে যাজ্ঞসেনীর মাটিতে পা পড়ে না! হায় রে! বর্ষারও যদি অমন সুন্দর একটা ভারিক্কি নাম থাকত! সকালের মনখারাপটা আবার নতুন করে ফিরে এল। 

এই অর্জুনস্যার হলেন কলেজের তামাম ছাত্রী-বাহিনীর ক্রাশ আর ছাত্রদলের হিংসার পাত্র! উনি ক্লাসে ঢুকলে ছাত্রীরা চোখের পলক ফেলতে ভুলে যায়। ক্লাস শুরু হলে মনে হয় আজ সারাটাদিন যেন পিরিয়ড শেষের বেল না বাজে! তার চেয়েও বড় কথা হল, স্যার পড়াতে পড়াতে একটাও বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন না। এমন কী ক্লাসের বাইরেও না! কতবার স্যারকে একটু দেখার আশায়, একটু কথা বলার জন্য অঙ্ক নিয়ে মেয়েরা স্টাফরুমে গেছে টিফিনের সময়… কিন্তু স্যার তখনও অনর্গল ইংলিশে পড়া বুঝিয়ে গেছেন! এ হেন অর্জুন স্যারের জন্যই তো আজ ঘোলা জল কোমরে করে আর দুর্যোগ মাথায় করে কলেজ পানে ধেয়ে চলা।

আসলে হয়েছে কী উনি একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছেন। আজকে সেটা জমা দেওয়ার শেষ দিন। মেক্যানিক্সের অঙ্কগুলো সব সহজ হয় না। রীতিমত মাথা ঘামিয়ে, বই ঘেঁটে, নেটে খুঁজে নামাতে হয়। বর্ষা এক সপ্তাহ ধরে দিনরাত এক করে সবকটা প্রবলেম সলভ করেছে। যেন ফার্স্ট সেমিস্টারে আর কোনো বিষয় পড়ার দরকারই নেই! ওদিকে বিরোধীপক্ষও জোর কদমে লেগে আছে। অর্জুন স্যারের টাস্ক বলে কথা! কবে, কিভাবে বর্ষা আর যাজ্ঞসেনীর মধ্যে এই সুপ্ত প্রতিযোগিতা শুরু হল তা বলা মুস্কিল! তবে অর্জুন স্যারের ক্লাস থাকলে একদিন যাজ্ঞসেনী দশ মিনিট আগে আসে তো পরেরদিন বর্ষা কুড়ি মিনিট আগে। ফার্স্ট বেঞ্চের দখল নেওয়াটা খুব জরুরি। আজ সকাল অবধিও গোপনসূত্রে খবর পেয়েছে যাজ্ঞসেনী সবকটা প্রবলেম সল্ভ করতে পারে নি। ব্ব্যাস! আর কী চাই? এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? এমনিতেই ওদের রেশারেশিতে শুধুমাত্র নামের জন্য বর্ষা এক গোল খেয়ে বসে আছে। 

"এক লড়কি ভিগিভাগি সি.." কানে আসতেই বর্ষা নড়েচড়ে বসল। জামাটা হাঁটুর নিচে টেনে দিয়ে ব্যাগপ্যাকটা বুকে জড়িয়ে ভুরু কুঁচকে পালবাবুর দিকে তাকিয়ে রইল। লোকটা আর গান পেল না! ইতর কোথাকার! কলেজ পৌঁছতে আর বেশি দেরি নেই! এইখানে রাস্তাটা এমনিতেই নরক-গুলজার! বসুন্ধরা এখানে ধনধান্যে নয় খানাখন্দে ভরা। রাস্তায় পিচ-সুরকি যাই ঢালা হোক না কেন দু'দিন পরেই দাঁত বেরিয়ে ছিরকুটি হয়ে যায়। রিক্সা ক্রমাগত দোদুল দোলে দুলছে। যেন থইথই জলে টাইটানিক! আর জলের রঙ তো মনে রাখার মত! এ জলকে এক কথায়  ঘোলা বা নোংরা বলা যাবে না। এর একটা বিশেষত্ব আছে। দুই পাশে সারি সারি কারখানার মাল-মশলাগুলোও দিব্যি মিলেমিশে গিয়ে কালো জলের উপর একটা চকচকে গাঢ় হলুদ আস্তরণ ফেলেছে! রঙটা প্রাতঃকালীন একটি বিশেষ বর্জ্য পদার্থের কথা মনে পড়ায়! গা'টা গুলিয়ে উঠল বর্ষার! 

কোনো কোনো কারখানার সাটার অর্ধেক তোলা। লম্বা লম্বা লোহার রডের স্তূপ উবুচুবু হয়ে পিঠ দেখাচ্ছে আইসবার্গের মত। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা সাইকেল আসছে যাচ্ছে। পিছন থেকে একটা রুটের বাস হর্ন দিচ্ছে। ইসসসস... বাসটা সেই এলো অথচ এত দেরিতে। পিছনে বাস আসছে না অ্যানাকোন্ডা তাতে চালকের কোনো হেলদোল নেই। রিক্সাটা এক্কেবারে রাস্তার মাঝখন দিয়ে ঝাঁকুনি খেতে খেতে শামুকের গতিতে এগোচ্ছে। পালবাবু বোধহয় কোনো এক যাত্রাপালা থেকে রিক্সা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। আজই সেই পালার যত গান উজাড় করে দিয়ে দম নেবেন। !  "বাস আসছে তো, সাইড করো… হর্ন দিচ্ছে শুনছ না?" একটু থামল গান। বাস আসায় ভারি বিরক্ত। যে রাজপথ আজ তার নামে লিখে দেওয়া হয়েছিল তাতে বাসের ভাগ বসানোটা পালরাজার পছন্দ হল না। তড়াক করে সিট থেকে জলে লাফিয়ে পড়ে প্রবল চেষ্টায় গোঁত্তা খেতে খেতে রিক্সাটা টেনে রাস্তার ধারে নিয়ে গেল। বাসটা রাস্তা খালি পেয়ে হুঙ্কার দিতে দিতে বেরিয়ে গেল। পিছনে ফেলে গেল হলুদ রঙের বড় বড় ঢেউ, যেগুলো রিক্সার মধ্যে এসে জলকেলি খেলতে  লাগল। পাশের একটা ভজনালয় থেকে হরে-কৃষ্ণ হরে-রামো ভেসে আসছে। তার সামনেই ডাঁই হয়ে পড়ে থাকা ভোজন উচ্ছিষ্ট, শালপাতা ভেসে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। সুশীল পাল তিনকোণা সিটে বসেই এবার ভক্তিরসে ডুব দিল, "আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল…" আবেগে ভেসে গিয়ে দুটো হাত হ্যান্ডল ছেড়ে যেইনা কপালে জড়ো হল অমনি প্যাডেলটাও পা ফস্কে গেল! আর রিক্সাটাও টাল সামলাতে না পেরে খেয়ে ওঁত পেতে থাকা  জলমগ্ন গর্তে এপাং ওপাং ঝপাং স্টাইলে উল্টে গেল - যেন ভাসান হওয়া প্রতিমা!

বর্ষা কিছু টের পাওয়ার আগেই বুঝল সে প্রথমে সামনের দিকে তারপরেই বাঁ-পাশে হেলে পড়েছে। যে জল হাঁটু অবধি ছুঁয়ে গেছে বলে ঘেন্নায় কুঁকড়ে ছিল, সেই পিঙ্গল জল থেকে কোনোমতে শুধু মুন্ডুটা বেরিয়ে আছে! বিপদের এখানেই শেষ নয়, সুশীল পাল বিপদ বুঝে উল্টোদিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। ফলতঃ গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে রিক্সাটা ঝপাং করে বর্ষার ঘাড়ে এসে পড়ল। চারিদিকে একটা হই-হই রব, "এই ধর ধর তোল তোল"। রিক্সাটা ধীরে ধীরে সোজা হলে পরে বর্ষা কারুর একটা হাত ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগটাও ভিজে সপসপ করছে। টপ্টপ করে জল গড়াচ্ছে। মানে এসাইন্মেন্টটাও…. ইসসসসস!
"দিদি আপনার লাগে নি তো?" 
"দিদি হাসপাতালে যাবেন?"
"দিদি ও দিদি…."
"না না… আমি কলেজ যাবো।"
লোকজন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল… এই অবস্থায় কলেজ? লজ্জায় মাটিতে  মিশে যাচ্ছে বর্ষা! এই অবস্থায় কলেজে যাবেই বা কি করে? এই রিক্সায়? এইভাবে কোনোদিন সেন্টার অফ এট্রাকশন হতে হবে জন্মেও ভাবেনি! ভিড়টাই ত্রাতা হয়ে চটপট বাকি ব্যবস্থা করে ফেলল। কিশোর কুমারের রেপ্লিকাকে চল্লিশ টাকায় বিদেয় করল বর্ষা। সে ব্যাটা শুকনো মুখে আমতা আমতা করে বলেছিল বটে, "আমিই পৌঁছে দিচ্ছি না হয়… আর ক'টা টাকা…" লোকজনের হস্তক্ষেপে পালবাবু পালিয়ে বাঁচল। আরেকটা রিক্সা জোগাড় করে অবশেষে তারাই কলেজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করল।

(৩)

কলেজে গিয়ে যদিও আর বিশেষ কোনো লাভ নেই। অর্জুন স্যারের ক্লাস এতক্ষণে শেষ হয়ে গেছে। অ্যাসাইনমেন্টটা ব্যাগে ছিল। নির্ঘাত আধডোবা লেড়ো বিস্কুটের মত দশা এখন তার! তবু পায়ে পায়ে এগোলো। বৃন্দাবন চত্বর আজ ধূ ধূ! নাঃ যতই জল জমুক রাস্তায়, কলেজে তার লেশ মাত্র নেই। সিঁড়ি ভেঙে উঠতে লাগল। দু'একটা স্টুডেন্ট ওঠানামা করছে আর ওকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। ভিজে জামাটা পরে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল বর্ষার। এতক্ষণের ঝুটঝামেলায় জামাটা গায়েই অনেকটা শুকিয়ে গেছে। তবু গা ঘিনঘিনে করছে। পায়ে পায়ে এগিয়ে ক্লাসের ভিতর উঁকি মারল । গোটা দশ বারোজন বসে আছে। বেশিরভাগই হোস্টেলের। নাঃ যাজ্ঞসেনীকে দেখতে পেল না। আসেনি? না বাইরে গেছে? ক্লাসে আর ঢুকলো না বর্ষা। স্টাফরুমের দিকে এগোলো। অর্জুন স্যার ঘরে নেই। এসেছেন তো? কোনো স্যার বা ম্যামকে জিজ্ঞাসা করে দেখবে? নাঃ থাক! আসলে কারুর নজরে এই দশায় পড়তে চাইছে না।  অ্যাসাইনমেন্টের পাতা দুটো ইতিমধ্যে ব্যাগ থেকে বের করে হাতে নিয়েছে। একদম নষ্ট হয়ে যায় নি। স্যাঁতস্যাঁত করছে কাগজটা। অর্জুন স্যার অনেক সময়ই ল্যাবে থাকেন। বর্ষাদের ফার্স্ট ইয়ারে মেকানিক্সের ল্যাব নেই। কিন্তু সিনিয়রদের আছে। একবার গিয়ে দেখবে? 

এই বিল্ডিং থেকে নেমে একটা মাঠ আর তার লাগোয়া ক্যান্টিন, "খেলে খান নয়তো যান"। ক্যান্টিন দেখেই সকালের ইলিশমাছের কথা মনে পড়ে গেল। ল্যাবে উঁকি মারতেই দেখা পেল অর্জুন স্যারের। রাজকীয় মহিমায় চেয়ার আলোকিত করে কিসব খাতা চেক করছেন। ওদের এসাইনমেন্ট পেপার নাকি?
"স্যার আসব?" 
ঘাড় ঘোরালেন অর্জুন স্যার। একটু অবাক। ফার্স্ট ইয়াররা ল্যাবে তো আসে না। 
"কাম ইন"
খুবই সঙ্কুচিত ভঙ্গিতে টেবিলের ওপারে এসে দাঁড়ালো বর্ষা।
"হোয়াট হ্যাপেনড টু ইউ?"
"প...পড়ে গেছি।"
একবার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে অবিশ্বাসের সুরে বললেন, "হোয়্যার? ইন দ্য ক্যাম্পাস?"
"নো স্যার। ইন দ্য রোড। রিক্সা থেকে জলে পড়ে গেছি।"
"জিসাস! আর য়ু হার্ট?"
বর্ষার মনে পড়ছে না ব্যথা আছে কিনা! ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে স্যারের এই কনসার্নটুকু। টেবিলের একপাশটা খুঁটতে খুঁটতে মাথা দু'দিকে নাড়ায়। অ্যাসাইনমেন্টটা এগিয়ে ধরে।
"ইউ কেম টু সাবমিট দিস? রিয়েলি?"
স্যারের গলায় বকুনির আভাস। ঘাড় নাড়ে বর্ষা।
"হোয়াই ইউ ডিডন'ট রিটার্ন হোম? ইউ রিয়েলি ডিডন'ট হ্যাভ টু কাম দিস ফার ফর দ্য এসাইনমেন্ট...ইট কুড ওয়েট!" স্যারের গলা চড়ছে।
অভিমানে মুখটা থমথম করছে বর্ষার। ইট কুড ওয়েট? সত্যি? সকাল থেকে একের পর এক অবশ্যম্ভাবী অনুচিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইলিশ ছেড়ে, বাবা-মার কথা অমান্য করে, জলে ডিগবাজি খেয়ে ছুটে এসেছে শুধুমাত্র যে স্যারের অ্যাসাইনমেন্টটা জমা দিতে, সেই তিনিই কিনা বলছেন না আসলেও চলত? বর্ষার নাম না হয় যাজ্ঞসেনীর মত সুন্দর না,  কিন্তু ওর সিন্সিয়ারিটি ওর কমিটমেন্ট নিয়ে স্যারের কিচ্ছু বলার নেই? ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ম্যামও নিজের কাজ ফেলে এদিকে তাকিয়ে আছেন। সকাল থেকে সহ্য করা সমস্ত অভিমান, লজ্জা, অপমান ঝরঝর করে ঝরে পড়ল। একটু ঘাবড়ে গেলেন স্যার। 
"আরে… কাঁদছ কেন? বোসো বোসো" একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললেন "পরীক্ষা তো নয় যে অ্যাটেন্ড করতেই হবে!"
চোখের জল তবু বাঁধ মানছে না। আধভেজা ওড়না দিয়ে চোখ মুছেই চলেছে। "আজ তো একজনও অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেয় নি। একদিন দেরিতে দিলে কী ক্ষতি ছিল?"
ম্যামও উঠে এসেছেন এই টেবিলের কাছে 
"জল খাবে একটু?" 
জল খেতে খেতে একটু ধাতস্ত হল বর্ষা। কান্না থামল। স্যার ততক্ষণে স্যাঁতস্যাঁতে পাতাগুলো যত্ন করে টেবিলের উপর বিছিয়ে পেপারওয়েট চাপা দিচ্ছেন। হঠাৎ বর্ষার খুব ভালো লাগতে শুরু করল। 
"থ্যাঙ্কিউ ম্যাম। থ্যাঙ্কিউ স্যার…" বলে উঠে দাঁড়ালো। 
অর্জুন স্যার বললেন, "এরকম আর কোরো না  বুঝলে?"
মাথা একপাশে হেলাল "আসছি স্যার" 
"একা একা যেতে পারবে?"
"পারব" গলা বুজে এসেছে। 
"ফিরবে কিসে?"
"বাস চলছে"
"সাবধানে যেও।" একটু ইতস্তত করে বললেন, "বাড়ি ফিরে খবর দিও পারলে। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছ তো?"

