জয়তী রায় মুনিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জয়তী রায় মুনিয়া লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                         


                



মনের ব্যাংক

আজ বলব মনের ব্যাংকিংয়ের কথা। ব্যাংক শব্দটা জড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। নিচুতলা থেকে উঁচুতলা ব্যাংকের দ্বারস্থ সবাই। কারণ, জমা থাক কিছু পুঁজি। অসময়ে কাজে লাগবে। বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। 

জমা করা ,জড়ো করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আরো নানান দিক আছে এই জমিয়ে রাখার ব্যাপারে। যেমন , কথায় কথায় আমরা বলি, এনার্জি বাঁচিয়ে রাখতে। একটু ঘুমিয়ে নিতে। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। পরে কাজ করার সময় বাঁচিয়ে রাখা এনার্জি সাহায্য করবে। ঠিকমত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সঠিক ব্যায়াম করে শরীর ঝরঝর তাজা করে ফেলার উপদেশ সর্বক্ষণ শুনতে হয়। 

তাহলে মনের ব্যাংকিং কি? মনের ঘরের জমা খরচের হিসেব ঠিক কি রকম?

     ******

  মুশকিল হল, ব্যবহারিক জগৎ আর তার উপযোগিতা নিয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিকেশ করে চলেছি। নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছি। চারিদিকে সবকিছু সামলে চলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে বাহবা দিচ্ছি। আজ এমন দুজন মহিলার  গল্প করি। গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 

 প্রথমজন  বাংলাদেশ হতে প্রচুর সংগ্রাম করে কলকাতা এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। জিরো থেকে একেবারে হিরো। ছেলেগুলো হীরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সেইসঙ্গে মা অন্ত প্রাণ। স্বামী অকালে স্বর্গে চলে গেলেও ওনার কোনও  সমস্যা হয় নি। উনি প্রচুর পুজো করতেন। উপোস করতেন। এবং কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এককথায় চতুর যাকে বলে। চারিদিকে সতর্ক নজর। টাকা পয়সা অনেক। ছেলেরা হাতের মুঠোয়। ধন্য ধন্য করত লোক। 

  আজ তিনি বিছানায় শয্যাগত। ছেলেরা রাজকীয় চিকিৎসায় রেখেছে। তার স্মৃতি ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে। কথা বলেন। কথার বেশিরভাগ হল অশ্রাব্য গালি। নোংরা কথার তুবড়ি। নিজের মনেই বলে যান। আয়া নাকি ওনার গোপনাঙ্গে হাত দিয়েছে। একটার পর একটা আয়া বদল। ওনার গালি গালাজ চলতেই থাকে। 


       গল্প ২

____________

 আরেক মহিলার গল্প। সংগ্রামের ইতিহাস দুজনের প্রায় সমান। সাফল্যের বিচারে দ্বিতীয়মহিলা অনেক কম। অর্থভাগ্য ভালো নয়। সন্তান ভাগ্য ভালো নয়। দিনান্তে নিজের ভাত নিজের ফুটিয়ে খাওয়া ছিল তার ভবিতব্য। 

********

এই মহিলা দুজনকে তাদের মধ্যবয়স থেকে দেখেছি। খুব কাছের থেকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করতাম। দুজন মহিলা আমার কাছের মানুষ। দুজনেই বিধবা। দুজনেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

আমি লক্ষ্য করতাম ওদের চলাফেরা, কথাবার্তা। সফল মহিলার চলা ফেরার মধ্যে উগ্র অহঙ্কার ফেটে পড়ত। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সর্বদা অবিশ্বাস। ভুরু দুটি কুঁচকে আছে। নিরামিষ খেলেও প্রচুর ফল দুধ হরলিকস একেবারে সময় মেপে খান। বাড়িঘর নিয়ে ভীষন সচেতন। সিল্কের শাড়ী, গহনা।  অপর মহিলা একবেলা আহার করেন। যত অল্প খাওয়া যায়। নিরন্তর মুখে হাসি। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যে সন্তান রোজ আঘাত করছে তার জন্য প্রার্থনা। অচেনা লোকের জন্যেও শুভ কামনা। সাদাথান ছাড়া কোনো কিছু নেই। এমনকি একটুকরো সোনা পযর্ন্ত নেই। আমি শুনেছি, সফল মহিলা ব্যঙ্গ করে বলতেন," তুমি ভাই ভীষন বোকা। 

উত্তরে মহিলা হাসতেন। বলতেন," আমি খুব শান্তিতে আছি। 

ব্যর্থ মহিলা সুস্থ থেকে সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছেন। এক ফোঁটা সেবা নেননি কারো কাছ হতে। সফল মহিলা বিছানায়। সাধের বাড়িতে রাজত্ব এখন আযাদের, ছেলেরা দেখাশোনা করে কিন্তু থাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সিল্কের শাড়ির হিসাব নেই। গহনা মেয়ের হেফাজতে। কোনো জ্ঞানই নেই। গালাগালি কেন দেন, সেটা এখন আমি জানি। এ বিষয়ে পড়াশুনো করে বুঝেছি, মনের ব্যাংকে যা যা সঞ্চয় হয়ে থাকবে সেগুলো অবচেতনে বেরিয়ে আসে।ওই যে ওনার স্বভাব, যাকে উনি লালন করেছিলেন সযত্নে, মনে করতেন এটাই উচিত। সন্ধ্যে হলেই বাংলা সিরিয়াল দেখতেন। রাতে সেই সিরিয়ালের গল্প বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা ওনার মন একটাই সংকেত দিত সেটা হল, কোথাও বিশ্বাস নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। এটা হয়ত কোনো অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার একটা উপায়। কিন্তু সে উপায় ঠিক না ভুল সেটার প্রমাণ দেয় সময়। উনি মারা গেলে কি হত জানি না তবে বেঁচে আছেন এবং নেগেটিভ স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে আছেন। ওনার মনের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে অবিশ্বাসের পুঁজি। অহঙ্কার। ক্ষমতা লিপ্সা। সেটাই এখন ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছে। 

 মন : ভীষণ শক্তিশালী যন্ত্র। সমস্ত রেখে দেয় নিজের ভিতর। মূল কথা হল আনন্দ এবং এনার্জি। ওই যে অসফল মহিলা , উনি ভিতরে কখনো ক্ষোভ পুষে রাখেন নি। যা পেয়েছেন যতটুকু পেয়েছেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তৃপ্ত থেকেছেন। সন্তান ওনাকে আঘাত করলেও উনি তার জন্য প্রার্থনা করেছেন আর ওই সফল মহিলার সন্তান মাথায় করে রাখলেও উনি ভাবতেন যথেষ্ট করা হচ্ছে না। সুতরাং, সচেতন থাকতেই হবে। আমরা সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করি মন নিয়ে। যা পারি, যেভাবে পারি ঢোকাতে থাকি। রাগ অভিমান দুঃখ ক্ষোভ ... যেন এটা আমার ডাস্টবিন। নাহ্। এই মন আমার বর্ম। আমার অস্ত্র। যা খুশি ভাবে তাকে ব্যবহার করার আগে ভাবতে হবে বইকি। এই ভাবনা আমাদের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেবে। শরীরের উপর কত নজর ! চুল এই করো, ত্বক ওই করো। কিন্তু, চিন্তন? মন? সারাদিন তাকে কি দিচ্ছি?

এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। লেখালিখি কথাটা বলতে এবং শুনতে যত সুন্দর হোক না কেন, সে জগৎ কত ভয়ঙ্কর সে কথা সকলেই জানি। দিনরাত সেখানে অবিশ্বাস আর দুর্নামের খেলা চলছে। একে অপরের নামে বলছি আমরা। পোস্ট লিখছি। ঠকছি। ঠকাচ্ছি। সারাদিন এইভাবেই ভাবছি কি করে আরো আরো লাভবান হওয়া যায়। 

 ঈর্ষা হোক মহতের তরে... 

    কালজয়ী কবি এমন বলতে পারেন। সৃষ্টির মূল কথা ঈর্ষা। 

প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে কাজের আনন্দ কিসের? কিন্তু তার মানে এই নয় যে , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা প্রতিদ্বন্দ্বী র কথা ভাবতে থাকব অথবা অপর কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ক্ষোভ আর হতাশায় ডুবে থাকব। 

  যদি প্রশ্ন হয়, ব্যবসা করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হবে, না হলে সফলতা আসবে না। সব সফল মানুষ কোনো না কোনো সময় অন্যায় করেছেন এবং করছেন। তবে? তারা কি ভালো নেই? সাধু আর বোকা হয়ে এই দুনিয়ায় কোনো লাভ নেই। 

 সমস্যা হল অন্য জায়গায়। জীবনে লাভ হচ্ছে না ক্ষতি সেটা বুঝতে যখন পারি তখন দেরি হয়ে যায় অনেক। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা পরিমিত, তার উপর অযথা ভার চাপিয়ে গেলে এক সময় সে বিদ্রোহ করে, মনের জমির নেওয়ার কিছু সীমিত ক্ষমতা আছে। তাকে এনার্জি তে ভরপুর রাখতে হয়। নেগেটিভ কথা আর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিতে দিতে এক সময় বিদ্রোহ করে সে। 

 শেষের সে দিন কে দেখেছে? লোকে বলবে ভালো লোক কি কষ্ট পায় না? কষ্ট কখনো ভালো মন্দ বিচার করে না। যার পাওয়ার সে পাবেই। কথা হল, মনের ধারণ ক্ষমতা বা শক্তি যার বেশি সে কষ্ট নিয়েও ভালো থাকে। সুন্দর ভাবনা থাকার ফলে তার ভিতর তৈরি হয় পজিটিভ এনার্জি। ওই এনার্জি সাহায্য করে। বয়স হলে শরীরের যন্ত্রপাতির ক্ষয় হবে। কালের নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, মনের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন এনার্জি যোগান দিলে মন সতেজ থাকবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মন ব্যাংকিং। জমা করতে হবে ভালো ভাবনা। সুন্দর চিন্তা। সুন্দর সঙ্গ। সুদে আসলে ফেরত পাওয়া যাবে সময় হলে। 

 টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে ফেলতে হয়। মন বাঁচিয়ে রাখতে হয় বইকি। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন কোন দিক আমাকে বিরক্ত করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গ আমাকে ক্লান্ত করে তুলছে ... এগুলো সুদূর ভবিষ্যতে  এনার্জি ব্যাংকের পুঁজি নষ্ট করে দেবে। সাবধান হতে হবে এখন থেকে। 

ভালো লেখক হওয়ার জন্য নামী পাবলিশার হওয়ার জন্য প্রতিদিন এই যে ধার করা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, ভাবছি কি ভবিষ্যত কি নিয়ে আসছে? অকারণ এনার্জি ক্ষয় করে লাভ নেই। বাঁচিয়ে রাখতে শিখতে হবে। জীবন থাকলে কোনো না কোনো দিকে আমাদের পথ খুলেই যাবে। 

  নিজে আনন্দে থাকলে জগৎ আনন্দময়। এমন চিন্তাশক্তি সবল থাক যার ফলে ভালো হতে বাধ্য। মনের ব্যাংকে বেড়ে উঠুক মঙ্গলধ্বনি। একদিন সেটা কাজে লাগবে আমাদের।।


চিত্রঋণ - অন্তর্জাল

রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                    



নিন্দার ফান্ডা 



নিন্দা অপবাদ সহ্য করতে হয়নি এমন মানুষ বিরল। কোন জগতে নেই? এই সেদিন আমাদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে জানতে পারলাম, শঙ্খ ঘোষের মত মানুষের নামে প্রবল কুৎসা রটনা চলছে। জীবিত কালেও ছিল এবং এখন তাঁর মৃত্যুর পরে! লেখার ভুল ধরা থেকে চারিত্রিক কলঙ্ক ... কিছু বাকি নেই। যারা ওখানে প্রতিবাদ করতে গেছে তাদের তুলোধনা করা হচ্ছে। 

একদল লোক সর্বদাই মজা লোটার জন্য কুৎসায় অংশ গ্রহণ করে, তারা সবচেয়ে ঘৃণিত। ইধার এবং উধার এই রকম চরিত্র কোনো জায়গায় ঠাঁই পায়না। 


 এবার বলি, আমাদের আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। সারাজীবন জ্বলেছেন তিনি। লেখার সমালোচনা থেকে চরিত্র... জীবিত এবং মৃত কোনো অবস্থায় রেহাই দেওয়া হয়নি তাঁকে। কি হত? যদি কলম নামিয়ে রাখতেন? আজ কোথায় থাকত বাঙালি? সামনে তেল মেরে পিছনে নিন্দে করতে এতটুকু লজ্জা বোধ হয়নি বাঙালির!

🔥🔥🔥🔥🔥


    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আপামর চিত্ত চেতনার প্রতিটি কোষ ঝঙ্কৃত হয় এই একটি নামে। শোক দুঃখ আনন্দ,প্রেম বিরহে বিষাদ... যখন যেমন মনে হয়, হাত বাড়ালেই আছেন তিনি।  আজো পর্যন্ত কত মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে তাঁর জন্য। রোদ ঝড় জল ... তিনি আছেন ...আশ্রয়ের মত। 

   এখন ২০২০ সাল। করোনা আক্রান্ত পৃথিবী। তার মাঝেও মহাসমারোহে  পালন করা হয় রবিঠাকুরের জন্মদিন। 

‌ভাবলে অবাক লাগে , আজ যাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা , একদিন তাঁকে নির্মম ভাবে সহ্য করতে হয়েছিল নিন্দুকের চপটাঘাত। বিষ  নিন্দার আঘাতে জর্জরিত রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন --    :এমন অনবরত , এমন অকরুণ, এমন অপ্রতিহত অসসম্মাননা আমার মত আর কোনো সাহিত্যিককে সইতে হয় নি! ( ১৩৩৮ সাল/ নোবেল পুরস্কার লাভ করার পরে)

‌🙏🙏🙏🙏

।          মহৎ সৃষ্টি করতে গেলে গোলাপ পাঁপড়ি বিছিয়ে রাখা পথ থাকে না কোথাও। প্রত্যেকে তাদের নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে জানেন কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হয় কাঁটার আঘাতে। অযথা কুৎসা অযথা মিথ্যা রটনা  ভয়ংকর আক্রমণ ... বারবার আছড়ে পড়ে সুনামির ঢেউয়ের মত। নিজের চেনা বৃত্ত হতেই আঘাত আসে বেশি।  নিজের কাছের লোকের হাতে লকলক করে ঈর্ষার ছুরি। 

    আজকেও যারা চেষ্টা করছেন দুর্দিনে বাংলা বই মাথা তুলে দাঁড়ায় যেন, কত ভাবে হেনস্থা হচ্ছে তারা!    

