রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                



 মেজাজ হল আসল রাজা/ আমি রাজা নই। 



   মুডসুইং ... অতি পরিচিত শব্দ। যেহেতু, মানসিক সমস্যা সমাজের উচ্চ এবং মধ্যবিত্তের মধ্যে বেশি, তার  মানে এই নয় যে নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে দেখা যায় না। মেজাজের পারদ ওঠা নামা করে। এটাই হল, জীবনের চালাকি। মানুষের ক্ষমতা এত বেশি যে তারা সহজেই সব পেতে পারে। হয়ে উঠতে পারে ঈশ্বরসম। এইখানে তারা অসহায়। এই নিজের কাছে। নিজের মেজাজের কাছে। ইচ্ছে অনিচ্ছের কাছে। মুড ভালো রাখা, মুড কিভাবে সন্তুষ্ট হবে তার চেষ্টা করা এই একটি সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত সৃষ্টি। পরিবার। সমাজ। বহু জঘন্য অপরাধ থেকে বহু সার্থক সৃষ্টি সম্পন্ন হচ্ছে মুড এর জন্যে। 

  কি এই মুড? কেন এর এত  দাপট? 

ডাক্তার বলবে এটা একটা অসুখ। এই ভালো আছি তো এই খারাপ। কেউ কেউ হালকা চালে বলে, আজকাল খুব মুডসুইং করছে। যেন এটা একটা খেলা। অনেকে বলে, ওগুলো বেশি হয় মেয়েদের মধ্যে। প্রচলিত কথা, ঋতুচক্রের সময়, প্রেগন্যান্ট অবস্থায় , লিখতে বসলে, একঘেঁয়ে রান্নার কাজ করলে আরো নানান ব্যাপারে মেয়েদের মধ্যে বেশি হয় বলে ধারণা করা হয়। 

   সন্দেহ নেই, ঋতুকালীন সময় এবং গর্ভবতী অবস্থায় হরমোনের ওঠা পড়া খুব বেশি মাত্রায় হয়, মেজাজ খিটখিট করে। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আজকাল পুরুষদের মধ্যেও এই মুড সুইং কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবে বলা হচ্ছে। 

মুড বা মেজাজ বা মন কেন দোল খাচ্ছে? কেন ব্যালান্স হারাচ্ছে? এর সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। 

কি ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধন করেছে কেউ বুঝতে পারছে না। এ যেন , বালির উপর রাজপ্রাসাদ তৈরি করছি আমরা। ভিত শক্ত হল না, অথচ এই করছি, সেই করছি। 

     ভারতবর্ষ এমন এক দেশ, বলা যায় একমাত্র দেশ, যেখানে প্রাচীন কাল থেকে মনের বিভিন্ন অবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমার বাবা বলতেন," আমরা অনেক প্ল্যান করি। এবার প্ল্যান মত কাজ হল না। ব্যর্থ হলাম। তখন কি হয়? মন খারাপ হয়। লাগাতার বলতে থাকি, প্রবলেম। প্রবলেম। মন খারাপ , মন খারাপ। সেই মন, যে আমাদের পাশে দাঁড়াবে, যে আমাদের প্রবলেম থেকে বেরিয়ে আসার সন্ধান দেবে, সে মন না কি খারাপ? তবে? 

বাবা বলতেন, প্রথমেই বাদ দাও প্রবলেম শব্দটা। বলো পরিস্থিতি। এবার দেখো। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে। প্রবলেম শব্দ বারবার ব্যবহার করলে,মনের  ভাইব্রেশন নষ্ট হয়ে যায়। লড়াই করার শক্তি নষ্ট হয়। 

প্রাচীনকাল মানে পুরাণের কতগুলি গল্প নয়। শিক্ষা। কিভাবে ভালো থাকব, তার শিক্ষা। সেটা আলোচনা করার আগে,

এবার দেখা যাক, মুডসুইং কি কি নষ্ট করছে? 

 প্রতিদিনের বেঁচে থাকার শক্তি ক্ষয় করছে। এনার্জিস্তর কমিয়ে দিচ্ছে। এনার্জি কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। খুব ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে দিতে খিটখিট করে তুলছে।করে তুলছে  স্পর্শকাতর। চট করে দুঃখ পাচ্ছি। অমুকের একটা শব্দ একটা, তুচ্ছ তাকানো , একটু এদিক ওদিক ব্যবহার নষ্ট করে দিচ্ছে সারাটা দিন। রাগ হচ্ছে। অকারণ হতাশা আসছে। ভয় এবং কান্না। 

  আজকাল গুগল করলে সমাধান চলে আসবে নিমেষে। প্রায় সবগুলোই বাইরের প্রক্রিয়া। যেমন, ব্যায়াম করতে বলা হয়। কাজে ব্যস্ত , লোকের সঙ্গে মেলা মেশা,প্রাণায়াম ইত্যাদি। 

   মুশকিল হল, এগুলো করতে ইচ্ছেই তো করবে না। ইচ্ছের জমি না তৈরি করলে ফসল ফলবে কি করে? ধাপে ধাপে এগিয়ে চলতে হবে। মুডসুইং মোটেই একদিন হঠাৎ হয় না। 

কারণ থাকে। বেশির ভাগ কারণ লুকিয়ে থাকে অতীতের মধ্যে। আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ খুঁজে বার করতে হবে। প্রবলেম বলে কিছু নেই। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে। সেটা পারবে শক্ত সবল মন। 

