সোমবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮

সম্পাদকীয়



সম্পাদকীয় 

মরমী বুকে আহ্বান করি পৌষের ভরা শীত 
এসো প্রিয়তম
সঙ্গমকালে জড়িয়ে ধরি পশমের নিঃশ্বাস 
ঈশ্বরীয় রসে ভরে যাক শরীর 
আর কোন যুক্তাক্ষর নয়
সম্পূর্ণ চিত্র তৈরী হোক আমাদের 


শীতকাল  মানেই হাজারো শব্দ ঘোরা ফেরা করে পৌষের ব্যালকনিতে ।খুঁজে নি  অসমাপ্ত কুয়াশা ,যা ঢেকে দেয় স্বপ্নের আঁচল ৷ বহুদিন পর শীত উপভোগ করলাম নরম চাদরে ৷ বয়স বাড়ছে মনের ৷ সাথে কলমের ৷ কলম আর আগের মত শক্তিশালী নয় ৷ ঋণ বেড়ে চলছে সংলাপের ৷ আমাদের মধ্যে যা রয়ে গেছে তা কি আদৌ পরিশোধযোগ্য ? কত সম্পর্ক দূরে চলে যায় কত কাছের হয় ৷ মূল্যায়ন হয় না কোন কিছুর ৷কতটুকুই বা আমরা পারি ৷ ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাবে ৷  চিহ্ন খুঁজে নেবে পরিসর যা কখনো হবে  না গতিশীল । আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যার ব্যাখা  পাওয়া যায় না বা আমরা চাইও না ৷

ডিসেম্বর আসলেই  খেজুর গুড় ,মোয়া ইত্যাদি ইত্যাদি কথা মনে পড়ে ৷সাথে মেলা ৷ লিটিল ম্যাগাজিন মেলা ,বইমেলা । এই ডিসেম্বরে সৃজন দুই  বছর অতিক্রম করল ৷ প্রথম দিন থেকে যাদের আমরা পাশে পেয়েছি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা অসংখ্য ৷ আমারা প্রকাশ করেছি সৃজনকে  মুদ্রিত আকারে ৷যার নাম " আমার সৃজন 
"সম্প্রতি প্রকাশ হতে চলেছে বই সংখ্যা ৷ ১৩ জানুয়ারি প্রকাশ পাবে বই সংখ্যা লিটিল ম্যাগ মেলায় ৷ আপনাদের ভালোবাসার হাত ধরে আমরা আরো অনেক পথ এগোতে চাই ৷সবাই সৃজনে থাকুন , ভালোবাসায় থাকুন ৷


সম্পাদিকা 
পারমিতা চক্রবর্ত্তী
ঠিকানা - ২৩ ,বিপিন গাঙ্গুলী রোড ,কলি - ৭০০০৫o 

পিয়ালি বসুঘোষ,




#সুপর্ণাদের_একদিন_প্রতিদিন -------------------------------------------- কতোকিছুই নিজের নয় তবু নিজের বলে ভ্রমে বিভ্রমে কেটে যায় দিন, কে যেন বলেছিলো একটা শরীর শরীর তাপ লাগে সেই উৎসাহে গরম জামার নীচে লুকিয়ে রাখি শীত হাত বাড়িয়ে পেড়ে নিই নিভে আসা ধোঁয়ার চিনেকাপ ধূলোমাখা বই হাতে শুকনো মাটির আহত সংকেতে দেখি আলোর প্রমিতি নিভে যাবার আগে ছড়িয়ে থাকে তাচ্ছিল্যের মায়া জানিনা সূর্যেরও কি শরীর আছে ? সময় এগোয় কমলালেবু রোদের লোভে কিন্তু সকাল কখন দিন হয়ে যায় দিন একদিন হয় সেদিন সন্ধ্যে কখন সে-রাতের স্মৃতি হয়ে নীল নীল ক্ষতদের ঢেকে দেয় বাহারি ব্ল্যাঙ্কেটে আমাদের ভিতরঘর নেই গোলমরিচের মতো অন্ধকারে কেবল ঘরের ভিতরে দেখি অনুযোগহীন 'বড়দিনের' কাছে গোটা শীতকাল জমা রেখেছেন একলা ভাস্কর দেখছেন কিভাবে পাতা ঝরে যায় বেপরোয়া সুপর্ণাদেরও .....