     ❤️❤️❤️      রবীন্দ্রনাথ আক্রান্ত ছিলেন যাঁদের হাতে, সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সেই সময় খ্যাতির শিখরে আছেন তাঁরাও। মানুষ তাঁদের মান দিচ্ছে। তাঁদের রচনা ছড়িয়ে পড়ছে দেশে বিদেশে। নাহ্। তাতে শান্তি নেই। ঠাকুর পরিবারের ওই রবি নামতেই হবে নিচে। নামতেই হবে নোংরা পাঁকে। অদ্ভুত এই বিকৃত মানসিকতার শিকার ছিল তৎকালীন সমাজের বহু বিখ্যাত লোক। কিন্তু কেন? কেন বহন করে মানুষ নিন্দা নামক বিষ? এর কারণ জানতে হলে, একটু আলোচনা করা যাক অন্যদিক দিয়ে। 

 এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন:

‌   :পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং ব্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে যে সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে। .....

       ‌বস্তুত নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কী থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, সে ভালো কাজের দাম কী! একটা ভালো কিছু লিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে! ...‌কেবল, প্রার্থনা এই যে, এরূপ নিন্দা যাহার স্বভাবসিদ্ধ সেই দুর্ভাগাকে যেন দয়া করিতে পারি।🙏


‌      দীর্ঘ উক্তি তুলে ধরলাম। কতখানি রক্তাক্ত হৃদয় থেকে তিনি এমন কথা বলেছেন। সহ্য করেছেন কত মিথ্যা লাঞ্ছনা! 

‌১৯২২ সাল। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়  নিজের লেখা গ্রন্থ :রবীন্দ্রছন্দ: 

  তার ভূমিকায় লিখলেন: 

‌      :রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ উপহাস কুৎসা কটু বাক্য গালি গালাজ করিতে দেশে অপরিমিত মূলধনে একটি স্বদেশী যৌথ কারবার স্থাপিত হইয়াছে।


   যৌথ করবার এই মুহূর্তে , লকডাউনের অলস বাজারে এমন যৌথ কারবার রমরম করে চলছে। তবে, বিন্দাস থাকুন। আপনি অন্যায় না করলে কেউ কিছু করতে পারবে না। কুৎসার এত শক্তি নেই যে সরল সৎ মানুষের চুল স্পর্শ করার  আরো উদাহরণ দিতে পারি। কুৎসা রটনা কারি এখন সব কোথায়?

    ‌১৮৮৮ সাল। কালীপ্রসন্ন কাব্য বিশারদ একটি ব্যাঙ্গাত্মক ছড়ার বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম -- মিঠেকড়া।

    প্যারোডি করে লিখলেন সেই অযোগ্য কবি: 

‌ উড়িসনে রে পায়রা কবি

‌ খোপের ভিতর থাক ঢাকা

‌  তোর বকবকমম আর ফোঁস ফোঁসানি

‌তাও কবিত্বের ভাব মাখা।...

‌ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ 

‌ বঙ্গের আদর্শ কবি 

‌ শিখেছি তাহারে দেখি

‌  তোরা কেউ কবি হবি? 


‌ পাঠক! এখুনি চমকে যেও না। আরো অজস্র তীর আসছে ছুটে। বিখ্যাত কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। এমন সব কটূক্তি করতেন যে, কানে আঙ্গুল দিতে হয়। 

‌আনন্দ বিদায় 

   নামক একটি ব্যঙ্গ নাটিকায় তাঁর ( ডি এ ল রয়) আক্রমণের ভাষা স্তম্ভিত করে। 

‌:একাধারে কবি, অধিকারী , ঋষি কিবা ত্যাগ, কিবা দান

‌ পরিষৎ জল ছিটিয়ে দিলেই ( কবিবর) স্বর্গে উঠিয়া যান।  ‌সুহাসচন্দ্র রায়। তিনি সমালোচনা বিজ্ঞান প্রথম ভাগ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। 

‌" রবি পরম গুরু। তিনি হেলিলে হেলিবে। দুলিলে দুলিবে।"

      ‌ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। দেশবন্ধু সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকায় বিরোধিতা হত রবীন্দ্রনাথের!

‌বহুলোক এই ধরণের মন্তব্য করতে পিছপা হত না যে, বড়লোকের ছেলে। এত প্রতিপত্তি। কথায় কথায় বিলেত যান। দরকার কি ছিল বাংলা সাহিত্য চর্চা করার? ছড়া বাঁধা হল: 

‌🔥 আয় তোরা কে দেখতে যাবি।

‌ঠাকুর বাড়ির মস্ত কবি

‌হায়রে কপাল হায়রে অর্থ

‌ যার নাই তার সকল ব্যর্থ। 

🔥🔥🔥🔥

‌ হায়!  মানুষের চরিত্র। ধনীর সন্তান । তাই অধিকার নেই সাহিত্য চর্চার! কী অদ্ভুত বিচার! 

‌*********

‌ এই প্রসঙ্গে আলোচনা করি, ঈর্ষা নামক মানসিক ব্যাধির কথা। অপরের সব ভালো, আর আমার কিছু হচ্ছে না, এই মনোভাব থেকে যে মানসিক জ্বলন , ভালো না লাগা , রাগ__সেটাই ঈর্ষা। ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে যখন সেই মানুষটির ক্ষতি কামনা করা হয় এবং আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় ক্ষতি করতে, তখন সেটা পরিণত হয় হিংসায়। এবং , ধীরে ধীরে স্ফুলিঙ্গের থেকে জ্বলে ওঠে দাবানল। 

‌একজন মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে জানি, ঈর্ষা থেকে হার্টের অসুখ হতে পারে। নার্ভাস ব্রেকডাউন হতে পারে। বদ হজম , ডিপ্রেসন, মাথা ব্যাথা__কিছুটা হলেও, এসব রোগের মূল কারণ মন এবং মনের মধ্যে জেগে ওঠা বিকার। ঈর্ষা হোক। হোক মহতের তরে। মহৎ লাভের আশায় ঈর্ষা করলে, জীব ও জগতের উপকার। 

‌***

‌ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের কথায়। ঋষিকল্প মানুষটি কিভাবে সহ্য করেছিলেন এইরকম বিষের জ্বালা?  সম্ভব হত কী? কবির কথায় দেখে নি একবার: 

‌ " কেবল এই কথাটা আমি 

‌বুঝিবার ও বুঝাইবার চেষ্টায় ছিলাম যে সাধারনত মানুষ নিন্দা করিয়া যে সুখ পায়,। তাহা বিদ্বেষের সুখ নহে। বিদ্বেষ কখনোই সাধারণভাবে সুখকর হইতে পারে না। এবং বিদ্বেষ সমস্ত সমাজের স্তরে স্তরে পরিব্যাপ্ত হইলে যে বিষ হজম করা সমাজের অসাধ্য। 

     নিন্দা বিরোধ গায়ে বাজে না, এমন কথা অল্প লোকই বলিতে পারে। 

‌যাহার হৃদয় বেশি তাহার ব্যথা পাইবার শক্তিও বেশি।

‌    কতখানি জমাট বাঁধা অভিমান থেকে এমন কথা কবি বলেছেন, ভাবতে গেলে মন ভরে ওঠে গভীর বিষাদে। মানুষ অদ্ভুত। মাথায় তুলে নিতেও দেরি নেই। নিচে ফেলে গুঁড়িয়ে দিতেও পিছপা হয় না। 


(তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ক বিভিন্ন বই। 

রবীন্দ্র বিদুষণ ইতিবৃত্ত: আদিত্য অহদেদার ব্যাখ্যা : নিজস্ব।)


