সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

অরূপরতন হালদার

                                      




অভিসার



প্রণয় অংশত দাহ্য, বাকি দেহ খুঁড়ে ফেল
জল কতদূর?
সারসের ডানায় সূর্য নিজেকে হারিয়ে ফেলে
তারপর মীনরাশি পঞ্চমবাহিনী
ঘুম দূরে সরে গেছে, তার পায়ের ছাপ
আমাকে অশ্বত্থের থেকে দূরে মেয়েটির কাছে নিয়ে যায়
তার দেহ ঘিরে রাতের হাড়, নীল চন্দ্রাতপ বুনে চলে ঢেউ
ধুলোপড়া জালিকায় নীহারিকা ভাসে
তুলট কাগজ থেকে সন্ধ্যা ভেসে গেছে প্রাচীন আখরে
কুয়াশাজড়ানো বন্দরে মারীচের হাসি
একটা নিস্তব্ধ আয়না তুলে ধরে কেউ
মেয়েটি গোপনে আসে, তার মুখচ্ছবি মিলিয়ে যায়
বাষ্পলীন আঘাতের মতো
আমলকি বনে চাঁদ এলোমেলো
হৃদয়প্রসূত ছায়া নুন মাখে সারা গায়ে
পশুদের দল চোরাবালি ফেলে
বনের অন্ধকারে চলে গেছে 



সপর্যা


লুপ্ত হ্রেষা, তুমি অমিতাভ, সূর্যপাথর নেমে এল দেহে
সেনানীর পরিহার অন্ধ বড়ো
জলের ভ্রান্তি আমাকে পোড়াও
ওই মাতৃরেখা শূন্য হয়ে আসে, অকাতর সমিধেরা
যেমন উদ্ভিদ, প্রাণসকল শোনে মহলা জেগে ওঠে
শীতলক্ষ্যার শরীর পেরিয়ে আরও অন্ধকারে
গ্রন্থি খুলে এলে নিসর্গের বেদনা একাকী ষাঁড়ের মতো স্থির
আলস্য নির্মাণ করো, কেবল তৃষ্ণা নয়
স্মরণিকাগুলি জানেনা অলিভ পাতার মুকুট
কখন নিঃশব্দে পুড়ে গেছে রক্তের ভেতর
আঙুর ও সনেটগুচ্ছ দ্রুত আরোগ্য থেকে তোমাকে দেখে
একটা পানপাত্রের সজীব অতীত আর
ছিটকে ওঠা কোহলে মিশে যায় জলবিভাজিকা
ওই তালবাদ্য তবে নিয়ন্ত্রক হল
মসৃণ প্রহরা থেকে সরে এসো, পর্দাগুলো ভৌতিক 

সায়ন্ন্যা দাশদত্ত

 


সংগীত


যে অন্ধ মেয়েটি শিখেছে গান। সারে গা অথবা মা তে থমকে দাঁড়িয়ে রইল বিকেল। চিঠি আসতে পারে। আকাশে মেঘ। আর তিনটে চব্বিশ বাস। হর্ন বাজলো। মেয়েটির নাম রেণুরানী আদক। ইস্কুলে নাম নেই। দুপুর গড়ালে ঝিঁঝিঁ চাদর খোলে। কালভার্টে দাঁড়িয়ে পড়া যুবক। গোঁফ উঠেছে। গোপনে সেদিন বুকে পেড়েছে হাত। ঘোরানো হাত। সঠিক পুরুষ নয়। সদ্য ওঠা গোঁফের মতো নরম। রেণুবালা কি গান রেখেছো বুকে??
স্তন নেই,
আদিঅনন্ত আনন্দলীলা বাজে। সংসার নেই। রেণুবালারা অন্ধ যেমন মানুষ। এসেছে লীলায় বাঁধন তেমন নয়। বাজো সংগীত। অন্ধ এ বুকে বাজো।

শম্পা মাহাতো

 






স্বপ্ন


আলোকবর্ষ অতিক্রম করেও আলো আসে।

ছুঁয়ে থাকে। কখনওবা মায়ের আদর হয়ে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না। জড়িয়ে ধরে। 