"দেব…" ল্যাব থেকে বেরিয়ে এল বর্ষা। কী সুন্দর বৃষ্টিভেজা দিন। ডান পায়ে একটা ব্যথা টের পাচ্ছে হাঁটতে গেলে। তবু মনটা খুব খুশি খুশি। হেঁটে তো নয় মনে মনে প্রায় উড়তে উড়তে কলেজের বাইরে চলে এলো। আবারও রিক্সা নিতে হবে। না হয় নেবে! না হয় আবারও পড়ে যাবে! ইসসস…. সুশীল পালকে আরও কুড়িটাকা বেশি দেওয়া উচিৎ ছিল। মনে মনে আক্ষেপ করে শেষে একটা ধন্যবাদই দিয়ে ফেলল তাকে। আজকে তার জন্যই যাজ্ঞসেনীকে একগোল দিয়েছে বর্ষা। না না,  অ্যাসাইনমেন্ট জমা করেছে সেটা কোনো বড় কথা নয়… আজ না হয় কাল সকলেই জমা দেবে। বর্ষার আজ এক পরম প্রাপ্তি হল, যেটা যাজ্ঞসেনীর কোনোদিন হবে না। আজ অর্জুন স্যার ওর সাথে, শুধুমাত্র ওর সাথে বাংলায় কথা বলেছেন! আচ্ছা, মেসেঞ্জারে যখন বর্ষা জানাবে ও বাড়ি পৌঁছে গেছে… স্যার কি উত্তর দেবেন? কোন ভাষায় দেবেন? বাংলা? 

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

যুগান্তর মিত্র

                                                                         




পুনর্গঠন 


এবার ভাবছি বাড়িটা রিপেয়ার করিয়ে নেব। অনেক জায়গায় ফেটে ফেটে গেছে। নতুন করে রঙও করিয়ে নেব বাবা। 
তা ভালো। কবে শুরু করবি? 
দুটো ফিক্সড ডিপোজিট ম্যাচিওর করেছে। হাতে টাকা এলেই হাত দেব। 
হয়তো এই রঙটাই করাব। রিপেয়ারের পরে তো নষ্ট হয়ে যাবে। তাই রঙ করাতেই হবে। 
হুম। আমার আর নতুন রঙ-করা বাড়ি দেখা হল না। দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ঋষিকেশ বলেন, এই রঙটা তোর মায়ের পছন্দের ছিল। দত্ত হার্ডওয়ারে আমার সঙ্গে গিয়ে নিজে রঙ পছন্দ করেছিল। 
আমাকেও মা বলেছিল। মা চেয়েছিল দেয়ালের একদিকের রঙ ডিপ হবে। তিনদিকে হালকা কোনও রঙ। তুমিই করতে দাওনি। 
কথাটা শুনে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর নিজেই নৈঃশব্দ্য চিরে বলে ওঠেন, হুম। তখন মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন ব্যাপার! তিনদিক একরকম রঙ, একদিক আলাদা! পরে দেখেছি অনেকের বাড়িতেই এইরকম আছে। 
আছে তো! বেশ ভালোও লাগে দেখতে। আমার পরিচিত অনেকের বাড়িতেই আছে। 
তোর মা অবশ্য খুব বেশিদিন পছন্দের রঙ-করা ঘরের দেয়ালে আটকে থাকল না। মাস ছয়েকের মধ্যেই চলে গেল! 
ক্যানসারটা লাস্ট স্টেজে ধরা পড়ল! মা এত কথা বলতে ভালোবাসত। অথচ গলাতেই ক্যানসার হল! শেষদিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকত মা! কথাটা বলেই বাবার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সুধন্য। 
ও যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে বুঝতে পারিনি! 
আবার কি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বাবা? ঠিক বোঝা গেল না। চোখের পাতা স্থির। বোঝার উপায় নেই বাবা আপশোস করলেন কিনা। 
তুমি বরাবরই এইরকমই বাবা। আমাদের কারও কথারই কোনও গুরুত্ব দাওনি। নিজের একগুঁয়ে ভাব বজায় রেখেছ। 
এভাবে বলছিস? 
খুব কি ভুল বললাম বাবা? ভেবে দেখো। কথাটা বলে সুধন্য আর বাবার দিকে তাকায় না। উঠে গিয়ে চায়ের কাপ-প্লেট সিঙ্কে নামিয়ে রাখে। ফ্লাক্সটা সরিয়ে রাখে টেবিলের কোণে। তারপর ধীরপায়ে হেঁটে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একটা টান দেয়। ঠোঁট সরু করে ধোঁয়া ছাড়ে বাতাসে। আর-একটা টান দিতে গিয়ে থেমে যায়। আঙুলের ফাঁকে সিগারেট রেখে ঘরে আসে সে। 
বাবা, তোমার মনে পড়ে একবার খুব মেরেছিলে আমাকে? 
হ্যাঁ, সে তো তোর ভালোর জন্যই। 
আমার ভালোর জন্য? ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে জিজ্ঞাসা করে সুধন্য।  
তা নয়তো কী? সেইসময় তুই কয়েকজন বন্ধু জুটিয়ে আড্ডা মারতিস খুব। ওই বয়সেই ওরা বিড়ি টানা শুরু করেছিল। তুইও কয়েকদিন খেয়ে বাড়ি এসেছিলি। মুখে লেবুতাপার গন্ধ পেতাম। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে জেনেছি বিড়ির গন্ধ ঢাকার কৌশল ওটা। খবর পেতাম মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে তাসও পেটাস। খুব রেগে গিয়েছিলাম। তখনও মারধর করিনি। শুধু বলেছিলাম, সবকিছুই ঠিকঠাক আছে। পড়াশোনাটাও তো করতে হবে! অপেক্ষা করছিলাম পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য। যখন দেখলাম কোনওমতে পাশ করলি, তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারিনি। সেদিন মারটা একটু বেশিই হয়ে গেছিল, এটা ঠিক। 
একটানা কথাগুলো বলে ঋষিকেশ থামেন। সুধন্য মাথা নীচু করে চুপ হয়ে থাকে। 
একটু দম নিয়ে ঋষিকেশ আবার বললেন, এরপর থেকেই তুই বদলে গেলি। একেবারে প্রথম তিনজনে বরাবর। ক্লাস সেভেনের সেই মার তোকে পাল্টে দিয়েছিল। এমএসসি পর্যন্ত আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 
সুধন্য সিগারেট আর টানে না। জ্বলতে জ্বলতে অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। ধোঁয়ায় ভরে গেছে ঘর। অ্যাসট্রেতে ছাই ঝেড়ে বারান্দায় চলে যায়। তারপর সেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেটটা ছুঁড়ে মারে দূরে। লেবুগাছের গোড়ায় পড়ে ধোঁয়া ছড়ায় আধ-পোড়া সিগারেট। ঘরে এসে প্রায় ফিসফিস করে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি একটু আসছি বাবা। 
নিশ্চয়ই কোনও জনসেবা? 
না না। এই একটু ঘুরে আসছি। মুচকি হেসে জবাব দেয় সুধন্য। 
বেশ। যা। তবে নিজের কথাও একটু ভাবিস। 
কী কথা? 
এই যে বাড়িটা ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে… 
সব হয়ে যাবে বাবা, বললাম তো… 
কিছু কিছু টাকা জমা সু। টাকা ছাড়া সব অচল। একা থাকিস। বিয়ে-থা করলি না। কখন কী হয় বলা যায় না!  
তুমি কি এসব ভেবেছিলে কখনও? ভাবলে আমাদের এইরকম হত না বাবা। মার চিকিৎসা করা যেত আরও ভালোভাবে। বুকের মধ্যে এই কথাগুলো অভিমান হয়ে জমে আছে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসতে চায়। কিছুতেই আটকাতে পারে না সুধন্য। 
বেসরকারি চাকরি করতাম সু। তুই জানিস। কত আর মাইনে পেতাম! 
জানি। কিন্তু বাবা, বুলু পিসিদের সংসারও তুমি টানতে। এতে আমাদের অভাব দিনে দিনে বেড়েই গেছে। অনেক টাকা ধার হয়ে গেছিল। ধারের পর ধার। এই সেদিন সেসব শোধ করলাম। 
ঋষিকেশ ধারের প্রসঙ্গ পাশ কাটিয়ে বুলুর কথায় চলে গেলেন। বুলুটা একটা ভুল করে ফেলেছিল। না-বুঝেই ঝপ করে তারককে বিয়ে করে ফেলল। মদ্যপ একটা ছেলে! বাড়িতে এসে বউকে পেটাত! 
ওদের ব্যাপার ওদেরই বুঝে নিতে দিতে পারতে। তোমার তো নিজের বোন নয়। কাকার মেয়ে। তাও দূর সম্পর্কের। 
দূর সম্পর্কের বলিস না সু। সম্পর্ক রক্ত দিয়ে হয় না। নান্টুকাকার কথা ভুলি কী করে বল? আমরা যখন খেতে পেতাম না ঠিক করে, নান্টুকাকাই কিন্তু আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর মেয়ে… 
বাবা এই রেকর্ডটা মাঝে মাঝেই বাজান। মাও বিরক্ত হতেন। সুধন্য চুপ করে যায় বাবার কথা শুনে। সে শুনেছে সবই। একসময় সত্যিই খুব উপকার করেছিলেন সেই দাদু। বুলুপিসি দুম করে তারককাকুর সঙ্গে পালিয়ে গেল। তারককাকু এপাড়াতেই ভাড়া থাকত মাকে নিয়ে। বিয়ে করে চলে গেল পাশের পাড়ায়। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। প্রচুর মদ খেত। কী দেখে যে বুলুপিসির মতো ঠান্ডা মেয়ে তারককাকুকে পছন্দ করেছিল কে জানে! মদ খেয়ে খেয়েই লোকটা মরে গেল। 
তুই কিন্তু বুলুর পাশে দাঁড়ালি না! অনুযোগের সুর ঋষিকেশের কণ্ঠে। 
এখন আর দরকার নেই বাবা। পিসি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাজ করে। 
তা জানি। কিন্তু মাইনে খুবই কম। 
এই তো বললে নিজের কথা ভাবতে! এখনই আবার অন্য কথা বলছ বাবা? সুধন্য বাবার দিকে চোখ রেখেই সরিয়ে নেয়। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। স্ট্রিট লাইটের জোরালো আলোয় দেখতে পায় উঠোনের গাছগুলো স্থির হয়ে আছে। মায়ের প্রিয় সবেদা গাছটা দাঁড়িয়ে আছে একা। অনেকটা যেন তারই মতো। 
যা ঘুরে আয়। বেশি রাত করিস না।  
হ্যাঁ যাচ্ছি। কথা শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে পড়ে সুধন্য। দরজায় তালা মেরে চাবিটা পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে ভাবে, আজ একটু এলোমেলো ঘুরে আসা যাক। বাবার বলা ‘জনসেবা’ কথাটা হাওয়ায় পাক খাচ্ছিল। বোধহয় সবেদা গাছে ধাক্কা খেয়ে তার কানে এসে পৌঁছেছিল আবার। আর তখনই ঠিক করল, আজ আর বেরোবে না। তালা খুলে ঘরে ঢুকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, দাদার কথা মনে পড়ে বাবা? বাবার চোখে চোখ রাখে সে। বিষণ্ণ ছায়া কি ঝুলে আছে চোখে? খোঁজার চেষ্টা করে সুধন্য। 
মনে তো পড়ে! খুবই মনে পড়ে! 
দাদার লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে তুমি বলেছিলে এই বডি আমার ছেলের নয়! এই ঘটনাটা মা আমাকে প্রায়ই বলত আর কাঁদত। তুমি কী করে পারলে? নিজের ছেলে… 
পারতেই হয়েছিল সু। তোর মাও বুঝতে চায়নি। তুইও না। রত্না আমাকে অনেকবার অনুযোগ করেছে। আমি সবার ভালোর কথা ভেবেই প্রদ্যুম্নর মৃতদেহ চিনেও চিনতে চাইনি। আমি যদি সেদিন বলতাম, হ্যাঁ, এটাই আমার ছেলের লাশ, তাহলে রেহাই পেতাম? রাষ্ট্রের চোখে ওর মতো অতি বামপন্থীরা অপরাধী। ও আমার ছেলে স্বীকার করলে পুলিশ কি আমাদের ছেড়ে দিত? ইন্টারোগেশনের নামে কম হ্যারাসমেন্ট করত? কিছুটা দৌড়ঝাঁপ করে, অনেক ধরাধরি করে ব্যাপারটা সামলানো গেছিল। এসব না-করলে তোর পড়াশোনা, আমাদের সুস্থির ভাবে টিকে থাকা এখানে সম্ভব হত, বল? পাড়াপ্রতিবেশী আমাদের সহজভাবে মেনে নিত? 
না নিলে না নিত! দাদা তো খারাপ কাজ কিছু করত না। হতদরিদ্র, খেতে না-পাওয়া মানুষগুলোর জন্য কাজ করত। সেটা তো অন্যায় ছিল না বাবা! 
তা ছিল না। কিন্তু পুলিশ কি সেসব শুনতে চায়? প্রশাসনের কাছে এসবের মূল্য নেই! 
তা বলে নিজের ছেলের লাশ… মাথাটা ঝাঁকায় সুধন্য। বাবার দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না তার। 
তোরা কেউ কি আমার কথা একবারও ভেবেছিস? নিজের ছেলের লাশ দেখেও অস্বীকার করতে হয়েছিল আমাকে। সে যে কী যন্ত্রণার তোরা বুঝবি না! 
তুমি কীরকম দেখেছিলে দাদাকে? 
এই জিজ্ঞাসাটা না-করলেও পারত সুধন্য। কেননা বাবার মুখে অনেকবারই শুনেছে। বাবা নিজেই বলেছিলেন। সে নিজেও কয়েকবার জিজ্ঞাসা করে জেনেছে। তবু বারবার জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করে। বাবারও যেন এর জবাব দিতে ক্লান্তি নেই। ঘোরের মধ্যে থেকে প্রতিবারই একই জবাব দিয়েছেন। 
দেখলাম আমার প্রদ্যুম্নর ডানাদুটো পাশে মাটিতে ছড়িয়ে আছে। নিষ্প্রাণ শরীরের নানা জায়গায় রক্তের দাগ। ও সবসময় বলত, আমি পাখি। পাখির মতো উড়ি। উড়ে উড়ে দেখি মানুষের যন্ত্রণা। খারাপ থাকা। ওদের কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করি। সেই পাখিটার ডানা থেমে গেল রে, একেবারেই থেমে গেল! জনসেবাই আমার ছেলেটাকে কেড়ে নিল। কেন যে এসব পথ বেছে নিয়েছিল, কে জানে! 
সুধন্য কোনও কথা বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে খাটের পাশে। 
বেরিয়ে আবার ফিরে এলি যে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি? 
নাহ্, শরীর ঠিকই আছে। আজ আর বেরোতে ইচ্ছে করছে না। কেমন যেন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। 
এই তো চা খেলি। সিগারেট খেলি। তাও ঘুম কাটল না? 
নাহ্। খুব ক্লান্ত লাগছে বাবা। খুব… 
তাহলে ঘুমো। বিশ্রাম নে। 
হ্যাঁ বাবা। কথাটা বলে পোশাক না-ছেড়েই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয় সুধন্য। 
তুই কি বিয়ে করবি না? আচমকা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন ঋষিকেশ। 
না বাবা। আমার বাঁধা পড়তে ইচ্ছে করে না। 
বাঁধা বলিস না। আমি কি বাঁধা পড়েছিলাম? 
তুমি হয়তো পড়োনি। কিন্তু মা পড়েছিল। গান ভুলে গেল। ছবি আঁকা ভুলে গেল। বাসন্তী কলোনির ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েদের পড়াত। তুমি বাধা দিলে। মানুষের পাশে থাকা তো খারাপ কাজ নয় বাবা! 
না, খারাপ নয়। আসলে তোর দাদার কথা মনে পড়লেই কেমন যেন ভয় করত। এখন অবশ্য সমস্ত ভয়-টয়ের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে এসেছি। 
ওসব তোমার অমূলক ভয় ছিল বাবা। 
আচ্ছা আচ্ছা, অনেক হয়েছে। বাবাকে সুযোগ পেলেই সমালোচনা করিস। মরে গিয়েও শান্তি নেই। এখন ঘুমো। 
ঘুম! কতদিন যে নিশ্চিন্ত ঘুম আমার আসে না বাবা! কিছুতেই আসে না! 
আচ্ছা, মাঝে মাঝেই মধ্যরাতে ছাদে চলে যাস। কেন রে? 
আকাশ দেখি। ওটা আমার মায়ের আকাশ। সেই আকাশে মাকে খুঁজি। 
তোর মায়ের আকাশ? তোর মা বলত বুঝি? 
হ্যাঁ। বিনুকাকা মাকে দিয়েছিলে একটুকরো আকাশ। মা সেটাকেই যত্ন করে ধরে রেখেছিল। 
বিনুকাকা আকাশ দিয়েছিল মানে কী? 
মারা যাবার কিছুদিন আগে একবার বিনুকাকা ফোন করেছিল মাকে। সেদিন ছিল মায়ের জন্মদিন। মা হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘জানো বিনু, আজ আমার জন্মদিন। তোমার দাদার মনে নেই। কোনওদিনই মনে রাখে না অবশ্য।’ তখন বিনুকাকা মাকে বলেছিল, তুমি জানলা দিয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছ বৌদি? মা বলেছিল, হ্যাঁ পাচ্ছি। বিনুকাকা বলেছিল, যতটা আকাশ দেখতে পাচ্ছ, সেটা তোমাকে দিলাম। ওটা তোমার জন্মদিনের উপহার। আজ থেকে ওটা তোমার। সেই থেকে মা পুব আকাশের ঐ অংশটা নিজের মনে করত। আমি খুঁজে দেখি মাকে পাওয়া যায় কিনা সেখানে। 
বিনুটা কী যে ভালবাসত তোর মাকে! ছোট থেকেই আমাদের বাড়িতে আসত। খুব বৌদি বৌদি করত রত্নাকে। সবাইকে অবশ্য বলত, বৌদি আমার মায়ের মতো। সেই বিনুও কেমন হারিয়ে গেল! ওই তো প্রদ্যুম্নর মনে মানুষের কথা ভাবার মন্ত্রটা দিয়েছিল। 
চুপ করে বিনুকাকার কথা ভাবে সুধন্য। দাদার থেকে সামান্যই বড় ছিল। দুটো বাড়ির পরে থাকত। পাড়া সম্পর্কে বাবাকে দাদা আর মাকে বৌদি বলে ডাকত বিনুকাকা। দাদা কাকা ডাকলেও তুই করে বলত। দুজনের খুব ভাব ছিল। কীভাবে যেন দাদাও জড়িয়ে গিয়েছিল বিনুকাকার সঙ্গে। মাকে মাঝে মাঝে ফোন করত। তবে কোথা থেকে করত, জানাত না। দাদা কমই ফোন করত। বিনুকাকাই দাদার খবর জানাত মাকে। তার এইসব ভাবনার মধ্যেই ঋষিকেশ বলে উঠলেন, তুই শুধু আমার দোষ ধরিস। তোর মাও ধরত। 
তোমার দোষ ধরতাম না শুধু, ভালোও বাসতাম। তুমি বুঝতে পারতে না। এখনও ভালোবাসি। না-হলে তোমার ছবির সঙ্গে এত কথা বলি? মায়ের ছবির সঙ্গে তো বলি না! মা ছিল সবচেয়ে প্রিয়… 
মায়ের ছবির সঙ্গে কথা বলিস না হয়তো, তবে শোবার ঘরে তোর মাথার কাছের দেয়ালে মায়ের ছবি রেখেছিস। 
হ্যাঁ বাবা, আমি ঘুমোলে মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সারারাত। 
বড় ছেলেকে হারিয়ে রত্না তোকে বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিল। 
ঠিকই বলেছ। তুমি আমাদের দুজনের মাঝখানে কঠিন পাঁচিলের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিলে। তাই আমি আর মা দুজনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চেয়েছিলাম। 
আচ্ছা ঠিক আছে। আর বকবক করিস না। সেই ছোটবেলার মতো আছিস এখনও। এবার ঘুমো। 
সুধন্য চোখ বুজে বাবার স্পর্শ অনুভব করে। তার মধ্যেই বাবার ফিসফিসে গলা শুনতে পায়, আমরা ভাবতাম নতুন প্রজন্ম শুধুই ক্যারিয়ারিস্ট। কিন্তু ওরা ক্যারিয়ারের পাশাপাশি মানুষের কথাও ভাবে! এসব দেখে খুব তৃপ্তি পাই এখন। আমরা তো সংসারটাকেই মুখ্য ভেবে জীবন কাটিয়ে দিলাম! ভালো থাকিস সু। মানুষের পাশে থাকিস। 

