গুচ্ছকবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গুচ্ছকবিতা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২১

সুনন্দ মন্ডল

                           


             স্বাধীনতা
             ‎    
             ‎
রক্তের প্রাচীর ভেদ করে 
স্বাধীনতার দাম।
বর্ণে বর্মে তোমাদের শৌর্য
ব্যস্ত জীবনে ঘাম।

নদী বয়ে যাওয়া সুরে 
আকাশের নীরবতা।
মেঘের গর্জন দিকে দিকে 
সবেতেই স্বাধীনতা। 

তোমার মনন জানে
অনভিপ্রেত কিছু জিজ্ঞাসা।
আশানুরূপ ফল পেয়ে
নেই আর কোনো হতাশা।

স্বাধীন ভারত, স্বপ্নেরও
লুকোচুরি খেলাঘর।
বীরত্বের কাহিনী ঠাসা
আত্মবলিদানের বাসর।
       

         রক্তের অক্ষর
         ‎    

সবুজ গায়ে বেঁধেছিলে পণ
জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে।
কোনো কিছুর পরোয়া ছিলো না
নিজের জীবন নিয়ে।

দেশের সেবায় আয়োজিত
রাষ্ট্রব্যাপি মহাযজ্ঞ।
তোমরাই এলে বুক চিতিয়ে
বিজ্ঞ কিংবা অজ্ঞ।

রক্তের অক্ষরে দিলে প্রাণ
স্বাধীনতার নামে।
আজও স্মরণ করি তোমাদের
আত্মত্যাগের ধামে।
        

          শিরোধার্
          ‎   

অজস্র মৃত্যুপণ
বলিদান
সমর্পণ
দেশের কল্যাণে।

মহা সংগ্রাম
বিদ্রোহের পরিণাম
স্বাধীনতার ফুল
পতাকায় ত্রিবর্ণ চেতনা।

যুগের অবসান
বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ
ক্ষমাসুন্দর
ভারত মায়ের কোলে শিরোধার্য।

চিত্রঋণ- জয়ীতা ব্যানার্জী 
       



রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০

অনিন্দ্য পাল

                                                 





 সৃজন এই সংখ্যার কবি অনিন্দ্য পাল। 


সাপের খোলস // অনিন্দ্য পাল 
=====================
মুখোসের উপর মুখোস চড়িয়ে 
লুকিয়ে পড়েছি সবাই 
গভীর 
ঘুরন্ত অন্ধকারে!

অন্ধকার কি শব্দহীন? 
না, খিদের শব্দ এখানে 
হিস-হিস...

অন্ধকার কি শর্তহীন ?
তাহলে তার পোষাক নেই কেন 
লজ্জাস্থানে!

অন্ধকার কি লোভহীন ? 
তবে এত মালা কেন গলায় 
সর্বাঙ্গে! 

আসলে আমরা সবাই বিবর্তনের শিকার 
সাপের ছেড়ে ফেলা খোলসের মত পড়ে থাকি 
চুপচাপ, 
ফাঁপা শরীরের খিদে এঁকে রাখি 
বেওয়ারিস খোলসের 
ভিতরপিঠে... 
================================ 
আঁকা মানুষ।  // অনিন্দ্য পাল 
===========
শেষ হয়ে যাওয়া সময়টুকু পেরিয়ে এসেছি সবে 
সব নাম-বেনাম বেরিয়ে গেছে শেষ নিঃশ্বাস হয়ে 
আমার "আমি"র মুখে বারবার এঁকে রাখা সব মুখোশ 
খরার আদরে ফাটাফুটি দোঁয়াশের মত চেয়ে আছে 
আকাশের দিকে, 
ধরো সেখানে ভেসে আছে একটাই মেঘ 
অথবা অভিশাপ 
বৃষ্টি হলে ,ধুয়ে যাবে রঙের পরত 
না হলে , ধূসর গুঁড়ো হয়ে বাতাসে মিশে যাবে 
আঁকা পরিচয় 
স্তরে স্তরে গড়ে তোলা বল্মীক জীবন 

এখন দেখছো এই সব শব যা চেয়ে দেখ 
আকাশের দেওয়ালে ফুটে আছে নাম 
আঁকা মানুষ ...
==================================
 বসন্তের শেষে //অনিন্দ্য পাল 
======!!!!=====
আজ বসন্ত চলে গেছে এই খানিকটা আগে 
চৌকাঠে ডানপা বাড়িয়ে দিয়েছে গ্রীষ্ম 
শীতকাল চলে গেছে বলে কষ্ট হচ্ছে না আর 
সিলিং-এ পাখাটা ঘুরছে, নামছে বাতাস আবার 

বসন্ত চলে গেছে বলে কোকিল ডাকলোনা আর 
অথচ 
কোকিলের ছানাপোনা সব এখনো কাকের বাসায় 
কোকিল কি ভুলে যেতে পারে সন্তানের কথা 
কোকিল কি ভুলে যেতে পারে সেই সব পথ 

আগামী বসন্তে আসতে হবে আবার 
বোকাসোকা কাকের মাতৃস্নেহ লুঠ করতে 
কোকিল ভোলেনা কাকের অপত্যপ্রেম 

তবে কাক ভুলে যায় বারবার বিগত বঞ্চনার ইতিহাস। 
========================= 
অনুরোধ // অনিন্দ্য পাল 
========
আমাকে ফেলে দিও না কাঁটাঝোপে 
ঘুলঘুলি থেকে পড়ে যাওয়া চড়ুই বাসার মত ,
বরং দিও এক সানগ্লাস সূর্যবাঁধ 
গুমটি মনের ফোস্কাতে দিও কিংশুক চুমু 

দহনরাগ জুড়াবো যখন অন্ধকার ঠাসা কোণে 
আলোকে দিওনা ঠিকানা লুকানোর 
কোন নদীজলে দিয়েছি ডুব 
মিশে গেছি কোণ বনে ...

অহল্যাঘুম ভাঙিও না আমার 
জীবনঘড়িতে দিওনা ঘুম ভাঙাবার চাবি 
আটকে দিওনা মোলায়েম শীতের বাতাস 
এ ভাবেই বাঁচি আমি এটুকুই আমার দাবী, 

সময় ফুরিয়ে এলে চলে যাবো ঠিক 
যেমন যেতে হয় হরিণকে মৃগনাভি ছেড়ে 
নাহলে প্রত্নবীজ হয়ে থেকে যাব হাজার বছর, 
যদি আসো তারও পরে, কালের সেচখাল পেরিয়ে 
ছুঁয়ে দেখো প্রথম বেরোনো কচিপাতা দুটো 

চারাগাছে পাবে নরম ভালোবাসা, 
                                            কাঁটার প্রেম এড়িয়ে। 
====================================
ভালোবাসার বাড়ি // অনিন্দ্য পাল 
===============
মোমের শিখার মত লাজুক আগুন
ছড়িয়ে দিয়েছ বুকের গভীরে 
সেখানে অনশনরত একগুঁয়ে ম্যাগমারা তখন 
একে অন্যের ইচ্ছা পানে ব্যস্ত, 
তবু তোমার এই পেলব দহন সয়ে নিতে পারি 
বেতাল জীবনের মত,
আরও পারি মৃত সভ্যতার শৌচাগার হতে 
অথবা অন্ধ দাবানল হয়ে গিলে নিতে পারি 
সবুজ কলমি লতা, 
অথবা যদি তুমি বলো, পুষ্পহীন করে দিতে পারি 
রাধার কুঞ্জবাগান,
শেষ লহমায় ছিনিয়ে আনতে পারি অ্যানুবিস হয়ে 
রতিমগ্ন প্রেমিকযুগল,

কিন্তু এত সব করেও কী পাওয়া যায়, পাওয়া গেছে 
কখনও কোনকালে বেহুলার প্রেম? 
তাই আর আদেশ নয়, নয় কোনো আইন জারি 
এস,লালরডোডেনড্রনের মত ঝরে পড়ি পাথরপাহাড়ে 
ফুলের শব দিয়ে বানাই ভালোবাসার বাড়ি। 
==================≠=========== 
ভালোবাসার বনসাই // অনিন্দ্য পাল 
=========
সেই প্রথম দিন, প্রথম দেখা 
একঝাঁক পায়রা এবং তুমি 
হাতে সোনালী শস্যদানা 
বানভাসি উপত্যকা আমি 

তুমি, আমি এভাবে গড়ায়নি আর দিন 
ক্যালেন্ডার নতুন হয়েছে বারবার 
ঘুমের মধ্যে তুমি লেডি আলাদিন
অর্ধেক দিন বেচে আমার রোজগার 

আমি দানা খুঁজি কবুতর জীবন 
চাঁদপ্রেমে উড়ে গেছ সমুদ্রশহর 
কুয়াশা বাষ্পে চুমুক দেয় তৃষ্ণা সৌরদিন 
পেয়ালায় ঢেলেছি স্মৃতি, রাত্রি উজাগর 
ইতিহাস অতীত কখনো ডাকেনি পিছনে 
তলানিতে ঘোলাটে সুখ, বসত করে মনে 


আমার বাগান জুড়ে আগাছা গুল্ম ঘাস 
তোমার দোলনাটবে বনসাই ভালোবাসার চাষ ...

