মনের জানলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মনের জানলা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                         


                                                                    



অশান্তি 😌 থেকে শান্তি😊

💕💕💕💕💕💕💕💕💕

  মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হল অশান্তি। এ এক ভয়ঙ্কর রোগ। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে এই রোগের শিকার। মহামারীর চাইতে অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এই রোগ। অশান্তিতে যে ভুগছে, সে সবসময় চাইবে অপরজন তার অসুবিধাটা বুঝুক। চুপ করে থাকলেও তার শরীর হতে বিচ্ছুরিত হয় অশান্তির আলো, যা পরিবার বন্ধু এবং সমাজ করে তোলে অন্ধকার। 

💕💕💕💕

অশান্তির সমস্ত কারণের পিছনে বাস্তব সম্মত কিছু ভিত্তি থাকে। কোনো কিছু অকারণ হয় না। সেই কারণ বলতে না পারা বা বুঝতে না পারার সঙ্গে লড়াইতে ক্লান্ত মানুষ, সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য, নিজের এক কাল্পনিক দুনিয়া তৈরি করে, সেটা ঠাকুরঘর হতে পারে, গানের ঘর হতে পারে, লেখার টেবিল অথবা পরকীয়া। ধীরে ধীরে সেই কাল্পনিক দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে পড়ে, আর মুক্ত হতেই চায় না, এমন ও দেখা গেছে, সেই দুনিয়ায় কিছু মানুষজনের দেখা পায় সে। অর্থাৎ, মনের স্থিতি তখন নষ্ট হতে চলেছে। 

আর, দীর্ঘস্থায়ী মন খারাপ শরীরের মধ্যে সৃষ্টি করে না না রোগের। ক্যান্সার সহ  সুগার প্রেসার বহু রোগের কারণ অশান্তি থেকে উৎপন্ন নেগেটিভ এনার্জি।  নষ্ট করতে থাকে কাজের উৎসাহ উদ্দীপনা আনন্দ। অকারণ কান্না পায়, দুনিয়া ধীরে ধীরে বিষাক্ত হয়ে আসে।

😊😊😊😊😊😊

আগেই বলেছি, অশান্তি অমূলক নয়। থাকে কিছু তো ঘটনা থাকে। প্রথম কারণ আমি বলব , কথা। শব্দ ব্রহ্ম। কথার শক্তি প্রচন্ড। শব্দবাণ রক্তাক্ত করে দিতে পারে মানুষকে। পরিবারের একটি কথা, ফেসবুকের একটি পোস্ট ... বদলে দিতে পারে আগামী কিছু ঘণ্টা। কথার আঘাত সামলে ওঠা খুব মুশকিল। বিশেষত, কুৎসা রটনা শুনলে মন খারাপ হয়। কুৎসা মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। ফলে, কেউ কাজ ছেড়ে দেয়, কেউ আত্মহত্যা করে। তাহলে কথা একটা কারণ। এবার, দিনের শুরু থেকে রাতের ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত শুধু মাত্র ভালো কথা শুনব এটা হতে পারে না। মনে রাখতেই হবে, বাজে কথা ভেসে আসবেই। স্বামী সন্তান ভার্চুয়াল জগৎ... টুক করে খারাপ কথা এসে নাড়িয়ে দেবে মনের স্থিতি। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ভালো কথা তোষামোদি কথা মন উৎফুল্ল করছে, কুৎসা মন খারাপ করছে। দুটো অভিঘাত আসছে বাইরে থেকে। এবার আমার করণীয় কী? সুতরাং, সকালে উঠে সবচেয়ে আগে আয়না থেরাপি করে নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে: আমি শক্তিশালী একজন মানুষ। আজ যে কথাই আসুক, আমার সুবিধা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ অথবা বর্জন করব। সারাদিন দেখতে হবে অপরের মুখ তাই আয়নায় আগে নিজেকে দেখি, নিজেকে তৈরি করি তারপর দেখব অপরে কি বলে! কুৎসার আয়ু বেশিদিন থাকে না। বিচলিত হলে বরং কুৎসার রটনাকে ইন্ধন দেওয়া হবে। 

এই থেরাপি খুব কাজে দেয়। টানা কয়েকদিন করলে তফাৎ বোঝা যায়। 

 *****

অশান্তির আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল অবদমন। চেপে রাখা। অনেক কিছু আমরা চেপে রাখতে বাধ্য হই, যৌনতা থেকে জীবনের অসফল কিছু মুহূর্ত চেপে রাখি সযত্নে। এই চেপে রাখার ফলে ভিতরে ভিতরে বাড়তে থাকে অশান্তি। এই চেপে রাখা কিন্তু ঘুন পোকার মত। তিলে তিলে শেষ করে দেবে। নাহ্, বাইরের কাউকে বলতে না পারলে, নিজেকে বলা যাক। নিজেকে বন্ধু করে তুলতে হলে, 5 মিনিট সময় দিতেই হবে। এবং, জিজ্ঞেস করতে হবে কোথায় হচ্ছে গন্ডগোল। আজকাল এটা ট্রেন্ড, নিজেকে ব্যস্ত প্রমাণ করা। কেবল বলে যাবে, এক ফোঁটা সময় নেই অথচ অনর্থক চ্যাট করার সময় আছে। কি হবে নিজেকে  5 মিনিট দিলে? চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটবে। পরিণত হবে। 5 মিনিট শারীরিক ব্যায়াম যেমন শক্ত করে শরীর, তেমনি মনের ব্যায়াম পুষ্টি জোগায়, পরিণত করে,  ঘটনাটার সামনে নিজেকে দাঁড় করিয়ে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে দেখা যাবে, চেপে রাখা ঘটনা নিজের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে ঘটনাকে কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তার একটা উপায় বার হয়। না হলে, অনর্থক উত্তেজিত মন ক্লান্ত অবসাদ আচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। এই সময় একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখতে পারলে আরো ভালো।

*******

আপোষ অথবা কম্প্রোমাইজ , অশান্তি সৃষ্টির বড় কারণ। আপোষ করে চলতে হবেই, নাহলে সংসারে থাকা মুশকিল। কিন্তু, একটা সীমার পরে মন আর নিতে পারে না, তখন শরীরও বিদ্রোহ করে। আপোষ করে চলতে ভালো লাগে না, কথায় কথায় মন চায় , মুক্ত বিহঙ্গের মত বেরিয়ে পড়তে। যদিও, বিহঙ্গ ও মুক্ত নয়, তাকেও আপোষ করতে হয়, সুতরাং, ব্যাপারটাকে ইতিবাচক নজর দিয়ে দেখতে হবে। ওই যে চিন্তা শক্তির উন্নতি ঘটিয়ে চলার প্রক্রিয়া, সেই শক্তিমান চিন্তা শক্তি সাহায্য করবে, আপোষ করেও কি করে নিজেকে সুন্দর এবং ভালো রাখা যায়, সেটা করতে। মনে রাখতে হবে, অশান্তি হল ধোঁয়া, আর স্ট্রেস হল আগুন। 

শুরু থেকে অশান্তির উৎস খুঁজে বার করে তার উপর কাজ না করলে ধীরে ধীরে সেটাই পরিণত হবে মারণ দায়ী স্ট্রেস এ। 

*******

অশান্তি থেকে আসে অবসাদ। মনের নিজেরও কিন্তু ইমিউন পাওয়ার আছে , আছে অরা অর্থাৎ প্রচুর পজিটিভ এনার্জি নিয়েই আমরা জন্মায়। প্রবল অবসাদের আক্রমণে ক্ষয় হতে থাকে এনার্জি। মন দিশেহারা হয়ে পড়ে, ডিসিশন নিতে ভুল করে ফলে আবার অবসাদ আসে। এইখানে বলব, দুই ভুরুর মাঝখানে আঙুল দিয়ে কিছুক্ষণ টিপে রাখুন। এটা একটা মারাত্মক থেরাপি। যেখানে যখন ইচ্ছে করে নেওয়া যায়। অবসাদে খুব কাজে দেয় ওম মন্ত্র কানে শোনা অথবা মুখে উচ্চারণ করা, দিনে দশবার। অবসাদের সূচনা হলেই এই থেরাপি প্রয়োগ করুন। ভয়ঙ্কর কিছু হলে কিন্তু তখন ডাক্তার আর ওষুধ।

******

আলোচনা শেষ করার আগে বলি, অন্যের উপর সুখ নির্ভর করে না কিন্তু দুঃখ নির্ভর করে। জীবনের নব্বই ভাগ অমুকের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছি, বাইরের প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে অশান্তির বীজ, এইখানে থেরাপি হ'ল, বাইরে নিয়ে যখন চলতেই হবে, তখন মন আর বাইরের মাঝখানে একটা পাঁচিল তৈরি হোক। প্রতিদিন ধ্যান করলে, প্রতিদিন একটু একটু করে আত্মশক্তির উন্নতি করলে, বাইরে থেকে ধেয়ে আসা ঝড় বৃষ্টি খুব বেশি ভেঙ্গে ফেলতে পারে না , মনের দুর্গ। প্রতি রাতে না হোক, কিছুদিন অন্তর অন্তর এক জায়গায় নিজের জন্য কিছু পজিটিভ বার্তা লিখে রাখি। যে সময়টা গালে হাত রেখে চিন্তা করছি, অথবা অমুকের সঙ্গে চ্যাট করে হা হুতাশ  করছি, সেই সময় নিজেকে দিয়ে, নিজেকেই শোনাই, আমি অমৃতপুত্র। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না। 


 💕💕💕💕💕💕

সামনে আসছে বিশ্বশান্তি দিবস। গোটা বিশ্ব হল আমার মন। তাকে প্রতিদিন যত্ন করুন। নিজের চারিদিকের প্রতিরক্ষা গড়ে তুলুন। অশান্তির ঝড় থেমে গিয়ে পাবেন সুন্দর নির্মল জীবন।

রবিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                      




 মণিযুক্ত সর্প এবং ছদ্মবেশী বন্ধু / ট্রমা সৃষ্টির কারণ

💕💕💕💕💕💕

 

   কেউ অথবা ফেউ ... নিবন্ধে অনেকেই সমাধান জানতে চেয়েছেন অনেকে ইনবক্স করে জানিয়েছেন ফেউদের আক্রমণে জীবন কতখানি দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। 

 তাদের জানাই, এমন ছোট পরিসরে সমাধান জানানো মুশকিল। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও , সমস্যার শিকড় ছড়িয়ে  থাকে অনেক ভিতরে। সবচেয়ে আগে জানা প্রয়োজন সমস্যা ঠিক কোথায় তারপর সমাধানের কথা আসতে পারে। 

🎉🎉🎉🎉🎉🎉

ফেউ প্রসঙ্গে যেটা প্রথমে মনে হয় কাছের মানুষ পিছনে লাগছে। রোজ রোজ হামলা করছে। কথা দিয়ে, চ্যাট দিয়ে, টেলিফোন করে ... শেষ করে দিচ্ছে জীবন। নষ্ট করছে মন। মাঝে মাঝে শারীরিক হামলা যে হচ্ছে না তাও নয়। এককথায় একসময় যে ছিল সঙ্গী আজ তার আক্রমণে প্রাণ ওষ্ঠাগত। 

🦋🦋🦋🦋🦋🦋🦋🦋

 এমন কেন হয়? রক্তের সম্পর্ক অথবা বৈবাহিক সম্পর্ক নিজের হাতে না থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু, বন্ধু? আর এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে বন্ধু অনায়াস। বাইরের চাকচিক্য সুন্দর প্রোফাইল দেখে বন্ধু করে ফেলি চট করে। দ্রুত কাছের মানুষ হয়ে যায় তারা। তারপর দেখা যায়, যাহাই চকচক করে তাহাই সোনা নয়। শুধু স্যোসাল মিডিয়া কেন, বন্ধু বৃত্তের যে কেউ হঠাৎ বদল করতে পারে রঙ। যে হৃদয় টলমল করে উঠত ভালোবাসার গঙ্গাজলে, সেখানে ছড়িয়ে পড়বে ঈর্ষার সবুজরঙ। 

💕💕💕💕💕💕💕💕

  বন্ধু , শব্দ শুনতে সহজ চট জলদি বানিয়ে ফেলা সহজ কিন্তু শব্দের ভার খুব কঠিন। দুটো ফোন করলাম একসঙ্গে কফি খেলাম তুমুল আড্ডা দিলাম, সেলফি তুললাম, নাহ্। এটাকে বলে টাইম পাস। দরকার আছে বইকি। সুন্দর আড্ডা। 

কারণ, বিশেষ একটা বয়সে বন্ধুর প্রভাব মুক্ত থাকা খুব মুশকিল। 

 কারণ, বন্ধুহীন জীবন মরুভূমির মত। জন্মগত ভাবেই মানুষ সঙ্গপ্রিয়। সঙ্গীর কামনা মানুষের চিরন্তন প্রবৃত্তি।   বন্ধুর সঙ্গে নিছক আড্ডা, প্রাণ খুলে আনন্দ হই হই ... অনেকখানি সময় মন করে তোলে নির্ভার। এমনও হয়, বাড়ি ছেড়ে বন্ধুর বাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, বন্ধুর একটি কথা তখন বেদবাক্য হয়ে ওঠে। পরিবার একদিকে বন্ধু অন্যদিকে। এগুলো স্বাভাবিক সত্য। বন্ধু সঙ্গে না থাকলে সৃষ্টি হয় না, লেখাপড়া হয় না অ্যাডভেঞ্চার হয় না। স্বয়ং ঈশ্বরকে ও বন্ধু নামে সম্বোধন করা হয়। 

🎇🎇🎇🎇🎇🎇🎇🎇

   বন্ধুত্ব গভীর হ'ল। আদান প্রদান হ'ল গোপন কথার। সমস্ত দুর্বলতা সমস্ত আকাঙ্খা জেনে গেল সে। কারণ, হল বিশ্বাস। অলিখিত এক চুক্তিপত্র থাকেই বন্ধুত্বে সেটা হল বিশ্বাস। ওটাই বলা যায় ভিত। তারপর একদিন বিশ্বাসের দেওয়াল ভেঙ্গে বেরিয়ে পড়ে আসল মুখ। নিজের সমস্ত গোপন কথা বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। স্ক্রিন শট/ ছবি ঘুরতে থাকে এদিক ওদিক। যা ছিল নিজের তা আজ বাজারের। শুধু তাই নয়, এমন হয়, নেট দুনিয়ার চট জলদি বন্ধুত্বের পরে জানা যায় ভিতরের চরিত্র কতখানি নোংরা। ততক্ষণ জড়িয়ে গেছেন অনেকটাই। লোকে ভাবতে শুরু করেছে, এমন মানুষের এত ঘনিষ্ঠ বন্ধু যখন তখন সে আর কত ভালো হবে? এইধরণের সঙ্গ, ব্যক্তিত্ব প্রতিভা সুনাম এমনকি সাফল্যকে ধ্বংস করে। A man known by the company he keeps.  নেট দুনিয়ার বন্ধু প্রভাব বিস্তার করে জীবনে। অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে কথা বলা। হঠাৎ একদিন ফোন বন্ধ। কারণ ছাড়া। ব্যাস! দুনিয়া বিস্বাদ। খাওয়ায় অরুচি। সংসারে অরুচি।

  আবার, কোনো বন্ধু কিছুদিন পরে বিরক্তি উৎপাদন করছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে,  আলাপ হওয়ার পরে। বোঝা যাচ্ছে, এর কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নেই। মোটা দাগের স্থূল বুদ্ধির মানুষ। কিন্তু, সে তখন ছাড়বে না।  ক্রমাগত ন্যাগিং আর ঘণ্টাভ'র  অবান্তর কথা ... ফোনে নাম দেখলেই ভয় করে।  মন জর্জরিত। ক্লান্ত। আতঙ্কিত। 

অবসাদ গ্রাস করতে থাকে। ভালো লাগে না কিছুই আর ভালো লাগে না। 

💕💕💕💕💕💕💕

  এবার কেউ প্রশ্ন করবে, তাহলে তো ঠগ বাছতে গ্রাম উজাড়। এত বেছে জীবন চলে না কি! 

  প্রশ্ন কিন্তু জীবন নিয়ে। তখন সতর্ক হতে হবে বইকি। কতগুলি নিয়ম মানতেই হবে সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। টাইম পাস বা নিছক আড্ডার কথা বলছি না, সেটা চলতেই পারে। বলছি, যদি কেউ বিশেষ স্থান নিতে চলে তবে কি হয়? বন্ধু কি করে? এনার্জির সঞ্চার করে।  আনন্দ ফুর্তি সঞ্চার করে এনার্জির, সেই এনার্জির অপর নাম ঈশ্বর। কারণ, এনার্জি হ'ল জ্বালানী। আমাদের সমস্ত কাজ, সৌন্দর্য , শরীরের যাবতীয় গোপন অসুখ, সম্পর্কের ওঠা পড়া এমনকি কঠিন সময়কেও আমরা সহজে অতিক্রম করে যাব যদি মনের ভিতর এনার্জি থাকে। এই এনার্জির একটি উৎস অথবা বলা যায় নব্বই ভাগ উৎস হল বন্ধু। সময় কাটাও কিন্তু নিজেকে বাঁচিয়ে। নিজের মনের গভীরে যে সুন্দর  আমি র অবস্থান... সে যেন কখনো ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। 

 নিজেই বোঝা যায়, কার সঙ্গ আমায় উন্নত করছে আমার চেতনা প্রসারিত করছে। কার ফোন রেখে দেবার পরে মনে হয়, পাহাড়ে ঘুরে এলাম। ফ্রেশ লাগে নিজেকে। মিথ্যা প্রবঞ্চকের চাটুকারিতা ক্লান্ত করে তোলে। এনার্জি নষ্ট করে। কাজেই সাবধান হতে হবে বইকি। 

🦋🦋🦋🦋🦋🦋

ট্রমা বা অবসাদ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। কাজেই, তুচ্ছ করলে চলবে না। অবসাদ সৃষ্টি করে এমন বন্ধু থেকে দূরে থাকতেই হবে। যদি কিছু ভুল হয়ে গিয়েও থাকে, ভয় পাওয়ার কারণ নেই। নতুন করে ঘুরে দাঁড়িয়ে নতুন এনার্জি নিয়ে বেঁচে উঠতে হবে। অনেকেই বলে, বন্ধু ভাগ্য খারাপ। তাই কি? তাৎক্ষণিক মোহে বন্ধু নির্বাচন কিন্তু আমরাই করে থাকি। তারপর হাহাকার আর নিরন্তর দোষারোপ। লাভ কী! পরশমণি দুর্লভ হলেও থাকে বইকি। ভালো বন্ধুর স্পর্শে জীবন সোনা হয় বইকি। এনার্জি লেভেল বৃদ্ধি পায়, এমন সঙ্গী থাকুক। বাঁচতে হবে সুন্দর করে। অবসাদহীন ঝকঝক জীবনের অধিকারী হয়ে।।

রবিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২১

জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                     


                   

   আজকের আলোচনা করব মানবমন নিয়ে। এখন ২০২১ সাল। চলছে মহামারির তাণ্ডব। কি হবে তার মধ্যে এই মনের কচকচি কেন? 