যুগান্তর মিত্র

সাপ
………




ভুবনের মনটা কদিন ধরেই এলোমেলো হয়ে আছে। ময়না আজকাল বড্ড খিটখিট করে। কেন যে এত রাগ ওর প্রতি কে জানে ! বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে মাঠের পশ্চিমকোণে, মরা বিকেলে, বকুলগাছের নীচে বসে আছে ভুবন। হঠাৎই সরসর শব্দে পিছন ফিরে দেখে হাত চারেক দূর দিয়ে একটা সাপ চলে যাচ্ছে। শুকনো পাতায় শব্দ তুলে সাপটা নিজের মনেই চলে যাচ্ছিল।

কেমন যেন রোখ চেপে গেল ভুবনের। একটা লাঠিও পেয়ে গেল হাতের কাছে।  লাঠি দিয়ে লেজে খোঁচা দিতেই গতি বাড়িয়ে মাঠের দিকে অনেকটা এগিয়ে গেল সাপটা। ভুবন মরিয়া হয়ে দ্রুত পা ফেলে আবার খোঁচা মারল লেজে। এবার সাপটা ঘুরে গিয়ে ফোঁস করে উঠল, ফণা তুলল কোমর সমান।

~ শ্লা, ফণা তোলোস ? আর চল্লিশ বছর বয়সে আমার সাপের ফণা ওঠে না ! মাজাকি হচ্ছে শ্লা !

সাপ যেন তার ভাষা বুঝতে পারে। তাই মাথা দোলাতে থাকে ফণা তুলেই। চেরা জিভে চেটে নিচ্ছে হাওয়া।

~ আমারে তুই টিটকারি দ্যাস? জিভ বাইর করস হারামজাদা?

সাপটা কী বুঝল কে জানে। এবার মাথা নামিয়ে আবার চলতে শুরু করল।

~ আমার বয়সে আমার বাবা বুইনের জন্ম দিসে। আর আমি শালা এমন অধম …

আবার খোঁচা মারে ভুবন। সাপটা এবারও ঘুরে মাথা তুলে ফোঁস ফোঁস করে। দোলে তার মাথা। লাঠি বাগিয়ে ধরে ভুবন। রাগে কাঁপতে কাঁপতে লাঠিটা সজোরে ছুঁড়ে মারে সাপের গায়ে। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে সাপ। একই জায়গায় নড়াচড়া করে। চলার ক্ষমতা নেই তার।  নেই ফণা তোলার ক্ষমতাও। লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে বারবার আঘাত করে। রক্তাক্ত সাপ ছেঁড়া দড়ির মতো পড়ে থাকে।

~ ফণা তোলোস? এত্ত সাহস তোর?

আচমকা ভুবন টের পায় তার সাপও জেগে উঠছে। ফণা তুলতে চাইছে। শিরশির করে ওঠে তার শরীর।

দ্রুত বাড়ির পথে হাঁটা দেয় ভুবন। ময়না, ময়না রে, অনেকদিন বাদে আমার সাপ ফণা তুলব মনে হয় আইজ। নিজেকেই বলে সে।

রাতে বিছানায় গিয়ে টের পায় তার সাপটা ছেঁড়া দড়ির মতো গুটিয়ে আছে। ময়নাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে সে।

~ রাইতদুপুরে আর নাটক করা লাগব না। চুপ যাও। পাশের ঘরের সব্বাই শুনব। পুরুষ মাইনষের ফণা থাইকতে হয়, ফোঁস থাইকতে হয়। ন্যাতার পারা হলি চলে না। 

ময়না পাশ ফিরে শোয়। অনেক পরে ভুবন ময়নার শরীরে হাত দিয়ে দেখে সাপের শরীরের মতোই ঠাণ্ডা। 

পরদিন সকালে লোক ভিড় করে দেখে বকুলগাছে ঝুলছে ভুবনের রোগা হিলহিলে শরীর। আর অদূরেই শুয়ে আছে রক্ত শুকিয়ে যাওয়া হিলহিলে মরা সাপ।

দেবাশিষ মুখোপাধ্যায়



   The last kiss—
Debasis Mukhopadhyay

On that day, I wanted from you as my last wish
It was nothing precious but an innocent kiss.
You halted at the door, made no promise
Then turned, went away to search for my sis.