দুঃখভাবনার গায়ে লতানো গুল্মের মত লেপ্টে থাকা ভয় থেকে কোনওমতে পাশ কাটিয়ে এগোতে গিয়ে মুখোমুখি হই স্বপ্নের।


আমার বন্ধুর নাম স্পর্শ। ধর্ম অস্পৃশ্যতা। আমি হাত বাড়ালেই স্পর্ধা চোখ রাঙাচ্ছে। দেখো ভুল। দেখো ভুল করছি বারবার আর ভালোবাসা প্রতিশোধ নিচ্ছে। ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত যতটুকু জ্বালানি। নিজস্ব। তার ওপারের আগুন নিয়ে খেলা করছে। হাসাহাসি করছে সময়।


বর্ষা বাড়ন্ত হলে লেখার ওপর ঝরে পড়ছে মায়ের চোখের জল। যার নিকট নেই। দূর নেই। সবটাই শুধু আছে। সূর্যের মত চিরসত্য হয়ে।


তবু অন্ধকার

লুট করছে আমায়।

----------


ধন্যবাদ


 



সব্যসাচী মজুমদার


 


হঠাৎ সবই শীতের মতো এল 

 


হঠাৎ সবই শীতের মতো এল ।
পাহাড় থেকে দেখতে পেলাম খাঁই,
কুয়াশাহীন তেন ও ত্যক্তেন…
আমার তুমুল পশুপাখির চাই ?

খাচ্ছে ওরা ! চাটছে ওরা স্বাদ ?
ওদের ছায়া অবশ্য উদ্বায়ু ।
স্পষ্ট আলোর জন্যেও সংঘাত 
বাড়ছে বলে সতর্ক হয় স্নায়ু…

তারপরে ঢেউ পাল্টে দিতে এল 
ভূতের মতো অসংখ্য হাত-ঘড়ি…
এইখানে তোর বহুত্বে উদ্বেলও
বুঝতে পারে সমস্ত মঞ্জরী !




বৈদূর্য্য সরকার

 


অপ্রচলিত 





কার সাথে হয় ভাব কাকে ছোঁড়ো ঢিল
সব জানতে পারলে জীবন অন্যরকম হতো,
'বৃষ্টি আসলে ঠিক নদীতে ভাসাবো সাধের নৌকা...'
এতো পর্যন্ত লিখলে কেউ বলবে এসকেপিস্ট ;
কত কাজ পড়ে আছে, হয়নি যা কথা হয়েছিল
ব্যর্থতা পাহাড় জমে হারিয়ে গেছে বাঁচার পথ ।
কার সাথে বৃষ্টি সন্ধে কতদূর একসাথে হেঁটে 
বহু ঠেক ঘুরে অনেক ঘাটের জল; সংসার সফরে
থমথমে মেঘ আর রিমঝিমে পেগ বললেই
কেমন যেন একটা অন্তঃমিল, 'লিরিক প্রবণ
হওয়ার বয়স কি আছে' বৃষ্টিদিনে প্রশ্ন ছিল, 
প্রশ্ন ছিল অনেকরকম যৌবনে মনকেমন 
প্রতিদিন আশায় থাকা তোমার ; যুগ পার করে
উত্তরের অবকাশ হয় না কারোর আজকাল। 
চিৎপুর সন্ধে ট্রাম ফিরিয়ে আনে কি মন্ত্রবলে
রয়্যাল থেকে যেই আমরা চাঁব খেয়ে বেরিয়েছি
বৃষ্টি নেমে পড়ে, আতর অতীতে হলুদ ট্যাক্সি ভরসা
কথা ফুরিয়ে এলে দেখেছি কোথায় হারায় মায়া। 
বৃষ্টিদিনে রবিঠাকুর খিচুড়ি ছাতার বাহার
সব গিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদা জুতো প্যান্টে মাখামাখি, 
বুঝতে পারি বৃষ্টি হাঁটার দিন ফুরোলে এমন 
বিরক্তিকর লাগে নিজেকে, ক্যাসুয়াল লিভ কিংবা
ঘরে বসে বৃষ্টি দেখার ইচ্ছেরা ক্যাপসুল গিলে
নিত্যদিন নিম্নচাপে খরচা করে গোপন কথা,
নিরপেক্ষতা আসলে একটা বিরাট বড় ঢপ
বুঝে ফেলার পরেও প্রতিটি মন্বন্তরের শেষে
বৃষ্টিদিনে কতবার তার কাছে পেতেছি দু'হাত,
তারপরে প্রতিটি মানুষ অনর্গল তর্ক করে । 