শেষে একটা ফুটনোট দেব: 

যত নিন্দা তত সমৃদ্ধি।


রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া 

                                                       




বৃষ্টি ও সিগারেট

-------------------- -   -----
      রামানুজের মতো সর্বগুণ সম্পন্ন একখানি পুরুষ মানুষ আর হয় না। চেহারাতে কার্তিক, বিদ্যায় গণেশ, অর্থে কুবের বলা না গেলেও, বেশ মোটা মাইনের চাকরী, স্বভাবে অতীব সুশীল-- পান সিগারেট ছোঁয় না-- এবং অফিস ছুটির পরে সোজা বাড়িতে মায়ের কোলে। 
       নিজ গুণে বিখ্যাত এমন একজনের কথা বিগলিত হয়ে বলছি  দেখে   পুরুষরা ইতিমধ্যে চোখ মটকে কি সব লিখবে তাই ভাবতে বসেছে, তবু ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়।  যাক, অবগতির জন্য জানাই, রামানুজের বয়স সাকুল্যে আঠাশ এবং সে বিবাহযোগ্য। এবং সেটাই বিপদের কারণ। 
       রামানুজ বিয়ে করতে চায়। আপ্রাণ ইচ্ছে তার। আঠাশ বছর বয়সে পড়ার থেকেই সে আকারে ইঙ্গিতে জানিয়ে চলেছে বাড়িতে, কিন্তু ,ফল হচ্ছে না তেমন। তার বন্ধু বলতে নিজের ছোট মাসীর ছেলে শুভদীপ। তাকেই ধরে বসলো--
:ফ্রী আছিস শুভ?
---আমি কি তোমার মত সোনার চাঁদ, যে, দিন তারিখ দেখে ফ্রী হবো? ভ্যবাগন্ড, সব সময় খালি। 
---বাজে বকিসনি। শোন, দেখা করবি বিকেলে। ধর্মতলায়, কাফে ডে কাফে তে।
--যথা আজ্ঞা ব্র। ভালো খাইও কিন্তু।
        জবাব না দিয়ে মোবাইল রেখে দিল রামানুজ। কোনদিন না খেয়ে ছেড়েছে তাকে, যে আজ বলছে? 
****
   স্যান্ডুইচে কামড় আর কফিতে চুমুক দিয়ে শুভ বললো-- ঝেড়ে কেশো দাদা। আমার তাড়া আছে।
----তাড়া কিসের? এই তো বললি ফ্রী? আর করিস তো নিজের বাড়ি বসে উকিলগিরি। তার আবার এত কথা?
--- আহা! রেগো না। রেগো না। আরে, হঠাৎ করে মাধুরী এমন করে ফোন করলো!
--- মাধুরী?
---সে যাকগে যাক। তুমি বলো, সেই বিয়ের সমস্যা তো? আচ্ছা! সত্যি তোমার কাউকে ভালো লাগে না? 
---শুভ , সমস্যা হলো মা।  মায়ের পছন্দ হয়না। কোনো মেয়েই পছন্দ হয়না। মেয়ে দেখেই বাড়ি এসে এমন মুখ করবেন, যেন শোক সভা থেকে ফিরলেন। কি করি বল!
---তুমি বা এত ভালো ছেলে কেন বলো দেখি? ভালো ছেলেকে মায়েরা সবসময় পাকড়ে রাখার চেষ্টা করে। আর একটা স্যান্ডুইচ বলো, আমি ভাবছি।
  রামানুজ শঙ্কিত হয়ে বললো--আবার স্যান্ডুইচ? তোর সেই মাধুরী না কি যেন, সে আসবে বললি যে?
---আরে মারো গুলি মাধুরী। দাদার বিয়ে আগে না মাধুরী সঙ্গে ইয়ে আগে? ভাবতে দাও ভাবতে দাও।’
 ভাবতে ভাবতে তুমুল বৃষ্টি এসে গেল। সঙ্গে সঙ্গে এক দল কলেজের ছেলে মেয়ে ঢুকে পড়লো কফি শপে। হৈ হৈ চিৎকার কথাতে কান পাতা দায়। এর মধ্যে এক ঝাপটা জল এসে রামানুজের মুখে লাগলো। চমকে, বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখে নীল জিন্স হলুদ  টপ, শরীরময় টুপটুপ জল এক মেয়ে লম্বা সোজা চুল এদিক থেকে ওদিকে ফেরালো, তার ফলে ভেজাচুলের ঝাপটা রামানুজের মুখে। মেয়েটা কাঁচু মাচু হয়ে বললো--সরি সরি। আসলে,বৃষ্টি ভিজে ফট করে ঢুকে পড়লাম। ভীড় এত! দেখতে পাইনি।
 শুভ ফট করে বললো-- আমাদের টেবিলে বসতে পারেন। যদি বন্ধুদের আপত্তি না থাকে।
---বন্ধু? না না। আমি তো একলাই। অফিস থেকে ফেরার পথে বৃষ্টি। বসতেই পারি।
 --কফি বলি?  শুভ বললো। 
-- আরে আমি বলে দেব  আমার কফি। আপনি কেন? দাঁড়ান গুছিয়ে বসি একটু। 
 শুভ নাছোড়বান্দা--
 -- তাতে কি? আমি শুভ। এ আমার দাদা রামানুজ। কফি কি ক্যাপাচুন না ল্যাতে?
---খাওয়াবে কে? দাদা না ভাই?
---দাদা। অম্লান বদনে বললো শুভ। 
শুনে মেয়েটি ফিক করে হেসে ফেলে রামানুজের দিকে তাকালো। এবং সর্বনাশ ঘটে গেল, রামানুজের হৃদয় একেবারে ভূমিকম্পে ধসে গেল। 
শুভ মহা ফিচেল। সে  দাদার অবস্থা বুঝে, মেয়েটিকে লাইনে আনার চেষ্টা চালিয়ে গেলে হবে কি, তিনিও মহা ঘোড়েল। শুধু নিজের নামটি বললেন , রিমা মৈত্র। সেক্টর ফাইভে চাকরি করে । মোবাইল নাম্বার নয় কিছু নয়, এবং বৃষ্টি থামলে আবার চুলের ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে গেল, সিগারেট ধরাতে ধরাতে। 
-- সিগারেট! কি সাংঘাতিক। এর পরে আর ওই মেয়ের দিকে না এগোনোই ভালো। ইস। শেষ পর্যন্ত সিগারেট? ওমন মিষ্টি হরিণ চোখের মেয়ে! ওমন সপ্রতিভ। মাত্র আধঘন্টা কি পোনে ঘন্টা, কথা বলার স্টাইলে রামানুজ হেসে ফেললো দু বার। কিন্তু সিগারেট? ওমন সুন্দর কমলা রঙের ঠোঁটে সিগারেট? 
রামানুজের তোমবা মুখের দিকে তাকিয়ে শুভ বললো-- তোমার হলো কি বলো তো? আরে মেয়েটা দেখতে হবে এনগেজড কিনা। আর তো সব ফার্স্টক্লাস।’ 
 --চুপ কর গাধা। এনগেজড ফেনগেজড বাদ দে। ওই মেয়ে সিগারেট খায়।’
-- দাদা। ওটা কোনো সমস্যা হলো? তোমার মা দিনে দশটা পান খায় না? তোমার ঠাকুমা দোক্তা খেত না? তার আগে হুঁকো টানতো কিনা ভগা জানে? আমার মা তো জর্দা খাবার মাষ্টার! তব্বে?
  বলে বিজয়ীর মতো কাঁধ হেলিয়ে শুভ বললো--
-- যেটা দেখার সেটা হলো, তোমাকে বিয়ে করতে রাজি কি না?
---’মানে? ‘ খুব আঁতে ঘা লাগলো রামানুজের--
 আমার মধ্যে কি আছে অপছন্দের?
---হে হে দাদা। ওই ভালোমানুষ ভাবটাই মেয়েদের পছন্দ নয়। তারা চায় রাফ এন্ড টাফ পুরুষ। তোমার ঐ ফর্সা লাল লাল গাল-- চলবে না।
--- শুভ।’ ধমকে ওঠে রামানুজ--