================================
একফোঁটা সুখের জন্য // অনিন্দ্য পাল 
================
মুষ্টিবদ্ধ সুখ খুঁজে ছিলাম মরিচীকার মত 
বেলেমাটি লেপা মেটে দাওয়ায় 
সেখানে বসত ছিল হলুদ ঝরাপাতার...

নীলচে শিরায় উপভোগ শ্লথগতি 
আপেলশামুক বাসা বাঁধে স্পন্দনঘরে
দু-একফোঁটা সুখেই ভিজবো, ভেবেছিলাম 
মেঘের আদর ভেসে চলে গেল, হঠাৎ মরুঝড়ে 

এত বড় আকাশ এত বৃষ্টি ঝরে 
আমাকে ভেজাবে কে, আমার একলা ঘরে 
ভালোবাসা ফুটে আছে দেখি রাতের জ্যোৎস্নাতলায় 
একফোঁটা সুখ তোমার গন্ধ নিয়ে 
আমাকে উদাস করে ...
============================= 
আবার প্লাবন আসুক, ব-দ্বীপে // অনিন্দ্য পাল 
==≠=================
তোমার আধচেরা ব-দ্বীপে এখন 
অস্তরাগের বিষণ্ণ প্রতিলিপি 
তবে কি এবার দিন ফুরিয়ে এল? 

ঋতুহীন খনিগহ্বর চাঁদ গেলে গোগ্রাসে...

জোনাকিরা এখনও ছড়ায়নি দেহগত আলো 
তুমি কি নিতান্তই অমাবস্যা চেয়েছ, বীতকাম 
প্রতিরাত ভোরে, 

প্লাবন আসবে কবে তোমার ব-দ্বীপে আবার?
আলুনি উর্বরতা আর সুখ দেয়না, শান্তি দেয় 
স্নেহ আর উৎসবে কেটে যায় রাত, অচঞ্চল 
কঠিন বাঁধে কি আটকেছো মোহনার নোনাজল? 

তবু আমি আশাদীপ জ্বেলে রাখি প্রাণপনে 
তোমার পলিপল্বল উঠোনে 
আবার যদি ফিরে আসে সেই সব প্লাবিত উচ্ছ্বাস
থেকে যাবো তবে, এই দ্বীপে,আনাচে-কানাচে 
অথবা বিশুষ্ক হও যদি লবণ বালিয়াড়ি 

ফুরিয়ে যাবো তবে, একান্ত একা আনমনে... 
==============================
বন্ধুকে / অনিন্দ্য পাল 
=========
যে ভাবে হারিয়েছিল তোমার উত্তরকাল 
আজ সেই আলুথালু পথে 
যেতে হবে ঐন্দ্রজালিক পদক্ষেপে, 

না কোনো প্রশ্ন নয়, কৌতুহলের ওষ্ঠে রাখ 
ধৈর্যের বাটখারা 
তোমার শত্রু নয় কেউ, তুমিও নও বন্ধু সবার 
ভঙ্গুর পলিথিনে মুড়ে পুরসভার ডাস্টবিনে ফেল
ষড়যন্ত্র আর মিথ্যার মাসকারা

এ অভিশাপ এনেছ কিষ্কিন্ধ্যা থেকে 
বৈরিতা বিদূষক হয়ে শুয়ে আছে তোমার হারেমে 
মনসার সুড়ঙ্গ ভুলে তুমি তুলে নিয়েছ ধনুক
দেবতার লড়াইয়ে বলি হতে হয়, রাবন আর রামে 

সুগ্রীবের ছলনায় বধেছ সহোদর
এখন বদলেছে সব, আগের মত নেই কালের নগর 
তবু তোমাকে বলছি আমি বন্ধু হই তোমার 

তুমিও শত্রু নও, কেউ বন্ধু নয় তোমার! 
====================================
অদ্ভুত কথা // অনিন্দ্য পাল 
=========
ধরবো বলে ছুটেছিলাম একবগ্গা 
সময়ের পিছনে 
নীল লন্ঠন জ্বেলে এগিয়ে ধরেছিল 
অবসৃত আদিম আত্মীয়রা 
আত্মার আলোয় যেটুকু ছিল পূর্ণিমা 
ব্রহ্মাণ্ডের গাছেরা তাও নিয়েছিল শুষে 

তবুও গোড়ালির আঘাতে ভেঙে ফেলে 
সভ্যতার মাইলফলক 
পেরিয়ে এসেছি প্রজন্ম পারের পঞ্চভূতে 
এখানে এখন সমুদ্র সমতল 
গুল্মজাতীয়রা ছেঁটে দেয় বট-অশ্বত্থের ডানা 
হৃৎপিণ্ডের আবহবিকারে জন্মনেয় 
লঘু আর গুরু 
এখানে সবাই স্বাধীন, অথচ প্রশ্ন করতে মানা,

মেরুদণ্ড বন্ধক রেখে সিংহাসনে রাখা হয় চুমু 
উচ্চরক্তচাপে ভোগে তরুন সময় 
খোলাবাজার থেকে কিনে নেয় বোতলের লোভ 

কফিনে ঘুমিয়ে থাকে মরেও বেঁচে থাকা 
বাস্তু ঘুঘু ... 

রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২০

মৌমিতা মিত্র

                                    




এই সংখ্যার কবি মৌমিতা মিত্র।জন্ম ১৯৯৫ । কলেজ জীবনে কবিতার হাত ধরেছেন।একটা সমস্যার মুখোমুখি ছেলেবেলা থেকেই হতে হতো — তা হল সকলের সাথে মিশতে না পারা। অনেক কথা থাকতো যা হয়তো বলার প্রয়োজন মনে করতেন কিন্তু বলা হয়ে উঠতো না। অনেকটা নিজের জগতে গুটিয়ে থাকা এই কবি কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজের না বলা কথাগুলোকে তুলে ধরেছেন। এর পাশাপাশি কবিতায় নিজেকে জানতে চেয়েছেন সবসময়। 

সন্ধে নামলে

সন্ধের নিস্তব্ধতায় এক অচেনা সন্ধ‍্যার নিঃশব্দ চলাচল;
পোশাক বদলে মানিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতা!
কত মানুষ ঘর চিনে ফিরে আসে নি।
একাকী ঘরের দরজাগুলোয় আঁচড়ের দাগ
যেন হিংস্রতায় গিলে নেবে সকলকে
আর আমরাও নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে পা গুটিয়ে
বসে যাবো বিশাল হা মুখের ভেতর; চোখ বুজে।

সন্ধের অন্ধকারে কালো হতে থাকা গাছের পাতাগুলোয়
পিতৃসুলভ অস্থিরতা; নিষেধাজ্ঞা আর সতর্কবার্তা―
হাওয়ার বেগ বদল কিংবা দিক বদল হয়েছিল
একবার; দূরে কোথাও; তাপমাত্রার তারতম্যে
তারপর থেকেই আকাশে বরাবরের মতো কালচে নীল

অন্ধকারের নিস্তব্ধতায় রাতজাগা পাখি আর হারানো শিশুদের গান
ঘরের সুচিন্তিত উষ্ণতায় ওরা আমন্ত্রিত নয় কারণ
তুমি আর আমি সময়কে নাকি বন্দি করেছি


*****************************



অপেক্ষার রঙ



মেঘরঙা পাখি আর
কাশফুলের প্রেমের
পরিণতিহীনতার স্পন্দনে
নদীতীর মুখর।

জীর্ণ গাছের গল্পে 
অপেক্ষার রঙ বদলে বদলে যায়।


*****************************



ঝরা পাতার গল্প


ভাতের দাগ মুছে গেছে অনেকদিন।
ফুটপাতে এখন শুধু 
ঝরাপাতার গল্প।
তারা পরিচয় খুঁজে পায়নি কোথাও
তারা গাছের পাশে বেঁচে আছে।


*****************************



চশমা




একটা চশমা উল্টো করে রাখা।

একটা ছায়া বড়ো হতে হতে
কাঁচদুটো চোখ হয়ে গেল।

সমীকরণ সহজ দেখে সেদিন সবাই
হাত তুলেছিল; দ্রুত সংখ‍্যা বসিয়ে
অনেক প্রকার সমাধানও উঠে এসেছিল।

