রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                   


 মন এবং চার যুগ :



যুগের ভেদে মানব মনের প্রকৃতির বদল ঘটে। তাহলে দেখি, চার যুগ কেমন ছিল?
 ১. সত্য যুগ: 
     পুরাণ ঘেঁটে তথ্য পাওয়া যায়, এই যুগ ছিল মোট__১৭, ২৮, ০০০ বছর। অবতার প্রসঙ্গ যদি আলোচনায় আনতে চাই , দেখব__মৎস, কুর্ম, বরাহ, নরসিংহ __এই চার অবতার। এই সময় শুধুই পূণ্য। পাপ ছিলনা। মৃত্যু ইচ্ছাধীন। সোনার পাত্র ব্যবহার করা হত। তীর্থ ছিল পুষ্কর। 
একটু ব্যাখ্যা করি এই যুগটির। পাপ ছিল না। শুধু পুণ্য ছিল। 
অর্থাৎ, সকলেই মহান। পাপ হীন। এবার ধরা যাক, এমন ইস্কুলে আমি এলাম, যেখানে সকলে ফাস্ট হয়। তাহলে, সেখানে নিজেকে প্রমাণ করতে হলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে? তাই তো? সত্যযুগে ছিল তপস্যার কম্পিটিশন। সেরার মধ্যে সেরা হতে গেলে যা যা করতে হবে, সত্য যুগের মানুষ তাই তাই করতেন। তারপর অভীষ্ট লাভ হত। সুতরাং , বিচার করলে দেখা যায়, সত্য যুগ ছিল কঠিন পরিশ্রমের যুগ। দেবতা বলে যে জাত ছিল, যাঁরা এই সব সত্যবাদী তপস্বী মানবদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারত না। মনে রাখতে হবে, দেবতা কিন্তু পরম ব্রহ্ম নন। শুধু , ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ __ছিলেন সেই ভগবান ... যাঁদের জন্য কঠোর তপস্যা করতে হত। এমনকি দেবতাদের ও করতে হত। সে যাই হোক, সত্য যুগের কাহিনীতে যুদ্ধ বিগ্রহ ছিল। এই যুগের নায়ক , প্রহ্লাদ, ভক্ত প্রলহাদ হিসেবে যিনি বিখ্যাত, তাঁর জীবন কাহিনী বেশ চমকপ্রদ। মহর্ষি বাল্মীকির মত ওইরকম প্রতিভাধর কবি থাকলে, প্রহ্লাদ কাহিনী আজ ঘরে ঘরে আলোচনা হত। অসির চাইতে মসি অনেক বেশি ক্ষমতাবান, সেটা বাল্মীকি প্রমাণ করে গেছেন।  আর ওই যে দাবি?  সত্য যুগ অর্থাৎ মিথ্যা হীন যুগ... সম্পূর্ণ ঘটনা জানলে একটু কেমন কেমন যেন লাগে। তাহলে , ঘটনা একটু বলি বরং। 
    ভক্ত প্রহ্লাদ, নামের মতই স্বভাব। মধুর স্বভাব, সর্বদা হরি নামে বিভোর। মুশকিল হল, ওই রকম সত্যযুগে ও, তাঁর প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করলেন তাঁর জন্মদাতা পিতা , হিরণ্যকশিপু।  এই যে সর্বক্ষণ দেখানো হয়, ভক্তদের প্রতি অত্যাচার করা হচ্ছে এবং ভগবান এসে রক্ষা করছেন... এই ব্যাপার একটু অদ্ভুত লাগে না? তবে কি , ভগবান কতখানি শক্তিমান , সেটা প্রমাণ করার জন্য এইরকম কাহিনী রচনা করা হয়েছিল? 
 পৃথিবী সবে গড়ে উঠছে। মানব জাতি নিজেকে প্রমাণ করছে। যুগভেদ বা তার সঙ্গে গল্পগুলি মানব সৃষ্ট __এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। শৃঙ্খলাাহীন পৃথিবী ধর্মের শিকল পরে , বশ্যতা স্বীকার করবে সহজে। এই পদ্ধতি যথেষ্ট সম্মান জনক এবং আধুনিক ছিল। কালক্রমে বিকৃতি যদি আসে, সে দোষ কিন্তু নিয়মের নয়, সে দোষ করা হয়, কোনো ব্যক্তি স্বার্থের জন্য। 
 যেমন , এই যে তত্ত্ব , সাধনা করো , ঈশ্বর লাভ হবে। এক্ষেত্রে , সাধনা যদি dedication বোঝানো হয়, তবে dedicated লোক , ভালো ফল পাবে। ঈশ্বরের মত ভালো কিছু, সুন্দর কিছু, মঙ্গল কিছু লাভ করবে। সাধনা করা অর্থাৎ ইতিবাচক দিকে মন নিয়ে যাওয়া। 
ভক্ত প্রহ্লাদ , প্রচুর অত্যাচারিত   হচ্ছিল শুধুমাত্র হিরণ্যকশিপু র বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য। তবু, সে আপোষ করে নি। বালক বয়স থেকে  তিনি সেটাই করেছেন, যেটা তিনি ঠিক মনে করেছেন! মৃত্যুর মুখ থেকে বারবার ফিরে এসেছেন, রাজ্য , সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন... কিন্তু, মাথা নত করেন নি। শেষ পর্যন্ত , রেজাল্ট ভালো হয়েছে। ঈশ্বর এসেছেন কাছে।  আমাদের ধর্মের এই সবচেয়ে মহৎ গুণ। অলৌকিক তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে লৌকিক সত্যকে তুলে ধরা। রোজকার জীবন, তেল মশলার জীবন, যৌনতা , অধিকার বোধ ইত্যাদির জীবন... সেখান থেকে একটু সরে গিয়ে অলৌকিক কিছু দেখালে বা শোনালে , মানব মন আকৃষ্ট হতে বাধ্য। এইবার , সেখান থেকে শিখে নাও জীবনে চলার ধর্ম।
ত্রেতা যুগ

২.

চারযুগের দ্বিতীয় যুগ হল, ত্রেতাযুগ। এর পরিমাণ , ১২, ৯৬, ০০০বছর। পুণ্য তিনভাগ। পাপ এক ভাগ। অর্থাৎ, পাপের প্রবেশ ঘটেছে। এই যুগের কিছু বিশেষত্ব ছিল। এই সময় থেকে নতুন করে জেগে উঠেছে ভারতবর্ষ। জ্ঞান বিজ্ঞান শৌর্য বীর্য  সাহিত্য কাব্য ... সব দিকেই উঠছে নতুন সূর্য। সূর্য বংশ। নতুন নায়ক__শ্রীরামচন্দ্র। সত্যবাদ, ন্যায়বাদ ,যুক্তিবাদ সেই সঙ্গে প্রথম অনুভূত অপরাধবোধ। পাপ বোধ...জাতিভেদ , বর্ণভেদ... ত্রেতা যুগের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ  করলে মনে হয়, আধুনিক নাগরিক জীবনের জটিলতা এই যুগ থেকেই শুরু হল। 
   নারীর ভূমিকা নিয়ে সংশয়, নারীকে ঘিরে বিতর্ক, বিবাদ এমনকি যুদ্ধ পযর্ন্ত শুরু হল। ত্রেতা যুগ , ব্যক্তিগত ভাবে আমাদের চেনা যুগ। মনে রাখতে হবে, অনর্থক অলৌকিক কোনো ভাবনা কিন্তু এই যুগে তেমন করে গুরুত্ব পায়নি। শ্রীরামচন্দ্র আদর্শ মানব হিসেবে স্থান করে নিলেন ইতিহাসে।
 রাম + আয়ন__রামায়ণ __লেখা হতে থাকল তাঁকে কেন্দ্র করে।   কালক্রমে এই আদর্শ মানব, দেবতা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। নানা ঘটনার সাক্ষী ত্রেতা যুগ। যে ঘটনা কালের বিচারে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে ইতিহাসে। 
    চার যুগের বিচারে, আমার মতে, ত্রেতা  হল শ্রেষ্ঠযুগ।
দ্বাপরযুগ

৩.
 তৃতীয় যুগ। এর পরিমাণ: 
 ৮, ৬৪, ০০০ বছর। পুণ্য অর্ধেক। পাপ অর্ধেক। দ্বাপর যুগ___
  ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, আধ্যাত্মিক__ সব দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য যুগ। কারণ, এই যুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। 
এমন একজন যুগপুরুষ, যাঁর কথা শত মুখে ব্যাখ্যা করলে, আবার নতুন করে কিছু বলতে হয়। যেহেতু অর্ধেক পাপ থাবা বাড়িয়ে দিচ্ছে তখন, সে জন্যে প্রচুর জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ লোভী প্রতারক হত্যাকারী হয়ে উঠছে। একে অপরের সম্পত্তি গ্রাস করার  জন্য হানাহানি করছে। প্রাচীনকে অপমান করছে নবীন। এই সময়, দুষ্ট শাসক মহাশক্তিশালী। যেমন , কংস। শিশুপাল জরাসন্ধ প্রমুখ। সংকটে  আছে সৎ নিরীহ মানুষ। যেমন পাণ্ডব। দেশ জুড়ে হাহাকার। অশান্তি। এই সময় আবির্ভাব কৃষ্ণের। 
সুতরাং , সব দিক দিয়েই দ্বাপর যুগ উল্লেখযোগ্য।
8.
কলিযুগ
____________
এবার বলি, কলিযুগের কথা। আমাদের কাছে খুবই গুরত্বপূর্ণ। এর পরিমাণ: 
৪, ৩২,০০০ বছর। পুণ্য একভাগ। পাপ তিনভাগ। এক অদ্ভুত সময়। সৎ হলে পতন। দুষ্ট হলে সফলতা। পুরাণ যা যা বলছে, তাতে কলিযুগের ভালো বলতে কিছু নেই। কুটিল, হিংস্র , নারীর অপমান, তপস্যা ধর্ম সব রসাতলে। আবার, গুরুমুখী সাধনা তুঙ্গে।  মানুষের গড় আয়ু ১০০র কাছাকাছি। কলিযুগ অদ্ভুত যুগ। মানুষ আর মেশিন একসঙ্গে মিলে পৃথিবী জয় করবে। নাম যশের কারণে , মানুষ হত্যা পযর্ন্ত করতে পিছপা হবে না। 
   কলিযুগ সম্পর্কে, ঋষি মার্কন্ডেয় অনেক কথা বলেছেন। তিনি কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। দিব্যদৃষ্টির অধিকারী।  তাঁর সম্পর্কে আমি পরে লিখব। যাই হোক, প্রচুর নেতিবাচক দিকের মধ্যে, কলিযুগে দুটি ভালো দিক আছে। একটি হল, এই যুগে দান হল সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। আর হরিনাম সংকীর্তন করলেই মোক্ষলাভ। 
  অন্যান্য যুগে প্রচুর পরিশ্রম করে সিদ্ধি লাভ হয়, কলিযুগ সেইদিক দিয়ে সহজ পথ দেখিয়েছে। অল্প ভালো কাজ বিনিময় প্রচুর লাভ।







ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

                                         





ভাষা দিবসের তাৎপর্য


১৯৯৯এর ১৭ই নভেম্বর বিশ্ব সংগঠন ইউনেসকো ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে ‘বিশ্ব মাতৃভাষা দিবস’ পালনের আহ্বান জানানোর পর বিশ্বের নানা প্রান্তের সঙ্গে এ বাংলাতেও ‘ভাষাদিবস’ পালনের রেওয়াজ শুরু হয় । ওপার বাংলাতো বটেই এ বাংলাতেও দু একটি ভাষাসংগঠন আরো আগে থেকেই ‘ভাষা শহিদ দিবস’ পালন করে আসছে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিতে । এপারের বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীরা বিনম্র শ্রদ্ধায় একষট্টির ভাষা আন্দোলনে হত এগারো শহিদের স্মৃতিতর্পন করেন প্রতি বছর ১৯শে মে । এটা ভাষাদিবস পালনের একটি দিক ।

একুশে পালনের তাৎপর্য শুধুমাত্র ভাষা শহিদদের স্মৃতিতর্পন নয়, আরো কিছু । একুশে যেমন ভাষা শহিদ দিবস তেমনই মাতৃভাষা দিবস । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং আমাদের জীবনচর্যায় মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দানের প্রত্যয়কে প্রসারিত করার দিনও । ১৯৫২র ভাষা আন্দোলন – মাতৃভাষার মর্যাদার দাবিতে সেদিনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অবশেষে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । একুশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ওপারে বাংলার মত এক সমৃদ্ধ ভাষার সম্ভাব্য বিলুপ্তি রোধ করেছিল । ১৯৬১র ১৯শে মে’র বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন সেখানে মতৃভাষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল । মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে আর নেই । কিন্তু এই ইতিহাস চর্চার বাইরে ভাষা দিবসের তাৎপর্য নবীন প্রজন্মের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছে, সে বিষয়ে সংশয় থেকে যায় ।

ভারতে বাংলা ভাষা দুটি রাজ্যের সরকারী ভাষা । কিন্তু এই যে গত ষোল বছর ধরে আমরা ঘটা করে ভাষসদিবস পালন করছি, নবীন প্রজন্মের কাছে তার আবেদন কতটুকু পৌঁছায় কিংবা ভাষা-আবেগ তাদের কতটুকু স্পর্শ করে তা বোঝার উপায় নেই । এখানে বাংলা চাকুরি পাওয়ার ভাষা নয়, উচ্চশিক্ষা লাভের ভাষা নয় এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ভাষাও নয় । কিন্তু সেটাই বাংলা ভাষার নিজভূমে দুয়োরাণি হয়ে থাকার একমাত্র কারণ নয় । তবে হ্যাঁ, ক্ষীণ কন্ঠে এটা জানান দেওয়া গেছে যে বছরের ৩৬৫ দিনের একটা দিন ভাষা দিবসের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে । অনেকে আবার ভাবতে পারের, ভাবেনও যে তা হোক না । নারী দিবস, প্রবীণ নাগরিক দিবস, বাবা দিবস, এমনকি হুইস্কি দিবসও তো  বরাদ্দ আছে । আশঙ্কা হয়, এদেশে ভাষাদিবস ভাষা উৎসব না হয়ে যায় । কারণ উৎসবের ফন্দি-ফিকির খুঁজতে আমরা বেশ দড় । তাই ভাষাদিবসের তাৎপর্য যাদের সবচেয়ে বেশি জানা দরকার সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থেকে যায় অন্ধকারে  ।

আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে ‘বিশ্বায়ন’ নামক পাঁচ অক্ষরের এক দানবীয় বন্দোবস্ত তার অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের কৌশল হিসাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিসাবে আমরা টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনের এসএমএস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এক বিকৃত ভাষা রপ্ত করে নিচ্ছে নবীন প্রজন্মের শিশুরা, গড়ে তুলছে নিজ মাতৃভাষার সঙ্গে অনাত্মিয়তা ।

বিশ্বের আদিম জনগোষ্ঠীগুলির মাতৃভাষার ক্রমবিলুপ্তি রাষ্ট্রসঙ্ঘকে বিচলিত করেছিল । বস্তুত, বিশ্বের ভাষাবিজ্ঞানিরা ধারাবাহিক গবেষণা শুরু করেছিলেন, বিশ্বায়ন কি ভাবে অনুন্নত জনগোষ্ঠীগুলির ভাষাগত ভারসাম্য এলোমেলো করে দিতে পারে সেই বিষয়ে ।  রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধীনে এই বিষয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে, যেখান থেকে উঠে এসেছিল এক ভয়াবহ ছবি । তারা রাষ্ট্রসঙ্ঘকে সতর্কিত করেছিলেন যে এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের ছয় হাজার মাতৃভাষার বিলুপ্তি ঘটবে, যদি না ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতাকে ঠেকানো যায় । আমরা জানি আদিম ভাষাগোষ্ঠীর ক্রমবিলুপ্তি ছিল উপনিবেশবাদের অনিবার্য ফল । আজকের অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদের আবহে সেই ট্রাডিশনের অন্যথা হবার কথা নয় ।

        কোন ভাষার  বিলুপ্তি ঘটে তখন, যখন সেই ভাষায় কথা বলার আর একটি লোকও থাকে না । আমরা জানি, গত দুশো বছরে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ বহু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে চিরতরে লোপাট করে দিয়েছে । আমেরিকার আদিম জনগোষ্ঠী বা কালো মানুষরা জানে না, তাদের মাতৃভাষা কেমন ছিল । মেক্সিকো কিংবা মরিসাসের মানুষ জানে না তাদের মাতৃভাষা কি ছিল । আমরা আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারি এই ভেবে যে, বাংলার মত এতো সাহিত্য-সম্পদ সমৃদ্ধ ভাষা, যে ভাষায় রবীন্দ্রনাথ আছেন সে ভাষার মৃত্যু হতে পারে না কোন দিন । হ্যাঁ, পারে । সংস্কৃতেও তো কালিদাস, ভারবি, ভাস ছিলেন , সে ভাষাও মৃত । অহম ভাষা একসময় খুব সমৃদ্ধ ভাষা ছিল । ১৩ থেকে ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় শাসন করতো অহম জনজাতি । ১২২৮ থেকে ১৮২৬ পর্যন্ত অহম গণরাজ্যের প্রধান ভাষা ছিল ‘অহম’। ১৯ শতাব্দীর মধ্যে এই ভাষাটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে । বিষয়টা তো এই যে আমরা সেই ভাষায় কথা বলছি কি না, সেই ভাষাতেই আমার সৃজনশীলতা পুষ্ট হচ্ছে কি না । শিশুরা বা নবীন প্রজন্ম যদি তাদের দৈনন্দিন জীবনে, জীবনচর্যায় মাতৃভাষার উচ্চারণ থেকে বিরত থাকে তবে সেই ভাষার মৃত্যু ঠেকানো যায় না । এপারের বাঙ্গালাভাষীদের অশেষ সৌভাগ্য যে বাঙ্গালী জাতিসত্তার একটা স্থায়ী ঠিকানা আছে – বাংলা দেশ, যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা । 

ভাষা বিলুপ্তি সম্পর্কে সারা বিশ্বকে প্রথম যিনি সচেতন করেছিলেন সেই আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল ক্রাউস ২০০৭এ একটি তথ্য দিয়েছিলেন যে, সারা বিশ্বে সক্রিয় ভাবে চালু সাত হাজার ভাষাকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়  নিরাপদ, প্রায় বিপন্ন ও বিপন্ন ভাষা । তাঁর মতে সেই ভাষাকেই নিরাপদ বলে মনে করা হয় যদি শিশুরা ও নবীন প্রজন্ম আগামী একশো বছরে সেই ভাষা ব্যবহার করে তার দৈনন্দিন জীবনে । না করলে সেই ভাষা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে, ক্রম বিলুপ্তিই যার অনিবার্য পরিণাম । ২০০৯এ ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ সমিতির প্রতিবেদনে একই কথা বলা হয় যে, “একটি ভাষায় কথা বলা জনগন যদি তার দৈনন্দিন ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকে, সেই ভাষায় আদান প্রদান করা মানুষের সংখ্যা যদি ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে এবং সেই ভাষায় কথা বলার ধারা যদি  পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তরিত না হয় তবে তা বিপন্ন ভাষা রূপেই চিহ্নিত হবে” । 

তৃতীয় বিশ্বের ভাষাগত বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য তছনছ করে দেওয়াই উন্নত দেশগুলির অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের লক্ষ্য । তারা চাইছে  সারা বিশ্বে মাত্র পাঁচ-ছটি ভাষায় মানুষ কথা বলবে । কারণ তারা মনে করে ভাষার কাজ শুধু সংযোগ সাধন করা বা ‘কমিউনিকেট’ করা । ভাষার নৃতাত্বিক উপযোগিতা তাদের কাছে গৌণ । তিন ধরনের প্রবণতা কোন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয় । প্রাধান্য বিস্তারকারী কোন ভাষার চাপে নিজের মাতৃভাষার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং এই বিচ্ছিন্নতার ফলেই  কয়েকটি প্রজন্ম ধরে কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা ‘ভাষামৃত্যু’র দিকে এগিয়ে যায় । আবার কোন ভাষাগোষ্ঠী নিজের মাতৃভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় সেই প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষার প্রকরণকে নিজ ভাষার সঙ্গে মিশ খাইয়ে দিয়ে । বিশ্বায়নের আড়কাঠি কর্পোরেট সংস্থাগুলি এই প্রক্রিয়ায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে । তাদের বিজ্ঞাপন গুলিতে ব্যবহার হচ্ছে অদ্ভুত সব খিচুড়ি ভাষা ‘এ দিল মাঙ্গে মোর’, ‘ঠান্ডার নতুন ফান্ডা’ ইত্যাদি । 

দু বছর আগে , ২০১২র অক্টবরে লখণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যগে ভাষা সংক্রান্ত এক সেমিনার হয়েছিল । সেই সেমিনারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদপত্র ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ জানিয়েছিল যে, ভারতে চালু ৩৮০টি আঞ্চলিক ভাষার ৯৬শতাংশ ভাষাই বিলুপ্তির পথে । ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী ভারতে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছে ২৪২টি আঞ্চলিক ভাষা । এখন ভারতে মোট জনসংখ্যার ৪শতাংশ মানুষ এই মৃত্যুপথযাত্রী ভাষাগুলিতে কথা বলে, আর ৯৫শতাংশ মানুষ যে প্রধান ভারতীয় ভাষায় কথা বলে তা ভারতে চালু ভাষা সম্মূহের ৪শতাংশ মাত্র । কি ভয়ঙ্কর ছবি উঠে আসছে ভারতকে ‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’র গর্ব করা আমাদের কাছে ! 