শর্মিলা ঘোষ

 




সম্পর্কের উষ্ণায়ন


বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো বাড়ছে সম্পর্কের তাপমাত্রা ,
শৈশবের নিরেট নির্ভেজাল সম্পর্ক কাঁচের ঘরের মতো ভেঙে গেছে,
হ্যাঙারে টাঙানো ব্যথা আমরা ঝেড়ে পুছে গুছিয়ে রাখছি মনের আলমারিতে,
আমাদের ভেতরের রক্ত ক্ষরণ লুকিয়ে রাখছি গ্ল্যামারাস প্রোফাইল পিকচারের চমকে,
প্রকৃতির গভীর অসুখের মতো দূরত্বের অসুখ পিছনে ফেলে লং ড্রাইভে ছুটে চলেছি.......
এর শেষ কোথায় আধুনিক বিশ্ব জানেনা,
সুখের ওপর জি এস টি বসিয়ে মূল্যায়ন করছি সময়ের।
মায়া শব্দটা ডিকশনারি থেকে মুছে দেবার চেষ্টায় একে অপরকে অতিক্রম করে চলেছি .........

কৌশিক সেন


 বনসাই

 

তোমরা যখন মেঘের গল্প বল,

গোপের বালক আপনি বাজায় বাঁশি

শ্যামল দু’চোখ আপনি টলোমলো

ঠিক বুঝেছি, সে কোন সর্বনাশই!

 

দুষ্টু আকাশ কলমা পরে চোখে

উপচে পড়ে দু’পাড় ছলাচ্ছল,

কদম্ববন ঢাকলে সুরলোকে

আরেকটু পর থামলে কোলাহল।

 

সুর লেগেছে নিভন্ত কিংশুকে

স্বপ্নঘোরে অবাক ধুলোবালি

তোমরা যাকে মেঘ বলেছ সুখে,

তাকেই বলি পদ্য লেখার কালি।

 

শোক জমেছে কাজলাদীঘির পাড়ে

নাগকেশরের পাতায় ভেজে রোদ

আলগা পাঁজর বেঁধেছে মাল্হারে

তবুও কোথাও ভাঙছে প্রতিরোধ।

 

তোমরা যাকে স্পর্শসুধা বল

একলা ঘোরে যত্নে রাখি তাই,

তোমরা যখন মেঘের কথা বল

আমার ঘোরে ভিজেছে বনসাই।।

 

 

বহুদূরের বিন্তিকে...

 

ডুব দিয়ে দেখা তোর নামে যত শব্দ

কথা উড়ে গেলে ধরে ফেললেই পারতিস

কাটা ঘুড়ি মেখে মেঘেরা বিপ্রলব্ধ

চিঠি হয়ে যাক আকাশের যত আর্তি।

 

দুটি জুঁইফুল, টুলটুল করে সন্ধে

টিমটিম জ্বলা তেলকুপিটাই ভরসা

নীলাভ জ্যোৎস্না উঁকি দেয় কটিবন্ধে

দুটি গলি ছেড়ে তোর নামে ছিল বর্ষা।

 

আচমন সারা ফোঁটা ফোঁটা যত ঝুমকো

রতি রতি দাম গড়ালে বিকেল সন্ধ্যায়

কুচিকুচি কাচ, অভিমান যত ঠুনকো

প্রতিপদ ঢাকা নিবিড় রজনীগন্ধায়।

 

তবু সাঁতারের, ডুব সাঁতারের দিনটি

মৌসুমি বায়ু সব জানে অনাসৃষ্টি

ছাতা ভুলে গেছি। জানতিস বল্ বিন্তি

দুটি গলি পর... আমি, তুই আর বৃষ্টি!!