প্রয়োজন বইকি! মন ঠিক না থাকলে শরীর নিয়ে লড়াই করা মুশকিল। মরণাপন্ন রুগী উঠে দাঁড়াতে পারে  মনের জোর থাকলে। আর শুধু রোগের কথা ই বা কেন? প্রতিদিনের জীবন চর্যায়  মনের ভুমিকা স্বীকার করতেই হবে। বিবাহিত জীবনে মন বড় ভু


মিকা পালন করে। দাম্পত্য পুরনো হয়ে গেলেই পরকীয়া এসে হানা দেয়। কেন? মন কেন চায় অখণ্ড স্বাধীনতা? এটা কোনো দোষ নয়। ধর্ষণ বিদেশে এত বেশি হয় না। কারণ, মনের কোন জায়গা থেকে এইরকম ভযঙ্কর ইচ্ছের উত্পত্তি সে সম্বন্ধে ছোট থেকে বাচ্চাদের সচেতন করে দেওয়া হয়। এই দেশে বাচ্চারা যত মায়ের বেবি হয়ে থাকবে ততই ভারতীয় মা খুশি। শিশু কোনো অবোধ প্রাণী নয়। মাত্র তিন মাস থেকে যৌন আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে তার শরীরে। অথচ, মায়েরা ভাবে, শিশু অবোধ। আধো আলো  আধো অন্ধকারে থাকতে থাকতে একমাত্র sex  নিয়ে সারাজীবন কৌতূহলী থেকে যায়। 

মন খারাপে ভোগে। লেখাপড়া, সম্পর্ক সবকিছুতে ছাপ পড়ে। 

********



জন্ম নিয়েই কেঁদে ওঠে শিশু। 

  আগামী দিনের লড়াইয়ের কথা ভেবে হয়ত মন খারাপ হয়। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়ে না জানি কত  লড়াই করতে হবে? শুধু  বাইরের জগতের সঙ্গে তো নয়, কঠিন লড়াই হল নিজের সঙ্গে। ভিতরের আমি আর বাইরের আমি র নিরন্তর সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।   তাই কেঁদে ওঠে শিশু। পারবে তো টিঁকে থাকতে? না কি , পরাজিত হতে হবে নিজের কাছে? নিজের অ- দেখা প্রবৃত্তির কাছে? 

    

***

  প্রবৃত্তি( Instinct) জন্মলগ্ন থেকে বহন করে আনতে বাধ্য হয় মানুষ। এই ব্যপারে তার কোনো  পছন্দ- অপছন্দ কাজ করেনা। বিষয়টিতে প্রথম আলোক পাত করেন বিখ্যাত মনো বিজ্ঞানী  সিগম্যানট ফ্রয়েড। এ একেবারে ধামকাধার আবিষ্কার। উপর দেখে নয় বিচার করতে হবে ভিতর দেখে! ভিতর মন। সেখান থেকে আরো আরো খুঁড়ে খুঁড়ে একেবারে শেষ পর্যন্ত। সেই শেষের ঘরে লুকিয়ে আছে যে মন,সে নাকি পশুর মত। কিম্বা তার চাইতেও আগ্রাসী। হিংস্র। লালসা পূর্ণ। 

ফ্রয়েড স্যারের এমন চমকপ্রদ আবিষ্কারের কথা ভালো করে জেনে চোখ কপালে উঠে গেল। মানুষ জন্ম হতেই হিংস্র? তবে সমাজ চলছে কি করে? 

   একটু গুছিয়ে বলা যাক। 

ফ্রয়েড স্যার বললেন যে, যাবতীয় মানসিক চিন্তা ভাবনা তিনটি পথ ধরে এগিয়ে চলে। ইড, ইগো , সুপার - ইগো। 

*****

ইড , মানুষের অচেতন মন। শিশুর মত, পশুর মত...উচিত অনুচিত বোধ থাকে না। খিদে পেলে খাবার, রমণ ইচ্ছে জাগল তো রমণ...আনন্দ চাই।  যেভাবে হোক। চাই। চাই আর চাই। ইড হল মানব মনের মৌলিক স্তর। যেখানে মানব মনের সকল শক্তি নিহিত থাকে।  ইড মূলত মানুষের জৈবিক দিক। মানব মনের স্বভাবজ চাহিদা পূরণ করে ইড। মন যা চায় তাই করো। এর কোনো মানবিক দিক নেই। পুরোটাই লোভ লালসা কাম চিন্তায় ভরপুর। ইড এমন তীব্র ভাবে মানুষকে প্ররোচিত  করে যে, সে প্ররোচনায়  মানুষ যে কোনো অসামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে খুন ধর্ষণ অবধি করতে দ্বিধা বোধ করে না। এক কথায় ইড হচ্ছে আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু। ফ্রয়েড স্যার বলেছেন যে, এই প্রবৃত্তি দখল করে আছে মানব চরিত্রের বেশির ভাগ জায়গা। 

      পাশবিক প্রবৃত্তির ভূমিকা মানুষের জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝা গেল। 

   সুপার ইগোর কথায় আসি একটু।  এ হল আধা অচেতন বা অবচেতন মন।  সুপার ইগো হল মানুষের বিবেক। ইড যখন জৈবিক কামনা পূরণ করতে উদ্দীপ্ত হয়, সুপার ইগো একে বাধা দেয়। সুপার ইগো মানুষ কে সব সময় মানবিক দুর্বলতার উর্ধে উঠে ভালো কাজ করার জন্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। অর্থাৎ, পশু প্রবৃত্তির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে এর অবস্থান। একজন অতি খারাপ তো অপরজন অতি ভালো। এই দুই অতি অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে ইগো বা চেতন মন। কি রকম?

যেমন, ইড বলবে পর্নোমুভি দেখো। দারুণ লাগবে। 

সুপার ইগো ওমনি  লাঠি উঁচিয়ে বলবে, খবর্দার। এটা নৈতিকতা বিরোধী। অতএব দেখা যাবে না। 

ইগো বলবে, পর্ণমুভি দেখো। তবে লুকিয়ে। কেউ যেন জানতে না পারে। 

ইগোর কাজের আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, ফাঁকা রাস্তা আর বাইক সহ কিশোর। এক্ষেত্রে, ইড প্রবৃত্তি উস্কানি দিয়ে বলবে তীব্র বেগে চালিয়ে যাও। যা হয় দেখা যাবে। হেসে নাও দুদিন বই তো নয়।  ফুর্তি করো। মজা লোটো। বাতাসের বেগে বাইক চলাও। সঙ্গে সঙ্গে তার অবচেতন মন বা সুপার ইগো বাধা দেবে। বহু অনিষ্ট হতে পারে সেটা বলবে। এই দোলাচলের মাঝে এসে পড়বে ইগো অর্থাৎ সচেতন সামাজিক মন।  মাঝামাঝি স্পিডে চালাতে নির্দেশ দেবে। 

*****

   আমাদের যখন তিনবছর বয়স তখন থেকে উচিত- অনুচিত বোধ তৈরি হয়। শিখে যাই অনুভূতি চেপে রাখার কৌশল। মন আর মুখ আলাদা করে ফেলতে পারি অনায়াসে। রেসের মাঠে গেলে লোকের নিন্দে, তবে লুকিয়ে যাওয়া যায়। পরকীয়া করা উচিৎ নয়। গোপনে করলে কে জানবে? ইগো সর্বক্ষণ এই ভূমিকা  পালন করে যাচ্ছে। মানুষের আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে সামাজিক প্রবৃত্তির এমন একটা সহাবস্থান কাজ করছে। চেতন মন লুকিয়ে লুকিয়ে সেই কাজটাই করছে, যেটা গোপন মন করতে চায়। প্রকাশ্যে না হলে, চিন্তায় করছে। স্বপ্নের মধ্যে আসছে। অচেতন মন ঘুমের মধ্যেও জাগ্রত থাকে। তাই, সারাদিন যেমন যেমন চিন্তা করি ,অচেতন মনের মধ্যে জমা হতে থাকে সব। স্বপ্নে বহুসময় প্রতিফলিত হয় সেগুলো।

  *****

     কথায় বলে, প্রবৃত্তির হাতে অসহায় মানুষ। নির্মম সত্য। আজকের সভ্য মানুষ সৃষ্ট হয়েছে সমাজের প্রয়োজনে। প্রকৃতপক্ষে সে তো অরণ্যচারী স্বাধীন। জবাবদিহির কোনো প্রয়োজন ছিল না তার। শরীরের ক্ষুধা উদরের ক্ষুধা মেটানো ছিল জন্মগত অধিকার। নারী -পুরুষ জীবনে একজন হতে হবে, এমন মাথার দিব্যি ছিল না। অথবা আইনগত সম্পর্কের বাঁধনে মোটেই  বাঁধা ছিল না সে। যুগের সঙ্গে পরিবর্তন হল পৃথিবীর। পরিবর্তন হল না মানুষের গোপন মনের। সেখানে সে রয়ে গেল স্বেচ্ছাচারী  আদিম।   স্বপ্নদোষ  দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষের। নিরীহ ভালমানুষ ব্যক্তি বহন করে চলে অবদমিত কাম। পতিব্রতা বৌটি  মনে মনে পরকীয়া করে। নিষ্ঠাবতী বিধবা  কান পেতে শোনে রসের গল্প। ধর্ষণের ভিডিও বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ভিডিও তারিয়ে তারিয়ে দেখে অনেকেই। আহা উহু করার মধ্যে দিয়ে সুখানুভূতি  চলকে পড়ে। খুন জখম দাঙ্গার খবর অনেক বেশি আগ্রহ জাগায় সাধারণ খবরের চাইতে। সরাসরি অপরাধ করছে না কিন্তু অপরাধ ঈর্ষা হিংসার ঘটনা শুনে তীব্র  আনন্দ পাওয়া নিজের পাশবিক প্রবৃত্তির  কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া  আর কিছু নয়। 

   

  ****

   ফ্রয়েড স্যার অনেক উপকার করে দিয়েছেন আমাদের। তার কাছে  কৃতজ্ঞ থেকেও বলতে পারি এই পাশবিক মনের আক্রমণ সম্বন্ধে প্রাচীন শাস্ত্র ভালরকম চর্চা করে নানান উপদেশ দিয়ে গেছে। মন চাইছে অথচ পাচ্ছে না...চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যের ব্যবধান থেকে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় হতাশার।  দিনের পর দিন নিজেকে দোষ দিতে দিতে একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। পীড়িত মন দুর্বল মন বহনকারী মানুষকে আত্মহনন থেকে সরে এসে আত্মোপলব্ধি করার পথ দেখিয়েছেনভারতীয় ঋষি -মুনিগণ। 

   মানব চরিত্র সম্পর্কে প্রাচীন যুগের ঋষিকুল মানব চরিত্রের নাড়ি  গলি খুঁজে  ভালো রকম পর্যালোচনা করেছিলেন। প্রবৃত্তির হাতে বন্দী মানব মুক্তি কি করে পাবে? সুপার ইগো ( সুপার ego) অর্থাৎ মনের যে অংশে নীতিবোধ, মানবিকবোধ, নৈতিক চেতনা সুপ্ত থাকে--তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

ভিতর হতে ইচ্ছে জেগে না উঠলে  পশুপ্রবৃত্তি রোধ করা যাবে না। নৈতিক বোধ জাগরণের জন্য নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই জরুরি। প্রকৃষ্টতম  উদাহরণ মহর্ষি বাল্মিকী। দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মিকী। রাম নাম করে একমনে তপস্যা বস্তুত এক্ধরণের কাউনসিলিং।   রত্নাকর অবস্থায় কিন্তু মানুষ হত্যা করতে হাত কাঁপেনি। অনুশোচনা হয় নি। স্বাভাবিক ভাবেই  নিয়েছিলেন দস্যুজীবন। তপস্যা শেষে ভিতর ঘরে জ্বলে উঠল আলো। স্পষ্ট অনুভব করলেন প্রাণ কত মহিমাময়। সামান্য পাখি হত্যা দেখে ঝরে পড়ল অশ্রু। উচ্চারিত হল কবিতা। এখানে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত ইড প্রবৃত্তি। নিজের মনের সঙ্গে বসে ধ্যান করে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করা যায় মানব জীবনের  উদ্দেশ্য রিপু বা প্রবৃত্তির হাতে হারিয়ে যাওয়া নয়। বরং, রিপুকে মহৎ কাজে নিয়োজিত করে জীবন সুন্দর করে তোলা। 

*****

  মানব মনের, অন্ধকার পাশবিক দিক অনেক বেশি শক্তিশালী। তার  অভিঘাত প্রবল প্রচন্ড। সুনামির মত। ভাবনার কথা এই যে, কতখানি পশু আমরা হয়ে উঠতে পারি, সে সম্বন্ধে নিজেরাই জানি না। এমন শক্তিশালী পিশাচের সঙ্গে লড়াই সহজ নয়। নৈতিক বোধ দ্বারা পিশাচ কে হত্যা করতে হলে, কঠিন জীবনচর্যা প্রয়োজন। নিজের আয়নায় নিজেকে দেখে ধুলো ময়লা সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। 

পিশাচ মনের কাজ হল তাৎক্ষণিক খুশির দিকে মনকে চালিত করা। সাধারণ মানুষের ভালো লাগে সেটাই। মদ্যপান, অকারণ হুল্লোড়,ঈর্ষা , আড্ডা , পরনিন্দা, ধর্ষণ, ইভ টিজিং উলঙ্গ শরীর দেখা ...আরো নানা কাজে পিশাচমন উৎসাহ দিতে থাকে। তাৎক্ষণিক খুশির জাল রঙিন সুন্দর। 

ইড ধীরে ধীরে অধিকার করে নেয় মানবমন। প্রবৃত্তির দাস বানিয়ে হরণ করে শান্তি। ভুরি ভুরি ঘটনা আছে উদাহরণ হিসেবে। 

এই পিশাচ মনের ভিতর নিহিত আছে প্রচন্ড শক্তি। ভেঙে যেমন ফেলতে পারে, গড়েও তুলতে পারে। রত্নাকর থেকে বাল্মিকী হতে গেলে অলৌকিক উপায় নয়, চাই নিরলস সাধনা। তবে, সেই প্রবৃত্তি ঘুরে যাবে সুন্দর দিকে, সৃষ্টি  করবে অতুলনীয় জীবন। আমাদের ভিতর ঘরের মন যেন উত্তাল নদী। বাঁধ দিয়ে উৎপদিত হবে বিদ্যুত। দূর করবে অন্ধকার। না হলে? ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মৃত্যুর দিকে। মৃত্যু অর্থ শারীরিক কেবল নয়। মানসিক সুস্থতা  না থাকাও মৃত্যুর সমান। 

******

গভীর অজানা মন লাগাম ছাড়া  ঘোড়ার মত। তাকে  লাগাম পরিয়ে সঠিক পথে চালিত করে ফেলতে হবে। তাৎক্ষণিক সুখের জন্য বহু ক্ষতি করে দিতে পারে বেয়াড়া মন। বহু সমস্যা, দুশ্চিন্তা দুঃ স্বপ্ন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। শরীর খারাপ হতে থাকে। অচেতন মন সাংঘাতিক শক্তিশালী একথা জেনেছি। এই শক্তি বা এনার্জি কিন্তু নেতিবাচক। ক্রমাগত নেতিবাচক ইঙ্গিত করে পথ চ্যুতি  ঘটতে থাকে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কালে অর্জুনের অচেতন মনে এইরকম নেতিবাচক চিন্তার ঝড় উঠেছিল। ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। ইতিবাচক মনোভাব  অর্জন করতে হলে  শ্রীমদ্ভগবত গীতা পড়া জরুরি।  নিরন্তর চর্চার দ্বারা এই নেতিবাচক মন যদি ইতিবাচক দিকে পরিণত হয়, তবে মানুষ হয়ে উঠবে ঈশ্বর। বহুগুণ বেড়ে যাবে জীবনী শক্তি।

*****

মানুষ ভালো - মন্দের ফারাক করতে পারবে। 

অচেতন মন( Id) সচেতন মন( ego) অবচেতন মন( super ego) --তিনটি এক সুতোয় গেঁথে ফেলে মানুষ হয়ে উঠুক নিজভূমে  রাজা। 







      

শনিবার, ৭ আগস্ট, ২০২১

জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                  




সুখ বনাম সাফল্য

❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️


    কোনো কাজ কেন করি? 

