রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                                            



শ্রাবণের ধারার মতো



পর্ব-৪

মাদিকেরীর বুকের ভেতর পাহারের কোলে ছোট্ট জনপদ কাদাগাদাল।কফি বাগানের মাঝেমাঝে পাহাড়ের ঢালে ছোটছোট ছিমছাম বাড়িঘর।সহজ সরল মানুষজন।সকলেই প্রায় কর্ণাটকের আদিবাসিন্দা।মহেশ এখানে মানিয়ে নিয়েছে খুব ভালো ভাবে।গ্রামের সকলেই তাকে বিশেষ ভালোবাসে।সদ‍্য গড়ে ওঠা রিসর্ট,হোমস্টে,হোটেল সবকিছুর উপর তার কড়া নজরদারি।কোনভাবেই অঞ্চলের স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে দেবেনা।নেচার মাদার এনজিওর কর্মী হিসেবে বছর তিনেক হল এখানেই রয়েছে।ধীরে ধীরে নিজের আধিপত‍্য বিস্তার করে চলেছে।যে ছোট্ট বাড়িটার একতলায় মহেশ থাকে তারপাশেই কুভান আলভার বাগানবাড়ি।সেখানেই আজ বিকেলে নিমন্ত্রণ।এমনিতে এসব নিমন্ত্রণ এড়িয়ে থাকতেই স্বচ্ছন্দ সে তবে কুভানকে এড়িয়ে যেতে পারেনা।প্রভাবশালী বলেই নয় বছর সত্তরের মানুষটা জ্ঞানের ভাণ্ডার।বিশেষ স্নেহ করেন তাকে।সন্ধ‍্যে সাতটা নাগাদ ওর বাড়িতে গিয়ে উপস্হিত হতেই দেখল গোটা বাগানটা সাদা মলমল কাপড়ে মুড়ে হালকা বেগুনি অর্কিডে সাজানো হয়েছে।মহেশ হাতে করে বই নিয়ে এসেছে।কালেকশান অফ্ ও হেনরি।কুভান স্মিতমুখে বইটা বুকে চেপে ধরলেন।

-এরচেয়ে বড়ো কিছু নেই রয়।তুমি ভেতরে এসো একজন তোমার সাথে আলাপ করতে আগ্রহী।

ঘরের ভেতর খুব লো ভল্যুউমে সারেঙ্গী বাজছে।মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে আছে ঘরটায়।কুভান কাওকে চাপা গলায় ডাকলেন।সেই ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এল হলদে জমির উপর ছোট ছোট লাল বুটিদার শাড়ি,লাল ব্লাউজ আর সাদা ফুলের মালায়,মুক্তোর সেটে এক নারী। মহেশ খানিক মুগ্ধ না হয়ে পারলনা।শুভেচ্ছা বিনিময় ও নাম জানার পর ধীরে ধীরে ত্রিচি, মহেশ গল্পে মেতে উঠল।বাগানের মাঝখানে রাখা ছোট্ট গোল টেবিলে কথোপকথন এগিয়ে চলল।সাথে কন্টিনেন্টাল খাবারের সমাহার।

-আপনাদের রাজ‍্যের দার্জিলিং আমার সবচে প্রিয়।একাধিক বার গিয়েছি কর্মসূত্রে।

-হ‍্যাঁ দার্জিলিং অসামাণ‍্য তবে পারলে একবার পুরুলিয়া,বাঁকুড়া ঘুরে আসবেন।ভালো লাগবে।

-আমার ইচ্ছে আছে।বিশেষ করে লাল কাঁকুড়ে মাটির জৌলুস দেখাটাই উদ্দেশ‍্য।আপনার নানা রকম কাজকর্মের প্রশংসা শুনতে পাই মিস্টার রয়।তাই আমি সরাসরি একটি প্রস্তাব আপনাকে দিতে চাই।

-কী বিষয়ে?

-কুভান একটি ইকো রিসোর্ট চাইছেন দুবরা এলিফ‍্যান্ট ক‍্যাম্পের কাছাকাছি।আপনি আমাদের উপদেষ্টা মণ্ডলীতে যোগ দিন।আপনার সাজেশান অনুযায়ী আমরা রিসোর্টটিকে সাজাতে চাই।

মহেশ ত্রিচির চোখে চোখ রেখে বুঝতে চাইল কী উদ্দেশ্য এই নারীর।ঠিক তখন সামাণ‍্য ঝুঁকে হাত ধরে বলল,'মহেশ আমরা সত‍্যিই চাইছি দুবরা ইন্টারন‍্যাশানাল পরিচিতি পাক।'মহেশ উঠে দাঁড়াল।গভীর খাঁজের অমোঘ আকর্ষণ সহজেই এড়িয়ে বলল,'ম‍্যাডাম ত্রিচি,আমরা চাইছি দুবরা ক‍্যাম্পে হাতিদের সুরক্ষা আরো বাড়ুক।দর্শকের চাপ কী করে কমানো যায় সেটাই আমাদের লক্ষ‍্য।আচ্ছা চলি ভালো লাগল আলাপ হয়ে।ভালো থাকবেন।'চলে যাওয়া মহেশের পায়ের রেখায় চোখ রেখে কুটিল হাসল ত্রিচি।দূর থেকে মহেশের কুভানের সাথে করমর্দন দেখে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।টেক্সট করল,'ইউ আর রাইট হিয়ার হি ইজ!অনুজ।'


--------------------------------------------------------------

চন্দ্রনাথ আদিত‍্যর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বাঁকা হাসিল।দই চিঁড়া কলা ভালো করিয়া মাখিয়া বৃহৎ একখানি গ্রাস মুখ পুড়িয়া চকাম চকাম আওয়াজ বজায় রাখিতে রাখিতেই কথা বলিতে শুরু করিল।

-তুমি বাপু স্ত্রী লোককে কিঞ্চিৎ অধিক গুরুত্ব দিয়া থাক।আমার শ‍্যালিকার সহিত সারাদিনে যে পরিমাণ বাক‍্যব‍্যয় করিয়া থাক তাহা দৃষ্টিকটূ।

আদিত‍্যনাথ হতভম্ব হইয়া কহিল,'এ কী রূপ দোষারোপ।তোমার শ‍্যালিকাটিই বরং পায়ে পায়ে ঘুরিয়া বেড়ায়।সোহাগের কথা শুনিতে চাহিয়া ব‍্যতিব‍্যস্ত করিয়া তোলে আর তুমি কিনা চন্দ্র আমাকে দুষছ!'

-আহা চটো কেন?আসলে অমরকন্ঠক হইতে আসিয়া ইস্তক তুমি ব‍্যাকুল হইয়া রহিয়াছো।বিশেষ করিয়া স্ত্রীরত্নটির জন‍্য বোধকরি মন উচাটন হইয়াছে।তাহাই স্বাভাবিক।তুমি বরং কয়দিন বাড়ি হইতে ঘুরিয়া আইস।আমি আবার দিন পাঁচের ভিতর জয়পুর যাত্রা করিব ব‍্যবসাটিকে আরো ঢালিয়া সাজাইতে পারিলে তোমার কর্জটিও চুকাইতে পারি।

আদিত‍্য শেষের বাক‍্যগুলি শুনিয়া যারপরনাই অসন্তুষ্ট হইল কিন্তু চন্দ্রনাথকে কঠিন কথা শোনানোর হিম্মত তাহার কোনদিন হয় নাই।বরং খানিক চুপ করিয়া থাকিবার পর তাহার মনে হইতে লাগিল,চন্দ্রনাথকে সে হয়ত না বুঝিয়া কখনো আঘাত করিয়াছে তাই সহসা কর্জ শোধ করিবার প্রসঙ্গ আসিয়া পড়িল।বসারঘরটিতে চন্দ্রনাথের ফলার খাইবার আওয়াজ ব‍্যতীত অন‍্যকোন শব্দ নাই।আদিত‍্য অনেক সময় চুপ করিয়া থাকিল।তারপর কথা বলিয়া উঠিল।

-চন্দ্র তোমার আপত্তি না থাকিলে আমি জয়পুর যাত্রায় তোমার সঙ্গী হতে চাই।

ডানহাতের কনুই পর্যন্ত মিষ্টি রস গড়াইয়া যাওয়ায় সেই রস জিভ দিয়া চাটিয়ে লইবার কাজটির অবসরে এক ঝলক আদিত‍্যকে দেখিয়া চন্দ্রনাথ বলিল,'সে তো আমার পরম সৌভাগ‍্য।তবে কিনা মহিলা মহল তোমাকে ছাড়িতে রাজি হইবে কিনা সেটি বিচার্য।তোমার যত্ন আত্তি করিয়া তাহারা সবিশেষ সুখ লাভ করেন কিনা।'আদিত‍্য বুঝিল গতরাতে চন্দ্রর স্ত্রী রুক্মীনি তাহার খাদ‍্যের প্রতি অধিক মনোনিবেশ করিবার কারণেই চন্দ্র তাহার সহিত মশকরা করিতেছে।তবু সে বিবেচনা করিল,রাগ করিয়া ফল কী,বরং গৃহে প্রত‍্যাবর্তন করিয়া সকলের সহিত সাক্ষাৎ করা ভালো হইবে।সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল,'চলি চন্দ্র জয়পুর যাত্রার দিনক্ষণ ঠিক করিয়া খবর পাঠাইও।'চন্দ্রনাথ উদাসীন মুখ বলিল,'গৃহে যাইতেছ যাও সোহাগবালার খপ্পরে নিজেকে বাঁধিয়া ফেলিও না।অতি কষ্টে মুক্তি পাইয়াছ,ভুলিও না।'সোহাগবালার নামটি চন্দ্রর মুখে শুনিয়া আদিত‍্যর বুকটা মোচড় দিয়া উঠিল।

রবিবার, ১০ এপ্রিল, ২০২২

শ্যামলী আচার্য

                            



মৃত্যু অথবা  ( পর্ব ৩)