বাগানের বালতিতে জমা জলে
মুখ দেখতে দেখতে গড়িয়ে যাচ্ছি ---
দেখে সে পেছন থেকে চুল টেনে ধরে।
কুসংস্কারের মতো। রোজ।

অনেক সরলরেখা ভেঙেচুড়ে, বাঁকিয়ে
নাম লিখে দিয়েছে ওরা সবাই ----
সকালগুলো বেঁধে দেবে বলে।

তারপরেও শ‍্যাওলা ধরা জলে মুখ ভাসে।
সবুজ হয়ে আসে জলের আকাশ।

চশমাটা উল্টো হয়ে পাশে থেকে যায়।


*****************************



ঘর





ছেলেটি নতুন জামা পেলে কাঁদতো।
মেয়েটি কোনোদিন জানতে চায়নি
বাড়ির নাম কেন কুয়াশা।

ডালভাত গড়িয়ে যেতে যেতে
থালার একপাশে একটা মাছি।
তারা ঘর বাঁধবে নৌকার
আলোছায়া আশ্রয়ে।

গল্পটা এগোতে থাকে।
সব কথা পাড় হয়ে যায় নদী;
মাছিগুলো এখন শহরের সেই দীর্ঘ পথে,
ছড়িয়ে ছিটিয়ে।


*****************************


আপোসের পথে




কিছু কিছু বিকেল আমাকে বাঁচিয়ে রাখে।

ভাঙা ভাঙা কথা, দূরের হলুদ আলো, 
মাটির ভাঁড়, এলোমেলো আমি ---
সব ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পথ।

দিন-শেষের আলোয়
অচেনা রাস্তার কাছে এসে দাঁড়াই
নতুন গলিপথের সন্ধানে।

ভুলগুলোর সাথে আপোস করতে পা বাড়াই।


*****************************


ঘুণ ধরা গন্ধে




শেষ সারির মৃতদের একজন
চোখ খুলে সাক্ষ্য দিয়ে গিয়েছিল
তারপর থেকেই আকাশের রং লাল
সোনালি ফল হাতে দুটো শরীর
পাশাপশি এলেই হিংস্র ডালপালা
চেঁচে নিতে থাকে সমস্ত শাঁস
বাইরের ঝাঁঝালো নিঃশ্বাস আর
বন্ধ ঘরের সোঁদা ঘুণ ধরা গন্ধে
নতুন পৃথিবী একে একে হাত পা তৈরি করছে
ভূমিষ্ঠ শিশু গতকালের চির ধরা টুকরোগুলো
সঠিক শূন‍্যস্থানে বসিয়ে
গল্পকথা বুনবে আর ক'দিন পরেই
রাত্রিকালীন বৈদ‍্যুতিক তারাগুলো
গলে গলে নিভে এলে
দেবদূতের পুরোনো কেল্লার 
শেষ জানলা বন্ধ হয়ে যাবে নিঃশব্দে

প্রতিটা টোলে একেকটা স্বপ্ন ফেরত চাইছে সময়


*****************************


যুদ্ধভাঙা একটা শহরে




একে অপরের চোখে লুকিয়ে পড়ে নিলে
ভাতের থালার গন্ধ ভুলে যায় উত্তাপ
ত্রুটি আড়াল করতে শক্ত হয়ে ওঠা
বুকের ঠিক মাঝখানটায়
নিথর তখন সব ভাবাবেগ
সদ‍্য যুদ্ধভাঙা শহরে একটিমাত্র স্তব্ধদিবস
আমি আর তুমি হারিয়ে গিয়েছি বলে।
কোনো এক ভবিষ‍্যতের বৃদ্ধ
তেল-নুন মাখাতে মাখাতে হিসেব দেয় সংস্কারের
আর তুমি, আমি একটা দাঁড়ি পেরিয়ে এসে
চোখ বুজে থাকার অভিনয়ে নামি।
প্রতিবেশীরা এখনও জানে না
আমাদের মায়ের আয় স্বল্প, বাবার আয়ে
একটাও আঙুল খরচ হয় না
আর আমাদের বুকের মাঝখানে শক্ত একটা কুণ্ডলী
তাই খবর ছড়িয়ে পড়ার আগে
আমরাই চোখ বুজিয়ে দিই
যাতে বোঝানো যায় আমরা কিছু বুঝিনি।


*****************************


সোমবারের বিকেলে

অনেকদিন পর আজ ক‍্যারাম খেলবো
বাবার সাথে দীর্ঘদিন দেখা হয়নি;
ক‍্যারামবোর্ডের পেছনে দুটো মাকড়শা
ওদের ঘরে চারদিকে হাওয়া;
লাল কালি দিয়ে পাতার ওপর
ভুল সংশোধন করতে করতে
জানলাগুলো আপনিই বন্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু আমি জানি ঘুটির আঘাতে
উল্টোদিকের ঘরগুলো ভেঙে যাবে না।
শুধু ওরা জানতে পারবে
দমবন্ধ একটা ঘরের হাওয়াই 
ওদের ছাদখোলা ঘরের চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে।
ওরা জানতে পারবে আমি ছিলাম এখানে।
একাই ছিলাম আর ওদের লক্ষ্য করছিলাম।
অনেকদিন পর আজ কাউকে ছাড়াই
নীল স্ট্রাইকারে কালো-সাদা রঙ চলকে পরবে
অথবা জার্সির অদলবদল হবে।


*****************************


একটা ঘরের খোঁজে





কথা বলার সংখ‍্যায় গভীরতা বাড়লে
সরে সরে আসে সব রঙপাখিরা
ছোটোঘাসে ফুল হবার আগে হাত ছুঁয়ে করা
যত ভোরের প্রার্থনা সাবেকি গন্ধে মিশে আসে
ছায়ারা পরতে ভুলে গেছে
সংজ্ঞাহীন পরিযায়ী পাখি ভেঙে যেতে যেতে
পথ দেখালে চোখের সামনে সে পথ এগিয়ে নেয়
নাকি উপহারে আসে একটা মৃত্যু?
কথা বলা ফুরিয়ে এলে কথা অনেক হয়
তখন গালিচাপাতা সন্ধেগুলো উত্তাপ নিভিয়ে ঘুমিয়ে এলে
আমাদের ঘর একইরকম পরিচয়হীন
এক পৃথিবী মেঘে সীমাবদ্ধ এক দৃষ্টি।


*****************************




রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

তন্ময় রায়

                                         



এই সপ্তাহের কবি তন্ময় রায়।জন্ম ৯/১/ ৮৮ ।তার প্রকাশিত বইগুলি -  কমবেশি ক্রিয়া (২০১১), দৃশ্যাক্ষর (২০২০, সিদ্ধার্থ দাসের সাথে যুগলবন্দী)। 

ঘটনাহদ্দ  


তা দেওয়ার কথায়

মাথা খারাপ দিচ্ছে, খোলস ছেড়ে

চিরতায় গুঁজে থাকা বদনামখণ্ড।


ভেতর গুমোটে

লম্ফ জ্বেলে বসে আছে

তোমার ধিৎকার ধরানো কালি, কার্বাইড 

জন্মদোলে মেজাজ

অন্ত্র পরিষ্কার অর্থে পাকে পড়ে


বিষম রান্নাঘরে আলতো ধোঁকা এ মধ্যমা, ফুলে ঢোল...


সব খুলে বলতে গিয়ে

আমার লোম লবণ তছনছ।


পাকতে এসে ফুরিয়ে যাওয়া ঘটনা,

সীমায় জড়ানো সাপে লঙ্কাবাষ্প; 

গর্ত ছেনে ল্যাজে খেলাচ্ছে জাতভাইকে।

পেট ভর্তি অস্ত্র নিয়ে

জাতভাই আমার কথায় থাকেন

টুঁটি রঙ করতে আসেন অসময়ের শুরুতে…


মোড়ে নাকি মোচড়ে, কোথাও একটা লুকিয়ে আছে মণি,

দূরত্বে বেজায় সেজে ওঠে সে।

আতরগাঢ়।


প্রয়োজনের কাদা তখনো ডোবায় ফলছে।

চাপা দেওয়ার তাল ঠোকেন জাতভাই

বিরতির ধোঁয়া ও ঢেঁকুর সমেত।

কিছু একটা খোয়া যাচ্ছে এবং টেরও পাচ্ছে কেউ


বিষম রান্নাঘরে এবার ডালপালানো পত্র, হেজে একশা...