হাওয়ায় পাক খেতে খেতে ঋষিকেশের কথাগুলো ভেসে বেড়ায় ঘরের মধ্যে। সুধন্য চুপ করে শোনে। ঘুম জড়িয়ে আসে তার চোখে। 

রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২০

আবেশ কুমার দাস

                                     


  

এই সংখ্যার গদ্যকার আবেশ কুমার দাস৷জন্ম ৩০ মার্চ, ১৯৮৩। উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে। প্রযুক্তিবিদ্যা শাখায় পড়াশুনো। কর্মসূত্রে বেসরকারি প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা।ছোটগল্প রচনার মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা শুরু। লিখেছেন সাহিত্য, সিনেমা ও ক্রিকেট বিষয়ক কিছু নিবন্ধ। বর্তমানে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ‘বাক্‌’ পত্রিকার গল্প বিভাগ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। তিনটি ছোটগল্প ও দু’টি নিবন্ধ সংকলন ইতিমধ্যে প্রকাশিত।


যখন লকডাউন



খবরটা আর বেরোয়নি শুক্রবারের কাগজে।

ছবিটা অবশ্য বড় করেই ছাপা হয়েছিল বৃহস্পতিবার। ফটোগ্রাফির হিসেবেও কাজটা ছিল বেশ পাকা হাতেরই। মুখটা অল্প নামানো থাকলেও পরিচিতরা ঠিকই চিনতে পেরেছিল মৃত্যুঞ্জয়কে। উপরন্তু সাবজেক্টের যেমন ফ্রেমের ঠিক মধ্যিখানে থাকার কথা, সেভাবেই ছবিতে ছিল মৃত্যুঞ্জয়।

খবরের কাগজের পাতায় ছবি ছাপা হওয়া বলে কথা।

চার লাইনের খবর হওয়া কি তার চাইতেও বড় হল!


বাজার থেকে ফিরে জামাকাপড় গামলায় ফেলে খিড়কির চাতালে ব্লিচিং ছড়াচ্ছিল বাপি। একটু ঘষে দেবে এরপর ঝাঁটা দিয়ে। শেষে ঢেলে দেবে দু’ বালতি জল। সদর নয়, বাড়িতে ঢুকছে বেরোচ্ছে আজকাল খিড়কি দিয়েই।

সদর দিয়ে ঢুকে বাথরুমে আসতে হয় শোবার ঘর ডিঙিয়ে। কিছুতে হাত না-ই দিল। বাইরের কাপড়ে হেঁটে আসবে ঘর দিয়ে! ভয় পেতে মানা করেও যা ভয় দেখিয়ে দিচ্ছে টিভি-কাগজ! এখন তো বলছে হাওয়াতেও নাকি ভেসে থাকতে পারে আপদটা। তার চাইতে এই ভাল। চাতালের কলের তলায় বাজারের জামাপ্যান্ট ছেড়ে একেবারে চান করে ঢোকো ঘরে। সারারাত তারেই মেলা থাকে আগের দিনের কাচা কাপড়জামা। চাতালটা শেড দিয়ে ঢাকা বলে সাঁঝ পাওয়ারও ঝামেলা নেই যেহেতু। চান সেরে শুকনো কাপড় চড়িয়েই একেবারে ঘরে ঢোকে বাপি।

মাথায় জল ঢালার সময়ই খেয়াল করেছিল গতকাল। ভাল পা হড়কাচ্ছে চাতালে। তখন আর ঝাঁটা ধরতে ইচ্ছে করেনি। ভেবে রেখেছিল আজ চানের আগে ব্লিচিং ছড়িয়ে একপ্রস্ত ঘষে দেবে চাতালটা। এমনিতে মা-ই করে এসব। কিন্তু বাড়ি বসে বসে ক’দিনেই হাঁপিয়ে উঠেছে বাপি। কলকবজায় না জং ধরে যায় এরপর!