বিভিন্ন মতামত উঠে আসতে পারে, একটি বহুল প্রচারিত মত হল, প্যাশন। অর্থাৎ আবেগ। যে কোনো কাজ করি না কেন, চালিকা শক্তি কিন্তু আবেগ। আবেগ থেকে উৎসারিত এনার্জি। সেই এনার্জি শক্তি জুগিয়ে চলে নিরন্তর। তার ফলে, হাজার বাধা বিপত্তির মধ্যেও কাজ করে চলি। 

 কেউ কেউ ছবি এঁকে চলেন, কেউ গান গাইছে, কেউ লিখছে। সবসময়ই যে সেগুলি প্রফেশন হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে তার কোনো মানে নেই, তবু , কাজটা করছে। অদ্ভুত ভালো লাগায় বুঁদ হয়ে করে যাচ্ছে। অফিস করে ঘরের কাজ করে সারাদিন প্রচুর ঝামেলা সামলে বসে পড়ছে নিজের আবেগের কাছে নতজানু হয়ে।

হয়ত কিছু না কিছু সাংঘাতিক দায়িত্ব আছে,  সেটা করতে করতেও এই ধরণের কাজ না করে তাদের ভালো লাগে না। আবার করলেই একটা শান্তি, আনন্দ। মন ভালো থাকে। 

*******

এই হল মূল কথা, মন ভালো থাকে। একবার একজন আমায় বলেছিলেন, আপনি যদি না লিখতেন তাহলে সাধারণ এন আর আই হয়ে থাকতেন। 

 নাহ্। কথাটা মানতে পারিনি। লিখতে ভালোবাসি কিন্তু লেখার উপর আমার সুখী হওয়া নির্ভর করছে, এটা মানতে পারি না। মনে রাখতে হবে, যে কোনো কাজ, সাফল্য অথবা ব্যর্থতা দুই ই বহন করে। তৃপ্তি এবং অতৃপ্তি দুটোই থাকবে। যে কাজটাই করি না কেন, সেটি যদি আমার রুজি রোজগার ও হয়, তবুও, ব্যর্থতা , অতৃপ্তি আসতেই পারে। তৃপ্তি- অতৃপ্তি আলো 😌অন্ধকারের মতই সত্য। এখন , সমস্যা হল, যেই মাত্র অতৃপ্তি এলো, ব্যর্থতা এলো, তক্ষুনি মন খারাপ হল। অর্থাৎ, যে কাজ আমার ভালোলাগা, ভালোবাসা থেকে উৎসারিত ছিল, সেই কাজ থেকে উৎপন্ন হচ্ছে মন খারাপ। হয়ত হার মেনে নিচ্ছি না। হয়ত কাজ ছেড়েও দিচ্ছি না, তবু মন খারাপ লেগে আছে কুয়াশার মত। 

*********

বহু সময় এইরকম নেতিবাচক কথা বন্ধুদের কাছে শুনতে পাই। আর ভালো লাগছে না। 

কারণ স্বরূপ বহু অভিযোগ আদান প্রদান হয়। কিছু ক্ষেত্রে সেগুলি সত্য তো বটেই। সঙ্গত কারণে বঞ্চনা এবং সে থেকে উৎসারিত বিষাদ... মন খারাপ হতেই পারে। 😌

******

ঘটনা দাঁড়াল এই যে, তৃপ্তি: মন ভালো করছে -- অতৃপ্তি: মন খারাপ করছে। ফল স্বরূপ, আমি এমন কিছু উক্তি ব্যবহার করছি অথবা ভাবছি, সেখানেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আমার মনের জমি। 

********

এই ব্যাপার কিন্তু, বহু বিখ্যাত ব্যক্তির জন্যও সত্য। তারা বরং আরো কষ্টকর এক অবস্থার মধ্যে দিয়ে দিন যাপন করেন। প্যাশন বহু ক্ষেত্রে পানিশমেন্ট হয়ে যায়। না পারেন ছেড়ে দিতে আর ধরে রাখতে গিয়ে প্রতিদিন অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।  বিখ্যাত লোকেদের গালাগালি ও খেতে হয় প্রচুর। ঈর্ষা মিথ্যা বদনাম তো থাকেই। উল্টে, কোনোদিন যদি তাদেরও এমন কিছু বলতে বাধ্য হতে হয় বা বলেন সেটা ভিতর মনের বহু গভীরে গিয়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। আজ না হয় কাল অন্যায়বোধ পীড়া দেবেই। মানুষ যতই ভাবুক, আমার ক্ষমতা আছে, বেশ করেছি। সেটা হয় না। শুভ-- অশুভ বোধ মানুষের মধ্যে আছেই। একজন অসৎ মানুষের মধ্যে শুভ বোধের প্রাবল্য কম, তাই তারা হয়ত অক্লেশে অন্যায় করেন, কিন্তু, মনোবিজ্ঞানে এটা প্রমাণিত যে, কোনো কিছুই বিনষ্ট হয়ে যায় না। অবচেতন মনে গিয়ে জমা হয়। সেইগুলো কিন্তু একদিন বিষবাষ্পের মত মস্তিষ্কে আঘাত করে। যে কারণে, এমন কিছু করতে নেই, যা আমার অবচেতন মনে গিয়ে আবর্জনার সৃষ্টি করবে। ইতিহাস প্রমাণ করে দিয়েছে, ক্ষমতাবান প্রভুদের কথাই শেষ কথা নয়। 

********

ঘুরে ফিরে সেই ❤️ আমি। বেদ বারংবার বলেছে , আমি কে সুখী করো। এবার সহজ অঙ্ক হল, সুখী আর সফল 🔆 

 কতটা একে অপরের পরিপূরক? সফল হলেই সুখী হবে? নাহ্। তার কোনো মানে নেই।  কিন্তু, সুখী মানুষ সফল হলেও হতে পারে। এখন, কেউ ভাবতে পারে, যদি কিছু করতে না ই পারলাম , তাহলে সুখ আসবে কি করে? মুশকিল হল, এইখানে অঙ্ক গোলমাল হয়ে যায়। কিছু তো করতেই হবে। ব্যবসা, লেখা, আঁকা ... যাই হোক, এই কিছু করার ক্ষেত্রে প্রাপ্তি নিশ্চিত না ও হতে পারে সেটার জন্য  মন প্রস্তুত থাকতে হবে। যেই পেলাম না, অমনি নেতিবাচক চিন্তা শুরু হল... অমুক পেল আমি পেলাম না। সেইসঙ্গে আরো অনেক কুৎসা রটনা। একে অপ্রাপ্তি তার সঙ্গে অপ্রিয় কথা... ফলত ... সুখ গেল দূরে সৃষ্টির মান গেল নিচে। 

*********

জীবনের মূল লক্ষ্য আমি যেন ভালো থাকি। হতেই পারে পরিস্থিতির শিকার হয়ে লোকসান হয়ে গেল। যতটুকু পাওয়ার পেলাম না। বই লিখলাম, পাঠক নিল না। এই পরিস্থিতি একটাও আমাদের হাতে নেই। যেটা আছে , সেটা হল, আমার মন। সেই মন যেন অতৃপ্ত না থাকে। অসুখী না থাকে। লোকে ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস করুক, আমার স্থিতি হেলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হবে না কারো। স্থিতি স্থির চরিত্রের মুখে একটা ছাপ ফুটে ওঠে। সে ছাপ সুখের ছাপ। পৃথিবীর কোনো ব্যর্থতা সেই সুখ কেড়ে নিতে পারবে না।  


শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                   



 মনের হদিশ/ কিছু কথা

_______________________

   প্যারাসাইকোলজি ব্যাপারটা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। যেহেতু সার্টিফিকেট মেলেনি বিজ্ঞানের কাছ থেকে।কূটতর্কে একদিন হয়ত যাব। কোনো মঞ্চে অথবা দূরদর্শনের পর্দায়। আজ লিখতে হচ্ছে তাদের জন্য, যারা আমার কাছে ক্লাস করতে চায়।

  প্রথমেই বলে রাখি , প্রথাগত কাউন্সিলিং আমি করি না। কিছুটা অতীন্দ্রিয় ব্যাপার থাকে। এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। অনুমান করার ক্ষমতা , কুকুর থেকে পিঁপড়ে প্রত্যেকের কম বেশি থাকে। বিপদের গন্ধ পাওয়ার ইন্দ্রিয় আদিম যুগে মানুষের মধ্যে ছিল। যন্ত্র যতদিন কব্জা না করে ফেলেছে, মানুষের অনুমান ক্ষমতা ছিল প্রখর। পশু ইন্দ্রিয় আজো সজাগ। কারণ ? তাদের যন্ত্র নেই। মানুষের ইন্দ্রিয় লুপ্ত হয়নি। শুধু ক্ষমতা কমে গেছে। 

   আমার থেরাপির মূল কথা হল , নষ্ট হয়ে যাওয়া ইতিবাচক অনুভূতি ফিরিয়ে নিয়ে আনা। এটা সময় সাপেক্ষ। অনেকেই সেটা বুঝতে চায় না। চটজলদি সমাধান চায়। বিনাওষুধে , শুধুমাত্র নিজের সাহায্যে নিজেকে ভালো রাখতে পারার নিয়ম জেনে গেলে জীবন আসে ম্যাজিক। দুঃখ কব্জা করে ফেলতে পারলে দুঃখ হয়ে পড়ে অক্ষম। এটা এখন অনেকেই বুঝে গেছেন। অনেকেই ভালো আছেন। তাদের শুভেচ্ছা নিরন্তর ঝরে পড়ছে , এ আমার পরম সৌভাগ্য। 

 এই যে অনুমান করার ক্ষমতা( মোটেই বিরল নয়) অথবা কাউকে দেখে কিছু আঁচ করার, এমনকি তার বিপদ আসছে না সৌভাগ্য সেটাও বুঝে যাওয়া... এগুলো শেখানো মুশকিল। কেউ কেউ ভাবেন বুঝি, মন্ত্র তন্ত্র অং বং টং করতে হয়। কেন এমন ভাবনা আসে? মন্ত্র শক্তির ক্ষমতা আলাদা। সে ছাড়াও ত হয়। উদাহরণ দিয়ে বলছি, যেমন দৌড়তে সকলে পারে, কিন্তু দৌড় বীর হতে গেলে অভ্যাস জরুরি। অভ্যাস যোগ। ।প্রতিদিন বাড়িয়ে তুলতে হবে নিজের এনার্জি। এনার্জি বাড়ানো কি মুখের কথা? শারীরিক ফিটনেস তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম। তেমনি , মন যাতে তীক্ষ্ণ হয়, বোধ যাতে সঠিক হয়, শান্ত থাকতে হয় তার জন্য। মৌন থাকতে হয়। সঙ্গী নির্বাচন ঠিক মত করতে হয়। সঙ্গী যেন বিরক্ত না করে। অযথা সময় নষ্ট না করে। আর যদি করেও, যদি সঙ্গী তেমন হয়েই যায়, খুব বেশি সময় তাকে না দেওয়াই ভালো। ভুল সঙ্গ দুঃখ তৈরির বড় কারণ। 

 নিয়মিত দর্শন আলোচনা করতে হয়। গভীরে পৌঁছতে হয় প্রতিদিন। প্রতিদিন। একদিন ও ফাঁকি দিলে চলবে না। দর্শন হল আলো। প্রথম প্রথম কঠিন মনে হয়, ধীরে ধীরে আত্মস্থ হয়ে যায়। কত কি ই তো আলোচনা করি কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কিছু বোধ নিয়ে আলোচনা করি না। কেন? কেউ কেউ আবার দর্শন বলতে কিছু সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে দেন 😀 আউড়ে দেন মানে নিজেই বোঝেন না। আমি বলি, কথামৃত পড়ো। সব আলো লুকিয়ে আছে ওখানে।❤️

     কাউন্সিলিং শেখানো যায়। কিন্তু অতীন্দ্রিয় বোধ শেখানোর বিষয় নয়। কেউ কেউ ভাবে😀 এইতো জয়তী দির মত ফোনে ভালো ভালো কথা বললেই তো হয়ে গেল। ওটাই তো জয়তীদি করে। 

ভালো শব্দের কোনো বিকল্প নেই, একথা সত্যি। বাতাবরণে ম্যাজিক তৈরি করতে জানে শব্দ। রাজনৈতিক নেতা কি করে? ধর্ম গুরু কি করে? শব্দের খেলাই তো করেন। কিন্তু, শব্দ দিয়ে মনের পরিস্থিতি বদল করতে চাইলে তার মধ্যে কিছু বস্তু থাকতে হবে। টেলিফোনে কথা বললেও মন পড়ে নিতে হবে। বুঝে নিতে হবে, অপর প্রান্তের মানুষের না বলা উদ্বেগ। আপাত স্বাভাবিক কথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে বড় কোনো অসুখের ইঙ্গিত। ধরে ফেলতে হবে। এটা নিরলস চর্চার কাজ। অসুবিধার কি আছে?😀 কঠিন তো নয়। যদি রান্না করতে পারি যদি রূপচর্চা করতে পারি তবে নিজেকে নিয়ে বসতেও পারি। 

  মূল কথা হল, সময় সকলের জন্য আছে কেবল নিজের জন্য নেই! একটা দিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা। আঠারো ঘণ্টা এনার্জি দিচ্ছি, অন্য লোক প্রশংসা করল না নিন্দে... এই ভেবে। 

 নিন্দে যে করার সে করবেই। সোনারথালায় খেতে দিয়ে,নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেও তারিফ জুটবে না। তারচেয়ে একটু তাকাই আমার দিকে। ক্ষয়ে যাওয়া মনের দিকে। লুকিয়ে থাকা শক্তি বাড়িয়ে তুলি। তবে, হয়ে উঠব নিজের ভরসা সেইসঙ্গে অপরের বন্ধু। মনের বন্ধু।

রবিবার, ২৫ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                             




ঘরোয়া খাদ্যে অমৃত পুষ্টি




  করোনা থাবা ঘরের দরোজা।  নিস্তার মিলবে কি না কেউ জানি না। প্রতিটিদিন মূল্যবান। এখন বোঝা গেছে, কেন বলা হয়, একটি সুস্থ দিন আশীর্বাদের মত। 

  কাল কিসনে দেখা... মহা মূল্যবান এই বাণী। কালকে কি অপেক্ষা করে আছে জানি না। আজ জানি। আজকের লড়াই জানি। নিজেদের কর্মফলের দিকে এগিয়ে চলেছি সেটাও জানি। কর্মফল কোনো আধি ভৌতিক ব্যাপার নয়। যে কাজ করছি তার ফল ভুগছি। সঙ্গে আরো দশজনকে টেনে নিচ্ছি।

পৃথিবীর অন্য দেশ পারছে আমরা পারছি না? মৃত্যুকে বরণ করে নিয়ে আসছি। লক ডাউন জরুরি। হচ্ছে না।

 তবু, কুর্নিশ তাদের যারা একটা অসহায় অবস্থায় লড়াই করে যাচ্ছেন। সেই আমাদের ডাক্তার ভগবানের দল। উপর থেকে কেউ নেমে আসেন না। ডাক্তার আসেন। নিজে নিরাপদ থাকবেন না হয়ত, জেনেও আসেন। 

  ***

আমরা লড়াই করছি। প্রতিদিন নিজের মত করে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি ভাইরাসের প্রবল কামড়। রোজ মেপে চলেছি অক্সিজেন। 

 সত্য যতই নির্মম হোক জারি থাক লড়াই। মন ভালো রাখুন ... বললেই তো মন ভালো হয় না। সেটাও যেমন সত্যি, তেমনি ভয় কিন্তু সৃষ্টি করে ক্ষতিকর হরমোন। তার ফলে লড়াই করার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। ফুসফুসের বাতাস কম হতে থাকে। 

এনার্জি ক্ষয় হয় বেশি কথা বললেও। এইসময় মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় ত্রাস। ত্রাসের আক্রমণে মাথা ঠাণ্ডা রাখা খুব মুশকিল। বাড়ির লোকের সঙ্গে অশান্তি হয়ে চলে। মুখ ভার। ভিতরের ক্ষয় বৃদ্ধি পায়। অতীতের কথা মনে পড়ে। করোনা আগের পরিস্থিতি কত ভালো ছিল! মৃত্যু হচ্ছে কাছের মানুষের। ভয়ঙ্কর রকমের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। অতল খাদের মধ্যে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। এনার্জি আর অবশিষ্ট থাকে না। 

   এনার্জি হল জ্বালানি।  বাঁচিয়ে রাখতে হলে ধ্যান জরুরি। ধ্যান না হোক, নিজেকে নিয়ে একটু বসতেই হবে। বিশেষ করে দুপুরবেলার সময়। ওই সময় সবচেয়ে ক্লান্ত থাকে মন। 

ভাইরাস এসে গেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই। এই সময় নিজেকে চাঙ্গা রাখতে হবে। দুঃখ বোধ আক্রান্ত করবে। এটাও কিন্তু , মহামারীর প্রক্রিয়া। মানুষকে ভিতর হতে বিপর্যস্ত না করে দিতে পারলে, আক্রমণের কামড় সহজ হবে না। 

 দুঃখ বোধ থাকুক। তাকে নিয়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাজারে যেতে হবে। কাজ করতে হবে। মনের এনার্জি লেভেলের দিকে সতর্ক নজর রাখতে হবে। বিপদের সময় কাজে লাগবে এই মন। এমনকি বিপদের পরেও কাজে লাগবে। অনর্থক কথায় ভারাক্রান্ত হয়ে কি লাভ? 

****

নিজের রুটিন ঠিক করে নিন। এখনো লকডাউন হয় নি। অফিস যেতে হচ্ছে। ভয় নয়। যেতে হচ্ছে যখন যেতে হবে। 

সব রকম সতর্কতা সেই সঙ্গে নিজেকে উৎসাহ দেওয়া। পারব। আমি ই পারব। পারতেই হবে। 

  

  ব্যায়াম করা জরুরি। মহামারীর জন্য নয়। এমনিতেই প্রয়োজন। ব্যায়াম কথাটা শুনলেই আমাদের মত মধ্যবয়সী মহিলা পুরুষের কপাল কুঁচকে যায়। আমি বলি, চলতে ফিরতে ব্যায়াম করা যাক। 

১. দুই হাতে যেন ধরে আছি দুটো বালতি , এই ভাবে বালতি দুটো শ্বাস নিয়ে উপরে তুলে, নামিয়ে কোমরের কাছে রেখে , নিচে শ্বাস ছেড়ে নামাতে হবে। পাঁচ বার। শ্বাস নিয়ে উপরে। কোমরে ধরে রাখা। নিচে ছেড়ে দেওয়া। রান্না করতে করতে, অফিসে কাজ করতে করতে করাই যায়। 

২. পিছন দিকে হাঁটা। দশ পা গুণে গুণে। পাঁচ বার। 

৩. লিখতে লিখতে , একটু থেমে, মুখ দিয়ে বাতাস টেনে, মুখ ফুলিয়ে দম বন্ধ করে বাতাস ছেড়ে দেওয়া। যতবার খুশি। 

নিজেই  বুঝবে কতখানি আরাম পাচ্ছে ফুসফুস। 

*****

 বলো তো, কোন ইন্দ্রিয় মানুষের একাধারে বন্ধু ও শত্রু? সে হল জিভ। জিহ্বা। 

স্বাদবস্তু এখানেই অবস্থান করে। আজ ফাস্টফুডের এত রমরমা, সে কিন্তু আমাদের এই ইন্দ্রিয়ের কারণে। 

  মাঝে মাঝে পান্তাভাত খাই। 

লালচাল ভিজিয়ে রাখি। করোনা কাল চলছে। তার উপর গরম। প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান যেমন পটাশিয়াম ক্যালসিয়াম প্রচুর পরিমাণে থাকে। পান্তাভাত থেকে ভিটামিন সি ভিটামিন বি ১২ পাওয়া যায়। দ্রুত যোগায় শক্তি। অনেকক্ষণ কাজ করা যায়। 

পান্তাভাতের জল/ তিন পুরুষের বল।।

 ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। তৈরি হয় ফাইটিক অ্যাসিড। ল্যাকটিক অ্যাসিড। আয়রন ক্যালসিয়াম পটাশিয়াম এত বেশি যে , এই সময় শরীরকে লড়াকু করে তুলতে সাহায্য করে। 

*****

মানুষ চেষ্টা করে যায়। পরিস্থিতি প্রতিকূল। এমন ভয়াবহ মহামারীর কবল থেকে বাঁচার উপায় আমাদের খুঁজতে হবে। হঠাৎ ছোবল মারবে এই ভাইরাস। পরিচিত ডাক্তারের ফোন নম্বর থাক। অক্সিজেন মাপার মেশিন থাক। উপুড় হয়ে শুয়ে পড়া থাক। শরীরে জোর থাক। সেইসঙ্গে মনের জোর থাক।

  যুদ্ধক্ষেত্রে এইগুলি সম্বল করে নেমেছি। তারপর? 