 

শ্রীলেখা মুখার্জ্জী

 



আফসোস

উদযাপনের তেমন কিছুই নাই
হাতের মুঠোয় প্রাত্যহিকীর ভোর
পেলব ঘাসে আরাম খোঁজাটাই
আগল খুলে উদোম হাওয়ার জোর

পূরবৈয়াঁয় জুঁইলতাটির দোল
থমকে গেছে দিন পেরিয়ে রাত
ফুল ঝরিয়ে বিষাদমগ্ন কোল
নিমগ্নতায় গভীর গিরিখাত

বর্ষা ছিল নিবিড় ব্রীড়া স্নান
বর্ষাতিতে মুখচোরা সেই তাপ
ছিল মুখর বাদল দিনের গান
মিইয়ে যেত ক্যাপুচিনোর কাপ

এখন কেবল রাত মোহনায় দিন
ঋতুরা সব রেলিং ছুঁয়ে চুপ
মেঘ যে এখন গল্প কথা হীন
ঝরার নেশায় জলফোঁটা টুপটুপ

বারান্দাতে অস্তগামী রোদ
দীঘল ছায়ার মর্মে পিছুটান
কী জানি কোন ধার হলো না শোধ
সব খুইয়ে বৃথাই মাপি ধান

অর্ঘ্য নাথ


 বৃষ্টিহীন সেই ছেলেটি 



লড়াইটা কেউ দ্যাখেনা
দ্যাখে দৃশ্যমান সুখ,
রক্তটা কেউ দ্যাখেনা
দ্যাখে লক্ষ্মীঝাঁপি মুখ।
কীভাবে একটা ছেলে বৃষ্টিহীন
একা বড় হয়,
ভেজা চোখে গোসাপের গর্ত দেখে
পেরিয়ে যায় মেঘলা কাদা মাঠ,
একটা জগৎ তৈরি হয়
নিজেদের একটা বকুল গাছ -
কেউ সেটুকু দ্যাখেনা।
শুধু আগুন আরো আগুনে মরে
অসভ্য গ্রীষ্মে ফুলে ফুলে ওঠে -
কোন ম্যাজিকে ছেলেটা
বড় গাছে ফুল ধরায় 
স্বরবৃত্তে বৃষ্টির দেশ !

পৌলমী ভট্টাচার্য

 


সূক্ষ্ম দ্বীপ, আমি এবং নান্দনিক ভূগোল



আদবকায়দা মেনে ঘর বাঁধা যায় না ... 

এমনটাই স্বপ্ন জড়ানো দ্বীপে গচ্ছিত থাকে বিস্তর নুড়ি সংলাপ ।

'ভালবাসা বলে কিছু নেই?'

প্রশ্নহীন সাম্রাজ্যে অজানা চিহ্ন নিষিদ্ধ ; -- বক্তব্য আত্মিক যুবরাজের।

তার পকেট ভর্তি উদভ্রান্ত বর্ষা,
চুলে চুলে হাঁটে পদাতিক সন্ন্যাস।
বালিকা-বেভুল বেশে মেঠোচারিণীর কুসুম কুসুম প্রলাপ যেন সারং ঘরানায় দৈবাৎ আলোর বিপর্যয়;
তবু, অশিক্ষিত এবং উড়নচণ্ডী নুনের ভিড়ে মিশে যায় কবি পরিচিতি ।
এখানে তেমন কানপাতা দায় হয় নি আজও অথচ মৌমাছিদের সংসারে সাজানো আছে সবুজ বনবিবি।
বাহানায় তুমি দূরে যাচ্ছ সমুদ্দুর...
নির্জনতায় হাসে সূক্ষ্ম দ্বীপ ,
                                  আমি এবং
                           নান্দনিক ভূগোল।

স্বাধীন চেতনার বশে ভালোবেসো না যেখানে নাক দুল হাতিয়ে নেবে শ্মশান-বিভূতি।