ঘড়ির কাঁটায় ন’টা সাতাশ বাজতেই রাণা একবার তাকায় দীপুর দিকে। সময়ের ব্যাপারে ও অসম্ভব খুঁতখুঁতে। দীপু জানে কিরণমালা ঠিক সাড়ে ন’টায় আসবে বলেছিল। দীপু সবেমাত্র বাঙালির টাইম ম্যানেজমেন্ট, মেয়েদের সাজতে সময় লাগে, এইসব নিয়ে দু’চার কথা বলবে ভাবছিল, ঠিক সেই সময় রাণার মোবাইল বেজে ওঠে।   
“আমি অপেক্ষা করছি। ভেতরে আসুন।” ফোনে কথা শেষ হতে না হতেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় যে মহিলা, তার সঙ্গে কলেজের সেই যুবতীর মিল শুধু কাঠামোয়। বাইরের চেহারা রীতিমতো বদলেছে। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত অর্থের জৌলুস। এতটা ঝলমলে আর ফ্যাশনেবল কিরণমালা কোনওকালেই ছিল না। তার সঙ্গে বাড়তি যোগ হয়েছে সপ্রতিভতা। 
কিরণমালা ঘরে ঢুকে নমস্কার করে দাঁড়ায়। “অনেকদিন পরে দেখা হল। কিন্তু আমার বেশি সময় নেই হাতে। খুব চটপট কাজের কথাগুলো বলতে চাই।” রাণার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতেই দীপুর দিকে তাকায় কিরণমালা। চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন।
রাণা পরিচয় করায়, “ও আমার বন্ধু। একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করে। আমার ক্লাসমেট। দীপন মিত্র। মনে আছে কীনা জানি নয়া। আপনি ওকে কলেজে দেখে থাকতে পারেন। আপনি বসুন। দীপুর সামনে কথা বলতে আপত্তি থাকলে...”  
“না না। আমার কোনও অসুবিধে নেই। আমারও চেনা চেনা লাগছে ওনাকে... এনি ওয়ে...”
“বসুন প্লিজ।” 
কিরণমালা বসে। আঁচল গুছিয়ে নিয়ে একমুহূর্ত চুপ করে থাকে। মাথা নিচু। 
“আমার মায়ের খুনের তদন্ত করতে হবে। সেইজন্যেই আসা।”  
ঘরের মধ্যে বাজ পড়লেও দীপু এতটা চমকে যেত না। কিন্তু রানা একদম স্থির। নিস্পৃহ। 
“আপনার মা, মানে...”
“আমার মা। ইরাবতী সান্যাল। লেখালেখি করতেন, অনেকেই তাঁকে চেনেন।” 
“কিছু মনে করবেন না, আপনাকে আমরা কলেজে-ইউনিভার্সিটিতে দেখেছি দূর থেকে। কিন্তু কখনও কোনও অবস্থাতেই আপনি নিজের বাবা-মায়ের পরিচয় কাউকে দেননি। এটা পার্সোনাল প্রশ্ন, তবু... উত্তর দেওয়া না দেওয়া আপনার ব্যাপার।”   
রাণার কথায় মৃদু হাসল কিরণমালা। 
“আজ অনেক কথা বলব বলেই এসেছি। আগে বলি, তিন-চার বছর বয়স পর্যন্ত আমার সেই অর্থে কোনও নিজস্ব পরিচয় ছিল না। মানে, আমি জানতাম না, কে আমার বাবা-মা। আমি কিংশুক রায় আর ইরাবতী সান্যালের দত্তক নেওয়া সন্তান। আমার ঠিকানা ছিল বেসরকারি একটি অনাথ আশ্রম। যেদিন একটা জমকালো বিরাট বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল, সেদিন থেকে এই দুটি মানুষকে আমায় ‘বাবা-মা’ বলতে শেখানো হয়েছে। আর খুব ছেলেবেলার ঘটনা হলেও সেই দিনটা আমার এখনও মনে আছে। জ্ঞান হবার অনেক পরের ঘটনা তো...
“আমার ঠিকানা বদলে গেল। ফুটপাথ থেকে রাজপ্রাসাদ। অনেক আদবকায়দা শিখলাম। আর বহু কিছু পেতে শিখলাম। না চাইতেই পাওয়া। প্রচুর খেলনা, অগুনতি জামাকাপড়, টেবিল উপচোনো খাবার। এককথায় প্রাচুর্য। কিন্তু আমার ভেতরে একটা গরিব মন থেকে গেল। সবকিছু পেতে পেতেও পাওয়ার অভ্যেস হল না। কেবল মনে হত, এগুলো আমার নয়, আমার প্রাপ্য নয়। আমি এখানে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। কেউ যেন একটা রঙিন সিনেমা দেখাচ্ছে, হঠাৎ সুইচ অফ করে ঘর অন্ধকার করে দেবে। আমার খুব ভয় করত। আমি কেমন গুটিয়ে থাকতাম। সহজ হতে পারতাম না। প্রথম এই অসুবিধে বুঝেছিলেন ইরাবতী সান্যাল। আমার মা।”  
রাণা আর দীপু দুজনেই লক্ষ্য করে ‘মা’ শব্দটা বলতে বলতে চোখ উপচে আসছে কিরণমালার। সে সামলে নেয় চট করে। বলতে থাকে, “অনেক জন্ম তপস্যা করলে অমন মা পাওয়া যায়। তিনি আমার বায়োলজিক্যাল মাদার নন ঠিকই, কিন্তু...। মা প্রচুর পড়তেন, রাত জেগে লিখতেন। কিন্তু আমাকে এতটুকুও অবহেলা করেননি কোনওদিন। নিজে যখন যা করেছেন, আমাকে পাশে বসিয়ে নিতেন। আমাকে ঘুম পাড়িয়ে কোলের কাছে রেখে লিখেছেন, বাঁহাতটা আমার মাথার ওপর, ডান হাতে কলম চলছে। অনেক বড় হয়েও আমি এমনটাই দেখেছি। আর শিখিয়েছেন, ‘নিজের পরিচয়ে বাঁচবে। অন্য কারও পরিচয়ে নয়। প্রতিটি মেয়ের নিজস্ব পরিচয় তৈরি হওয়া দরকার। সে কার মেয়ে, কার বৌ, কার মা, এটা তার পরিচয় নয়। বী ইওরসেলফ। মা নিজেই বারণ করেছিলেন আমি যেন কোথাও আমার বাবা-মায়ের পরিচয় ব্যবহার না করি। আমি মায়ের সব কথা শুনতাম। এই কথাটাও শুনেছি।”  
কিরণমালা কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এই সুযোগে রাণা জিগ্যেস করে, “আর কিংশুক রায়? আপনার বাবা?” 
“বাবা? সত্যি কথা বলতে কি, বাবারা কেমন হন আমি জানি না। ছেলেবেলা থেকে মায়ের বই পড়ার নেশা দেখে আমারও বন্ধু হয়েছিল বই। আমাদের বাড়িতে একটা বিরাট লাইব্রেরি আছে। আবার বাবার কাকার। আমাদের কোম্পানির কর্ণধার কল্যাণ রায়ের। আমি সেখানে বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকতাম। বন্ধু ছিল না তেমন। থাকলেও তাদের কাছে বাবাকে নিয়ে গল্প হত না। আর কিংশুক রায় বরাবর উচ্চাকাঙ্ক্ষী। নিজের কেরিয়ার, নিজের বিজনেস নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। যতটুকু শুনেছি, মূলত মায়ের চাপেই তিনি আমাকে অ্যাডপ্ট করেন। স্নেহ-মমতা নিয়ে তাঁর শো-অফ ছিল না। আমাকে তিনি কোনওদিন খুব কাছে টেনে নেননি। আমিও দূরত্ব বজায় রেখেছি। মা’কেও দেখেছি একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে রাখতেন। আমার আর মায়ের কিছু কমন জগত থাকলেও কিংশুক রায় আমাদের দুজনের কাছেই দূরের গ্রহের জীব।”  
কথা বলতে বলতেই একবার ঘড়ি দেখে কিরণমালা।  
“আমি কিন্তু আমার মায়ের মৃত্যুর তদন্ত করতে এসেছি। আমি নিশ্চিত, আমার মায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে।”    
রাণা বলে, “কী করে নিশ্চিত হচ্ছেন? মাঝরাতে হার্ট অ্যাটাক। বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন। সকালে কাজের মেয়ে দেখতে পায়। তখন ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান এসে ডেথ সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। সবটাই আইনের চোখে অত্যন্ত স্বাভাবিক।” 
কিরণমালা একদৃষ্টে তাকায় রাণার দিকে, ধীরে ধীরে বলে, “আইন আমিও জানি। সেইজন্য আইনের দ্বারস্থ হইনি। জানি, লাভ নেই। আইন থাকলে আইনের ফাঁকও থাকে। খুব সুন্দর নিটোল করে সাজানো একটা খুনের প্ল্যান। মাঝরাতে বাথরুমে হার্ট অ্যাটাকের চেয়ে সহজ সরল স্বাভাবিক মৃত্যু আর হয় না। কিন্তু সত্যিই মাঝরাতে কী হয়েছিল মায়ের? হার্ট অ্যাটাক, না অন্য কিছু? পোস্ট মর্টেম তো হয়নি। কী করে জানা গেল মা’কে কেউ কিছু খাইয়েছিল কীনা। আমাকে জানতেই হবে। মা আমাকে বলে গিয়েছিলেন... মায়ের কিছু একটা মনে হয়েছিল... ইন ফ্যাক্ট মায়ের সঙ্গে আমার বণ্ডিং ভীষণ স্ট্রং ছিল। আমি জানতাম আমি চলে যাবার পরে মা খুব একা হয়ে পড়েছেন।”   
“আপনাকে মা বলেছিলেন... মানে? ইরাবতী সান্যালের মনে হয়েছিল তাঁকে খুন করা হতে পারে?” 
মাথা নিচু করে কিরণমালা।
“মা আমাকে আভাস দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি হঠাৎ মরে গেলে একটু খোঁজ নিস কিরণ। আমি শুনে রেগে যেতাম। তখন মা হেসে বলতেন, এত তাড়াতাড়ি মরব না, জানি অনেক পাপ করেছি, সব কর্মফল মিটিয়ে যেতে হবে না? আমি বকলে বলতেন, ভয় নেই রে, অনেক লেখা বাকি। সব লিখে রেখে যাব। তবু...। আমি জানি মায়ের হার্টে বেশ সমস্যা ছিল... সেইজন্যেই কি ওই রাস্তা দিয়ে... আমি জানি না রাণা, প্লিজ আপনি আমাকে হেল্প করুন। এই রহস্য উদ্ধার করতে না পারলে আমার মা’র কাছে আমি অপরাধী হয়ে থাকব...।”  
রাণা একবার তাকায় দীপুর দিকে। “আমি কেসটা নিলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করব আপনার সন্দেহ যাতে মিথ্যে হয়, সেটা প্রমাণ করতে। শুধু আমার একটাই প্রশ্ন, কাকে সন্দেহ করেন আপনি?” 
কিরণমালা গম্ভীর হয়ে যায়। উঠে দাঁড়ায় সে। রাণার দিকে তাকিয়ে বলে, “সিস্টেম, সিস্টেমকে সন্দেহ করি আমি,” বলতে বলতেই ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে একগোছা নোট বের করে এনেছে কিরণমালা। সামনের সেন্টার টেবিলে রেখে বলে, “এতে পাঁচ হাজার আছে। অ্যাডভান্স পেমেন্ট। আমি কলকাতায় আপাতত কয়েক সপ্তাহ থাকব। তার মধ্যে...। জানি, কাজটা কঠিন। কিন্তু পেশাদার গোয়েন্দার পক্ষে সব সম্ভব। তোমরা ভুলে যেও না, আমি মনস্তত্ত্ব নিয়ে পড়েছি। আমি জানি, পারলে তুমিই পারবে। আসি। যে কোনও দরকারে ফোন কোরো।”    
রাণা আর দীপুকে সেভাবে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঘর থেকে ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যায় কিরণমালা। শেষ বাক্যে কিরণমালার হঠাৎ ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে সম্বোধন পরিবর্তনও কান এড়ায় না দুজনের। কিরণমালা কি তাদের সঙ্গে ফর্ম্যাল সম্পর্ক ছেড়ে বন্ধুত্বের সহজ পথে আসতে চাইছে? 
ফ্যানের হাওয়ায় টাকার গোছা থেকে নোটগুলো উড়ে পড়ে এদিক-সেদিক। দীপু কুড়িয়ে তুলতে তুলতেই শোনে রাণা অস্ফুটে উচ্চারণ করছে, “সিস্টেম।”  
....................................................................................................................................