I didn’t had time long enough to stay or wait
For me, somewhere, someone opened a gate
Then you came back, bestowed upon my cold lips a kiss
Oh! Dear! That made my journey filled with heavenly bliss.

শোভন বাগ

#আগুন


১.
এক গেলাস চা আর খানকয় লেড়ো বিস্কুট খেয়ে, গেলাসটা ঠক্ করে নামিয়ে রাখলেন পুরুষ্টু বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও হীরক খচিত তর্জনি।
গরিবি খিদের আগুন থেকে পায়রা ওড়ানো বনেদিয়ানায় ফিরে এসে, তাচ্ছিল্যের আগুনে নিজেকে সেঁকে, স্ফটিকের কুঠুরির দরজা বন্ধ করলেন ঠক্ করে।

২.
চায়ের দোকানের ছেলেটি ফেলে আসা ঘরের মায়ায়, না যেতে চাওয়া স্কুলের টানে, ছেঁড়া কাঁথায় মায়ের ওমের খোঁজে, ছুঁড়ে দেয়া ভাতের অনাদরের সাথে লড়তে লড়তে - খিড়কির পুকুর, পুকুরের ওপর ঝুঁকে আসা খেজুর গাছ, পোষা নেড়ি, খেলার মাঠ, শাঁখের শব্দ, বাবা-মা-ভাই-বোন সবার সাথে গা ঘসাঘসি করে না থাকতে পারার ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে, হীরের আংটির প্রতি হিংসায় এঁটো গেলাসটি ঠক্ করে নামিয়ে রাখে ধোয়ার জায়গায় ।

৩.
রাতেরবেলা ফেরার পথে, হীরের আংটি দামি গাড়ির দরজা খুলে, রাস্তার পাশ থেকে তুলে নেয় রঙ মাখা শরীর ।দশ পনেরো মিনিট পর দড়াম করে খুলে যায় দরজা । ছিটকে পড়ে শরীর। যে অঙ্গগুলো একটু আগেও ছিল কামনার, এখন সেগুলো শুধুই কিছু কুৎসিত শব্দ । মুখ দিয়ে সেইসব কুৎসিত শব্দ ওগরাতে ওগরাতে, একরাশ থুথু আর কয়েকটি নোট ছুঁড়ে দিয়ে হুশ করে চলে যায় দামি গাড়ি।

কিছু পরে চুলার আগুনে প্রেসার কুকারে ভাতের ভোঁ ওঠে।

৪.
জড়োয়া গয়না তখন নাইটিটা বুক পর্যন্ত গুটিয়ে তুলে, তুমুল আশ্লেষে কাছে টেনে নিচ্ছিল ছোকরা চাকরকে।
"বল, কী খাচ্ছিস?"
"বল, কী ঢোকাচ্ছিস?"
"বল, কী করছিস?"
অশ্লীলতা আর শীৎকারের শব্দে শরীরের আগুন সুখ খুঁজে পায়। তারপর খুট করে দরজা বন্ধ করে চাকরটা ফিরে যায় নিজের ঘরে ।
মোবাইলে ভেসে আসে, "বাবা, এবারে জমিখান ঠিক ছাড়িয়ে নেব।"

বাবার চাষী-বুকে জ্বলতে থাকা আগুনে শান্তির জল পড়ে।

৫.
বাড়ী ফিরে হীরের আংটি চেপে ধরল কলিংবেল। দরজা খুলে দিল কেউ।
জড়োয়া গয়না শুনতে পাচ্ছে খট খট শব্দটা এগিয়ে আসছে তাদের শোবার ঘরের দিকে।
খুট। খুলে গেল দরজা।
খুট। খুলে গেল আলমারি। আরেকটা গয়না হল জমা।
আরেকটা শব্দ হল। অভিধান বলল, ওটা চুম্বন।

