সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সায়ন্ন্যা দাশদত্ত

 


সংগীত


যে অন্ধ মেয়েটি শিখেছে গান। সারে গা অথবা মা তে থমকে দাঁড়িয়ে রইল বিকেল। চিঠি আসতে পারে। আকাশে মেঘ। আর তিনটে চব্বিশ বাস। হর্ন বাজলো। মেয়েটির নাম রেণুরানী আদক। ইস্কুলে নাম নেই। দুপুর গড়ালে ঝিঁঝিঁ চাদর খোলে। কালভার্টে দাঁড়িয়ে পড়া যুবক। গোঁফ উঠেছে। গোপনে সেদিন বুকে পেড়েছে হাত। ঘোরানো হাত। সঠিক পুরুষ নয়। সদ্য ওঠা গোঁফের মতো নরম। রেণুবালা কি গান রেখেছো বুকে??
স্তন নেই,
আদিঅনন্ত আনন্দলীলা বাজে। সংসার নেই। রেণুবালারা অন্ধ যেমন মানুষ। এসেছে লীলায় বাঁধন তেমন নয়। বাজো সংগীত। অন্ধ এ বুকে বাজো।

শম্পা মাহাতো

 






স্বপ্ন


আলোকবর্ষ অতিক্রম করেও আলো আসে।

ছুঁয়ে থাকে। কখনওবা মায়ের আদর হয়ে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না। জড়িয়ে ধরে। 


দুঃখভাবনার গায়ে লতানো গুল্মের মত লেপ্টে থাকা ভয় থেকে কোনওমতে পাশ কাটিয়ে এগোতে গিয়ে মুখোমুখি হই স্বপ্নের।


আমার বন্ধুর নাম স্পর্শ। ধর্ম অস্পৃশ্যতা। আমি হাত বাড়ালেই স্পর্ধা চোখ রাঙাচ্ছে। দেখো ভুল। দেখো ভুল করছি বারবার আর ভালোবাসা প্রতিশোধ নিচ্ছে। ফুরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত যতটুকু জ্বালানি। নিজস্ব। তার ওপারের আগুন নিয়ে খেলা করছে। হাসাহাসি করছে সময়।


বর্ষা বাড়ন্ত হলে লেখার ওপর ঝরে পড়ছে মায়ের চোখের জল। যার নিকট নেই। দূর নেই। সবটাই শুধু আছে। সূর্যের মত চিরসত্য হয়ে।


তবু অন্ধকার

লুট করছে আমায়।

----------


ধন্যবাদ


 



সব্যসাচী মজুমদার


 


হঠাৎ সবই শীতের মতো এল 

 


হঠাৎ সবই শীতের মতো এল ।
পাহাড় থেকে দেখতে পেলাম খাঁই,
কুয়াশাহীন তেন ও ত্যক্তেন…
আমার তুমুল পশুপাখির চাই ?

খাচ্ছে ওরা ! চাটছে ওরা স্বাদ ?
ওদের ছায়া অবশ্য উদ্বায়ু ।
স্পষ্ট আলোর জন্যেও সংঘাত 
বাড়ছে বলে সতর্ক হয় স্নায়ু…

তারপরে ঢেউ পাল্টে দিতে এল 
ভূতের মতো অসংখ্য হাত-ঘড়ি…
এইখানে তোর বহুত্বে উদ্বেলও
বুঝতে পারে সমস্ত মঞ্জরী !




বৈদূর্য্য সরকার

 