কোথায় রিমা মৈত্রকে খুঁজে তার সিগারেট ছাড়াবি, না পড়লি আমার গাল নিয়ে।
---দুটোই দরকার দাদা। তোমায় জিম যেতে হবে, নিজেকে বেশ হান্ডু বানাতে হবে, আর ওই মেয়ে যদি রাজি হয়, দেখছি কি করা যায়। 
এই বলে সংকোটমোচন দেবতার মতো উঠে দাঁড়ালো শুভ।
****
রিমা মৈত্রকে ফেসবুকে পাকড়াও করলো শুভ। তাকে খোলাখুলি সব মেসেজে লিখতে  সে তো হাসির স্টিকার দিতে দিতে আর বাঁচে না। হাসতে হাসতেই লিখলো
  -- কারো সঙ্গে চক্কর নেই এটা ঠিক। কিন্তু বিয়ে? ওরে বাবা। ভাবতেই পারি না।
--ভেবেই বলো। প্রচুর সময় নাও। দাদা জিম শুরু করেছে। লাল লাল গাল ভাঙছে,। আর মোবাইল নম্বর টা দাও দেখি। আমরা ভদ্রলোক। ঠকবে না। বেশ দার্শনিকের কায়দায় সব লিখলেও, সিগারেট নিয়ে কিছু বলতে সাহস করলো না।
সেদিন রাতে টুং আওয়াজে রিমার বুকে কে যেন এক বাঁশি বাজালো। অচেনা এক মুখচোরা ছেলে, বলিষ্ঠ সুঠাম চেহারা। মুখে তার ভেজা চুলের ঝাপটা, তার থেকে এত কিছু? 
 মেসেজ খুলে দেখে লেখা --আমি রামানুজ। ঘুমিয়ে পড়েছেন?’
   সেক্টর ফাইভ বা ছোট থেকে যেসব পুরুষ মানুষ দেখছে রিমা, তারা এমন নয়। বড্ড স্মার্ট, বড্ড হামবড়াই, বড্ড খোলা মেলা। শরীর নিয়ে  , সম্পর্ক নিয়ে  কোনো রাখ ঢাক নেই। রামানুজ কেমন আলাদা? তার অকালে চলে যাওয়া বাবার মতো! সে লিখলো-- না না। ঘুমোবো কেন?’
 একটু পরে আবার মেসেজ--ফোন করবো?
 ---করুন’। 
  ফোনে রাজ্যের আবোল তাবোল কথা হলো। রিমার বাবা আর রামানুজের মায়ের সম্পর্কে গল্প হলো এক ঘন্টা।  পরের দিন, তারও পরের দিন-- সব জানা হলো দুজনের। রিমার বাবার মতো রামানুজ পুঁটি মাছ খেতে ভালোবাসে, ফলের মধ্যে তরমুজ খায়--সব জানা হলো রিমার। রামানুজ জানলো , রিমা খুব সুন্দর আলপনা দিতে পারে, রবীন্দ্রসংগীত গায়। রাত বাড়ে, কথা ফুরোয় না। 
    বেশ কয়েক দিন পরে উৎকন্ঠিত শুভ নিজেই ফোন করলো ---’ কি ব্যাপার দাদা? খবর কি?’
----ঘটক বিদায় ভালোই পাবি , নিশ্চিন্ত থাক।’
---’ উররেব্বাস। এত দূর? তা বড়মাসীকে বলতে পারবে তো?’ 
---’ ভালোবাসলে কি না পারে মানুষ? তুই নিশ্চিন্ত থাক।’
---’ কিন্তু দাদা? ওই সিগারেট? ওটার কি হলো? কিছু বললে ওটা নিয়ে?
--- কিছুই বলিনি। বিশ্বাস আছে। ভালোবাসলে কি না পারে মানুষ!
❤❤❤❤❤❤❤❤
      বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর

রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                                   



অধ্যায় -- ৬ 

_______________

 মুড সুইং

মনের জানালা

 মুড সুইং বা মেজাজের পরিবর্তন এখন আলোচ্য বিষয়। কথায় বলে মেজাজ তো আসল রাজা, আমি রাজা নই। সুতরাং , এই রাজার খিদমত গার তো হতেই হবে। 

 কারণ, মেজাজ খারাপ তো দুনিয়া খারাপ। 

 গত অধ্যায়ে বলেছি, শরীর গত কিছু কারণ বিরক্ত করে তোলে। যেমন, হঠাৎ চুল পড়ে যাওয়া। চুল বড্ড আদরের বস্তু। আজ বলি কিছু সহজ টিপস। যার ফলে চুলের গোড়া শক্ত হবে। ঝলমল করবে। মন ভালো থাকবে। নারকেল তেলের মধ্যে  জবা ফুল, অপরাজিতা ফুল, নিয়ম পাতা , মেথি গুঁড়ো , আমলকি দিয়ে ফুটিয়ে , ছেঁকে একটা শিশিতে ভরে রেখে দিয়ে, মাঝে মাঝে চুলের মধ্যে ভালো করে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিয়ে পরেরদিন ধুয়ে নিতে হবে। সপ্তাহে একদিন ডিম লাগানো জরুরি। না হলে পাকা কলার পেস্ট। সঙ্গে দই। 

   অবাক করা ফল মিলবে দিন কতকের মধ্যে। সেইসঙ্গে আলো হয়ে উঠবে অন্ধকার মন। 

  তাহলে এটা বোঝা গেল, সেজে গুজে সুন্দর থাকা অন্যায় কিছু না। বরং জরুরি। 

     এবার আসি আরো একটা  বিষয়ে।  অনেকেই বলে থাকে, ভালো লাগছে না। কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে বলবে, জানি না। শুধু ভালো লাগছে না। নাহ্। সম্ভব না। কোনো কিছু কারণ ছাড়া হবেনা। যদি প্রশ্ন করা যায় , একটু ভেবে বলো কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে হবে,  কত কাজ।  ফলে, মেজাজ আরো খারাপ হচ্ছে। 

 ছড়িয়েপড়া কাজের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা খুব সাধারণ সমস্যা। তার থেকে বিরক্তি খিটখিট ভাব। তাহলে আগে বিরক্তির কারণ জেনে নিতে হবে। এক একটা দিনের কাজকে লিস্ট বানিয়ে রাখতে হবে। লিস্ট মিলিয়ে শেষ করে ফেলতে হবে কাজ। ভালো লাগবে অবশ্যই। এমনও হতে পারে , আচমকা কোনো ব্যাঘাত এসে ভেস্তে দিল দিনের প্ল্যান। তবু , ধৈর্য হারালে চলবে না। যে কাজটা রয়ে গেল, তাকে চাপ দিয়ে শেষ না করে বরং পরের দিনের কাজের সঙ্গে  জুড়ে দিয়ে যেভাবে হোক শেষ করে ফেলতে হবে। মেজাজ হারালে চলবেনা। মনে রাখতে হবে, কাজ শেষ করা উদ্দেশ্য, মেজাজ খারাপ করা না। 