শুধু আগুনটাই যা জ্বলল না।


শুভশ্রী সাহা


মরমিয়া

মনেরে নিয়ন্ত্রণ করা কি অত সহজ
বাউল মন যখন যেমন
এ যে বেজে যায় নিজের মত করে
স্তব্ধতায় মগ্ন থেকে

সাড়া নেই  কোনো গভীর তৃপ্তিতে পুলকে
থেকে থেকে জেগে ওঠে
তবু ছুঁতে গেলেই শূন্য যেন
জানিনা এর কি কারণ

ভাবনারা মেলে দেয় ডানা
নীল আকাশ নেই ছোঁবার মানা
তবু দু পায়ে কিসের বাঁধা
জানি না কি কারণ
অকারণ পুলকে আপ্লুত আমি
ভেসে আছি মগ্নতায়
সব আছে চারপাশে
শুধু আমি নেই আমার মাঝে

জানি না কি কারন, জানিনা কি কারন


২)

মৃত সঞ্জিবনী দিও দেবী আরবার
তোমার চরণ প্রান্তে চুমি একবার
এ কলম তোমার প্রসাদ ধন্য অনুক্ষন
ভক্ত আমি রিক্ত কবি অক্ষরেই দেবী দর্শন।

৩)

ছেঁড়া বিকেল-

বৃষ্টি  স্নাত  বিকেল, গোখেল রোডের গোল মন্দির
ছপে ছপে জলে  নন্দন  ভেজে একলা গম্ভীর

আজ কুছ  আজীব হো যায়ে, অচল ট্রাফিক
দিল মাঙ্গে মোর, অটোতে দেখা পুরোনো প্রেমিক

স্বপন রায়





রিয়া আবার-১৮ # স্বপন রায়
#
যেন হয়, মেয়েলি আসমা ধরে জন্নত, যেন হয় মহিলা আকাশের যা কিছু
ফেরেশ্তা ছুঁয়ে রিয়া
রিয়া?
#
ইংলিশভাপায় যে ফিফথ এভেন্যু রিয়াকে আসন্ন এপ্রিল দেয়
বালুচ র‍্যান্ডম দেয়
রিয়া তার পার্টটাইম টোকা, বাড়ি ফেরে
হেলো হাই আদাব ফেলে দিয়ে
রাস্তায়
যে রাস্তায় রিয়া ইয়াসমিন চারা পুঁতেছিল
আর দেখেছিল একটা কাঠবেড়ালি দৌড়চ্ছে
একটা প্রজাপতি উড়ছে
জন্নত
সেই ছোটবেলার শুধু, জন্নত ছোটই এখনো
#
রিয়া হাসে
রিয়া ভাসে
সূঁচের ডগায় লেগে থাকা কারুকাজের অবহেলা যেন, দুনিয়াবরণ যেন 
...





রিয়া আবার-২০  


#
শেষে পোচ নামে হায় হায়
#
ধোঁয়া ওঠে আঁধারমা
খয়েরে না-ডোবা ভাদুরতা বয়ে যায়
পান বলে, জিও
পাতা গায়, ' আমি যাবো না যাবো না যাবো না ঘরে...'
#
কোন ভয় নেই
চাঁদ লটকে আছে, তালগাছ খচ্‌রামি করছে
রিয়া আবার সাজতে সাজতে পানপাতা হবে কিনা এই সন্দেহে
হি হিম পড়ে যাচ্ছে
ম্যাচোহিম
#
এক পোঁচ দু'পোঁচ কুয়াশা নামে
ডিমের গন্ধ নিয়ে
আমার আবাল গোঁফে তা দেয় পালক না হতে পারা শীষ
কাঁচা পাকা
#
খুব সরু হয়ে নামে পোচ
দখিনামোহনে পৌঁছে...


