শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

পাপিয়া গাঙ্গুলি

                           


চা চাই 
 

বাসটা মিস করলো গুপি। রাতের শেষ বাস ছিল। দূরপাল্লার টাইমের বাস। অফিসে আজ মিটিং ছিল। শেষ হতে রাত হয়ে গেল। বাবুরা তো গাড়িতে উঠে হাওয়া। তাদের আর কি। কাল রবিবার ভাগ্যিস। নাহলে আবার ভোর না হতেই অফিস খুলতে দৌড়াতে  হতো। সকাল নটায় অফিস শুরু। গুপি তার আগে এসে  অফিস খুলে আলো জ্বালায়। এসি চালিয়ে সাফ সাফাই করে রাখে। এমনিতে খুব দেরী হলে গুপি রাতে  থেকে যায় অফিসে। কাল মায়ের কি একটা পুজো আছে। ফোনে অনেকবার বলে দিয়েছে। বাড়ি যেতেই হবে। ট্রেন ধরা ছাড়া উপায় নেই।দুপুরে আকাশভাঙা বৃষ্টি হয়েছে। গরমের থেকে একটু রেহাই। এখন বৃষ্টির জোর কমলেও পুরোপুরি থামেনি। জল কাদা পেড়িয়ে শিয়ালদা স্টেশন পৌঁছলো। আধঘন্টায় পরের ট্রেন। এই বৃষ্টিতে চা ছাড়া বসে থাকা বিরক্তিকর। খিদেও পেয়েছে অল্প। চা পেলে খিদেটাও মরতো কিছুটা। 
চা খুঁজতে শুরু করলো। রাতের স্টেশন আজ অনেক খালি। হয়তো বৃষ্টির জন্য।
 " চায়ে গরম চায়ে "বলে কোনো হাঁকাহাঁকিও নেই। 
গুপি হাঁটাচলা করতে করতে একটা বেঞ্চে বসলো। মনটা চা চা করছে।  চা পাচ্ছে না।  একটু বিরক্তি এসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এমন মুহুর্তে একটা চায়ের কাপ তার সামনে ঝুলতে দেখলো। 
 আনমনা ছিল তাই তার পাশেই এক চাওয়ালা  কখন এসে নিশব্দে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। চা'ওয়ালা ছেলেটা নিজে থেকেই একটা কাগজের কাপে চা এগিয়ে দিয়েছে  তার দিকে। ছেলেটা কি তার মন পড়তে পারলো? সে যেমন জানতে পারে অফিসার বাবুদের চা চাওয়া মন।  কিছু না বলে হাত বাড়িয়ে চায়ের পয়সা এগিয়ে দিয়ে  কাপটা নিল  গুপি। ধোঁয়া ওঠা চা... মনটা খুশী হয়ে গেল। 
ট্রেনের হুইসেল। দ্রুত চুমুকে শেষ করলো চা। আজ ঠেলাঠেলি নেই । ঠেলাঠেলি কি প্রায় কোনো লোকই নেই। আশ্চর্য লাগলো।
একটা বসার জায়গায়ও পেল। জানলার পাশে। সেই ছোটো থেকেই জানলার পাশে সিট পেলেই তার মন ভালো হয়ে যায়। জানলার পাশে গুছিয়ে বসলো। এই কামরায় আর কেউ নেই। নিশ্চিন্ত লাগলো। নাহ্!   একজন প্যাসেন্জার  এলো পাশে । গুপী তাকিয়ে দেখলো।  মুখটা কেমন চেনা লাগলো ।  কোথায় দেখেছে। মাথা খাটাতে ইচ্ছে করছে না। তবে মাথায় ঘুন পোকার নিঃশব্দে কাজ চালাচ্ছে ভাবনাটা। ট্রেনটা খালি। সাড়াদিন খুব ধকল গেছে।  জানলার ঠান্ডা হাওয়া চোখটায় ঘুম এনে দিয়েছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানেনা।  একটা ঝাঁকানির  আওয়াজে ঘুমটা ভাঙলো। কোন স্টেশন দেখলে বোঝা যাবে কতটা ঘুমালো সে।
বাইরে তাকিয়ে দেখলো কোনো স্টেশন নয়। ঘুটঘুটে অন্ধকার শুধু। যাকে নিকষ কালো বলে। কিছু ঠাহর করা যাচ্ছেনা। 
কি আবার হলো!  ঘুম চোখে এদিক ওদিক  দেখলো।  পাশের লোকটা তার দিকে তাকিয়ে। কেমন অর্থহীন এক চাহনি। তার দিকে এমন করে তাকিয়ে আছে কেন? সেই চেনা চেনা মুখটা। 
হ্যাঁ ঠিক, মনে পরেছে এটা তো স্টেশনের চা'ওয়ালা ছেলেটা । চা বিক্রি করতে করতে ওর সহযাত্রী হলো কি করে!  ভাবতে ভাবতে নিজের জায়গায়  গুটিয়ে বসলো গুপী। কি এক অস্বস্তিকর অনুভূতি। শান্ত হয়ে বসতে পারছে না।  চারপাশে তাকিয়ে দেখলো।  এত ভিড় তো ছিল না!!! আশ্চর্য,  ভীড়ে  কোনো লোক দেখা যাচ্ছেনা।  সবকটা শুধু মুখ আর জোড়া জোড়া চোখ দেখা যাচ্ছে। বেড়ালের চোখের মত চোখ গুলো জ্বলছে।   তার দিকেই তাকিয়ে চোখ গুলো । প্রতিটি মানুষের মুখ একই রকম দেখতে। মানে প্রত্যেকের মুখ ঠিক  স্টেশনের চা ওয়ালা ছেলেটার মতো। ঠান্ডা নিস্প্রাণ জ্বলজ্বলে দৃষ্টি নিয়ে পুরো ভীড়টা তার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশে বসা সহযাত্রীও  একই দৃষ্টিতে একটা কাগজের কাপে চা এগিয়ে দিয়েছে তার দিকে। কাপটা দেখা যাচ্ছে। কারোর হাত দেখা যাচ্ছে না।   হিমেল হাওয়া গুপীকে আরও ঠান্ডা করে দিচ্ছে। ভেতরেও একটা ঠান্ডার স্রোত।  গুপী জোর করে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ের কাছে ফিসফিসানি " চা' টা গরম কিন্তু। " মনে হচ্ছে অনেক লোক একসাথে হিসহিসিয়ে  কথা বলছে।
গুপী সামনে হুটোপাটি করে এগোতে থাকলো। মনে হলো অনেক পায়ে তার পা আটকে যাচ্ছে ।অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গুপী ভিড় ঠেলে এগোবার মত করে চেষ্টা করলো ।  দিশেহারা অবস্থা।  ট্রেনটাও চলছে না।  আলো গুলোও জ্বলছে না।  হঠাৎ অনেক লোকের গলা শুনতে পেল। সামনেটা খালি লাগছে। এখন একটা আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে কিছুটা। একটা জটলা।  নিজেকে সে ট্রেনের দরজায় আবিস্কার করলো। জটলাটা ট্রেনের পাশের লাইনে।  গুপী অতগুলো মানুষ দেখে স্বস্তি পেলখানিক।  একলাফে নীচে নামলো। তারপর জটলার দিকে এগোলো। ভেতর উঁকি দিয়ে দেখল। একটা থ্যাতলানো মৃতদেহ। মুখটা চেনা যাচ্ছে না। শার্টটা চেনা।  পকেট থেকে আইডি  কার্ডটা বেড়িয়ে আছে। ছবিটা তার নিজের। জামাটাও শেষ পুজোয় মায়ের দেওয়া নীল শার্টটা।  গুপী চমকে উঠলো।  চারপাশের লোকগুলোকে দেখলো। সব লোকগুলো অবিকল চা' বিক্রেতা ছেলেটা। তার দিকে তাকিয়ে শীতল ক্রুর দৃষ্টিতে হাসছে।  পেছনে ট্রেনটা চলতে শুরু করলো ঘটাং ঘটাং শব্দ তুলে। প্রতিটা চা'ওয়ালা এক কাপ করে চা ঢেলে দিচ্ছে তার থ্যাতলানো মুখের ওপর। চারপাশে হাওয়ার মত উড়ে বেড়াচ্ছে একটা কথা "চা চাই, চা চাই। " 



শঙ্খসাথি

        




অচিন আঁধার 
        
— এতটুকু বাচ্চাকে তুমি মারলে! 
গার্গী তার স্বভাবগত মৃদু কন্ঠস্বরের বদলে বেশ জোরেই বলে ফেললেন কথাগুলো।
— আমি এভাবেই শাসন করি।, থেমে থেমে কেটে কেটে এই কথা ক'টা বলেই অভিরূপ বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

গত সাতদিন ধরে আনন্দের যে হাওয়া বইছিল সমস্ত বাড়ি জুড়ে, এক নিমেষে সবটুকু গুমোট হয়ে উঠল যেন।
গীত অবশ্য পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল।
— আসলে কী জানো তো মা, সারাদিন এত কাজের প্রেসার থাকে অভিরূপের, নার্সিংহোমে, চেম্বারে রোগীর ভিড় লেগেই থাকে। বাড়িতে একটু ওয়েল অর্গানাইজড চায় সবকিছু। এই আর কি ...
নাহলে তুমি তো জানোই মা, আহেরি অন্ত প্রাণ ওর পাপার। 