    মুড সুইংয়ের আরো একটা বড় কারণ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। ঘুমোতে হবে। বিকেলের দিকে ৩০ মিনিট হেঁটে আসতে হবে যত কাজ থাক। মনে রাখতে হবে, দুপুর বারোটার পর থেকে আমাদের খারাপ বেশি লাগে। সেজন্য বিকেলের দিককে গুরুত্ব দিতে হবে। একটু ধ্যান, হেঁটে আসা, ছবি আঁকা ... কিছুতেই যেন বিকেলের মলিন ভাব গ্রাস করে ফেলতে না পারে। 

   আজ এই পর্যন্ত। আবার পরের রবিবার।

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                             



 মনের জানলা


অধ্যায় ৫

    মুডসুইংয়ের কারণ বলতে বসলে হাজার কথা বলতে হয়। এই কারণগুলোকে দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা অবশ্যই মানসিক। আর একটা শারীরিক। শরীরের চাইতে মনেরগুরুত্ব এইজন্য বেশি যে , অনেক সময় শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে না। কিন্তু , মন খারাপ থাকলে দুনিয়া গন্ডগোল। 

   মনে রাখতে হবে, প্রতিদিনের তুচ্ছ ঘটনা অনেক সময় মনের উপর প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। যেমন একটা সহজ কথা, চুল নিয়ে মহিলাদের দুঃখ। চুল উঠে যাচ্ছে। কি যে হবে! এই নিয়ে চলল মন খারাপ। ডাবলচিন হচ্ছে। চোখের কোলে পড়ছে ভাঁজ। গলার চামড়া ঢিলে। মনের আকাশ মেঘলা হয়ে থাকে। 

  তাই বলি, দিনের কিছুটা সময় থাকুক নিজের জন্য। ত্বক চুল ইত্যাদি থাক যত্নের তালিকায়। দশমিনিট সময় বার করতে বললেই মহিলারা হায় হায় করে উঠবেন। তাদের না কি এক ফোঁটা সময় নেই। 

   যখন দেখে আর হচ্ছে না, তড়িঘড়ি পার্লারে গিয়ে এক গাদা টাকা খরচ করে চলে এলো। সেটাতেও মন খারাপ। কাউকে কাউকে বাড়িতে কথা শুনতে হয় এই জন্য। অনেক স্বামী বলে বসেন : এগুলো কি বাজে খরচ হচ্ছে! 

রোজগেরে সন্তান বলবে: তোমার কি দরকার চুলে রঙ করার? 

এগুলো মাঝে মাঝে বড্ড অপমানের। কেউই হয়ত ইচ্ছে করে বলে না। কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন চাবুকের মত আছড়ে পড়ে কথা। সরল জীবন জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কথা বা বাক্য একটা শক্তিশালী অস্ত্র। তাকে তীক্ষ্ণ ভাবে ব্যবহার করে রক্তাক্ত করা যায় বইকি! 

 চুলে একটু ডিম লাগানো হোক। হাতে পায়ে বাদাম তেল অথবা গ্লিসারিন। বাড়িতেই গরমজল করে টিভি দেখতে দেখতে পা ঘষে ফেলে নেলপালিশ পরে নিলেই হয়ে গেল। নিজের চকচক গোড়ালি এক নিমেষে মন ভালো করে দেবে। 

 আয়না থেরাপির মূল কথা হল নিজেকে ভালোবাসা। সেলফ লাভ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলা, দেখোতো! আমায় চিনতে পারো কি না? 

 আগে একটা ছবি তুলে রেখে নিজের একটু চর্চা করে দশদিন পরে দেখতে হয় কেমন তফাৎ হল! মন খুশি হতে বাধ্য। 

 দুঃখ সবসময় বড় কারণেই হয় না। চোরকাঁটা র মত কিছু দুঃখ থাকে। চলতে ফিরতে যেগুলো বিঁধতে থাকে অহরহ। 

ছোটছোট এই দুঃখ গুলো তুচ্ছ হলেও কষ্ট দেয়। সময় করে একটু ঝেড়ে বেছে তুলে নিলেই হল। 

একটু সময় একটু যত্ন আমাদের শরীরের প্রয়োজন আছে। সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে নিজের জন্য কেবল মনখারাপ তুলে রাখলে চলবে? 

  তাই আজ থেকেই বরাদ্দ হোক দিনে ২০ মিনিট শুধু নিজের জন্য।




রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                       


মন – খোলা জানালা 

মনেরপুষ্টির জন্য কি কি করা প্রয়োজন।

 শিশুর জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে শরীরের পুষ্টি কি করে বৃদ্ধি পাবে সেটা নিয়ে। শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে করুণ আর্জি চলে স্বাস্থ্যবান বাচ্চা চাই। কতরকম খাবার খাওয়ায় তাকে। আজকাল সকলেরই একটা কি দুটো বাচ্চা। পরিবারের পুরো মনোযোগ থাকে শিশুর উদর কতটা পূর্ণ হল অথবা হল না। শিশু কোলে মায়েদের নিরন্তর অনুযোগ চলতেই থাকে তার বাচ্চা কিছু খায় না! এখন কথা হল, জন্মের পরে দৈহিক পুষ্টি গুরুত্ব পায় আর মনের পুষ্টি? তার কথা কতটুকু ভাবে মানুষ? একজন শিশুর মনের গঠন ঠিক ভাবে গড়ে উঠছে কি না, সেটা দেখা পরিবারের কর্তব্য। খুব ছোট্ট থেকে এমনকি যখন মাত্র কয়েক মাস বয়স, তখন থেকেই শিশুটির মনের ভিতর নানারকম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সেইসময় কিভাবে শিশুর মন আনন্দে ভরপুর থাকবে, সেটা বোঝা উচিত। 

*****

আজ যে শিশু আগামীকাল সে একজন দায়িত্ব বান নাগরিক। মজবুত শরীরের সঙ্গে চাই একটি মজবুত মন। সে যেন সমস্ত রকম সমস্যার সামনে স্থির রাখতে পারে নিজেকে। প্রতিকূল পৃথিবীতে লড়াই করতে গেলে স্থিতিশীল মনের প্রয়োজন খুব। 

     ক্রমবর্ধমান স্ট্রেস সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। এর ফলে আমাদের ক্ষতি হয়। অনেকটা স্লোপয়জনিং এর মত। খুব ধীরে ধীরে চিন্তা গ্রাস করে আমাদের। 

  বিজ্ঞান বলে, দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে দিয়ে গেলে মস্তিষ্ক প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষকে শান্ত করতে সাহায্য করে। সেইসময়, ডোপামাইন বা ডোপামিন ( dopamine)। বলে একপ্রকার হরমোন ক্ষরণ হয়। 

  এই হরমোনের কাজ হল , খুশি উৎপন্ন করা। অর্থাৎ চাপ মুক্ত করতে সাহায্য করা। কি সাংঘাতিক কাজ করে এই হরমোন। ( বলে রাখা ভালো, এই প্রবন্ধ কোনো নিউরো সার্জনের লেখা নয়। কিন্তু, আমার বক্তব্যের সঙ্গে শরীর যুক্ত। তাই এই কথা গুলো সংক্ষেপে হলেও আনতে হবে)। 

  খুশি উৎপন্ন করে এমন হরমোন, যা কিনা neurotransmitter হিসেবেও কাজ করে, তার এত গুরুত্ব কেন? 