খোঁজ জুড়ে সেই জ্ঞান যেন ফোস্কা

ঝাঁঝ খেয়ে জল খসাবে

আমি এগিয়ে দেবো গলা, গ্রন্থিকথায় লেগে থাকা হরমোন

একটু ঘুরিয়ে নেবো

দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা

তলপেট ব্যথা করা পাথর পাথর ভাব

অন্তঃগাত্রে কানে-পৈতে জাতভাই সাক্ষাৎ


পুরোটাই জলের ওপর ছিল। মনে না লাগার কারণ হিসেবে মোমের কথা তুলতে গিয়েও, পাঁকের কথা চলে আসে। পাঁক দিয়ে মণি অন্ধকার করা হয়ে ওঠে না। কারণ হিসেবে আমার কথা উঠলেও, ব্যবহারে পাঁক তখন ত্বক দখল নিয়েছে। আর জাতভাইয়ের ত্বকে মহাকাব্য লেপছি আমি...

 

খিদে থেকে বিষটুকু

ঝাড়ার কথা

মাথায় গোবর বাড়িয়ে দেয়; 

জাতভাইকে বড়লোকে পেয়েছে,

সে তার গন্তব্য খুঁজতে আসে আমার মাথায়।




দশা 


১.

নামে আতঙ্কের পিন

রাস্তা আগলে আছে।

এর বাইরে সময় দেখতে এসেছে যারা

তাদের মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা

আমার পকেটেই।

পকেটেই থাকে আমার বিজ্ঞ…


২.

গদ্যে কোন কলারের উল্লেখ রাখছি না

ইনিয়ে বিনিয়ে,

হজমের ব্যাপার মুখে ফুটে ওঠে।

কত ধাক্কায় কত কি সুন্দর...

হাতে শ্বাসনালীর ছাপ

কিঞ্চিৎ খিল ধরা পেট

বসত পেরিয়ে উঁকি দিলে 

কলারে খুন জখম নজরে আসে


৩.

জল ভুগিয়ে যাচ্ছে

কোমর এখানে শুকোতে চায় না।

এ ঘরের অন্ধকার

জট চাগাড় দেওয়া বর্ষাকাল;

বর্ষাকাল জুড়ে

গায়ে শাক হয়েছে

দেখা মিলেছে পাকিয়ে যাওয়া জ্বরের,

ঘাম ঘাম পথ

আলোর নিচে স্যাঁতস্যাঁতে পাকস্থলী।


৪.

সরু ক'রে ঢালার কথা ওঠে।

এর আগে

কষ দিয়ে চুইয়ে গেছে ঘিলু,

গলনাঙ্ক পেরনো হয়েছে সাবধানে।

রুমালে কথার মতো মিল 

আর চুমুকে যে শ্বাস সভ্য হচ্ছে 

তা একটু পরে সরু হবে…


৫.

গেলে দেখে নিচ্ছি

চোখের কাচময় মেজাজ।

উতল আসে সম্পত্তিতে,

ফেনাভাসনে গাঢ় করি।

মোজায় ভরে পাচার করি তোমায়,

এই তো হাল

বিষয় থেকে ম্যাদা মারতে যাই...


রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২০

সোহেল ইসলাম

                                         

   


এই সপ্তাহের কবি সোহেল ইসলাম।জন্মঃ ১৯৮৫ ১লা মে । ২০০১ থেকে লেখা শুরু। প্রথম লেখা ব্যাক্তিগত না পাওয়া থেকে।তারপর দেখেছেন শুধু নিজে নয় হাজার হাজার মানুষ না পাওয়ার পুকুরে গলা জলে ডুবে যাচ্ছে,ডুবে আছে, তাদের কাছে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য লেখা। কবির মতে লিখলে ,না বলা গুলো, না বোঝাতে পারা গুলো বলতে পারেন। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "সবাই প্রতিরোধ শিখুক,প্রতিবাদ শিখুক,নিজের দাবি নিজেরাই জানাতে শিখুক।কেউ কারুর কান্না কেঁদে দেয় না।রাজস্থানের গ্রামে রুদালি ভাড়া পাওয়া যায়,কিন্তু আমাদের রুদালি আমরাই হব।কাউকেই এক ছটাক জমি ছাড়বো না।" প্রিয় কবিঃ রঞ্জন আচার্য। প্রিয় বই : সম্পর্ক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - আব্বাচরিত(প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর, ২০১৮।দ্বিতীয় প্রকাশ : এপ্রিল,২০১৯ প্রকাশক : নাটমন্দির)।লেখা 'উত্তর দক্ষিণ' পত্রিকাতে শুরু,আজও সে পত্রিকার সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন।আসুন পড়ি তার কবিতা I

সাতে সমুদ্র
সোহেল ইসলাম
১.
যেদিন দুজনে নদী পার করলাম
পায়ে বালি নিয়ে
নতুন ঠিকানার নেশায়,
আড়চোখে তাকাল পৃথিবী
হলুদ আলোটা ধরতে যাবো যেই
বিকেল লুকিয়ে নিল

আমাদের এক হওয়ার উৎসবে
অন্ধকারে শুধু সাঁতার কাটলাম
২.
আবৃত্তি শেখা স্কুলের গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছি
পাশ দিয়ে রিক্সা পার হল
রিক্সার চাকায় পিষে গেল অপেক্ষা

কাপড়ের তারে উড়ে এল দুটো পাখি
মাঝখানে আধভেজা কাপড় আমাদের
বাঁধের রাস্তাটা দেখছে,
ওই রাস্তাতেই
আলাদা হতে হতে মুখ ফিরিয়েছিল
ছায়া ―
        যেন হারমোনিয়ামের দুটো রিড

একটা সাদা                 একটা কালো
৩.
ভাঙা সাইকেলের ছায়া শান বাঁধান পুকুরের মত
শরীরে খয়েরি রঙের শেওলা
অথচ,লোহার কঙ্কালে একদিন জীবনের শিস ছিল
যমুনার স্রোত ছিল 

আজ,
বাজারের ব্যাগ
এতদিনকার চলা পথ
পথের হিসেবেই শুধু বেঁচে থাকা
খোঁজ খবরে আকুল কোনও কাপড়
ঝাড়পোছ করে না
বিশ্বকর্মার ফুল সিঁদুরও পড়ে না কতকাল

নিজের ছায়াকে দূরে পাঠানো
আর কাছে টেনে আনাই এখন তার কাজ
৪.
খন গানের আসরে
সীতার নুপুর খুলে গেছে
রামচন্দ্র ঝুঁকে বসছে মাটিতে
হ্যাজাক লণ্ঠনের আরতিতে
মায়ার হিড়িক―
এ দৃশ্যটা উলের কাটায় আসনে তুলেছিলি,
যত্নে আছে,
কাঁসার থালায় আমন ধানের দুঃখ নিয়ে খেতে বসি

দশভূজা,তখন তুই কোন আসনে 
আমাকে খুঁজিস ?
৫.
সমস্ত কিছু চুলোয় যাক
এভাবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে
ভুলে যাওয়া ঢের ভালো
কিন্তু পারছি না
এর বেশি জানানোর নেই আপাতত

রাস্তা দিয়ে তাকাতে তাকাতে যাই
ফেরার সময়ও তাকিয়ে থাকি
বারান্দায় ফাঁকা টুল
তোমাকে দেখি না

এর সব কিছু
থেকে যাবে―
দেওয়ালের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেড়ে ওঠা
বট পাঁকুড় হয়ে,
শুধু,তুমি আমি থাকব না
৬.
মনে মনে চাইছি
তুমুল বৃষ্টি নামুক
মাঝের গর্ত ভরে যাক জলে
তখন না হয়
সাঁতার কেটে এক হওয়া যাবে
৭.
তুমি যেই মুখ ফেরালে
আমি কলম তুলে নিলাম
কিছু একটা ছিল বলেই না
এই চাওয়া
তুমি মানতেই চাইলে না
সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেট পার করে গেলে
শামুকের খোলা মুখের দিকে ফিরেও তাকালে না

কি আশ্চর্য,এই সম্পর্কের ওঠানামা

রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

কস্তুরী সেন









এই সপ্তাহের কবি কস্তুরী সেন ৷ প্রথম দশকের কবি।  স্নাতকোত্তর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। লেখালিখির শুরু স্কুলজীবনে। পত্রিকাপ্রকাশ ২০১৬য় প্রথম। প্রথম বই, ধীরে বলো অকস্মাৎ, ২০১৭, ধানসিড়ি প্রকাশন। পেয়েছে 'সহজ' সাহিত্য সম্মান। দ্বিতীয় বই নাম নিচ্ছি মাস্টারমশাই, ২০১৯, ধানসিড়ি প্রকাশন। পেয়েছে 'কথাস্বপ্ন পত্রিকা' পুরস্কার এবং 'একুশে' সৃজন সম্মান। নিয়মিত লেখালিখিতে কৃত্তিবাস, বৃষ্টিদিন, কবিসম্মেলন, আবহমান ইত্যাদি পত্রিকা এবং ঐহিক, বাংলালাইভ, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম সহ নানা ওয়েবজিনে। পেশা শিক্ষকতা। তার কিছু কবিতা পড়া যাক ৷
১/  #আয়ু