  কাল কিসনে দেখা?

রবিবার, ১৮ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                         


                



মনের ব্যাংক

আজ বলব মনের ব্যাংকিংয়ের কথা। ব্যাংক শব্দটা জড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। নিচুতলা থেকে উঁচুতলা ব্যাংকের দ্বারস্থ সবাই। কারণ, জমা থাক কিছু পুঁজি। অসময়ে কাজে লাগবে। বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। 

জমা করা ,জড়ো করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আরো নানান দিক আছে এই জমিয়ে রাখার ব্যাপারে। যেমন , কথায় কথায় আমরা বলি, এনার্জি বাঁচিয়ে রাখতে। একটু ঘুমিয়ে নিতে। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। পরে কাজ করার সময় বাঁচিয়ে রাখা এনার্জি সাহায্য করবে। ঠিকমত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সঠিক ব্যায়াম করে শরীর ঝরঝর তাজা করে ফেলার উপদেশ সর্বক্ষণ শুনতে হয়। 

তাহলে মনের ব্যাংকিং কি? মনের ঘরের জমা খরচের হিসেব ঠিক কি রকম?

     ******

  মুশকিল হল, ব্যবহারিক জগৎ আর তার উপযোগিতা নিয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিকেশ করে চলেছি। নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছি। চারিদিকে সবকিছু সামলে চলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে বাহবা দিচ্ছি। আজ এমন দুজন মহিলার  গল্প করি। গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 

 প্রথমজন  বাংলাদেশ হতে প্রচুর সংগ্রাম করে কলকাতা এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। জিরো থেকে একেবারে হিরো। ছেলেগুলো হীরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সেইসঙ্গে মা অন্ত প্রাণ। স্বামী অকালে স্বর্গে চলে গেলেও ওনার কোনও  সমস্যা হয় নি। উনি প্রচুর পুজো করতেন। উপোস করতেন। এবং কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এককথায় চতুর যাকে বলে। চারিদিকে সতর্ক নজর। টাকা পয়সা অনেক। ছেলেরা হাতের মুঠোয়। ধন্য ধন্য করত লোক। 

  আজ তিনি বিছানায় শয্যাগত। ছেলেরা রাজকীয় চিকিৎসায় রেখেছে। তার স্মৃতি ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে। কথা বলেন। কথার বেশিরভাগ হল অশ্রাব্য গালি। নোংরা কথার তুবড়ি। নিজের মনেই বলে যান। আয়া নাকি ওনার গোপনাঙ্গে হাত দিয়েছে। একটার পর একটা আয়া বদল। ওনার গালি গালাজ চলতেই থাকে। 


       গল্প ২

____________

 আরেক মহিলার গল্প। সংগ্রামের ইতিহাস দুজনের প্রায় সমান। সাফল্যের বিচারে দ্বিতীয়মহিলা অনেক কম। অর্থভাগ্য ভালো নয়। সন্তান ভাগ্য ভালো নয়। দিনান্তে নিজের ভাত নিজের ফুটিয়ে খাওয়া ছিল তার ভবিতব্য। 

********

এই মহিলা দুজনকে তাদের মধ্যবয়স থেকে দেখেছি। খুব কাছের থেকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করতাম। দুজন মহিলা আমার কাছের মানুষ। দুজনেই বিধবা। দুজনেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

আমি লক্ষ্য করতাম ওদের চলাফেরা, কথাবার্তা। সফল মহিলার চলা ফেরার মধ্যে উগ্র অহঙ্কার ফেটে পড়ত। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সর্বদা অবিশ্বাস। ভুরু দুটি কুঁচকে আছে। নিরামিষ খেলেও প্রচুর ফল দুধ হরলিকস একেবারে সময় মেপে খান। বাড়িঘর নিয়ে ভীষন সচেতন। সিল্কের শাড়ী, গহনা।  অপর মহিলা একবেলা আহার করেন। যত অল্প খাওয়া যায়। নিরন্তর মুখে হাসি। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যে সন্তান রোজ আঘাত করছে তার জন্য প্রার্থনা। অচেনা লোকের জন্যেও শুভ কামনা। সাদাথান ছাড়া কোনো কিছু নেই। এমনকি একটুকরো সোনা পযর্ন্ত নেই। আমি শুনেছি, সফল মহিলা ব্যঙ্গ করে বলতেন," তুমি ভাই ভীষন বোকা। 

উত্তরে মহিলা হাসতেন। বলতেন," আমি খুব শান্তিতে আছি। 

ব্যর্থ মহিলা সুস্থ থেকে সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছেন। এক ফোঁটা সেবা নেননি কারো কাছ হতে। সফল মহিলা বিছানায়। সাধের বাড়িতে রাজত্ব এখন আযাদের, ছেলেরা দেখাশোনা করে কিন্তু থাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সিল্কের শাড়ির হিসাব নেই। গহনা মেয়ের হেফাজতে। কোনো জ্ঞানই নেই। গালাগালি কেন দেন, সেটা এখন আমি জানি। এ বিষয়ে পড়াশুনো করে বুঝেছি, মনের ব্যাংকে যা যা সঞ্চয় হয়ে থাকবে সেগুলো অবচেতনে বেরিয়ে আসে।ওই যে ওনার স্বভাব, যাকে উনি লালন করেছিলেন সযত্নে, মনে করতেন এটাই উচিত। সন্ধ্যে হলেই বাংলা সিরিয়াল দেখতেন। রাতে সেই সিরিয়ালের গল্প বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা ওনার মন একটাই সংকেত দিত সেটা হল, কোথাও বিশ্বাস নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। এটা হয়ত কোনো অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার একটা উপায়। কিন্তু সে উপায় ঠিক না ভুল সেটার প্রমাণ দেয় সময়। উনি মারা গেলে কি হত জানি না তবে বেঁচে আছেন এবং নেগেটিভ স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে আছেন। ওনার মনের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে অবিশ্বাসের পুঁজি। অহঙ্কার। ক্ষমতা লিপ্সা। সেটাই এখন ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছে। 

 মন : ভীষণ শক্তিশালী যন্ত্র। সমস্ত রেখে দেয় নিজের ভিতর। মূল কথা হল আনন্দ এবং এনার্জি। ওই যে অসফল মহিলা , উনি ভিতরে কখনো ক্ষোভ পুষে রাখেন নি। যা পেয়েছেন যতটুকু পেয়েছেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তৃপ্ত থেকেছেন। সন্তান ওনাকে আঘাত করলেও উনি তার জন্য প্রার্থনা করেছেন আর ওই সফল মহিলার সন্তান মাথায় করে রাখলেও উনি ভাবতেন যথেষ্ট করা হচ্ছে না। সুতরাং, সচেতন থাকতেই হবে। আমরা সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করি মন নিয়ে। যা পারি, যেভাবে পারি ঢোকাতে থাকি। রাগ অভিমান দুঃখ ক্ষোভ ... যেন এটা আমার ডাস্টবিন। নাহ্। এই মন আমার বর্ম। আমার অস্ত্র। যা খুশি ভাবে তাকে ব্যবহার করার আগে ভাবতে হবে বইকি। এই ভাবনা আমাদের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেবে। শরীরের উপর কত নজর ! চুল এই করো, ত্বক ওই করো। কিন্তু, চিন্তন? মন? সারাদিন তাকে কি দিচ্ছি?

এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। লেখালিখি কথাটা বলতে এবং শুনতে যত সুন্দর হোক না কেন, সে জগৎ কত ভয়ঙ্কর সে কথা সকলেই জানি। দিনরাত সেখানে অবিশ্বাস আর দুর্নামের খেলা চলছে। একে অপরের নামে বলছি আমরা। পোস্ট লিখছি। ঠকছি। ঠকাচ্ছি। সারাদিন এইভাবেই ভাবছি কি করে আরো আরো লাভবান হওয়া যায়। 

 ঈর্ষা হোক মহতের তরে... 

    কালজয়ী কবি এমন বলতে পারেন। সৃষ্টির মূল কথা ঈর্ষা। 

প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে কাজের আনন্দ কিসের? কিন্তু তার মানে এই নয় যে , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা প্রতিদ্বন্দ্বী র কথা ভাবতে থাকব অথবা অপর কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ক্ষোভ আর হতাশায় ডুবে থাকব। 

  যদি প্রশ্ন হয়, ব্যবসা করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হবে, না হলে সফলতা আসবে না। সব সফল মানুষ কোনো না কোনো সময় অন্যায় করেছেন এবং করছেন। তবে? তারা কি ভালো নেই? সাধু আর বোকা হয়ে এই দুনিয়ায় কোনো লাভ নেই। 

 সমস্যা হল অন্য জায়গায়। জীবনে লাভ হচ্ছে না ক্ষতি সেটা বুঝতে যখন পারি তখন দেরি হয়ে যায় অনেক। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা পরিমিত, তার উপর অযথা ভার চাপিয়ে গেলে এক সময় সে বিদ্রোহ করে, মনের জমির নেওয়ার কিছু সীমিত ক্ষমতা আছে। তাকে এনার্জি তে ভরপুর রাখতে হয়। নেগেটিভ কথা আর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিতে দিতে এক সময় বিদ্রোহ করে সে। 

 শেষের সে দিন কে দেখেছে? লোকে বলবে ভালো লোক কি কষ্ট পায় না? কষ্ট কখনো ভালো মন্দ বিচার করে না। যার পাওয়ার সে পাবেই। কথা হল, মনের ধারণ ক্ষমতা বা শক্তি যার বেশি সে কষ্ট নিয়েও ভালো থাকে। সুন্দর ভাবনা থাকার ফলে তার ভিতর তৈরি হয় পজিটিভ এনার্জি। ওই এনার্জি সাহায্য করে। বয়স হলে শরীরের যন্ত্রপাতির ক্ষয় হবে। কালের নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, মনের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন এনার্জি যোগান দিলে মন সতেজ থাকবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মন ব্যাংকিং। জমা করতে হবে ভালো ভাবনা। সুন্দর চিন্তা। সুন্দর সঙ্গ। সুদে আসলে ফেরত পাওয়া যাবে সময় হলে। 

 টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে ফেলতে হয়। মন বাঁচিয়ে রাখতে হয় বইকি। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন কোন দিক আমাকে বিরক্ত করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গ আমাকে ক্লান্ত করে তুলছে ... এগুলো সুদূর ভবিষ্যতে  এনার্জি ব্যাংকের পুঁজি নষ্ট করে দেবে। সাবধান হতে হবে এখন থেকে। 

ভালো লেখক হওয়ার জন্য নামী পাবলিশার হওয়ার জন্য প্রতিদিন এই যে ধার করা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, ভাবছি কি ভবিষ্যত কি নিয়ে আসছে? অকারণ এনার্জি ক্ষয় করে লাভ নেই। বাঁচিয়ে রাখতে শিখতে হবে। জীবন থাকলে কোনো না কোনো দিকে আমাদের পথ খুলেই যাবে। 

  নিজে আনন্দে থাকলে জগৎ আনন্দময়। এমন চিন্তাশক্তি সবল থাক যার ফলে ভালো হতে বাধ্য। মনের ব্যাংকে বেড়ে উঠুক মঙ্গলধ্বনি। একদিন সেটা কাজে লাগবে আমাদের।।


চিত্রঋণ - অন্তর্জাল

শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                       




মনের হদিশ/ কিছু কথা

_______________________

   প্যারাসাইকোলজি ব্যাপারটা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। যেহেতু সার্টিফিকেট মেলেনি বিজ্ঞানের কাছ থেকে।কূটতর্কে একদিন হয়ত যাব। কোনো মঞ্চে অথবা দূরদর্শনের পর্দায়। আজ লিখতে হচ্ছে তাদের জন্য, যারা আমার কাছে ক্লাস করতে চায়।

  প্রথমেই বলে রাখি , প্রথাগত কাউন্সিলিং আমি করি না। কিছুটা অতীন্দ্রিয় ব্যাপার থাকে। এটা কোনো বড় ব্যাপার নয়। অনুমান করার ক্ষমতা , কুকুর থেকে পিঁপড়ে প্রত্যেকের কম বেশি থাকে। বিপদের গন্ধ পাওয়ার ইন্দ্রিয় আদিম যুগে মানুষের মধ্যে ছিল। যন্ত্র যতদিন কব্জা না করে ফেলেছে, মানুষের অনুমান ক্ষমতা ছিল প্রখর। পশু ইন্দ্রিয় আজো সজাগ। কারণ ? তাদের যন্ত্র নেই। মানুষের ইন্দ্রিয় লুপ্ত হয়নি। শুধু ক্ষমতা কমে গেছে। 

   আমার থেরাপির মূল কথা হল , নষ্ট হয়ে যাওয়া ইতিবাচক অনুভূতি ফিরিয়ে নিয়ে আনা। এটা সময় সাপেক্ষ। অনেকেই সেটা বুঝতে চায় না। চটজলদি সমাধান চায়। বিনাওষুধে , শুধুমাত্র নিজের সাহায্যে নিজেকে ভালো রাখতে পারার নিয়ম জেনে গেলে জীবন আসে ম্যাজিক। দুঃখ কব্জা করে ফেলতে পারলে দুঃখ হয়ে পড়ে অক্ষম। এটা এখন অনেকেই বুঝে গেছেন। অনেকেই ভালো আছেন। তাদের শুভেচ্ছা নিরন্তর ঝরে পড়ছে , এ আমার পরম সৌভাগ্য। 

 এই যে অনুমান করার ক্ষমতা( মোটেই বিরল নয়) অথবা কাউকে দেখে কিছু আঁচ করার, এমনকি তার বিপদ আসছে না সৌভাগ্য সেটাও বুঝে যাওয়া... এগুলো শেখানো মুশকিল। কেউ কেউ ভাবেন বুঝি, মন্ত্র তন্ত্র অং বং টং করতে হয়। কেন এমন ভাবনা আসে? মন্ত্র শক্তির ক্ষমতা আলাদা। সে ছাড়াও ত হয়। উদাহরণ দিয়ে বলছি, যেমন দৌড়তে সকলে পারে, কিন্তু দৌড় বীর হতে গেলে অভ্যাস জরুরি। অভ্যাস যোগ। ।প্রতিদিন বাড়িয়ে তুলতে হবে নিজের এনার্জি। এনার্জি বাড়ানো কি মুখের কথা? শারীরিক ফিটনেস তৈরি করতে প্রচুর পরিশ্রম। তেমনি , মন যাতে তীক্ষ্ণ হয়, বোধ যাতে সঠিক হয়, শান্ত থাকতে হয় তার জন্য। মৌন থাকতে হয়। সঙ্গী নির্বাচন ঠিক মত করতে হয়। সঙ্গী যেন বিরক্ত না করে। অযথা সময় নষ্ট না করে। আর যদি করেও, যদি সঙ্গী তেমন হয়েই যায়, খুব বেশি সময় তাকে না দেওয়াই ভালো। ভুল সঙ্গ দুঃখ তৈরির বড় কারণ। 

 নিয়মিত দর্শন আলোচনা করতে হয়। গভীরে পৌঁছতে হয় প্রতিদিন। প্রতিদিন। একদিন ও ফাঁকি দিলে চলবে না। দর্শন হল আলো। প্রথম প্রথম কঠিন মনে হয়, ধীরে ধীরে আত্মস্থ হয়ে যায়। কত কি ই তো আলোচনা করি কিন্তু হারিয়ে যাওয়া কিছু বোধ নিয়ে আলোচনা করি না। কেন? কেউ কেউ আবার দর্শন বলতে কিছু সংস্কৃত শ্লোক আউড়ে দেন 😀 আউড়ে দেন মানে নিজেই বোঝেন না। আমি বলি, কথামৃত পড়ো। সব আলো লুকিয়ে আছে ওখানে।❤️

     কাউন্সিলিং শেখানো যায়। কিন্তু অতীন্দ্রিয় বোধ শেখানোর বিষয় নয়। কেউ কেউ ভাবে😀 এইতো জয়তী দির মত ফোনে ভালো ভালো কথা বললেই তো হয়ে গেল। ওটাই তো জয়তীদি করে। 

ভালো শব্দের কোনো বিকল্প নেই, একথা সত্যি। বাতাবরণে ম্যাজিক তৈরি করতে জানে শব্দ। রাজনৈতিক নেতা কি করে? ধর্ম গুরু কি করে? শব্দের খেলাই তো করেন। কিন্তু, শব্দ দিয়ে মনের পরিস্থিতি বদল করতে চাইলে তার মধ্যে কিছু বস্তু থাকতে হবে। টেলিফোনে কথা বললেও মন পড়ে নিতে হবে। বুঝে নিতে হবে, অপর প্রান্তের মানুষের না বলা উদ্বেগ। আপাত স্বাভাবিক কথার মধ্যে হয়ত লুকিয়ে আছে বড় কোনো অসুখের ইঙ্গিত। ধরে ফেলতে হবে। এটা নিরলস চর্চার কাজ। অসুবিধার কি আছে?😀 কঠিন তো নয়। যদি রান্না করতে পারি যদি রূপচর্চা করতে পারি তবে নিজেকে নিয়ে বসতেও পারি। 

  মূল কথা হল, সময় সকলের জন্য আছে কেবল নিজের জন্য নেই! একটা দিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা। আঠারো ঘণ্টা এনার্জি দিচ্ছি, অন্য লোক প্রশংসা করল না নিন্দে... এই ভেবে। 

 নিন্দে যে করার সে করবেই। সোনারথালায় খেতে দিয়ে,নিজেকে নিঃশেষ করে দিলেও তারিফ জুটবে না। তারচেয়ে একটু তাকাই আমার দিকে। ক্ষয়ে যাওয়া মনের দিকে। লুকিয়ে থাকা শক্তি বাড়িয়ে তুলি। তবে, হয়ে উঠব নিজের ভরসা সেইসঙ্গে অপরের বন্ধু। মনের বন্ধু।

চিত্রঋণ - মলয় দত্ত

রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                    



নিন্দার ফান্ডা 



নিন্দা অপবাদ সহ্য করতে হয়নি এমন মানুষ বিরল। কোন জগতে নেই? এই সেদিন আমাদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে জানতে পারলাম, শঙ্খ ঘোষের মত মানুষের নামে প্রবল কুৎসা রটনা চলছে। জীবিত কালেও ছিল এবং এখন তাঁর মৃত্যুর পরে! লেখার ভুল ধরা থেকে চারিত্রিক কলঙ্ক ... কিছু বাকি নেই। যারা ওখানে প্রতিবাদ করতে গেছে তাদের তুলোধনা করা হচ্ছে। 

একদল লোক সর্বদাই মজা লোটার জন্য কুৎসায় অংশ গ্রহণ করে, তারা সবচেয়ে ঘৃণিত। ইধার এবং উধার এই রকম চরিত্র কোনো জায়গায় ঠাঁই পায়না। 


 এবার বলি, আমাদের আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। সারাজীবন জ্বলেছেন তিনি। লেখার সমালোচনা থেকে চরিত্র... জীবিত এবং মৃত কোনো অবস্থায় রেহাই দেওয়া হয়নি তাঁকে। কি হত? যদি কলম নামিয়ে রাখতেন? আজ কোথায় থাকত বাঙালি? সামনে তেল মেরে পিছনে নিন্দে করতে এতটুকু লজ্জা বোধ হয়নি বাঙালির!