অপ্রচলিত 





কার সাথে হয় ভাব কাকে ছোঁড়ো ঢিল
সব জানতে পারলে জীবন অন্যরকম হতো,
'বৃষ্টি আসলে ঠিক নদীতে ভাসাবো সাধের নৌকা...'
এতো পর্যন্ত লিখলে কেউ বলবে এসকেপিস্ট ;
কত কাজ পড়ে আছে, হয়নি যা কথা হয়েছিল
ব্যর্থতা পাহাড় জমে হারিয়ে গেছে বাঁচার পথ ।
কার সাথে বৃষ্টি সন্ধে কতদূর একসাথে হেঁটে 
বহু ঠেক ঘুরে অনেক ঘাটের জল; সংসার সফরে
থমথমে মেঘ আর রিমঝিমে পেগ বললেই
কেমন যেন একটা অন্তঃমিল, 'লিরিক প্রবণ
হওয়ার বয়স কি আছে' বৃষ্টিদিনে প্রশ্ন ছিল, 
প্রশ্ন ছিল অনেকরকম যৌবনে মনকেমন 
প্রতিদিন আশায় থাকা তোমার ; যুগ পার করে
উত্তরের অবকাশ হয় না কারোর আজকাল। 
চিৎপুর সন্ধে ট্রাম ফিরিয়ে আনে কি মন্ত্রবলে
রয়্যাল থেকে যেই আমরা চাঁব খেয়ে বেরিয়েছি
বৃষ্টি নেমে পড়ে, আতর অতীতে হলুদ ট্যাক্সি ভরসা
কথা ফুরিয়ে এলে দেখেছি কোথায় হারায় মায়া। 
বৃষ্টিদিনে রবিঠাকুর খিচুড়ি ছাতার বাহার
সব গিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদা জুতো প্যান্টে মাখামাখি, 
বুঝতে পারি বৃষ্টি হাঁটার দিন ফুরোলে এমন 
বিরক্তিকর লাগে নিজেকে, ক্যাসুয়াল লিভ কিংবা
ঘরে বসে বৃষ্টি দেখার ইচ্ছেরা ক্যাপসুল গিলে
নিত্যদিন নিম্নচাপে খরচা করে গোপন কথা,
নিরপেক্ষতা আসলে একটা বিরাট বড় ঢপ
বুঝে ফেলার পরেও প্রতিটি মন্বন্তরের শেষে
বৃষ্টিদিনে কতবার তার কাছে পেতেছি দু'হাত,
তারপরে প্রতিটি মানুষ অনর্গল তর্ক করে । 

শর্মিলা ঘোষ

 




সম্পর্কের উষ্ণায়ন


বিশ্ব উষ্ণায়নের মতো বাড়ছে সম্পর্কের তাপমাত্রা ,
শৈশবের নিরেট নির্ভেজাল সম্পর্ক কাঁচের ঘরের মতো ভেঙে গেছে,
হ্যাঙারে টাঙানো ব্যথা আমরা ঝেড়ে পুছে গুছিয়ে রাখছি মনের আলমারিতে,
আমাদের ভেতরের রক্ত ক্ষরণ লুকিয়ে রাখছি গ্ল্যামারাস প্রোফাইল পিকচারের চমকে,
প্রকৃতির গভীর অসুখের মতো দূরত্বের অসুখ পিছনে ফেলে লং ড্রাইভে ছুটে চলেছি.......
এর শেষ কোথায় আধুনিক বিশ্ব জানেনা,
সুখের ওপর জি এস টি বসিয়ে মূল্যায়ন করছি সময়ের।
মায়া শব্দটা ডিকশনারি থেকে মুছে দেবার চেষ্টায় একে অপরকে অতিক্রম করে চলেছি .........

কৌশিক সেন


 বনসাই

 

তোমরা যখন মেঘের গল্প বল,

গোপের বালক আপনি বাজায় বাঁশি

শ্যামল দু’চোখ আপনি টলোমলো

ঠিক বুঝেছি, সে কোন সর্বনাশই!

 

দুষ্টু আকাশ কলমা পরে চোখে

উপচে পড়ে দু’পাড় ছলাচ্ছল,

কদম্ববন ঢাকলে সুরলোকে

আরেকটু পর থামলে কোলাহল।

 

সুর লেগেছে নিভন্ত কিংশুকে

স্বপ্নঘোরে অবাক ধুলোবালি

তোমরা যাকে মেঘ বলেছ সুখে,

তাকেই বলি পদ্য লেখার কালি।

 

শোক জমেছে কাজলাদীঘির পাড়ে

নাগকেশরের পাতায় ভেজে রোদ

আলগা পাঁজর বেঁধেছে মাল্হারে

তবুও কোথাও ভাঙছে প্রতিরোধ।

 

তোমরা যাকে স্পর্শসুধা বল

একলা ঘোরে যত্নে রাখি তাই,

তোমরা যখন মেঘের কথা বল

আমার ঘোরে ভিজেছে বনসাই।।

 

 

বহুদূরের বিন্তিকে...