আমরা কি মেপে রাখব দোরে আয়ু 
উঠোনে বাঁধন
আমরা কি ভরে উঠব স্রোতজলে 
আর সেই জল কাটব আল খুঁড়ব সুবচনীপয়ে
আমরা কি রোগ পার হব 
আর হয়ে বলব -
যা তোমার মারীতেষ্টাইচ্ছেতীব্রনীল
এত কষ্ট সোয়ো না গো, 
দাও দাও অশ্রুমতী গ্রাম

দাও মৃত শস্যগাছ দাও ক্লিষ্ট নভোতলস্বাদ
বিষাদ ও চ্ছলচ্ছল দাও ঋতু সুফসল হবে-
আমাদের দৃঢ়বর্ণ
আমাদের  অন্ধপাঠশালা!
মেপে রাখা ধাতু...
বন্ধু আমরা তো জিহ্বাগুণে এতদূরও
একাকী এলাম!



২/ #ভাঙন
     

বিষাদ লিখব না বলে
দুপুরের পর গিজার, 
বিষাদ লিখব না... 
দেখি আজ নিয়ে তিনদিন ক্যাজুয়াল, 
শীতকাল বিশ্রি লাগে, 
বিষাদ লিখব না, শুধু মেঘ চাই, 
বন্ধু হে পরবাসী, 
মানবেন্দ্র শুনব একা ঘরে...
বিষাদ লিখব না, আজ সকালেই তো কথা হয়েছে...
বন্ধুকে বুঝিয়ে বলব 
ডিপ্রেসড করে দিও না, 
দ্যাখো আমরা এইরকমই!
দ্যাখো আমরা দুপুরবেলা, 
ফ্রিজে সবজি, 
আনন্দবাজারের হেডলাইন

দ্যাখো আমরা এই নিয়ে কতবার, ও কিছুই না

পায়ের তলায় জল, জলের তলায় মাথা তুলি

বিষাদ লিখব না, 

দ্যাখো এরও বেশি আরও কত ভিটে উপড়ে
ভেসে গেছে ছেষট্টির জলে!

৩/ #সহজ
     
 দুর্দিনের এই খুদকুঁড়ো খুব সহজ নাকি...
নদির অতই নিকটে আবার
নিষিদ্ধ ফুল ফুটে উঠবার
অলীক নিয়ম!
মানুষ হয়েই একটি জীবন 
মানুষের কাছে এই বেঁচে থাকা,
সহজ নাকি
জাগ্রত সব রাত্রির পরে অখণ্ড ঘুম
শরীরস্নাতক ভোর, আয়ু, 
ফুল ছিঁড়বার নেশা

বনদেবতার সে নির্বাসন...

সহজ ছিল না
তোমাকে চিনেছি সকলরকমে,
এমন আমার মিথ্যাভাষণ!

৪/ #সুরস্থান
    

অলীক ও অলীক দ্যাখো এত স্মৃতিমাত্র হলে চলে
ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি বান্ধবীর 'আর জানিস কাল মাঝরাতে ও...' ইত্যাকার কথার উত্তরে!
আর দেখেছ অলীক, দ্যাখো 
এইসব খিলখিল এইসব বৃত্তাকার মধুগন্ধী অক্ষরেরা যত 
এসে কে কাকে বলছে পড়ো অমুকের লেখা 
শোনো অমুকের গান, 
গান, ও অলীক দ্যাখো তোমাকেই বলি উফ এত কি দ্রুততা হলে চলে?
এত কি ফাল্গুনমাত্র, ফুটপাথমাত্র, 'আমি কিন্তু পৌঁছে গেছি'
'দাঁড়া দুমিনিটমাত্র!' হলে চলে, 
'এ গান যেখানে সত্য'...সেইখানে তুমি তো জানোই
কোন্ জুলাইমাসের রাত্রি, 
সারারাত্রি সারারাত্রি অন্তরাসঞ্চারী ছাদ আর 
আমি
আমিই তো প্রতিবার দাঁড়াচ্ছি এসে, 
দাঁড়াবই, 
তোমার সমস্ত ফেলে আসা 
তোমার সমস্ত আগামীরও শ্রীপঞ্চমীস্তবে...

৫/#পলাতক_ও_অনুসরণকারী
  

আর এই দরজা ঠেলে ঢুকলেই 
কেমন সকালবেলার রোদে আমার কিশোরী ছোটদিদা যে গান গেয়েছিলেন সেই গান!
সেই ছোটদিদা যাঁরও ডাকনাম ছিল হাসি 
আর প্রায় সেই থেকে তিনি তো আমাদের উমা বসুই, 
উমা বসু হয়ে পরের মোড় ঘুরতেই 
দ্যাখা পাবার কথা ছিল দিলীপকুমারের 
অথচ পরের মোড়ে কিন্তু আর গান নেই কোনও, 
সকাল নেই, সবে বৃষ্টি থেমে গেছে রথের বিকেলে, অঙ্কখাতার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে 
দোতলার জানলা থেকে উড়িয়ে দিচ্ছে ওই যে স্কুলভীতু বালক, 
ওই বালকটি কি আমার বাবার সাতবছর বয়স, 
ভাবতে ভাবতেই পরের বাঁকে হই হই করে ঢুকে পড়ল যারা, তাদের পায়ে ভোরবেলার ময়দান, 
আমেদ ভাল না ধনরাজ ভাল তর্কে তর্কে 
গলার শির ফুটে উঠছে যে কঠিন ছেলেটির 
সন্ধেবেলায় সেই তো মিনতি নামের মেয়েটিকে বলবে ব্রহ্মপুত্র ছেলেবেলার গল্প 
আর মিনতি, মেজজ্যাঠাইমা, 
এই সেদিন অবধি নাম গুলিয়ে ফেললেও 
যিনি একলহমায় বলে ফেলতে পারতেন আত্মীয়স্বজনের বিয়েথা, উৎসব আয়োজনের সব তারিখ, 
তাঁর জন্যও না থেমে এই গান যে শেষপর্যন্ত যাবেটা কোথায়, গিয়ে থামবে কোন চুরাশি সালের সপ্তমীর দিনে 
কিংবা কলামন্দিরের একক সুমনে 
সেসব তো আর এই লেখার হাতে নেই, 
না থাকুক, আমরা যারা অবাক হতে জন্মেছি
বরং ব্রত শুনবার মত করে হাতে তুলে নিই এই আশ্চর্য পানের পাতা 
আর দেখি, অসুখবিসুখ ধারদেনা
মন্দিরমসজিদের ফাঁক গলে
কী অবিশ্বাস্য উপায়ে এক্কাদোক্কা খেলার মতো করে 
এগিয়ে যাচ্ছে একা বেইমান সুর
আর খুব কাছ থেকে না হোক, কিন্তু দূর থেকেই 
চিরদিন সেই পলাতককে অনুসরণ করে যাচ্ছে 
এই লেখার যত 
অক্ষরের পর অক্ষরের পর অক্ষরের পর অক্ষর...

৬/#ফাঁদ
   

এসব কিছুই নয়, অক্ষরবৃত্তগুলি গুনে গুনে দ্যাখা
এসব কিছুই নয় মাত্রা সব এলোমেলো মাপি
এসব কিছুই নয়, বলে ওঠা কী অসহ্য শেষের কবিতা
এসব কিছুই নয়, মুখভার কেন তুমি গিয়েছ বেপাড়া!

শুধু প্রাণ ঝলসে উঠবে, শুধু এই মাত্রাস্থানে ছোঁয়াবে আঙুল
শুধু ভুল ধরে দেবে, শুধু বলবে কী যে বন্দি জীবন হতাশ!

তোমাকে গোপন ক'রে শুষে নেব সেই ঝলসে ওঠা
ভোর নামবে, আমার সমস্ত জুড়ে নতুন কবিতা হবে, তাই
এতেক ঘটিয়ে তুলি অবলার বলে!
অক্ষরে অক্ষরে আমি তোমারই তো নাম নিই মাস্টারমশাই!