গার্গী উত্তর দিতে গিয়েও চুপ করে যায়। আহেরি তখনও দিম্মার কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
— আহেরি, স্টপ ক্রাইং।গো ইনসাইড ।, গীত এবার মেয়েকে ধমকে চুপ করাতে চায়।
মল্লিকা... আহেরিকে ভেতরে নিয়ে যাও। ড্রেশটা পাল্টে স্লিপিং স্যুট পরিয়ে দাও। আর হ্যাঁ, ব্রাশ করাতে ভুলবে না।, পরমুহূর্তেই নির্দেশ ছুড়ে দেয় আহেরির জন্য যে মেয়েটি থাকে, তাকে।
মল্লিকা তৎক্ষণাৎ ত্রস্ত হয়ে বৌদিমণির নির্দেশ পালন করে। 
গীত এবার বাকিদের নির্দেশ দিতে থাকে, কী করতে হবে না হবে। আহেরির জন্মদিনের পার্টি শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। অনেক কাজ বাকি এখন গীতের। 
গার্গী নিজের ঘরে চলে আসে চুপচাপ। 
নিজের ঘর বলাটা হয়ত ঠিক হল না। মেয়ে জামাইয়ের বাড়ি এলে এই ঘরটিতেই বরাবর থাকেন। 
একটু বসে নিজেও ভালো শাড়ি ছেড়ে হাউসকোট পরে ঘরে এসে দেখে, মল্লিকা সব কাজ সেরে আহেরিকে বিছানায় দিয়ে গেছে। 
বেচারার সারাদিনের ধকলে এতই ক্লান্ত যে এক্কেবারে ঘুমিয়ে কাদা। অথচ অন্যদিন ঘুমোতে কি বায়নাক্কাই না করে।
বিছানায় এসে বসতেই চোখে পড়ল, আহেরির ফর্সা টুকটকে গালে অভিরূপের পাঁচ আঙুলের দাগ নীল হয়ে বসে আছে। রাগটা আবার নতুন করে দপদপিয়ে উঠল মাথার মধ্যেই। 
তিনবছরের একটা বাচ্চাকে এভাবে কেউ মারে? আর মারার মত কী এমন ঘটেছিল! 
জন্মদিন, সবাই নানা উপহার এনেছে। গেস্টরা থাকাকালীন আহেরি একটা উপহারের মোড়ক খুলে দেখেছিল। আহেরি হয়ত বাকিগুলোও তখনই দেখার চেষ্টা করত। কিন্তু ততক্ষণে গীত ওগুলো ঘরের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। 
ঘটনা এইটুকুই। কিন্তু গেস্টরা যেতেই অভিরূপ রাগে ফেটে পড়ল। ওর বক্তব্য এসব নাকি আনসিভিলাইজড বিহেভিয়ার। শেষ পর্যন্ত আহেরিকে এভাবে মারল! 
অভিরূপের ওপর তো রাগ হচ্ছেই, তার থেকেও গার্গীর বেশি রাগ হচ্ছে গীতের ওপর। কি অদ্ভুতভাবে অভিরূপের ব্যবহারকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। গীতের কি মনে নেই, ওর মা-ও রেলের চাকরি সামলে ওকে মানুষ করেছে। 
এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে এসেছিল। কিছুক্ষণ পর ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। 
পাশের ঘর থেকে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় কানে ওর কোনোরকম চেষ্টা ছাড়াই। অভিরূপ এখনও বন্য জন্তুর মত গরগর করছে। গীত স্পষ্টতই ওকে সন্তুষ্ট করতে চাইছে হাতে-পায়ে ধরে। কিছুক্ষণ পরে গার্গীর কেমন যেন মনে হল ব্যাপারটা আর শুধুমাত্র কথা কাটাকাটিতে নেই। গীত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ঠিক যেমনভাবে আহেরি কিছুক্ষণ আগে কাঁদছিল। তবে কি অভিরূপ...! 
বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে গার্গীর। কত আদরে মানুষ করেছেন গীতকে ছোটো থেকে তনয় আর ও মিলে। প্রথমদিকে গার্গীর ইচ্ছা ছিল আরেকটা ইস্যু নেওয়ার। কিন্তু তনয়ের ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে ছিল গীত। মেয়েও ছিল তেমনি বাপ-সোহাগী। গীত এমনিতেও অবিকল ওর বাবার মত, দেখতে স্বভাবে।যারা তনয়কে চিনত না, তারা অনেকেই অবাক হত গার্গীর গায়ের রং আর ওর মেয়ের গায়ের রং দেখে। এমন ধবধবে ফর্সা মায়ের মেয়ে কারো হয় কি করে! কিন্তু গীত শুধুমাত্র দেখতেই ওর বাবার মত, স্বভাবেই ঐরকম নরম ও চাপা। তনয় যখন মারা গেল তখন গীত এক্কেবারে অবসাদে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই সময়েই অভিরূপের সঙ্গে পরিচয়। ওর কাছেই ট্রিটমেন্ট চলেছিল গীতের। তারপর যখন দু'জনকেই দু' জনকে বিয়ে করতে চাইল, তখন আপত্তি করেনি গার্গী। হ্যাঁ তবে ইচ্ছা ছিল, গীত আরও পড়াশোনা করুক, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে করুক। কিন্তু অভিরূপ এত তাড়াহুড়ো করল, বলল বিয়ের পরে পড়ুক না যত খুশি। সব মিলিয়ে বিয়েটা হয়েই গেল। কিন্তু তার পরিণতি যে এতটা ভয়ংকর হয়েছে, তা তো ঘুণাক্ষেরও বুঝতে পারেনি গার্গী। বুঝতে পারবেই বা কী করে। বিয়ে পর থেকে এই চারবছরে হাতে গুণে এসেছে মেয়ের কাছে, থেকেছে দু'টো দিন। এবারেই প্রথম দশদিন থাকার কথা। আর গীত যে নিজে মুখ ফুটে কখনও কিছু বলবে না, সে তো জানাই আছে। কিন্তু এতদিন যে গার্গী ভাবত গীত ভীষণ সুখী অভিরূপের সাথে, সে ধারণা এতখানি ভুল! নাকি নিছকই দাম্পত্য কলহকে মিছিমিছি এত বড় করে দেখছে গার্গী! 
বেশ কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল গার্গী। ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে। আহেরির আজ স্কুল ছুটি বলেই হয়তো বেলা অবধি ঘুমাতে দিয়েছে ওর পাপা। আগের রাতের রাগটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তবু নিজেকে শান্ত করে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট টেবিলে যোগ দিতে এল গার্গী। ততক্ষণে অভিরূপ বেরিয়ে গেছে। গীত টুকটাক কথা বললেও বোঝা যাচ্ছিল, মনের ঘরে মেঘ জমেছে। 
সারাদিন  কেটে গেল আহেরির সঙ্গেই। আগামীকাল   সন্ধ্যায় গার্গীর ট্রেন।ফিরে যাবেন নিজের বাড়ি। 
— তোমার ট্রেন তো কালকে, তাই না?, 
নিরাসক্ত মুখে চা খেতে খেতে বলল গীত। 
— হ্যাঁ রে, দিন দশেক তো হয়েই গেলো। আবার পরে আসব। 
গীত কোনও কথাই বলল না, চুপচাপ উঠে চলে গেল। 
গার্গী খুব আশা করেছিলেন মেয়ে আর কয়েকদিন থেকে যেতে বলবে। নিদেনপক্ষে একটু মনখারাপ করবে। এ তো মনে হচ্ছে গার্গী চলে গেলে গীত খুশি হয়। 
নাহ, গীত বড় বদলে গেছে। 
দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে নিজের ঘরে এসে প্যাকিং সেরে নেয় গার্গী চুপচাপ।। পরেরদিনও অভিরূপ বেরিয়ে গেছে। গীত উবের বুক করে দিয়েছে মাকে স্টেশন যাওয়ার জন্য। আহেরি বারবার ঝোঁক করছিল, স্টেশন পর্যন্ত আসার জন্য। গীত ধমকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। 
বাড়িতেই তো থাকল। আসলে কীজানি হত!, একবুক অভিমান নিয়ে ট্রেনে উঠে বসেছেন গার্গী। গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে এল আর।টু্ং করে মেসেজটা ফোনে ঢুকল তখনই। 
গীত! 
"আহেরির গালে পাঁচ আঙুলের দাগটা স্পষ্ট ছিল বলে দেখতে পেলে মা! কালো মেয়ের গালে বুঝি কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না? 
আহেরিকে দেখো মা... " 

মানেটা কী! গীত...এত বড় ভুল করতে যাচ্ছে। গীতের ফোন স্যুইচড অফ। পাগলের মত অভিরূপের ফোনে রিং করছেন। তার ফোন বেজেই যাচ্ছে। 
কী করব এখন গার্গী!
এ কি, ট্রেন চলতে শুরু করেছে!কিন্তু ওকে তো ফিরতেই হবে। 
টালমাটাল পায়ে এগোতে থাকে গার্গী, ট্রেনের চেন টানবে বলে। 
ওদিকে সল্টলেকে সাইকিয়াট্রিস্ট অভিরূপ দাশগুপ্তের বাড়িতে অসময়ে রাত নামছে গুটিগুটি... 

সম্বৃতা দাশরায়

                     .