 

ডুব দিয়ে দেখা তোর নামে যত শব্দ

কথা উড়ে গেলে ধরে ফেললেই পারতিস

কাটা ঘুড়ি মেখে মেঘেরা বিপ্রলব্ধ

চিঠি হয়ে যাক আকাশের যত আর্তি।

 

দুটি জুঁইফুল, টুলটুল করে সন্ধে

টিমটিম জ্বলা তেলকুপিটাই ভরসা

নীলাভ জ্যোৎস্না উঁকি দেয় কটিবন্ধে

দুটি গলি ছেড়ে তোর নামে ছিল বর্ষা।

 

আচমন সারা ফোঁটা ফোঁটা যত ঝুমকো

রতি রতি দাম গড়ালে বিকেল সন্ধ্যায়

কুচিকুচি কাচ, অভিমান যত ঠুনকো

প্রতিপদ ঢাকা নিবিড় রজনীগন্ধায়।

 

তবু সাঁতারের, ডুব সাঁতারের দিনটি

মৌসুমি বায়ু সব জানে অনাসৃষ্টি

ছাতা ভুলে গেছি। জানতিস বল্ বিন্তি

দুটি গলি পর... আমি, তুই আর বৃষ্টি!!

 

শ্রীলেখা মুখার্জ্জী

 



আফসোস

উদযাপনের তেমন কিছুই নাই
হাতের মুঠোয় প্রাত্যহিকীর ভোর
পেলব ঘাসে আরাম খোঁজাটাই
আগল খুলে উদোম হাওয়ার জোর

পূরবৈয়াঁয় জুঁইলতাটির দোল
থমকে গেছে দিন পেরিয়ে রাত
ফুল ঝরিয়ে বিষাদমগ্ন কোল
নিমগ্নতায় গভীর গিরিখাত

বর্ষা ছিল নিবিড় ব্রীড়া স্নান
বর্ষাতিতে মুখচোরা সেই তাপ
ছিল মুখর বাদল দিনের গান
মিইয়ে যেত ক্যাপুচিনোর কাপ

এখন কেবল রাত মোহনায় দিন
ঋতুরা সব রেলিং ছুঁয়ে চুপ
মেঘ যে এখন গল্প কথা হীন
ঝরার নেশায় জলফোঁটা টুপটুপ

বারান্দাতে অস্তগামী রোদ
দীঘল ছায়ার মর্মে পিছুটান
কী জানি কোন ধার হলো না শোধ
সব খুইয়ে বৃথাই মাপি ধান

অর্ঘ্য নাথ


 বৃষ্টিহীন সেই ছেলেটি 



লড়াইটা কেউ দ্যাখেনা
দ্যাখে দৃশ্যমান সুখ,
রক্তটা কেউ দ্যাখেনা
দ্যাখে লক্ষ্মীঝাঁপি মুখ।
কীভাবে একটা ছেলে বৃষ্টিহীন
একা বড় হয়,
ভেজা চোখে গোসাপের গর্ত দেখে
পেরিয়ে যায় মেঘলা কাদা মাঠ,
একটা জগৎ তৈরি হয়
নিজেদের একটা বকুল গাছ -
কেউ সেটুকু দ্যাখেনা।
শুধু আগুন আরো আগুনে মরে
অসভ্য গ্রীষ্মে ফুলে ফুলে ওঠে -
কোন ম্যাজিকে ছেলেটা
বড় গাছে ফুল ধরায় 
স্বরবৃত্তে বৃষ্টির দেশ !

পৌলমী ভট্টাচার্য

 


সূক্ষ্ম দ্বীপ, আমি এবং নান্দনিক ভূগোল



আদবকায়দা মেনে ঘর বাঁধা যায় না ... 

এমনটাই স্বপ্ন জড়ানো দ্বীপে গচ্ছিত থাকে বিস্তর নুড়ি সংলাপ ।

'ভালবাসা বলে কিছু নেই?'

প্রশ্নহীন সাম্রাজ্যে অজানা চিহ্ন নিষিদ্ধ ; -- বক্তব্য আত্মিক যুবরাজের।

তার পকেট ভর্তি উদভ্রান্ত বর্ষা,
চুলে চুলে হাঁটে পদাতিক সন্ন্যাস।
বালিকা-বেভুল বেশে মেঠোচারিণীর কুসুম কুসুম প্রলাপ যেন সারং ঘরানায় দৈবাৎ আলোর বিপর্যয়;
তবু, অশিক্ষিত এবং উড়নচণ্ডী নুনের ভিড়ে মিশে যায় কবি পরিচিতি ।
এখানে তেমন কানপাতা দায় হয় নি আজও অথচ মৌমাছিদের সংসারে সাজানো আছে সবুজ বনবিবি।
বাহানায় তুমি দূরে যাচ্ছ সমুদ্দুর...
নির্জনতায় হাসে সূক্ষ্ম দ্বীপ ,
                                  আমি এবং
                           নান্দনিক ভূগোল।