এখন সারা বিশ্বে ৭৩৫৮টি ভাষা আছে, যার ৯০ শতাংশই ২০৫০এর মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান । এরমধ্যে ৩৩০টি ভাষায় কথা বলে ১০লক্ষের বেশি মানুষ, ১৭৮টি ভাষায় কথা বলে ১০জন মানুষ, ২০০টি ভাষায় ১০জনেরও কম আর ৫১টি ভাষায় মাত্র একজন করে কথা বলার লোক আছে । সেই শেষতম মানুষটির মৃত্যুর সঙ্গেই সেই জনগোষ্ঠীটি তার ভাষাপরিচয় হারিয়ে ফেলবে । পরের প্রজন্ম জানবেও না তার পূর্বজদের মুখের ভাষা কেমন ছিল, কেমন গান তারা গাইতো, কি রকম ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে তাদের শিশুরা ঘুমিয়ে পড়তো ! ঠিক পাঁচবছর আগে ২০১০এর ২৬শে জানুয়ারি ভাষাপ্রেমিকদের  সামনে এসেছিল এক বিষন্ন দিন যেদিন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ৮৫ বছরের নিঃসন্তান বৃদ্ধা বো সিনিয়রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছে আন্দামানী জনজাতিরন্যতম প্রাচিন ভাষা ‘আকা বো’ । বো সিনিয়র ছিলেন সেই ভাষায় কথা বলা শেষতম মানুষ । ১৮৫৮তে ইংরাজরা আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে উপনবেশ করার সময় বো জনজাতির লোকসঙ্খ্যা ছিল পাঁচ হাজার আর বো সিনিয়রের মৃত্যুর সময় সেই সংখ্যাটা দাঁড়ায় ৫৮ জনে, যাদের মধ্যে তিনিই একমাত্র সেই ভাষাটি জানতেন । এই ভাবে ইতিহাসের একটি পৃষ্ঠাই যেন মুছে গিয়েছিল সে দিন ।

ভাষা বিলুপ্তির এই প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির ওপর উন্নত দেশগুলির প্রাধান্য বিস্তারের গতির সঙ্গে তাল রেখে । খোদ আমেরিকাতেই ১৯২টি জনজাতির ভাষা বিলুপ্তির পথে । ইন্দোনেশিয়ায় ১৪৭টি ও ভারতে ১৯২টি ভাষা অবলুপ্তির পথে । ভাষা বিলুপ্তির এই প্রবণতা রোখা না গেলে ভাষা বিজ্ঞানিদের অনুমান এই শতাব্দীর মধ্যেই ছ’হাজার ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংকট ঘনিয়ে আসবে ।

দু’বছর আগে ২০১৩তে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে ইউনেসকো একটি উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছিল যে বিশ্বে এখন কথা বলা অর্থাৎ চলতি ভাষাগুলির মধ্যে ২৫০০ ভাষাই বিপন্ন ভাষা এবং গত তিন প্রজন্মে দু’শটি ভাষার বিলুপ্তি ঘটে গেছে । এই যে আড়াই হাজার ভাষাকে বিপন্ন বলে চিহ্নিত করেছে সেগুলিকে তারা ভাগ করেছে এই ভাবে –

নিরাপদ নয় (আন-সেফ) – ৬০৭টি ভাষা

নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন – ৬৩২টি

মারাত্মক বিপন্ন – (সিভিয়ারলি এনডেনজার্ড)- ৫০২টি এবং

ভয়ঙ্ক বিপন্ন (ক্রিটিকালি এনডেনজার্ড) – ৫৩৮টি ভাষা ।

ভাষাবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেছেন যে যখন তরুণ প্রজন্মএর মানুষ তার ভাষায় কথা বলে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যেমন বাড়িতে – সেও ভাষা বিপন্ন ভাষা । শিশুরা যখন তার মাতৃভাষায় কথা বলে না তখন সে ভাষা নিশ্চিত ভাবেই বিপন্ন । আবার যে ভাষায় বৃদ্ধ বা প্রবীণ অর্থাৎ দাদু-দিদিমারা কথা বলেন, পরের প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুটির পিতা-মাতা সে ভাষা বুঝতে পারেন কিন্তু তৃতীয় প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের সন্তানদের সঙ্গে সেই ভাষায় আদান-প্রদান করেন না, সেই ভাষা ভাষা বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে মারাত্মক ভাবে বিপন্ন । আর একটি ভাষায় শুধুমাত্র প্রবীণরাই কথা বলেন নিজেদের মধ্যে – সে ভাষা ভয়ঙ্কর ভাবে বিপন্ন । 

স্বাধীন ভারতেও উপজাতি ভাষাগোষ্ঠীর মাতৃভাষাগুলিকে রক্ষা করার কোন অর্থবহ প্রয়াস দেখা যায় না । ভারতে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলি কতটা বিপন্ন সে হিসাব কোন সমাজতাত্বিক করে উঠতে পেরেছেন কি না জানা নেই । কিন্তু এটা তো জানি এদেশেও অনেক প্রাধান্য বিস্তারকারী ভাষা অনেক আঞ্চলিক ভাষাকেই গিলে ফেলেছে । ১৯৯১সালের জন গননায় স্বীকার করা হয়েছিল যে ভারতে হিন্দিভাষী মোট জনসংখ্যার  ১০কোটি ৭২ লক্ষ মানুষের পৃথক ভাষা পরিচয় আছে । ভোজপুরি, বুন্দেলখন্ডি, মৈথিলী গোষ্ঠীগুলির পৃথক ভাষা পরিচয় থাকা সত্বেও সেগুলকে হিন্দি গিলে ফেলে নিজের  কলেবর মোটা করেছে । ১৯৯১ ও ২০০১এর দুটি জনগননার প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে দেখা যাবে এই দুটি জনগননার মধ্যবর্তী সময়কালে সব প্রধান ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা কমেছে কিন্তু হিন্দির ক্ষেত্রে বেড়েছে ১৯৯১ তে ভারতের মোট জনসংখ্যার ৮.২২% মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন আর ২০০১এর জনগননায় এই সংখ্যাটা হয়ে গেছে ৮.০১% অর্থাৎ দশ বছরে ০.২১% মানুষ দশ বছর আগে যারা বাংলায় কথা বলতেন তারা অন্য ভাষায় কথা বলা শুরু করেছে ।

কোন ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য থাকা বা না থাকা সেই ভাষার বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত নয়, জরুরিও নয় । ভাষার লিখিত রূপ বা সাহিত্য এসেছে অনেক পরে । আমরা জানি যে, মৌখিক ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সম্পদ অনেক বেশি । এই যে আমরা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান শুনে বড় হই, চিরকাল শিশুরা মায়ের মুখে যে সব ছড়া-গল্প-গান শুনতে শুনতে ঘুমাতে যায়, সে তো মৌখিক সাহিত্য – আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অসামান্য সম্পদ, আমরা জানিনা, জানার প্রয়োজনও নেই সেগুলি কার রচনা । সব আঞ্চলিক ভাষারই এই মৌখিক সাহিত্য-সম্পদ আছে । ভাষাচার্য সুকুমার সেন এই মৌখিক সাহিত্য বা শিশুতোষ ছড়া-গল্প-গান প্রসঙ্গে লিখেছেন “শিশু-বেদ বয়স্কের সাহিত্য-ভুবন ধরে আছে বাসুকীর মতো । শিশু-বেদের মধ্যে ধরা আছে সমগ্র মানবজাতির জন্মপত্রিকা” । কোন জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির অর্থ সেই ভাষাগোষ্ঠীকে ঘিরে যে যে জ্ঞানভান্ডার তারও বিলোপ । আদিম জনগোষ্ঠীর মৌখিক ভাষায় সঞ্চিত থাকে তার পরিবেশ, সংস্কৃতি, বন্য-প্রজাতি সম্পর্কিত জ্ঞানভান্ডার । সমস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষত্রেই একই কথা বলা যায় । কারণ মানুষের জ্ঞানভান্ডারের অতি সামান্য অংশই লিখিত ও সাহিত্য রূপে থাকে, মানুষের মৌখিক জ্ঞানসম্পদ অনেক বেশি ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ । কোন ভাষাগোষ্ঠীর বিলুপ্তির অর্থ অতয়েব  সেই ভাষা অঞ্চলের  নৃতাত্বিক ভারসাম্য তছনছ হয়ে যাওয়া ।

এই উদ্বেগের যায়গা থেকেই মাতৃভাষা পালনের আহবান জানিয়েছিল ইউনেসকো । মাতৃভাষায় কথা বলার পরম্পরাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মে হস্তান্তর করতে না পারলে – শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় কথা বলতে শেখানো আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহারের মধ্য দিয়েই ভাষা-মৃত্যুর প্রবণতাকে রোধ করা যায় – অন্য কোন বিকল্প পন্থা নেই । এটাই ভাষাদিবস পালনের তাৎপর্য । একুশে যেমন ভাষাশহিদ স্মরণ দিবস তেমনই নিজ মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রত্যয় প্রসারিত করার দিনও ।