   থেরাপি::

১.অউম প্রতিদিন ১০ বার। করতেই হবে। 

২.আয়না থেরাপি দিনে একবার। 

৩.মৌন দিনে ২ মিনিট। 

৪.খাতায় লেখা সমস্যার কথা। 

 

    কেন যেতে হবে নিজের সমস্যার জন্য অন্যের কাছে? কেন তোড়জোড় করে শুরু করতে হবে রুটিন মেনে ধ্যান ইত্যাদি? মন নিরন্তর ডুবে থাকবে নিজের চেতন শুদ্ধ করার জন্য। যেমন , aquaguard  জল পরিশুদ্ধ করছে, তেমনি আমার মন করুক চিন্তা শুদ্ধ। সকাল থেকে সারাদিন পাচ্ছি। দেখি, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। খারাপ না ভালো? আছে শক্ত মন। করবে মোকাবিলা। একটাই কথা, বাবা বলতেন, প্ল্যান করো। পরিকল্পনা করো। কিন্তু দিনের কখন কি ঘটে যাবে, কেউ জানে না। কাজেই , সেই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যদি প্ল্যান মত কাজ না হয়, তখন কি হবে? তখন মেজাজ খারাপ করব? আনন্দ নষ্ট করব? এনার্জি স্তর নামিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষতি করব? ডাক্তারের কাছে দৌড়ে যাব? 

মুড নামক মহারাজকে মাথায় তুলতে নেই। মুড বা মেজাজ একটু এদিক হবেই। উপরের থেরাপি গুলো সাহায্য করবে, নিজের ভিতর শক্তি জাগ্রত করার। ফলে, বাইরের পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, ভিতরের স্থিতি ঠিক থাকলে, লড়াই করার শক্তি জন্ম নেবেই। 

মুডসুইং এর গালভরা গুগল ব্যাখ্যায় না গিয়ে নিজেই বরং  গুগল হই অথবা মনের ডাক্তার হয়ে যাই। মেজাজের উপর কন্ট্রোল থাক আমার নিজের। শুনতে কঠিন হলেও খুব সহজ কিন্তু। চেষ্টা করে যাওয়া যাক। মন শক্ত হবেই। মুড তো দূরের কথা , সমস্ত প্রবলেম সমাধান করার শক্তি জেগে উঠবে। মেজাজ হোক প্রজা, আমি হই রাজা।

চিত্রঋণ- Thomas .S.Andro 





রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২১

সৌমিতা চট্টরাজ

                                      


এই সপ্তাহের কবি সৌমিতা চট্টরাজ৷জন্মঃ- ১৯৯৪ ২৬ শে অক্টোবর। ইংরেজিতে স্নাতক। রূপনারায়নপুর, পশ্চিমবর্ধমান নিবাসী। 
অবান্তর... 



১. 
কথা হচ্ছিল মৃত্যু দৃশ্য নিয়ে।
দুই আঙুলের দূরত্ব বাড়িয়ে জুম করলাম ছবিটা।
বিলিতি ব্র‍্যান্ডের বোতল, একের অধিক পুরুষ আর টালমাটাল হরফ সাঁতরে  রবীন্দ্রনাথ উৎরোতে চাইছি আমি...
যথারীতি সাংস্কৃতিক শামুকে পা গেঁথেছে আমার।
অতএব
দৃশ্যটার বাইরে বেরোতে পারছি না...
দু'আঙুলের দূরত্ব কমাতেও পারছি না...

২.
ভাবমূর্তি নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন তোলেন যারা
পোশাক খুলে তাদের সামনে দাঁড়াতে লজ্জার কি আছে আর!
বরং ভয় পাও হাত পা জিভ খুলে দাঁড়াতে
বরং ভয় পাও সেই পায়রার ঝাঁকটা কে হারিয়ে ফেলার...
খুদ খেতে খেতে এখনো তোমাকে যারা মানুষ ভাবে।

৩.
ভেড়া টির সুবাদেই দেবতা কে চেনা হয়েছিল।
ছবিতে দেখেছি যাকে নরম কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। 
সেই থেকে ভেড়ার পিছনে ধাওয়া করছি আমি।
ভেঙে ফেলছি পাহাড়, উপত্যকা...
আর ভেড়াটি দিব্যি চোখ বুজে মুখ লুকোচ্ছে দেবতার লোমশ বুকে।
ভাবছে, পৃথিবী তাকে দেখতে পাচ্ছে না...
কিন্তু আমিও দেখছি, পৃথিবীও দেখছে,
কিভাবে দেবতার দাঁতের ফাঁক দিয়ে একটা জলজ্যান্ত দানব ঝরে পড়ছে।

৪.
যে পুরুষটি তার প্রেমিকা কে নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করেছিল
অথবা যে নারীটি তার প্রেমিককে আকাশের সঙ্গে...  
দুজনেই বোকা, কেউ একা নয়।

৫.
বিপ্লবী দিনদিন অসহ্য হয়ে ওঠে সংসারে। 
সংসারও তার কাছে প্রথাগত হেমন্তের মাঠ...
হেমন্তের ছয় ঘর ছেড়ে ডাইনী ঋতু টি থাকে
সংসারের রক্ত চোষে 
আর শাঁস চুষে বীজ পুঁতে গোলাপ ফোটায়
তুমি বাঁচো হে বিপ্লব... 
ভালবাসা মরে যাক বিনা চিকিৎসায়।

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                             


    