স্বাধীন চেতনার বশে ভালোবেসো না যেখানে নাক দুল হাতিয়ে নেবে শ্মশান-বিভূতি।




রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

সৌমী আচার্য্য

 

                




শ্রাবণের ধারার মত



শেষ পর্ব

ঊশ্রীকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে এসে নিজেকে হঠাৎ অনাথ মনে হল দেবপ্রিয়ার। বাবা চলে গিয়েছিলেন যখন তখন সে সবে সেভেন, কষ্ট হয়েছিল কিন্তু মায়ের আঁচলের নীচে কখনোই অনাথ মনে হয়নি নিজেকে। অনুজ চলে গেলেও তেমন মনে হয়নি আর মা চলে গেলে ভীষণ ফাঁকা লাগলেও ঊশ্রী যেন জড়িয়ে নিয়েছিল সবটুকু। আজ সারা বাড়ি জুড়ে নৈঃশব্দ‍্য তাকে গিলতে আসছে। চলে যাবার আগে একটা সাংঘাতিক কাজ করেছে ঊশ্রী যার কোনো আভাস বা কল্পনা দেবপ্রিয়ার ছিলনা। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে ঝোড়ো কাকের মত মেয়ে ফিরেছে। চোখের জলের দাগ তখনো লেগে রয়েছে। দেবপ্রিয়া পড়ছিলেন। দ্রুত উঠে এসে মেয়ের কাছে আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।

-সব আড়াল আজ ভেঙে দিলাম মা। সব আড়াল। এতদিন লড়াইটা আমাদের ছিল। এবার ওদের পালা।

-কী হয়েছেরে মুনিয়া? 

-আজ জোনাকমাসির কাছে গিয়ে নিজে সব বলে এসেছি। সাথে বন্ধুদের নিয়ে গিয়েছিলাম। ওদের বাইরে দাঁড় করিয়ে ভেতরে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম যদি শুনিস বেশি চিৎকার চ্যাঁচ্যামেচি হচ্ছে এই বাড়িতে সোজা ঢুকে আসবি।

দেবপ্রিয়া স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছে শুনে। কী করে করল মেয়েটা এমন! সব বলে দিল সব! সোফায় ডুবে রয়েছে। ঘোরের ভেতর বলেই চলেছে বিড়বিড় করে।

-মাসির জন্য কষ্ট হচ্ছিল খুব তবু বলে এসেছি। আর কতোদিন এভাবে ভয় পেয়ে বাঁচবো? ঐ বরুণ দত্তের চোখে চোখ রেখে বলেছি আমার ছবি ভাইরাল করুন আপনি, তারপর আমি পুলিশে জানাব সবটা। আমার মায়ের জীবন নিয়ে কী ভাবে খেলছেন সেটাও বলবো।

দেবপ্রিয়া আজ আর কাঁদতে চায়না। লবণস্রোতে জীবন যার তার নতুন করে আর কান্না আসে না। চুপ করে থাকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। ঊশ্রী হঠাৎ যেন ঝলমল করে ওঠে, 'মা আমি অনেক আগেই এটা করতে পারতাম, করা উচিৎ ছিল। আমার নিজেকে হালকা লাগছে মা। বোধহয় দীপ্তার্ককে এবার একটু স্পেস দিতে পারবো।' নতুন চরিত্রের আগমনে নড়ে বসে দেবপ্রিয়া। মায়ের কৌতূহল লক্ষ্য করে ঊশ্রী বলে, 'এমন কিছু না। হ্যাণ্ডসাম একটা ছেলে ঐ পুলিশেই চাকরী টাকরী করে। ডিজি ফিজি কিছু একটা হবে। ফেসবুক থেকেই আলাপ। একটু বেশি এ্যাটেনশান দিচ্ছে মাস ছয়েক তাই বললাম আরকি।' হেসে ফেলে দেবপ্রিয়া। যদিও ঊশ্রী কথা থামায়নি।

-মরুণকিশোর আছেন বলেই তুমি যাচ্ছো না মা! উনি কিন্তু আজো তোমায় ভোলেননি। কত বছর আগের কথা একবার ভেবে দেখো। আশ্চর্য জানো আমার চোখে উনি যেন তোমাকেই দেখছিলেন। তুমি আমার সাথে আসলে ভালো করতে মা। হয়ত একটু শান্তি পেতে, ভালো লাগত তোমার।