                                ========== XXX =========

যুগান্তর মিত্র

                                       





নদীকথা 


নদীটি আমার কাছে নিয়মিত আসে। 

ঠিক যখন দিবালোক কেড়ে নিতে 

চুপিসারে আসে সান্ধ্যকাল। 

তিরতির বয়ে যায় আর 

একা একা গেয়ে যায় জীবনের গান। 



আমি তাকে কোনোদিন গাইতে বলি না।  

আমি তাকে কোনোদিন আসতেও  বলি না।  

তবু সে ঠিকই আসে 

গান নিয়ে 

কথা নিয়ে 

আর আনে 

বাংলাভাষার অহংকার। 



এই মহার্ঘ্যের জন্যই আমি তাকে 

বুকে এঁকে রাখি আজীবন।


চিত্রঋণ_ জয়ীতা ব্যানার্জী

সৌমাল্য গরাই

                                                     


সৃজন এই সপ্তাহের কবি সৌমাল্য গরাই জন্ম ১ লা জুলাই, ১৯৯৬।
বাঁকুড়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম, নাকাইজুড়ি। সেখানেই তার জন্ম, সেখানেই শিক্ষার সাথে বেড়ে ওঠা। বাঁকুড়া ক্রিশ্চান কলেজ হয়ে বর্তমানে কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে স্নাতকোত্তরে পাঠরত। কবিতাই তার নিভৃত আশ্রয়, বেঁচে থাকার অক্সিজেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবি লিখে চলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম দেশ, কবিতা আশ্রম,কৃত্তিবাস, শ্রীময়ী, লালমাটি, রুখুডি ইত্যাদি।



সহজাত 

চোখের গভীর কোনও চোখ 
খুঁজেছে তোমায়

   অতিদীর্ঘ অন্ধকারে
   না থাকাও  কথা বলে তার



     যেভাবে শোনায় গাছ
               মাটির কবরে শুলো যারা
হারিয়ে গিয়েছে ভেবে আক্ষেপ করো না
তারাই ত উঠে আসে পাতার পোশাকে?
           না হলে কীসের লোভে        ওই শেকড়েরা   এত মাটি
      বুকে   ধরে  রাখে

 
বিভ্রম

যতটা সীমানা তার ততদূর নয় আসমান
আলোরা মায়ার মৃগ অন্ধকার বনে
অতর্কিতে ফাঁদ পাতে দৃষ্টির আড়ালে

অনেক ভ্রমণ শেষে ধ্বংসস্তূপে এখনো দাঁড়ালে
কেবল বিভ্রমে কেঁপে উঠি, যাকে এতকাল ধরে   
খুঁজেছি নিজের ভেবে সাক্ষী রেখে নিজস্ব আয়নায়
মিলেনি কিছুই তার দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপ
আমিও নকল তাই বিপরীত দিকে
আমাকেই ভ্রম ভেবে ছায়া আরও বড় হতে চায়

আবহমান

নদী তুমি পার করে দিও দেহজ নৌকার ভার। বইঠা হারিয়েছে মন তাকে মাঝি করে দিও
চর্যাপদে গুঞ্জাফুল গাঁথা শবরীটির মতো। ভুলে যাই কীভাবে বাঁধিব অক্ষর স্রোতচূর্ণিমালা  

উদ্দেশ্য বিহীনভাবে পালিয়ে এসেছি বৃক্ষ ও ব্যাধের ধ্যান থেকে। দুজনের ধ্যানসত্য থেকে জেনেছি এসব লক্ষ্যভেদী। এর চেয়ে ভালো  সমুদ্র মুখর হাওয়াদের কাছে যাওয়া। সমুদ্রের লবণাক্ত ডাকে সাড়া দেয় লক্ষ্যহীন। নীল ফেনায়িত রাতে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে ঘুমোয় সবুজ শ্যাওলারা, তার আঁশগন্ধ পেয়ে জল জাগে আর ছুটে ছুটে যায় তীর থেকে তীরে।

যে ছেড়েছে ঘর— ক্রীতদাস হতে ইচ্ছে করে তার, যেন জীবনকে ঘোরাতে পারি আমার পিছু পিছু

খাদক ধর্ম

খিদে মেটানোর আগে 
 নিভে যায় যে আগুন 
সে আগুন ছিল না কখনো সৎ

রক্ত কোথাও নেই আমাদের আছে শুধু খুন
আহার ফুরিয়ে এলে শোনও খিদে
চোখের উপর থেকে তুলে নেব বিশুদ্ধ নুন 


খাঁচাবন্দী 

একটাই খাঁচা,  তাকে রোজ দুভাবে পুষেছি
আমাদের দ্বারে থাকেনি কোথাও
ঘন বন, আত্মমগ্ন গাছ
 ভয়ে ভয়ে থাকা একদিন, যে পাখি উড়েছে
পেয়েছ কী টের
সে পাখি কেবলই ছিল একাকী খাঁচার
কখনো ছিল  না  আমাদের...
বৃক্ষজন্ম

যে মানুষ জীবন কুড়োতে কুড়োতে কিছুই পেল না
তাকে কুঁড়ি দাও, 
 একবার তার বৃক্ষজন্ম হোক, 
মাটি পাক নিজস্ব শিকড়,  পাতা,ফুল, ফল
ঝড়- বাদলের দিনে
অন্তত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার অধিকার


দিগন্ত- পাঠ

কোথাও কোনও বিচ্ছেদ নেই
 এরকমভাবে শুয়ে আছে দিগন্ত
নীচু হয়ে আছে বক, নির্নিমেষ মাঠ—
বুক খুলে শুয়ে আছে। একে একে সব পাখি একাকী আকাশ

অসীম দূরত্বে তাই —
আমাদের খুদকুঁড়ো, দু'বেলার বেঁচে থাকা লড়াইকে 
করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে 
 ফিরে যাচ্ছে সূর্যাস্ত- দেবতা

সৌমাল্য গরাই
বাঁকুড়া  


রবিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                                   



অধ্যায় -- ৬ 

_______________

 মুড সুইং

মনের জানালা

 মুড সুইং বা মেজাজের পরিবর্তন এখন আলোচ্য বিষয়। কথায় বলে মেজাজ তো আসল রাজা, আমি রাজা নই। সুতরাং , এই রাজার খিদমত গার তো হতেই হবে। 

 কারণ, মেজাজ খারাপ তো দুনিয়া খারাপ। 

 গত অধ্যায়ে বলেছি, শরীর গত কিছু কারণ বিরক্ত করে তোলে। যেমন, হঠাৎ চুল পড়ে যাওয়া। চুল বড্ড আদরের বস্তু। আজ বলি কিছু সহজ টিপস। যার ফলে চুলের গোড়া শক্ত হবে। ঝলমল করবে। মন ভালো থাকবে। নারকেল তেলের মধ্যে  জবা ফুল, অপরাজিতা ফুল, নিয়ম পাতা , মেথি গুঁড়ো , আমলকি দিয়ে ফুটিয়ে , ছেঁকে একটা শিশিতে ভরে রেখে দিয়ে, মাঝে মাঝে চুলের মধ্যে ভালো করে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিয়ে পরেরদিন ধুয়ে নিতে হবে। সপ্তাহে একদিন ডিম লাগানো জরুরি। না হলে পাকা কলার পেস্ট। সঙ্গে দই। 

   অবাক করা ফল মিলবে দিন কতকের মধ্যে। সেইসঙ্গে আলো হয়ে উঠবে অন্ধকার মন। 

  তাহলে এটা বোঝা গেল, সেজে গুজে সুন্দর থাকা অন্যায় কিছু না। বরং জরুরি। 

     এবার আসি আরো একটা  বিষয়ে।  অনেকেই বলে থাকে, ভালো লাগছে না। কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে বলবে, জানি না। শুধু ভালো লাগছে না। নাহ্। সম্ভব না। কোনো কিছু কারণ ছাড়া হবেনা। যদি প্রশ্ন করা যায় , একটু ভেবে বলো কেন ভালো লাগছে না? উত্তরে হবে,  কত কাজ।  ফলে, মেজাজ আরো খারাপ হচ্ছে। 

 ছড়িয়েপড়া কাজের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা খুব সাধারণ সমস্যা। তার থেকে বিরক্তি খিটখিট ভাব। তাহলে আগে বিরক্তির কারণ জেনে নিতে হবে। এক একটা দিনের কাজকে লিস্ট বানিয়ে রাখতে হবে। লিস্ট মিলিয়ে শেষ করে ফেলতে হবে কাজ। ভালো লাগবে অবশ্যই। এমনও হতে পারে , আচমকা কোনো ব্যাঘাত এসে ভেস্তে দিল দিনের প্ল্যান। তবু , ধৈর্য হারালে চলবে না। যে কাজটা রয়ে গেল, তাকে চাপ দিয়ে শেষ না করে বরং পরের দিনের কাজের সঙ্গে  জুড়ে দিয়ে যেভাবে হোক শেষ করে ফেলতে হবে। মেজাজ হারালে চলবেনা। মনে রাখতে হবে, কাজ শেষ করা উদ্দেশ্য, মেজাজ খারাপ করা না। 

    মুড সুইংয়ের আরো একটা বড় কারণ পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। ঘুমোতে হবে। বিকেলের দিকে ৩০ মিনিট হেঁটে আসতে হবে যত কাজ থাক। মনে রাখতে হবে, দুপুর বারোটার পর থেকে আমাদের খারাপ বেশি লাগে। সেজন্য বিকেলের দিককে গুরুত্ব দিতে হবে। একটু ধ্যান, হেঁটে আসা, ছবি আঁকা ... কিছুতেই যেন বিকেলের মলিন ভাব গ্রাস করে ফেলতে না পারে। 