(ক্রমশঃ)

সৌমী আচার্য্য

                                




শ্রাবণের ধারার মতো


পর্ব-৩

বিন্দুবালা কিছুতেই স্বস্তি লাভ করিতে পারিতেছে না। যাহা ঘটিতেছে তাহার জন্যে কাহাকেও দোষারোপ করিবার উপায় নাই অথচ মনের ভিতর অভিমান ফেনাইয়া উঠিতেছে। সোহাগ নিজ হাতে ডাল বাটিয়া গয়না বড়ি বানাইয়া রান্না করিয়া দ্বিপ্রহরে সৌম‍্যাদিত‍্য খাইতে বসিলে তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছে, বিন্দু সেইক্ষণে মাছের মুড়ার ঝোল সবে আগাইয়া দিয়াছে।

-মাছ খাইবার পূর্বে একবার দেখুন তো ইহা খাইবার যোগ‍্য হইয়াছে কিনা।

বিন্দু অবাক হইয়া দেখিল তাহার স্বামী পরম মমতায় গয়না বড়ির আলু ঝোল খাইয়া ঢেকুর তুলিয়া বলিল, 'আজ আর কিছু খাইতে ইচ্ছে করিবে না। বিন্দু মাছের মাথা আজ খাইব না।' বিন্দু ঘাড় নাড়িয়া উঠিয়া যায় তবে বুঝিতে পারেনা ইহা কী করিয়া সম্ভব। মাছের মাথা যাহার না খাইলে একটি দিনও চলে না সে কিনা বড়ির ঝোল চাটিয়া খাইয়া উঠিয়া যাইতেছে! একখানি গরম বাতাস সহসা ঘরময় দৌরাত্ম্য করিয়া বাহির হইয়া গেল। সোহাগের নিকট গিয়া বিন্দু চুপ করিয়া দাঁড়াইল।

-তুই ছোটো জাদু জানিস ভাই। আমার সোয়ামির মাছের মাথা খাওয়া ঘুচিল।

-জাদু জানি কিনা জানিনে। তবে তোমার সোয়ামিটির মাছের মাথার চাইতে অন‍্যকিছুর মাথা খাইতে সাধ জাগিয়াছে কিনা খোঁজ রাখিও। 

কথাটি বলিয়া দীর্ঘ বিনুনিটি দুলাইয়া নরম পায়ে হাঁটিয়া চলিয়া গেল। বিন্দু এসব দুর্বোধ‍্য কথা বিশেষ বোঝেনা। খাইতে বসিয়া অখাদ‍্য গয়না বড়ির ঝোল খাইয়া তাহার মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। ঘরে আসিয়া সৌম‍্যাদিত‍্যের দিকে তাকাইয়া কহিল, 'এ তোমার ভারি অন‍্যায়, অখাদ‍্য খাইয়া নিজের শরীরকে কষ্ট দিবার কোনো কারণ বুঝিনে।' 

-সব কারণ বুঝিবার মতো বুদ্ধি ঈশ্বর যদি তোমায় না দিয়া থাকেন তাহাতে তোমার কিছু করিবার নাই।

-সব সময় ঠাট্টা ভালো লাগেনা বাপু!

সৌম‍্যাদিত‍্য হাসিয়া কোলবালিশটিকে জড়াইয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিল। বিন্দুর মনে অস্বস্তি বাড়িয়া চলিল। স্বামীর পাশটিতে বসিয়া বাম হাতখানি পিঠের উপর রাখিতেই টের পাইল, সে ঘুমাইয়াছে। চোখের কোণ দুইটিতে জল আসিয়া সব ঝাপসা করিয়া দিতেছে। সোহাগের প্রতি এই বিশেষ পক্ষপাতিত্ব কী স্নেহ না অন‍্যকিছু ইহা জানিবার কোনো উপায় কি নাই!

--------------------------------------------------------------
গোধূলি মাসির কথায় হতবাক হয়ে গেল দেবপ্রিয়া।ফোনের ভিতর দিয়ে গালে যেন সপাটে চড় পড়ল।

-মরুণকিশোরকে মনে পড়ছে কেন তোর? ওর ভিতরে আর কি কিছু বাকি আছে নিঃড়ে নেবার মত? 

দেবপ্রিয়া খানিকক্ষণ চুপ করে যায়। এত রোষ নিয়ে কথা বলছে কেন মাসি? কোনদিন তো এমন ভাবে কথা বলেনা।

-তুই যতদিন ওর কথা তুলিসনি আমার তোকে বলার মত কিছু ছিল না। কিন্তু একটা আত্মভোলা খ‍্যাপাকে আবারো খুঁচিয়ে তুই যন্ত্রণা দিবি সেটা আমি হতে দিতে পারিনা।

-মাসি আমি কখনো কাউকে যন্ত্রণা দিতে পারি? সে ক্ষমতা আমার কোনদিন ছিল?

-হাসালি প্রিয়া, তুই যন্ত্রণা ছাড়া আর কাউকে কিছু দিয়েছিস? মরুণকিশোর, অনুজ, তোর মা এমনকি বরুণকে পর্যন্ত তুই যন্ত্রণা দিয়েছিস। আমার তো ভয় হয় তুই নিজের মেয়েটাকে ছাড়বি তো!

কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠেছে দেবপ্রিয়ার। এত রাগ, ঘৃণা তার প্রতি গোধূলি মাসির? ফোনটা রাখার আগে আশ্চর্য নরম গলায় বলল, 'কিছু মনে করিস না প্রিয়া, মরুণকিশোরের নাম তোর মুখে শুনতেই বড্ড রেগে গিয়ে এসব বললাম। ওর বিয়ে হয়েছে। ভালো আছে দুটিতে। তুই আর ওর ঠিকানা খুঁজিস না মা। আমি সামনের মাসে পারলে একবার যাব তোর কাছে। আদর করে আসব একটু। বড্ড কঠিন কথা বলে ফেললাম না রে মা?' 

মায়ের ঘরে ঢুকে ঊশ্রীর ভুরু কুঁচকে গেল। দেবপ্রিয়া রাইটিং টেবিলে মাথা নীচু করে বসে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে কেঁপে কেঁপে উঠছে শরীর।

-মা!

ছোট্ট ডাকটায় মুহূর্তে সচেতন দেবপ্রিয়া।নিজেকে কুড়িয়ে নেয় অতীত থেকে। চোখটা আলতো হাতে মুছে বলে, 'বেড়াতে যাবি মুনিয়া?'


রবিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২২

শ্যামলী আচার্য

                 





 মৃত্যু অথবা  (পর্ব ২)


কিরণমালার ফোন ধরেই লাউডস্পিকারে দিয়ে দিল রাণা। দীপু সামনে রয়েছে। ওর সামনে আবার আড়াল কীসের? বরং ও সবটাই শুনুক। আলোচনা করতে সুবিধে হবে।  
মহিলাকণ্ঠ ভেসে আসে, “হ্যালো, এটা কি রাণা সেনগুপ্তর নম্বর?”
“হ্যাঁ বলছি।” 
“নমস্কার। আমাকে চিনবেন কি না জানি না। আমার নাম কিরণমালা রায়। আমি সায়েন্স কলেজের দু’হাজার চোদ্দ সালের পাস আউট। আমার সাবজেক্ট ছিল সাইকোলজি।” 
কিরণমালার শান্ত সৌজন্যের মধ্যে ‘আপনি’ সম্বোধন কান এড়াল না দুজনের। রাণাও অবশ্য ভীষণ সংযত গলাতেই কথা বলছিল।   
“বুঝেছি। আপনাকে বেশ মনে আছে। আমাদের চেয়ে এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। বলুন, বিশেষ কোনও প্রয়োজন?” 
“হুম, প্রয়োজন তো বটেই। এবং প্রয়োজনটা বিশেষ এবং ব্যক্তিগত। কাজেই বুঝতেই পারছেন সব কথা ফোনে বলা যাবে না।”  
“সে তো নিশ্চয়ই। কিন্তু, আপনি ... মানে আমাকে হঠাৎ খুঁজে ...এভাবে ফোন করছেন...” রাণার গলায় স্পষ্ট প্রশ্নচিহ্ন।   
“আমি যতদূর খবর পেলাম আপনি বেশ কিছুদিন হল প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হিসেবে কাজ করছেন। অপরিচিত এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে ঠিক সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। আমারই এক ক্লাসমেট আপনার সন্ধান দেয়। আপনাকে আমার মনে আছে। আমার মনে হল, প্রোফেশনালি কাজ দিলে আপনাকেই ভরসা করা যায়। আফটার অল, আপনি খুব সামান্য হলেও চেনেন আমাকে।” কিরণমালার কথা শুনে রাণা দীপুর দিকে তাকায় একবার। 
“আপনি কি এখন কলকাতায়?”
“আমি কয়েকদিন হল এসেছি। কিছুদিন থাকার ইচ্ছে আছে। এর মধ্যেই একটা কাজ মিটিয়ে দিতে চাইছি, সেটা আপনাকে সাক্ষাতে বলব।” 
“বেশ, অবশ্যই আসুন। আমি আপনার এই নম্বরে আমার ঠিকানা পাঠাচ্ছি। গুগল ম্যাপ ধরে চলে আসা খুব সহজ। শুধু একটাই কথা...”  
রাণাকে থামিয়ে কিরণমালা জবাব দেয়, “আমি জানি, আপনি কাজটা সম্পর্কে জানতে চাইছেন... টেলিফোনে শুধু একটিই কথা বলছি, আমি একটি খুনের তদন্ত করাতে চাই। এর বেশি জানতে চাইবেন না।”   
রাণা থমকে যায় এক মুহূর্ত। তারপর সপ্রতিভ গলায় বলে, “আপনি কবে কখন দেখা করতে আসবেন?”
“কালই সকালে। ঠিক সাড়ে ন’টা। আই হোপ আপনার প্রবলেম নেই কোনও।”
“নট অ্যাট অল। আসুন।” 
“আমি পৌঁছে যাব।”  
কিছু বোঝার আগেই ফোন কেটে দেয় কিরণমালা।  
রাণা মোবাইলটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে কুশনের ওপরে। ভুরুদুটো কুঁচকে গেছে, চোখে অস্থিরতা। 
দীপু বলে, “কেসটা কী হতে পারে বল তো?”
“আন্দাজ করছি, শিওর নই। কিন্তু... একটাই মুশকিল...”
রাণার কথায় অস্থিরতা। 
দীপু জিগ্যেস করে,“কী মুশকিল?” 
“একরাত্তিরের মধ্যে আমাকে খুঁজে নিতে হবে কিরণমালা কেন আসতে চায় আমার কাছে। সময়টা বড্ড কম। ওর সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নিয়ে রাখতে পারলে ভালো হত। অ্যাট লিস্ট কোথায় আছে, কী করছে...।”   
“কিন্তু রাণা, এত তাড়া কীসের? ওকে আগে আসতে দে। ও নিজেই এসে বলবে নাহয়...।” 
রাণা উঠে পড়ে। পায়চারি করতে করতে বলে, “তুই একটু তলিয়ে ভাব দীপু, এতদিন পরে তাকে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর খুঁজতে হচ্ছে কেন? তার যা সোশ্যাল স্ট্যাটাস সে পুলিশের বড়কর্তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই অর্ধেক কাজ হয়ে যাবে... তার ওপর খুন। খুন হলে পুলিশ জানবে না? না কি পুলিশ জেনে ফেললে খুনি পালিয়ে যাবে বলে সে ভয় পাচ্ছে? খুনি কি আরও প্রভাবশালী কেউ? খুন হলই বা কোথায়?...” পায়চারি করতে করতে মাথার চুলগুলো খামচে ধরে রাণা।    
দীপু বলে, “আমি যতটুকু বুঝলাম, জট পাকিয়ে যাচ্ছে একটাই কারণে। ক্লায়েন্টের নাম কিরণমালা রায়। আর সে চিরকাল আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। কিন্তু তুই কী ভাবছিস রাণা?”  
দীপুর কথায় হুঁশ ফেরে। 
“সেরকম কিছু ভাবছি না। আমাদের ডিএসপি সাহেবের কথা মনে পড়ছে।” 
“কে? অরিন্দম? ও তো এখন বারাসতে পোস্টেড।” 
“আরে, যেখানেই পোস্টেড হোক, ক্লাসমেট তো রে বাবা। এই ঝামেলায় ওকে একবার লাগতে পারে।” 
“কিন্তু রাণা, কে কোথায় খুন হল, তাই তো বোঝা যাচ্ছে না। কিরণমালা আগে কাল আসুক। আর তাছাড়া, তোর এই শখের গোয়েন্দাগিরি নিয়ে অরিন্দম খুব গাল দেয়, মনে নেই?”
“তা’ দিকগে। বন্ধুরা অমন বলেই থাকে। ভালোবাসে বলেই গাল দেয়। দেখ ভাই, রাজনীতি করতে গিয়ে কেরিয়ার ডুবিয়েছি। হাবিজাবি চাকরিবাকরি করে ওই ডালভাতের জীবন আমার পোষাবে না। আমার এই কাজই ভালো। থানাগুলো মোটামুটি চিনে নিয়েছে। জানে, আমি লোকটা চোর-ছ্যাচোড় নই। টুকটাক কেস সলভ করলে পুলিশেরও লাভ। আমারও মগজের ব্যায়াম। নির্মেদ নির্ভার মস্তিষ্কে হাওয়া খেলে...”  
রাণার কথা শুনতে শুনতে মন খারাপ হয় দীপুর। রাণা ছিল ব্যাচের ব্রাইট বয়। সত্যিই অনেক বেশি সময় দিয়ে ফেলেছিল ছাত্র-রাজনীতিতে। নিজের আখের গুছিয়ে নিতে পারেনি। যথারীতি রেজাল্ট হল একদম সাদামাটা। নম্বরের ফাঁদে অনেক বড় কেরিয়ারের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। নেহাত কিছু পৈতৃক ধনসম্পত্তির ভরসা আছে। নিজের বাড়িতে একা মানুষের খাওয়া-পরার সংস্থানটুকু রয়েছে। বাকি সময়টা, এখন ওর নিজের ভাষায়, ‘মগজের ব্যায়াম’ করে। পুরোপুরি পেশাদার গোয়েন্দা না হলেও প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে বেশ কিছু কেস সামলেছে।  
“দীপু, আমি একটু কাজে বসি। তুই শুধু দেখিস কেউ ডিস্টার্ব না করে। আর হ্যাঁ... কিরণমালা রায়ের মা ইরাবতী সান্যাল আর বাবা কিংশুক রায়ের সব ডিটেল চাই চটপট। যেখানে যত ইন্টারভিউ আছে, নিউজ ক্লিপিংস আছে... সব খুঁজে জড়ো করি। দুজনেই সমাজের উঁচুতলার মানুষ, কিছু বেসিক ইনফো তো থাকবেই...।”   
দীপু উঠে পড়ে। মানিকতলায় রাণার আনঅফিসিয়াল অফিসঘরের চৌহদ্দির ঠিক ওপরের তলাতেই ওদের একত্রে বসবাস। দুই ব্যাচেলরের ভাগাভাগি জীবন। দীপুর নিশ্চিন্ত ব্যাংকের চাকরি রাণার পেশাদার গোয়েন্দা জীবনে কোনও অসুবিধে করেনি। বরং রাণার পৈতৃক বাড়ির একটা অংশে দীপু পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকায় এক অর্থে দুজনেরই সুবিধে। দীপু সুদূর মফঃস্বল থেকে কলকাতায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে চাকরি করতে আসার যন্ত্রণা থেকে মুক্ত, রাণা তার পিতৃমাতৃহীন নিস্তরঙ্গ একলা জগতে একটা বন্ধুর সাহচর্য পেয়ে তৃপ্ত। দীপু তাকে প্রচুর সাহায্যও করে। ঠিক এই মুহূর্তে যেমন দীপু টেবিলের কম্পিউটার অন করে দিয়ে বেরিয়ে যাবে। পাশে রতনের চায়ের দোকানে হাঁক দিয়ে এলে ফ্লাস্ক ভর্তি গরম চা চলে আসবে রাণার পাশে। রাতের খাবার চলে আসবে হোম ডেলিভারি মারফত সময়মতো। দীপু চুপচাপ এবার নিজের ঘরে। হয় সিনেমা কিংবা ওটিটিতে জমিয়ে সিরিজ। নয় গল্পের বই। রাণা ডাকলে তবেই আবার একসঙ্গে বসা। তার আগে রাণাকে কোনও ভাবে বিরক্ত করা যাবে না।    
রাতে চোখ বোজার আগে অবধি নিচের ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছে দীপু। 
ভাগ্যিস কাল রোববার।     
.......................................................................................................................................
( ক্রমশঃ)