 চতুর্থ পর্বের পর

সাইকেল 

৫) 

  ভোরবেলা ওঠা অভ্যেস সামুয়েলের। এখানে সূর্যও সকাল সকাল উঠে পড়ে। এবাড়িরও ঘুম ভেঙে গেছে, ধোওয়া মোছার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের শব্দ। ঘরকন্নার শব্দ। ঠিক যেমন ওদের বাড়িতে এই সব রোজকার খুঁটিনাটি শব্দে ঘুম ভাঙে ওর। প্রথমে ভেবেছিল বাড়িতেই আছে বুঝি। জানলার বাইরে চোখ গেলে খেয়াল হল, এ এক অন্য দেশ। আলস্য কাটিয়ে বাইরে এলো সামুয়েল। সাইকেলের কাছে গিয়ে ওর ঘুম ভাঙাল। এবার তাদের মেলামেশার সময়। সাইকেল নিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় বুলবুল এক কাপ কফি নিয়ে এলো ওর জন্য। এরা যদিও চা খায়। সকালে লিকার চা, পরে ঘন দুধ, চিনি দিয়ে কড়া আসাম চা। একবার, দুবার চেষ্টা করে দেখেছিল সামুয়েল, খেতে পারেনি। এত মিষ্টি চা কী করে খায় এরা? মেয়েটা কফি দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ভদ্রতা করে জিজ্ঞেস করল সামুয়েল, তোমার চা খাওয়া হয়েছে? ঘাড় নাড়ল ও। একটু যেন গম্ভীর মেয়েটা বয়সের তুলনায়। নাকি বিদেশি কাউকে দেখে অমন হয়ে আছে? যাই হোক না কেন, ওকে আর রাগিয়ে দেওয়া চলবে না। ভাব জমানোর উদ্দেশ্যে ও আবার বলল, পড়াশুনো হচ্ছে তো ঠিকমতো? কজন বন্ধু তোমার? বেস্ট ফ্রেন্ড কে? তিনটে প্রশ্নের উত্তরে বুলবুল একটাও শব্দ করল না। জ্বলন্ত চোখে ওর দিকে তাকাল শুধু। তারপর চলে গেল। সামুয়েল সাইকেল নিয়ে ঘুরে আসার পর দেখল, ওর ঘরের সামনে টানা বারান্দায় দুজন বাচ্চা ছেলেমেয়ের সঙ্গে বুলবুল বসে বসে খুব গল্প করছে। ও এলে নিজেই যেচে বলল, এই যে! এদের চিনে নাও। এরাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। আর কোনো বন্ধু নেই আমার। স্কুলের সঙ্গীরা সবাই আমাকে হিংসে করে। 

  এখন এই মেয়েকে দেখলে কে বলবে, এই সেই রাগী মেয়েটা! দিব্যি হাসিখুশিতে ঝলমল করছে। সেই থেকে রুবাই আর মুনিয়া ওরফে মাদাম সামুয়েলেরও সঙ্গী হয়ে গেল। বুলবুল বড় হয়েছে বলে, ওকে বাড়ি থেকে সব সময়ে বেরতে দেয় না। যেখানে সেখানে যাওয়াও তার মানা। তাই সামুয়েলের সর্বক্ষণের সঙ্গী ওরাই। তিন/চারদিন গ্রাম ঘুরে ঘুরেই কাটিয়ে দিল সামুয়েল। সবার সঙ্গে ওর আলাপ করতেই হবে। এর বাড়ি, ওর বাড়িতে ডাল পেলেই গিয়ে দুটো বাতাসা জল খেয়ে আসতে হবে, নয়ত মুড়ি চিবিয়ে কয়েক মুঠো। পাঁচদিনের মাথায় এমন হল সামুয়েলকে গ্রামের সবাই চিনে গেল নাম ধরে। ও যেন এ গ্রামেরই বাসিন্দা। বিকেল হলেই একটা গাছতলায়, যে বটগাছের ঝুরি নামা আয়তন দেখে সামুয়েল মুগ্ধ, সে গাছের নিচে জমায়েত হয় অনেকে। সেখানে সামুয়েল গান শোনায়, ওদের গান শুনে সুর তুলতে চেষ্টা করে, সাইকেল নিয়ে কিভাবে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ায় ও, সেই সব গপ্প বলে। সূর্য অস্ত গেলে একটা মেয়ের মুখ মনে পড়ে সামুয়েলের। তার এক্স প্রেমিকা। কবে যেন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে ওদের…ওর নিজেরই দোষে। সে স্বভাব বাউন্ডুলে, সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লে সব ভুলে যায়। সে আর কতদিন অপেক্ষা করবে! মেয়েদের মনোযোগ চাই, আর কোনো নির্দিষ্ট মানুষের দিকে মন দিতে পারে না সামুয়েল। একমাত্র মা আর দিদা ছাড়া কারুর ওপর সেভাবে টান নেই ওর। আকর্ষণ জাগলেও সে সাময়িক, কেটে যায় দুদিনে। উঠে পড়ল ও সাইকেল নিয়ে। নিজের ঘরে ঢুকেই একটা তাজা ফুলের গন্ধ পেল। টেবিলের ওপর একটা কাঁসার বাটিতে জল দিয়ে তার মধ্যে বেল, জুঁই, গন্ধরাজ ফুল রেখে গেছে কেউ। টেবিলে, বিছানা পরিপাটি করে গুছনোও হয়েছে। সে একটু এলোমেলো স্বভাবের, গুছিয়ে রাখতে পারে না বা ইচ্ছে করে না। এ নিয়ে মায়ের বকুনি খেতে এক সময়ে রোজ। তারপর মাও আর বিরক্ত হয়ে বলে না কিছু। 