   আজ এই পর্যন্ত। আবার পরের রবিবার।

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                             



 মনের জানলা


অধ্যায় ৫

    মুডসুইংয়ের কারণ বলতে বসলে হাজার কথা বলতে হয়। এই কারণগুলোকে দুটো প্রধান ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা অবশ্যই মানসিক। আর একটা শারীরিক। শরীরের চাইতে মনেরগুরুত্ব এইজন্য বেশি যে , অনেক সময় শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে না। কিন্তু , মন খারাপ থাকলে দুনিয়া গন্ডগোল। 

   মনে রাখতে হবে, প্রতিদিনের তুচ্ছ ঘটনা অনেক সময় মনের উপর প্রতিক্রিয়া ফেলতে পারে। যেমন একটা সহজ কথা, চুল নিয়ে মহিলাদের দুঃখ। চুল উঠে যাচ্ছে। কি যে হবে! এই নিয়ে চলল মন খারাপ। ডাবলচিন হচ্ছে। চোখের কোলে পড়ছে ভাঁজ। গলার চামড়া ঢিলে। মনের আকাশ মেঘলা হয়ে থাকে। 

  তাই বলি, দিনের কিছুটা সময় থাকুক নিজের জন্য। ত্বক চুল ইত্যাদি থাক যত্নের তালিকায়। দশমিনিট সময় বার করতে বললেই মহিলারা হায় হায় করে উঠবেন। তাদের না কি এক ফোঁটা সময় নেই। 

   যখন দেখে আর হচ্ছে না, তড়িঘড়ি পার্লারে গিয়ে এক গাদা টাকা খরচ করে চলে এলো। সেটাতেও মন খারাপ। কাউকে কাউকে বাড়িতে কথা শুনতে হয় এই জন্য। অনেক স্বামী বলে বসেন : এগুলো কি বাজে খরচ হচ্ছে! 

রোজগেরে সন্তান বলবে: তোমার কি দরকার চুলে রঙ করার? 

এগুলো মাঝে মাঝে বড্ড অপমানের। কেউই হয়ত ইচ্ছে করে বলে না। কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন চাবুকের মত আছড়ে পড়ে কথা। সরল জীবন জটিল হয়ে দাঁড়ায়। কথা বা বাক্য একটা শক্তিশালী অস্ত্র। তাকে তীক্ষ্ণ ভাবে ব্যবহার করে রক্তাক্ত করা যায় বইকি! 

 চুলে একটু ডিম লাগানো হোক। হাতে পায়ে বাদাম তেল অথবা গ্লিসারিন। বাড়িতেই গরমজল করে টিভি দেখতে দেখতে পা ঘষে ফেলে নেলপালিশ পরে নিলেই হয়ে গেল। নিজের চকচক গোড়ালি এক নিমেষে মন ভালো করে দেবে। 

 আয়না থেরাপির মূল কথা হল নিজেকে ভালোবাসা। সেলফ লাভ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলা, দেখোতো! আমায় চিনতে পারো কি না? 

 আগে একটা ছবি তুলে রেখে নিজের একটু চর্চা করে দশদিন পরে দেখতে হয় কেমন তফাৎ হল! মন খুশি হতে বাধ্য। 

 দুঃখ সবসময় বড় কারণেই হয় না। চোরকাঁটা র মত কিছু দুঃখ থাকে। চলতে ফিরতে যেগুলো বিঁধতে থাকে অহরহ। 

ছোটছোট এই দুঃখ গুলো তুচ্ছ হলেও কষ্ট দেয়। সময় করে একটু ঝেড়ে বেছে তুলে নিলেই হল। 

একটু সময় একটু যত্ন আমাদের শরীরের প্রয়োজন আছে। সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে নিজের জন্য কেবল মনখারাপ তুলে রাখলে চলবে? 

  তাই আজ থেকেই বরাদ্দ হোক দিনে ২০ মিনিট শুধু নিজের জন্য।




রবিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় ( মুনিয়া)

                                           


                    

মনের জানলা

অধ্যায় __৪

 

    আজ বলব মনের ব্যাংকিংয়ের কথা। ব্যাংক শব্দটা জড়িয়ে আছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। নিচুতলা থেকে উঁচুতলা ব্যাংকের দ্বারস্থ সবাই। কারণ, জমা থাক কিছু পুঁজি। অসময়ে কাজে লাগবে। বিপদে পড়লে কাজে লাগবে। 

জমা করা ,জড়ো করা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আরো নানান দিক আছে এই জমিয়ে রাখার ব্যাপারে। যেমন , কথায় কথায় আমরা বলি, এনার্জি বাঁচিয়ে রাখতে। একটু ঘুমিয়ে নিতে। শরীর ফ্রেশ হয়ে যাবে। পরে কাজ করার সময় বাঁচিয়ে রাখা এনার্জি সাহায্য করবে। ঠিকমত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, সঠিক ব্যায়াম করে শরীর ঝরঝর তাজা করে ফেলার উপদেশ সর্বক্ষণ শুনতে হয়। 

তাহলে মনের ব্যাংকিং কি? মনের ঘরের জমা খরচের হিসেব ঠিক কি রকম?

     ******

  মুশকিল হল, ব্যবহারিক জগৎ আর তার উপযোগিতা নিয়ে সর্বক্ষণ হিসেব নিকেশ করে চলেছি। নিজেদের খুব বুদ্ধিমান ভাবছি। চারিদিকে সবকিছু সামলে চলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে বাহবা দিচ্ছি। আজ এমন দুজন মহিলার  গল্প করি। গল্প নয়। সত্য ঘটনা। 

 প্রথমজন  বাংলাদেশ হতে প্রচুর সংগ্রাম করে কলকাতা এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। জিরো থেকে একেবারে হিরো। ছেলেগুলো হীরের টুকরো বললেও কম বলা হয়। সেইসঙ্গে মা অন্ত প্রাণ। স্বামী অকালে স্বর্গে চলে গেলেও ওনার কোনও  সমস্যা হয় নি। উনি প্রচুর পুজো করতেন। উপোস করতেন। এবং কাউকে বিশ্বাস করতেন না। এককথায় চতুর যাকে বলে। চারিদিকে সতর্ক নজর। টাকা পয়সা অনেক। ছেলেরা হাতের মুঠোয়। ধন্য ধন্য করত লোক। 

  আজ তিনি বিছানায় শয্যাগত। ছেলেরা রাজকীয় চিকিৎসায় রেখেছে। তার স্মৃতি ক্রমশঃ লোপ পাচ্ছে। কথা বলেন। কথার বেশিরভাগ হল অশ্রাব্য গালি। নোংরা কথার তুবড়ি। নিজের মনেই বলে যান। আয়া নাকি ওনার গোপনাঙ্গে হাত দিয়েছে। একটার পর একটা আয়া বদল। ওনার গালি গালাজ চলতেই থাকে। 


       গল্প ২

____________

 আরেক মহিলার গল্প। সংগ্রামের ইতিহাস দুজনের প্রায় সমান। সাফল্যের বিচারে দ্বিতীয়মহিলা অনেক কম। অর্থভাগ্য ভালো নয়। সন্তান ভাগ্য ভালো নয়। দিনান্তে নিজের ভাত নিজের ফুটিয়ে খাওয়া ছিল তার ভবিতব্য। 

********

এই মহিলা দুজনকে তাদের মধ্যবয়স থেকে দেখেছি। খুব কাছের থেকে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ করতাম। দুজন মহিলা আমার কাছের মানুষ। দুজনেই বিধবা। দুজনেই পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। 

আমি লক্ষ্য করতাম ওদের চলাফেরা, কথাবার্তা। সফল মহিলার চলা ফেরার মধ্যে উগ্র অহঙ্কার ফেটে পড়ত। মুখে একফোঁটা হাসি নেই। সর্বদা অবিশ্বাস। ভুরু দুটি কুঁচকে আছে। নিরামিষ খেলেও প্রচুর ফল দুধ হরলিকস একেবারে সময় মেপে খান। বাড়িঘর নিয়ে ভীষন সচেতন। সিল্কের শাড়ী, গহনা।  অপর মহিলা একবেলা আহার করেন। যত অল্প খাওয়া যায়। নিরন্তর মুখে হাসি। সকলের সঙ্গে কুশল বিনিময়। যে সন্তান রোজ আঘাত করছে তার জন্য প্রার্থনা। অচেনা লোকের জন্যেও শুভ কামনা। সাদাথান ছাড়া কোনো কিছু নেই। এমনকি একটুকরো সোনা পযর্ন্ত নেই। আমি শুনেছি, সফল মহিলা ব্যঙ্গ করে বলতেন," তুমি ভাই ভীষন বোকা। 

উত্তরে মহিলা হাসতেন। বলতেন," আমি খুব শান্তিতে আছি। 

ব্যর্থ মহিলা সুস্থ থেকে সজ্ঞানে দেহত্যাগ করেছেন। এক ফোঁটা সেবা নেননি কারো কাছ হতে। সফল মহিলা বিছানায়। সাধের বাড়িতে রাজত্ব এখন আযাদের, ছেলেরা দেখাশোনা করে কিন্তু থাকে নিজেদের ফ্ল্যাটে। সিল্কের শাড়ির হিসাব নেই। গহনা মেয়ের হেফাজতে। কোনো জ্ঞানই নেই। গালাগালি কেন দেন, সেটা এখন আমি জানি। এ বিষয়ে পড়াশুনো করে বুঝেছি, মনের ব্যাংকে যা যা সঞ্চয় হয়ে থাকবে সেগুলো অবচেতনে বেরিয়ে আসে।ওই যে ওনার স্বভাব, যাকে উনি লালন করেছিলেন সযত্নে, মনে করতেন এটাই উচিত। সন্ধ্যে হলেই বাংলা সিরিয়াল দেখতেন। রাতে সেই সিরিয়ালের গল্প বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টা ওনার মন একটাই সংকেত দিত সেটা হল, কোথাও বিশ্বাস নেই। নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। এটা হয়ত কোনো অন্যায় নয়। বেঁচে থাকার একটা উপায়। কিন্তু সে উপায় ঠিক না ভুল সেটার প্রমাণ দেয় সময়। উনি মারা গেলে কি হত জানি না তবে বেঁচে আছেন এবং নেগেটিভ স্মৃতির মধ্যে তলিয়ে আছেন। ওনার মনের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে অবিশ্বাসের পুঁজি। অহঙ্কার। ক্ষমতা লিপ্সা। সেটাই এখন ফোয়ারার মত বেরিয়ে আসছে। 

 মন : ভীষণ শক্তিশালী যন্ত্র। সমস্ত রেখে দেয় নিজের ভিতর। মূল কথা হল আনন্দ এবং এনার্জি। ওই যে অসফল মহিলা , উনি ভিতরে কখনো ক্ষোভ পুষে রাখেন নি। যা পেয়েছেন যতটুকু পেয়েছেন আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। তৃপ্ত থেকেছেন। সন্তান ওনাকে আঘাত করলেও উনি তার জন্য প্রার্থনা করেছেন আর ওই সফল মহিলার সন্তান মাথায় করে রাখলেও উনি ভাবতেন যথেষ্ট করা হচ্ছে না। সুতরাং, সচেতন থাকতেই হবে। আমরা সবচেয়ে বেশি ছেলেখেলা করি মন নিয়ে। যা পারি, যেভাবে পারি ঢোকাতে থাকি। রাগ অভিমান দুঃখ ক্ষোভ ... যেন এটা আমার ডাস্টবিন। নাহ্। এই মন আমার বর্ম। আমার অস্ত্র। যা খুশি ভাবে তাকে ব্যবহার করার আগে ভাবতে হবে বইকি। এই ভাবনা আমাদের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে দেবে। শরীরের উপর কত নজর ! চুল এই করো, ত্বক ওই করো। কিন্তু, চিন্তন? মন? সারাদিন তাকে কি দিচ্ছি?