বাজার করার বাইরে আর কোন কাজটা করার আছে হালে! তাও পৌঁনে দশটা বাজল তো মোড়ের মাথায় এসে দাঁড়াল কালো ভ্যান। তারপর আর দেরি হয় না ভিড় পাতলা হতে। এপ্রিলের ফার্স্ট উইক পেরোতে চলল। সবাই বলছে আরও নাকি বাড়বে লকডাউনের মেয়াদ। গোটা এপ্রিলটাই নাকি টেনে দেবে এভাবেই। বাড়ি বসে থাকতে যে এত বিরক্তি, ভাবতে পেরেছে কোনওদিন বাপি! মার্চের গোড়াতেও মনে হত, দু’দিন ছুটি নিয়ে স্রেফ শুয়েবসে থাকবে ঘরে।

রাতে ফিরতে ফিরতে ঘড়ির কাঁটা প্রায়দিনই ছুঁয়ে ফেলত এগারোর দাগ। মিউনিসিপ্যালিটি চত্বরে দোকান। সওয়া দশটা-দশটা কুড়ি অবধি থাকতই দু’-একজন খরিদ্দার। তারপর হিসেব মিলিয়ে ঝাঁপ ফেলে বেরোতে বেরোতে সেই যার নাম সাড়ে দশটা-দশটা পঁয়তিরিশ। একদিন বন্ধ ঠিকই দোকান। কিন্তু ছুটি বলতে যা বোঝায় সচরাচর সেটা থাকত না বাপির। মাসের মধ্যে কম সে কম দুটো বিষ্যুদবার ছুটতেই হত চাঁদনি। শিয়ালদার মেন লাইনের ট্রেন। মানুষ যেন বেড়েই চলেছে দিনকে দিন। এই ছ’ বছরের অভিজ্ঞতায় তেমনই মনে হয়েছে বারেবারে বাপির। মফস্‌সলের দিক থেকে পেটের টানে কত লোক যে যায় রোজ কলকাতায়, টের পাওয়া যেত এই লোকাল ট্রেনের কামরাতেই। উলটোদিকের দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত বাপি। পুরনো প্লাটফর্মগুলোকে ধরে ধরে বাড়ানো হচ্ছে স্টেশনে স্টেশনে। কাঁকিনাড়ায় প্রায় তৈরি হয়ে গেল আস্ত একটা নতুন প্লাটফর্ম।

সাড়ে সাতটা-আটটার দিক করে ট্রেন থেকে নেমেও তখনই বাড়ি ফেরা হত না বাপির। মাদারবোর্ড, প্রিন্টার, হার্ড ডিস্কের হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হত দেবুদার বাড়ি গিয়ে। দু’-একটা বিষ্যুদবার হয়তো যেতে হত না কলকাতায়। কিন্তু শুয়েবসে ছুটি কাটাতে হলে কপাল করে আসতে হয়। কলকাতায় যাওয়া না থাকলে কাস্টোমারদের বাড়ি পাঠাত দেবুদা। কার পাঁচ বছরের পুরনো ল্যাপটপ অন হচ্ছে না। কার মনিটরে সবুজ ছোপ আসছে। পনেরো মিনিট থেকে তিন ঘণ্টা— কতক্ষণের কাজ না গেলে বোঝার জো নেই। অল্পক্ষণে মিটে গেলেও বিরক্তি ধরত। এটুকুর জন্য ছুটির দিনে টাইম বের করে আসতে হল ছুটে। শুক্রবার অবধি ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারল না লোকটা। বেশিক্ষণ লাগলেও গরম হত মাথা। বাড়ির একটা কাজ সেরে আসা যেত এই সময়ে। সেই বিকেলে আধাঘণ্টা-চল্লিশ মিনিট দেরি করে টাইম দিতে হবে পৃথাকে। এখনও ম্যাচিয়োরিটি আসেনি মেয়েটার। গুম হয়ে বসে থাকবে মিনিট দশেক। আবার তেলাতে হবে...

কতদিন ভেবেছে তখন বাপি। একেবারে নির্ভেজাল ছুটি নিয়ে বসে থাকবে দু’দিন। কিন্তু শুয়েবসে থাকা যে এত বিরক্তির কে ভাবতে পেরেছিল! খুঁজে খুঁজে কাজ বের করছে ইদানীং বাপি। বাজার এতকাল করেছে বাবা-ই। কিন্তু বুড়ো মানুষটাকে তো আর ভিড়ের মধ্যে পাঠানো যায় না এখন। একেই সুগারের রুগি। চাতালের শ্যাওলা সাফ করেছে এতদিন মা-ই। কিন্তু এত কাচাকাচির পর আবার খাটাবে বুড়িটাকে। একেই হাঁপের সমস্যা।

নিজেই ব্লিচিং ছড়াচ্ছিল তাই আজ বাপি।

তখনই কানে এসেছিল। ফোনে কার সঙ্গে কথা চলছে মা-র। উৎকণ্ঠায় গলার আওয়াজ চড়ে যায় মানুষটার। ভেসে আসা কণ্ঠস্বর থেকে শব্দগুলোকে আলাদা করতে না পারলেও টের পাচ্ছিল মায়ের উত্তেজনা। কী আর হবে! কুলতলা বা সাহাপাড়া থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে হয়তো আবার কাউকে। বাড়ি সিল করে লোকজনকে বেরোতে মানা করে গিয়েছে চোদ্দো দিন। কাকিমাকেও বলিহারি। রোজ ফোন করে করে এসব গল্প না শোনালেই নয় মাকে!

অদ্ভুত একটা ব্যাপার টের পাচ্ছে হালে বাপি। মৃত্যুভয় যত নিশ্বাস ফেলে ঘাড়ের কাছে, রোগ-জরা-মৃত্যুর খবর রাখাও যেন ততই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র নেশা। বলে বলে যা হয়নি এত বছরে, সেই বিড়ির নেশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে বাবা। অথচ রোজের কাগজ তন্নতন্ন করেও যেন আজকাল শান্তি নেই মানুষটার। টিভি খুলে ঠিক সেই খবরের চ্যানেলগুলোই চালিয়ে বসে থাকবে দিনরাত। আর খবর তো এখন একটাই। জালিয়াতি, রাহাজানি, খুনজখমের কিছুও যেন আর ঘটছে না হালে ভূভারতে! খবর বলতে শুধু সারা পৃথিবীর কোথায় কত বাড়ল আক্রান্তের সংখ্যা আর মরে গেল কত মানুষ! অলিম্পিক পদকের দৌড় চলছে যেন! এক-একদিন আশ্চর্য লাগে বাপির। পানুর ক্লিপিংসও আর পাঠায় না কেউ শালা হোয়াটসঅ্যাপে...

ব্লিচিং ছড়িয়ে কতক্ষণ রাখে কে জানে! সঙ্গে সঙ্গেই ঝাঁটা টেনে দেয়! উপযাচক হয়ে হাত দিয়েছিল বটে কাজটাতে। এখন টের পাচ্ছে কোনও কিছুতেই অন্ধের মতো নেমে পড়লেই হল না। মাকে ডাকবে নাকি একবার...

গলার আওয়াজটাও এদিকেই আসছে না!

দাঁড়া, আমি বলছি। কী যে করিস না তোরা...

ফোন কাটতে কাটতে এসেও দাঁড়িয়েছে মা।

বাপিকে আর বলতে হয় না কিছু। মা-ই বলে ওঠে, কী করছিস? এখন রাখ এসব। বেরোতে হবে এক্ষুনি তোকে...

মানে! এখন আবার কোথায় বেরোব! সাড়ে দশটা বাজতে চলল...

আর বলিস না। পুচাই ফোন করেছিল। তোর কাকা রাগারাগি করে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে...

কী বলছ, ঝাঁটা ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ায় বাপি, কোথায় বেরিয়েছে এই লকডাউনের মধ্যে!

ওই তো। এত আড়বুঝো না বাড়ির এই পুরুষমানুষগুলো! ক’দিন ধরে শরীর ভাল যাচ্ছিল না। এখন হবেই। দোকান বন্ধ। তার এক টেনশন আছে। মালা বোধহয় বলেছিল, বাড়ি বসে রয়েছ একদম, হজমের গণ্ডগোল তো হবেই একটু। তাতেই তেজ করে নাকি বেরিয়ে গেছেন বাবু...

বাপির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। বলে, ফোন নিয়ে যায়নি?

তাহলে কি আর ভাবনা ছিল! এদিকে দু’ ঘণ্টা হয়ে গেছে। পুচাই যতটা পেরেছে ঘুরে ঘুরে দেখে এসেছে এদিক-সেদিক...

না না, ও আবার বেরোতে গেল কেন! পুলিশ ঘুরছে রাস্তায়...

বলতে বলতেই তার থেকে কাচা জামাকাপড় টেনে নিয়েছে বাপি। মাস্ক তো এসেই ছেড়ে দিয়েছিল গামলার জলে। একটা রুমালই গিঁট দিয়ে নেয় এখন মাথার পেছনে। এবার হায়ার সেকেন্ডারি দিচ্ছিল পুচাই। অভাবের সংসারেও বয়সের একটা স্বাভাবিক চটক লেগেছেই গায়েগতরে। দিনকাল ভাল নয়। অসুস্থতাকে ঢাল করে রাস্তাঘাটে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে রক্ষকই। ওদিকে ঘরে বসে থাকলেও ছ’ মাস দিব্যি এখন হেসেখেলে চলে যাবে যাদের, ফেসবুকে তারাই নিদান দিচ্ছে কড়া দাওয়াইয়ের। কী যে করে না কাকাটা! বুদ্ধিশুদ্ধি হল না এতদিনেও। নিজেও বিপদে পড়বে। মেয়েটাকেও ফেলবে। না না, একা-একা বেরোতে গেল কেন পুচাই! প্রথমেই ফোন করা উচিত ছিল বাপিকে। ফোন অবশ্য চার্জে বসিয়ে রেখে বাজারে বেরিয়েছিল বাপি। রুমালটাকে মাথার পেছনে গিঁট দিয়ে দাড়ির মতো ঝুলে থাকা অংশটাকে ঘুরিয়ে আবার নাকের কাছে তুলে আনে বাপি। কোন কোন রাস্তায় ঘুরপাক খেতে হবে এখন কে জানে! মামাদের মুখে না পড়াই বিচিত্র। মুখে ঢাকা থাকলে তাও কথা শুনবে মামারা।

মা গজগজ করে যাচ্ছে তখন, ঘরে বয়েস্থা মেয়ে। সেসব তো ভাবল না জীবনেও। পইপই করে বলা হয়েছিল তখন। ব্যাঙ্ক থেকে সব টাকাগুলো তুলে বসিও না ওসব জায়গায়। এখন দোকান বন্ধ। কী করে চলবে সেই টেনশন। টাকাগুলো থাকলে বুকে বল থাকত তাও...

সাইকেলটা থাকে সিঁড়ির তলায়।

সেই চান না করেই ঢুকতে হল ঘরের ভেতর।


পাছায় হালকা রুলের গুঁতো দিতে দিতে হলদে দাঁত বের করে হাসছিল পুলিশটা, নামটা তো খাসা বে। মৃত্যুঞ্জয়। তাই বুঝি মরার ভয় নেই একদম...

যদিও পুলিশটার মুখ আসেনি ছবিতে।

ক্যামেরার ফোকাস ছিল বাপির মুখেই। বুঝতে পেরে শেষ মুহূর্তে মাথা নামিয়েও নিয়েছিল বাপি। তবে বড় কাগজে চাকরি করা ফটোগ্রাফারের হাতের রিফ্লেক্স তো। সারা বাংলার লোক না হোক, বৃহস্পতিবারের কাগজ দেখে সারা শহরের লোক ঠিকই চিনে নিয়েছিল কান ধরে ওঠবোস করতে থাকা বাপিকে। আসলে খোদ মিউনিসিপ্যালিটি চত্বরে দোকান দেবুদার। দোকানে আসুক আর না-ই আসুক, কাজে-অকাজে বিগত ছ’ বছরে ওই চত্বরে একদিনও পা রাখেনি এমন মানুষ মাইক্রোস্কোপে খুঁজতে হবে শহর ঢুঁড়ে।

শুক্রবারের কাগজে অবশ্য আর বেরোয়নি বিষ্যুদবার দুপুরেই বাপির নিজের ঘরের সিলিংফ্যান থেকে ঝুলে পড়ার খবরটা।








রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২০

অর্পিতা বোস






আত্মপক্ষ 

____________

                           

--মা,  নীলাদ্রির বয়স বত্রিশ আর আপনার ত্রিশ বছর হলো বিয়ে হয়েছে!  কি বলছেন!
  পুত্রবধু কোয়েলের কথায় চমক ভাঙে রঞ্জিতার। অসতর্কভাবে একি বলে ফেললেন!  এত বছর যে কারণে সবকিছু  মনের মাঝে লুকিয়ে রেখে, সবার থেকে দূরত্ব  রেখে এখানে  এলেন। আজ হঠাৎ  কি করলেন! আমতা  আমতা করেন । মিথ্যে কথাটাও কি বলবেন বুঝে পাননা। এতবছর মিথ্যে সম্পর্ক সবাইকে বোঝানোর  চেষ্টা করলেও ছেলের বউকে মিথ্যে বলতে পারলেন না। চোখ না তুলেও বুঝতে পারেন কোয়েল তার দিকে সন্দেহের চোখে  তাকিয়ে  আছে। 
  - মনে হয়  ফোন  বাজছে, আমি  ঘরে যাচ্ছি বৌমা। তুমি বাসনগুলো তুলে শুয়ে পড়ো।
 বলেই রান্নাঘর ছাড়েন।  খাটে বসে ভাবেন  এতটা অসতর্ক হলেন কি করে!  নীলাদ্রী সবটা জানলে যদি...
  নাহ্!  বুকের  কাছটা অজানা  আশঙ্কায় কেঁপে  ওঠে। শরীরটা কেমন করে ওঠে, ফ‍্যানটা ফুলস্পিডে থাকলেও খুব ঘাম  হতে থাকে। কাঁপা হাতে মোবাইলটা নিতে  গিয়ে  ভাবেন, এতদিন ধরে এতকষ্ট সবটা বোধহয়  শেষ  হয়ে গেল নিজের  একটা ভুলে....
     চোখে  ঘন অন্ধকার নেমে আসে রঞ্জিতার---