   গিটারটা সন্তর্পনে ঝুলিয়ে রাখল ও। নাহ! এখানে এমন অসভ্যের মতো থাকা চলে না। হাজার হোক, অন্যের বাড়ি। হাত, পা ধুয়ে এল ও। সঙ্গে সঙ্গে কাঁসার বড় বাটিতে মুড়ি, নারকেল মাখা নিয়ে হাজির হল বুলবুলি। অভিজিৎ আজ কোথায় যেন বেরিয়েছে। ও হ্যাঁ, কী একটা সরকারি কাজে সদরে গেছে। ফিরতে হয়ত একটু দেরিই হবে ওর। মুড়ির বাটিটা টেবিলে ঠক করে নামিয়ে রাখল বুলবুল। তারপর ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সামুয়েল কি কেঁপে উঠল একটু? ওর ধুসর মণিতে ছায়া পড়ল কালো হ্রদের? তারপর গিটার ছাড়াই খালি গলায় গেয়ে উঠল-

Te necesito como

 a luz del sol

en este invierno frío

pa' darme tu calor

te necesito como a luz del sol

tus ojos el abismo

donde muere mi razón.

( সূর্যের আলোর মতো আমি তোমাকে চাই/ এই ঠান্ডা শীতে তোমার উষ্ণতা পেতে চাই/ সূর্যের আলোর মতো তোমাকে পেতে চাই/ তোমার চোখ, মৃত্যুকূপ, যেখানে কোনো কারণ ছাড়াই আমি মরে যেতে চাই)


বুলবুল সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, মানে কী বল…এই গানের ভেতরে কী এক আর্তি রয়েছে…আমার মন কেমন করে উঠল কেন? ওর দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় সামুয়েল বলে উঠল, এ গানের কোনো মানে নেই, থাকতে পারে না। তুমি ভাল মেয়ে, তাই মন কেমন করেছে তোমার। এবার আমাকে কিছু কাজ করতে হবে যে… 

ধীরে ধীরে বুলবুল চলে যাচ্ছে বারান্দা বেয়ে…যেন এক তিতির পাখি সহসা শান্ত হয়ে উঠেছে আর উড়তে ভুলে গেছে আচমকাই। মনের ভেতরে একটা মায়া টনটন করে উঠল সামুয়েলের।          

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                 



সাইকেল

তৃতীয় পর্বের পর 

৪) 

   অভিজিতের সঙ্গে ওদের বাড়িতে পৌঁছল সামুয়েল। শহরে এসে বাইকস্ট্যান্ডে নিজের বাইক রেখে দেয় অভিজিৎ। সেই বাইকের পিছনে বসে প্রায় ঘন্টাখানেক জার্নির পর ওদের গ্রাম। এই সেই বরবরুয়া গ্রাম, ছবির মতো সবুজ ও সুন্দর। প্রথম দেখেই এই গ্রামের প্রেমে পড়ে গেল সামুয়েল। তারপর যে ওর বাড়িতেও আরেক দফা বিস্ময় ওর জন্য অপেক্ষা করছিল, সে ওর ধারনার বাইরে ছিল। ওদের বাড়ির এলাকা গাছের বেড়া দেওয়া। ভেতরে কিছুটা অংশ পাকা বাড়ি, দেখলেই বোঝা যায়, নতুন তৈরি হয়েছে। আর পিছনের দিকে মাটির বাড়ি, মাটির দেওয়ালে আবার সুন্দর কল্কা, ফুল, বাঘ, হরিণের ছবি আঁকা। দেখলেই মন জুড়িয়ে যায়। যদিও অভিজিৎ ওকে পাকা বাড়িতেই এনে তুললো। অভিজিতের ঘরেই এলো ওরা। সুন্দর, পরিপাটি, বাহুল্যবর্জিত ঘর। ঘরের একপাশে একটা খাট, আলনা, আর কাঠের চেয়ার, টেবিল। ব্যস্‌। কুলুঙ্গির মতো একটা জায়গায় আয়না টানানো রয়েছে। টেবিলে অভিজিতের ছোটবেলার ছবি একটা। দুচারটে বই। চেয়ারে বসল সামুয়েল। অভিজিতের বাবা মা এলে হাতজোড় করে প্রণাম করল ওদের সামুয়েল। অভিজিৎ জানাল, ওর এক ছোট বোন আছে, ইলেভেনে পড়ে, এখন স্কুলে সে। খুব পাজি নাকি সে! একটা সুন্দর হাসিখুশি পরিবারে এসে সামুয়েল সাতদিনের জন্য আস্তানা গাড়ল। অভিজিৎ রইল পাশের ঘরে, যে ঘর ফাঁকাই পড়ে থাকে। বাড়ি ঘুরিয়ে দেখাল সামুয়েলকে ও। বাবা মায়ের ঘরের পাশেই এক চিলতে বারান্দা ঘিরে পড়ার টেবিল-চেয়ার। ওখানেই নাকি ওর বোন পড়াশুনো করে। মাছের ঝোল দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে টেনে ঘুমলো সামুয়েল। ওকে এভাবে তৃপ্তি করে খেতে দেখে অভিজিতের মাও খুব খুশি! ফলে একাত্ম হতে সামুয়েলের একটুও সময় লাগল না। বিকেলে চা দিতে এলো কাকিমা। অভিজিৎ তখন টেনে নিয়ে এলো বোনকে। রোগা, পাতলা গড়নের এক কিশোরী সে। টানা টানা চোখ, এক ঢাল কালো কোঁকড়া চুল কপাল ঢেকে রেখেছে তার। শ্যামলা মেয়েটির মুখে একটা আলগা শ্রী আছে, এটুকুই। আর রয়েছে চোখ ভর্তি বিস্ময় আর দুষ্টুমি। সামুয়েলের সামনে প্রাথমিক জড়তা কাটছিল না তার। যেহেতু ইংরেজি বলতে সে সড়গড় নয়, তাই কথাবার্তাও কিছু হল না। একটু ফিকে হাসি হেসে বসে রইল খাটের ওপর। আর অনবরত ঠ্যাঙ দুলিয়ে যেতে লাগল। চা পর্বের পর, একসময় সামুয়েল আর পারল না। বলেই ফেলল। ‘তুমি কি পা না দুলিয়ে থাকতে পার না?’ ওর কথায় হকচকিয়ে গেল সেই মেয়ে। আর অভিজিৎ হাহা করে হেসে উঠল। রাগে দাদার দিকে চোখ পাকিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল ও। ওর নাম বুলবুল। সামুয়েল জানল যে বুলবুল এক পাখির নাম। যদিও বুলবুলের একটা পোশাকি নামও আছে। শ্রীময়ী।  