এই মুহূর্তে আমরা অনেকেই লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। লেখালিখি কথাটা বলতে এবং শুনতে যত সুন্দর হোক না কেন, সে জগৎ কত ভয়ঙ্কর সে কথা সকলেই জানি। দিনরাত সেখানে অবিশ্বাস আর দুর্নামের খেলা চলছে। একে অপরের নামে বলছি আমরা। পোস্ট লিখছি। ঠকছি। ঠকাচ্ছি। সারাদিন এইভাবেই ভাবছি কি করে আরো আরো লাভবান হওয়া যায়। 

 ঈর্ষা হোক মহতের তরে... 

    কালজয়ী কবি এমন বলতে পারেন। সৃষ্টির মূল কথা ঈর্ষা। 

প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে কাজের আনন্দ কিসের? কিন্তু তার মানে এই নয় যে , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আঠারো ঘণ্টা প্রতিদ্বন্দ্বী র কথা ভাবতে থাকব অথবা অপর কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ক্ষোভ আর হতাশায় ডুবে থাকব। 

  যদি প্রশ্ন হয়, ব্যবসা করতে গেলে কিছু নিয়ম মানতে হবে, না হলে সফলতা আসবে না। সব সফল মানুষ কোনো না কোনো সময় অন্যায় করেছেন এবং করছেন। তবে? তারা কি ভালো নেই? সাধু আর বোকা হয়ে এই দুনিয়ায় কোনো লাভ নেই। 

 সমস্যা হল অন্য জায়গায়। জীবনে লাভ হচ্ছে না ক্ষতি সেটা বুঝতে যখন পারি তখন দেরি হয়ে যায় অনেক। মাটির যেমন ধারণ ক্ষমতা পরিমিত, তার উপর অযথা ভার চাপিয়ে গেলে এক সময় সে বিদ্রোহ করে, মনের জমির নেওয়ার কিছু সীমিত ক্ষমতা আছে। তাকে এনার্জি তে ভরপুর রাখতে হয়। নেগেটিভ কথা আর কাজের পাহাড় চাপিয়ে দিতে দিতে এক সময় বিদ্রোহ করে সে। 

 শেষের সে দিন কে দেখেছে? লোকে বলবে ভালো লোক কি কষ্ট পায় না? কষ্ট কখনো ভালো মন্দ বিচার করে না। যার পাওয়ার সে পাবেই। কথা হল, মনের ধারণ ক্ষমতা বা শক্তি যার বেশি সে কষ্ট নিয়েও ভালো থাকে। সুন্দর ভাবনা থাকার ফলে তার ভিতর তৈরি হয় পজিটিভ এনার্জি। ওই এনার্জি সাহায্য করে। বয়স হলে শরীরের যন্ত্রপাতির ক্ষয় হবে। কালের নিয়ম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, মনের সঙ্গে বয়সের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিদিন এনার্জি যোগান দিলে মন সতেজ থাকবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। মন ব্যাংকিং। জমা করতে হবে ভালো ভাবনা। সুন্দর চিন্তা। সুন্দর সঙ্গ। সুদে আসলে ফেরত পাওয়া যাবে সময় হলে। 

 টাকা বাঁচিয়ে ব্যাংকে ফেলতে হয়। মন বাঁচিয়ে রাখতে হয় বইকি। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন কোন দিক আমাকে বিরক্ত করছে, কোন বন্ধুর সঙ্গ আমাকে ক্লান্ত করে তুলছে ... এগুলো সুদূর ভবিষ্যতে  এনার্জি ব্যাংকের পুঁজি নষ্ট করে দেবে। সাবধান হতে হবে এখন থেকে। 

ভালো লেখক হওয়ার জন্য নামী পাবলিশার হওয়ার জন্য প্রতিদিন এই যে ধার করা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, ভাবছি কি ভবিষ্যত কি নিয়ে আসছে? অকারণ এনার্জি ক্ষয় করে লাভ নেই। বাঁচিয়ে রাখতে শিখতে হবে। জীবন থাকলে কোনো না কোনো দিকে আমাদের পথ খুলেই যাবে। 

  নিজে আনন্দে থাকলে জগৎ আনন্দময়। এমন চিন্তাশক্তি সবল থাক যার ফলে ভালো হতে বাধ্য। মনের ব্যাংকে বেড়ে উঠুক মঙ্গলধ্বনি। একদিন সেটা কাজে লাগবে আমাদের।।

রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                       


মন – খোলা জানালা 

মনেরপুষ্টির জন্য কি কি করা প্রয়োজন।

 শিশুর জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে শরীরের পুষ্টি কি করে বৃদ্ধি পাবে সেটা নিয়ে। শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে করুণ আর্জি চলে স্বাস্থ্যবান বাচ্চা চাই। কতরকম খাবার খাওয়ায় তাকে। আজকাল সকলেরই একটা কি দুটো বাচ্চা। পরিবারের পুরো মনোযোগ থাকে শিশুর উদর কতটা পূর্ণ হল অথবা হল না। শিশু কোলে মায়েদের নিরন্তর অনুযোগ চলতেই থাকে তার বাচ্চা কিছু খায় না! এখন কথা হল, জন্মের পরে দৈহিক পুষ্টি গুরুত্ব পায় আর মনের পুষ্টি? তার কথা কতটুকু ভাবে মানুষ? একজন শিশুর মনের গঠন ঠিক ভাবে গড়ে উঠছে কি না, সেটা দেখা পরিবারের কর্তব্য। খুব ছোট্ট থেকে এমনকি যখন মাত্র কয়েক মাস বয়স, তখন থেকেই শিশুটির মনের ভিতর নানারকম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সেইসময় কিভাবে শিশুর মন আনন্দে ভরপুর থাকবে, সেটা বোঝা উচিত। 

*****

আজ যে শিশু আগামীকাল সে একজন দায়িত্ব বান নাগরিক। মজবুত শরীরের সঙ্গে চাই একটি মজবুত মন। সে যেন সমস্ত রকম সমস্যার সামনে স্থির রাখতে পারে নিজেকে। প্রতিকূল পৃথিবীতে লড়াই করতে গেলে স্থিতিশীল মনের প্রয়োজন খুব। 

     ক্রমবর্ধমান স্ট্রেস সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়। এর ফলে আমাদের ক্ষতি হয়। অনেকটা স্লোপয়জনিং এর মত। খুব ধীরে ধীরে চিন্তা গ্রাস করে আমাদের। 

  বিজ্ঞান বলে, দীর্ঘদিন চাপের মধ্যে দিয়ে গেলে মস্তিষ্ক প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষকে শান্ত করতে সাহায্য করে। সেইসময়, ডোপামাইন বা ডোপামিন ( dopamine)। বলে একপ্রকার হরমোন ক্ষরণ হয়। 

  এই হরমোনের কাজ হল , খুশি উৎপন্ন করা। অর্থাৎ চাপ মুক্ত করতে সাহায্য করা। কি সাংঘাতিক কাজ করে এই হরমোন। ( বলে রাখা ভালো, এই প্রবন্ধ কোনো নিউরো সার্জনের লেখা নয়। কিন্তু, আমার বক্তব্যের সঙ্গে শরীর যুক্ত। তাই এই কথা গুলো সংক্ষেপে হলেও আনতে হবে)। 

  খুশি উৎপন্ন করে এমন হরমোন, যা কিনা neurotransmitter হিসেবেও কাজ করে, তার এত গুরুত্ব কেন? 

 কথায় কথায় আমরা বলি, feel good, আনন্দে থাকো। খুশিতে থাকো। ডোপামাইন হরমোন ভালো থাকার প্রেরণা যোগায়। ভালো কাজ করার প্রেরণা যোগায়। ভালো ভাবে থাকার প্রেরণা যোগায়। আরো অনেক অনেক কাজ করে, অনেকেই হয়তো এ সম্পর্কে জানে। অর্থাৎ, ভালো থাকতে হলে ডোপামাইন নিঃসরণ সুন্দর ভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয়। 


   ২


    মানুষ স্বাভাবিক ভাবে ভালো থাকতে চায়। সে কাজে তাকে সাহায্য করে তার মস্তিষ্ক। 

 আমরা ভাবতে পারি কি ? যে, আনন্দ দেওয়া এই হরমোনের উদ্দেশ্য। এবং, এই হরমোন সঠিক পরিমাণ নিঃসরণে মানুষ নানা ধরণের কাজে উৎসাহ পায়। শরীরের অন্যান্য ইন্দ্রিয় শক্তিশালী হয়। সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু যে স্ট্রেস প্রতিদিন উৎপন্ন হচ্ছে বাইরে থেকে, সে তো ছিনিয়ে নিচ্ছে আমাদের খুশি? তবে? উপায়?  বিভিন্ন কারণে চলে যাচ্ছে খুশির অনুভব। মহামারীর সংকট এই মুহূর্তে একটি বড় কারণ। সেটা মেনে নেওয়া যায়, যদিও স্নায়ুর উপর প্রবল চাপ ফেলছে এবং বহু মানুষ মনের রোগের শিকার হচ্ছেন। 

 এই বড় কারণ ছাড়াও, ছোট ছোট বহু করণের ফলে ক্ষয় হচ্ছে আনন্দের ভূমি। সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষোভের। পার্থিব জগতে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মধ্যে টানা পোড়েন থাকে তীব্র। সর্বক্ষণ একটা ভয় কাজ করে। এই বুঝি হারিয়ে গেল! এই বুঝি অমুক পেল সম্মান , এই বুঝি ...! আমি পারলাম না। আমি হেরে গেলাম।  ভাবলে অবাক হতে হয়, ছোট বাচ্চাদের মনের মধ্যেও এরকম ক্ষোভ দুঃখ হতাশা জেগে ওঠে। অর্থাৎ, যে সুন্দর কাজ আমাদের খুশি দিতে পারে, সে কাজ যদি কোনো কারণে সাফল্য না পায়, তবে আমাদের মনের ব্যালান্স শূণ্য হয়ে যেতে পারে!