 __________________________________
                          **
     লকডাউনে স্কুল ছুটি থাকায় দুপুরে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়েছিল কোয়েল।মন বসছিল না বইতে।বারবার শাশুড়িমার আজকের  কথা আর ব‍্যবহারটা মনে পড়ছিল।
 ছ'মাস হলো বিয়ে হয়ে  এসেছে এবাড়িতে। এমন ছোট ছিমছাম পরিবারে  নীলাদ্রীর ভালোবাসায় কোয়েলের সুখী দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।চারজনের এই পরিবারে নীলাদ্রীর পরেই শাশুড়িমা  বড়ো আপন করে নিয়েছেন  কোয়েলকে। 
   চুপচাপ থাকা এই  মানুষটাকে কোয়েলের অদ্ভুত লাগে।কাজের লোক  থাকা সত্ত্বেও  সকাল  থেকে  রাত পর্যন্ত  সবসময়  বাড়িতে  টুকটাক  কাজ করতেই  থাকেন। কোয়েল, নীলাদ্রী আর শ্বশুরমশাই নীলাঞ্জনবাবুর যেন কোনো  অসুবিধা না হয়  সেদিকে সবসময়  সজাগ দৃষ্টি  শাশুড়িমার।তবে নীলাদ্রীকে নিয়ে যেন একটু বাড়াবাড়ি করেন মনে হয়  কখনও। বাচ্চা ছেলের মতো আগলে রাখার চেষ্টা করেন। অবাক লাগে মাঝে মাঝেই। 
  তবে  নিজের থেকে কখনও কোনো বিষয়ে কৌতূহল  দেখাননা অথবা কথাও বলেননা। কিন্তু সবাইকে এক অদৃশ্য ভালোবাসার বাঁধনে বাঁধার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু  শ্বশুরমশাইয়ের সাথে কোথাও  যেন অনেকটা দূরত্ব  আছে বলে কখনও মনে হয়  কোয়েলের। দুজনের দুই ঘরে বসবাস দেখে  অবাক  হয়েছিল। কিন্তু   শ্বশুরমশাইয়ের রাতজেগে বইপড়ার অভ‍্যাসে ঘুমের  ব‍্যাঘাত হয়  শাশুড়িমায়ের তাই আলাদা ব‍্যবস্থা। এই যুক্তিকে মেনে নিয়েছিল। আসলে এত ভাবনার জন‍্য বেশি সময়ও ছিল না এতদিন। সকালে একটু দেরি করেই ঘুম  থেকে  ওঠে নবদম্পতি। তারপর  স্কুলে যাওয়ার তাড়া থাকে। নীলাদ্রী অফিস যাওয়ার পথে তাকে নামিয়ে দেয়।
  এই লকডাউনে কাজের  লোক আসেনি  তাই  কোয়েল হাতে হাতে কিছু সাহায্য করে বটে কিন্তু  শাশুড়িমা নিজেই  যতটা পারেন করেন। এমনিতে চুপচাপ থাকা শাশুড়িমায়ের সাথে এই লকডাউনে কোয়েলের একটা সখ্যতা গড়ে ওঠে। যদিও  উনি নিজের  সম্পর্কে  কিছু  বলতেই  চাননা। কিন্তু কোয়েলের জোড়াজুড়িতে কখনও  কিছু কিছু কথা বলেন। এমন করেই আজ কথার মাঝে বলেন যে এই চব্বিশে আষাঢ় তাদের ত্রিশ বছরের বিবাহবার্ষিকী। অবাক কোয়েল বলে ফেলে,
--মা,  নীলাদ্রির বয়স বত্রিশ আর আপনার ত্রিশ বছর হলো বিয়ে হয়েছে!  কি বলছেন!         
   অবাক হয়ে দেখে শাশুড়িমায়ের মুখটা কেমন ফ‍্যাকাশে হয়ে গেছে। ফোনের  আছিলায় ঘরে চলে যান। হঠাৎ করে কেন এমন  করলেন মা?- এমন ভাবনার মাঝেই একটা ভারি কিছু পড়ার আওয়াজ আসে। দৌড়ে যায়  শব্দের  উৎসের দিকে---
____________________________________
                      ***
    নীলাঞ্জন বসে আছেন ভিজিটার্স লাউঞ্জে। রঞ্জিতার জন্য  খুব চিন্তা হচ্ছে। ম তার সংসারটাকে আগলে রেখেছেন এতবছর। অথচ স্ত্রীর অধিকার কখনও দাবী করেননি। কথা রেখেছেন বিয়ের পর থেকে।অবশ‍্য কথা রেখেছেন দুজনেই।   শর্তসাপেক্ষে করা এই  তিরিশ বছরের  বৈবাহিক  সম্পর্ক সত্যিই  অন‍্যরকম। রঞ্জিতা না থাকলে নিজের চাকরি বাঁচিয়ে  এভাবে নীলাদ্রীকে মানুষ করতে পারতেন কিনা খুব  সন্দেহ জাগে। রঞ্জিতাকে তিনি  সম্মান করেন তার কর্তব্য, নিষ্ঠা আর অধিকারের সীমারেখার মাত্রা  বজায় রাখার জন্য । কিন্তু নীলাদ্রীর কাছে তিনি ও রঞ্জিতা এক বড়ো  সত‍্য গোপন করেছেন। আজ  সবটা জানার পরে যদি ....
 এমন দোলাচলের মাঝেই  কাঁধে একটা চেনা স্পর্শে পিছনে ফিরে দেখেন নীলাদ্রী আর কোয়েল। দুজনের  চোখে-মুখেই অনেক  প্রশ্ন। 
আজ সব প্রশ্নের উত্তর  দিতে হবে ,জানেন নীলাঞ্জন। দুজনকে পাশে বসিয়ে  ফেরেন পুরোনো দিনে।

 বড়লোকের  একমাত্র  ছেলে নীলাঞ্জন  আর গ্রাম‍্য সরলতামাখা সুজাতার বিয়ে হয়। সেই সুখের সংসারে এল তাদের  ভালোবাসার সন্তান  নীলাদ্রী। তারপর  হঠাৎ ঝড়ের  মতো সব বদলে গেল যেন। সেবার নীলাঞ্জন অফিসের কাজে ট‍্যুরে গেলে দেড়বছরের ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন  সুজাতা । সেখানেই তিনদিনের জ্বরে হঠাৎ ..
   একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন নীলাঞ্জন।সুজাতার চলে যাওয়াটা তখনও  মেনে নিতে পারেননি, আজও পারেননা। সেইকথাটাই  বিয়ের  আগে স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন রঞ্জিতাকে। অবশ্য তিনিও জানতেন রঞ্জিতার কোনো মতামতের মূল্য দেওয়ার মতো অবস্থা ছিলনা। 
       সুজাতার একমাত্র ছোটবোন রঞ্জিতা   কলেজ থেকে এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় ফিরছিলেন। কে বা কারা তাকে ঘিরে ধরে আর ধর্ষণ করে আজ পর্যন্ত  কাউকে বলেননি। স্টেশনের পাশে তার ক্ষতবিক্ষত অচৈতন্য  দেহ উদ্ধার করে চিকিৎসা চললেও  দোষীদের সনাক্ত করতে  অদ্ভূতভাবে নিরুত্তর  থেকে গেছেন। 
   গ্রামে ধর্ষিতা মেয়েকে নিয়ে বসবাস করা দায় হয়ে  উঠেছিলে। একদিন রঞ্জিতার  সাথে  বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে জোড়হাতে এসেছিলেন  শ্বশুর- শাশুড়ি।অস্বীকার করতে বাধা নেই নীলাঞ্জনও নিজের স্বার্থ  দেখেছিলেন। অত ছোট্ট  ছেলেকে সামলে অফিসের কাজ করতে  নাজেহাল  হচ্ছিলেন।
 শর্ত  রেখেছিলেন নিজের  স্বার্থেই -  বিয়ের পরে রঞ্জিতা শুধু  নীলাদ্রীর মা হয়েই থাকবেন। সুজাতার জায়গা রঞ্জিতাকে দিতে  অপারগ নীলাঞ্জন। স্পষ্ট সেকথা জানিয়েছিলেন। মেনে নিয়েছিলেন রঞ্জিতা।   শুধু নীলাদ্রীর আপন মাতৃত্বের  অধিকার চেয়েছিলেন । উভয় পক্ষের  সম্মতিতে  গোপনে বিয়েটা হয়ে যায় রেজিস্ট্রি করে। বিয়ের পর থেকেই  নীলাদ্রীর ঘরেই আশ্রয়  নিয়েছিলেন রঞ্জিতা।আর  সুজাতার ছবিও সরিয়ে  রেখেছিলেন  নীলাঞ্জন। এমন করে কিছুদিন কাটল। সুজাতাদের গ্রামের জমি বাড়ি বিক্রি করে প্রথমে  শ্বশুর- শাশুড়িকে নিজের  বাড়িতে  এনে তোলেন। তারপর  অফিসে  বদলি নিয়ে বহরমপুরের  পাট চুকিয়ে এখানে  নতুন  জীবন  শুরু করেন। 
   তবে রঞ্জিতা সংসার গুছিয়ে  নিলেও কখনও স্ত্রীর  অধিকার  দাবী করতে আসেননি। নীলাদ্রীর মা হিসেবেই থেকেছেন। রঞ্জিতার বাবা-মা একে একে গত হলে সেই  ঘরেই রঞ্জিতা নিজের ঠাঁই  করেছেন। নীলাঞ্জনও  লাইব্রেরী-কাম শোবার  ঘরেই  রাত কাটিয়ে দেন  সুজাতার স্মৃতির সাথে। একছাদের তলায়  বসবাস করলেও  নীলাঞ্জন আর রঞ্জিতা শুধু  কর্তব্য পালন করেছেন  একে অপরের প্রতি। কিন্তু  নীলাদ্রীকে কেন্দ্র  করেই রঞ্জিতার জীবনের  নতুন  অধ‍্যায় শুরু  হয়েছিল।
আর তাই আজ অজান্তেই  সত্যি  কথা বেরিয়ে ভয় পেয়েছেন রঞ্জিতা।সেই মানসিক চাপে অসুস্থ হলেন। 
 
 এতবড়ো সত‍্যিটা জেনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে নীলাদ্রী। যাকে এতদিন  মা বলে   জেনে এসেছে তিনি আসলেই মাসি! সুজাতার ছবিটা দেখতে চায়। মানিব‍্যাগ থেকে  সুজাতার  একটা ছবি দেখান নীলাঞ্জন। দুচোখ  ভিজে যায়  অজান্তেই। চেয়ার ছেড়ে  এগিয়ে যায়  নীলাদ্রী। 


 জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা নীলাদ্রীর মনের ভেতরে ঝড় চলছে। এতবড়ো সত্যিটা এতবছর সে জানলোই না। নাড়ির  সাথে যার সম্পর্ক সেই গর্ভধারিনীকে আজ প্রথম  দেখল!তাও ছবিতে অথচ সেই ছোট থেকে  যাকে মা বলে জেনেছে, জীবনের প্রতিটা ওঠাপড়ায় পাশে যে ছিল মাতৃরূপে তিনি....
   চোখটা বন্ধ  করে সুজাতাকে  মাতৃরূপে অনুভব করতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই রঞ্জিতার  মাতৃত্বের সত‍্যকে অস্বীকার করতে পারছেনা । কোয়েলের ডাকে চোখ মেলে। আপন মনে বলে ওঠে,
--' মা ' শব্দটা আজ আমার কাছে বড়ো  অদ্ভুত লাগছে। ছোটবেলাতেই থেকে  যে মানুষটা আমার  ঘুম থেকে ওঠা থেকে আমার  ঘুমিয়ে পড়া, আমার  পড়াশোনা শরীর খারাপ  সব কিছুতে আমার  সাথে সাথে জড়িয়ে আছেন  তিনি  আমার  মা নন!  আর আমার আসল মা... 
  একটা দীর্ঘশ্বাস  ফেলে  আবার  বলতে শুরু করে,
-- জানো  চোখ বন্ধ করে নিজের মায়ের ছবিটা যতবার  দেখতে চাইছি ততবার মাকে মানে মাসিকে  ...

 কথাটা শেষ করার আগে কোয়েল মৃদু হেসে হাতে ভরসার হাত রেখে বলে ওঠে, 
-- হ‍্যাঁ, নীলাদ্রী,তোমার  মাকেই দেখছ। মাতৃত্ব যখন যখন  সব সম্পর্কের উর্ধ্বে চলে যায়  তখন  এমন হয়। মা অথবা মাসি যে নামেই ডাকোনা কেন, তোমার  চেতনে অথবা অবচেতনে একজনকেই দেখবে। তোমার স্বত্ত্বায় মাতৃত্বের একটাই মূর্তি। ভালোবাসা আর স্নেহ দিয়ে গড়া এমন সম্পর্ককে  অস্বীকার করার ক্ষমতা  কারো নেই। 
-- কিন্তু  এতবড়ো মিথ্যে!
-- আমি  সত্যি-মিথ‍্যে এভাবে বুঝিনা নীলাদ্রী। আমি অনুভবে সম্পর্কের বাঁধন চিনি। ওনার জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন তুমি। হ‍্যাঁ, কখনও কখনও  ওনার  তোমার প্রতি পজেসিভনেস দেখে আমিও  অবাক  হয়েছি। তবে একথা স্বীকার করি তোমার খুটিনাটি সব বিষয়ে ওনার যা নজর, ততটা আমার গর্ভধারিনীর নেই। এটাই ভালোবাসা  এটাই সত্য।যিনি তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে অসুস্থ  হয়ে  পড়েছেন।তাকে ভুল বুঝোনা প্লিজ। চলো ভিজিটিং আওয়ার শুরু  হয়েছে..


 
___________________________________
                  ****
      ঝাপসা ছবিগুলো স্পষ্ট  দেখতে  পাচ্ছেন  রঞ্জিতা--
     
    অষ্টাদশী রঞ্জিতা স্টেশনে নামতেই  ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি  নামল। আজ  কলেজের পরে লিলির জন্মদিনের জন্য  ফিরতে বেশ দেরি হলো। এদিক- ওদিক তাকাতেই দেখে স্টশনটা প্রায় ফাঁকা  হলেও  ঐ ছেলের দলটা বসে আছে। ওদের দেখেই বুকটা কেঁপে ওঠে। কতদিন  ধরেই  কলেজ  যাতায়াতের পথে বিরক্ত করছে। দলের পান্ডাটা আবার গ্রামের প্রধানের ছেলে। লিলির জন্মদিনের আনন্দে ভুলেই গেছিলেন এদের  কথা।ওদের  দেখে স্টেশনে আর দাঁড়িয়ে  না থেকে বৃষ্টির  মধ্যেই  পা বাড়ালেন। গ্রামের রাস্তা সন্ধের পরেই লোকজন কম থাকে,আর আজ তো বৃষ্টি। শুনশান  রাস্তায়  কিছুটা এগোতেই  বুঝতে পারেন বিপদ পিছু নিয়েছে...