-মুনিয়া, মরুণ আমাকে কেন ভালোবেসেছিল? কতটা ভালোবেসেছিল আমি জানিনা। জানতে চাইওনা কারণ আজ আর তার কোনো মানেই হয় না। এই বয়েসে হৃদয় অপর কারো দুঃখের কারণ হবার দায় নিতে চাইবে না বোধহয়। তাছাড়া আমার এখানে কিছু কাজ আছে। সেসব না মিটিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। যদিও যাবনা কখনো একথা বলছি না।

-বেশ তোমার যা ইচ্ছে। তবে আমি বেশিদিন তোমায় ছাড়া থাকতে পারিনা এটা মনে রেখো।

মেয়েটা নিজেকে ঠিক সামলে নিল। চারিদিক কেমন যেন শান্ত হয়ে আসছে। এই ফাঁকা বাড়িতে একাই থাকতে হবে এখন থেকে। দিন কারো জন্য বসে অপেক্ষা করেনা। বয়ে যায়। ঊশ্রী যাবার পাঁচ ছদিন পর ছেলেটা এল। বেশ উঁচু লম্বা গায়ের রঙ ঈষৎ চাপা তবে তিক্ষ্ণ চোখ। বসার ঘরে কথা হল ছেলেটির সাথে। দেখা মাত্রই দুহাত তুলে নমস্কার জানাল বেশ কেতাদুরস্ত। বসতে বলল দেবপ্রিয়া।

-আমি দীপ্তার্ক সেন। ঊশ্রী আমাকে আপনার সাথে দেখা করতে বলেছিল। আমি কোলকাতায় এসেছি একটা বিশেষ কাজে। আজ এই বেলাটা অবসর আছে তাই এলাম।

-বেশ করেছো। আমাকে ফোন করেছিল মুনিয়া। তোমার পোস্টিং এখন কোথায়?

-কার্সিয়াং...

-বাহ্ সুন্দর জায়গা। মা বাবা কী তোমার সাথেই থাকেন?

-না মা বাবা থাকেন ব্যাঙ্গালোর। বাবা এখনো ইন সার্ভিস। মা প্রফেসার ওখানেই একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আছেন।

-বাহ্ খুব ভালো। 

ছেলেটি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। দেবপ্রিয়া ওকে দেখতে থাকতে মন দিয়ে। এরমধ্যে ধলিদি চা, কুকিজ, কেক, কাজুবাদাম রেখে যায়। 'তুমি কিছু বলবে?' দেবপ্রিয়ার প্রশ্নে একটু চমকে ওঠে ছেলেটি। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বলে, 'আমি ঠিক জানিনা কী ভাবে কথাটা বলা উচিৎ। আসলে ঊশ্রী আমায় সবটা শেয়ার করেছে। সবটা। গত কয়েক মাসে ওর জীবনের সবটুকু আমায় বলেছে। আপনাদের সকলকেই আমি চিনি ওর কথা থেকে। দেখুন ম্যাম বরুণ দত্তের বাড়িতে যাবার সাজেশনটাও আমার। এখন বিষয় হল ঊশ্রীর ধারণা হয়েছে আপনার এই একা থাকাটা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। মানে বরুণ দত্ত মরিয়া হয়ে কিছু একটা করতেই পারে। ম্যাম আপনি ঊশ্রীর কাছে আপাতত কেন যেতে চাইছেন না সেটাও আমি জানি। এখন বিষয় হল আমি পরশু কার্সিয়াং ফিরে যাচ্ছি। আপনাকে এভাবে একা রেখে যেতে চাইছি না।' দেবপ্রিয়া অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। কে এই ছেলে? এত মায়া দিয়ে একথা বলছে কী করে? অধিকারটাই বা কী? ঊশ্রী ওর বিশেষ বন্ধু যদি হয় তাতেও কী এতটা উদ্বেগ স্বাভাবিক?

-আমায় ভুল বুঝবেন না ম্যাম। আসলে ঊশ্রী এত চিন্তিত থাকলে কাজ কিছুই করতে পারবে না। ইনফ্যাক্ট আমার মনে হয়েছে ও যে কোনো মুহূর্তে কাজ ছাড়তে পারে। রাতে তো ঘুমাচ্ছেই না। ওর রাত বাড়লে আতঙ্ক বাড়ছে।

-তোমায় বলেছে এসব ও?