     রাতে খাওয়ার সময় এক ঝলক দেখা গেল বুলবুলকে। অভিজিৎ অনেকবার ডাকল একসঙ্গে খেয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তার সাড়া পাওয়া গেল না। আপন মনেই অভিজিৎ বলে উঠল, রাগ হয়েছে! এই এক রোগ ওর। এমনিতে সব ভাল, শুধু রেগে গেলেই তার মান ভাঙাতে ভীষণ সমস্যা। সামুয়েল বুঝল, একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে ও। আন্তরিক ভাবে তাই অভিজিতকে বলল, তুমি তোমার বোনকে একবার ডাক। আমি খুব লজ্জিত। ক্ষমা চাইব ওর কাছে। কিন্তু বুলবুলের আর দেখা পাওয়া গেল না। কিন্তু সে যে আশপাশেই আছে, এবং ওদের কথা কান খাড়া করে শুনছে সেও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেল একটু বাদেই। খেয়ে হাত ধুতে যাওয়ার সময় সামুয়েল শুনল, বারান্দায় এক জোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত পালিয়ে গেল। নিজের মনেই হাসল ও। ভাবল, থাক এখন। একটু মজা নেওয়া যাক বরং! হাত ধুয়ে গিটারে সুর তুলে গান ধরল ও-

Como cada noche desperté pensando en ti

Y en mi reloj todas las horas

vi passar

Porque te vas

(প্রতি রাতের মতো, আমি জেগে উঠব, আর তোমার কথাই ভাবব…আমার ঘড়িতে দেখব সমস্ত সময় পেরিয়ে চলে যাচ্ছে, কারণ তুমি চলে যাচ্ছ…) 


রবিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২০

Prosenjit Kabasi প্রসেনজিৎ কাবাসী

 


প্রান্তিক সরকার

 


পলাশ কুণ্ডু

 






তুষ্টি ভট্টাচার্য

                             


দ্বিতীয় পর্বের পর 

৩) 

  খুব ভোরে উঠে পড়ে সামুয়েল। এ তার পুরনো অভ্যেস। ঘুম থেকে উঠেই সাইকেল নিয়ে কসরত করে সে। সাইকেলটাও যেন এই সময়ের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। এইটুকু সময় শুধু তার আর সামুয়েলের। যেহেতু এই গ্রামের রাস্তার প্রায় সবটাই সমতলে, তাই চড়াই উতরাই ভাঙতে সে চলে যায় ওই দূরের পাহাড়ের দিকে। পাহাড় তো নয়, টিলার মতো। পাথুরে কিছুটা হলেও, সবুজে ঢেকে আছে এখন। পায়ে চলা পথ ধরে সামুয়েল আর তার সাইকেল সোজা উঠে যায় পাহাড়ের মাথায়। সূর্যটাও তখন পাহাড়ের মাথায় এসে হাজির হয়। এতদিনে আশেপাশের বসতির সবাই, মায় এই পথঘাট, গাছপালা, পশুপাখি, সবাই জেনে গেছে যে, এক বিদেশী ছেলের সাইকেলের শব্দে তাদের ঘুম ভাঙবে আর সেই ছেলের গলায় থাকবে ভাঙা ভাঙা অসমীয়া গানের কলি। ঠিক এই যেমন এখন যদি কেউ ওই টিলার মাথায় এসে দাঁড়ায়, শুনতে পাবে…

নিবিড় বনে যে মাতিছে যা/ যা যা দূৰণিলৈ/ হেৰুৱা সুবাসে মাতিছে যা/ সোনৰে সজাটি এৰি থৈ যা/ যা নীলিম আকাশলৈ/ সোনালী ৰদে যে মাতিছে যা/ জোনৰে জোনাকী মাতিছে যা/ যা পখী দূৰণিলৈ/ হেৰুৱা সুবাসে মাতিছে যা