সেই ভয়ানক সর্বনাশের পর হাসপাতালের বেডে শুয়ে চেয়েছিলেন  সত‍্যটা প্রকাশ করবেন। কিন্তু পুলিশ আসার একটু  আগেই  ওয়ার্ড বয়ের ছদ্মবেশে  সেই কুকীর্তির একজন এসেছিল। নিজের থেকেও বেশি  ভয় পেয়েছিলেন বাবা-মায়ের জন‍্য। তাই অপরাধীদের  শনাক্ত করতে পারেননি পুলিশকে জানান। কিন্তু বাড়িতে  ফিরতেই শুরু হলো আরেক অত‍্যাচার। ধর্ষকের নয় ধর্ষিতার শাস্তি হয়  সর্বদা। তাই প্রতিবেশী থেকে শুরু করে ধর্ষকের বাবার  হুমকি  আর মানসিক  চাপে নিজেকে শেষ করে দিতে  গিয়েছিলেন। কিন্তু  মা দেখে  ফেললেন, তারপর...
 তারপর  অন‍্য জীবন। সে জীবনের  একমাত্র  অবলম্বন  দুবছরের নীলাদ্রী। লতার মতো আগলে বাঁচতে চাওয়া। ওকে ঘিরেই  তো সবকিছু। কিন্তু  আজ হঠাৎ   ভুলে  বলে ফেললেন। সত্যিটা জেনে যদি নীলাদ্রী তাকে....
  বন্ধ  চোখের পাতা থেকে  গড়িয়ে  পড়া জলটা মুছে  দেয় চেনা হাতের স্পর্শ। চোখ মেলতেই দেখেন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে  আছে নীলাদ্রী আর কোয়েল। আর বেশ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখেমুখে আজ উৎকণ্ঠার ছাপ। 
  
  --মা,
-- তোকে বলিনি রে আমি  তোর মা...
    কথাটা শেষ করতে পারেননা রঞ্জিতা।
-- তুমিই  আমার  মা। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি চলো।

   রঞ্জিতার হাতটা শক্ত করে ধরে নীলাদ্রী। স্পর্শেরা জানান দেয় আত্মজ না হলেও মাতৃত্বের সম্পর্কের  বাঁধন অনেক শক্তিশালী। 
___________________________________

      



 


সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়




নিও-রিয়ালিস্ম

______________________________________________________


শট -

দীপ্তি ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োর কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে ভাঙা বেঞ্চিটাতে বসেছিল কমল শটটার ফাইনাল টেক ওকে করে বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীপ্তির পাশে এসে বসে বলল, কোথা থেকে যে ধরে আনে এদের, না পারে ডায়ালগ বলতে, না পারে ঠিকঠাক পজিশন নিতে
-কেন, মেয়েটাকে তো দেখতে শুনতে ভালো
-তাতে কি? শোন্‌ , ক্যামেরায় কাজ করতে গেলে আগে জানতে হবে আলো কি ভাবে নিতে হয়তারপর দেখতে হবে কামেরা কেমন ফ্রেম ধরছে। এস পি হলে একরকম, মিড শটে আবার অন্যরকম। আরে বাবা বেসিকটা তো ঠিক রাখতে হবে। উতরে যাচ্ছে কেন জানিস? নেহাত ঢপের সিরিয়াল তাই। পড়ত তেমন লোকের পাল্লায়, বুঝত।
-তাও তো এরা অভিনয় করছেহিরোইনের রোল। আর আমার দেখ, চারটে বছর হয়ে গেল, সেই এক্সট্রার রোল।
-ওসব ভাবিস না, অভিনয়টা মন দিয়ে করে যা। সুযোগ একদিন আসবেই। ও শোন, রুপাদি সেদিন তোর কাজের প্রশংসা করছিল। আমায় জিজ্ঞাসা করল, মেয়েটা কে। আমার মনে হয় বীণাদি একটা নতুন কাজ নামাবে। তারই কাস্টিং চলছে।

-ও আমায় নেবে না। কে দেখেছে আমার অভিনয়। কোথায় রুপাদি কি বলল আর তুমিও একেবারে বীণাদির সিনেমায় আমায় দেখে নিলে। তোমারও না... যতসব... আমার এখন রোজ কাজ দরকার। মায়ের শরীর ভালো না। কাল বলছিল আর চার বাড়ির বাসন মাজতে পারে না। বাসন মাজা, ঘর মোছা, দু বাড়ির জল আনা। পেরে ওঠে না আর। দেখো মাসে অন্তত দিন পনেরো কাজ পেলে আমি মায়ের দুটো বাড়ি ছাড়িয়ে দিতে পারি। এদিকে বাপ শুনছে না। বলছে যা পাচ্ছিস জমিয়ে রাখ, বিয়েতে কাজে আসবেআর বিয়ে...

কমল সিগারেটটায় একটা লম্বা টান মেরে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিতে দিতে বলল, এই হল তোদের নেগেটিভ মাইন্ড সেট। দেখই না কি হয়। চল আমার শট রেডি, আলো হয়ে গেছে, তুই এখন কি করবি? আর বাকি আছে কাজ?
-হ্যাঁ, রাহুলদা বসতে বলেছে, একটা শট রি-টেক করবে না কি। আমি আছি, তুমি সেরে নাও।
-সাড়ে নটা তো বাজল, আর কখন বাড়ি যাবি? শীতের রাত। দেখি রাহুলকে বলে তোরটা যদি আগে নিয়ে নেয়।
-ছেড়ে দাও কমলদা। লোক সুবিধের নয়। অন্য চোখে দেখবে। তুমি যাও, আমি আছি। আর তোমার যদি মিটে যায় তো আমায় তোমার বাইকে করে খালপাড়টা পার করে দিয়ে এসো। ওখানে মদ জুয়ার ঠেক তৈরি হয়েছে কিছুদিন। যদিও পাড়ার মেয়ে বলে ঘাঁটায় না, তবু, বোঝোই তো...





শট২ টেক -

বারোটার পরে কমলের সেট কেন কোথাও কোন শট থাকে না নাকতলায় একটা এক কামরার ঘর নিয়েছে কমল মোটামুটি সাজানো গোছানো সামনের পল্টনের দোকান থেকে খাবার আসে যখন যা হয় আজ সয়াবিনের তরকারি কমল সেসব ভাবে না সেটের আগুন থেকে মুক্তি তো সে ভালো করে স্নান করার জল গরম করে বারোটা বাজতে আর বেশী সময় নেই এক্ষুনি আসবে সে খাটের পাশে কমল স্নান সেরে খেয়ে নেয় আজ জানতেই হবে কে তুমি? কি চাও আমার কাছে? তুমি কে? কার আত্মা? সত্যজিৎ রায়? নাকি কুরসাওা? কি চাও? আমি সাধারণ যে চেষ্টা করলেও চ্যানেল আমায় সুযোগ দেবে না ওই ইন্তারলিউদ অবলঙ্গিটি আমার কাট টু শট বহেমিয়ানিস্ম কুয়াসার চাদরে নিওরিয়ালিস্ম তোমরা ত্রুফো ফাসবিন্দারে মাতো, আমি তো এখনও খোয়াইয়ের পারে টলোমলো সূর্য দেখি  


শট২ টেক

আজ বীণার কি হয়েছে কে জানে এত অবিন্যস্ত, অগোছালো সে কোনদিনই ছিল না এতগুলো জাতীয় আর আন্তর্জাতিক পুরস্কার তার ঝুলিতে এত গুছিয়ে কাজ করে এসেছে এতদিন প্রতিটা স্ক্রিপ্ট দশটা সিকুয়েন্সে ভেঙে, প্রতিটা টেক আগে থেকে সাজিয়ে পুরো প্ল্যান করে এতদিন ফিল্ম বানিয়ে এসেছে কিন্তু আজ কয়েকদিন হল কোন কিছুই যেন ঠিকঠাক হচ্ছে না এবারের সিনেমার প্লট সে অনেক ভেবে সাজিয়েছিল নেওরিয়ালিস্মের ওপরে প্রখর বাস্তব সামাজিক সমস্যাকে তুলে ধরে কিন্তু সবসময় মনে হচ্ছে গল্পটার হৃদয়টাই যেন বাদ পড়ে যাচ্ছে বলবো বলবো করেও আসল কথাটা যেন বলা হয়ে ওঠা হচ্ছে না সাউথ সিটির এই চব্বিশ তলার ফ্ল্যাটে ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে হুহু করে হাওয়া এসে স্ক্রিপ্টের পাতাগুলো  এদিক সেদিক উড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে ঘরময় কিছুক্ষণ চেষ্টা করে সে হাল ছেড়ে মেঝের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ল

একটু কফি হলে ভালো হতো কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না মালতীও দিন সাতেকের ছুটি নিয়েছে ওর ছেলের বিয়ে বীণা খুব ভালো করে জানে যে সে সাতদিন বলে দিন দশেক আসবে না আজকাল আর টেম্পোরারি কাজের লোক পাওয়া যায় না এখানে তো একেবারেই নয়

রুপার আসার কথা আছে মূল চরিত্রে রুপাকেই নেবে ঠিক করেছে সে ও এখন যে বয়স আর মানসিক সন্ধিক্ষণে আছে তাতে এই রোলটা খুব ভালো তুলতে পারবে। দীপকের সঙ্গে ওর বিবাহ বিচ্ছেদটা বড্ড চোখে লাগে। আসলে দুজনেই ছিল যাকে বলে আইডিয়াল জীবনসঙ্গী। অন-স্ক্রিন বা অফ-স্ক্রিন, দুজনকে সব জায়গাতেই ভারী মানাতো। একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে বীণার। সুমনের কথা হঠাৎ এক পলকের জন্য চোখের পাতা ছুঁয়ে যায়।
এই স্বার্থপর, নীতিবোধহীন, অন্তঃসারশূন্য, অসুস্থ সমাজে দাঁড়িয়ে তার এই ছবিটা বড় প্রাসঙ্গিক। তবু কেন যে গল্পে প্রাণ আসছে না কিছুতেই বুঝতে পারছে না বীণা।

শট -

-এই দীপ্তি, কি রে, হল টা কি তোর?
-দীপ্তি, শট ওকে, ওঠ এবার, কি রে কথা শুনতে পাচ্ছিস না?
প্রীতমদার ডাকে হুঁশ ফেরে তার। কোথায় যেন হারিয়ে গেছিল সে। মায়ের মৃত্যু, ননদের অপমানের কথা জেঠিমাকে বলতে বলতে সে কখন যে ওই রাজ্যে ঢুকে পড়েছিল খেয়াল নেই। মনেই পড়ে নি সে অভিনয় করছে। আলো নিভে গেছে। ক্যামেরা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে সেটের অন্য কোণে, তবু সে দেখে যে সে ঠায় বসে আছে মেঝেতে। স্বাভাবিক। কাজের মেয়ে কি আর চেয়ারে বসবে। মাটিতেই তো তার যায়গা।

-তোর আজ আর কোন সিন নেই রে, ভালো কাজ করেছিস, কাল সকাল সাড়ে সাতটায় কল টাইম। চলে আসবি। আর প্রোডাকশন থেকে তোর এই সপ্তাহের পেমেন্টটা তুলে নে। আমার বলা আছে।

খুব ধীর পায়ে উঠে পড়ে দীপ্তি। এখনও যেন সেই চরিত্রের মধ্যে ডুবে আছে। কোন রকমে মাথা নেড়ে বলে, আচ্ছা প্রীতমদা।

বাইরে বেরিয়ে সূর্যের আলোটাকে বড় চোখে লাগে তার। ভিতরের আলো আধারিতে চোখ সওয়া হয়ে গেছিলো। অনেকদিন পর আজ দিনের বেলা তার প্যাক আপ হল। এক্সট্রার রোল, সে সব শেষে হয়। তাও তো এই সিরিয়ালে ছোট হলেও একটা ভালো চরিত্র সে পেয়েছে। মেক আপ রুম থেকে পরমা আর স্নেহা বেরিয়ে ফ্লোরের দিকে চলে গেল। তাকে ঘুরেও দেখল না। এই নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথা নেই। শুধু রোজ কাজ পেতে হবেস্বপ্ন সেও দেখত শুরুতে। ইদানীং দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। বাপের কাজ এখন বিড়ির দোকানে হেল্পারি। যেদিন পি পি ক্যাপের কারখানায় মেশিন চালাতে গিয়ে বুড়ো আঙুলটা উড়ে গেল সেদিন থেকেই দীপ্তি স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেছে। আজ অভিনয় তার স্বপ্ন নয়, তিনটে মানুষের পেটের দু মুঠো ভাত।

শট

-শিবু, এই শিবু, কি আলো করেছিস হ্যাঁ? ইয়ার্কি মারছিস? জানিস সিরিয়ালটা এয়ারে আছে, এইভাবে সময় নষ্ট করলে প্রোডাকশন ছেড়ে দেবে মনে করেছিস?
-কেন দাদা কি হয়েছে?
-আর ন্যাকামো করতে হবে না। রিয়াদির জন্য কটা নেট মেরেছিস?
-দুটো দাদা।
-শালা, হাজারো বার বলেছি রিয়াদির গায়ের রঙ ফেটে পড়ছে, মিনিমাম চারটে নেট দিয়ে আলো কাটবি নইলে স্ক্রিনে রঙ জ্বলে যায়, কোন কিছু খেয়াল করিস না কেন?
-তুমি বাপু বড্ড খুঁতখুঁতে। একটা তো এস পি যাবে, নিয়ে নাও না।
-চোপ শালা, তাড়াতাড়ি নেট দে।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে রুপা ফ্লোর পেরোতে পেরোতে কমল আর বিশুর কথাগুলো শুনতে পেল। হাসি খেলে গেল ঠোঁটের কোণে। ছেলেটা সিরিয়াস। কাজটাও ভালো বোঝে। রুপা কাজ করে দেখেছে। কমলের সঙ্গে কাজ করার সুবিধে হল কোন আর্টিস্ট কিসে স্বচ্ছন্দ সেটা খুব ভালো বোঝে বলে ছবির টেক্সচারটা ঠিক বার করে আনতে পারে। এই সব ছেলে সিনেমার কাজ পেলে করে দেখিয়ে দেবে। কিন্তু কি আছে ওর কপালে কে জানে। কোনোদিন এসে বলেনি, দিদি আমার জন্য একটু দেখো। ওর যত হম্বিতম্বি সব সেটে। বাইরে একেবারে মুখচোরা।