🔥🔥🔥🔥🔥


    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আপামর চিত্ত চেতনার প্রতিটি কোষ ঝঙ্কৃত হয় এই একটি নামে। শোক দুঃখ আনন্দ,প্রেম বিরহে বিষাদ... যখন যেমন মনে হয়, হাত বাড়ালেই আছেন তিনি।  আজো পর্যন্ত কত মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে তাঁর জন্য। রোদ ঝড় জল ... তিনি আছেন ...আশ্রয়ের মত। 

   এখন ২০২০ সাল। করোনা আক্রান্ত পৃথিবী। তার মাঝেও মহাসমারোহে  পালন করা হয় রবিঠাকুরের জন্মদিন। 

‌ভাবলে অবাক লাগে , আজ যাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা , একদিন তাঁকে নির্মম ভাবে সহ্য করতে হয়েছিল নিন্দুকের চপটাঘাত। বিষ  নিন্দার আঘাতে জর্জরিত রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন --    :এমন অনবরত , এমন অকরুণ, এমন অপ্রতিহত অসসম্মাননা আমার মত আর কোনো সাহিত্যিককে সইতে হয় নি! ( ১৩৩৮ সাল/ নোবেল পুরস্কার লাভ করার পরে)

‌🙏🙏🙏🙏

।          মহৎ সৃষ্টি করতে গেলে গোলাপ পাঁপড়ি বিছিয়ে রাখা পথ থাকে না কোথাও। প্রত্যেকে তাদের নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে জানেন কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হয় কাঁটার আঘাতে। অযথা কুৎসা অযথা মিথ্যা রটনা  ভয়ংকর আক্রমণ ... বারবার আছড়ে পড়ে সুনামির ঢেউয়ের মত। নিজের চেনা বৃত্ত হতেই আঘাত আসে বেশি।  নিজের কাছের লোকের হাতে লকলক করে ঈর্ষার ছুরি। 

    আজকেও যারা চেষ্টা করছেন দুর্দিনে বাংলা বই মাথা তুলে দাঁড়ায় যেন, কত ভাবে হেনস্থা হচ্ছে তারা!    

     ❤️❤️❤️      রবীন্দ্রনাথ আক্রান্ত ছিলেন যাঁদের হাতে, সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সেই সময় খ্যাতির শিখরে আছেন তাঁরাও। মানুষ তাঁদের মান দিচ্ছে। তাঁদের রচনা ছড়িয়ে পড়ছে দেশে বিদেশে। নাহ্। তাতে শান্তি নেই। ঠাকুর পরিবারের ওই রবি নামতেই হবে নিচে। নামতেই হবে নোংরা পাঁকে। অদ্ভুত এই বিকৃত মানসিকতার শিকার ছিল তৎকালীন সমাজের বহু বিখ্যাত লোক। কিন্তু কেন? কেন বহন করে মানুষ নিন্দা নামক বিষ? এর কারণ জানতে হলে, একটু আলোচনা করা যাক অন্যদিক দিয়ে। 

 এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন:

‌   :পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং ব্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে যে সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে। .....

       ‌বস্তুত নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কী থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, সে ভালো কাজের দাম কী! একটা ভালো কিছু লিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে! ...‌কেবল, প্রার্থনা এই যে, এরূপ নিন্দা যাহার স্বভাবসিদ্ধ সেই দুর্ভাগাকে যেন দয়া করিতে পারি।🙏


‌      দীর্ঘ উক্তি তুলে ধরলাম। কতখানি রক্তাক্ত হৃদয় থেকে তিনি এমন কথা বলেছেন। সহ্য করেছেন কত মিথ্যা লাঞ্ছনা! 

‌১৯২২ সাল। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়  নিজের লেখা গ্রন্থ :রবীন্দ্রছন্দ: 

  তার ভূমিকায় লিখলেন: 

‌      :রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ উপহাস কুৎসা কটু বাক্য গালি গালাজ করিতে দেশে অপরিমিত মূলধনে একটি স্বদেশী যৌথ কারবার স্থাপিত হইয়াছে।


   যৌথ করবার এই মুহূর্তে , লকডাউনের অলস বাজারে এমন যৌথ কারবার রমরম করে চলছে। তবে, বিন্দাস থাকুন। আপনি অন্যায় না করলে কেউ কিছু করতে পারবে না। কুৎসার এত শক্তি নেই যে সরল সৎ মানুষের চুল স্পর্শ করার  আরো উদাহরণ দিতে পারি। কুৎসা রটনা কারি এখন সব কোথায়?

    ‌১৮৮৮ সাল। কালীপ্রসন্ন কাব্য বিশারদ একটি ব্যাঙ্গাত্মক ছড়ার বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম -- মিঠেকড়া।

    প্যারোডি করে লিখলেন সেই অযোগ্য কবি: 

‌ উড়িসনে রে পায়রা কবি

‌ খোপের ভিতর থাক ঢাকা

‌  তোর বকবকমম আর ফোঁস ফোঁসানি

‌তাও কবিত্বের ভাব মাখা।...

‌ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ 

‌ বঙ্গের আদর্শ কবি 

‌ শিখেছি তাহারে দেখি

‌  তোরা কেউ কবি হবি? 


‌ পাঠক! এখুনি চমকে যেও না। আরো অজস্র তীর আসছে ছুটে। বিখ্যাত কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। এমন সব কটূক্তি করতেন যে, কানে আঙ্গুল দিতে হয়। 

‌আনন্দ বিদায় 

   নামক একটি ব্যঙ্গ নাটিকায় তাঁর ( ডি এ ল রয়) আক্রমণের ভাষা স্তম্ভিত করে। 

‌:একাধারে কবি, অধিকারী , ঋষি কিবা ত্যাগ, কিবা দান

‌ পরিষৎ জল ছিটিয়ে দিলেই ( কবিবর) স্বর্গে উঠিয়া যান।  ‌সুহাসচন্দ্র রায়। তিনি সমালোচনা বিজ্ঞান প্রথম ভাগ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। 

‌" রবি পরম গুরু। তিনি হেলিলে হেলিবে। দুলিলে দুলিবে।"

      ‌ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। দেশবন্ধু সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকায় বিরোধিতা হত রবীন্দ্রনাথের!

‌বহুলোক এই ধরণের মন্তব্য করতে পিছপা হত না যে, বড়লোকের ছেলে। এত প্রতিপত্তি। কথায় কথায় বিলেত যান। দরকার কি ছিল বাংলা সাহিত্য চর্চা করার? ছড়া বাঁধা হল: 

‌🔥 আয় তোরা কে দেখতে যাবি।

‌ঠাকুর বাড়ির মস্ত কবি

‌হায়রে কপাল হায়রে অর্থ

‌ যার নাই তার সকল ব্যর্থ। 

🔥🔥🔥🔥

‌ হায়!  মানুষের চরিত্র। ধনীর সন্তান । তাই অধিকার নেই সাহিত্য চর্চার! কী অদ্ভুত বিচার! 

‌*********

‌ এই প্রসঙ্গে আলোচনা করি, ঈর্ষা নামক মানসিক ব্যাধির কথা। অপরের সব ভালো, আর আমার কিছু হচ্ছে না, এই মনোভাব থেকে যে মানসিক জ্বলন , ভালো না লাগা , রাগ__সেটাই ঈর্ষা। ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে যখন সেই মানুষটির ক্ষতি কামনা করা হয় এবং আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় ক্ষতি করতে, তখন সেটা পরিণত হয় হিংসায়। এবং , ধীরে ধীরে স্ফুলিঙ্গের থেকে জ্বলে ওঠে দাবানল। 

‌একজন মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে জানি, ঈর্ষা থেকে হার্টের অসুখ হতে পারে। নার্ভাস ব্রেকডাউন হতে পারে। বদ হজম , ডিপ্রেসন, মাথা ব্যাথা__কিছুটা হলেও, এসব রোগের মূল কারণ মন এবং মনের মধ্যে জেগে ওঠা বিকার। ঈর্ষা হোক। হোক মহতের তরে। মহৎ লাভের আশায় ঈর্ষা করলে, জীব ও জগতের উপকার। 

‌***

‌ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের কথায়। ঋষিকল্প মানুষটি কিভাবে সহ্য করেছিলেন এইরকম বিষের জ্বালা?  সম্ভব হত কী? কবির কথায় দেখে নি একবার: 

‌ " কেবল এই কথাটা আমি 

‌বুঝিবার ও বুঝাইবার চেষ্টায় ছিলাম যে সাধারনত মানুষ নিন্দা করিয়া যে সুখ পায়,। তাহা বিদ্বেষের সুখ নহে। বিদ্বেষ কখনোই সাধারণভাবে সুখকর হইতে পারে না। এবং বিদ্বেষ সমস্ত সমাজের স্তরে স্তরে পরিব্যাপ্ত হইলে যে বিষ হজম করা সমাজের অসাধ্য। 

     নিন্দা বিরোধ গায়ে বাজে না, এমন কথা অল্প লোকই বলিতে পারে। 

‌যাহার হৃদয় বেশি তাহার ব্যথা পাইবার শক্তিও বেশি।

‌    কতখানি জমাট বাঁধা অভিমান থেকে এমন কথা কবি বলেছেন, ভাবতে গেলে মন ভরে ওঠে গভীর বিষাদে। মানুষ অদ্ভুত। মাথায় তুলে নিতেও দেরি নেই। নিচে ফেলে গুঁড়িয়ে দিতেও পিছপা হয় না। 


(তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ক বিভিন্ন বই। 

রবীন্দ্র বিদুষণ ইতিবৃত্ত: আদিত্য অহদেদার ব্যাখ্যা : নিজস্ব।)


শেষে একটা ফুটনোট দেব: 

যত নিন্দা তত সমৃদ্ধি।


শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১

জয়তী রায় (মুনিয়া)

                                                               




   আজকের আলোচনা করব মানবমন নিয়ে। এখন ২০২১ সাল। চলছে মহামারির তাণ্ডব। কি হবে তার মধ্যে এই মনের কচকচি কেন? 

প্রয়োজন বইকি! মন ঠিক না থাকলে শরীর নিয়ে লড়াই করা মুশকিল। মরণাপন্ন রুগী উঠে দাঁড়াতে পারে  মনের জোর থাকলে। আর শুধু রোগের কথা ই বা কেন? প্রতিদিনের জীবন চর্যায়  মনের ভুমিকা স্বীকার করতেই হবে। বিবাহিত জীবনে মন বড় ভুমিকা পালন করে। দাম্পত্য পুরনো হয়ে গেলেই পরকীয়া এসে হানা দেয়। কেন? মন কেন চায় অখণ্ড স্বাধীনতা? এটা কোনো দোষ নয়। ধর্ষণ বিদেশে এত বেশি হয় না। কারণ, মনের কোন জায়গা থেকে এইরকম ভযঙ্কর ইচ্ছের উত্পত্তি সে সম্বন্ধে ছোট থেকে বাচ্চাদের সচেতন করে দেওয়া হয়। এই দেশে বাচ্চারা যত মায়ের বেবি হয়ে থাকবে ততই ভারতীয় মা খুশি। শিশু কোনো অবোধ প্রাণী নয়। মাত্র তিন মাস থেকে যৌন আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে তার শরীরে। অথচ, মায়েরা ভাবে, শিশু অবোধ। আধো আলো  আধো অন্ধকারে থাকতে থাকতে একমাত্র sex  নিয়ে সারাজীবন কৌতূহলী থেকে যায়। 

মন খারাপে ভোগে। লেখাপড়া, সম্পর্ক সবকিছুতে ছাপ পড়ে। 

********



জন্ম নিয়েই কেঁদে ওঠে শিশু। 

  আগামী দিনের লড়াইয়ের কথা ভেবে হয়ত মন খারাপ হয়। পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়ে না জানি কত  লড়াই করতে হবে? শুধু  বাইরের জগতের সঙ্গে তো নয়, কঠিন লড়াই হল নিজের সঙ্গে। ভিতরের আমি আর বাইরের আমি র নিরন্তর সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।   তাই কেঁদে ওঠে শিশু। পারবে তো টিঁকে থাকতে? না কি , পরাজিত হতে হবে নিজের কাছে? নিজের অ- দেখা প্রবৃত্তির কাছে? 

    

***

  প্রবৃত্তি( Instinct) জন্মলগ্ন থেকে বহন করে আনতে বাধ্য হয় মানুষ। এই ব্যপারে তার কোনো  পছন্দ- অপছন্দ কাজ করেনা। বিষয়টিতে প্রথম আলোক পাত করেন বিখ্যাত মনো বিজ্ঞানী  সিগম্যানট ফ্রয়েড। এ একেবারে ধামকাধার আবিষ্কার। উপর দেখে নয় বিচার করতে হবে ভিতর দেখে! ভিতর মন। সেখান থেকে আরো আরো খুঁড়ে খুঁড়ে একেবারে শেষ পর্যন্ত। সেই শেষের ঘরে লুকিয়ে আছে যে মন,সে নাকি পশুর মত। কিম্বা তার চাইতেও আগ্রাসী। হিংস্র। লালসা পূর্ণ। 

ফ্রয়েড স্যারের এমন চমকপ্রদ আবিষ্কারের কথা ভালো করে জেনে চোখ কপালে উঠে গেল। মানুষ জন্ম হতেই হিংস্র? তবে সমাজ চলছে কি করে? 

   একটু গুছিয়ে বলা যাক। 

ফ্রয়েড স্যার বললেন যে, যাবতীয় মানসিক চিন্তা ভাবনা তিনটি পথ ধরে এগিয়ে চলে। ইড, ইগো , সুপার - ইগো। 

*****

ইড , মানুষের অচেতন মন। শিশুর মত, পশুর মত...উচিত অনুচিত বোধ থাকে না। খিদে পেলে খাবার, রমণ ইচ্ছে জাগল তো রমণ...আনন্দ চাই।  যেভাবে হোক। চাই। চাই আর চাই। ইড হল মানব মনের মৌলিক স্তর। যেখানে মানব মনের সকল শক্তি নিহিত থাকে।  ইড মূলত মানুষের জৈবিক দিক। মানব মনের স্বভাবজ চাহিদা পূরণ করে ইড। মন যা চায় তাই করো। এর কোনো মানবিক দিক নেই। পুরোটাই লোভ লালসা কাম চিন্তায় ভরপুর। ইড এমন তীব্র ভাবে মানুষকে প্ররোচিত  করে যে, সে প্ররোচনায়  মানুষ যে কোনো অসামাজিক অপরাধ থেকে শুরু করে খুন ধর্ষণ অবধি করতে দ্বিধা বোধ করে না। এক কথায় ইড হচ্ছে আমাদের ভিতরের সুপ্ত পশু। ফ্রয়েড স্যার বলেছেন যে, এই প্রবৃত্তি দখল করে আছে মানব চরিত্রের বেশির ভাগ জায়গা। 

      পাশবিক প্রবৃত্তির ভূমিকা মানুষের জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ সেটা বোঝা গেল। 

   সুপার ইগোর কথায় আসি একটু।  এ হল আধা অচেতন বা অবচেতন মন।  সুপার ইগো হল মানুষের বিবেক। ইড যখন জৈবিক কামনা পূরণ করতে উদ্দীপ্ত হয়, সুপার ইগো একে বাধা দেয়। সুপার ইগো মানুষ কে সব সময় মানবিক দুর্বলতার উর্ধে উঠে ভালো কাজ করার জন্য মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। অর্থাৎ, পশু প্রবৃত্তির সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে এর অবস্থান। একজন অতি খারাপ তো অপরজন অতি ভালো। এই দুই অতি অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে ইগো বা চেতন মন। কি রকম?