৭/ #দোষ
    

ভাষা তো শীতল জল, 
সহসা উতল হয়, বুদ্ধনাটকগানে 
মনের শরীর! 
ভাষা তো কর্পূরগন্ধ, একটি কাঁসার গ্লাসে
লিখে রাখে নামধামছবি...
ভাষা তো গোপনপথ
কে পালায় দিনমানে, 
চিতা থেকে অব্যাহতি গত শতকের!
ভাষা তো প্রেমের কথা, দোষ পায়
কী নাছোড় তবু কিন্তু
আজীবন লিখে যায় কবি!



শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২০

স্নেহাংশু বিকাশ দাস


নিজস্ব ছায়ার প্রতি 
এক
এই যে এখন সকাল হল, ছায়াগুলো হেঁটে গেল কাঠবেড়ালির দিকে। আমি অতীত জড়িয়ে নিচ্ছি আলোয়, চাদর জড়িয়ে নিচ্ছি – এমনকি অলস হাসির মধ্যে লুকিয়ে রাখছি একটা গোটা বালিচক লোকাল। স্টেশন জুড়ে এখন বিস্মৃতির পদাবলি। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিবর্ণ পাতায়। আমার আতসকাচ নেই, সমুদ্র নেই, এমনকি একটা নির্মেঘ আকাশও নেই। অথচ আমি খোলা খাতাটিকে বুকে জড়িয়ে অনর্গল বলে চলেছি অশ্লীল মৃত্যুর কথা। এখন ভিখিরির মতো হাত পেতে আছি। শুকনো পাতার বিষণ্ণতা ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়। শীতের বিকেলে নরম অভিমান পাশে এসে বসে। দু’হাতের মধ্যে তখন নিজের ছায়া, জলপ্রপাতের শব্দ। এখন জানালার পাশে বিপন্ন পলিমাটি জমা করি অকারণ....

দুই

চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করছে আজ। কুয়াশা জমেছে। ধুলো জমেছে। স্মৃতির পাশে এখন বিষণ্ণ কামরাঙা গাছ। গুটিশুটি শুয়ে আছে নিরীহ গিটার। সুর লাগছে না, আবেগ লাগছে না। বারবার সারানো সত্বেও আকাশ ফুটো হয়ে বৃষ্টি নামছে। পৃথিবীর সব সবুজ আজ ভিজে যাবে। দরজায় এখনই তালা দিয়ে দেব। ঘুম পাচ্ছে। অসহায় আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। গোপন সেই পাচিলের কাছে নতজানু হতে হবে। সারারাত ধরে জলপ্রপাতের শব্দ শুনব। একটা চিঠি লিখতে হবে। অন্ধকারময় এক পোস্টকার্ডে সেই চিঠি লিখব। ব্যর্থতা লিখব। ঘুম লিখব। আয় ঘুম...আয় ঘুম...তোমার আঙুলে ঢুকে পড়ছে কামরাঙা ফুল।

তিন

নদী মানেই একটা শীতল ছায়া। প্রায়শই ঘুমিয়ে থাকে বুকের বাম দিকটায়। রোদে ও পিপাসায় জীবন এলোমেলো হয়। ঘুড়ি ডিঙিয়ে ছুটে যায় ভেজা আকাশের দিকে, পাখিদের দিকে। হয়তো বহুদূরবর্তী কেউ ঠিক লক্ষ্য রাখছে। আগামী রাত্রিগুলোকে বলে দেবে কুর্চির ব্যথাতুর তিলটির কথা। সেই তিল মেঘের ভেতরে খেলে বেড়ায়, শুভেচ্ছা জানায় ঘুমের ভেতরে, গভীর শরীরী শুভেচ্ছা। ছায়ার বুকে, নদীর বুকে শোনা যায় জলের গর্জন। ঝড় আসতে পারে। তুমুল ঝড়। তীব্র হাওয়ায় কেঁপে উঠবে পূর্বজন্মের স্মৃতি। সেই জন্মে একটিও নদীর হৃদয়ে বৃষ্টি নামেনি। ভুল করেও ভিজে যায়নি নদীটির চোখ, চোখের পাতা। অভিশপ্ত সেই জীবনের দিকে বারবার ছুটে যাচ্ছে ছেলেটি, মেয়েটিও। ছুটে যাচ্ছে তাদের জীবনের আজব দোলাচল নিয়ে।

শর্মিলা ঘোষ


পরিযায়ী //


মেঘের ওপর বিষ জমেছে 
মানচিত্র ঘিরে বিষাদ, যা কিছু অসমাপ্ত ছিল রাতের আঁধারে হারিয়ে গেছে ছায়াপথ ধরে, 
নক্ষত্ররাজি মিটমিট করে লকডাউনের দিনলিপি লেখে রাতের গভীরে, 
এমনি করে পোশাক বদল করে শরীর একলা হয়ে ;



অবসন্ন বিকেলে মাধবীলতারা 
দুলে যায় ইমন কিংবা আশাবরী রাগে, 
সূর্য পাটে গেলেও সেই তো ফাঁকা ব্যলকনি হা-হুতাশ করে, 
ওপারে হ্যামলিনের বাঁশী আর এপারে লক্ষ্মণরেখা ;



যদি কখনও ইতিহাস লেখা হয় লিখো পরিযায়ী মানুষের কথা, যাদের ভাষা ছিল জঠরেই মৃত, 
এই বিষন্ন সময়ে মুছে ফেলো নোনতা চোখের পানি ,
যা কিছু শুন্য তার ওপরেই লেখো বুনো উল্লাস, 
শাষকের টার্গেট এখন স্থির অবিচল।


Copyright শর্মিলা ঘোষ 
14/04/20

তনিমা হাজরা


#ভালো_থাকিস_তুই


নাওএর উপর ছই, 
সাইদুল, যাস রে কোথায় তুই, 
পেরিয়ে কালবোশেখির ঝড়, 
মাঝি, তুই সাবধানে যাস ঘর।

নদীর জলে ঢেউ, 
মাঝির মনে ভাসে কেউ, 
অপূর্ব এক জুটি,
যেন বকমবকম বিহঙ্গম সে দুটি, 
কলকল হাসি, 
দু'জন পাশাপাশি।। 

বড্ড মন কাড়া,
ভাবতে বসে মাঝি,
কেমন আছে তারা??

সবাই তো নাও এ চড়ে,
ক'জন মাঝির খবর করে, 
মাঝির বসত ঘর, 
মাঝির প্রাণের স্বর,
মাঝির ডাইল-ভাত, 
মাঝির সন্ততি অঙ্গজাত,
কিছু তুচ্ছ কথায় মাখা,
উপহারের নামমাত্র টাকা,
তাতেই মাঝি পুষে রাখে ভালবাসার ঋণ,
একটি স্মৃতিমেদুর দিন।।

তাই তো  মাঝির মন,
আজ বিষম উচাটন, 
মারী যে চারদিক, 
রমজানে রাখে তৌফিক 
মাঝি তুই কেমন করে হলি
তাদের এমন অক্ষয় রফিক। 

আপন বলে কাকে,
যে ব্যথায় খবর রাখে, 
বাজে মাঝির চলভাষ, 
তার কন্ঠে দুশ্চিন্তার ত্রাস।

ওরা জানতে পারে, 
ওদের কথা মাঝির প্রায়ই বড্ড মনে পড়ে, 
হে মন, এ উতল দরিয়ায়
 কি করে কে যে কার আপন,
অহো! কী অমর্ত্য এ ক্ষণ, 
কী অপার্থিব এ বন্ধন, 
কথার গায়ে টুপটুপিয়ে
 কথারা সব ঝরে, 
 ঝাপসা অশ্রুভারে,
 দুখের ভাগ নিলে তা কমে, 
 সুখের ভাগ নিলে তা বাড়ে 
মাঝি, জানবি তুইও ওদের আপন 
তোর এমন সরল প্রাণের 
জোয়ার ভালবাসায় 
লাগলো মননদীতে পূর্ণমাসীর জোছনা-রজত কাঁপন।।

নাওএর উপর ছই, 
সাইদুল, এখন কোন গাঙে রে তুই, 
পেরিয়ে কালবোশেখির ঝড়, 
দোয়া রাখি, 
বন্ধু, যেনো প্রত্যহ সাবধানে তুই ফিরিস নিজের ঘর।। ত নি মা।। 

শব্দার্থঃ 
রমজান- কলুষদহনকারী অগ্নি
তৌফিক - সম্প্রীতি
রফিক -বন্ধু, প্রাণপ্রিয়  ।।।ত নি মা।।

#দেবতার_কান্না 


আচ্ছা তোমাদের সেইসব নানা ধর্মের নানা নামের দেবতারা সব কেমন আছেন এখন,
একবার নিতে চাই ভাই খোঁজ। 

সেই যাঁরা সকাল থেকে নানা উপাচারে  তোমাদের বাধ্য হয়ে ফুলে, দীপে সেজে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করতেন  রোজ।।