সে বাইরে এসে দেখল দীপ্তি চুপচাপ ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে বেঞ্চিটাতে বসে আছে। চোখাচুখি হতেই হেসে উঠে দাঁড়ালো।

-দিদি, ভালো আছেন?
-হ্যাঁ রে, তোর খবর বল, কাজটাজ পাচ্ছিস তো ঠিকঠাক? 
-এ কদিন তো চলছে। কিন্তু ইউনিয়নের নতুন নিয়ম, সবাইকে কাজ ভাগ করে দিতে হবে। আবার তোমাদেরও তো শুনছি চ্যানেল নাকি বলছে এক নায়িকা একসঙ্গে দুটো চ্যানেলে নাকি হিরোইন হতে পারবে না। কেন গো?
-ওদের ধারণা তাতে নাকি নতুন সিরিয়ালের টি আর পি পড়ে যাবে। যাক আমার কথা বাদ দে। শোন সেদিন রাতে জলসায় একটা সিরিয়াল দেখছিলাম। তুই তো ফাটিয়ে দিয়েছিস! ওইটুকু রোলের মধ্যে দিয়ে কি সব জিনিস বার করেছিস রে!
-তুমি দেখেছো দিদি! তোমার ভালো লেগেছে!
-না লাগলে এমনি এমনি বলতাম?
-থ্যাংক ইউ দিদি, জানো এই চার বছরে এই নিয়ে দুবার কেউ বলল আমি কিছু পেরেছি। একজন হল পীযূষ দা। আহা বড় ভালো মানুষ ছিল গো, যেমন অভিনয় তেমন গানের গলা। আমাকে খুব উৎসাহ দিত। জানো দিদি ওরা যদি ফ্রেমে আমায় আর চল্লিশ সেকেন্ড দিত আমি কিন্তু আরও ভালো করতে পারতাম। কিন্তু...
-সে সময় তুই পাবি, দেখে নিস। শোন, এখন কি শুট আছে তোর?
-না দিদি, আজকের মতো প্যাক আপ হয়ে গেছে।
-তাহলে এক কাজ কর, চল আমার সঙ্গে।
-কোথায় গো?
-রেড লাইট এরিয়ায়। মরণদশা, আবার প্রশ্ন করছে দেখো, চল বীণাদির বাড়ি যাব, কাজ আছে।
-তাই! তুমি গাড়িতে বস আমি পেমেন্টটা তুলে নিয়ে এক্ষুনি আসছি।

শট

আজ রাতে খুব ভালো করে ব্যাপারটা বুঝতে হবে। রোজ রোজ রাতে কে আসে ঘরে? কি বলতে চায় তাকে? কমল বাইক নিয়ে ফিরতে ফিরতে সে কথাই ভাবছিল। আজ সারাটা দিন মন খুঁতখুঁত করে গেছে। প্রডিউসার কিছুতেই রি-টেক করতে দেবে না। অথচ সে জানে শটগুলো সব এন জি ছিল। কিন্তু তার হাতে আর কতটুকু? ভালো কাজের দাম কে দেয়? এদের সময় নেই, ঘোড়ায় জিন পরিয়ে এসেছে। সেদিন একটা উপন্যাস পড়ছিল। এত মনে ধরেছে যে ভিতর ভিতর ফ্রেম তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছিল সে। গল্পটা নিয়ে স্ক্রিপ্টও লিখছিল। কিন্তু কিছুটা এগোতেই, কি লাভ, বলে খাতা সরিয়ে রেখেছে। তাও কি ইচ্ছে হল, না, আজ একবার দেখবে রাতে দাঁড় করানো যায় কিনা গল্পটা। কমল দেখতে পাচ্ছে সে একটা লং শট ক্লোজ করতে করতে প্যান করছে। দূর থেকে হাইওয়ে ধরে একটা হোন্ডা সিটি দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে। প্রায় ক্যামেরা যখন গাড়ির বনেট উচ্চতায় এসে পড়েছে, গাড়িটা রাস্তা থেকে নেমে পাশের ধাবাটার সামনে এসে সজোরে ব্রেক কষল। সঙ্গে সঙ্গেই কাট টু ফ্রেম, ধাবার মালিকটা হন্তদন্ত হয়ে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছে। ব্যাকগ্রাউন্দে দেখা যাচ্ছে উনুনে কেটলির জল ফুটছে, মুখটা দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়া বেরোচ্ছে। না না, এটা দেওয়া যাবে নাচাপা উত্তেজনা বোঝাতে এই শট বহুদিন আগে ঋত্বিক বাবু ব্যবহার করেছিলেন মেঘে ঢাকা তারাতে। সঠিক লোকেদের সেটা ধরে ফেলতে অসুবিধে হবে না। তার চেয়ে বরং অন্য কিছু ভাবতে হবে। ঠিক করল, বাড়ি ফিরে খাতা কলম নিয়ে নতুন করে ভাববে সে।

শট৫ টেক

-এসেছিস রুপা, আয় আয়। সঙ্গে এটি আবার কে রে?
-দিদি কেমন আছো গো?
-ভালো না রে।
-কেন গো, কি হল আবার?
-কিছুই ঠিকঠাক নেই, সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
-সে তুমি যাই বল, ফিগারটা এমন রেখেছ যে আমাদেরও লজ্জা হয় তোমার সামনে দাঁড়াতে। কি বল দীপ্তি? ও তোমাকে পরিচয় করে দেওয়া হয় নি। এ হল দীপ্তি, অভিনয় করে সিরিয়ালে ছোট ছোট রোলে।
-তাই! বাহ, দাঁড়াও তো মেয়ে ওই জানলাটার সামনে। না, না, আমার দিকে তাকিয়ে নয়, ওই আকাশের দিকে তাকাও তো।
-দিদি তুমি পারোও বটে, এই তো এলাম আমরা...নে দীপ্তি, দিদি যেমনটি বলছে তেমন কর। ও দিদি তোমার কাজের মেয়েটা আছে? একটু কফি খাবো।
-দাঁড়া বাপু, একটু সবুর কর। এই যে মেয়ে, আরে ওই ভাবে নয়...
-দিদি আপনি যদি বুঝিয়ে না দেন কি করতে হবে তাহলে ...
-আচ্ছা মনে করো তুমি যাকে জীবন দিয়ে ভালবাসতে, আজ জানলে সে বহুদিন তোমায় ছেড়ে চলে গেছে।  কিন্তু সেই জন্য তুমি বিচলিত নও। তোমার চিন্তা কাল কি খাবে। এমন একটা সিচুএশনে তুমি কি করবে? কালকের জন্য প্রস্তুত হবে, নাকি তার কথাই ভাববে?
-তার কথাই ভাববো আমি।
-তার মানে কালকের ব্যাপারটা রিয়ালিটি নয়? তুমি সু-রিয়ালিস্মে বেঁচে থাকতে চাও? কালকে যে খেতে পাবে না?
-দিদি তা নয়। কালকের প্রস্তুতি আমি কাল ভোরেও নিতে পারবো। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার সত্ত্বা, আমার চেতনা যে আমার কাঙ্ক্ষিতকেই জড়িয়ে থাকবে। আমি বারবার নিজেকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করবো, কি এমন ভুল করেছিলাম যে যাকে আমার সবটুকু দিয়েছি, সে আজ এমন হেলায় আমায় ছেড়ে চলে যেতে পারলো?
আমি যে তাকে জড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম দিদি। সেই যদি চলে যায় তাহলে নতুন করে কি নিয়ে বাঁচব? আর খিদের জ্বালা? তার জন্য শরীরটা তো পড়েই রইল, সেই ভাঙিয়ে চলে যাবে যদি একান্তই জীবন সংগ্রামে হেরে যাই।

বীণার দুহাতের মাঝে ক্যামেরার ভঙ্গি যেন স্তব্ধ হল। রুপার মুখে কোন ভাষা নেই। এ কি শুনছে সে? এ কোন মেয়ে? সে চেয়ারে চুপ করে বসে পড়ল। বীণা দি আনমনে দূর আকাশের পানে চেয়ে, কিছু বা অবিনস্ত্য, আলুথালু। নিস্তব্ধতা পেরেক ঠুকছে দেওয়াল ঘড়িতে। পল পল কেটে যাচ্ছে সময়।
দীপ্তিই মৌনতা ভাঙল। নিজেকে গুছিয়ে হেসে বলল, দিদি, রাগ করলে?

বীণা ওর দিকে তাকিয়ে বলল, এতদিন কোথায় ছিলিস মুখপুড়ি? বহুদিন পর কেউ আমায় জুতো মারল, নিজেকে বড্ড বেশী হোতা মনে করতাম। আয় আমার কাছে আয়। রুপা, এই দেখ আমার ল্যান্ডস্কেপ। আমার গল্পটার যে হৃদয় খুঁজে পাচ্ছিলাম না, আজ যেন একটু একটু করে তাকে আবিস্কার করছি। ও তুই কি যেন বললি? কফি? তাই না? মালতী তো ছুটিতে...

দীপ্তি হেসে বলল, ও দিদি আমি বানাই?
-তুমি? আচ্ছা দেখো কোথায় কি আছে।
-তার মানে তোমার রাতের খাবারটাও তো...
-ও আমি আনিয়ে নেব।
-কেন দিদি, সবে তো সাতটা বাজে, আমি করে দিয়ে যাই? দেখোই না এই গরীবদের সংসার কি ভাবে চলে। আর কোন সাহসের বশে তারা এমন কথা বলে যে মনের মানুষ আগে তারপর তো সংসার। সিনেমায় যতই ভুখা পেটের কথা বলা হোক আসলে বুকের আঁচরের ঘা যে কি দাগ রেখে যায় তার হদিস কি সবাই পায়? আমি বরং রান্নাঘরে যাই।

বীণা অবাক চোখে দীপ্তির চলে যাওয়া দেখে। তারপর রুপাকে বলে, এরা কারা? কই এতদিন তো সিনেমা বানিয়েছি, এদের তো কাছ থেকে দেখিনি কখনও? বেঁচে থাকার তাগিদ বুঝেছি, তবু এই মূল্যবোধ তো কখনও ধমনীতে অনুভব করি নি রে।

রুপা উঠে বীণা দির পাশে গিয়ে বসে। পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, এত ভেবো না দিদি, আর একবার বস তোমার স্ক্রিপ্টটা নিয়ে।
রান্নাঘর থেকে দীপ্তির গলার শব্দ, দিদিভাই, রুটি আর পাঁচমিশালী তরকারি করি? ফ্রিজে তো সবই আছে গো...

শট৬ টেক -

দু পেগ খেয়ে একটা সিগারেট ধরাতেই বুকের বাঁ দিকটায় একটা ব্যথা চেপে ধরে। কমল একবার ওষুধের বাক্সটা খুঁজে দেখে। আসলে অনেকদিন পর দারু খাচ্ছে। দারু সে আজকাল আর খেতে চায় না। এত অস্পষ্ট দেখায় ছবিগুলো। তবু কখনও কখনও কোন স্ক্রিপ্ট যখন সহজে হাতে ধরা দেয় না তখন মনে হয় একটু খেলে ক্ষতি কি। আজ একটু আগে যেমন দেখল স্বামী স্ত্রী ঝগড়া করছে। সেটা প্রেম হোক, মান অভিমান হোক, আবেগ হোক, তাদের হাতাহাতি না দেখিয়ে তাদের ভেলভেটের মাথার বালিশ ছিঁড়ে তুলো উড়ছে ঘরময়। যা বোঝানোর তো হয়ে গেল। আজ ওই দোকানে তড়কা বানিয়েছে। কমল ভাবল, না স্নান করে আসি। দেখি রোজ রাতে এরা কারা আসে আমায় জ্বালাতে।

-তুমি তো অনেক দিন আঁকছ জীবন।
-তাতে কি? আমি তো আমার ভাবনার মধ্যেই থাকি, কই কখনও তো বেরিয়ে যাই না। হ্যাঁ বলতে পারো স্বপ্ন দেখি, কিন্তু স্বপ্ন দেখা কি ভুলের?
-কে বলেছে ভুল? তবু স্বপ্ন মানেই তো শেষ রাতের ঘাসে প্রথম শিশিরে লাজুক মুখ ডোবানো নয়। ভালবাসা তো আজও বেঁচে থাকে আনাচে কানাচে।
-কে তুমি? আমায় ভালবাসা সেখাতে এলে? আমি তো প্রেমে পড়িনি, তবু কেন?
-শোনো তুমি প্রেমে পড়েছ, বুঝতে পারছ না, অবসেসড, লেখাটা তোমার মনে ধরেনি?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধরেছে, তাবোলে ওটা কি প্রেম?
-হ্যাঁ তো কেন প্রেম মানেই কি নারীসঙ্গ?
-না, না, আমি কি সে কথা বলেছি? কিন্তু তোমরা কারা? কেন আমায় রোজ রাতে বিরক্ত করো? দেখো আমি যে সাধারণ কর্মী...
-সেটাই তো বোঝাতে চাই, তোমার লজ্জা করল না, ওই ক্রেন শটটা তুমি শালা সাদামাটা ভাবে উতরে দিলে
-কি করবো? বল আমাকে, কি করবো? কে বুঝবে আমার এই ক্রাইসিস। শালা ভাগারের দলে বাস। কি আর নতুন করতে পারি, অথচ, কলকাতা আমার লেন্সে দেখেছো?  ভিক্টোরিয়া? হাড়কাটা  গলির রাতপরীদের ডাক। দেখেছো শুন্য স্থানে চন্দ্রবিন্দু আঁকা হয়ে থাকে ওই মেয়েটার কপালে?
-তুমি প্রেমে পড়েছ
-না,
-শোনো, কখনও জ্যোৎস্না দেখেছো? কান পেতেছ? নৈশব্দতায় মাঝ-বুক পেতে কোজাগরীর গান?
-কি চাও? কি চাও বল?
-তুমি স্বপ্ন দেখো, স্বপ্নে বাঁচো, আর আমরা কি চাই বল? ফ্রেম, কাট, টেক টু, মন্তাজ, প্যাক আপ, এ শব্দগুলো যেন কবে শেষ শুনেছি। তোমায় বিশ্বাস করলাম আমরা, শেষ বিশ্বাস।