কুঠুরি



    ব্যাগের  জিপ খুলে লাঞ্চবক্সটা বের করতে গিয়ে নীলার হাতে উঠে এল একটা ছাতা !  নীলের উপর গোলাপি অ্যাবস্ট্র্যাক্ট প্রিন্টে দারুণ সুন্দর  ছাতাটা।
নতুন ছাতা বোঝাই যাচ্ছে কারণ প্রাইস ট্যাগ  লাগানো আছে। এটা কোত্থেকে সমরের ব্যাগে এল ! ভুরু কুঁচকে  খানিকক্ষণ ছাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকল নীলা।  সমর এসেই রোজকার অভ্যাস মতো স্নান করতে ঢুকে গেছে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা অফিস থেকে ফিরেই  স্নান করে । এমনিতেও এখন চৈত্রের শেষ , গরম জানান দিচ্ছে । সমরকে 
 জিজ্ঞাসা করবে ছাতাটার কথা। ভুরু কুঁচকেই কিচেনে যায় নীলা। চায়ের জল বসায়, ডিম পেঁয়াজ কাঁচালঙ্কাকুচি এক চিমটি অরিগ্যানো ছড়িয়ে ফেটিয়ে নেয় । দরাজ হাতে  চিজ গ্রেট করে দেয়।  ফ্রাইং প্যানে সাদা  তেল ঢালে।  পাউরুটি স্লাইসগুলো ব্যাটারে ডুবিয়ে সাবধানে গরম তেলে ছাড়ে।  ভাজতে ভাজতেই টের পায়  সমর বেরিয়েছে বাথরুম থেকে। চটপট ট্রেতে চায়ের সরঞ্জাম টোস্ট দুরকম সস সাজিয়ে নীলা ড্রয়িংরুমে আসে । ততক্ষণে সমর খবরের  চ্যানেল সার্ফিং শুরু করেছে ।এগ চিজ টোস্ট সমরের  খুব  পছন্দ। গোটা একটা  স্লাইস মুখে পুরে চিবোতে শুরু করে দেয়।
চায়ে এক চুমুক দিয়ে আড়চোখে সমরের দিকে তাকায় নীলা।
--  তোমার ব্যাগে একটা ছাতা দেখলাম ,নতুন-- বলার ভঙ্গি একটু আলগোছ রাখে নীলা। তার কৌতূহল সমরকে বুঝতে দিতে চায় না।
মন দিয়ে চিলি সসে টোস্ট  ডুবিয়ে তুলছিল সমর, থমকে গেল।  কয়েক মুহূর্ত।  তারপর হেসে উঠল- আরে হ্যাঁ।  তোমার জন্যই তো কিনলাম।  পুরনোটা শিক টিক খারাপ হয়ে গেছে বললে না সেদিন। আজ প্রবালের সঙ্গে বেরিয়ে গেছিলাম ঐ  ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। অফিসের কাছেই যেটা নতুন খুলল।  কত  কি রেখেছে ! প্রবাল একটা  ইনডাকশন  ইউজেবল  ননস্টিক প্রেসার কুকার কিনল। আমিও  ভাবলাম তোমার জন্য নিয়ে নিই  কিছু ।
--বললে না তো ফিরে । আমি ব্যাগ খুলে...
--আরে ভুলে গেছি। এসেই  তো স্নান করতে গেলাম ।
বলতাম ঠিকই । পছন্দ হয়েছে ? তোমার ফেভারিট কালার। বলত বলতে টিভির  মধ্যে ঢুকে পড়ে সমর। হাইওয়ে  তোলপাড় করে গাড়ি  ছুটছে । ভিলেনকে তাড়া করছে হিরো।
নীলা কাপ টাপ  সব  সিঙ্কে রেখে চলে আসে ব্যালকনিতে।  হাওয়া দিচ্ছে হালকা শিরশিরে। আরাম লাগছে । বেতের দোলনাটায় বসে ভাবে, ছাতাটা তার জন্য এনেছে সমর এটা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। এনেছেই যদি তো জিগ্যেস করতে হল কেন? 
ঠোঁট কামড়ায় নীলা। অফিসের  কৌশানী বলে  মেয়েটাকে গত শীতের পিকনিকে দেখেছিল। চটকসুন্দরী থাকে না কেউ কেউ, সেরকম।   ছলবলে খলবলে গায়ে পড়ামতো। ভালো লাগে নি নীলার। সমরদা  সমরদা করছিল খুব।  ওর জন্যই কেনেনি তো ছাতাটা ! অফিস থেকে বেরিয়ে কিনে রেখেছে কাল উপহার দেবে বলে। ভাবনাটা মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে নীলার। বহুদিন হয়ে গেল সমর  কোনও গিফট এনেছে মনে পড়ে না নীলার আর হঠাৎ আজকে...
      উঁকি মেরে একবার দেখে নীলা।  টকটকে লাল শাড়ি পরা লাস্যময়ী নায়িকা নাচছে । উন্মুক্ত নাভি ধবধবে নিটোল কোমর ফিনফিনে শাড়ির ফাঁকে দৃশ্যমান । সমর নিষ্পলক তাকিয়ে।  কেমন শিউরে উঠল নীলা। চোখ ফিরিয়ে নিল। সন্ধেগুলো এভাবেই পেরিয়ে যায়। আগে বাবুইকে নিয়ে  হুড়মুড় করে দিন কেটে যেত। ছেলে পিলানিতে চলে গেল। এখন এত অবসরে  হাঁপ ধরে যায় নীলার। সকালটা তবু   সমরের বেরনোর তাড়াহুড়ো, ভাত তরকারি মাছের ঝোল, হালকা টিফিন তৈরির ব্যস্ততায় একরকম  চলে যায়।  তারপর   ফ্ল্যাটটাকে নির্জন  দ্বীপের মতো লাগে । এগারোটা  সাড়ে  এগারোটায় বাসন্তী আসে।   বাসন মাজা ঘর মোছার ফাঁকে ফাঁকে বকবক করে। মাতাল বরের মার  খায় প্রতিদিন  তবু কেন আঁকড়ে আছে, সতেরো বছুরে  ছেলে এখনই বাপের পথ ধরেছে।  তারও নেশাভাঙে ঝোঁক, বড় মেয়ের বিয়ের দেনা  শোধের চিন্তা থেকে  বি-টুয়েলভের  দত্তগুপ্তদের শাশুড়ি বৌমার খিটিমিটি,  সি-ফাইভের অশনি চৌধুরীর নতুন গাড়ি ঘুষের টাকায় কেনা এমন হাজারো  কথা বাসন্তীর ভাঁড়ারে। নীলা বাধা দেয় না। এভাবেও তো নিঃসঙ্গতা কাটে কিছুটা  কিন্তু  সে আর কতক্ষণ। ঝপাঝপ কাজ সেরে দৌড়য় বাসন্তী। আবার নিঝুম ঠান্ডা চারপাশ। রাত সাতটা আটটা হয় সমর ফিরতে ফিরতে।
 সমর ফিরলেই বা কি এমন আর উনিশ বিশ ? হুঃ!
 চা খেতে খেতে টুকটাক  কথা তারপর খবর সিনেমা নাহলে ফোনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে । আজকাল বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়ার রেওয়াজ তো নেই তেমন।  রাতেও সমর চটপট খেয়ে উঠে পড়ে। ফোন নিয়ে সোজা বিছানায়।
নীলা  আস্তেসুস্থে খেয়ে এঁটো  বাসন তোলে।  ফ্রিজে  বাড়তি খাবার গুছিয়ে রাখে। ভালো করে দুবার ডাইনিং টেবিল মোছে । কিচেন স্ল্যাব গ্যাস ওভেন পরিষ্কার করে । উড়ন্ত পর্দার ফাঁকে দেখে সমর ফোনে মশগুল  ,  ওয়েব সিরিজের নেশা হয়েছে ইদানীং। নীলা কোলাপসিবল গেটের তালা মেরে জানলাগুলো টেনেটুনে দেখে। আলো নিভিয়ে  বাথরুমে যায়।
আগে বারোমাস  হুড়হড় করে জল ঢালত গায়ে । ঘষে ঘষে  ফেনা তুলত  সাবানের। ভুরভরে সুগন্ধ ছড়িয়ে যখন ঘরে আসত সমরের দৃষ্টির মুগ্ধতায়  ছমছম করত নীলার শরীর। এখন রাতে গায়ে জল ঢাললেই চট করে ঠান্ডা লেগে যায়। অগত্যা  মুখেচোখে  জল দিয়ে পরিষ্কার  নাইটি গলিয়ে নেওয়া। ততক্ষণে সমর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
চুল আঁচড়ে বিনুনি করে শোয়ার অভ্যেসটুকু  বজায় আছে আর কোনো পরিচর্যা করতে ইচ্ছেই করে না। মুখে ক্রিম লাগাতেও ক্লান্তি আসে।  শুয়েও ঘুম আসে না অনেকক্ষণ। আকাশ পাতাল ভাবে। এপাশ ওপাশ করে।  সমর একটুও   নড়েচড়ে না , এত গভীর ঘুম! নীলার আজকাল সন্দেহ হয় ইচ্ছে করেই সমর সাড়াশব্দ করে না।  পঁয়তাল্লিশ পেরোতে পেরোতেই নীলার আকর্ষণ কমে গেল ? ছেলের পড়া, স্কুল , সংসার নিয়ে  নাটাঝাপটা খেতে খেতে  চিবুকের ডৌল  ,  টানটান ত্বকের ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়াটা টের পায়নি তেমন করে। টের পায়নি সমরের এত আলগা হয়ে যাওয়াটাও।
বাবুই  চলে যাওয়ার পর সম্পর্কের খোঁদলগুলো আরো বেশি চোখে পড়ছে । কৌশানীর মেসেজ চুপিচুপি দেখেছে নীলা। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ কথোপকথন  কিন্তু তলিয়ে ভাবলেই মাথাটা কেমন করতে থাকে। মাঝরাত পেরিয়ে চোখের পাতায় ঘুম নামে আর ঘুমের ভিতর ছেঁড়া ছেঁড়া অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে। অজস্র ফেনিল বুদবুদ তখন যেন ঘিরে থাকে নীলাকে। স্বপ্নের মধ্যে আসে  সমর কৌশানী ।  যন্ত্রণায় চৌচির  হয়ে যায় নীলা ।  প্রচন্ড  রাগে ফেটে পড়তে ইচ্ছে করে  পরক্ষণেই সুখের ঢেউ  ভাসিয়ে নিয়ে যায় নীলাকে।