সৌমী আচার্য্য

                     





শ্রাবণের ধারার মতো


পর্ব ২


এই অবধি পড়ে ঊশ্রী ভীষণ মন খারাপ করে মাকে বলল,'মা তুমি কি ওদের আলাদা করে দেবে?'দেবপ্রিয়া মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,'সে তো ওদের উপর নির্ভর করছে রে।ওদেরকেই বুঝতে হবে কি ওরা চায়?'

-ইস‍্যুটা তো খুবই সাধারণ।

-সেটা তোমার মনে হচ্ছে,ওদের নয়।

-কিন্তু মা...

-উহু আর নয়।আমার লেখাকে প্রভাবিত করবে না।তুমি এবার নিজের কাজে যাও।

বৃষ্টি ঝরে পড়ছে অবিরাম।ঊশ্রী মায়ের চোখে কিছু খুঁজতে চেয়ে একবার তাকাল।দেবপ্রিয়া ততক্ষণে মন ডুবিয়ে দিয়েছে সোহাগে।

ঊশ্রী পা ফেলে এগিয়ে আসে বারান্দায়।বাবার কথা ভাবতে চায় কিন্তু অস্পষ্ট ছবিটাতে আলো ফেলতে পারেনা।'নিরাকার অবয়ব নিয়ে ঘর করা যায়না'বহুবার মা একথা বলেছে,নিজেকেই হয়তো।তবু শুনেছে সে।ছোটোবেলায় যতদিন ওর দিদা বেঁচে ছিলেন জিজ্ঞাসা করেছে,'এর মানে কি দিদামা!'

-ওরে বাবা ঊশ্রী এত কঠিন কথা তুই পুরোটা বললি কি করে হ‍্যাঁ?আমি তো মনে রাখতেই পারতাম না।

-আহ্!তুমি অন‍্য কথা বলছো কেন?

দিপালী নাতনীর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কেবলি কথা নিয়ে খেলতে খেলতে ওর মনটা সরিয়ে দিত অন‍্য দিকে।বড় হবার সাথে সাথে ঊশ্রী দেবপ্রিয়ার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে ক্রমশ।মায়েতে মেয়েতে খোলা বারান্দা আবিষ্কার করেছে নিজেদের মধ‍্যে।বাবাকে নিয়ে আগ্রহ দেখালে দেবপ্রিয়া স্পষ্ট করে বলেছে,'অনুজ সত‍্য গোপন করত।যে সত‍্য আমার জানা দরকার ছিল।সম্পর্কের শুরু থেকেই এই লুকোচুরি আমি বুঝতাম।'

-তাহলে বিয়ে করলে কেন?

-কি জানিস মুনিয়া!মানুষ কি চায় সেটা বোধহয় সে নিজেই জানেনা।অনুজের গ্রেসফুল ব‍্যক্তিত্ব আদর করার ধরণ সব এত পছন্দ ছিল যে অনেক কিছু উপেক্ষা করে গিয়েছি।যখন একসাথে থাকতে এলাম তখন সব বদলে গেল।দমবন্ধ লাগতে শুরু করল।চলে এলাম।

ঊশ্রী মায়ের চোখে কখনো কোনো আক্ষেপ দেখেনি।কেন!মা কি বাবাকে ভালোবাসত না।একটা মানুষের জন‍্য মায়ের মনে কেন কোনো উত্তাপ নেই?

               ---------------------------------

সোহাগের পিত্রালয়ে ফিরিয়া যাইবার কোন উপায় নাই বলিয়া সে ধীরে ধীরে পরিস্হিতির সহিত মানাইয়া চলিবার রাস্তা খুঁজিতে লাগিল।বড় জা বিন্দুবালার সহিত সময় কাটাইতে লাগিল।বড়ির ডাল বাটা,পিঠে পুলির রকমারি কায়দা আয়ত্ত করিবার অভিপ্রায়ে নিজেকে ডুবাইয়া রাখিল কিন্তু সপ্তাহ পরেই তাহার প্রাণ যায় যায়।দক্ষিণের বারান্দায় আরাম কেদারায় হাত রাখিয়া কাঁদিয়া উঠিল।

-তুমি ফিরিবে না!আমার প্রেম মিথ‍্যা করিয়াই তোমার আহ্লাদ!ঐ চন্দ্রনাথের সঙ্গ তোমার এত প্রিয়।আজ সাতদিন হইল তুমি ফিরিলে না?

দাসী খুঁজিয়ে খুঁজিয়া আরাম কেদারার পার্শ্বে আলুথালু সোহাগবালাকে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া মুখ বাঁকাইয়া গৃহিনীকে সংবাদ দিতে একতলায় নামিয়া আসিল।গৃহকত্রী যমুনাবতী রান্নাঘরে তদারকিতে ব‍্যস্ত।

-মাগো তোমার বৌ যে সোয়ামির দুককে আরাম কেদারা জড়িয়ে ঘুমুচ্চে।আর কত পোচ্ছয় দেবে গো মা?

-বেশি দুঃসাহসের কথা বললে তোর মুকে নুড়ো জ্বেলে দুবো হারামজাদি।দূর হ।মোতির মা একবার এদিক পানে এসো তো বাপু।

মোতির মা এই বাড়িতে দীর্ঘ তিরিশ বৎসর অতিক্রম করিয়াছে।যমুনাবতীর সুখ দুঃখের সঙ্গী।নীরবে আসিয়া দাঁড়াইতেই যমুনাবতী রেকাবিতে সামাণ‍্য সন্দেশ আর ফল দিয়া বলিলেন,'সামনে বসিয়ে খাইয়ে আসবে।আর জটিকে বলবে ওকে আজ সন্ধ‍্যায় যেন সাজিয়ে যায়।'মোতির মা কিছু বলিবার অভিপ্রায়ে তাকাতেই যমুনাবতী গম্ভীর স্বরে বলিয়া ওঠেন,'যাও মোতির মা,বিলম্ব আমার অপছন্দ।'মুখে যাহাই বলুক ছোটোছেলের আচরণ তাহার নিকটেও সুবিধার লাগে না।কি হইলে যে তাহার অন্তর পূর্ণ হইয়া ওঠে কে জানে?অমন সুন্দরী,বিদূষী স্ত্রী ছাড়িয়া জলহস্তীর ন‍্যায় চন্দ্রনাথের সহিত যত্রতত্র ভ্রমণে কি সুখ লাভ করে সে কেবল ঈশ্বরেই জানে।বড়োছেলে সৌম‍্যাদিত‍্য অপেক্ষায় নীরিহ আর তাহার স্ত্রী বিন্দুবালা নেহাতই সাধারণ।উহাদের জীবন ঘটিতে তুলিয়া রাখা জলের ন‍্যায়।গড়াইয়া খাইলেও হয় আবার নষ্ট করিলেও কারো কিছু যায় আসেনা।সোহাগবালা ইহাদের অনেক ঊর্ধ্বে।যমুনাবতী অন্তরে ছোটবৌটিকে স্নেহের অধিক ভালোবাসেন।মায়া দিয়ে গড়া মেয়েটির চোখ।শুধু হাতের বাঁধন আলগা বলিয়াই সব গড়াইয়া যায়।উজাড় করিয়া ভালোবাসিতে জানে ঝগড়া করিতে তার সাধ নাই।অভিমানে ফুলিয়া ওঠে কেবল অধিকার দাবী করিতে বিমুখ।এমন মেয়েকে ভালো না বাসিয়া উপায় কি?মোতির মা আসিয়া দাঁড়াইল।

-মা,ছোটবৌ খেয়েচে।

-বাঁচালে বাপু।তা সে কি করচে?কি হল মুকে কুলুপ আঁটলে যে।সে কি করচে?