তোমরা তাঁদের সামনে যাবে,
 ধূপ দেবে, ধুনো দেবে, ফল দেবে, ফুল দেবে, মোমবাতি দেবে, চাদর চড়াবে, মাথা ঠুকে প্রণামী বাক্সে  ঘুষ দেবে নিজেদের ষোলো আনা ভালো হোক এই প্রার্থনায় ।।

তারপর, স্তবের স্তবকে স্তবকে  বিবিধ ধর্মস্থানগুলি মুখরিত হবে বিবিধ ধর্মগীতিকায়।। 

 দেখো কি পরিমাণ অসহ্য হয়েছো এই সামান্য কদিনের বন্দীত্ব সহ্য করে, 
সেইসব স্বরচিত দেবতাদের কথা ভাবো তো একবার দয়া করে, 
 কেমন আবদ্ধ তারা  চিরকাল তোমাদের যোগ ও সাজশে বদ্ধ গর্ভগৃহে ধর্মকুটিরে, কুটিরে। 

ডাকছে বিপন্ন মানুষ এতবার এত করে, 
তবুও মানুষের ভিড়ে, 
এসে দাঁড়াতে দাওনি তাঁদের নিজেদের ক্ষুদ্রতাদোষে, 
বেঁধে রেখে দিয়েছ তাঁদের কষে, 
মন্দিরে, মসজিদে, গীর্জায়, 
লাগতে দাওনি ধূলো দেবতার পায়, 
চড়িয়ে রেখেছ বাহারী পোশাক সাজ ও গহনাসম্ভার তাঁদের অনিচ্ছুক গায়, 
শিকল দিয়েছ তাঁদের  পায়, 
যেন কিছুতেই তাঁরা কয়েদের পাঁচিল না টপকায়, 
তোমাদের ছুঁৎমার্গ কেটে, 
হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, শিখ,পারসীক ইচ্ছেমতো নানাবিধ  লেবেল দিয়েছ তাঁদের গায়ে জোর করে সেঁটে। 

এত যে মানুষ মরছে থরে থরে, 
তবু্ও প্রহরায় তাঁদের আটকে রেখেছ  ঘরে মনের ক্ষুদ্র গন্ডি করে।।  

মানুষ তো মরণশীল, 
দেবতা যে অমর, অপার।।
তবুও দেখো কী পোড়া ভাগ্য তাঁর
তোমাদের হাতে পড়ে ।। 

তোমাদের হাতে পড়ে, 
জাত যায় তার, 
ঘুষ খেয়ে যেতে হয় হররোজ
 প্রণামী বাক্সের ফেরে।

দেবতার মহত্ত্ব নিয়েছে
ডাকাতের মতো কেড়ে,
ভক্তের ভক্তির চূড়ান্ত  নীচতা 
এসে, হায়।

দেবতা বলেছেন  বারবার তোমাদের কাছে উচ্চৈঃস্বরে কেঁদে, 
দেবত্ব নয়, দেবত্ব নয়, অমরত্ব নয়,
এ শিকলের, এ গরাদের হোক ক্ষয়,
অগণিত মানুষের মাঝে 
দেবতাও পরিপূর্ণ এক সামান্য মানুষই হতে চায়।।।।ত নি মা।। 

#পুনরুত্থান 

যীশু উঠলেন 
মৃত্যুকে জয় করে, 
যন্ত্রণাকে মুছে ফেলে গা থেকে, 
যীশু উঠলেন কবরের বল্কলে, 
পুরনো শরীর ঝেড়ে ফেলে রেখে। 

যীশু উঠলেন যেমন করে 
ভুলগুলি করে ক্ষমা 
মহামানবেরা অভিব্যক্তিপথ খোঁজে, 
যীশু উঠলেন মানবের প্রতিনিধি 
যেন মাশুল গুনেছে খেটে খাওয়া তার রোজে।

যীশু উঠলেন ভোরের আলোর মতো 
আকাশের গায়ে অবিনশ্বর দম্ভে,
যীশু উঠলেন প্রাণের প্রেরণায় 
সৃষ্টির প্রারম্ভে।।

যীশু উঠলেন, যীশু উঠবেন, 
পৃথিবীর বুক চিরে, 
যীশু উঠলেন,যীশু উঠবেন 
সবুজের সারি ঘিরে।।

যীশু উঠছেন ধমনীর দ্রুত রক্তপ্রবাহ যেমন হৃদয়ের থেকে প্রাণবায়ু নিয়ে প্রতি কোষে কোষে ছোটে,
যীশু উঠবেন যেমন করে গায়ের অজস্র শুঁয়োগুলি ঝেড়ে প্রজাপতি তার ডানা দুটি মেলে গুটির গরাদ কেটে।।

যীশু উঠবেন হিংসার শেষে বিজয়ী বিবেকদ্যুতি, 
যীশু উঠবেন শোক ভেদ করে আশার আলোর প্রতি।। 

শবদেহ ছেড়ে যীশুর উত্থান 
আসলে শোক জয় করে জীবনেরই গান।।

মৃত্যুর অন্তিম তীরে বসে বসে জীবনের টংকার,
তাই যীশু উঠলেন, যীশু উঠছেন, যীশু উঠবেন বারবার।।

গর্ভিনী ধরার সন্তানদের নিঃশেষ করে, বিলুপ্ত করে, 
এমন সাধ্য কার??
ওরে, এমন সাধ্য কার??? ত নি মা।। 
 

পিয়ালী বসু


হিলিয়াম  
__________

( ১ )

পূর্ণ হয়ে উঠছে আমার ফুসফুস
সময়ের সর্বগ্রাসী শূন্যতার মতো তোমার ভারহীন হৃদয় আকণ্ঠ ভরে উঠছে, বিষের তীব্র ধোঁয়ায়।

ভালোবাসার সুষম স্পন্দন 
এখন বিবর্ণ, পাণ্ডুর ঝাপসা হতে থাকা
একরৈখিক জীবন কে হাফ ফার্লং দূরত্বে মাপে

ডিজএরেড হয়ে চলেছে ক্রমশ, আমার যাবতীয় প্রথম প্রতিশ্রুতিগুলি। কপাল থেকে বুক হয়ে নাভি পর্যন্ত গড়িয়ে নামছে কবন্ধ সময়...। 

( ২ ) 

কেউ যেন আমার গায়ে অন্ধকার চাপিয়ে দিয়ে গেছে
সব জেনে, বুঝেও আমি নিশ্চুপ আছি, কারণ এখনো মিরাক্যালে বিশ্বাস করি। 

আসলে যে কোন নেগেটিভ ফোর্সে আমি বিশ্বাস করি না, তাই, মাছের চোখের দিকে টার্গেট করে তীর ছোঁড়ার প্রয়াসে যাইনি কোনোদিন।

আজকাল সূত্রহীন হয়ে পড়ে
প্রতিফলনের সমস্ত সংজ্ঞারা
তাই, যন্ত্রণার নুন জড়ো করে রাখি, ফাল্গুন মৌসমে

তবুও তুমি জেনে নাও, তিমিরসন্ধ্যার দেশে ' I Quit’- নয়, বরং আত্মহত্যার লিরিকের পাশে, আজও সমভাবে সহাবস্থান করে, ভাষাহীন নৈঃশব্দ্যের হলুদ রূপটান।

কৌশিক চক্রবর্ত্তী


আঙুল


বিক্রিবাট্টা ভীষণ কমে গেছে
তাই থরে থরে আঙুল খুলে সাজিয়ে রেখেছি আমি
তারাও বিপথগামী ছিল
কিন্তু গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় সই পাওয়া যায়নি একটাও...

হাতের কবলে হাত, ডুবন্ত শরীর-
আনাচেকানাচে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবার তাগিদ
এসবের মধ্যে আঙুলহীন মানুষের সংখ্যাই বেশি...

বইমেলার মতই ভীষণ প্রয়োজন একটা পূর্ণাঙ্গ শরীরমেলার
যেখানে শখের অঙ্গ কিনতে মুহূর্মুহু ভিড় জমাবেন শরীরপ্রেমীরা
কোনোটা রঙিন, কোনোটাতে জড়ানো রয়েছে গামছা-

তখনও আঙুল তুলে কেউ আর প্রশ্নটা করে উঠতে পারে নি
যাদের পাশে শোয়ানো রয়েছে সংশ্লিষ্ট শরীর 
শুধুমাত্র সেইসব আঙুলের দর আকাশছোঁয়া কেন!