                                   অফিসের ব্যাগ সমরের হাতে দিয়ে  সহজ গলায় বলে  নীলা -- ছাতাটা  ব্যাগে দিলাম । আগেরটা তো ঠিকই  আছে। সারিয়ে নিলেই হবে।  দেখ না এটা ফেরত নেয়  যদি, তাহলে একটা ভালো কফি মাগ সেট নিও।
  -- এজন্যই কিছু আনতে চাই না। রেখে দিতে পারতে,  তা না...দেখি ফেরত হয় কিনা-- বিরক্তি দেখালেও  যেন সমরের গলায় স্বস্তির ছোঁয়া।
          সিঁড়িতে পায়ের শব্দ  মিলিয়ে গেলে দরজা বন্ধ করে নীলা। ফোনটা হাতে নিয়ে কনট্যাক্ট লিস্টে যায়।  প্রবালের নম্বর আছে তার কাছে। আলাপও আছে ভালই। ওকে জিগ্যেস করলে হয় কালকে ও সমরের সঙ্গে দোকানে গেছিল কিনা। তাহলেই ছাতার রহস্য পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এসব ভাবতে ভাবতেই  প্রবালের নম্বরে রিঙ করে ফেলল নীলা। চলতি  হিন্দি গান বেজে উঠতেই  টুক করে কেটে দিল ফোন । ইসসস  ভাগ্যিস ফোনটা ধরে নি প্রবাল! এসব জিগ্যেস করলে কি জানি কি ভাবত ছেলেটা। নাহহ  সত্যি   মিথ্যের এই জটিলতায়  ঢুকবে না নীলা। তার চেয়ে ওর মন যা ভাবে , ভাবতে চায় সেটাই সত্যি হয়ে  থাক না ।  ঘুমের ভিতর নেমে আসা বুদবুদের অস্তিত্ব এখনও যেন অনুভব করতে পারে নীলা। থাকুক না,  কৌশানি সমরের উদ্দামতার নীল গোলাপি  স্বপ্নগুলো থাকুক  নীলার মনকুঠুরির গোপন সুখ হয়ে।।

                        
                      

মঞ্জুশ্রী দাস

      


সাক্ষ্য


  এই   গনগনে   দুপুরেও  ,
   হাত দুটো  কে
        সেঁকে  নিয়েছি   আগুনে ,
যাতে   এই  হাতটাই  
                গায়ে  লাগলে ,
   ক্ষিদের   জ্বালা  মরে যায়  ।

  সদ্য - ফোটা  ফুলের 
     পাপড়ি  - খসানো  দেখেছো  ?
    দেখলেই  মনে হবে   , 
         মানুষ - জন্ম ও  এতো   সয়  ?
   
  তবু  , কিছু   ব্যতিক্রমই 
       বাঁচিয়ে   রাখে ,
            বয়ে  নিয়ে   চলে, 
           মানবতার   ইতিহাস  ।

   ভেঙে - পড়া  ধ্বংস স্তুপের  মধ্যে 
         একটা  শীর্ণ   হাত  শুধু  , 
             দৃশ্যমান   ।
        তারই    অভিমুখে  ,
              চলছে   খনন- কার্য   ,
            পুরাতাত্ত্বিক   গবেষণার 
                    অকাট্য   প্রমাণ   ।

বুড়ো  বট

শেকড়ের  মানচিত্র  তৈরি করে 
তেমাথা য়  দাঁড়িয়ে  আছে  ,
বুড়ো  বট ,----
অগুনতি    দিক - ভোলা 
মানুষ কে  সে পথ দেখায় ,
তাকে  অবলুপ্ত  করার 
সমস্ত  প্রচেষ্টা  কে
প্রতিহত করে ,
মাথা  উঁচু  করে ----
তার অস্তিত্বকে   টিকিয়ে  রেখেছে,
   অতীত  থেকে  বর্তমান  ,
তার গায়ে  আঁকিবুকি   কেটেছে  সময় 
    কত ভাবেই না তাকে
      নিশ্চিহ্ন   করার  চেষ্টা  
  হঠাৎ ,  সাদা মেঘ  , কালো হোলো ,
    আকাশের  বুক  চিরে -
              বাজ  পড়লো ----
     দাউ  দাউ করে  জ্বলে  উঠলো  ,
                  বুড়ো    বট ,---
        স্বেচ্ছা - আত্ম অবলুপ্তি  ,
                     না  কি ,
         দৈব -নিধনের  নিষ্ঠুর  চুক্তি  ,
          বাস্তু - হারানো  প্রাণগুলো  
          ছটফট  করেছে  সারা রাত ,
             প্রাজ্ঞ  - বটের জীবন - অবসান
                      হোলো  অকস্মাৎ । 

নেমে যাই
_____________

এক পা , এক পা করে
    নেমে  যাই ,
খাজ  কেটে ,  কেটে,---
আয়ু  আর বয়সের  ,----
বিপন্ন   অস্তিত্ব  নিয়ে 
  নেমে যাই   গহন  গহ্বরে  ।
  ঘেঁষাঘেঁষি  , ঠেলা  ঠেলি  ,
তার ই মাঝে  হাত ধরা
  হাতে হাতে  ধরাধরি , গলাগলি ।
   
বোধ  হতে বোধে  ফিরি  
    নি সঙ্গ   ,  একা ,
পায়ে  পায়ে   চলে  যাই  ,
   নামহীন  ,  ছেদহীন  
  পথ  আঁকা  ব

মানসী গাঙ্গুলী

                  



পুনর্মিলন


     মা মারা যাবার পর অতনু তার বাবা নীরেনবাবুকে গ্রামের বাড়ীতে একা রাখবে না বলে, নিয়ে আসে তার কলকাতার ফ্ল্যাটে। যদিও পর্যাপ্ত জায়গা আছে তবু তাঁর ব্যবস্থা হয় এককোণের ছোট একটা ঘরে। এসবই সীমা করে তার মায়ের পরামর্শে। সীমাকে সর্ব ব্যাপারে চালনা করেন তার মা। অতনু শান্তিপ্রিয় মানুষ, গ্রামের সাদাসিধে মানুষেরা যেমন হয়, এ নিয়ে কোনো ঝামেলা সে করে না, চুপচাপ মেনেই নেয়। বস্তুত দু'জনের দশবছরের সংসার হলেও ওদের দু'জনের জগৎ সম্পূর্ণ আলাদা, কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ভালবাসা? ছিল প্রথমে, সীমার মায়ের দাক্ষিণ্যে তা আজ পাখা মেলেছে। প্রথম থেকেই সীমার মায়ের মত ছিল না গ্রামের ছেলে অতনুর সঙ্গে তাদের মেয়ের বিয়ে দিতে। কিন্তু, সীমার বাবার আন্ডারে কাজ করার সময় থেকেই অতনুকে ওনার চোখে পড়ে, মনেও ধরে। আর তাঁর একমাত্র মেয়ের জীবন যে তার মায়ের মতোই চলবে যেটা যে কেউ মেনে নেবে না তাও উনি জানতেন। তাই এমন এক ছেলেই যে সীমার জন্য উপযুক্ত তা তিনি বেশ বুঝেছিলেন এবং প্রায় নিজের মতের জোর খাটিয়েই তিনি অতনুর সঙ্গে সীমার বিয়ে দেন, স্ত্রীর প্রবল আপত্তি অগ্রাহ্য করে। সীমার মায়ের ইচ্ছে ছিল সোসাইটির উঁচুতলায় মেয়ের সম্বন্ধ করার যা তিনি প্রচুর চেষ্টা করেও পারেননি।

       অতনু কানপুর আইআইটির ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশী ফার্মে চাকরী করে, তার মধ্যে আজও গ্রাম্য সরলতা বিদ্যমান যা আজকাল এককথায় বিরল বলা চলে। এমন একটি ছেলের কাছে যে মেয়ে সুখে থাকবে এ সীমার বাবার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি অতনুকে কেবল অনুরোধ করেন যাতে সীমাকে গ্রামের বাড়ীতে সে না নিয়ে যায়। অতনু রেখেছে সে কথা, নিজে গেছে, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হিসাবে দায়িত্ব কর্তব্য সে করে এসেছে চিরকাল, সেখানে কোনো ত্রুটি সে রাখেনি। তবে বিয়ের পর বাবা-মাও আর কখনও আসেননি কলকাতায় তার ফ্ল্যাটে। অতনুও আনেনি তাঁদের। বোঝে দুই-পরিবারের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক, সেখানে তার বাবা-মাকে এনে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলতে চায়নি সে। তবে ফারাক হলেও নিজে গেছে সে মাঝেমধ্যে শ্বশুরবাড়ি নিমন্ত্রণ পেলে। শ্বশুরমশাই তাকে অত্যন্তই স্নেহ করতেন তাই সেখানে তার যত্ন আপ্যায়নের ত্রুটি ছিল না। কিন্তু সেই মানুষটা চলে গেলে সে বোঝে তার শাশুড়ি তখনও তাকে তুচ্ছজ্ঞান করেন গ্রামের ছেলে বলে। এতদিন শ্বশুরমশাই থাকায় সেটা বোঝাতে পারেননি, যা প্রকট হয়ে ওঠে। 