-পুকুরঘাটের দিকে গিয়েচে।সাথে রাজ‍্যির জামাকাপড়।

-ওমা,সেকি কতা!শিগগিরই দাসীকে পাটাও।আদরের দুলালী সে অনতথো হবে মোতির মা।যাও যাও।

মোতির মা নিজেই পা চালাইয়া পুকুরঘাটের দিকে আগাইয়ে যাইতেই কাঁঠালতলা হইতে দেখিতে পাইল,সৌম‍্যাদিত‍্য সোহাগের হাত হইতে কাপড় গুলি লইতেছে আর দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া সোহাগ কাঁপিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে।মোতির মা প্রসন্ন মনে ফিরিতে গিয়াও পুনরায় পিছন ফিরিতেই আকাশ কালো করিয়া আসিল।কে জানে কিসের ইঙ্গিত!ঝড় বৃষ্টি পৃথিবী তোলপাড় করিতে আগ্রহী হইয়া উঠিল।

--------------------------------------------------------------
দেবপ্রিয়া লেখা বন্ধ করে চুপ করে বসে রইল।কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে সে সোহাগকে?নিজেকে কখনো কখনো অচেনা লাগে।এমন বিচ্ছেদ কেন পরিকল্পনায় আসছে?কোন ভাবে কি এই ধূসরতার মধ‍্যে সে নিজেকে মগ্ন করে তুলেছে?অনুজের কথা কোনভাবেই সে মনে রাখতে চায়নি কিন্তু সত‍্যি কি সম্ভব ওকে ভুলে থাকা?এতটা উদাসীন কোন মানুষ কী করে হতে পারে?কোথায় আছে অনুজ?বল্লভপুরের কোনো মাটির ঘরের দোচালায়?নাকি পাহাড়ের কোলে কোথাও টেন্ট করেছে।আদিত‍্যনাথ কি অনুজের ছায়া?নাহ্ কিছুতেই এটা হতে দেওয়া যায় না।আদিত‍্যকে ভিন্ন শেড দিতে হবে যেভাবেই হোক।মরুনকিশোর কোথায় থাকে খোঁজ নিতে হবে।ওর নামের মানেটা জানা হয়নি।কি খুঁজছিল ও পুরীর মন্দিরে?কে জানে?গোধূলি মাসি ওর খবর দিতে পারবে।কালই একবার ফোন করতে হবে।বুকের বাঁদিকটা বড্ড চাপ ধরে আসে আজকাল।একটা ডাক্তার না দেখালেই নয়।ঊশ্রী এখনো কলেজ থেকে ফেরেনি বোধহয়।ফিরলেই আগে এইঘরে আসবে,'মা সোহাগের কি হল?ওর বর ফিরলো?মা আদিত‍্য কি গে?'প্রশ্নে প্রশ্নে পাগল করে দেবে।একা থাকাটাই এখন অভ‍্যাস।তবু মেয়েটা এলে মনে হয় যেন স্নান সেরে ঠাণ্ডা শরীরে এসে বসল নিশ্চিন্ত হয়ে।দুপুরের এই শেষ রোদের তেজে একটা মায়া গন্ধ আছে।বাড়ির পাশের আমগাছটায় এবারো মুকুলের বৃষ্টি নেমেছে।মা থাকলে ঠিক ঘরের ফুলদানিতে ওরা কেউ না কেউ ঠাঁই পেত।দেবপ্রিয়া জানে মা চলে যাবার আগে ভীষণ ভাবে চেয়েছিল অনুজকে জানানো হোক।কোনভাবেই এই ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে চায়নি সে।বহুকষ্টে যে মোহ ছেড়ে বেরিয়েছে সেখানে আর ফিরতে চায়না।এই সময়টায় গোটাবাড়ি ঘুমিয়ে থাকে।কাজের লোকেরা,ধলিদি সবাই ঘুমায়।কেবল ড্রাইভার ছেলেটা গান শোনে রেষ্টরুমে বসে।অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোনটা বাজছে।ল‍্যাণ্ডলাইন।কেউ বোধহয় ধরার নেই।রকিং চেয়ারটায় গুটিসুটি দিয়ে বসল দেবপ্রিয়া।মেয়েটা ফিরছে না কেন?চারটে প্রায় বাজতে চলল অথচ অন‍্যদিন ফিরে যায়।আবার বাজছে ফোনটা।ভুরু কুঁচকে উঠল তবে কি মেয়ের কিছু!তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বেরিয়ে ড্রইং রুমে ছুটল দেবপ্রিয়া।নাহ্ আবার কেটে গেল।কে হতে পারে?কেন ফোন করছে?ঘরে ফিরে মেয়েকে ফোন করল।সচরাচর ফোন করে জানতে চাওয়ার মানসিকতা ওর নয়।মেয়েকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতেই তার আগ্রহ।তবু...

-হ‍্যালো ঊশ্রী!

-হ‍্যাঁ মা বলো।

-ফিরছিস?

-একটু কাফে তে আছি মা,কিছু বলবে?দরকার আছে কিছু?

-না না,দরকার কিছু নেই।সাবধানে ফিরিস।

-আমি আধঘন্টার মধ‍্যে ঢুকে যাব।

-আচ্ছা বেশ।

ফোনটা রেখে দেবার পর অস্বস্তিটা বেড়ে গেল।কে হতে পারে এই সময়?আত্মীয় স্বজন কারো সাথেই তো তেমন যোগাযোগ রাখেনি সে।কিবা হত রেখে?একই উত্তর দিতে আর ভালো লাগতনা।কলিংবেলটা বাজছে।ধলিদি নিশ্চই উঠবে।চুপচাপ অপেক্ষা করে দেবপ্রিয়া।কানে আসে দরজা খোলার আওয়াজ।ফিসফিস শব্দ এবং আবার নিস্তব্ধতা।খুব মৃদু পায়ের আওয়াজ।খানিকপর ধলিদি ডাকে দরজার বাইরে থেকে।

-দিদি,এসেছে।

-কে?

-তোমার পিসতুতো বোনের বর।

-কি?বের করে দাও এখুনি।যাও।স্কাউন্ড্রেলটাকে ঢুকতে দিলে কেন?

কথা শেষ হবার আগেই পর্দা সরিয়ে ঢুকে এল বরুণ দত্ত।মাথার চুল ধুলো ভরা,পোশাক জীর্ণ,ময়লা,চোখ লাল।

-প্রিয়া,নিরুপায় হয়ে এসেছি।একটিবার কথা শোনো।তারপর যা সিদ্ধান্ত হয় নিও।

-তুমি এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও।তোমার কোনো কথা শুনতে চাইনা আমি।যাও বলছি।

-একটু শোনো,তারপর...

-বরুণ আমি পুলিশে ফোন করব।

বরুণের চোখের আকুতি,অসহায়তা মুহূর্তে উবে গেল।এক ভয়ংকর শয়তানিতে হলদে হয়ে উঠল চোখ।গলায় মিথ‍্যে কান্না রেখে তাকাল।

-ঊশ্রীর কিছু ছবি এখনো আমার কাছে আছে।যদিও আমি সেসব তোমায় বলতে চাইনা।তোমার মন চঞ্চল হলে লেখালিখি আবার বন্ধ হয়ে যাবে আগের মতো।তারচে আমায় একটু সময় দাও প্লিজ।

মাথা চেপে ধরে দেবপ্রিয়া।জীবন কিছুতেই যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে না।সামাণ‍্য বিচ‍্যূতি সামাণ‍্য ভুল এত দীর্ঘ কালো ছায়া ফেলে কি করে?সাড়ে চারটে প্রায় বাজে।মেয়েটা ফেরার আগে এই আপদকে বিদায় করতে হবে।কিন্তু এভাবে কতদিন আর কতদিন।একটা স্হায়ী সমাধান খুব প্রয়োজন।দেওয়ালে টিকিকিটা টিকটিক করে উঠল।

(ক্রমশঃ)

রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

                              




শ্রাবণের ধারার মতো



পর্ব _১



মাথার ভিতর তীব্র জ্বালা নিয়া তিন চারিদিন অতিবাহিত করিয়া অবশেষে সোহাগবালা আদিত‍্যনাথের সমীপে উপস্হিতি হইল।মুখভঙ্গি দেখিয়া অচিরেই বুঝিল নিজের অবস্হান হইতে বিন্দুমাত্র সরিয়া আসার অভিপ্রায় আদিত‍্যর নাই।তথাপি সোহাগবালা শেষ চেষ্টা করিতে ছলছল চক্ষে আদিত‍্যের হাত দুইখানি চাপিয়া ধরিল।

-আমার সাথে কাটানো সব সময় কি তবে মিথ‍্যে?তুমি কি আমায় কোনদিন ভালোবাসো নাই!সেই সব মধুর শব্দ,স্পর্শ কেবল ছলনা!

আদিত‍্য এই অবুঝ নারীটিকে কিছুটা শান্ত করিবার অভিপ্রায়ে বলিয়া বসিল,'যতসব অস্বাভাবিক কল্পনায় নিজেকে পীড়া দিয়া যদি তুমি শান্তি লাভ কর তাহাতে আমার কোন অসুবিধা নাই।শুধু একটিই অনুরোধ দয়া করিয়া আমায় একা থাকিতে দাও।তোমার সাথে অকারণ বাক‍্যব‍্যয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নাই।'

-জানি তোমার সকল আগ্রহ এখন কেবল চন্দ্রনাথের বৈঠকখানায়।আমার সঙ্গ আর ততটা মধুর নয়।

-অহেতুক বাক‍্যালাপে আগ্রহ বোধ করিনে।দীর্ঘকাল তোমার পীড়া হইবে বোধ করিয়া নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব না দিয়া নিজের ভেতরেই এক অসন্তোষের বারুদ স্তূপিকৃত করিয়াছি।সেই বারুদে অগ্নি সংযোগ করিলে বোধকরি বহু সম্পর্ক নষ্ট হয়।

সোহাগের দুইচক্ষু ভাসিয়া যাইতে লাগিল।মহিলামহলে তাহার স্বামী সোহাগী নামটি বুঝি মিথ‍্যে বলিয়া প্রকাশ হইয়া পড়ে।কেবলি ভালোবাসায় উথলিত স্বামীর আচরণ মনে পড়িতে লাগিল আর ততই সে বিচলিত হইয়া উঠিল।কি করিবে ভাবিয়া না পাইয়া সজোরে মস্তকে করাঘাত করিয়া বসিল।এরূপ আচরণে আদিত‍্যনাথ যারপরনাই অসন্তুষ্ট হইয়া চিৎকার করিয়া তীব্র ভর্ৎসনা করিল সোহাগকে।

-অন‍্য কোন পুরুষমানুষ হইলে তোমাকে আচ্ছা করিয়া বুঝাইয়া দিত স্ত্রীর অধিকার ঠিক কতটুকু।যতখানি তোমার ভালো লাগা মন্দ লাগার দাম দিয়াছি তাতেও তুমি সন্তুষ্ট নও।সবটুকু গ্রাস করিলে তবে তোমার শান্তি!আর নয়,নিজের ইচ্ছার সঙ্গে যতটুকু আপোষ করিয়াছি সেই ঢের।শুধু তোমাকে ঘিরিয়া বাঁচিবার মতো মন আমার নাই,এই সত‍্য।

সোহাগ ফুলিয়া ফুলিয়া নিজেকে সম্বরণ করিবার বৃথা চেষ্টায় ঠোঁট চাপিয়া ধরিল,'তবে তোমার মনে এই ছিল!সব মিথ‍্যে,সব।তুমি অন্তরে অন‍্য কোন মানুষ হইবার বাসনা পোষণ কর!আর প্রকাশ কর অন‍্য কিছু!'