রীনা রায়




"পিকনিক"
********
মনসিজ এপার্টমেন্টে নন্দিনীরা নতুন এসেছে। এপার্টমেন্টের ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবারের মত এবারেও পিকনিক হচ্ছে।
সকালে সাড়ে সাতটা বাজতে না বাজতেই সবাই রেডি হয়ে ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে গেছে। নীচে নেমে বাচ্চা গুলোর কলকাকলি দেখেই মনটা ভালো হযে গেল নন্দিনীর।
সাদা পালাজো আর ফুলছাপ কুর্তি পড়েছে নন্দিনী। তার ওপর একটা মেরুন লং কোট চাপিয়ে নিয়েছে। বেলার দিকে গরম লাগলে খুলে রাখবে।
নতুন এসেছে বলে এপার্টমেন্টের সবার সাথে পরিচয় না হলেও কিছু জনের সাথে আলাপ হয়েছে।
নন্দিনী খুব চেষ্টা করছে নিজেকে সবার সাথে মানিয়ে নিতে।
ও তো পিকনিকে আসতেই চায়নি।
সৌহার্দ্যর জোরাজুরিতে আসতে হলো। আসলে, ওর কোনো কিছুই ভালো লাগেনা। যেন করতে হচ্ছে তাই করে। জীবনটাকে যেন জোর করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সৌহার্দ্য তো কম চেষ্টা করেনি ওকে ভালো রাখার। কিন্তু নন্দিনী পারে কই সৌহার্দ্যকে কাছে টানতে...

পিকনিক স্পটটা বেশ ভালো লাগলো নন্দিনীর।কৃত্রিমভাবে সুন্দর সাজানো হলেও একটু দূরেই ঘন সবুজ বনানী চোখে পড়ছে। একদিকে সবুজ পাহাড়, পিকনিক স্পটের কাছেই একটা সরু নদী বয়ে চলেছে।
ক্লাবের ম্যানেজার সুমিত জয়সোয়াল সবকিছুর তত্বাবধানে আছে। যাওয়ার সাথে সাথেই গরম কফি, জুস চলে এলো। একটু পরেই টিফিনের পর্ব। এখানেও দু রকম ব্যবস্থা আছে। সাবেকি লুচি আলুরদমও আছে, আবার কেক, ডিমসিদ্ধ, কলাও আছে।
টিফিনের পর্ব মিটলে যে যার নিজের মত আনন্দে মেতে উঠেছে।
ব্যাডমিন্টন, ক্রিকেট, কেউ কেউ নৌকাবিহারে চললো।
পাশের ফ্ল্যাটের অপূর্বদা আর বৌদির খাওয়া নিয়ে খুনসুটি অব্যাহত।
সৌহার্দ্যও ছোটগুলোর সাথে ক্রিকেট নিয়ে মেতেছে। মাত্র দু বছর হল ওদের বিয়ের, নন্দিনীর কিছু ভালো লাগেনা। সব ছেড়ে পালাতে ইচ্ছে করে। ওর মনটাই যে অন্য কারোর।
আনমনে পায়ে পায়ে নদীর ধারে এগোয় নন্দিনী।
আরো বেশ কিছু পিকনিক পার্টি এসেছে।
একটা বল এসে গায়ে লাগতেই চমকে ওঠে ও। বলটা ফেরত দিতে গিয়ে ওর হৃদস্পন্দন থমকে যায়।
সামনে কে দাঁড়িয়ে...ওর ঋত!
আনন্দে দৌড়ে ও ঋতর কাছে যাবার মুহূর্তে এক ঝলমলে তরুণী ছুটে এসে বললো, ''ডার্লিং, একটু তাড়াতাড়ি... চলো, এবার আমাদের টার্ন'', হাত ধরে টানতে টানতে ঋতকে নিয়ে চলে গেল।
এ কে? ঋতর গার্লফ্রেন্ড না বউ? সিঁথিতে মনে হলো যেন সিঁদুর ছিলো! ঋত এরমধ্যেই বিয়ে করে নিয়েছে? বেশ তো খুশিই মনে হলো।
ভালো, ভালো খুব ভালো।
ভালো থেকো ঋত... আমিই শুধু বোকার মত...কান্নাটাকে চেপে
পিছন ফিরতেই দেখে সৌহার্দ্যও কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
''চলো, নৌকায় চড়বে?''
কিছু না বলে ও সৌহার্দ্যর হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিলো।
-------------------------------