         এর মধ্যে ওদের একটি সন্তানও হয়েছে, অরিত্র। সন্তানকে ঘিরে সীমা-অতনুর কত খুশীর দিনও কেটেছে কিন্তু সীমার বাবা মারা যাবার পর ওর মা সীমার ওপর আধিপত্য চালান বড় বেশী। মায়ের হস্তক্ষেপে ওদের সম্পর্ক ক্রমে খারাপ হতে থাকে মানসিকভাবে। সীমা মায়ের সঙ্গে যখনতখন রাতে পার্টিতে চলে যেত বাচ্চাকে আয়ার কাছে রেখে যেটা অতনু মেনে নিতে পারত না কিন্তু অশান্তি করবে না বলেই সে চুপ করে থাকত। ক্রমে ওদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়তে থাকে। আর নাইট ক্লাবে যাওয়া, পার্টিতে যাওয়া করতে করতে সীমা একটু একটু করে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে লাগল, রাতে প্রায় টলতে টলতে বাড়ী ফিরত। লা মার্টিনের ছাত্রী, প্রেসিডেন্সির অনার্স গ্র‍্যাজুয়েট, সে তখন একজন সোসাইটি মহিলা।

      ছোট্ট অরিত্র রাতে শোবার সময় মাকে কাছে পেতে চাইত, বায়না করত, শেষে জলভরা চোখে আয়ামাসির কাছেই ঘুমাত। বাবাও রাতে ফিরতেন বলে বাবাকে তেমন কাছে পেত না আর তাই দাদু এলে দাদুকে ভীষণভাবে আঁকড়ে ধরে সে। দাদুও নাতির সঙ্গে মহাখুশীতে থাকতেন। ছেলে সারাদিন ব্যস্ত, সীমা তার নিজস্ব সমাজ নিয়েই থাকতে পছন্দ করত। নীরেনবাবুর প্রথম প্রথম নিজেকে একটু অবাঞ্ছিত মনে হত, পরে ছোট্ট অরিত্র ওর দাদুর শুষ্ক মরুভূমিতে সাহারা হয়ে উঠেছিল। অবসরে দাদুর কাছেই থাকত অরিত্র, দাদুর সঙ্গে খেলা, দাদুর কাছে গল্প শোনা, অরিত্র মায়ের অভাব ভুলতে শুরু করল। স্কুল থেকে ফিরে সব কথা তার দাদুর সঙ্গে, দাদুর কাছে সম্পূর্ণ মেলে ধরত সে নিজেকে অনায়াসে, যা এতদিন সে কারও কাছে করতে পারেনি। ছোট্ট ছোট্ট হাত-পা নেড়েচেড়ে নাতি যখন কলকল করে দাদুর সঙ্গে গল্প করত, দাদুর মনে হত তাঁর জীবনে আর কিছু পাওয়ার বাকী নেই, তিনি যেন এক সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে গেছেন। এক বৃদ্ধ আর এক শিশুর বন্ধুত্বে বাড়ীটা তখন খুশীর আলোয় ঝলমল করে উঠত। নাহলে প্রথমদিকে গ্রামের মানুষ নীরেনবাবু ছেলের বাড়ী এসে, ওদের জীবনযাত্রা দেখে থতমত খেতেন। বিশেষ করে বৌমা সীমার হালচাল সম্বন্ধে তিনি কিছুই অবগত ছিলেন না। অবাক হয়ে সব দেখতেন কিন্তু কিছু বলতেন না। বুঝতেন তাঁর কোনো বক্তব্যের সেখানে কোনো মূল্য নেই তবে ছেলে অতনু যতটুকু পারত বাবাকে সময় দিতে চেষ্টা করত।

       এভাবেই চলছিল জোড়াতালি দেওয়া সম্পর্ক। দু'জনে দেখাই কম হয়, সীমা বাড়ী ফেরে প্রায় মাঝরাতে নেশাগ্রস্ত হয়ে, ততক্ষণে অতনু গভীর ঘুমে। ওদিকে রাত করে ফেরার জন্য সে লেট-রাইজার। ঘুম থেকে উঠে দেখে অতনু, অরিত্র বেরিয়ে গেছে। অতনু অফিস যাবার পথে অরিত্রকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে যায় রোজ আর সারাটা রাস্তা অরিত্র বকবক করতে থাকে। কত কি যে ওর বলার থাকে বাবাকে, আর অতনুও বেশ উপভোগ করে সেটা। ছুটির সময় ড্রাইভার বাড়ী নিয়ে আসে অরিত্রকে, তখন সীমা হয়তো বা শপিংএ কিংবা পার্লারে অথবা কোনো বন্ধুর বাড়ী, এই ছিল ওদের রোজনামচা। একরাতে সীমা বোধহয় একটু বেশিই মদ্যপান করে ফেলেছিল তাই মা তাকে সঙ্গে করে ওপরে ওর সাততলার ফ্ল্যাটে পৌঁছতে আসেন। আয়া দরজা খুলে দিতেই ঘরে ঢুকে সে পড়ে যায়। এতে একটু জোরে কথাবার্তায় নীরেনবাবু ঘুম ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে বলে ফেলেন, "একি বৌমা, ছি ছি"। ব্যস আর যাবে কোথায়? সীমার মা তো রেগে আগুন, নীরেনবাবুকে যথেচ্ছ অপমান করেন, একটা হেস্তোনেস্ত করেই তিনি ছাড়বেন। এই 'গেঁয়ো ভূত'কে না তাড়ালে তাঁর শান্তি নেই।

       এরপর অতনুও উঠে আসে ঘুম ভেঙ্গে। তার বাবার অনেক অবহেলা, অপমান দেখেছে সে মুখ বুজে, কিন্তু এবারে আর সে সহ্য করতে পারে না। পরদিন অরিত্রকে স্কুলে ছেড়ে সে ফিরে আসে, অফিসে আর যায় না। সীমা ঘুম থেকে উঠলে শান্ত-কঠিন স্বরে জানিয়ে দেয় যে সে সীমার সঙ্গে একসঙ্গে এক ছাদের তলায় আর থাকতে চায় না। কাজেই অবশ্যম্ভাবী ডিভোর্স। অরিত্র কিন্তু বাবাকে, দাদুকে ছেড়ে মায়ের সঙ্গে যেতে চায় না। বস্তুত মা কি জিনিস তা যে তার জানাই হয়নি। অতঃপর মায়ের আশকারায় জেদী হয়ে ওঠা সীমা গিয়ে ওঠে তার মায়ের কাছে। নতি স্বীকার সে করবে না।

      এতে দু'পক্ষের কারোরই কোনো অসুবিধা হয়নি, যে যেমন ছিল সে তেমনই রইল। কিন্তু কয়েকমাস পরে নীরেনবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনদিনের মাথায় চলে গেলেন সকল মায়া ত্যাগ করে, এই জগৎ ছেড়ে। খুব কাঁদল অরিত্র দাদুকে হারিয়ে। অতনুও যেন বাবাকে হারিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছিল। বাড়িটা যেন খাঁ খাঁ করে গিলে খেতে আসত ওকে। খোঁজখবর করে চাকরী নিয়ে অতনু তাই লন্ডন চলে গেল অরিত্রকে নিয়ে। এদেশে আর আসত না, কার কাছেই বা আসত সে! কে ছিল তার জন্য এখানে অপেক্ষায় পথ চেয়ে! তাই ওদেশেই থাকতে থাকতে সেখানে একটা বাড়ীও করে সে। বাবা-ছেলে সেই বাড়ীতে থাকে। ছেলেটাও বড় হয়েছে, সে-ই ওর বন্ধু, সঙ্গী। অরিত্র পড়াশোনায় ব্রিলিয়ান্ট বাবার মত, সেখানে ডাক্তারি পড়ে সে। দেখতেও হয়েছে একেবারে সাহেবের মত। পাশ করার বহুবছর পর অতনু তাকে নিয়ে দেশে আসে। কলকাতার ফ্ল্যাট, দেশের বাড়ী, সব জায়গায় নিয়ে যায় ছেলেকে, আগে তো কখনও নিয়ে যেতে পারেনি। অরিত্র দাদুর ঘরে যায়, সেখানে রাখা ধূলোপড়া দাদুর ছবিতে হাত বোলায়। গ্রামের বাড়ী গিয়ে ও ঘুরে ঘুরে সব দেখে, যেখানে তার বাবা বড় হয়েছে, দাদু-ঠাকুমা সারাজীবন থেকেছেন। ও যেন ছোটবেলায় ফিরে গেছে।

       অতনুরও বাবা-মার জন্য মন কেমন করে খুব, তবু অরিত্রর মনখারাপ দেখে তার মাথায় হাত রাখে এসে, অরিত্র বাবাকে জড়িয়ে ধরে থাকে কিছুক্ষণ। অতনু বোঝে সব, সস্নেহে ছেলের গায়ে হাত বোলায়। কলকাতায় ফিরে অতনু কিছু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ করে, অরিত্রর বিয়ে দিতে চায় সে আর সেটা এদেশের মেয়ের সঙ্গেই।