পুড়ে যাওয়া জামা
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

কাল সমস্ত বুক জুড়ে খুঁজেছি ইতস্তত খই
তন্নতন্ন করে খুঁজেছি সুগন্ধী-চন্দন আর গোলাপের বীজ
পরিবর্তে যতটা কুড়িয়ে এনেছি কাদামাটি 
তার মধ্যে সিংহভাগই পরজীবি গাছ -
সভ্যতার নাম দেওয়া থেকে শুরু করে আয়নায় চিড় খাওয়ার দাগ
কোনোটাতেই আমার কোনো ভুমিকা ছিল না কোনোদিন...

ঘাসেরা বিনিময় করত মাথা তোলার গর্বিত সংস্কৃতি 
তারাও প্রতিটা পায়ের ছাপ কিভাবে শুকিয়ে তুলত ঝড়বৃষ্টির অব্যবহিত পরেও--

খোঁজ নেওয়া শুরু হবে এবার
কেউ ডেকে বলবে আমার জন্য তোলা আছে ঘর
কেউ হঠাৎ আদর করে শরীরে গলাতে যাবে জামা
অথচ তারা কেউ বুঝবে না বন্ধ ঘরে আমি এখনো আয়নার সামনে 
কিভাবে সাবলীল খুঁড়তে চেয়েছি গোপন সুড়ঙ্গ...
তাই শুয়ে থাকলেও তুমি অনায়াসে ছিঁড়ে নিতে পারো আমার পোশাক
ভালোবাসবার জন্য আমি অনেক আগেই নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে নিতাম রোজ।


এই শহর
কৌশিক চক্রবর্ত্তী 

আজ একটা শহর কিনলাম
যে শহরে একটাও গোপনীয় নর্দমা নেই
স্নানের সময় একটাও মানুষ 
গলে যায় না শূন্য ম্যানহল খুঁজে
গা ভেজানোর পর তারা সকলেই
বেমালুম চেটে নেয় রোদের সাম্পান

একমাত্র নর্দমার অভাবই
প্রতিটি নাগরিককে বেছে দেয় পথ
কোনোকিছু হারানোর ভয় নেই বলে
আমিও গ্যাসের আলো সরিয়ে
নিয়মিত পরে নিয়েছি রক্ষার কবজ

আজ একটা শহর কিনলাম 
যে শহরে একটাও ঝোলাবারান্দা নেই
রাতের অন্ধকারে কোনও বাবা
নিজের অজান্তেই ছেলেকে 
ছুঁড়ে দেয়নি রঙিন ফুটবল

আজও এই শহর জেনে এসেছে
কেবল অন্ধকারের কোনো বিবর্তন নেই
নিজস্বতার জন্য কখনো বারান্দা
অথবা নর্দমা খুঁজতে হলে
আমাদের আজও ছেড়ে আসতে হয় শহর...

বলে রাখি...
এই শহরে অন্ধকার যথারীতি না বলেই আসে...







সুজন ঘোষ

করোনাকালের ক্রান্তি

ভীষণ রকম বদলে গেছে সব!
আমার এ শহরে সুনসান নীরবতা
প্রশস্ত রাজপথে নেই কলরব।।

অলিতে-গলিতে নেই রিকশার শব্দ!
মিরপুর থেকে মতিঝিল,
নিজের নিঃশ্বাসেও চমকে উঠি, এমনই স্তব্ধ ।।

করোনাকালের ক্রান্তিতে মানুশের গন্ধমাখা এ শহরে,
হটাৎ থেমে যাওয়া যন্ত্রের আড়ালে,
ডেকে ওঠে এক সুকণ্ঠি পাখি, জনমানবহীন প্রান্তরে।।

এ শহরে আছে এমন পাখি জানিনি কখনও আগে !
ভীষণ ভয়ে বদলে গেছে সব, করোনাকালে;
আপাদমস্তক ভীষণ রকম নিরবতা আজ, শাহবাগে ।।


ঠোঁট শুকিয়ে আসে

এই বোশেখে না হয় আমি
বদ্ধ রবো ঘরে,
আবার তোমায় পাবো কি এই
কোয়ারেন্টাইন কাল পরে?
নাখ-মুখ আমার ঢেকে আছে
মহামারীর ত্রাসে,
আবেগ-ঘন অপেক্ষায় বাধা
ঠোঁট শুকিয়ে আসে।।
ঠিক কবে সেই ঋতুর মাসে
জানি বৃষ্টি এলে পর,
সব দ্বিধারা ভাসিয়ে দেবে
মন-কেমনের বর।।

করোনাকাল পরে

সকল মহামারী ত্রাস শেষে,
আমাদের অব্যক্ত সব কথা,
আবারও বলবো আকাশ তলে এসে।।

বৃষ্টি ঝরিয়ে ধুয়ে দেব সব যুদ্ধ জয়ের দাগ,
সন্ধ্যা ছায়ায় ভালোবাসা আবার
জানাবে তার অনুরাগ।।

আমাদের হাসিতে আবার নামবে রাত্রি
সকালে অ্যালার্ম ডাকে,
সারাদিনব্যাপী ফুটন্ত চায়ে, কত গল্প জমবে ফাকে।।

দিনশেষে আরো সহজ হবো, কিংবা আরও জটিল হবো পাছে।
তবুও না হয় বসবো আবার,
আরও আরো হৃদয়ের কাছে।।

শনিবার, ২২ জুন, ২০১৯

মেঘশ্রী ব্যানার্জী







১) অবসর

বারমাস্যার খোপে খোপে 
যত্ন করে সাজিয়ে নিয়েছি ব্যস্ততা
কখনও তার নাম দিয়েছি পরিস্থিতি, কখনও বা কাজ।
তোমার মুখের ছবি আজও ভেসে বেড়ায় অবসরে -
ব্যস্ত মুহূর্তগুলো বেঁচে একখন্ড নিরুপদ্রব নিশ্চিন্ত 
অবসর ছুঁতে চাওয়ার চেষ্টাই বুঝি আলেয়া। 



২) অবিরাম

ঢেউ অবিরাম, আবার সময়ও
ঢেউ অল্প থেমে আসা-যাওয়ার মাঝে 
মেপে দেয় প্রশ্বাসের সময়...
সময় থামে না, থামতে দেয় না। 
প্রতি পলে বয়স বাড়ে তার,
বুঝে নেয় প্রতি মুহূর্তের হিসাব!
নিত্য সমস্যার যাতায়াত হোক ঢেউয়ের মত, 
সময়ের মত নয়।



৩) ঢেউ

সাগরপাড়ে আছড়ে পড়ে ঢেউ প্রবল উচ্ছ্বাসে, 
ঢেউ কি জানে সে কেবল ডাকহরকরা?
শান্ত নীলকান্ত বুকের ঝিনুক-বার্তা বয়ে আনা -
আর নগর-সভ্যতার মালিন্য মুছে নিয়ে যাওয়া জলধিগর্ভে - এই তার যাপন।
উচ্ছাসের স্থায়িত্ব কাচ-ভাঙা শব্দের মতই ক্ষণিকের।
শুভ্র জলকণার ফেনিল মেঘ হয়ে লাফিয়ে ওঠার পরেরটুকুই মিলিয়ে যাওয়া এক লহমায়।

দীপাঞ্জন মাইতি




কথক কথা
-

অভ‍্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মন্দ নয়।
তবু আজন্ম মৃত‍্যুর অপেক্ষার থেকে
নিহিত নিহতের কথায় আশঙ্কার চিহ্নকে
পৃথক করতে পারি না বলেই
আমায় কবি হিসেবে গ্রাহ‍্য করি না আমি।
মরণোত্তর পদোন্নতির তেমন কোনো আশাও দেখতে পাই না;
তবে! এর দায় কারযে লড়তে লড়তে মরে গেল?
না কি যে মরার ভয়ে...
আমার তো নিজের কোনো গল্প নেই।
মৃত কবির প্রতি মাফিনামা

মেরুদন্ড বড় বিষম বস্তু.. সবার তা থাকে না,
উত্তরাধিকার সূত্রে যারা রোদ জল ভালোবাসা পেয়ে বেড়ে ওঠে -
তারা সবাই ব‍্যাটন তুলে নিতে পারে না;
ফলে মৃত‍্যু হয়। মৃত‍্যু হয় প্রজন্মেরমৃত‍্যু হয় প্রজন্ম কবির।
তোমার পদচিহ্নের গভীরে গাহন পূণ‍্যস্নানসমতার কিনারে দাঁড়ালে
আমার প্রায়শই নিজেকে হন্তারক মনে হয়.. আর্তনাদ চিরে দেয় হৃদয়,
"
ক্ষমা করো হে কালশ্রেষ্ঠ তোমার মৃত‍্যু আসলে হত‍্যা
তোমার মৃত‍্যু মোদের স্বভাবে.. তোমার মৃত‍্যু স্বাভাবিক নয়।"