ঋষেণ ভট্টাচার্য্য



নারী



যে সমস্ত মহিলাগণ নিম্নবর্ণিত নিবন্ধটি পড়িবার উপক্রম করিতেছেন, অনুগ্রহ করিয়া পাঠপূর্বে সর্বপ্রথম ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়কে প্রণাম জানাইবেন।
ইহার কারণ সেই ব্যক্তিটি না জন্মাইলে আজও আপনাদিগের সম্মুখে অকাল বৈধব্যে দুইটি পথই উন্মুক্ত হইতো, হয় সহমরণ অথবা দেবদাসী হিসাবে সমাজে দেহদান। সদ্যজাত শিশু-কন্যার নগ্ন পশ্চাৎদেশ দর্শনে পিতা নরকগামী হইয়া থাকেন - উক্ত যুগে এমত ন্যক্কারজনক ধারণাও বহুল প্রচলিত আখ্যা পাইতো।
অদ্যাপি আপনাদের পরমতম হিতৈষীগণ ভাবিতেন, স্ত্রী-জাতির বিদ্যাভাসই তরান্বিত বৈধব্যের হেতু। 
অবশ্য কেবল নারীই নহেন, তিনি পুরুষদিগেরও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। প্রকৃত অর্থেই তিনি নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের প্রণম্য।

এ হেন মহামানব, যিনি তাঁহার সমগ্র জীবন অতিবাহিত করিলেন বঙ্গীয় তথা, ভারতীয় নারীমুক্তি এবং উহাদিগের যন্ত্রণামোচনে, যিনি প্রভুত অর্থোপার্জন এবং তাহার সিংহভাগ নির্দ্বিধায় উক্ত প্রয়োজনে ব্যয় করিয়াও শেষ জীবনে সমস্ত ভুলিয়া সাঁওতালপল্লীতে আদিবাসীদিগের সহিত শাকসব্জি চাষাবাদে দিনপাত করিয়াছিলেন।
তাঁর ন্যায় মহাপুরুষের এরূপ সিদ্ধান্তের কারণ তিনি শেষ জীবনে তাঁহার সমগ্র জীবন ও কর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও তিতিবিরক্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন।  আশ্চর্য লাগিলেও ইহাই সত্য বীতশ্রদ্ধার কারণ সেই নারীজাতি! ইহা সত্যই অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক, যে নারীজাতির প্রতি তিনি তাঁর শেষ রক্তবিন্দু ব্যয় করিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, তিনিই শেষ জীবনে তাঁহাদের প্রতি চূড়ান্ত হতাশাগ্রস্থ হইয়া সমাজ ত্যাগ করেন।

সমাজত্যাগ কালে অত্যন্ত ক্ষোভের সহিত তিনি জানাই দেন, তাঁহার জীবনের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ভ্রান্তি নারীজাতির সেবা ও উহাদের উন্নতিসাধনের প্রচেষ্টা। কারণ, তাঁহার মতে যিনি নিজ অবস্থান সম্পর্কে সম্যক সচেতন নহেন, যিনি সর্বদা অদৃষ্ট এবং তাঁহাদিগের চালিকাশক্তির বশবর্তী থাকিয়া কেবল ভিক্ষাপ্রার্থণা করিয়া দিনযাপনকেই আপন নিয়তি হিসাবে মানিয়া লইতে অভ্যস্ত, যিনি কদাপি আপনাকে পুরুষের সমকক্ষ মানিয়ে লইয়া আপন দাবী প্রতিষ্ঠা করিতে অপারগ এবং যিনি সর্বক্ষণ কাহারো ছত্রছায়ায় থাকিয়া নিকৃষ্টতর জীবনযাপনেও সাচ্ছন্দ বোধ করিয়া থাকেন, তিনি আর যাহাই করিয়া থাকুন না কেন, তাঁহার জীবদ্দশায় দুঃখ মোচন সম্ভবপর নহে।
নিজ চেতনা এবং বিবেক জাগ্রত না হইলে যেরূপ নিজ উন্নতিসাধন সম্ভব নহে, তদ্রুপ বাহির হইতে যতই বলপ্রয়োগ করা হউক না কেন উহাদের অবস্থান অনড়ই রহিবে।