       ওদিকে সীমার মা-ও আর বেঁচে নেই। বুকভরা হাহাকার, শূন্যতা, একাকীত্বকে সঙ্গী করে সীমা কলকাতার অভিজাত এলাকার বিশাল বড় বাড়ীতে একাই থাকে। শরীরে বয়সের ছাপ প্রকট, আর একাকীত্ব যেন গিলে খায় তাকে আজকাল। কিছু ভাল লাগে না তার, পার্টি, হুল্লোড়, কিচ্ছু না। মদ্যপান আর সে করে না, অতনু, অরিত্রর জন্য বুকের ভেতরটা তার খাঁ খাঁ করে। ফিরতে চায় সে, উপায় নেই। মা তার সে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। মায়ের ওপর হয় তার দুরন্ত অভিমান। মা-ই জীবনটা শেষ করে দিল তার। অতনুর মত স্বামী, যে চিরকাল মুখ বুজে সব সহ্য করেছে, তার সঙ্গে ওর বিচ্ছেদও তো মায়েরই কারণে, অতনুর সঙ্গে তো ওর কোনোদিনই কোনো বিবাদ ছিল না।

    আজকাল সীমা বইপড়া, গানশোনা, সাহিত্যসভা, এইসব নিয়েই থাকে। তাতে কিছুটা হলেও শান্তি পায় ও। এইভাবে বাইরে বেরিয়ে কিছু পরিচিতি, কিছু সঙ্গী তার হয়েছে। তাদেরই একজন একদিন ফোন করে জানায় অতনু আর অরিত্রের দেশে আসার কথা। বুকের ভেতর তার হাজাররকমের আওয়াজ, বড় উতলা লাগে মন। কতদিন দেখেনি ছেলেটাকে, কত বড় হল, কেমন দেখতে হয়েছে! অস্থিরতাকে দমন করতে না পেরে ছোটে অতনুর ফ্ল্যাটে। দরজা খুললে মা -ছেলে মুখোমুখি, অবাক চোখে সীমা তাকিয়ে থাকে অরিত্রর দিকে, এ তার ছেলে! এত্ত সুন্দর হয়েছে! একেবারে সাহেবের মত। অতনুও 'কে কে' করতে করতে বেরিয়ে আসে ঘর ছেড়ে দরজায়। চেহারাটা ঈষৎ ভারী হয়েছে, মাথার সামনের চুলে রূপোলী রেখা, তিনজনের মুখেই কোনো কথা নেই।

       কোনোরকমে সামলে অতনু ভেতরে ডাকে সীমাকে আন্তরিকভাবে নরমস্বরে। সীমার চোখে জল, কন্ঠরুদ্ধ। মাথা নীচু করে সোফায় বসে সামলাবার চেষ্টা করে নিজেকে, কথা বলতে পারে না। তারপর সহসা অতনুর হাত চেপে ধরে সে, "আমি ফিরতে চাই, তোমাদের ছেড়ে থাকা আমার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আমি আর পারছি না, অনেক শাস্তি আমি পেয়েছি, এবার আমায় ক্ষমা করে দাও"। অরিত্ররও চোখদুটো জলে ভিজে উঠেছে।

       এরপর কি আর ফেরানো যায়! তিনজনে ওরা আবার এক ছাদের তলায় থাকতে শুরু করে তখন এক সুখী পরিবার গড়ে নতুন করে। সীমার ইচ্ছে তার বাবার অতবড় বাড়ী পড়ে র‍য়েছে, অরিত্র সেখানে নার্সিংহোম করুক। এখানেই থাকুক অরিত্র কিন্তু অতনুর চাকরী রয়েছে এখনও, তাকে তাই ফিরে যেতে হবে লন্ডনে। এরপর তোড়জোড় করে ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিনক্ষণ ঠিক করে সবাই ওরা লন্ডনে যায়। বিয়ের তখনও আটমাস বাকী, অরিত্র ততদিনে একটা ডিপ্লোমা করে নিতে চায়। সীমা সেখানে গিয়ে মন দিয়ে সংসার করে স্বামী সন্তান নিয়ে যা সে কোনোদিনও করেনি আগে, আর এতে যে কি আনন্দ সে স্বাদও সে পায়নি কখনও আগে।

       ওরা ঠিক করে অরিত্রর বিয়ের পর কিছুদিন লন্ডনে এসে থেকে অরিত্রর কোর্স কমপ্লিট হলে ওরা কলকাতায় সীমার বাবার বাড়ীতে থাকবে। আপাতত সেখানে চেম্বার, পরে নার্সিংহোম করবে। আর সীমা ও অতনু যতদিন অতনুর চাকরী থাকবে ততদিন লন্ডনে থাকবে তারপর দেশে ফিরে ওরা একসঙ্গে থাকবে। মাঝে মাঝে ছুটি কাটাবে অরিত্র বউকে নিয়ে সেখানে গিয়ে।

       সীমা ভাবে মনে মনে, এই সুখ ছেড়ে ও কিসের নেশায় সব অবহেলা করেছিল এতদিন। অতনু ভাবে, ভালবাসা মরে না, চাপা থাকে পরিস্থিতির চাপে। সুযোগ পেলেই তা ডানা ঝাপটায়, ভালবাসার মানুষের কাছে যেতে চায়। অরিত্র ভাবে, আজ সে কত সুখী, এই সুখটাই তো চেয়েছিল সে ছোট থেকে। যাই হোক দেরীতে হলেও সে পেয়েছে অবশেষে, better late than never.


 


সুস্মিতা সাহা

                   


 


অঞ্জলি/ 

সুস্মিতা সাহা 

''ও সোনাই, এই লাল পাড় নকশা কাটা শাড়িটার যে অনেক দাম সোনা। তুই তো সবে চাকরি পেয়েছিস, এখনি এতো খরচা করাটা কি ঠিক হবে?''
গটগট করে হাঁটতে থাকে সোনাই- শ্রীতমা  মুখার্জি। সদ্য সদ্য চাকরি পেয়ে মাকে নিয়ে এসেছে পুজোর বাজার করতে। 
''ও সোনাই, শোন না রে, আমি আর এই বয়সে রংচঙে শাড়ি পরে কি করবো বল তো? তার থেকে তোর ঠামুকে দে একটা তসরের শাড়ি। খুব খুশি হবেন। ''
'' আচ্ছা মা, ঠামুকে তো সবাই কতো সুন্দর সুন্দর শাড়ি দিচ্ছে। আর আমিও তো মাইনে পেয়ে প্রথমেই দাদু ও ঠামুকে গিফ্ট দিয়েছিলাম।
তোমাকে বললাম যে কিছু কিনে দি, তুমি রাজি হলে না। আজ আর কোন বারন শুনবো না। চলো তো ঐ রেস্টুরেন্টে বসে চাউমিন খাই।''

সোনাই সব ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে মাকে নিয়ে ঢুকে পড়ে এক ঝা চকচকে ঠান্ডা ঠান্ডা খাবারের জায়গায়। 
এই রে, যাও বা এতক্ষণ হৈমন্তী ভাবছিল যে অষ্টমীর অঞ্জলি দেবে এই তাঁতের শাড়ি পরে - তা তো আর হবে না। চাউমিন তো আমিষ- অশুদ্ধ হয়ে যাবে শাড়ি। এমনিই তো আজ বাড়ি ফিরে কতো কটু কথা হয়তো বা শুনতে হবে তাকে।
শ্বশুর বাড়ির বহু দিনের বয়স্কা রাঁধুনি মঞ্জুদির ঠোঁট বাঁকানো হাসির সঙ্গে দুটো/একটা কটূক্তি কানে এসেছিল হৈমন্তীর কিন্তু ছোট্ট মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে আর পেছন ফেরে নি।
কিন্তু এখন তো বাধ সাধছে হৈমন্তীর মনের দীর্ঘ দিনের সংস্কার। আমিষের ছোঁয়া লাগলে তো সেই শাড়ি পরে মা দুগগার কাছে যাওয়া যাবে না। কি করবে সে? 
ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চাউমিন তার প্লেটে তুলে দিচ্ছে সদ্য চাকুরি পাওয়া বাইশের মিষ্টি শ্রী। হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে কাঁটা চামচ। কি সুন্দর ঘ্রাণ খাবারের। 

একটু একটু করে সন্ধ্যে নেমে এসেছে শহরের রাস্তায়। এমা, সন্ধ্যাবাতি দিতে হবে তো।
''চল রে চল সোনাই', হালকা ঠান্ডা হাওয়া বয় এ সময়ে। ''মা দুগগা, ক্ষমা কোরো এই মাটা-কে।''
না গো মা , চাউমিনের লোড নয়- এ যে সন্তানের হাসি মুখটা দেখার আনন্দ। 
সবাই কতো না হ্যাটা করেছে স্বামী পরিত্যক্তা হৈমন্তীকে - একা লড়াই করে আজ মেয়েকে বড় করেছে সে। সেই মেয়ের মূখের দিকে তাকিয়ে আজ না হয় একটু নিয়ম ভাঙলেন।

শুধু এই মূহুর্তটি থাক এমনই।




রত্না দত্ত

                   