  অবসাদ আচ্ছন্ন করলে ডোপামাইন হরমোন নিঃসরণ ঠিক মত হয় না অথবা বেশি হয়। দুটোই ক্ষতিকর। কম মাত্রায় হলে, প্রচুর রোগ খুব ধীরে ধীরে আক্রমণ করে। এবার যেই মাত্র অবসাদ ঘিরে ধরছে, সহজ উপায় খুঁজে নিচ্ছি ভালো থাকার।  ভিডিও গেম, সিগারেট, নানারকম নেশা, বিকৃত পোস্ট,  ইত্যাদি বহুরকম কাজ করলে সাময়িক মন খারাপ ভুলে থাকা যায়।  খুব ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যারা এই ধরণের নেগেটিভ কাজ করে, যে বাচ্চারা বেশি ট্যাব আসক্ত ... কোথাও না কোথাও তাদের মনের প্রবলেম আছে। তারা জানেও না, বাইরের থেকে আনন্দ নিয়ে ভিতরের কতখানি ক্ষতি হচ্ছে। খুশি যদি অযথা অকারণ অদরকারি হয়, তবে হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলেও শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়। প্রথম কথা, নেশা ছাড়া তখন আর খুশি থাকা যায় না। বাচ্চার থেকে ট্যাব নিলে সে হিংস্র হয়ে ওঠে। নানা রকম অপরাধ মূলক কাজ, অযথা অভিযোগ অভিমান ... এ সমস্তই ধীরে ধীরে অধিকার করে ফেলে আমাদের সমস্ত নিজস্বতা। 

   

 ৩

প্রাচীন কাল থেকেই, ভালো থাকার একটা উপায় বলা হয় শ্বাস নেওয়া, মেডিটেশন করা অথবা কিছুক্ষণ মৌন থাকা।  নাম জপ করা... ইত্যাদি ইত্যাদি। এই কাজগুলো মনের ব্যায়ামের অঙ্গ। সবচেয়ে বড় কথা, মনের ব্যায়াম ঠিক মতন করলে, ডোপামাইন হরমোন নিয়ন্ত্রণে থাকে। এটা আমার মনে হয়। সত্যি কথা বলতে কি, এই কিছুদিন আগে একজন কাউন্সিলিং করতে এসেছে,( হয়ত সে পড়ছে এই প্রবন্ধ,) তার বাচ্চাটি ট্যাব আসক্ত। আমি এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে আবিষ্কার করি,শৈশব থেকেই ওর মধ্যে ছিল খুশির অভাব। এখন ও খুশি খুঁজে নিচ্ছে ট্যাব দেখে। আরো এক জায়গায় পড়লাম, যদি ডোপামাইন নিঃসরণ বেশি হয়, তবে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, নিজের এক দুনিয়া বানিয়ে নিয়ে সুখে থাকা। পারিপার্শ্বিক কারো সঙ্গ ভালো না লাগা। একলা থাকা। নিজের মত। 


আমি এত জটিল বিজ্ঞান বুঝি না। মনের জন্য ওষুধ খেতে হয়, সে বিশ্বাসও করি না। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন," সুখ দুখ সমভাব চ। 

  এই উপদেশ হল আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল কথা। সাফল্য আর ব্যর্থতা বলে কিছু হয় না। এক দরজা বন্ধ হোক। সুখী হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। আবেগ যেমন চালিকা শক্তি তেমনি অতি আবেগ ক্ষতিকর। মনে রাখতে হবে, বেঁচে থাকাই হল সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। একবার এক চাকর আর এক রাজা দুজনেই জলে ডুবে মারা যায়। জলে ডুবে চেহারা বিকৃত হওয়ায় কেউ বুঝতেই পারল না , কে চাকর আর কে রাজা? লোকজন অনেক ভেবে চিন্তে আন্দাজে দেহ দুটির একটিকে রানীর কাছে অপরটি চাকরদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল।।

  এই তো জীবন! যতক্ষণ আছি ডিউটি করে যাই। ফল পাবার হলে পাবো, না হলে পাব না। সেটা আমার হাতে নেই। কিন্তু , ফল না পেলে দুঃখী হব কি না সেটা আমার হাতে আছে। 

 বাচ্চাকে আনন্দে রাখা আমাদের কর্তব্য। তবে ওর ভিতর খুশিতে ভরে উঠবে। অনেক কাজ ও আনন্দে করবে। না হলে ধীরে ধীরে মনের চারিদিকে জঞ্জাল জমতে থাকবে। 

  অবসাদ , আবেগ , ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায়, 

  অ উ ম অথবা সো হ ম উচ্চারণ করা। প্রতিদিন।  আর প্রতিদিন নিজেকে বলা

  আমি ভালো আছি।





রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                             



অতীত, একটু কম কথা বলো।

 মুডসুইং নিয়ে কথা বলছিলাম। মুড অথবা আবেগের ওঠা পড়া অনেকটা নির্ভর করে অতীত চারণার মধ্যে। অতীতের সুখময় দিন অথবা দুঃখের স্মৃতি মানুষকে নিঃস্ব করে তোলে। কত সুখে ছিলাম অথবা কত দুঃখে ছিলাম... এই বোধ থেকে আসে হতাশা। মন খারাপ। কিটকিট। ভালো না লাগার প্রকোপ বাড়তে থাকে। 

 আজকের আলোচনার বিষয় 

  অতীত। 

     অতীত নিয়ে আমার বাবা খুব  সতর্ক ছিলেন। মানসিক ভোগান্তির একটা মূল কারণ পিছন ফিরে দেখা সে বিষয়ে বারবার বলতেন। তখন আমার দশ / এগার বছর বয়স। বাবা একদিন নিয়ে গেলেন বাগানে। মাটিতে দুটো  গর্ত খুঁড়ে , একটিতে রাখলেন  ছোলাবীজ অপরটিতে তরকারির খোসা ডিমের খোলা ইত্যাদি। দিনচারেক পরে বললেন: চল, অতীতের ফলাফল দেখে আসি। যে গর্তে বীজ ছিল, তার উপরে ছোট ছোট সবুজ পাতা আর যেখানে আবর্জনা ছিল সেখানে দুর্গন্ধ। অমূল্য একটা শিক্ষা। অতীত থাকবে। কিন্তু, দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছু পরিহার করাই ভালো। আজকে বহুমানুষ অতীতের করাল থাবার শিকার। অদ্ভুত ভাবে, মানুষ সুন্দরের চাইতে মনে রাখে খারাপ স্মৃতিগুলি।   যার ফলে মন খারাপ হয়। বরং, খারাপ স্মৃতি গুলি থেকে কিছু শিখে নেওয়া ভালো। সৃষ্টির সবুজ পাতা দুলবে। মেঘলা দুপুরে অতীত নিয়ে ভেবে কষ্ট না পেয়ে একটা বর্তমানের গান শুনে নিও। 

🔥🔥🔥বাবার শিক্ষা কতভাবে জীবনে কাজে লেগেছে, বলার মত না। মহিলা পুরুষ উভয়ের বিবাহের আগে এবং পরের জীবন সম্পূর্ন আলাদা। একেবারে অন্যরকম। সবদিক দিয়ে। নানা রকম ঝামেলা দায় দায়িত্ব ঘিরে ধরে চারিদিক থেকে। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো ভয়ানক হয়েছিল বিদেশ চলে যাওয়ায়। এমন কিছু মানুষের সঙ্গে থাকতেই হত, যারা ভারতীয় কিন্তু বাঙালী বিদ্বেষী। আমি ছিলাম একমাত্র বঙ্গললনা। এ যেন ক্ষুধার্ত নেকড়ের সামনে সুস্বাদু খরগোশ। তাদের টাইম পাস ছিলাম আমি। এমন ব্যবস্থা তারা করেছিল, যাতে আমি ব্যাংকক ছেড়ে যেতে বাধ্য হই। বিজনবাবু সারাক্ষণ ট্রাভেল করছেন। সেইসুযোগে  দিনরাত্রি অপমান। বাচ্চাগুলোকে নানা ভাবে উৎপীড়ন। সেই সময় মনের কানে ভেসে এলো বাবার উপদেশ: রাস্তার নোংরা ঘরে আনবি না। রাস্তার ধাক্কা ওখানেই ফেলে রেখে, ঘরে বসে আরাম কর। তুই পরম সুখী। রোজ নিজেকে ভালোবেসে যা। 

ছোট্ট কথা। বাইরের পরিস্থিতি যেন কোনো ভাবেই মনের স্থিতি নষ্ট না করে। অদ্ভুত ম্যাজিক ঘটল এর পরে। যত অপমান করে ততো আমি উজ্জ্বল হই। বাচ্চারা দারুণ রেজাল্ট করে। আমার ঝকঝক চুল। চকচক ত্বক। স্বামী স্ত্রী বেড়াতে যাই। ওরা হার মেনে গেল। 

🙏  বাবা বলতেন: 

আমার মৃত্যুতে শোক করবে না। চেষ্টা করবে যে কাজে আমি খুশি হই, তাই করতে। 

সে কাজ হল, নিজের মনকে লাঠি বানাও। অবলম্বন করো। বাইরের আঘাতের সাধ্য কি, তোমাকে কষ্ট দেবে? 