যেমন, ইড বলবে পর্নোমুভি দেখো। দারুণ লাগবে। 

সুপার ইগো ওমনি  লাঠি উঁচিয়ে বলবে, খবর্দার। এটা নৈতিকতা বিরোধী। অতএব দেখা যাবে না। 

ইগো বলবে, পর্ণমুভি দেখো। তবে লুকিয়ে। কেউ যেন জানতে না পারে। 

ইগোর কাজের আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, ফাঁকা রাস্তা আর বাইক সহ কিশোর। এক্ষেত্রে, ইড প্রবৃত্তি উস্কানি দিয়ে বলবে তীব্র বেগে চালিয়ে যাও। যা হয় দেখা যাবে। হেসে নাও দুদিন বই তো নয়।  ফুর্তি করো। মজা লোটো। বাতাসের বেগে বাইক চলাও। সঙ্গে সঙ্গে তার অবচেতন মন বা সুপার ইগো বাধা দেবে। বহু অনিষ্ট হতে পারে সেটা বলবে। এই দোলাচলের মাঝে এসে পড়বে ইগো অর্থাৎ সচেতন সামাজিক মন।  মাঝামাঝি স্পিডে চালাতে নির্দেশ দেবে। 

*****

   আমাদের যখন তিনবছর বয়স তখন থেকে উচিত- অনুচিত বোধ তৈরি হয়। শিখে যাই অনুভূতি চেপে রাখার কৌশল। মন আর মুখ আলাদা করে ফেলতে পারি অনায়াসে। রেসের মাঠে গেলে লোকের নিন্দে, তবে লুকিয়ে যাওয়া যায়। পরকীয়া করা উচিৎ নয়। গোপনে করলে কে জানবে? ইগো সর্বক্ষণ এই ভূমিকা  পালন করে যাচ্ছে। মানুষের আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে সামাজিক প্রবৃত্তির এমন একটা সহাবস্থান কাজ করছে। চেতন মন লুকিয়ে লুকিয়ে সেই কাজটাই করছে, যেটা গোপন মন করতে চায়। প্রকাশ্যে না হলে, চিন্তায় করছে। স্বপ্নের মধ্যে আসছে। অচেতন মন ঘুমের মধ্যেও জাগ্রত থাকে। তাই, সারাদিন যেমন যেমন চিন্তা করি ,অচেতন মনের মধ্যে জমা হতে থাকে সব। স্বপ্নে বহুসময় প্রতিফলিত হয় সেগুলো।

  *****

     কথায় বলে, প্রবৃত্তির হাতে অসহায় মানুষ। নির্মম সত্য। আজকের সভ্য মানুষ সৃষ্ট হয়েছে সমাজের প্রয়োজনে। প্রকৃতপক্ষে সে তো অরণ্যচারী স্বাধীন। জবাবদিহির কোনো প্রয়োজন ছিল না তার। শরীরের ক্ষুধা উদরের ক্ষুধা মেটানো ছিল জন্মগত অধিকার। নারী -পুরুষ জীবনে একজন হতে হবে, এমন মাথার দিব্যি ছিল না। অথবা আইনগত সম্পর্কের বাঁধনে মোটেই  বাঁধা ছিল না সে। যুগের সঙ্গে পরিবর্তন হল পৃথিবীর। পরিবর্তন হল না মানুষের গোপন মনের। সেখানে সে রয়ে গেল স্বেচ্ছাচারী  আদিম।   স্বপ্নদোষ  দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষের। নিরীহ ভালমানুষ ব্যক্তি বহন করে চলে অবদমিত কাম। পতিব্রতা বৌটি  মনে মনে পরকীয়া করে। নিষ্ঠাবতী বিধবা  কান পেতে শোনে রসের গল্প। ধর্ষণের ভিডিও বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের ভিডিও তারিয়ে তারিয়ে দেখে অনেকেই। আহা উহু করার মধ্যে দিয়ে সুখানুভূতি  চলকে পড়ে। খুন জখম দাঙ্গার খবর অনেক বেশি আগ্রহ জাগায় সাধারণ খবরের চাইতে। সরাসরি অপরাধ করছে না কিন্তু অপরাধ ঈর্ষা হিংসার ঘটনা শুনে তীব্র  আনন্দ পাওয়া নিজের পাশবিক প্রবৃত্তির  কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া  আর কিছু নয়। 

   

  ****

   ফ্রয়েড স্যার অনেক উপকার করে দিয়েছেন আমাদের। তার কাছে  কৃতজ্ঞ থেকেও বলতে পারি এই পাশবিক মনের আক্রমণ সম্বন্ধে প্রাচীন শাস্ত্র ভালরকম চর্চা করে নানান উপদেশ দিয়ে গেছে। মন চাইছে অথচ পাচ্ছে না...চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যের ব্যবধান থেকে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় হতাশার।  দিনের পর দিন নিজেকে দোষ দিতে দিতে একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। পীড়িত মন দুর্বল মন বহনকারী মানুষকে আত্মহনন থেকে সরে এসে আত্মোপলব্ধি করার পথ দেখিয়েছেনভারতীয় ঋষি -মুনিগণ। 

   মানব চরিত্র সম্পর্কে প্রাচীন যুগের ঋষিকুল মানব চরিত্রের নাড়ি  গলি খুঁজে  ভালো রকম পর্যালোচনা করেছিলেন। প্রবৃত্তির হাতে বন্দী মানব মুক্তি কি করে পাবে? সুপার ইগো ( সুপার ego) অর্থাৎ মনের যে অংশে নীতিবোধ, মানবিকবোধ, নৈতিক চেতনা সুপ্ত থাকে--তাকে জাগিয়ে তুলতে হবে।

ভিতর হতে ইচ্ছে জেগে না উঠলে  পশুপ্রবৃত্তি রোধ করা যাবে না। নৈতিক বোধ জাগরণের জন্য নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই জরুরি। প্রকৃষ্টতম  উদাহরণ মহর্ষি বাল্মিকী। দস্যু রত্নাকর থেকে বাল্মিকী। রাম নাম করে একমনে তপস্যা বস্তুত এক্ধরণের কাউনসিলিং।   রত্নাকর অবস্থায় কিন্তু মানুষ হত্যা করতে হাত কাঁপেনি। অনুশোচনা হয় নি। স্বাভাবিক ভাবেই  নিয়েছিলেন দস্যুজীবন। তপস্যা শেষে ভিতর ঘরে জ্বলে উঠল আলো। স্পষ্ট অনুভব করলেন প্রাণ কত মহিমাময়। সামান্য পাখি হত্যা দেখে ঝরে পড়ল অশ্রু। উচ্চারিত হল কবিতা। এখানে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত ইড প্রবৃত্তি। নিজের মনের সঙ্গে বসে ধ্যান করে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করা যায় মানব জীবনের  উদ্দেশ্য রিপু বা প্রবৃত্তির হাতে হারিয়ে যাওয়া নয়। বরং, রিপুকে মহৎ কাজে নিয়োজিত করে জীবন সুন্দর করে তোলা। 

*****

  মানব মনের, অন্ধকার পাশবিক দিক অনেক বেশি শক্তিশালী। তার  অভিঘাত প্রবল প্রচন্ড। সুনামির মত। ভাবনার কথা এই যে, কতখানি পশু আমরা হয়ে উঠতে পারি, সে সম্বন্ধে নিজেরাই জানি না। এমন শক্তিশালী পিশাচের সঙ্গে লড়াই সহজ নয়। নৈতিক বোধ দ্বারা পিশাচ কে হত্যা করতে হলে, কঠিন জীবনচর্যা প্রয়োজন। নিজের আয়নায় নিজেকে দেখে ধুলো ময়লা সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। 

পিশাচ মনের কাজ হল তাৎক্ষণিক খুশির দিকে মনকে চালিত করা। সাধারণ মানুষের ভালো লাগে সেটাই। মদ্যপান, অকারণ হুল্লোড়,ঈর্ষা , আড্ডা , পরনিন্দা, ধর্ষণ, ইভ টিজিং উলঙ্গ শরীর দেখা ...আরো নানা কাজে পিশাচমন উৎসাহ দিতে থাকে। তাৎক্ষণিক খুশির জাল রঙিন সুন্দর। 

ইড ধীরে ধীরে অধিকার করে নেয় মানবমন। প্রবৃত্তির দাস বানিয়ে হরণ করে শান্তি। ভুরি ভুরি ঘটনা আছে উদাহরণ হিসেবে। 

এই পিশাচ মনের ভিতর নিহিত আছে প্রচন্ড শক্তি। ভেঙে যেমন ফেলতে পারে, গড়েও তুলতে পারে। রত্নাকর থেকে বাল্মিকী হতে গেলে অলৌকিক উপায় নয়, চাই নিরলস সাধনা। তবে, সেই প্রবৃত্তি ঘুরে যাবে সুন্দর দিকে, সৃষ্টি  করবে অতুলনীয় জীবন। আমাদের ভিতর ঘরের মন যেন উত্তাল নদী। বাঁধ দিয়ে উৎপদিত হবে বিদ্যুত। দূর করবে অন্ধকার। না হলে? ভাসিয়ে নিয়ে যাবে মৃত্যুর দিকে। মৃত্যু অর্থ শারীরিক কেবল নয়। মানসিক সুস্থতা  না থাকাও মৃত্যুর সমান। 

******

গভীর অজানা মন লাগাম ছাড়া  ঘোড়ার মত। তাকে  লাগাম পরিয়ে সঠিক পথে চালিত করে ফেলতে হবে। তাৎক্ষণিক সুখের জন্য বহু ক্ষতি করে দিতে পারে বেয়াড়া মন। বহু সমস্যা, দুশ্চিন্তা দুঃ স্বপ্ন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। শরীর খারাপ হতে থাকে। অচেতন মন সাংঘাতিক শক্তিশালী একথা জেনেছি। এই শক্তি বা এনার্জি কিন্তু নেতিবাচক। ক্রমাগত নেতিবাচক ইঙ্গিত করে পথ চ্যুতি  ঘটতে থাকে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কালে অর্জুনের অচেতন মনে এইরকম নেতিবাচক চিন্তার ঝড় উঠেছিল। ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। ইতিবাচক মনোভাব  অর্জন করতে হলে  শ্রীমদ্ভগবত গীতা পড়া জরুরি।  নিরন্তর চর্চার দ্বারা এই নেতিবাচক মন যদি ইতিবাচক দিকে পরিণত হয়, তবে মানুষ হয়ে উঠবে ঈশ্বর। বহুগুণ বেড়ে যাবে জীবনী শক্তি।

*****

মানুষ ভালো - মন্দের ফারাক করতে পারবে। 

অচেতন মন( Id) সচেতন মন( ego) অবচেতন মন( super ego) --তিনটি এক সুতোয় গেঁথে ফেলে মানুষ হয়ে উঠুক নিজভূমে  রাজা। 







      

রবিবার, ২ মে, ২০২১

জয়তী রায়(মুনিয়া)

                                       



 মধ্যবয়স/ মুড সুইং/ আধ্যাত্মিক দিক।


  আধ্যাত্মিকতা কথাটা খটোমটো। ইংলিশ সহজ। স্পিরিচুয়ালটি। spirituality.এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সংযোগ নেই। অর্থাৎ ধার্মিক লোক স্পিরিচুয়াল হতে পারে কিন্তু স্পিরিচুয়াল ব্যক্তিকে ধার্মিক হতে হবে না। 

  মধ্য বয়স আলোচনা করতে গিয়ে আধ্যাত্মিকতা কেন এলো , সেটা বোঝাতে গেলে, বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। 

ধৃ + মন = ধর্ম। ধৃ মানে হল ধারণ বা গ্রহণ করা আর মন হল অন্তর , আত্মা পরমাত্মা। তাহলে, ধর্মের অর্থ হল , মন যাহাকে গ্রহণ করে শান্তি লাভ করে। 

এখন ধর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্প্রদায় কেন্দ্রিক। বৃহৎ অর্থ হারিয়ে গেছে। মধ্যবয়সে পৌঁছে মানুষের মন টাল মাটাল হতে থাকে। শরীর এবং মন উভয় দিকেই পরিবর্তন আসতে থাকে। পুরনো দিনের কথা বড় বেশি করে গ্রাস করে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, লেখক লেখিকা মধ্যবয়সে পৌঁছে অতীত চারণ করেন বেশি। পুরানো সেই দিনের কথা... আক্রান্ত করে। কলেজ লাইফের দুরন্ত জীবন...খুব মনে পড়ে। এইরকম একটা সময়ে বেশ অনেকেই ধর্ম করতে ছোটেন। এমনও বলতে শোনা যায়: বুড়ো হতে চলেছি। ধর্ম কর্ম নিয়ে থাকি এইবার। 

অতঃপর আশ্রম এবং বাবাজীর খপ্পরে পড়তে বেশি দেরি হয় না। 

 তাহলে? ঈশ্বর সাধনা করতে হবে না?  দান ধ্যান পুজো কিছুই লাগবে না? 

কিছু পুজো বাড়ির পরম্পরা। সেগুলি রক্ষা করতে হয়। কিন্তু, মধ্য বয়সে হঠাৎ করে ধর্মে আসক্তি হলে সমস্যা হয় এটাই, ভীষন ভাবে আচার সর্বস্ব হয় মন। অর্থাৎ, এই বারে এই খাব না। অমুক সময় ঘরে থাকব। আরো হাজার কিছু। কেউ কেউ প্রচন্ড রকম শুচি বাই হয়ে পড়েন। মহিলাদের ক্ষেত্রে বেড়ে চলে বাতিক। সুস্থ শরীর কে ব্যস্ত করে তোলার নানা প্রক্রিয়া চলে। মধ্য বয়সে মনের জানালা আপনা থেকেই সঙ্কুচিত হতে থাকে। ধর্ম যদি সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হয়, তবে জানালা বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরি। মন নষ্ট হতে থাকে। বিকার গ্রস্থ হতে থাকে।

 ***********

এখানেই প্রয়োজন spirituality. ধর্মকে ঠিক মত ব্যবহার করা যায়, যদি মানুষটা আধ্যাত্মিক হয়। অর্থাৎ পরিণত হয়। কোনো কিছুই অন্ধের মত বিশ্বাস করে আঁকড়ে ধরলে বিপদ হতে পারে। বয়সের তেজ যত ঢলে যেতে থাকে, লাঠির প্রয়োজন তত বেশি। মন সর্বদাই ভাবতে থাকে: অমুক এলে কি ভালো হয়। অথবা, আগে কত লোক আসত, এখন কেউ আসে না। আনন্দের উৎস, যদি ব্যক্তি বিশেষ অথবা বস্তু বিশেষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন  অনুগ্রহের পাত্র হয়ে দাঁড়াতে হয়। সবচেয়ে খারাপ লাগে, যখন বোঝা যায়, কেউ উপেক্ষা করছে। বিরক্তিতে ভুরু কুঁচকে আছে। খারাপ লাগলেও, সঙ্গ ছেড়ে দেবার মত মনের জোর পাওয়া যায় না। একা কি করে ভালো থাকা যায়?

********

 আধ্যাত্মকিতা কিভাবে সাহায্য করে: 

 আবারও বলছি, ধর্ম বা আচারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। তাহলে? দরকার কি? এটা একটা থেরাপি। মনের অবস্থা উন্নত করার থেরাপি। যেমন, মানুষের শোচনীয় অবস্থার জন্য দায়ী জীবন সম্পর্কে তাদের গভীর ভ্রান্ত ধারণা। অনেক মধ্য বয়েসী মনে করেন, দুঃখিত হয়ে কিছু পাওয়া যায়। কষ্টের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে লোকের কাছে সহানুভূতির আশা করে। 

 *** 

আধ্যাত্মিকতার অর্থ হল, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উপলব্ধি করা। আমার আনন্দের উৎস আমি নিজে... এই সত্য হৃদয়ে আত্মস্থ করা। মধ্যেবয়সে এসে আমরা অনুভব করি, পার্থিব অনেক কিছু আছে। যেটা নেই সেটা হল আনন্দ। শান্তি। কারণ, জীবন কাটিয়ে দেওয়া হয়েছে বৈষয়িক উপার্জনে। শান্তি আনন্দ এগুলি যে উপার্জনের বিষয়, সেকথা কখনো ভাবার অবসর ছিল না। 

******

আধ্যাত্মিকতা কিভাবে সাহায্য করে। 


  There is something greater than myself, something more to being human than sensory experience, and that the greater whole of which we are part is coshmic or divine in nature. 

   খুব কটমট কথা। আসলে, এটা খুব সরল এক উপায়। মনের জমিতে নিয়মিত আলো, জল, সার ইত্যাদি দিয়ে তাকে উর্বর করে রাখা। তাহলে, আবেগের উপর সংযম আসবে। শরীর মন আবেগ শক্তি এগুলির সঠিক পরিচর্যা করলে,ধীরে ধীরে ভিতরে এক শক্তির জন্ম হয়। বিচার বুদ্ধি সতর্ক হয়। বোধ পরিণত হয়। জীবন তখন আলাদা মাত্রায় ধরা দেয়। 

**********

  মানুষকে নিজের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হয়। নিজের গন্ডীর বাইরে গিয়ে তাকালে তবে বৃহতের অনুভূতি হয়। পার্থিব ছাড়তে শিখতে হয়। জলে দুধে মিশে থাকবে, দুধটুকু তুলে খেতে হবে। সংসার সর্বস্ব হতে নেই। তাহলে, সংসারের অবহেলা মনে ধাক্কা দেয় না। এই অভ্যাসটা হল আধ্যাত্মিকতা। জীবনের শিক্ষা মাত্র। যার জন্য আমরা আনন্দে থাকতে পারি। 

********

 বোঝা গেল, নিজের মনের গভীরে প্রবেশ করতে জানা হল এই প্রক্রিয়ার উৎস। যেমন, সাঁতার জানি, রান্না জানি, যৌনতা জানি তেমনি এটাও জানতে হয়, কিভাবে নিজের ভিতর হতে আনন্দের উৎস খুঁজে পেতে হয়। এই জানার অপর নাম spirituality. মধ্যবয়সে সবচেয়ে বেশি কাজের হল এই অভ্যাস।

         




                                       

রবিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২১

জয়তী রায়( মুনিয়া)

                                                





 মস্তিষ্কের  ভুলভুলাইয়া/ মানব জীবনের অভিশাপ। 

_________________________

  :নামটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না! 

: কাল যেন কোথায় যেতে হবে? ফোনে সেভ করা আছে। দেখে নিচ্ছি। 

: ফোন নম্বর। দূর। ওতো সব সেভ করা। 

: বারবার জিনিস হারিয়ে ফেলা। 

  হাল্কা সুরে বলা কথাগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে একটা ভয়ংকর অসুখের। আলঝাইমার।

   মধ্য বয়স নিয়ে লেখা এই পর্বে এসে বলব, নিজেকে অবহেলা করার চূড়ান্ত ফল কি হতে পারে! 