 বই - আমাদের পরমাত্মীয়

বই মানুষের চিরন্তন বিশ্বস্ত সঙ্গী।বই মানুষের জীবনকে করে তোলে আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক।মানুষের সুঅভ্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট হল বই পড়া এবং অন্যকে বই পড়ার উৎসাহ প্রদান করা।কেননা, বইপড়ার মাধ্যমে মানুষের মনে আসে আনন্দ - বেদনার কাব্যিক,দার্শনিক সত্যবোধ।
     শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সহচর হিসেবে বই পূর্বপরিচিত।বই মানুষকে হাসতে শেখায়,কাঁদতে শেখায়,নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা যোগায়।শত শত কাগজের মাঝে সীমাহীন জ্ঞানকে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখে।এই বই দুরন্ত শিশুকে যেমন আনন্দের খোরাক জোগায় তেমনি মাঝবয়সী,প্রবীণ ও নবীনদের
আত্মতৃপ্তির স্বাদ আহরণের সুযোগ দেয়। বিস্তীর্ণ পৃথিবীর দুর্লভ সব কার্যসিদ্ধির ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে বইএর পাতায় পাতায়।সেইসব কালজয়ী কাহিনী স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে বইএর পাতার প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে।সঙ্গীহীন বালকটিও অজান্তে বইকে সঙ্গী করে নেয়।প্রতিটি মানুষের কাছে নতুন বইএর মানে নতুন কিছু আবিষ্কার।তবে কৃত্রিমতার বিষাক্ত ছোবল জ্ঞানের আধার বইকেও রেহাই দেয়নি।ধ্বংসাত্মক জ্ঞান সম্বলিত বই মানুষের স্বাভাবিক চিত্তকে বিষিয়ে তোলে।বই যেমন অন্ধকার জীবনকে আলোকিত করে তেমনি আলোকিত জীবনকেও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলতে পারে। তা সম্পূর্ণভাবে বই ও পাঠকের উপর নির্ভর করে।পাঠককে সচেতনতার সাথে বইএর মর্ম বা গুরুত্ব উপলব্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে সেটা ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
     বই হল জ্ঞানের আধার।মানুষের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত বন্ধু বই।বইএর পাতার কালো অক্ষরগুলিতে সঞ্চিত হয়ে আছে মানবজাতির হাজার বছরের জ্ঞানপ্রবাহ।জ্ঞানের ধারক হিসেবে বই অতীত ও বর্তমানের সংযোগ সেতু।
বই পড়া হল একটি নির্মল আনন্দের উৎস।বইপ্রেমী মানুষ মাত্রই বই পড়ার আনন্দ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।মানুষ যুগে যুগে বই পড়ার মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছে,নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জগৎকে বিস্তৃত ও প্রসারিত করেছে।মনের প্রসারতার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই।প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ - দুর্দশা,ক্লান্তি - হতাশা মানুষের মনকে যখন বিষিয়ে তোলে তখন বই পড়ার মাধ্যমেই পাওয়া যেতে পারে অপার্থিব আনন্দ।মনীষীদের জীবনীপাঠে তাঁদের বইপড়ার অভ্যাস ও মানস গঠনে এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা অবগত হই। বিপুলা এই পৃথিবীকে জানার জন্য আমাদেরকে বইএর দ্বারস্থ হতে হবে।জ্ঞান - বিজ্ঞানের বিচিত্র শাখায় মানুষের ধ্যানধারণার যে প্রতিফলন ঘটেছে তা স্থান পেয়েছে বই এর পাতায়।ছোটবেলায় সমস্ত শিশুদের হাতেই দেখা যায় সেই বিশ্ববিখ্যাত ' সহজপাঠ ' ও ' বর্ণপরিচয় '। যার হাত ধরেই আমাদের সকলের শিক্ষার হাতেখড়ি।তাই যে বই হোক না কেন তাকে অস্বীকার করে আমাদের শিক্ষার পথকে প্রশস্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।পরবর্তী ক্ষেত্রে সাহিত্যের রস আস্বাদন,বিজ্ঞানের বৈচিত্রময় জগতে অবাধ বিচরণ কিংবা ইতিহাস,দর্শন তথা জ্ঞানের যেকোন শাখায় বিচরণের একমাত্র বাহন হল বইপড়া।তবে পড়ার জন্য বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।পাঠকের রুচি ও মানসিক পরিপক্কতার আলোকে বই নির্বাচন করতে হবে।শুধু নিজে বই পড়লেই হবে না আমার পাশের লোকটিকেও বই পড়ার জন্য অনুপ্রেরণা দিতে হবে।তার জন্য যেকোনো জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বা অন্য কোনো পার্টিতে উপহারস্বরূপ তার পছন্দের ভালো কোনো সাহিত্যিকের বা ভালো কোনো কবির লেখা ভালো বই দেওয়া যেতেই পারে।
একটি ভালো বই পাঠকমনের সর্বোচ্চ উৎকর্ষসাধন করতে পারে।অন্যদিকে একটি বাজে বই পাঠকের মনকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। সুনির্বাচিত বই পাঠ আনন্দ লাভের পাশাপাশি নিঃসঙ্গতা ঘোচানোর এক শ্রেষ্ঠ উপায়।বই পড়ার মাধ্যমে ঘরে বসেই আমরা বিশ্বের বিখ্যাত ও শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য পেতে পারি,পরিচিত হতে পারি তাদের চিন্তা,চেতনার সঙ্গে।নশ্বর এই পৃথিবীতে অপার্থিব আনন্দ কেবল বই পড়াতেই পাওয়া যায়।
বই পড়া হল শ্রেষ্ঠ ও অত্যন্ত উপাদেয় একটি শখ।অতীত ঐতিহ্য,নানা চিন্তার অনুশীলন ও বিচিত্র ভাবধারার সাথে আমরা পরিচিত হই।বিচিত্র ধরণের বইএর মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে চেনে,নিজেকে জানে,বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে।সেইসব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ ব্যক্তিজীবন তথা সমাজ ও জাতীয় জীবনকে উন্নত করে,সমৃদ্ধ করে।প্রত্যেককে বই পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করুন।আজ ইন্টারনেটের যুগে,ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপ এর যুগে বই এর গুরুত্ব তলানিতে এসে ঠেকেছে।তাকে আবার জাগিয়ে তুলুন,একে অপরকে বই উপহার দিন।বই একটি অন্যতম উপহার সামগ্রীও হতে পারে। যার মাধ্যমে একে অপরকে বইপড়ার অনুপ্রেরণা দেওয়া যায়।বইপড়ার মাধ্যমে সার্বিক মনের দিগন্ত উন্মোচিত ও প্রসারিত হয়,উদার ও মহৎ হয়।যাবতীয় অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে আমরা প্রত্যেকে বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল হতে পারি কেবলমাত্র ভালো বইএর সংস্পর্শে এসে।একারণে,পড়ার জন্য ভালো বই, আনন্দদায়ক বই আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।তাই আমাদেরকে পাঠাগারে যেতে হবে।না থাকলে সমবেত প্রচেষ্টা চালিয়ে পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে।বিশেষ করে আমাদের দেশ, জাতি ও সত্তাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বই অবশ্যই আমাদেরকে পড়তে হবে ও অন্যকে পড়াতে হবে।
বই পড়লে আমাদের মনে জাগ্রত হবে মানবিক চেতনা,দেশপ্রেম,মহৎ জীবন ভাবনা,সত্য - সুন্দরের সাধনা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, সময়ানুশীলন ও অধ্যবসায়ের সুদৃঢ় মানসিকতা যা সুন্দর জীবন গঠনে,সমাজ গঠনে ও দেশ গঠনে উজ্জীবিত করে।তাই স্বশিক্ষা অর্জনে বা নিজেকে ও অন্যকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম।বই আমাদেরকে শোকে স্বান্তনা,দুঃখে দুঃখজয়ের ব্রত ও পরাজয়ে বা ব্যর্থতায় সহিষ্ণুতার দীক্ষা দেয়।নির্মল ও অকৃত্রিম আনন্দ লাভের অন্যতম হাতিয়ার হল বই।
ছোটবেলা থেকেই যদি একটি শিশুকে বিভিন্ন ধরণের কমিকসের বই,ঈশপের কাহিনীর বই,জাতক জাতিকাদের গলপকথার বই,হস্যকৌতুকের বই,বিভিন্ন ধরণের গল্প ও ছড়ার বই  এর সঙ্গে পরিচয় করানো যায় তাহলে আস্তে আস্তে সেই শিশুটির মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ ও মানসিকতা গড়ে উঠবে।পারিপার্শ্বিক ও বাহ্যিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়।ছোটো থেকেই তাকে মুঠোফোনের স্বপ্ন না দেখিয়ে একটি সুন্দর বউ যদি তার হাতে তুলে দেওয়া যায় তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম সুস্থ,সুন্দর পরিবেশে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে পারবে।তাই ছোট বড় থেকে শুরু করে আবাল - বৃদ্ধ - বনিতা সবাই আমরা অধিক পরিমাণে বই পাঠে আগ্রহী হব যা দিতে পরে এক সুন্দর ও সুস্থ ভবিষ্যত।



   

তপন কুমার বসু

         


 
       