এটাও অতীত চারণা বইকি! কিন্তু , সৃষ্টির সবুজপাতা দুলে ওঠে এতে। 

   অচেতনমন অনেক বেশি শক্তিশালী। অনেক বেশি জমিয়ে রাখতে পারে। অবচেতন মনে কোনো আইডিয়া ঢুকে গেলে , তা আমাদের সচেতন চিন্তাকে প্রভাবিত করে। অতীত বহু সময় ভয় দেখায়। আত্ম বিশ্বাস নষ্ট করতে উদ্যত হয়। 

সেজন্যে , অতীত থাকুক। কিন্তু তাকে বহন করতে হবে না। বর্জন নয়। বহন নয়। অতীত হোক একটা ঘটনা মাত্র। ক্যালেন্ডারের পুরনো পাতার মত। দরকার না হলে ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া যেতেই পারে। 

জীবন হল নৌকা। মন হল মাঝি। বিপদ সঙ্কুল নদীতে জীবন নৌকা সুন্দর করে বাইতে পারে দক্ষ মাঝি। যতই ঝড় আসুক, তুফান আসুক নাও নিয়ে মাঝি লড়ে যাবে শেষ পযর্ন্ত। কিন্তু অনভিজ্ঞ মাঝি? সে পারবে তীরে পৌঁছতে? লক্ষ্য স্থানে পৌঁছে যেতে ? পারবে না। তখন দোষ দিতে থাকবে পারিপার্শ্বিক খারাপ আবহাওয়ার। মন মাঝি  নিজেই দুর্বল, তৈরি হয়ে হাল ধরতে হয়, সে কথা মনে থাকে না। 

 আজ বাবার কথা মনে করছি। তিনি যে দর্শনের কথা  বলতেন, এখন বুঝি, সেগুলি নতুন কিছু না। আমরা সবাই সব জানি। শুধু মেনে চলি না। 

ধনী কে? এক সুন্দর মনের অধিকারী হল প্রকৃত ধনী।




রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২১

জয়তী রায় মুনিয়া

                                



 মেজাজ হল আসল রাজা/ আমি রাজা নই। 



   মুডসুইং ... অতি পরিচিত শব্দ। যেহেতু, মানসিক সমস্যা সমাজের উচ্চ এবং মধ্যবিত্তের মধ্যে বেশি, তার  মানে এই নয় যে নিম্নমধ্যবিত্তের মধ্যে দেখা যায় না। মেজাজের পারদ ওঠা নামা করে। এটাই হল, জীবনের চালাকি। মানুষের ক্ষমতা এত বেশি যে তারা সহজেই সব পেতে পারে। হয়ে উঠতে পারে ঈশ্বরসম। এইখানে তারা অসহায়। এই নিজের কাছে। নিজের মেজাজের কাছে। ইচ্ছে অনিচ্ছের কাছে। মুড ভালো রাখা, মুড কিভাবে সন্তুষ্ট হবে তার চেষ্টা করা এই একটি সূত্রের উপর দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত সৃষ্টি। পরিবার। সমাজ। বহু জঘন্য অপরাধ থেকে বহু সার্থক সৃষ্টি সম্পন্ন হচ্ছে মুড এর জন্যে। 

  কি এই মুড? কেন এর এত  দাপট? 

ডাক্তার বলবে এটা একটা অসুখ। এই ভালো আছি তো এই খারাপ। কেউ কেউ হালকা চালে বলে, আজকাল খুব মুডসুইং করছে। যেন এটা একটা খেলা। অনেকে বলে, ওগুলো বেশি হয় মেয়েদের মধ্যে। প্রচলিত কথা, ঋতুচক্রের সময়, প্রেগন্যান্ট অবস্থায় , লিখতে বসলে, একঘেঁয়ে রান্নার কাজ করলে আরো নানান ব্যাপারে মেয়েদের মধ্যে বেশি হয় বলে ধারণা করা হয়। 

   সন্দেহ নেই, ঋতুকালীন সময় এবং গর্ভবতী অবস্থায় হরমোনের ওঠা পড়া খুব বেশি মাত্রায় হয়, মেজাজ খিটখিট করে। আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আজকাল পুরুষদের মধ্যেও এই মুড সুইং কথাটা খুব স্বাভাবিক ভাবে বলা হচ্ছে। 

মুড বা মেজাজ বা মন কেন দোল খাচ্ছে? কেন ব্যালান্স হারাচ্ছে? এর সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। 

কি ভয়ঙ্কর ক্ষতি সাধন করেছে কেউ বুঝতে পারছে না। এ যেন , বালির উপর রাজপ্রাসাদ তৈরি করছি আমরা। ভিত শক্ত হল না, অথচ এই করছি, সেই করছি। 

     ভারতবর্ষ এমন এক দেশ, বলা যায় একমাত্র দেশ, যেখানে প্রাচীন কাল থেকে মনের বিভিন্ন অবস্থার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমার বাবা বলতেন," আমরা অনেক প্ল্যান করি। এবার প্ল্যান মত কাজ হল না। ব্যর্থ হলাম। তখন কি হয়? মন খারাপ হয়। লাগাতার বলতে থাকি, প্রবলেম। প্রবলেম। মন খারাপ , মন খারাপ। সেই মন, যে আমাদের পাশে দাঁড়াবে, যে আমাদের প্রবলেম থেকে বেরিয়ে আসার সন্ধান দেবে, সে মন না কি খারাপ? তবে? 

বাবা বলতেন, প্রথমেই বাদ দাও প্রবলেম শব্দটা। বলো পরিস্থিতি। এবার দেখো। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে। প্রবলেম শব্দ বারবার ব্যবহার করলে,মনের  ভাইব্রেশন নষ্ট হয়ে যায়। লড়াই করার শক্তি নষ্ট হয়। 

প্রাচীনকাল মানে পুরাণের কতগুলি গল্প নয়। শিক্ষা। কিভাবে ভালো থাকব, তার শিক্ষা। সেটা আলোচনা করার আগে,

এবার দেখা যাক, মুডসুইং কি কি নষ্ট করছে? 

 প্রতিদিনের বেঁচে থাকার শক্তি ক্ষয় করছে। এনার্জিস্তর কমিয়ে দিচ্ছে। এনার্জি কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার রসদ। খুব ধীরে ধীরে কমিয়ে দিতে দিতে খিটখিট করে তুলছে।করে তুলছে  স্পর্শকাতর। চট করে দুঃখ পাচ্ছি। অমুকের একটা শব্দ একটা, তুচ্ছ তাকানো , একটু এদিক ওদিক ব্যবহার নষ্ট করে দিচ্ছে সারাটা দিন। রাগ হচ্ছে। অকারণ হতাশা আসছে। ভয় এবং কান্না। 

  আজকাল গুগল করলে সমাধান চলে আসবে নিমেষে। প্রায় সবগুলোই বাইরের প্রক্রিয়া। যেমন, ব্যায়াম করতে বলা হয়। কাজে ব্যস্ত , লোকের সঙ্গে মেলা মেশা,প্রাণায়াম ইত্যাদি। 

   মুশকিল হল, এগুলো করতে ইচ্ছেই তো করবে না। ইচ্ছের জমি না তৈরি করলে ফসল ফলবে কি করে? ধাপে ধাপে এগিয়ে চলতে হবে। মুডসুইং মোটেই একদিন হঠাৎ হয় না। 

কারণ থাকে। বেশির ভাগ কারণ লুকিয়ে থাকে অতীতের মধ্যে। আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ খুঁজে বার করতে হবে। প্রবলেম বলে কিছু নেই। পরিস্থিতি খারাপ। লড়তে হবে পরিস্থিতির সঙ্গে। সেটা পারবে শক্ত সবল মন। 

   থেরাপি::

১.অউম প্রতিদিন ১০ বার। করতেই হবে। 

২.আয়না থেরাপি দিনে একবার। 

৩.মৌন দিনে ২ মিনিট। 

৪.খাতায় লেখা সমস্যার কথা। 

 

    কেন যেতে হবে নিজের সমস্যার জন্য অন্যের কাছে? কেন তোড়জোড় করে শুরু করতে হবে রুটিন মেনে ধ্যান ইত্যাদি? মন নিরন্তর ডুবে থাকবে নিজের চেতন শুদ্ধ করার জন্য। যেমন , aquaguard  জল পরিশুদ্ধ করছে, তেমনি আমার মন করুক চিন্তা শুদ্ধ। সকাল থেকে সারাদিন পাচ্ছি। দেখি, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। খারাপ না ভালো? আছে শক্ত মন। করবে মোকাবিলা। একটাই কথা, বাবা বলতেন, প্ল্যান করো। পরিকল্পনা করো। কিন্তু দিনের কখন কি ঘটে যাবে, কেউ জানে না। কাজেই , সেই সঙ্গে এটাও ভাবতে হবে যদি প্ল্যান মত কাজ না হয়, তখন কি হবে? তখন মেজাজ খারাপ করব? আনন্দ নষ্ট করব? এনার্জি স্তর নামিয়ে দিয়ে নিজের ক্ষতি করব? ডাক্তারের কাছে দৌড়ে যাব? 

মুড নামক মহারাজকে মাথায় তুলতে নেই। মুড বা মেজাজ একটু এদিক হবেই। উপরের থেরাপি গুলো সাহায্য করবে, নিজের ভিতর শক্তি জাগ্রত করার। ফলে, বাইরের পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, ভিতরের স্থিতি ঠিক থাকলে, লড়াই করার শক্তি জন্ম নেবেই। 

মুডসুইং এর গালভরা গুগল ব্যাখ্যায় না গিয়ে নিজেই বরং  গুগল হই অথবা মনের ডাক্তার হয়ে যাই। মেজাজের উপর কন্ট্রোল থাক আমার নিজের। শুনতে কঠিন হলেও খুব সহজ কিন্তু। চেষ্টা করে যাওয়া যাক। মন শক্ত হবেই। মুড তো দূরের কথা , সমস্ত প্রবলেম সমাধান করার শক্তি জেগে উঠবে। মেজাজ হোক প্রজা, আমি হই রাজা।

চিত্রঋণ- Thomas .S.Andro