 এই একটি মাত্র গান সে আয়ত্ব করেছে। এই সুর তাকে খুব টানে। অবশ্য জয়ন্ত হাজারিকার বেশ কিছু গানই ভাল লেগেছে ওর, কিন্তু ভাষা আর সুর রপ্ত করতে সময় লাগবে। আর তুলতে হবে ভূপেন হাজারিকার কিছু গান। টিলার ওপর এসে সামুয়েল কিছু ব্যায়াম করে সাইকেল নিয়ে। শরীরে আর এই সাইকেলে জং ধরতে সে দেয় না কোনোমতেই। তাকে সব সময় প্রফুল্ল রাখে সুর আর গান। কত দেশে সে গেছে, কত রকম মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, সব মানুষের মুখ যে ওর মনে থাকে, বা মনে রাখতে চায়, তাও না। কিন্তু সুর সে ভোলে না। কথা ভুলে যায় স্বাভাবিক ভাবেই, কিন্তু সুর মাথার মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকে। কখন যে কোন সুরে সে গুনগুনিয়ে উঠবে বা গিটারে কী যে সে বাজাবে, সেও জানে না! 

  সেদিন অভিজিতের সঙ্গে আলাপের পরদিনই ওরা আবার এক ক্যাফেতে আড্ডা দিতে বসেছিল। অভিজিৎ গরগাঁওয়ে যুবা উৎসবে ওকে নিয়ে যেতে চাইছিল, চাইছিল বলা ভুল, একরকম জোর করছিল ওকে ওখানে যাবার জন্য। খুব বেশি ভিড় সামুয়েলের ভাল লাগে না, তবু অভিজিতের উপরোধে ওকে রাজি হতে হয়েছিল সেদিন। এখন মনে হয়, সেদিন যদি ওই উৎসবে না যেত ও, এই গ্রামে আসাও হত না ওর। অথবা মণিপুর থেকে সে যদি ফেব্রুয়ারিতে আসামের শিবসাগরে না আসত, তাহলেও অভিজিতের সঙ্গে দেখা হত না। সবই বোধহয় পূর্বনির্ধারিত। নইলে কোথাকার কোন বরবরুয়া গ্রাম, আজ তার নিজের ঘরবাড়ি হয়ে ওঠে! ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল সামুয়েলের মন কেড়ে নিয়েছিল। অসমীয়ার বিহু নাচগান আর সুর, তাল, ছন্দে সে খুব একাত্ম বোধ করেছিল সেদিন। আসলে তার নিজের বাসস্থান যেখানে, সেও তো এমনই এক মায়াময় দেশ। কান্ট্রিসাইডে এক বিরাট খামার রয়েছে ওদের। চাষবাস তাদের পরিবারের রক্তে। আর সুর! তাদের পরিবারের সবারই রক্তের মধ্যেই সুর দৌড়ে বেড়ায়। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যে মুখে হাসি লেগে থাকে স্রেফ এই অজস্র, অনর্গল গান আর সুরের জন্য। টনিকের মতো কাজ করে। 

  একটানা সাতদিন যুবা উৎসবে ভাগ নিয়েছিল ওরা। এমনও হয়েছে, নিজের গিটার নিয়ে নাচেগানে ওদের সঙ্গে মেতে উঠেছে সামুয়েল। এমন একটা প্রাণবন্ত ছেলেকে, বিদেশি হলেও কাছে টানতে কারুর দেরি হয়নি। শেষদিন অভিজিৎ আর সামুয়েল প্রচুর মদ্যপান করে একসঙ্গে। আর সেই সময়েই অভিজিতের সঙ্গে ওর গ্রামে গিয়ে কিছুদিন থাকতে চায় ও। অভিজিৎ অবাক হলেও, সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়। যদিও একটু কিন্তু কিন্তু ভাব ছিল ওর…একজন সাহেবকে নিয়ে গিয়ে কোথায় থাকতে দেবে, কী খাওয়াবে, ওইরকম গ্রামে সাহেব কি থাকতে পারবে আদৌ…এইসব নিয়ে যখন মনে মনে ভাবছে অভিজিৎ, ভরপেট মদ খেয়েও সামুয়েল কী করে যেন ওর মনের কথা ধরতে পেরে গেছিল। নিজেই জড়ানো গলায় আশ্বাস দিয়েছিল, আমাকে নিয়ে ভেব না। এই সাইকেলে আমি কত যে দেশ ঘুরেছি, কত গ্রাম, জঙ্গল, পথঘাটে না খেয়ে পড়ে থাকতে হয়েছে, জল পর্যন্ত ফুরিয়ে যেত একেক সময়ে, ফলে আমাকে নিয়ে টেনশন কর না। তোমরা যেমন ভাবে থাকবে, আমাকেও সেভাবেই রাখবে।

   তবুও দুরুদুরু বুকে সামুয়েলকে নিয়ে গ্রামে এসেছিল অভিজিৎ। ঠিক হয়েছিল সাতদিন থাকবে এখানে সামুয়েল। তারপর রওনা দেবে দেশের উদ্দেশ্যে। ততদিনে টিকিট কেটে রাখতে হবে। কারণ ওর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে।        


(ক্রমশঃ)

শৌনক দত্ত

                                       




সৃজন এই সংখ্যার কবি শৌনক দত্ত।জন্ম - ৭ ই আগষ্ট( ২১ শে শ্রাবণ ) কোচবিহারের ব্যাঙচাতরা রোড। স্কুল জীবন শুরু জেনকিন্স -এ আর সেই সময় থেকেই লেখালিখির সূত্রপাত। সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা এবং ওয়েবজিনের। বর্তমানে ইরাবতী ডেইলি ওয়েবজিনের সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থ :