       প্রতিদিন বই পড়া নিয়ে কিছু কথা।
    

প্রথমেই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগবে যে আজকের এই গতিময় জীবনে মানুষের সময় কোথায় বই পড়ার। কিন্তু এ ধারণাটা ঠিক নয়। আমরা চাইলে দিনের যে কোন সময় একটু বার করে নিতে পারি  বই পড়ার জন্য। বর্তমান আধুনিক যুগে তো e-book এরও প্রচলন হয়েছে।
 ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই  পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি। একটা ভাল বই  মানুষের মনের চোখ যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভেতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে। বারট্রাণ্ড রাসেল বলেছেন, " সংসারে জ্বালা যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে, মনের ভিতর আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং বিপদকালে তার ভিতর ডুব দেওয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি হয়।"
   অর্থাৎ সাহিত্যে সান্ত্বনা না পেলে দর্শন, দর্শন কুলিয়ে উঠতে না পারলে ইতিহাস, ইতিহাস না মানলে ভূগোল -- এরকম আরো কত কি ? এখন প্রশ্ন এত ভুবন সৃষ্টি করব কি করে? সেটা করা যায় বই পড়ে বা ভ্রমণ করে। সেক্ষেত্রে বইপড়াটা সকলের নাগালের মধ্যে।
  জীবনে চূড়ান্ত সফল অনেক মানুষই বইপড়ায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বইপড়ার মধ্য দিয়ে তাঁরা রোজ নিজেকে সমৃদ্ধ করেন।
  এখন বই পড়ব কেন ? সে প্রসঙ্গে যে কথাগুলো বলা যায় তা হল বই পড়লে জ্ঞান বৃদ্ধি হয়। বইপড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের জ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে। যত বেশি বই পড়া যাবে, তত জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। বই-ই পারে একজন মানুষকে যথার্থ জ্ঞানী বানাতে, আর জ্ঞান সবসময় একজন মানুষকে সমৃদ্ধ করে।
 বর্তমানে depression একটা সুপরিচিত শব্দ। Depression আসে জীবনের কোন বিশেষ পরিস্থিতি মেনে নিতে না পারার জন্য। দেখা গেছে বই পড়লে সেই বই তার নিজস্ব পরিস্থিতি, আবহাওয়া পাঠকের মনকে সম্পূর্ণ অধিকার করে। ফলে কিছু সময়ের জন্য depression থেকে বেরিয়ে আসা যায়।বই পড়ায় মানসিক উদ্দীপনা তৈরি করে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে বইপড়ার অভ্যাস মানুষকে Dementia এবং Alzheimer's নামে দুটি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। বই পড়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে উদ্দীপনা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয় যা মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শরীর সুস্থ রাখতে যেমন ব্যায়াম করি তেমনি মস্তিষ্ককে সবল ও কর্মচঞ্চল রাখতে বইপড়া বিশেষ জরুরী।
   এছাড়া বইপড়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। ২০০৯ সালে ইউনাইটেড কিংডম এর সাসেক্স ইউনিভার্সিটির বৈজ্ঞানিকরা হার্টরেট ও মাসল্ টেনসন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন যে কিছু কিছু কাজ আমাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। তাতে দেখা গেছে মাত্র ছয় মিনিটের জন্য বই পড়লে স্ট্রেস লেভেল ৬৮% কমে যায়, যা হাঁটা (৪২%}, কফি পান (৫৪%} বা গান শোনা (৬১%} থেকে অনেকটা বেশি কার্যকর। বইপড়ার মধ্যে পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার ফলে আমরা এক মুহূর্তের মধ্যে কোনো এক অজানা জগতে পৌঁছতে পারি যা প্রতিদিনকার বাস্তবতা ও   নানা  দুঃখ কষ্ট থেকে একটু হলেও রেহাই দেয়, ফলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।
বই পড়লে কল্পনাশক্তির বৃদ্ধি হয়। গল্প বা উপন্যাস যাই হোক তার বর্ণনা আমাদের কল্পনাকে দূর বিস্তৃতি দেয়। কোন জায়গার বর্ণনা পড়ে কল্পনায় আমরা সেইরকম স্থানে চলে যাই। কোন চরিত্র তার বইয়ের বর্ণনার সঙ্গে নিজের কোন চরিত্র মিলে গিয়ে একাকার হয়ে যায়। এইভাবে বই আমাদের কল্পলোক ভ্রমণ করায়। যত বেশি বই পড়া যাবে ততবেশি কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পাবে।
 স্মরণশক্তিরও বৃদ্ধি ঘটে। যখন কোন বই পড়ি তখন বইয়ের অগণিত তথ্যগুলি মনে রাখতে হয়। মস্তিষ্কের অনেক exercise হয় ফলে memory power বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রোজ নিয়ম করে বই পড়লে একাগ্ৰতা শক্তি বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে আত্মসম্মানবোধ তৈরি হয়। এই আত্মসম্মানবোধ আসে তখনই যখন মানুষ ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় প্রভৃতি মানবিক গুণগুলির মূল্য বুঝতে শেখে। বই পড়তে পড়তে মানুষের মনে এই বোধ জন্মায়। ফলে মানুষ অন্যকেও সম্মান জানাতে শেখে।
Virginia Woolf এর একটা সুন্দর উক্তি দিয়ে লেখা শেষ করি -- "Books are the mirrors of the soul."
 

পলাশ দাস

               



গন্ধ 


সকালের আলোর নিচে যারা  
মধ্যাহ্নে এসে মুঠো খানিক ধুলো সংগ্রহ করে  

অ্যাসট্রে, ক্লান্ত ব্যাগের পেটে ছাই 
পায়ের তলার পিচ নরম অন্ধকার ডেকে আনে   
মাটির শরীরে দাগ 

প্রত্যেক সকাল থেকে মধ্যাহ্নে দীর্ঘ যাত্রা শেষ হলে  
                    নাকে ঘুরে ঘুরে ওঠে 
                    ভাতের গন্ধ 
ভাতের গন্ধ উঠবে বলেই, পথ 
                                                       
                               
  




পিরামিড 

একটা মাকড়সা 
ঠিক পরে একটা ব্যাঙ 
এর পরেই একটা সাপ

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি  
দেখতে দেখতেই   
একটা পিরামিড আঁকা হয়ে যাচ্ছে  
বাকিটা শব্দে সাজানো বৃহৎ উপন্যাস 
                                                       
                                   




ধান 

শব্দের আত্মহনন নেমে এলে 
বিষণ্ণ বিকেলের আলোয়  
স্পর্শহীন শরীর 
ভাঁটফুল গন্ধ  

তবুও এক ভোরে, ধানের শরীর জুড়ে 
হাসি মুখ সূর্যের রঙ, ফিরে আসে মানুষ  

                                       

শর্মিলা ঘোষ

        




অণুগল্প

একটি অবিশ্বাসের জন্ম 


বুকের ভেতরটা কফি কাপের মতো উষ্ণ, ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে চোখ।নীলা বসে আছে সমুদ্র শুষে নেবে বলে।তার এলোমেলো চুল ঝাউপাতার মতো দোলা খাচ্ছে।অমলেশ ছবি তুলতেই ব্যস্ত, সুন্দরী স্ত্রীর দিকে লক্ষ্য তার বরাবরই কম।ইংরেজির প্রফেসর অমলেশ, আর নীলার একটা বুটিক আছে গড়িয়াহাট থেকে একটু এগিয়ে গিয়ে ।
রাকেশ একটু দূরেই ডাব কিনছে, সে চেঁচিয়ে ডাকলো , কি রে অমলেশ ডাব খাবি তো! অমলেশ হাত নাড়লো।রাকেশ দুটো ডাব নিয়ে নীলার পাশে এসে বসলো। নীলা আজ রাতেই কাজটা সেরে ফেলো , কোনো ঝক্কি ঝামেলা হবে না , খুব সহজেই হার্ট অ্যাটাক বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে , তারপর তুমি আমি আর অসীম সমুদ্র....... জলোচ্ছাস । নীলা আবার উদাসী অমলেশের দিকে তাকালো.......অমলেশের সাথে তার কলেজ থেকে প্রেম ছিল আর রাকেশ সেই কলেজ থেকেই তার পিছনে পড়েছিল।অমলেশের উদাসীনতা তাকে রাকেশের দিকে কিছুটা ঠেললেও সে অমলেশকে ঠকাতে চায়নি।অমলেশেকে নীলা সন্তান দিতে পারবে না জেনেও অমলেশ কোনোদিন কোনো অনুতাপ করেনি, অন্তত নীলার কোনোদিন তা মনে  হয়নি।
অমলেশ আসছে ঝাঁকড়া একমাথা চুল এলোমেলো হয়ে আছে, রাকেশের দিকে তাকিয়ে বলে , যা তিনকাপ চা নিয়ে আয়! সঙ্গে বিস্কুট আনিস।
রাকেশ চা নিয়ে আসছে, নীলার মুখটা ফ্যাকাশে আর চোখটা ঝপসা হতে থাকে।
রাকেশ চায়ের ভাঁড় গুলো তুলে দেয় ওদের হাতে;
সমুদ্র যেন ক্রমশ উত্তাল হচ্ছে, আর একটু পর জল ওদের পায়ের পাতা ছোঁবে।আকাশের রঙ এখন ঘন নীল, মনে হয় কে যেন অন্তরের সব অভিযোগ ঢেলে দিয়েছে আকাশের গায়ে।
অমলেশ বিস্কুটে কামড় দিয়ে চায়ে চুমুক দেবে বলে সবে প্রস্তুতি নিচ্ছে ....... নীলা এক ঝটকায় ফেলে দেয় ভাঁড়।
অমলেশের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নীলা, কাঁদতে থাকে, অমলেশ স্থির, অবিচল।রাকেশ ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে , এগোচ্ছে সমুদ্রের দিকে............