দৌড়াইয়া ঘরে ঢুকিয়া শয‍্যায় আছাড় খাইয়া পড়িল সোহাগ।তাহার সব ধারণা মিথ‍্যে!সে সুখি হইয়াছে ভাবিয়া মনে মনে অহংকার করিত সে সব ধূলিসাৎ হইয়া গেল।কিন্তু কেন তাহার মন চাহিতেছে আদিত‍্য এই মুহূর্তে ঘরে আসিয়া তাহাকে বক্ষে জড়াইয়া ক্ষমা চাহিয়া বসুক?আদিত‍্য বারন্দা হইতে আকাশে উড়িতে থাকা পাখির দিকে করুণ চক্ষে চাহিয়া মনে মনে জপিয়া ওঠে,'মুক্তি চাই বাসায় ফিরিতেও চাই।এই দুইয়ের ভেতর যে অদৃশ‍্য সুতোটি এতদিন আমার আয়ত্তে ছিল তা বুঝি ছিঁড়িয়া যায়।ফিরিয়া যাইতে চাই সোহাগের কাছে কিন্তু এবার ফিরিলে আর বাহির হইতে পারিব না।'

(ক্রমশঃ)

শ্যামলী আচার্য

                                   




 মৃত্যু অথবা  

 
“আবার চিঁড়েতন! উফ! জ্বালিয়ে খেল...” অস্থির হয়ে হাতের তাসের গোছাটা একটানে ফেলে দেয় রাণা। 
“ওই ফেললি তো সব উলটে... এই হল তোর দোষ। একটুও ধৈর্য নেই। ওরে জিততে গেলে হারতে শেখ।”  
“চুক্কর, জ্ঞান দিস না। ” দীপুর কথায় আরও চটে ওঠে রাণা। 
“এইজন্য লাইফে তোর কিস্যু হল না।” দীপু খুঁচিয়েই যাবে। জানে, রাণা এরপর রেগেমেগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। আর ফিরে আসবে ঘুগনি কিংবা আলুর দম হাতে নিয়ে। তার অর্ধেকটাই শেষ। তবু আনবে। দেখিয়ে দেখিয়ে বাকিটা খাবে।  
দীপু মুচকি হাসে। ছেলেমানুষ। এই খ্যাপামি নিয়ে...  
খবরের কাগজটা এলোমেলো হয়ে উড়ছিল হাওয়ায়। টেনে আনে সামনে। ভাঁজ করতে গিয়েই চোখে পড়ল খবরটা। 
বিশিষ্ট সাহিত্যিকের অকালপ্রয়াণ। শ্রীমতী ইরাবতী সান্যাল। তাঁর স্মরণসভার আয়োজন করেছেন তাঁর শিল্পপতি স্বামী কিংশুক রায়। সমাজের গণ্যমান্য সব ব্যক্তিত্ব উপস্থিত থাকবেন। গানে, কবিতায় বেশ বর্ণাঢ্য ব্যাপার। স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন যেমন হয়। খবরটা এই অবধি ঠিকই ছিল। নিচে একমাত্র ভাগ্যহত কন্যার নামে চোখটা আটকে গেল। কিরণমালা রায়। ভুরু কুঁচকে যায় দীপুর। কিরণমালা ইরাবতী সান্যালের মেয়ে?   
“অ্যাই রাণা, শোন একবার।”  
সিগারেট ধরানোর জন্য দেশলাই বাক্সের গায়ে কাঠি ঘষতে গিয়ে থেমে গেল রাণা। 
“দেখ এই খবরটা।”    
“কোন খবর?” রাণা নিস্পৃহ গলায় দেশলাই জ্বালায়। কাঠিটা এক ঝটকায় নিভিয়ে জোরে টান দেয় সিগারেটে। 
“এই যে, ইরাবতী সান্যাল। তাঁর স্মৃতিচারণ সভার বিজ্ঞাপন...।” 
“হ্যাঁ, তা’ হয়েছে কী? ভদ্রমহিলা ভালো লিখতেন। একটু বেশি বয়সে লেখা শুরু করেন... আমি বেশ কিছু লেখা পড়েছি। খুব স্মার্ট গদ্য। ভদ্রমহিলার কত বয়স হয়েছিল রে? আটান্ন? না ষাট?”  
দীপু অধৈর্য হয় সামান্য।  
“আরে ধেত্তেরি নিকুচি করেছে ইরাবতীর বয়েসের। কিন্তু তুই এই কিরণমালা রায়কে চিনিস?”
রাণা ঘরের সিলিঙের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। কে বলবে, একটু আগে তাস ছুঁড়ে ফেলে চেঁচামেচি করছিল!
“রাণা, তুই শুনতে পাচ্ছিস আমার কথা? এই কিরণমালা কি আমাদের কলেজের...?”
রাণা নিখুঁতভাবে মোলায়েম দুটি ধোঁয়ার রিং ছাড়ে পরপর। ছাদের দিকে উড়তে উড়তে মিলিয়ে যাওয়া রিঙের দিকে তাকিয়ে বলে, “আজ্ঞে হ্যাঁ, সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট। পরে যাকে আমরা ইউনিভার্সিটিতেও দেখেছি। একবছরের সিনিয়র।”  
রাণার উত্তরে অবাক হয় দীপু। “কিরণমালা ইরাবতী সান্যালের মেয়ে? তুই জানতিস?”
রাণা আধশোয়া হয় সিগারেট মুখে নিয়ে। “তখন জানতাম না। মানে যখন আশুতোষ কলেজে সাইকোলজি অনার্স পড়ত, তখন ডেফিনিটলি চিনতাম না বা জানতাম না। তারপর রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের চত্বরেও টের পাইনি। শুধু জানতাম, ওর বাবা একজন বড়সড় বিজনেসম্যান। কিন্তু মায়ের পরিচয় গত কিছুদিন হল জেনেছি। তা’ও ইরাবতী সান্যালের মৃত্যুর পর। খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, ফেসবুক... টুকটাক কিছু কথা বেরোচ্ছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ইরাবতী সান্যালের একমাত্র কন্যা কিরণমালা। যিনি আপাতত প্রবাসে রয়েছেন। ডাক্তার স্বামীর কর্মস্থলে। তবে কোথাও মায়ের মৃত্যুতে তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।”
“আমার ভীষণ অদ্ভূত লাগছে রাণা। ইরাবতী সান্যাল লেখকমহলে যথেষ্ট পরিচিত নাম। একেবারে অখ্যাত এলেবেলে লেখক নন। নামী পাবলিকেশন থেকে বেশ কিছু বইপত্র রয়েছে, ভালো বিক্রি। ছোটদের জন্য উপন্যাস লিখেছেন, বড়োদের জন্য লিখেছেন। খুব টেকস্যাভি মহিলা। নিয়মিত লিখতেন, ফেসবুকে নিজের স্টেটাস আপডেট দিতেন। আমার মতো নীরস লোকেরও ওনার লেখা এদিক-সেদিকে চোখে পড়েছে। কিন্তু গোটা ছাত্রজীবনে কিরণমালা তার মায়ের পরিচয় কোথাও দেয়নি। মানে, মানুষ তো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্পে আড্ডায় বসেও বলে, সেভাবেও বলেনি। কেন?”  
রাণা আধবোজা চোখে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে ছিল। 
“মাথা খাটাচ্ছিস? নতুন কেস হিসেবে ভাবছিস? ধুস! আরে বাবা, ইরাবতী সান্যালকে কোনওদিন তাঁর হাজব্যাণ্ডের পরিচয় দিতে দেখেছিস? বাপের বাড়ির সান্যাল পদবীটাই ব্যবহার করতেন। নিজের লেখার জোরে নিজে পরিচিত হয়েছিলেন। ওনার স্বামীকে চিনিস তো? স্বনামধন্য শিল্পপতি। তাঁর মেয়ে-বউকে নিয়ে ভুলভাল সন্দেহ দেখালে কিংশুক রায় তোকে আমাকে ছবি করে দেবে... আর তাছাড়া কিরণমালা যখন আমাদের কলেজে পড়ত, তখন ওর মা এত লেখালেখি করতেনও না, বা লিখলেও সেভাবে প্রচারিত ছিলেন না। উল্লেখযোগ্য কোনও নাম ছিলেন না।”   
“কিরণমালা বড়োলোকের মেয়ে জানতাম। গাড়ি করে আসত, যেত। কাউকে পাত্তা দিত না, কারও সঙ্গে কথা বলত না। তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ছিল বলেও জানি না বা দেখিনি। আমরা সারাজীবন ওকে দেমাকি ভেবে এসেছি...”
“সুন্দরী মেয়েরা পাত্তা না দিলে সবাই যা ভেবে থাকে আর কি...”
রাণার ঠেস দেওয়া কথাটা পাশ কাটিয়ে গেল দীপু। 
“সুন্দরী? কী জানি, আমার বরাবর মনে হয়েছে খুব ডাঁটিয়াল। ও যে অত বড় বিজনেসম্যানের মেয়ে, তা’ও জানতাম না আমরা। ফেয়ারওয়েলে না অ্যানুয়াল ফেস্টে মনে নেই, ওকে বোধহয় একটা বিজ্ঞাপনের ফর্ম দেওয়া হয়েছিল। একবারে তাতে একটা পঁচিশ হাজার টাকার চেক এনে দেওয়াতে ইউনিয়ন রুমে ফিসফাস শুরু হয়। মনে আছে তোর?” 
রাণার সবই মনে আছে। সেদিনের ঘটনার রাণা প্রত্যক্ষ সাক্ষী।  
রাণা তখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র-সংসদের জিএস। শাসকদলের মদতপুষ্ট ইউনিয়নে প্রতি বছর বেশ ঘটা করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের চাঁদা, এদিক-সেদিক স্পনসর জোগাড় করে দিব্যি প্রোগ্রাম হয়। হঠাৎই কেউ একজন বায়না করে, এবার ক্লাসের সব স্টুডেন্টরা উদ্যোগী হয়ে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিক। দেখা যাক না, কারও মামা-কাকা-জ্যাঠাকে দিয়ে আরও বেশি কিছু মাল আনানো যায় কিনা। সেই সময় ফর্ম ছাপিয়ে খুব যত্ন নিয়ে বিলি করা হল সব ডিপার্টমেন্টে। রাণা ছিল কেমিস্ট্রির, আর ফিজিওলজির রিনি। ফিজিক্সের অরিত্রও প্রচুর ছুটোছুটি করত। ওরা তিনজন সবথেকে অ্যাকটিভ মেম্বার। ওদের কাছেই ধীরে ধীরে জমা পড়ে সব ফর্ম আর চেক। সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টের কিরণমালা রায়ের কাছ থেকে একটা বিশাল অ্যামাউন্টের চেক পেয়ে রীতিমতো থমকে গিয়েছিল ওরা। যদিও কিরণমালা নিজে ইউনিয়ন রুমে আসেনি। ওর ডিপার্টমেন্টের অন্য কারও হাত দিয়ে পাঠিয়েছিল। হলই বা ক্রসড চেক, অ্যাকাউন্ট পেয়ি, কিন্তু এত উদাসীনভাবে কেউ অত টাকার চেক পাঠায়? সেদিনই ওদের প্রথম অবাক লাগে। সাদা খামের মধ্যে থেকে চেকটা বেরোতে প্রথমে একেবারে আঁতকে ওঠে অরিত্র।        
“উরিস্লা! ইকিরে... এ তো দেখি অ্যাক্কেরে মেয়ের বিয়ের যৌতুক!”   
রিনি আরও সরেস। সে উঁকি মেরে দেখে বলল, “ধুস, আড়াই হাজার টাকায় কারও মেয়ের বিয়ে হয়?”
রিনির নাকের সামনে চেকটা নাড়িয়ে অরিত্র বলতে থাকে, “চোখের ফিজিওলজিটা ভালো করে পড় রিনি, ওটা বোধহয় এবারের টার্মে ইম্পর্ট্যান্ট নয় বলে বাদ দিয়েছিস। পঁচিশের পরে তিনটে শূণ্য বসানো আছে মা আমার। নিজের চোখটা খুলে রেখে এবার আমার চশমা নাকে দিয়ে দেখ ভাই।”   
রাণা একটা বড় ফাইল খুলে সব কাগজ মিলিয়ে ভরে টাকা এন্ট্রি করছিল। ওদের শূণ্য সংক্রান্ত আলোচনায় ফিরে তাকায়। 
“কে আবার ক’টা শূণ্য পেল?”
“কে আর কী পাবে বস। এই দ্যাখো, ইউনিয়নের প্রোগ্রামে একধাক্কায় পঁচিশ হাজার টাকা। একেই বলে বিজ্ঞাপন।”  
“সে কি রে! দিল কে? মানে এত দিলদরিয়া কে? তার ক’টি মেয়ে আছে তা’লে খোঁজ নে ভাই শিগগির। লাইন লাগাই...”
রিনি এতক্ষণে ধাতস্থ হয়েছে। “ভালো করে দেখ, এই চেক দিয়েছেন কিংশুক রায়। নামটা চেনা। তবে তাঁর মেয়ের নাম...”  
রাণা হেসে বলে, “বলেই ফেল,ভাগাভাগি করে নেব আমি আর অরিত্র। তুই এ যাত্রা ফক্কা...”
রাণার হাসির ওপরে বাড়তি হাসি চাপিয়ে রিনি বলে, “মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড, কিংশুক রায়ের মেয়ের নাম কিরণমালা রায়। সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট। মাত্র এক ব্যাচ সিনিয়র। যদিও এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার... তবুও। নাম হল কিরণমালা, বুঝলে চাঁদু। তোদের সব গুড়ে কিচকিচ করছে বালি... হে হে হে।”   
ওদের হাসাহাসি ওই অবধিই। কিরণমালা পঁচিশ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে বলে ইউনিভার্সিটিতে ইউনিয়ন থেকে তাকে আলাদা কোনও খাতির করা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বরং অত তাচ্ছিল্যভরে চেক পাঠিয়েছিল বলে আদর্শবোধে একটু আঘাত লাগে ছাত্র-সংসদের সাধারণ সম্পাদক রাণা সেনগুপ্তর। সেই বছরই কিরণমালার ফাইনাল ইয়ার। সে ইউনিভার্সিটিতে আসত খুব কম। এলেও গম্ভীর হয়ে ফার্স্ট বেঞ্চিতে বসত। চুপচাপ নিজের ক্লাস করে বাড়ি চলে যেত। ক্যান্টিনের আড্ডাতেও তাকে কেউ কখনও টানতে পারেনি। বছরখানেকের মধ্যে শোনা গেল কিরণমালা বিয়ে করে সাগরপাড়ি দিয়েছে। তার নাম স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে কারওরই তেমন সময় লাগেনি। 
কিন্তু তাকে কিংশুক রায়ের মেয়ে বলে জানতে পারলেও তার মায়ের নাম যে ইরাবতী সান্যাল, এটা জানতে এত বছর লেগে গেল? ইরাবতীও কোথাও কোনওদিন তাঁর পারিবারিক পরিচয় প্রকাশ করতেন না। তাঁর মেয়েও কি সেই পথে নিজের পরিচয় গোপন রেখেছে? কিংশুক রায়ের তো সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনও প্রোফাইলই নেই। পছন্দ আর কাজের জগত আলাদা হলে মানুষ কি এমনই হয়? 
 