এহেন মহাপুরুষের মৃত্যুর বহু বৎসর অতিবাহিত হইবার পর, ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের বহু পরে, বর্তমান যুগে কতিপয় রাজ্য ব্যতিত প্রায় সমগ্র দেশ ভ্রমণ করিয়া যুগপৎ বিস্মিত ও ব্যথিত হইয়া আমি লক্ষ্য করিয়াছি, শহর গ্রাম প্রভৃতি বিভিন্ন জনপদে, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে, কেবলমাত্র আর্থিকভাবে অনগ্রসর, দরিদ্র এবং দারিদ্রের সর্বশেষ সীমায় অবস্থানকারী এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী ব্যতিত আমাদিগের দেশের নারীর অবস্থার সামান্য বাহ্যিক পরিবর্তন হইলেও, অন্তরের প্রকৃত অবস্থানের বিন্দুমাত্র উন্নতিসাধন ঘটে নাই। 

আর্থিক অনগ্রসর ও নিম্ন এবং নিম্নতর ও তম আয়ভুক্ত পরিবারের নারী এবং পার্বত্য অঞ্চলের নারীরা প্রকৃত অর্থেই বর্তমানে আর্থিক শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাধীন হইয়া, পুরুষের মুখাপেক্ষি না থাকিয়া, সংসার তথা তাহাদের সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে দৃঢ় ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ লইয়া চালিকাশক্তি হিসাবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজমত প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইয়াছেন। ইহা ভিন্ন দেশের প্রতিটি শ্রেণীতে অবস্থিত ভিন্ন ভিন্ন নারীর আভ্যন্তরীণ অবস্থান একটি অঙ্গুলিপ্রমাণ অগ্রসর হইয়াছে কিনা ইহা তর্কসাপেক্ষ।
বর্তমান যুগেও স্বোপার্জিতা নারীর উপার্জনহীন অথবা তুলনামূলক নিম্নোপার্জিত পুরুষের সহিত বিবাহ কেবল ব্যতিক্রম হিসাবেই পরিগণিত হইয়া থাকে।

ইহা সত্যই লজ্জার বিষয়, অদ্যাবদি নারীজাতি উহার দাবী অর্জন অপেক্ষা শারীরিক গঠন ও সামাজিক সুরক্ষা এবং সংস্কারের দোহাই পাড়িয়া পুরুষের নিকট দাবী ভিক্ষা ও আশ্রয়দান শ্রেয় মনে করিয়া থাকেন।

নারী বিষয়ক প্রবন্ধ রচনাকালে কেবল দুইটি কথা মনে আসিয়াছিলো।
প্রথম হইলো ইহাই যে, উক্ত মহাপুরুষটির মহানির্বাণের পর উঁহার আত্মা পঞ্চভূতে বিলিন হইবার শত বৎসর অতিক্রান্ত হইবার পরও সহস্র কোটি প্রবন্ধ রচনা করিবার পরেও আমাদিগের দেশের বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় বসবাসকারী নারীগণের প্রকৃত আভন্তরিণ মুক্তি ও অগ্রগতি কতকটা হইয়াছে? যাহা হইয়াছে, তাহাও কী পর্যাপ্ত? আমাদিগের সমাজে নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা, নারী প্রগতি ইহা কী আদৌ আলোচনার স্তরে পৌঁছোইবার যোগ্য?
দ্বিতীয়ত, অপর যে কথাটি মাথায় আসিয়াছিলো, বর্তমান যুগের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, শিক্ষা, নারী তোষণ, ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে কেবল একজন নারীর মুখই মনে পড়িয়া যায়। যে গ্রাম্য নারী আজ হইতে শতবর্ষ পূর্বে সম্পূর্ণ নিরক্ষর হইয়াও, মানসিকভাবে এমত উন্নত মনস্ক ও আধুনিকা ছিলেন, যিনি, এক বিদেশিনী মহিলাকে নিঃশংকোচে এবং নির্দ্বিধায় তাঁহার হস্ত চুম্বনে সম্মতি দান করিতেন।