 আজকাল সবাই সব জানে। একটা বোতাম টিপলে হাজির হচ্ছে তথ্য। আলাদিনের দৈত্য কাহিনীর আধুনিক রূপ হল স্মার্টফোন।  শুধু জানে না, ২৪ ঘণ্টা সময় ঈশ্বর আমাদের দিয়েছেন, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে সুখে থাকা অথবা অসুখে থাকার উপায়। 

  কিছু অসুখ ঘটে যায়।  আমাদের হাতে থাকে না। আবার কিছু অসুখ আমাদের ভুল জীবন শৈলীর ফল হতে সৃষ্টি। যার মধ্যে একটি হল আয়ালজাইমার। অথবা ভুলে যাওয়ার অসুখ। সম্প্রতি Alzheimer's Association International conference 2020 এর একটি গবেষণায় উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পড়াশুনো এবং খারাপ জীবন যাপনের ধরণের জন্যই মানুষ পরবর্তী জীবনে মানুষ অ্যালজাইমারের মত রোগের শিকার হতে পারে। 

  মধ্য বয়স বলছি বটে, তবে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা অল্প বয়স থেকেও শুরু হতে পারে।

 যে যে রোগের ক্ষেত্রে জিন ঘটিত কারণ উল্লেখ  করা হয়, ভুলে যাওয়া তার মধ্যে একটি।

এছাড়া, স্ট্রোক হলে, টাইপ ২ ডায়াবেটিস হলে মস্তিষ্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। 

   আমি সেটার মধ্যে যাচ্ছি না। আজকের আলোচনায় থাকবে, পরিবেশ ও জীবন শৈলী র ভুল পদক্ষেপ কিভাবে মানুষকে ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঠেলে দিতে থাকে। 

**********

  একদিনে ২৪ ঘণ্টা। কম নয়। ঘুমিয়ে থাকার সময়েও আমাদের মস্তিষ্কের চিন্তা শক্তি সচল থাকে। এই চিন্তা মানুষের জীবনের একটা বড় অস্ত্র। এর অপপ্রয়োগ বহু সময় ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়। চিন্তাঅশ্বের লাগাম ছোট থেকে কষে ধরে রাখতে হবে। মন এবং মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে তাকে শান্ত ভাবে বুঝিয়ে ফেলা প্রয়োজন। মন আশকারা পেলে মাথায় চড়ে বসে। তুচ্ছ কারণেও বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারে বারবার। তখন সে পারিপার্শিক সব ভুলে যেতে চায়। বা , ইচ্ছে করে মনে রাখতে চায় না। ক্রমাগত করতে করতে এটা অভ্যাসে পরিণত হয়। সুতরাং, দিনের উল্টোপাল্টা চিন্তায় লাগাম  পরিয়ে দিতে হবে। 

: সময়ের সঠিক ব্যবহার না করতে পারলে মেজাজ খারাপ হয়। স্কুলে পড়াকালীন অভ্যাস তৈরি করে দিতে হয়। বহু সময়, স্কুলে খাতা বই ফেলে রেখে আসা অথবা বাড়িতে টিফিন ভুলে যাওয়ার প্রবণতাকে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না। ধীরে ধীরে এই অভ্যাস পরিণত হয় স্বভাবে। বড় হয়েও ভুল হতে থাকে রোজ। ঢাবির গোছা, অফিসের ফাইল আরো নানান কিছু। রোজ ঠিক মত সময় জিনিস পত্র গুছিয়ে রাখতে পারলে, আপনা হতেই মস্তিষ্ক ইঙ্গিত দেবে। মনে করিয়ে দেবে। 

: নিজের চিন্তা শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে মানুষ রাগী স্বভাবের হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যদি হতাশা আসে। চাওয়া আর পাওয়ার মাঝখানে থাকে যদি অনেক ব্যবধান , মনো সামাজিক জগতে তখন প্রবল আলোড়ন ওঠে। সমস্ত কিছুতেই অবসাদ। প্রাপ্য ছিল অথচ পাওয়া হল না... নিরন্তর এই চিন্তা মস্তিষ্কের বায়োলজিক্যাল ক্লকের কাজ ব্যাহত করে। এই সময় লম্বা শ্বাস খুব কাজে লাগে। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে ধরে রাখতে হয়। সেই সঙ্গে নিরন্তর  নিজেকে বোঝাতে হবে। জীবনের চাইতে মূল্যবান আর কিছুই নেই। 

: অসম্ভব প্রতিশ্রুতি কাউকে দেওয়া যাবে না। সকলকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের দিকে সবথেকে কম সময় দেয় মানুষ। দিনের শেষে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যায়। রোজকার অত্যধিক ভাবনা চিন্তা থেকে ভুলে যাওয়ার সিনড্রোম তৈরি হয়। সুতরাং, সকালে উঠেই নিজেকে শুনিয়ে দিন, বাঁচতে হবে নিজের জন্য। 

: ইনফরমেশন ওভার লোড __স্মৃতি ভ্রংশের একটা কারণ।

অনেক কিছু একসঙ্গে মনে রাখতে গিয়ে কিছুই  মনে থাকছে না। এ ক্ষেত্রে ফোনে নয়, কাগজে  টুকে রাখুন কাজ গুলি। আঙুল  আর পেন্সিলের যুগল বন্দী মস্তিষ্কের কোষ উজ্জীবিত করে। 

: অ্যালঝাইমার বিপদ ঘণ্টা বেজে উঠতে পারে যে কোনো বয়স থেকে। অযথা  হোয়াটস অ্যাপ দেখা বন্ধ করতে হবে। গ্রুপ চ্যাট দরকারি না হলে একেবারেই না। মনসংযোগ নষ্ট করে, এমন কাজ না করায় মঙ্গল। যে কোনো একটা বাদ্য যন্ত্র বাজান। না হলে, হারমোনিয়ামের রিড চেপে রাখুন। 

: স্মার্ট ফোন দিনের অনেকগুলি ঘণ্টা কেড়ে নিয়ে এলোমেলো করে দেয় রুটিন। প্রয়োজন না হলে দরকার নেই। তার চেয়ে গান চালিয়ে নেচে নিতে পারেন একটু। 


     অশনি সংকেত হল কাল বৈশাখী নেমে আসার সূচনা। নিজের দিকে তাকান। শরীরের উপরের অংশে বস্ত্র আছে। নিচের দিকে? হয় বইকি। ভুলে যেতে যেতে এই পর্যায় পৌঁছে যায় মানুষ। 

   পরিশেষে বলি, ২৪ ঘণ্টা কাজে লাগাতে হবে। রাতে শুতে যাবার আগেও, এমন একটা বই পড়ে শুয়ে পড়ুন, যা চিন্তা সুন্দর করতে সাহায্য করবে। 

 ভুলে যাওয়া রোগ মহামারীর আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। একে অপরকে সাহায্য করুন। দেখা হলে প্রশ্ন করুন, দুদিন আগে কি কি রান্না হয়েছিল? নানা রকম খেলা চলত আগে। সেই খেলা গুলো নিয়ে আসুন। এই খেলা একটা থেরাপি। আড্ডা য় গসিপ না করে এই সমস্ত খেলা খেলুন। 

  ভুলে যাওয়া নয়/ মনে রেখে এগিয়ে চলি। 

হাতে হাত রেখে / এক সাথে পথ চলি।

***********

 দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:

: পরিবারে অ্যালঝাইমার থাকলে এখন থেকেই সাবধান হতে হবে। কারণ, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে প্রবণতা ফুটে উঠবে। সেটা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 

: ব্রেন অ্যাকটিভ রাখুন। মস্তিষ্ককে সবসময় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রাখুন। মাইন্ড কুলনেস থেরাপি অথবা টক থেরাপি কাজ দেয় খুব  বেশি। 


     সতর্ক থাকতে হবে/ নিজেকে রক্ষা করতে হবে।।



                                   



রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                   


 মন এবং চার যুগ :



যুগের ভেদে মানব মনের প্রকৃতির বদল ঘটে। তাহলে দেখি, চার যুগ কেমন ছিল?
 ১. সত্য যুগ: 
     পুরাণ ঘেঁটে তথ্য পাওয়া যায়, এই যুগ ছিল মোট__১৭, ২৮, ০০০ বছর। অবতার প্রসঙ্গ যদি আলোচনায় আনতে চাই , দেখব__মৎস, কুর্ম, বরাহ, নরসিংহ __এই চার অবতার। এই সময় শুধুই পূণ্য। পাপ ছিলনা। মৃত্যু ইচ্ছাধীন। সোনার পাত্র ব্যবহার করা হত। তীর্থ ছিল পুষ্কর। 
একটু ব্যাখ্যা করি এই যুগটির। পাপ ছিল না। শুধু পুণ্য ছিল। 
অর্থাৎ, সকলেই মহান। পাপ হীন। এবার ধরা যাক, এমন ইস্কুলে আমি এলাম, যেখানে সকলে ফাস্ট হয়। তাহলে, সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে হলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে? তাই তো? সত্যযুগে ছিল তপস্যার কম্পিটিশন। সেরার মধ্যে সেরা হতে গেলে যা যা করতে হবে, সত্য যুগের মানুষ তাই তাই করতেন। তারপর অভীষ্ট লাভ হত। সুতরাং , বিচার করলে দেখা যায়, সত্য যুগ ছিল কঠিন পরিশ্রমের যুগ। দেবতা বলে যে জাত ছিল, যাঁরা এই সব সত্যবাদী তপস্বী মানবদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারত না। মনে রাখতে হবে, দেবতা কিন্তু পরম ব্রহ্ম নন। শুধু , ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ __ছিলেন সেই ভগবান ... যাঁদের জন্য কঠোর তপস্যা করতে হত। এমনকি দেবতাদের ও করতে হত। সে যাই হোক, সত্য যুগের কাহিনীতে যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল। এই যুগের নায়ক , প্রহ্লাদ, ভক্ত প্রলহাদ হিসেবে যিনি বিখ্যাত, তাঁর জীবন কাহিনী বেশ চমকপ্রদ। মহর্ষি বাল্মীকির মত ওইরকম প্রতিভাধর কবি থাকলে, প্রহ্লাদ কাহিনী আজ ঘরে ঘরে আলোচনা হত। অসির চাইতে মসি অনেক বেশি ক্ষমতাবান, সেটা বাল্মীকি প্রমাণ করে গেছেন।  আর ওই যে দাবি?  সত্য যুগ অর্থাৎ মিথ্যা হীন যুগ... সম্পূর্ণ ঘটনা জানলে একটু কেমন কেমন যেন লাগে। তাহলে , ঘটনা একটু বলি বরং। 
    ভক্ত প্রহ্লাদ, নামের মতই স্বভাব। মধুর স্বভাব, সর্বদা হরি নামে বিভোর। মুশকিল হল, ওই রকম সত্যযুগে ও, তাঁর প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করলেন তাঁর জন্মদাতা পিতা , হিরণ্যকশিপু।  এই যে সর্বক্ষণ দেখানো হয়, ভক্তদের প্রতি অত্যাচার করা হচ্ছে এবং ভগবান এসে রক্ষা করছেন... এই ব্যাপার একটু অদ্ভুত লাগে না? তবে কি , ভগবান কতখানি শক্তিমান , সেটা প্রমাণ করার জন্য এইরকম কাহিনী রচনা করা হয়েছিল? 
 পৃথিবী সবে গড়ে উঠছে। মানব জাতি নিজেকে প্রমাণ করছে। যুগভেদ বা তার সঙ্গে গল্পগুলি মানব সৃষ্ট __এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শৃঙ্খলাাহীন পৃথিবী ধর্মের শিকল পরে , বশ্যতা স্বীকার করবে সহজে। এই পদ্ধতি যথেষ্ট সম্মান জনক এবং আধুনিক ছিল। কালক্রমে বিকৃতি যদি আসে, সে দোষ কিন্তু নিয়মের নয়, সে দোষ করা হয়, কোনো ব্যক্তি স্বার্থের জন্য। 
 যেমন , এই যে তত্ত্ব , সাধনা করো , ঈশ্বর লাভ হবে। এক্ষেত্রে , সাধনা যদি dedication বোঝানো হয়, তবে dedicated লোক , ভালো ফল পাবে। ঈশ্বরের মত ভালো কিছু, সুন্দর কিছু, মঙ্গল কিছু লাভ করবে। সাধনা করা অর্থাৎ ইতিবাচক দিকে মন নিয়ে যাওয়া। 
ভক্ত প্রহ্লাদ , প্রচুর অত্যাচারিত   হচ্ছিল শুধুমাত্র হিরণ্যকশিপু র বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য। তবু, সে আপোষ করে নি। বালক বয়স থেকে  তিনি সেটাই করেছেন, যেটা তিনি ঠিক মনে করেছেন! মৃত্যুর মুখ থেকে বারবার ফিরে এসেছেন, রাজ্য , সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন... কিন্তু, মাথা নত করেন নি। শেষ পর্যন্ত , রেজাল্ট ভালো হয়েছে। ঈশ্বর এসেছেন কাছে।  আমাদের ধর্মের এই সবচেয়ে মহৎ গুণ। অলৌকিক তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে লৌকিক সত্যকে তুলে ধরা। রোজকার জীবন, তেল মশলার জীবন, যৌনতা , অধিকার বোধ ইত্যাদির জীবন... সেখান থেকে একটু সরে গিয়ে অলৌকিক কিছু দেখালে বা শোনালে , মানব মন আকৃষ্ট হতে বাধ্য। এইবার , সেখান থেকে শিখে নাও জীবনে চলার ধর্ম।
ত্রেতা যুগ

২.

চারযুগের দ্বিতীয় যুগ হল, ত্রেতাযুগ। এর পরিমাণ , ১২, ৯৬, ০০০বছর। পুণ্য তিনভাগ। পাপ এক ভাগ। অর্থাৎ, পাপের প্রবেশ ঘটেছে। এই যুগের কিছু বিশেষত্ব ছিল। এই সময় থেকে নতুন করে জেগে উঠেছে ভারতবর্ষ। জ্ঞান বিজ্ঞান শৌর্য বীর্য  সাহিত্য কাব্য ... সব দিকেই উঠছে নতুন সূর্য। সূর্য বংশ। নতুন নায়ক__শ্রীরামচন্দ্র। সত্যবাদ, ন্যায়বাদ ,যুক্তিবাদ সেই সঙ্গে প্রথম অনুভূত অপরাধবোধ। পাপ বোধ...জাতিভেদ , বর্ণভেদ... ত্রেতা যুগের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ  করলে মনে হয়, আধুনিক নাগরিক জীবনের জটিলতা এই যুগ থেকেই শুরু হল। 
   নারীর ভূমিকা নিয়ে সংশয়, নারীকে ঘিরে বিতর্ক, বিবাদ এমনকি যুদ্ধ পযর্ন্ত শুরু হল। ত্রেতা যুগ , ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের চেনা যুগ। মনে রাখতে হবে, অনর্থক অলৌকিক কোনো ভাবনা কিন্তু এই যুগে তেমন করে গুরুত্ব পায়নি। শ্রীরামচন্দ্র আদর্শ মানব হিসেবে স্থান করে নিলেন ইতিহাসে।
 রাম + আয়ন__রামায়ণ __লেখা হতে থাকল তাঁকে কেন্দ্র করে।   কালক্রমে এই আদর্শ মানব, দেবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। নানা ঘটনার সাক্ষী ত্রেতা যুগ। যে ঘটনা কালের বিচারে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে ইতিহাসে। 
    চার যুগের বিচারে, আমার মতে, ত্রেতা  হল শ্রেষ্ঠযুগ।
দ্বাপরযুগ

৩.
 তৃতীয় যুগ। এর পরিমাণ: 
 ৮, ৬৪, ০০০ বছর। পুণ্য অর্ধেক। পাপ অর্ধেক। দ্বাপর যুগ___
  ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, আধ্যাত্মিক__ সব দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য যুগ। কারণ, এই যুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। 
এমন একজন যুগপুরুষ, যাঁর কথা শত মুখে ব্যাখ্যা করলে, আবার নতুন করে কিছু বলতে হয়। যেহেতু অর্ধেক পাপ থাবা বাড়িয়ে দিচ্ছে তখন, সে জন্যে প্রচুর জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ লোভী প্রতারক হত্যাকারী হয়ে উঠছে। একে অপরের সম্পত্তি গ্রাস করার  জন্য হানাহানি করছে। প্রাচীনকে অপমান করছে নবীন। এই সময়, দুষ্ট শাসক মহাশক্তিশালী। যেমন , কংস। শিশুপাল জরাসন্ধ প্রমুখ। সংকটে  আছে সৎ নিরীহ মানুষ। যেমন পাণ্ডব। দেশ জুড়ে হাহাকার। অশান্তি। এই সময় আবির্ভাব কৃষ্ণের। 
সুতরাং , সব দিক দিয়েই দ্বাপর যুগ উল্লেখযোগ্য।
8.
কলিযুগ
____________
এবার বলি, কলিযুগের কথা। আমাদের কাছে খুবই গুরত্বপূর্ণ। এর পরিমাণ: 
৪, ৩২,০০০ বছর। পুণ্য একভাগ। পাপ তিনভাগ। এক অদ্ভুত সময়। সৎ হলে পতন। দুষ্ট হলে সফলতা। পুরাণ যা যা বলছে, তাতে কলিযুগের ভালো বলতে কিছু নেই। কুটিল, হিংস্র , নারীর অপমান, তপস্যা ধর্ম সব রসাতলে। আবার, গুরুমুখী সাধনা তুঙ্গে।  মানুষের গড় আয়ু ১০০র কাছাকাছি। কলিযুগ অদ্ভুত যুগ। মানুষ আর মেশিন একসঙ্গে মিলে পৃথিবী জয় করবে। নাম যশের কারণে , মানুষ হত্যা পযর্ন্ত করতে পিছপা হবে না। 
   কলিযুগ সম্পর্কে, ঋষি মার্কন্ডেয় অনেক কথা বলেছেন। তিনি কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। দিব্যদৃষ্টির অধিকারী।  তাঁর সম্পর্কে আমি পরে লিখব। যাই হোক, প্রচুর নেতিবাচক দিকের মধ্যে, কলিযুগে দুটি ভালো দিক আছে। একটি হল, এই যুগে দান হল সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। আর হরিনাম সংকীর্তন করলেই মোক্ষলাভ। 
  অন্যান্য যুগে প্রচুর পরিশ্রম করে সিদ্ধি লাভ হয়, কলিযুগ সেইদিক দিয়ে সহজ পথ দেখিয়েছে। অল্প ভালো কাজ বিনিময় প্রচুর লাভ।







রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                                   



অধ্যায় -- ৬ 

_______________

 মুড সুইং

মনের জানালা

 মুড সুইং বা মেজাজের পরিবর্তন এখন আলোচ্য বিষয়। কথায় বলে মেজাজ তো আসল রাজা, আমি রাজা নই। সুতরাং , এই রাজার খিদমত গার তো হতেই হবে। 

 কারণ, মেজাজ খারাপ তো দুনিয়া খারাপ। 

 গত অধ্যায়ে বলেছি, শরীর গত কিছু কারণ বিরক্ত করে তোলে। যেমন, হঠাৎ চুল পড়ে যাওয়া। চুল বড্ড আদরের বস্তু। আজ বলি কিছু সহজ টিপস। যার ফলে চুলের গোড়া শক্ত হবে। ঝলমল করবে। মন ভালো থাকবে। নারকেল তেলের মধ্যে  জবা ফুল, অপরাজিতা ফুল, নিয়ম পাতা , মেথি গুঁড়ো , আমলকি দিয়ে ফুটিয়ে , ছেঁকে একটা শিশিতে ভরে রেখে দিয়ে, মাঝে মাঝে চুলের মধ্যে ভালো করে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিয়ে পরেরদিন ধুয়ে নিতে হবে। সপ্তাহে একদিন ডিম লাগানো জরুরি। না হলে পাকা কলার পেস্ট। সঙ্গে দই। 

   অবাক করা ফল মিলবে দিন কতকের মধ্যে। সেইসঙ্গে আলো হয়ে উঠবে অন্ধকার মন। 

  তাহলে এটা বোঝা গেল, সেজে গুজে সুন্দর থাকা অন্যায় কিছু না। বরং জরুরি। 

     এবার আসি আরো একটা  বিষয়ে।  অনেকেই বলে থাকে, ভালো লাগছে না। কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে বলবে, জানি না। শুধু ভালো লাগছে না। নাহ্। সম্ভব না। কোনো কিছু কারণ ছাড়া হবেনা। যদি প্রশ্ন করা যায় , একটু ভেবে বলো কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে হবে,  কত কাজ।  ফলে, মেজাজ আরো খারাপ হচ্ছে। 

 ছড়িয়েপড়া কাজের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা খুব সাধারণ সমস্যা। তার থেকে বিরক্তি খিটখিট ভাব। তাহলে আগে বিরক্তির কারণ জেনে নিতে হবে। এক একটা দিনের কাজকে লিস্ট বানিয়ে রাখতে হবে। লিস্ট মিলিয়ে শেষ করে ফেলতে হবে কাজ। ভালো লাগবে অবশ্যই। এমনও হতে পারে , আচমকা কোনো ব্যাঘাত এসে ভেস্তে দিল দিনের প্ল্যান। তবু , ধৈর্য হারালে চলবে না। যে কাজটা রয়ে গেল, তাকে চাপ দিয়ে শেষ না করে বরং পরের দিনের কাজের সঙ্গে  জুড়ে দিয়ে যেভাবে হোক শেষ করে ফেলতে হবে। মেজাজ হারালে চলবেনা। মনে রাখতে হবে, কাজ শেষ করা উদ্দেশ্য, মেজাজ খারাপ করা না। 

    মুড সুইংয়ের আরো একটা বড় কারণ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। ঘুমোতে হবে। বিকেলের দিকে ৩০ মিনিট হেঁটে আসতে হবে যত কাজ থাক। মনে রাখতে হবে, দুপুর বারোটার পর থেকে আমাদের খারাপ বেশি লাগে। সেজন্য বিকেলের দিককে গুরুত্ব দিতে হবে। একটু ধ্যান, হেঁটে আসা, ছবি আঁকা ... কিছুতেই যেন বিকেলের মলিন ভাব গ্রাস করে ফেলতে না পারে। 

   আজ এই পর্যন্ত। আবার পরের রবিবার।

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                             



 মনের জানলা


অধ্যায় ৫

    মুডসুইংয়ের কারণ বলতে বসলে হাজার কথা বলতে হয়। এই কারণগুলোকে দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা অবশ্যই মানসিক। আর একটা শারীরিক। শরীরের চাইতে মনেরগুরুত্ব এইজন্য বেশি যে , অনেক সময় শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে না। কিন্তু , মন খারাপ থাকলে দুনিয়া গন্ডগোল। 

   মনে রাখতে হবে, প্রতিদিনের তুচ্ছ ঘটনা অনেক সময় মনের উপর প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। যেমন একটা সহজ কথা, চুল নিয়ে মহিলাদের দুঃখ। চুল উঠে যাচ্ছে। কি যে হবে! এই নিয়ে চলল মন খারাপ। ডাবলচিন হচ্ছে। চোখের কোলে পড়ছে ভাঁজ। গলার চামড়া ঢিলে। মনের আকাশ মেঘলা হয়ে থাকে। 

  তাই বলি, দিনের কিছুটা সময় থাকুক নিজের জন্য। ত্বক চুল ইত্যাদি থাক যত্নের তালিকায়। দশমিনিট সময় বার করতে বললেই মহিলারা হায় হায় করে উঠবেন। তাদের না কি এক ফোঁটা সময় নেই। 

   যখন দেখে আর হচ্ছে না, তড়িঘড়ি পার্লারে গিয়ে এক গাদা টাকা খরচ করে চলে এলো। সেটাতেও মন খারাপ। কাউকে কাউকে বাড়িতে কথা শুনতে হয় এই জন্য। অনেক স্বামী বলে বসেন : এগুলো কি বাজে খরচ হচ্ছে! 

রোজগেরে সন্তান বলবে: তোমার কি দরকার চুলে রঙ করার? 

এগুলো মাঝে মাঝে বড্ড অপমানের। কেউই হয়ত ইচ্ছে করে বলে না। কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন চাবুকের মত আছড়ে পড়ে কথা। সরল জীবন জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কথা বা বাক্য একটা শক্তিশালী অস্ত্র। তাকে তীক্ষ্ণ ভাবে ব্যবহার করে রক্তাক্ত করা যায় বইকি! 

 চুলে একটু ডিম লাগানো হোক। হাতে পায়ে বাদাম তেল অথবা গ্লিসারিন। বাড়িতেই গরমজল করে টিভি দেখতে দেখতে পা ঘষে ফেলে নেলপালিশ পরে নিলেই হয়ে গেল। নিজের চকচক গোড়ালি এক নিমেষে মন ভালো করে দেবে। 

 আয়না থেরাপির মূল কথা হল নিজেকে ভালোবাসা। সেলফ লাভ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলা, দেখোতো! আমায় চিনতে পারো কি না? 

 আগে একটা ছবি তুলে রেখে নিজের একটু চর্চা করে দশদিন পরে দেখতে হয় কেমন তফাৎ হল! মন খুশি হতে বাধ্য। 

 দুঃখ সবসময় বড় কারণেই হয় না। চোরকাঁটা র মত কিছু দুঃখ থাকে। চলতে ফিরতে যেগুলো বিঁধতে থাকে অহরহ। 

ছোটছোট এই দুঃখ গুলো তুচ্ছ হলেও কষ্ট দেয়। সময় করে একটু ঝেড়ে বেছে তুলে নিলেই হল। 

একটু সময় একটু যত্ন আমাদের শরীরের প্রয়োজন আছে। সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে নিজের জন্য কেবল মনখারাপ তুলে রাখলে চলবে? 

  তাই আজ থেকেই বরাদ্দ হোক দিনে ২০ মিনিট শুধু নিজের জন্য।




রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                           


                    

মনের জানলা

অধ্যায় __৪

 

    আজ বলব মনের ব্যাংকিংয়ের কথা। ব্যাংক শব্দটা জড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। নিচুতলা থেকে উঁচুতলা ব্যাংকের দ্বারস্থ সবাই। কারণ, জমা থাক কিছু পুঁজি। অসময়ে কাজে লাগবে। বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। 

জমা করা ,জড়ো করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আরো নানান দিক আছে এই জমিয়ে রাখার ব্যাপারে। যেমন , কথায় কথায় আমরা বলি, এনার্জি বাঁচিয়ে রাখতে। একটু ঘুমিয়ে নিতে। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। পরে কাজ করার সময় বাঁচিয়ে রাখা এনার্জি সাহায্য করবে। ঠিকমত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সঠিক ব্যায়াম করে শরীর ঝরঝর তাজা করে ফেলার উপদেশ সর্বক্ষণ শুনতে হয়। 

তাহলে মনের ব্যাংকিং কি? মনের ঘরের জমা খরচের হিসেব ঠিক কি রকম?

     ******

  মুশকিল হল, ব্যবহারিক জগৎ আর তার উপযোগিতা নিয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিকেশ করে চলেছি। নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছি। চারিদিকে সবকিছু সামলে চলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে বাহবা দিচ্ছি। আজ এমন দুজন মহিলার  গল্প করি। গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 

 প্রথমজন  বাংলাদেশ হতে প্রচুর সংগ্রাম করে কলকাতা এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। জিরো থেকে একেবারে হিরো। ছেলেগুলো হীরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সেইসঙ্গে মা অন্ত প্রাণ। স্বামী অকালে স্বর্গে চলে গেলেও ওনার কোনও  সমস্যা হয় নি। উনি প্রচুর পুজো করতেন। উপোস করতেন। এবং কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এককথায় চতুর যাকে বলে। চারিদিকে সতর্ক নজর। টাকা পয়সা অনেক। ছেলেরা হাতের মুঠোয়। ধন্য ধন্য করত লোক। 

  আজ তিনি বিছানায় শয্যাগত। ছেলেরা রাজকীয় চিকিৎসায় রেখেছে। তার স্মৃতি ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে। কথা বলেন। কথার বেশিরভাগ হল অশ্রাব্য গালি। নোংরা কথার তুবড়ি। নিজের মনেই বলে যান। আয়া নাকি ওনার গোপনাঙ্গে হাত দিয়েছে। একটার পর একটা আয়া বদল। ওনার গালি গালাজ চলতেই থাকে। 


       গল্প ২

____________

 আরেক মহিলার গল্প। সংগ্রামের ইতিহাস দুজনের প্রায় সমান। সাফল্যের বিচারে দ্বিতীয়মহিলা অনেক কম। অর্থভাগ্য ভালো নয়। সন্তান ভাগ্য ভালো নয়। দিনান্তে নিজের ভাত নিজের ফুটিয়ে খাওয়া ছিল তার ভবিতব্য। 

********

এই মহিলা দুজনকে তাদের মধ্যবয়স থেকে দেখেছি। খুব কাছের থেকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করতাম। দুজন মহিলা আমার কাছের মানুষ। দুজনেই বিধবা। দুজনেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

আমি লক্ষ্য করতাম ওদের চলাফেরা, কথাবার্তা। সফল মহিলার চলা ফেরার মধ্যে উগ্র অহঙ্কার ফেটে পড়ত। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সর্বদা অবিশ্বাস। ভুরু দুটি কুঁচকে আছে। নিরামিষ খেলেও প্রচুর ফল দুধ হরলিকস একেবারে সময় মেপে খান। বাড়িঘর নিয়ে ভীষন সচেতন। সিল্কের শাড়ী, গহনা।  অপর মহিলা একবেলা আহার করেন। যত অল্প খাওয়া যায়। নিরন্তর মুখে হাসি। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যে সন্তান রোজ আঘাত করছে তার জন্য প্রার্থনা। অচেনা লোকের জন্যেও শুভ কামনা। সাদাথান ছাড়া কোনো কিছু নেই। এমনকি একটুকরো সোনা পযর্ন্ত নেই। আমি শুনেছি, সফল মহিলা ব্যঙ্গ করে বলতেন," তুমি ভাই ভীষন বোকা। 

উত্তরে মহিলা হাসতেন। বলতেন," আমি খুব শান্তিতে আছি। 

ব্যর্থ মহিলা সুস্থ থেকে সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছেন। এক ফোঁটা সেবা নেননি কারো কাছ হতে। সফল মহিলা বিছানায়। সাধের বাড়িতে রাজত্ব এখন আযাদের, ছেলেরা দেখাশোনা করে কিন্তু থাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সিল্কের শাড়ির হিসাব নেই। গহনা মেয়ের হেফাজতে। কোনো জ্ঞানই নেই। গালাগালি কেন দেন, সেটা এখন আমি জানি। এ বিষয়ে পড়াশুনো করে বুঝেছি, মনের ব্যাংকে যা যা সঞ্চয় হয়ে থাকবে সেগুলো অবচেতনে বেরিয়ে আসে।ওই যে ওনার স্বভাব, যাকে উনি লালন করেছিলেন সযত্নে, মনে করতেন এটাই উচিত। সন্ধ্যে হলেই বাংলা সিরিয়াল দেখতেন। রাতে সেই সিরিয়ালের গল্প বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা ওনার মন একটাই সংকেত দিত সেটা হল, কোথাও বিশ্বাস নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। এটা হয়ত কোনো অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার একটা উপায়। কিন্তু সে উপায় ঠিক না ভুল সেটার প্রমাণ দেয় সময়। উনি মারা গেলে কি হত জানি না তবে বেঁচে আছেন এবং নেগেটিভ স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে আছেন। ওনার মনের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে অবিশ্বাসের পুঁজি। অহঙ্কার। ক্ষমতা লিপ্সা। সেটাই এখন ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছে। 

 মন : ভীষণ শক্তিশালী যন্ত্র। সমস্ত রেখে দেয় নিজের ভিতর। মূল কথা হল আনন্দ এবং এনার্জি। ওই যে অসফল মহিলা , উনি ভিতরে কখনো ক্ষোভ পুষে রাখেন নি। যা পেয়েছেন যতটুকু পেয়েছেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তৃপ্ত থেকেছেন। সন্তান ওনাকে আঘাত করলেও উনি তার জন্য প্রার্থনা করেছেন আর ওই সফল মহিলার সন্তান মাথায় করে রাখলেও উনি ভাবতেন যথেষ্ট করা হচ্ছে না। সুতরাং, সচেতন থাকতেই হবে। আমরা সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করি মন নিয়ে। যা পারি, যেভাবে পারি ঢোকাতে থাকি। রাগ অভিমান দুঃখ ক্ষোভ ... যেন এটা আমার ডাস্টবিন। নাহ্। এই মন আমার বর্ম। আমার অস্ত্র। যা খুশি ভাবে তাকে ব্যবহার করার আগে ভাবতে হবে বইকি। এই ভাবনা আমাদের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেবে। শরীরের উপর কত নজর ! চুল এই করো, ত্বক ওই করো। কিন্তু, চিন্তন? মন? সারাদিন তাকে কি দিচ্ছি?

এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। লেখালিখি কথাটা বলতে এবং শুনতে যত সুন্দর হোক না কেন, সে জগৎ কত ভয়ঙ্কর সে কথা সকলেই জানি। দিনরাত সেখানে অবিশ্বাস আর দুর্নামের খেলা চলছে। একে অপরের নামে বলছি আমরা। পোস্ট লিখছি। ঠকছি। ঠকাচ্ছি। সারাদিন এইভাবেই ভাবছি কি করে আরো আরো লাভবান হওয়া যায়। 

 ঈর্ষা হোক মহতের তরে... 

    কালজয়ী কবি এমন বলতে পারেন। সৃষ্টির মূল কথা ঈর্ষা। 

প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে কাজের আনন্দ কিসের? কিন্তু তার মানে এই নয় যে , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা প্রতিদ্বন্দ্বী র কথা ভাবতে থাকব অথবা অপর কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ক্ষোভ আর হতাশায় ডুবে থাকব। 

  যদি প্রশ্ন হয়, ব্যবসা করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হবে, না হলে সফলতা আসবে না। সব সফল মানুষ কোনো না কোনো সময় অন্যায় করেছেন এবং করছেন। তবে? তারা কি ভালো নেই? সাধু আর বোকা হয়ে এই দুনিয়ায় কোনো লাভ নেই। 

 সমস্যা হল অন্য জায়গায়। জীবনে লাভ হচ্ছে না ক্ষতি সেটা বুঝতে যখন পারি তখন দেরি হয়ে যায় অনেক। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা পরিমিত, তার উপর অযথা ভার চাপিয়ে গেলে এক সময় সে বিদ্রোহ করে, মনের জমির নেওয়ার কিছু সীমিত ক্ষমতা আছে। তাকে এনার্জি তে ভরপুর রাখতে হয়। নেগেটিভ কথা আর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিতে দিতে এক সময় বিদ্রোহ করে সে। 

 শেষের সে দিন কে দেখেছে? লোকে বলবে ভালো লোক কি কষ্ট পায় না? কষ্ট কখনো ভালো মন্দ বিচার করে না। যার পাওয়ার সে পাবেই। কথা হল, মনের ধারণ ক্ষমতা বা শক্তি যার বেশি সে কষ্ট নিয়েও ভালো থাকে। সুন্দর ভাবনা থাকার ফলে তার ভিতর তৈরি হয় পজিটিভ এনার্জি। ওই এনার্জি সাহায্য করে। বয়স হলে শরীরের যন্ত্রপাতির ক্ষয় হবে। কালের নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, মনের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন এনার্জি যোগান দিলে মন সতেজ থাকবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মন ব্যাংকিং। জমা করতে হবে ভালো ভাবনা। সুন্দর চিন্তা। সুন্দর সঙ্গ। সুদে আসলে ফেরত পাওয়া যাবে সময় হলে। 

 টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে ফেলতে হয়। মন বাঁচিয়ে রাখতে হয় বইকি। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন কোন দিক আমাকে বিরক্ত করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গ আমাকে ক্লান্ত করে তুলছে ... এগুলো সুদূর ভবিষ্যতে  এনার্জি ব্যাংকের পুঁজি নষ্ট করে দেবে। সাবধান হতে হবে এখন থেকে। 

ভালো লেখক হওয়ার জন্য নামী পাবলিশার হওয়ার জন্য প্রতিদিন এই যে ধার করা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, ভাবছি কি ভবিষ্যত কি নিয়ে আসছে? অকারণ এনার্জি ক্ষয় করে লাভ নেই। বাঁচিয়ে রাখতে শিখতে হবে। জীবন থাকলে কোনো না কোনো দিকে আমাদের পথ খুলেই যাবে। 

  নিজে আনন্দে থাকলে জগৎ আনন্দময়। এমন চিন্তাশক্তি সবল থাক যার ফলে ভালো হতে বাধ্য। মনের ব্যাংকে বেড়ে উঠুক মঙ্গলধ্বনি। একদিন সেটা কাজে লাগবে আমাদের।।