 সাহিত্যিক ইরাবতী সান্যালের এই স্মরণসভায় কোনও রহস্যের লেশমাত্র নেই। শুধু তলায় কিরণমালার নাম দেখে এতদিন পরে নিজেদের মধ্যে আবার সেই পুরনো দিন ফিরে এল।
মোবাইলের রিং টোনে চন্দ্রবিন্দুর গান। মৌনমুখরতা। 
রাণা ফোন হাতে তুলল। মুচকি হেসে স্ক্রিনটা বাড়িয়ে দিল দীপুর দিকে। 
“কে রে?”
“সমাপতন। যাকে সহজ ইংরেজিতে বলে কো-ইনসিডেন্স।” 
ট্রু কলারে অচেনা নম্বরের সঙ্গে একটা নাম ফুটে উঠেছে। 
‘কিরণমালা রায়।’   

(ক্রমশঃ)

রবিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

                                  


কোল্হাপুর ডায়েরী ৯

হোটেলে ঢুকতে ঢুকতেই মিমি দেখতে পেল লাউঞ্জে তিনটে টেবিলকেই পাশাপাশি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। লাঞ্চের প্রস্তুতি। মিমিকে দেখে বোসদা বললেন, লাঞ্চের অর্ডার কিন্তু দিয়ে দিয়েছি।মেনু কিন্তু আমরাই সিলেক্ট করেছি। মিমি সলজ্জ হেসে ঘাড় কাত করলো। -  'না দাদা,অসুবিধের কিচ্ছু নেই!চলবে চলবে। '
এ পাশে তাকিয়ে দেখলো বোস বৌদি
তার পাশের চেয়ারটা ফাঁকা রেখেছেন। মিমিকে ইশারায় ডাকলেন পাশে এসে বসবার জন্য। যেন স্নেহময়ী বড় দিদি
ছোট বোনের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছেন! মিত্র বৌদি বললেন, মিমি রূপা তোমার জায়গাটা আগেই সিলেক্ট করে রেখেছে। আমাদের নো চান্স!
এই স্নেহ এই মমতা মিমির প্রবাসজীবনের এক বড় সম্পদ।
লাঞ্চের পরে ঠিক হোলো রোদ একটু পড়ে এলে ফোর্টের বাকি অংশটা ঘুরে দেখা হবে সকলে মিলে।
এর মধ্যে হোটেলের ম্যানেজার এসে একবার ঘুরে গেলেন।
বোসদা বিশ্বাসদা সকলে যে পূর্বপরিচিত এবং সকলের সাথেই যথেষ্ট পরিমাণে হৃদ্যতা রয়েছে কথাবার্তার মাধ্যমে
মিমি  বেশ বুঝতে পারলো।
সকলেই বেশ আড্ডার মুডে রয়েছে। এত অল্প সময়ে সব আলোচনায় যোগ দেওয়া সম্ভব ও নয় অনেক বিষয়বস্তুই যদিও তার এবং সূর্যর কাছে অজানা  তবু খুনসটিগুলো দিব্যি উপভোগ করছিলো সূর্য আর মিমি দুজনেই।
ভটচাজ বৌদি বললেন,
-জানো মিমি' পান্হালা শব্দের অর্থ কি?  পান্হালা শব্দর মানে হোলো নাগেদের বাসস্থান।পান্হালার আসল নাম পান্হাল গড়। এছাড়াও এই ফোর্টটার নাম পান্হালা কারণ এর গঠনটাও  খানিকটা সর্পাকৃতি এর ভেতরে এত সর্পিল গলিঘুঁজি রয়েছে যে পান্হালা নাম সার্থক। বিশ্বাস বৌদিও এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন ওদের কথা। ভটচাজবৌদি
থামতেই উনি পাশ থেকে বলে উঠলেন, আর জানোতো মিমি পান্হালাতে একটা গুহা আছে এটাকে মহর্ষি পরাশরের গুহা বলা হয়। মনে করা হয় ব্যাসদেবের পিতা মহর্ষি পরাশর এখানে বাস করতেন।1730 খ্রীষ্টাব্দে লেখা কোল্হাপুর পুরাণ বা করবীরে  এই পান্হালার উল্লেখ আছে। পুরনো লিপিতে এর নাম পদ্মনাল বা পন্নগালয়। পন্নগ মানে হলো সাপ।  মহর্ষি পরাশর যে গুহায় বাস করতেন সেটা বোধহয় নাগেদের বাসস্থান ও ছিল বোধহয়  মিমি বিস্মিত ও অভিভূত হচ্ছিলো এদের কথায়। সেটা লক্ষ্য করে বিশ্বাসবৌদি বললেন, আসলে কি জানোতো, এই শহরটাকে এত ভালবেসে ফেলেছি যে এর সম্পর্কে যত  পৌরাণিক কাহিনী আছে সেগুলো ও জানবার আগ্রহে যতটা পেরেছি পড়তে চেষ্টা করেছি। আরে আমি ও হিষ্ট্রির ছাত্রী একটু কৌতূহল তো থাকবেই বলো! দু বছর বাংলার বাইরে এসে মিমি কেবল জীবনধারণের তাগিদে দৌড়েই গেছে, মনের খিদের যে পুষ্টি দরকার আজ যেন মনে হলো এখানে এই কোল্হাপুরে এসে তার কিছু আস্বাদ সে গ্রহণ করতে পারবে।
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মে মাসের মাঝামাঝি তবু পান্হালার বাতাসে হাল্কা হিমেল হাওয়ার পরশ। প্রায় চারটে নাগাদ মিমিরা আবার যে যার নিজস্ব বাহনে। আশপাশটুকু ঘুরে দেখে আজকের মতো প্রত্যাবর্তন।
সারাদিনের ধকলে সকলেই কমবেশী পরিশ্রান্ত।একদিনে সবটা ঘুরে দেখা সম্ভব ও নয়। পরে আবার নাহয় আসা যাবে কোন একসময়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে  পশ্চিম দিগন্তে নেমে আসছে রক্তিম সূর্য।দিনান্তের ক্লান্ত রবি পাহাড়ী পথের কিনারে কিনারে ছড়িয়ে দিয়েছে  শেষ রশ্মি আভাটুকু। নিবিড় অরণ্যানীর বুক চিরে আসন্ন সন্ধ্যার পূর্বাভাস।  সেদিকে তাকিয়ে মিমির মন যেন তাকে এই পথের বাঁকে অজানা কোন দিকে যাবার সঙ্কেত ঘোষণা করে বলে গেল'হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনখানে।'
এই কথাই তো টেনে নিয়ে যায় অজানাকে জানার অচেনাকে চেনার হাতছানি দিয়ে। এই তো পরিক্রমা। এ পরিক্রমা সারা জীবনভর।
পাহাড়ী পথ ধীরে ধীরে নেমে আসছে সমতলে।এক অদ্ভুত ভাল লাগার রেশ নিয়ে মিমি ফিরলো তার নতুন বাসস্থানে।
ক্রমশঃ



রবিবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মিনাক্ষী ঘোষ

         