দারিদ্র অশিক্ষা কুশিক্ষা এবং অন্তরসারশূন্য জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ ও প্রয়োগবিহীন পুঁথিগত শিক্ষা দীর্ণ ভারতবর্ষে আমার চোখে তিনিই আদর্শ নারী, নারী সম্বন্ধীয় প্রবন্ধ অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায় যে মহিয়সী মহিলার নাম স্বীকার না করিলে, যিনি সেযুগেও বিজাতীয় স্পর্শশুচিতাকে জয় করিয়াছিলেন, সেই সারদামণি দেবী।

শর্মিষ্ঠা দত্ত

টেকেন ফর গ্র্যান্টেড 
___________________

ঠিক বিকেল পাঁচটায়  অ্যাকাডেমির সামনে চলে এল ব্রত...আজ নাট্যচিন্তার শো আছে । সাড়ে ছটায় শো । সুরঞ্জনা নিশ্চয়ই এখনই এসে গ্রীনরুমে ঢুকে পড়বে । আলাপ হওয়ার পর থেকে ওর প্রতিটি শোই দেখতে এসেছে ব্রত  , সে তার অফিসে  যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন । ফেসবুকেও  প্রতিদিন চ্যাটবক্সে  গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে একটা প্রত্যাশা জন্মেছিল মনে , তাই সরাসরি প্রেমের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেলেছিল । প্রত্যুত্তরে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা নিয়ে সাতশো একান্ন শব্দের একটা জ্ঞানবহুল মেসেজ দিয়ে তাকে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লক করেছিল সুরঞ্জনা । 

ক্যাবটা আজ প্রায় সবকটা  সিগন্যালে আটকাতে আটকাতে অবশেষে পাঁচটা ঊনত্রিশে  অ্যাকাডেমিতে পৌঁছালো । গ্রীনরুমে ঢুকেই ডিরেক্টর মানসদার বকুনি খেতে হবে আজও । ওঁর দোষ নেই ...নাটকের প্রধান চরিত্রই  যদি সময়মতো উপস্থিত না হয় তাহলে টেনশন তো হবেই । এর মধ্যেই চারবার কল  এসে গেছে সুরঞ্জনার ফোনে ,  ক্যাব থেকে নেমে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল সুরঞ্জনা। 

গেটের সামনে আবার এসে দাঁড়িয়েছে ব্রত মিত্র নামের সেই  ছেলেটা , বিরক্তিতে সুরঞ্জনার মুখটা কুঁচকে গেল । হাতে আবার চকোলেট আর গিফটের প্যাকেট ! সাহস তো কম নয় ! ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছে ...তবু ! দেবে না কি  রামধোলাই ! সময় নেই অবশ্য । বন্ধু শর্মিলী আসবে আজ , সকালে ফোন করে বলছিল । ঝাড়ের  দায়িত্বটা ওকেই  দেওয়া যাক ...শর্মিলীর নম্বরটা ডায়াল করার  আগেই সুরঞ্জনা দেখতে পেল  বাঁ দিক থেকে শর্মিলী এগিয়ে যাচ্ছে ব্রতর দিকে ,  "সরি , দেরি হয়ে গেল গো ...অনেকক্ষন এসেছ ? "

গিফট আর চকোলেট ওর হাতে দিয়ে , হাত ধরে রাস্তা ক্রস করে মোহরকুঞ্জের দিকে  যেতে যেতে  ব্রত বলল  , "তুমি একেবারে পারফেক্ট টাইমে এসেছ শর্মিলী ..."

বুকের ভিতর একটা কাঁটা খচখচ করছে ...অপমানের নাকি বিশ্বাসঘাতকতার !  ধীর পায়ে গেটের ভিতর  মোরামের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল সুরঞ্জনা...