শট৬ টেক ২

-তোর সঙ্গে অনেক কাজ আছে তুই বরং কিছুদিন আমার এখানে থেকে যা দীপ্তি
-বাড়ি ফিরব না রাতে বীণা দি?
-না, ফিরবি না আমি তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলবো দরকারে শোন, অভিনয় করতে গেলে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয় দুদিন তো হাতে পেলি, স্ক্রিপ্টটা পড়েছিস?
-হ্যাঁ দিদি।
-কি বুঝলি?
-কি আর নতুন করে বুঝবো দিদি, এ তো আমাদের জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। চরিত্রের নামগুলোই যা পাল্টেছে। তবে হ্যাঁ রুমার চরিত্রটা মনে দাগ কাটে। যেন মনে হয় কত কথা বলার ছিল কিন্তু সে বলে উঠতে পারছে না। সন্তান এলে শরীরে যেমন মাতৃত্বের ছাপ ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে তেমনই রুমার না বলা কথাগুলো ওর কাজের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাবে। ওর হাঁটাচলা, ওর চোখের ভাষায়, ওর থমকে থাকা ঠোঁটের কোলে। জানো দিদি... না থাক...
-কি বলবি বল না।
-না না, কিছু না। তুমি বলছ যখন আমি নিশ্চয়ই থাকব তোমার সঙ্গে।
-শোন দীপ্তি, কাল একটা স্ক্রিন টেস্ট রাখছি। তোর ডেট নেই তো কাল?
-আছে গো দিদি, তবে কল টাইম দেখে মনে হয় দিনে দিনে শেষ হয়ে যাবে।
-ঠিক আছে, শেষ হলে ফোন করে নিস আমায়। কোথায় আসতে হবে জানিয়ে দেবো।
-আচ্ছা, এবার বল রাতে কি খাবে?
-রোজ রোজ রান্না করবি নাকি? ওই সময়টা স্ক্রিপ্ট পড়। ভাব, আরও ভাব।
-কেন গো দিদি আমার রান্না মুখে লাগছে না তাই না?
-হতভাগী এত ভালো রান্না করিস, আমি সেই জন্য বলিনি। বলেছিলাম যাতে বাজে সময় নষ্ট না হয়।
-না না, তুমি কাজ করো, আমি সেরে নিচ্ছি দিদি।


শট

-আহ, ছাড়ো দিপু
-কি হয়েছে তোমার আজ? শরীর জাগছে না
-ছাড়ো বললাম তো
-কেন?
-লাগছে ছাড়ো
-এত ড্রাই তো তোমায় কোনোদিন পাই নি রুপা
-সরো, ওঠ, আমার ভালো লাগছে না
-হ্যাঁ, আর আমাকে ভালো লাগবে কেন, আজকাল বাজোরিয়ার ছেলেটা সব থেকে প্রিয় তো আমি তো পরতি নায়ক এখন ওর সাথে পাঁচতারা হোটেলের রাতগুলো আজকাল বড় মধুর তাই না? শুনলাম নতুন ছবিতে তোমায় নিয়েছে, লোকেশন ফেলেছে মালদ্বীপে
-জাস্ট ফাক অফ ইউ বাস্টার্ড লজ্জা করে না তোমার স্কাউন্দ্রেল?
-হ্যাঁ এখন তো বলবেই, একদিন বুকে জড়িয়ে নিয়ে কত কথা বলেছিলে, আজ সব ভুলে গেলে?
-শুধু শরীর শরীর শরীর, এর বাইরে কিছু বোঝো তুমি? কেন তোমার ঘরের খানকিটা খিদে মেটাতে পারে না?
-ওই শালি, একটা কথা বললে গলা টিপে দেবো
-দেখলে, এই হলে তোমরা জাস্ট ফাক অফ ফ্রম মাই লাইফ, গেট আউট ইউ পপার, সিমপ্লি গেট আউট উফ, আমাকে শেষ করে দিলো আর এর জন্যই আমি


-বীণা রয়, ইউ নো, দেয়ার ইজ এ সাবষ্টেন্স ইন ইওর ফিল্ম। সাম আনক্যানি ফিলিং।
-হাহাহা, তাই নাকি সাহেব? কি আছে আমার ছবিতে যা তোমাদের নেই?
-এ মন্তাজ আনভিজিটেড
-রিয়ালি! হোপ ইউ আর নট সিডিউসিং মে, হাহাহাহাহা...


শট -৮ টেক

বীণার এটা চার নম্বর। সে সিগারেট হাতে উঠে আসে রান্নাঘরে। দীপ্তি আপন মনে রান্না করছে। দরজাটা ধরে চুপ করে দাঁড়ায় সে। দেখে কড়াইতে সর্ষের তেলটা বোতল থেকে না ঢেলে চামোচে করে একটু একটু নিয়ে প্যানে দিলো। তারপর তেল গরম হতেই ফোড়ন ছেড়ে সবজিগুলো দিল।

এই তো আমার চরিত্ররা, এদের নিয়েই তো আমার বইহাহা, সে দীপ্তিই হোক বা রুপা কি আসে যায় তাতে। তবে হ্যাঁ, এই স্ক্রিপ্টটা পাল্টাতে হবে অনেকটা যায়গায়। রিয়ালিস্মের আমি কি বুঝি? চব্বিশ তলার খোলা হাওয়ায় আস্তাকুঁড়ের ছবি কি ফোটে? সেখানে যে সব সময়ই বসন্ত, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি বীণা রায়, সাকসেস আমার পায়ের তলায়... ওই মেয়ে রান্না হল? ... স্ক্রিপ্টটা আর একবার পড়ে সিন সতেরোটা একবার অভিনয় করে দেখা দেখি। ওখানে তোর পেটে অবাঞ্ছিত সন্তান, তোকে হাসপাতালে এবর্‌শনের নাম করে ফেলে রেখে গেছে লম্পটটা। দেখা করে, কি হল, দেখা...

শট৮ টেক

-শোন যখন দুটো চরিত্র কথা বলবে তখন ক্যামেরা একেবারে নড়াবি না। স্টিল একটা ফ্রেম ধরে রাখবি।
-কেন? লোকে বুঝবে কি করে?
-লোক বলতে কে? তুই কি শ্বাশুরি কাঁদছে বৌমা হাগছে বানাবি? তাহলে?
-কিন্তু কেন এই ফ্রেম? লোকে তো বিরক্ত হবে।
-হতে দে না, যখন দেখবি চূড়ান্ত বিরক্ত তখন প্যান করবি, দেখাবি বিজনেস।
-বুঝলাম, কিন্তু আমায় এগুলো কেন বল তোমরা? কি করেছি তোমাদের?
-আমাদের অন্তরাত্মায় বিশ্বাস জাগিয়েছিস, তুই পারবি... আর শোন ওই শটটা নিস না।
-কোনটা?
-ওই টপ শট। পাখা ঘুরছে সিলিঙে, নীচে আলো কাটছে ক্যারেক্টারের  মুখে... আমি জানি তুই কি বলবি... দীপ জ্বেলে যাই তে ছিল তো? ভুল আঙ্গেল, অমন করিস না।
-আচ্ছা সব বুঝলাম, কিন্তু আমায় কেন, আমি তো ... আমি তো... আমার হাতে তো...
-আমাদের বিশ্বাস আছে তোর ওপর, বাই দা ওয়ে, আজকের কাজ খুব ভালো হয়েছে... সাবলাইম সিরিনিটি বুঝিস? শেষ দেখা গেছিলো হিচককের দা রেয়ার উইন্ডোতে। আজ তোকে এই কমপ্লিমেন্ট দিলাম আমরা। শুধু মনে রাখ চোখ কি বলছে তা নয় মন কি বলছে সেটাই চোখের ছবি...


শট

-ওঃ গড! কাট কাট কাট, ওই দীপ্তি, এসব কি, হ্যাঁ? কিসব বলছিস? এগুলো সিনে ছিল? দীপ্তি এই দীপ্তি।

চমকে ওঠে মেয়েটা, ‘না মানে আমি ...’
-গেট আউট, জাস্ট গেট আউট, কি মনে করেছে কি নিজেকে? একটা সুযোগ দিয়েছিলাম, তাবোলে অকারণে এত ফুটেজ!
-দাদা, ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না।
-হবে না মানে? গত তিনদিন দেখছি তুই মুখে আলো পড়লেই কোথায় হারিয়ে যাস, চরিত্রর মধ্যে আবার একটা নতুন চরিত্র মুখ বুজে কথা বলে। তুই কি সিরিয়ালের আসল স্বাদটাই নষ্ট করে দিবি? এত সাহস তোর? শালি এক্সট্রা...

আমি যে বীণা দির রুমা হয়ে গেছি, কেউ বুঝলে না? ... মনের মধ্যে কে যেন বলে ওঠে তার

শট -১০

-কেন এত মাথা গরম করছ বীণা দি? আরে সৈকত নেই তো কি হয়েছে? ভালো কাজের প্রচুর লোক আছে তো।
-তুই চুপ কর। ওকে কে চিনতো? সেবার ভেনিসে ছবি পুরস্কার পেল, সব আঙ্গেল আর ফ্রেম আমার, ও শুধু কাজ টুকু করেছে। তাই বলে এত দেমাক? দেড় কোটি চাইছে? জানে এন এফ ডি সির  বাজেট কত? ছোটলোক ছেলে, ইজ্জত রাখতে জানে না...
-দিদি আমি বলি? খুব ভালো কাজের ছেলে আছে, একবার দেখে নেবে ওকে?
-চুপ কর তুই, দে ফ্রিজ থেকে একটু সোডা দে। এই রুপা, তুই নিবি তো...
-হ্যাঁ দিদি, ওই একটা, দীপ্তি কার কথা বলছিস?
-দিদি কমলদার কথা গো, একটা চান্স যদি পায় করে দেখিয়ে দেবে।
-ধুস শালা, কত দেখলাম, সব আমার নামের সাথে নিজেদের জড়িয়ে নিতে চায়।
-জানি দিদি, তবে এই ছেলেটা একটু অন্য রকম, ক্যামেরার সঙ্গে কথা বলে...
-কি বললি? কথা বলে ক্যামেরার সাথে? দে ফোন নাম্বার দে ...

শট১১ টেক ১

-কমল কোথায়?
-এইতো বাইক চালাচ্ছি
-উফ, তাড়াতাড়ি এসো
-আসছি ওয়েট...
-বুকের খাঁজে মাতন লেগেছে যে... তাড়াতাড়ি এসো ডার্লিং...
-জ্যাম রাস্তায় তো, অপেক্ষা করুন...

শট১১ টেক ২ 

-সিগারেটের গন্ধ আমার সহ্য হয় না। এত ঘন ঘন খান কেন?
-এক একটা কাট শট জুড়তে জীবনে সিগারেট লাগে যে...
-এবার উঠতে দিন, খুব ক্লান্ত লাগছে বীণাদি...
- দি! হাহাহা, আজ একশো দিনের সেলিব্রেশন, সারা ভারত ভেঙে পড়েছে, তোমার ক্যামেরায় জাদু... খুব  তাড়াতাড়ি বার্লিন যাব আমরা।
-আর দীপ্তি?
-কে? কে দীপ্তি?
-যে এমন অভিনয় করল, যাকে দেখে রুপা দি নিজে না করে দীপ্তিকেই রোলটা দিয়ে দিলো ওর মতো পারবে না বলে, তাকেই ভুলে গেলেন?
-হেই বেবি, কারা স্টার, কে দীপ্তি? শোনো শোনো, ওর দেখানো নিওরিয়ালিস্মের পথ আমার স্ক্রিপ্ট বদলেছে, ব্যাস, এইটুকুই ওর যথেষ্ট প্রাপ্য না কি? দে আর অব্লিভিওন, দে আর ডাইং পাস্ট, হু কেয়ারস?
-সত্যিই তো, আমি ক্যামেরা করলাম, এতগুলো পুরস্কার...
-ওঃ শাট আপ ম্যান, শরীর দিয়েছি নিজের প্রয়োজনে, তার মানে এই নয় তুমি হিরো বনে গেছ। কে তুমি ? ব্লাডি বুলসিট, বীণা রায়ের সিনেমায় লোকে শুধু বীণা রায় কেই খোঁজে।


শট -১২

-লাইট, সাউন্দ, ক্যামেরা... দীপ্তি, ক্যামেরা ক্লোজ হচ্ছে, তোমার বুকের ভাঁজ ছুঁয়ে তোমার না বলা কথারা   সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, এবার আর্তনাদ করো, ভাঙবে, ভাঙ্গবে ভাঙ্গবে, রক্তে চোবানো হাতগুলো আজ নীল মেরুতে বুদবুদ হয়ে মিশে গিয়ে নীলকণ্ঠ হবে...

-পারবো আমি? পারবো কমলদা?
-পারবে, পারবে, তোমাকে যে পারতেই হবে

ওকে, সাইলেন্স প্লীজ... ক্যামেরা রোল...রোলিং, সাউণ্ড... রোলিং, ক্ল্যাপস্টিক... নিও-রিয়ালিস্ম... সিন টু... টেক ওয়ান...দীপ্তি, অ্যাকশন...