কোল্হাপুর ডায়েরী ৮
ব্রেকফাষ্ট সারতে সারতে বেলা এগারোটা বেজে গেল। তিনটে টেবিলে যথাক্রমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিল ওরা।
গার্ডেন চেয়ার বেষ্টিত দুটি রেক্ট্যাঙ্গুলার টেবিলে মিষ্টারবৃন্দ ও রমণীকুল অনতিদূরে একটা গোল টেবিলে জেনারেশন গ্যাপ! অর্থাৎ কিনা মিমির সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ পুত্র অভি আর কৈশোর সোপানে প্রথম ধাপে পা রেখে কন্যা ঝিনুক সঙ্গে ওদের নবলব্ধ দাদা বৌদি বোসদার পুত্র ও পুত্রবধু
তিন্নি।ওদের কলকল শুনে মনে হচ্ছে যেন  কতকালের পরিচিতি একে অপরের সাথে। বলা বাহুল্য এই নতুন পাওয়া দাদা বৌদির সাহচর্যে  মিমির ছেলেমেয়ের গলায় ফেলে আসা আত্মীয়তার স্বাদ।
মে মাসের মাঝামাঝিতে সূর্য যদিও এখন প্রায় মধ্যগগনে তবু পান্হালার তাপমাত্রা আশ্চর্যজনকভাবে সুখাবহ।
হিলটপ এই হোটেলটা একেবারে পাহাড়ের গায়ে ঘেঁষে। পাঁচিলের ওপারেই খাড়া নেমে গেছে গভীর খাদ। যদিও সে খাদ মোটেও রুক্ষ বা পাথুরে নয় বরং শ্যামলিমা ধাপে ধাপে নেমে গেছে শেষ সীমানা অবধি।
হোটেল থেকে মাত্র কয়েক পা দূরেই পান্হালা ফোর্টের ভগ্নাবশেষ। হিষ্ট্রি আর আর্কিওলজির প্রতি প্রবল ঔৎসুক্য এক অমোঘ আকর্ষণে মিমিকে টানছিলো ফোর্টের দিকে। কিন্তু সময়ক্ষেত্রে দেখা গেল সেই মূহুর্তে কারোর ই বিশেষ ইচ্ছে নেই আড্ডা ছেড়ে ইতিহাসের পথে হাঁটবার। তার আরো একটা কারণ অবশ্য ই মিমিরা বাদে আর সকলের অজস্রবার পান্হালা ভ্রমণ। দর্শন তাই গৌণ এখানে জমায়েতটাই মুখ্য।
যেহেতু আর সব বৌদিরা বহুদিন ধরে এখানে বসবাসের কল্যাণে দীর্ঘদিনের পূর্বপরিচিত এবং সকলেই প্রায় সমবয়সী। তাদের তুলনায় মিমি বয়সে অপেক্ষাকৃতভাবে অনেকটাই ছোটো। তাই  অন্যান্য বৌদিরা নিজেদের মধ্যে নাম ধরে সম্বোধন করলেও মিমির কাছে সকলেই বৌদি
আখ্যায় সম্বোধিত।
এরমধ্যে বোস বৌদি একটু মৃদুভাষী যদিও ভূমিকাটা খানিকটা স্নেহশীলা অভিভাবিকার মতো। সবরকম রসিকতাই উপভোগ করছেন বিনা বাক্যক্ষেপে ঠোঁটের কোণায় স্মিত হাসিটি ঝুলিয়ে রেখে। মিত্র বৌদিও কম কথা বলেন তবে ওঁর মধ্যে বেশ ছেলেমানুষী ভাবটুকু লক্ষ্য করলো মিমি। বিশ্বাস বৌদি ও ভটচাজবৌদি দুজনেই খূব প্রাণোচ্ছল। এর মধ্যে বিশ্বাসবৌদি কোথ্থেকে  অবতারণা করলেন ভূতের কারসাজি।এই হিলটপ হোটেলে নাকি রাতবিরেতে তেনারা দৃষ্টিগোচর হন মাঝেমধ্যেই। বোঝো কান্ড! তেনারা এখানে থাকুন চাই না ই থাকুন এই ভরদুপুরে নিশ্চয় তারা ঢ্যালা মারতে বেরিয়ে আসবেননা! মিমির বলে এখন পায়ের তলায় সর্ষে নাচছে ফোর্টের অন্দরমহলের জন্য। অস্ফুটে সেকথা একবার উচ্চারণ করাতে ভটচাজবৌদি যদিও বা একটু দয়াপরবশ হলেন বোস বৌদি দিলেন অমনি তাকে বকুনি! দুজনে যদিও
নেমসেক তবু পরস্পরকে নাম ধরেই সম্বোধন করেন তারা।
- থামোতো রূপা তুমি মোটেও এখন যাবেনা। এই শরীর নিয়ে আর সিঁড়ি ভাঙতে হবেনা তোমার!
কথাপ্রসঙ্গে মিমি জানলো অদম্য প্রাণশক্তি বিশিষ্ট এই মহিলাটির দু দু বার অ‍্যাজিওপ্ল্যাষ্টি হয়ে গেছে।হয়েছে হাঁটুর প্যাটেলা ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ও। ওনার কৌতুকপ্রিয় মুখভঙ্গি আর বডি ল্যাঙ্গোয়েজ দেখলে সে কথা বোঝে কার সাধ্যি!
দূর  থেকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে বোসদার ছেলে আর ছেলের বৌ লক্ষ্য করছিলো এদিককার কথোপকথন। মিমির প্রায় হতাশ মুখের ভঙ্গিমা আঁচ করতে পেরে পুপু বললো,
- চলো আন্টি আমরা যাই তোমার সাথে। ওরা একটু বিশ্রাম নিক।'
মিমিকে নিয়ে ওরা চারজন পায়ে পায়ে এগোলো ফোর্টের দিকে। পুরোটাই প্রায় ভগ্নস্তূপ। ফোর্টের পাশ ঘেঁষে পরিখা কাটা যদিও এখন আর জল নেই তাতে। ভিতরে সিঁড়ি দিয়ে কয়েকধাপ নামলে  একটি গভীর কূপ।পুপু বললো এর নাম আন্ধার বাভড়ি।এই কূপটি একটি গুপ্ত কূপ। পান্হালা দুর্গের মূল জলের উৎস এইটাই। শত্রুপক্ষ  যাতে প্রবেশের পর পানীয় জলে বিষ মেশাতে না পারে তাই এই গোপনীয়তা। এর উপরে ত্রিতলবেষ্টিত ঘূর্ণ্যমান সোপানশ্রেণী ধাপে ধাপে নেমে গেছে কূপটির সন্নিকটে।এই কূপের নীচেও নাকি অজস্র গুপ্ত সুড়ঙ্গ রয়েছে যা পাহাড়ের অপরপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছে। এমন আরো অসংখ্য গূুপ্ত সুড়ঙ্গ রয়েছে ফোর্টের ভেতরে শত্রু আক্রমণ করলে যাতে নিরাপদে দুর্গের বাইরে বেরিয়ে যাওয়া যায়।
এ ফোর্টে প্রবেশের বেশ কয়েকটি দরওয়াজা রয়েছে তার মধ্যে মুখ্য দরওয়াজাটি হোলো চার দরওয়াজা। এছাড়াও র য়েছে  তিন দরওয়াজা ও বাঘ দরওয়াজা যদিও সব ই এখন প্রায় ভগ্নস্তূপে পরিণত।
এর উপরে একটি ছোট টিলার মতন। সিঁড়িগুলো খুব খাড়া খাড়া। মিমি আস্তে আস্তে উঠছিলো। মিমিকে ওভাবে কষ্ট করে উঠতে দেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলো তিন্নি। ততক্ষণে মিমির ছেলেমেয়ে পুপুর সাথে টিলার মাথায় উঠে গেছে। তিন্নি আর মিমি এসে দাঁড়ালো টিলার পাঁচিলের গা ঘেঁষে। অনভ্যাসের কারণে মিমি স্বভাবত ই একটু ক্লান্ত। সেটা বুঝতে পেরে তিন্নি বললো, চলো আন্টি
সামনের পাথরটার ওপর একটু বসি। ওখান থেকে নীচে
দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে সর্পিল পথশ্রেণী। তার ই একটি ঢুকে গেছে অনতিদূরে একটি গুহাভ্যন্তরে।হয়তো
এই পথেই একদা যাতায়াত করতো অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্য দল। পার্বত্য পথের সুচতুর ও কৌশলী যোদ্ধৃবৃন্দ। মিমি যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পেল সারি সারি মারাঠা ঘোড়সওয়ার হাতে তাদের উন্মূুক্ত ক্ষুরধার  অসি আর কন্ঠে হর হর মহাদেও শ্লোগান।
চমক ভাঙলো তিন্নির কথায়। -'জানো আন্টি, এই যে
ভটচাজ আন্টিকে দেখছো এর সবটাই নিজের যন্ত্রণাকে
লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। নাগো আমি ওনার শরীরের কথা বলছিনা। ওনার বুকের ভেতর যে গভীর ক্ষত লুকিয়ে রয়েছে উচ্ছলতার প্রলেপে তাকে ঢেকে দেন মাত্র।।
এর আগের দিন আলাপ পরিচয়ের সময় মিমি শুনেছিলো ওনার একটিই ছেলে। দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছিলো বোর্ডের পরীক্ষায়। ইঞ্জিনিয়ারির্  কম্প্লিট করে এখন প্যারিসে ম্যানেজমেন্ট পড়তে গিয়েছে। আজ জানলো ওর বড় ছেলের কথা। সে ও নাকি খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিল। কোল্হাপুর ইনষ্টিটিউট অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াকালীন ওর দুরারোগ্য লিউকেমিয়া ধরা পড়ে। সবরকম যথাসাধ্য ট্রিটমেন্ট ও প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোর্স শেষ হবার আগেই ও সকলকে ছেড়ে চলে যায় মহাকালের উদ্দেশে।বৌদি সন্তান হারানোর মাতৃহৃদয়ের ব্যথা কখনো প্রকাশ করেননা প্রকাশ্যে। তবু কখনো কোন অসতর্কমূহর্তে সেই বিয়োগব্যথা প্রকাশ হ য়ে পড়ে। যাকে তিনি মনে করেন সেতো হারায়নি। চোখের সামনে দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব তিনি তার মমতা দিয়ে উপলব্ধি করেন সবসময়।
এই ভগ্নস্তূপ কত বিয়োগব্যথার সাক্ষী। কত মায়ের স্ত্রীয়ের ভগিনীর অশ্রু লুকিয়ে রয়েছে এর পাথরের খাঁজে খাঁজে। তার সাথে আরেক মায়ের মর্মযন্ত্রণা মিশে গেল  এই খর মধ্যাহ্নের প্রাক্কালে।
শুনতে শুনতে কখন চোখের কোণায় জমা হয়েছিলো দুফোঁটা অশ্রুবিন্দু। হাতের চেটোয় মুছে নিতে নিতে মিমি দেখলো পুপুরা নেমে আসছে টিলার ওপর থেকে।
ক্রমশঃ



সম্পাদকীয়

               


চলে গেলেন সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর।বয়স হয়েছিল ৯২ ।১৯৮৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার  ভূষিত করে। এ ছাডাও তাঁর ঝুলিতে অনেক পুরস্কার ছিল৷ তিনি নিজেই ছিলেন আমাদের কাছে পুরস্কার৷ ছোটবেলায় বাড়িতে কে  .এল . সায়গালের গান  ছাড়া অন্য  কারোর গান শোনার অনুমতি ছিল না বাড়িতে৷ জীবনে প্রথম রেডিও কেনার সামর্থ্য যখন হল, তখন তাঁর বয়স মাত্র আঠারো। কিন্তু রেডিওটা কেনার পর নব ঘুরাতেই প্রথম যে খবরটি তাঁকে শুনতে হয় তা হচ্ছে, কে এল. সায়গল আর বেঁচে নেই। সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওটা ফেরত দিয়ে দেন ৷ 
সুরের সাম্রাজ্যে একছত্র রাজত্ব করেছিলেন দীর্ঘ দিন৷
সুর সাম্রাজ্যের সুর-সম্রাজ্ঞী ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ৮-ই জানুয়ারি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মুম্বাইয়ের ব্রীচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভরতি হন। করোনা মুক্তও হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী শারীরিক অসুস্থতায় অবস্থার অবনতি হয়। ৬-ই ফেব্রুয়ারি সকালে হাসপাতালে শেষ নিশ্বাঃস ত্যাগ করেন।