 কথায় কথায় আমরা বলি, feel good, আনন্দে থাকো। খুশিতে থাকো। ডোপামাইন হরমোন ভালো থাকার প্রেরণা যোগায়। ভালো কাজ করার প্রেরণা যোগায়। ভালো ভাবে থাকার প্রেরণা যোগায়। আরো অনেক অনেক কাজ করে, অনেকেই হয়তো এ সম্পর্কে জানে। অর্থাৎ, ভালো থাকতে হলে ডোপামাইন নিঃসরণ সুন্দর ভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয়। 


   ২


    মানুষ স্বাভাবিক ভাবে ভালো থাকতে চায়। সে কাজে তাকে সাহায্য করে তার মস্তিষ্ক। 

 আমরা ভাবতে পারি কি ? যে, আনন্দ দেওয়া এই হরমোনের উদ্দেশ্য। এবং, এই হরমোন সঠিক পরিমাণ নিঃসরণে মানুষ নানা ধরণের কাজে উৎসাহ পায়। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয় শক্তিশালী হয়। সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু যে স্ট্রেস প্রতিদিন উৎপন্ন হচ্ছে বাইরে থেকে, সে তো ছিনিয়ে নিচ্ছে আমাদের খুশি? তবে? উপায়?  বিভিন্ন কারণে চলে যাচ্ছে খুশির অনুভব। মহামারীর সংকট এই মুহূর্তে একটি বড় কারণ। সেটা মেনে নেওয়া যায়, যদিও স্নায়ুর উপর প্রবল চাপ ফেলছে এবং বহু মানুষ মনের রোগের শিকার হচ্ছেন। 

 এই বড় কারণ ছাড়াও, ছোট ছোট বহু করণের ফলে ক্ষয় হচ্ছে আনন্দের ভূমি। সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষোভের। পার্থিব জগতে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মধ্যে টানা পোড়েন থাকে তীব্র। সর্বক্ষণ একটা ভয় কাজ করে। এই বুঝি হারিয়ে গেল! এই বুঝি অমুক পেল সম্মান , এই বুঝি ...! আমি পারলাম না। আমি হেরে গেলাম।  ভাবলে অবাক হতে হয়, ছোট বাচ্চাদের মনের মধ্যেও এরকম ক্ষোভ দুঃখ হতাশা জেগে ওঠে। অর্থাৎ, যে সুন্দর কাজ আমাদের খুশি দিতে পারে, সে কাজ যদি কোনো কারণে সাফল্য না পায়, তবে আমাদের মনের ব্যালান্স শূণ্য হয়ে যেতে পারে!

  অবসাদ আচ্ছন্ন করলে ডোপামাইন হরমোন নিঃসরণ ঠিক মত হয় না অথবা বেশি হয়। দুটোই ক্ষতিকর। কম মাত্রায় হলে, প্রচুর রোগ খুব ধীরে ধীরে আক্রমণ করে। এবার যেই মাত্র অবসাদ ঘিরে ধরছে, সহজ উপায় খুঁজে নিচ্ছি ভালো থাকার।  ভিডিও গেম, সিগারেট, নানারকম নেশা, বিকৃত পোস্ট,  ইত্যাদি বহুরকম কাজ করলে সাময়িক মন খারাপ ভুলে থাকা যায়।  খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যারা এই ধরণের নেগেটিভ কাজ করে, যে বাচ্চারা বেশি ট্যাব আসক্ত ... কোথাও না কোথাও তাদের মনের প্রবলেম আছে। তারা জানেও না, বাইরের থেকে আনন্দ নিয়ে ভিতরের কতখানি ক্ষতি হচ্ছে। খুশি যদি অযথা অকারণ অদরকারি হয়, তবে হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলেও শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। প্রথম কথা, নেশা ছাড়া তখন আর খুশি থাকা যায় না। বাচ্চার থেকে ট্যাব নিলে সে হিংস্র হয়ে ওঠে। নানা রকম অপরাধ মূলক কাজ, অযথা অভিযোগ অভিমান ... এ সমস্তই ধীরে ধীরে অধিকার করে ফেলে আমাদের সমস্ত নিজস্বতা। 

   

 ৩

প্রাচীন কাল থেকেই, ভালো থাকার একটা উপায় বলা হয় শ্বাস নেওয়া, মেডিটেশন করা অথবা কিছুক্ষণ মৌন থাকা।  নাম জপ করা... ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কাজগুলো মনের ব্যায়ামের অঙ্গ। সবচেয়ে বড় কথা, মনের ব্যায়াম ঠিক মতন করলে, ডোপামাইন হরমোন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটা আমার মনে হয়। সত্যি কথা বলতে কি, এই কিছুদিন আগে একজন কাউন্সিলিং করতে এসেছে,( হয়ত সে পড়ছে এই প্রবন্ধ,) তার বাচ্চাটি ট্যাব আসক্ত। আমি এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আবিষ্কার করি,শৈশব থেকেই ওর মধ্যে ছিল খুশির অভাব। এখন ও খুশি খুঁজে নিচ্ছে ট্যাব দেখে। আরো এক জায়গায় পড়লাম, যদি ডোপামাইন নিঃসরণ বেশি হয়, তবে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, নিজের এক দুনিয়া বানিয়ে নিয়ে সুখে থাকা। পারিপার্শ্বিক কারো সঙ্গ ভালো না লাগা। একলা থাকা। নিজের মত। 


আমি এত জটিল বিজ্ঞান বুঝি না। মনের জন্য ওষুধ খেতে হয়, সে বিশ্বাসও করি না। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন," সুখ দুখ সমভাব চ। 

  এই উপদেশ হল আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল কথা। সাফল্য আর ব্যর্থতা বলে কিছু হয় না। এক দরজা বন্ধ হোক। সুখী হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। আবেগ যেমন চালিকা শক্তি তেমনি অতি আবেগ ক্ষতিকর। মনে রাখতে হবে, বেঁচে থাকাই হল সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। একবার এক চাকর আর এক রাজা দুজনেই জলে ডুবে মারা যায়। জলে ডুবে চেহারা বিকৃত হওয়ায় কেউ বুঝতেই পারল না , কে চাকর আর কে রাজা? লোকজন অনেক ভেবে চিন্তে আন্দাজে দেহ দুটির একটিকে রানীর কাছে অপরটি চাকরদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।।

  এই তো জীবন! যতক্ষণ আছি ডিউটি করে যাই। ফল পাবার হলে পাবো, না হলে পাব না। সেটা আমার হাতে নেই। কিন্তু , ফল না পেলে দুঃখী হব কি না সেটা আমার হাতে আছে। 

 বাচ্চাকে আনন্দে রাখা আমাদের কর্তব্য। তবে ওর ভিতর খুশিতে ভরে উঠবে। অনেক কাজ ও আনন্দে করবে। না হলে ধীরে ধীরে মনের চারিদিকে জঞ্জাল জমতে থাকবে। 

  অবসাদ , আবেগ , ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায়, 

  অ উ ম অথবা সো হ ম উচ্চারণ করা। প্রতিদিন।  আর প্রতিদিন নিজেকে বলা

  আমি ভালো আছি।





রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                



 মেজাজ হল আসল রাজা/ আমি রাজা নই। 



   মুডসুইং ... অতি পরিচিত শব্দ। যেহেতু, মানসিক সমস্যা সমাজের উচ্চ এবং মধ্যবিত্তের মধ্যে বেশি, তার  মানে এই নয় যে নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে দেখা যায় না। মেজাজের পারদ ওঠা নামা করে। এটাই হল, জীবনের চালাকি। মানুষের ক্ষমতা এত বেশি যে তারা সহজেই সব পেতে পারে। হয়ে উঠতে পারে ঈশ্বরসম। এইখানে তারা অসহায়। এই নিজের কাছে। নিজের মেজাজের কাছে। ইচ্ছে অনিচ্ছের কাছে। মুড ভালো রাখা, মুড কিভাবে সন্তুষ্ট হবে তার চেষ্টা করা এই একটি সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত সৃষ্টি। পরিবার। সমাজ। বহু জঘন্য অপরাধ থেকে বহু সার্থক সৃষ্টি সম্পন্ন হচ্ছে মুড এর জন্যে। 

  কি এই মুড? কেন এর এত  দাপট? 