জল ভাঙে জলের ভেতর (২০১১)

ঠোঁটে দাও জ্যোৎস্নার বিষ (২০১২)

ডুব সাঁতার (২০১৭)

নিরুদ্দেশ গাছে সন্ন্যাসীর মুখ (২০১৭)

গল্প গ্রন্থ :

কারুময় খামে অচেনা প্রেম (২০১২)

শখ বইপড়া, লেখালেখি, ছবিতোলা, গান শোনা, ভ্রমণ। বেশ কিছু গানও লিখেছেন।

রা' প্রকাশন থেকে দুই মলাটে বন্দী হতে চলেছে তাঁর প্রবন্ধের সমাহার।


পরকীয়া

অন্য  বিছানায় শুয়ে 

সমুহ সময় 

ধাতস্থ হবার

 আগে অন্যকেউ

 মুখস্থ করে ফেলে 

নকশীকাঁথা বুনন।

বৃষ্টির নকশীকাঁথা তুমি আমাকে উপহার দেবে

আর

আমি তোমাকে উপহার দেব নিঝুম দ্বীপের শাড়ি।


কুয়াশা ভেজা রোদ,দুপুর

০৭ জানুয়ারি,২০১৮



আমার ছেলেবেলা

যে-শহরে বেড়ে ওঠা-তার ডাকটিকিট জুড়ে পাহাড়। যখন-তখন আমরা সর্ষে ফুলের গন্ধ পকেটে নিয়ে পাহাড়ে যেতাম। বড়রা যেত সমুদ্রস্নানে।তোর্ষার বাতাসে ভেসে বেড়াত তাদের অলৌকিক মেয়েবন্ধুদের শিহরণজাগানো সব ফিসফাস। ঢেউয়ের ডানায় চেপে ‘লাল দোপাট্টা’ উড়িয়ে তারা ফিরে আসতো।আমরা রঙধনু বোতাম খুলে উড়িয়ে দিতাম ঘুড়ির শৈশব।


শীত সন্ধ্যা,আশ্রম

১২ ফেব্রুয়ারি,২০১৮


আমার শরীর


তোমার সাথে কাটানো যে শরীরটা রোদ ভাঙলো ...

সে শরীর প্রতি রাতে পাহারা দিই, 

দেখি 

এক নিস্তরঙ্গ সমুদ্রের দিকে দরজা খোলা

যেখানে ধ্যানী বয়স শিরার ভেতর বিশ্রাম নেয় 

অবসন্ন জাহাজ চোখে অবতরণ করলে

আমরা প্রতিবিম্বিত হই

জোছনায় বোনা লাইট হাউজে।



বেডরুম,মধ্যরাত

১২ আগষ্ট,২০১৮



নির্জনতার ডাকনাম মৃত্যু


জন্ম খুলে বসে আছে মৃত্যুর বিস্ময়,একটা প্রেমহীন আয়নায় প্রতিদিন মুখগুলো গলে যায় রোদের বিকালে মৃত ডুমুরের নীরবতায়। ক্রমশই রহস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে চিলেকোঠায় পুরোনো চিঠির বান্ডিলে শব্দের সিম্ফনি, নৈঃশব্দ্যের নিঃশ্বাস।

বল “মৃত্যু” এবং পুরো বাড়িটা জমে যায়—


পড়ন্ত বিকাল, স্টাডি

০৩ জানুয়ারি,২০১৯



হঠাৎ পাওয়া ছেলেবেলা...


রাফ খাতা ভর্তি দুপুর, সাইকেল নির্জনতা

সেই সব ছায়াপথ… সেই সব মুখরতা

হঠাৎ পাওয়া ছেলেবেলা!

ঘড়িপাড়ার পুল পেরিয়ে স্মৃতি বনের পাশ দিয়ে যে রঙ্গীন ঢালু পথ চলে গেছে, তার শেষ মাথায় সুনসান একটা ছেলেবেলা দাঁড়িয়ে । নয়নাপাড়ায় কুটুম্ব বৃষ্টি নামলে নির্জনতার বুকে জমা হওয়া সমস্ত বিষন্নতার সংগীত আমার মুখস্থ আমি তার স্বরলিপি লিখে রেখেছি জং ধরা নীল বেহালার তারে.

ফেরিওয়ালাঘুম দুপুরে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা পথের উড়নচন্ডী ধুলোয় যত হাহাকার ডুবে থাকে,সোনালী, রুপালী আধুলির ছক আঁকতে আঁকতে খুব তাচ্ছিল্যে আটকা পড়েছে আমার যাবজ্জীবন আমার ক্ষয়ে যাওয়া পেন্সিলের পাশে,

সে পথ আমার সমগ্র সংসার হারিয়ে ঘরের দিকে ফিরে যাওয়া......

শীতে বেডরুম ঢাকা, 

মধ্যদুপুর

০৫ জানুয়ারি,২০১৯




শীত ২০১৯



দিন গুলো অ্যাজমাটিক… নিঃশ্বাসের টানাপোড়েন। আমাদের নাগরিক জনপদে শীত আসে দূরবর্তী মফঃস্বল থেকে উলাক্রান্ত জানালায় । শীত এলো আমাদের শহরে, শীতের গল্প নিয়ে....