ডাক্তার বলবে এটা একটা অসুখ। এই ভালো আছি তো এই খারাপ। কেউ কেউ হালকা চালে বলে, আজকাল খুব মুডসুইং করছে। যেন এটা একটা খেলা। অনেকে বলে, ওগুলো বেশি হয় মেয়েদের মধ্যে। প্রচলিত কথা, ঋতুচক্রের সময়, প্রেগন্যান্ট অবস্থায় , লিখতে বসলে, একঘেঁয়ে রান্নার কাজ করলে আরো নানান ব্যাপারে মেয়েদের মধ্যে বেশি হয় বলে ধারণা করা হয়। 

   সন্দেহ নেই, ঋতুকালীন সময় এবং গর্ভবতী অবস্থায় হরমোনের ওঠা পড়া খুব বেশি মাত্রায় হয়, মেজাজ খিটখিট করে। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আজকাল পুরুষদের মধ্যেও এই মুড সুইং কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবে বলা হচ্ছে। 

মুড বা মেজাজ বা মন কেন দোল খাচ্ছে? কেন ব্যালান্স হারাচ্ছে? এর সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। 

কি ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধন করেছে কেউ বুঝতে পারছে না। এ যেন , বালির উপর রাজপ্রাসাদ তৈরি করছি আমরা। ভিত শক্ত হল না, অথচ এই করছি, সেই করছি। 

     ভারতবর্ষ এমন এক দেশ, বলা যায় একমাত্র দেশ, যেখানে প্রাচীন কাল থেকে মনের বিভিন্ন অবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমার বাবা বলতেন," আমরা অনেক প্ল্যান করি। এবার প্ল্যান মত কাজ হল না। ব্যর্থ হলাম। তখন কি হয়? মন খারাপ হয়। লাগাতার বলতে থাকি, প্রবলেম। প্রবলেম। মন খারাপ , মন খারাপ। সেই মন, যে আমাদের পাশে দাঁড়াবে, যে আমাদের প্রবলেম থেকে বেরিয়ে আসার সন্ধান দেবে, সে মন না কি খারাপ? তবে? 

বাবা বলতেন, প্রথমেই বাদ দাও প্রবলেম শব্দটা। বলো পরিস্থিতি। এবার দেখো। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে। প্রবলেম শব্দ বারবার ব্যবহার করলে,মনের  ভাইব্রেশন নষ্ট হয়ে যায়। লড়াই করার শক্তি নষ্ট হয়। 

প্রাচীনকাল মানে পুরাণের কতগুলি গল্প নয়। শিক্ষা। কিভাবে ভালো থাকব, তার শিক্ষা। সেটা আলোচনা করার আগে,

এবার দেখা যাক, মুডসুইং কি কি নষ্ট করছে? 

 প্রতিদিনের বেঁচে থাকার শক্তি ক্ষয় করছে। এনার্জিস্তর কমিয়ে দিচ্ছে। এনার্জি কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। খুব ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে দিতে খিটখিট করে তুলছে।করে তুলছে  স্পর্শকাতর। চট করে দুঃখ পাচ্ছি। অমুকের একটা শব্দ একটা, তুচ্ছ তাকানো , একটু এদিক ওদিক ব্যবহার নষ্ট করে দিচ্ছে সারাটা দিন। রাগ হচ্ছে। অকারণ হতাশা আসছে। ভয় এবং কান্না। 

  আজকাল গুগল করলে সমাধান চলে আসবে নিমেষে। প্রায় সবগুলোই বাইরের প্রক্রিয়া। যেমন, ব্যায়াম করতে বলা হয়। কাজে ব্যস্ত , লোকের সঙ্গে মেলা মেশা,প্রাণায়াম ইত্যাদি। 

   মুশকিল হল, এগুলো করতে ইচ্ছেই তো করবে না। ইচ্ছের জমি না তৈরি করলে ফসল ফলবে কি করে? ধাপে ধাপে এগিয়ে চলতে হবে। মুডসুইং মোটেই একদিন হঠাৎ হয় না। 

কারণ থাকে। বেশির ভাগ কারণ লুকিয়ে থাকে অতীতের মধ্যে। আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ খুঁজে বার করতে হবে। প্রবলেম বলে কিছু নেই। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে। সেটা পারবে শক্ত সবল মন। 

   থেরাপি::

১.অউম প্রতিদিন ১০ বার। করতেই হবে। 

২.আয়না থেরাপি দিনে একবার। 

৩.মৌন দিনে ২ মিনিট। 

৪.খাতায় লেখা সমস্যার কথা। 

 

    কেন যেতে হবে নিজের সমস্যার জন্য অন্যের কাছে? কেন তোড়জোড় করে শুরু করতে হবে রুটিন মেনে ধ্যান ইত্যাদি? মন নিরন্তর ডুবে থাকবে নিজের চেতন শুদ্ধ করার জন্য। যেমন , aquaguard  জল পরিশুদ্ধ করছে, তেমনি আমার মন করুক চিন্তা শুদ্ধ। সকাল থেকে সারাদিন পাচ্ছি। দেখি, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। খারাপ না ভালো? আছে শক্ত মন। করবে মোকাবিলা। একটাই কথা, বাবা বলতেন, প্ল্যান করো। পরিকল্পনা করো। কিন্তু দিনের কখন কি ঘটে যাবে, কেউ জানে না। কাজেই , সেই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যদি প্ল্যান মত কাজ না হয়, তখন কি হবে? তখন মেজাজ খারাপ করব? আনন্দ নষ্ট করব? এনার্জি স্তর নামিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষতি করব? ডাক্তারের কাছে দৌড়ে যাব? 

মুড নামক মহারাজকে মাথায় তুলতে নেই। মুড বা মেজাজ একটু এদিক হবেই। উপরের থেরাপি গুলো সাহায্য করবে, নিজের ভিতর শক্তি জাগ্রত করার। ফলে, বাইরের পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, ভিতরের স্থিতি ঠিক থাকলে, লড়াই করার শক্তি জন্ম নেবেই। 

মুডসুইং এর গালভরা গুগল ব্যাখ্যায় না গিয়ে নিজেই বরং  গুগল হই অথবা মনের ডাক্তার হয়ে যাই। মেজাজের উপর কন্ট্রোল থাক আমার নিজের। শুনতে কঠিন হলেও খুব সহজ কিন্তু। চেষ্টা করে যাওয়া যাক। মন শক্ত হবেই। মুড তো দূরের কথা , সমস্ত প্রবলেম সমাধান করার শক্তি জেগে উঠবে। মেজাজ হোক প্রজা, আমি হই রাজা।

চিত্রঋণ- Thomas .S.Andro