আমাদের ক্যালেন্ডার শীত রঙের দাগে ভরে যাচ্ছে, হিমফুল চোখে প্রতিদিন দেখি। রঙিন শিশির বিন্দু বিন্দু মুগ্ধতায় নির্বাক বায়োস্কোপে ছবি হয়ে ফোটে। অমিলিত বিচ্ছেদে তুমি শেষমেষ দুরত্বপ্রবাল।

পায়ের ছাপ হারিয়ে যেতে যেতে হলুদাক্রান্ত দুপুর গুলো বাজেয়াপ্ত । শৈতপ্রবাহ শেখায় দুই অক্ষরের মাঝে বিচ্যুতির ব্যবধান। বার বছর আগের একটা শীতার্ত প্রেম কম ভোল্টেজের আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বুকের ব্যালকনিতে, প্রায়ই। খুব উসখুস ৷ একা একা এক কাপ লাল চায়ে ঊষ্ণতার ঘ্রাণ এবং কতিপয় দৃশ্যের বিষন্ন জলরঙ,

অথচ আমার কিছুই জানা হয়না…

শুধু শুধু সারাটা শীতঘুম জুড়ে সুনীতি হাইস্কুল

পুকুর ঘাটে সবুজ পাড়ের শাড়ি পুড়ে যায়, যাচ্ছেতাই....


সন্ধ্যা,বেডরুম

০৬ জানুয়ারি,২০১৯








শহরের শীতকালীন উৎসব

___________________________

আজকের আবহাওয়ায় কোন শোক নেই ।

জাহাজ ভিড়েছে 

নাবিকের সমুদ্র ভেজা নিঃশ্বাস ঢুকে পড়ছে... শহরে, অলিতে গলিতে ।


নিশুতি যাপন… খুব অগোচরে, 

যেমন করে পড়ে থাকে ঘুমের ভেতর বহুকাল আগের আধুলি স্বপ্ন ।

কবরের নৈঃশব্দ্যে সন্ধ্যা নামছে ৷গ্রীলে ঝুলছে তরুনী বউদের রাত্রিকালীন পোষাক । 

এখানে আমার কোন উপাসনালয় নেই ।


মাঝেমধ্যেই রানিপুরম ধরে ধরে একটা সুড়ঙ্গ পথে যেতে সাধ হয়

যে পাহাড়ের নিচে রেখে এসেছি সোনারঙ ‍দুপুর, 

রাতের ডুব, কিছু ভেজা আঙুল ।


আমি বাড়ি ফিরে এসেছি... অগোচরে 

দূরে... দূরে সরে যাচ্ছে বন্দর

ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে গুটিয়ে থাকা পথের রঙ ।

মধ্যদুপুর

১৬ জানুয়ারি,২০১৯


নগর

_______

ঝুপঝাপ সন্ধ্যা নামছে

গাছ মুছে দিয়েছে

রোদের যৌবন

করিডোরের অশ্রু চেটে নেয় অন্ধ স্ট্রীট লাইট

হেঁটে যায় জ্যামিতি-বক্সের দিকে-

ঠিকানাবিহীন এক চিঠি

গতি কামড়ে ধরেছে পা

পাতায় পাতায় ভেঙে পড়ছে ঘর-বাড়ি

উটের ছায়ায় ছায়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে নগর।


সন্ধ্যা,নগরের পথে

২০ জানুয়ারী,২০২০


ফ্যান্টাসি

__________

পেরেক আর দেয়ালের প্রেম নিয়ে কথা ফুরালে

চুমু থেকে উড়ে যায় ঠোঁট

শপিং মলের ভেতর জ্বল জ্বল করছে

এক আকাশ তারা।

জঙ্গল সাঁতরে ফিরে এসেছে ঘুম

যুবতীরা টুপটাপ ঢুকে পড়ছে আধ খাওয়া আপেলে

পাটিগণিতের প্রস্তাব থেকে

গড়িয়ে পড়ছে ঘুঙুর।

ভোরবেলা!

নদীর শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে পোড়াবাড়ির গন্ধ!


মধ্যরাত, ব্যালকনি

২৩ জানুয়ারী,২০২০



মাধুকরী হাতে নিয়ে

___________________________



পোয়াতি পালক থেকে ঝেড়ে ফেলো অতীতের সব পাণ্ডুলিপি। জানো তো-

সুতীব্র আলোও এক আজানা অন্ধকার।


যে শৈশব বন্ধু অলিন্দে সাগর হয়ে বেলাভূমি খোঁজে। তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছি পাখির শিস!আলোর ফেনিল থেকে মুছে নিয়ে বিদেহী আগুন। কুটিরের দায় মুছে সূর্যের প্রলেপ দিয়ে প্রতিদিন অন্ধকার লিখি। আর,চিরুনী জুড়ে তল্লাসী জীবন!


গোপন জ্বরের মতো পৃথিবীরও আজ স্বপ্নদোষ। ঐ দেখো,ভিক্ষার থালা থেকে শালিক খুঁটে খুঁটে খায় দিন।

চোখেতে বর্ষামঙ্গল লিখে আমার নিখোঁজ। অন্ধ চিত্রকর ক্যানভাসে হাসি ছড়িয়ে কান্না আঁকছে হাজার বছর।


আমরা জবা ফুলের মতোন মুখস্থ করেছি বিমুগ্ধ জলের ছাপ!



বাসা,মধ্যরাত

১৬ জুলাই,২০২০