-না ম্যাম বলেনি, তবে টেক্সট করেছে। আমি সকালে দেখেছি। আমি বলি কি আপনার তো নতুন লেখা শুরুর জন্য একটা চেঞ্জ দরকার চলুন না আমার সাথে। ভালো লাগলে ওখানে থেকে যান কয়েক মাস। প্রথমে আমার বাংলোয় উঠুন পরে নয় একটা ঘর ভাড়া করে নেবেন পছন্দ মতো। এতে মেয়েটা একটু স্বস্তি পায় এই আরকি।

-তুমি তো বেশিদিন ঊশ্রীকে চেনোনা দীপ্তার্ক। এতটা ওর জন্য ভাবছো কী করে?

-সন্তান গর্ভে আসা মাত্র মা তাকে ভালোবাসে, না দেখে না জেনে, দশমাস তাকে শুধু অনুভব করেই জীবনে শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে গ্রহণ করে তবে একটা মানুষকে দেখে জেনে বুঝে সাতমাসে এটুকু ভালবাসা যায় না ম্যাম?

-কী সহজে বললে তুমি। তোমায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। বেশ আমি কাল তোমায় জানাচ্ছি। তুমি কখন ফ্রি হবে কাল?

-কাল ফ্রি হয়তো হব না তবে আমার লোক থাকবে আপনার এখানে।

-আমি যে ক্রমশ ভিআইপি হয়ে উঠছি।

-হওয়াই তো উচিৎ ছিল। এতদিন কেন হননি সেটাই ভাবছি। 


দীপ্তার্ক চলে গেলে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল দেবপ্রিয়া। একটা ফোন করল খানিক পর।

-কেমন আছো?

-ভালো আছি। তুমি?

-আমি বোধহয় এবার ভালো থাকব। তোমায় একটা কথা জানাতে ফোনটা করেছি।

-হ্যাঁ বলো।

-আমি কোলকাতা ছেড়ে যাচ্ছি অনুজ। একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছি। দেখি জীবন নতুন কিছু শুরু করতে দেয় কিনা।

-কোথায় যাচ্ছ?

-সত্যি তুমি জানতে চাও? কিন্তু কেন?

-না ঠিক আছে না বললেও চলবে।

-আমি কার্সিয়াং যাচ্ছি। যে শহরে তুমি নিয়ে যাবে কথা দিয়েছিলে।

-অথচ কখনো নিয়ে যাইনি। ভালো থেকো। ঊশ্রীর কাজে মন বসছে তো? ফোন করলে ধরো।

সত্যিই যে কোনদিন সব ছেড়ে যাওয়া যেতে পারে দেবপ্রিয়া ভাবিনি। কেয়ারটেকার রনেন ছাড়া সবাইকে দুমাসের মাইনে সহ ছুটি দিয়ে দিল। চলে এল অচেনা এক ছেলের হাত ধরে কার্সিয়াং। ছোট্ট বাংলোর ডানদিকে দীপ্তার্ক থাকে বাঁয়ে দেবপ্রিয়া। বাংলোর চারিদিকে পাইনঘেরা উঁচুনীচু জমি। নাম না জানা ফুলের সমারোহ। একটা পাহাড়ের প্রায় মাথার কাছাকাছি বাংলো। সামনে দিয়ে বড় রাস্তা চলে গিয়েছে। ওপাড়ে যতদূর চোখ যায় উঁচু নীচু পাহাড় আর তার মাঝেমাঝে গ্রাম। রোজ ভিডিও কলে কথা হচ্ছে মেয়ের সাথে। মেয়ে আনন্দে আটখান। গতরাতে ঘুম ভেঙে গেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের কথা শুনেছে দেবপ্রিয়া।

-ম্যাডাম এবার নিশ্চিন্ত তো! আর কোনো হুকুম?

-ভাবছি ভেবে বলছি। 

-আমাকে নিয়ে কিছু ভাবলেন?

-হুম্! আমার মায়ের পাশে আপনাকে বেশ মানাচ্ছে। ফেসবুকের ছবি দেখে একটু পোড়া গন্ধ পেলাম নিজের দীর্ঘশ্বাসে। আসলে মহিলা এখনো বড্ড সুন্দরী।

-তা ঠিক তবে লেখিকার সাথে প্রেম করার মতো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান আমার হয়নি ম্যাডাম। তাছাড়া উনি একটু বেশিইই সুন্দরী । আমার আরেকটু কম সুন্দরী পছন্দ।

-মানেটা কী? আমি সুন্দর না?

-না না সুন্দর তবে একটু কম।

-যাও কথা বলবো না। তুমি বাজে জঘন্য। 

-একটা কথা বলবো ম্যাডাম? একদিনের জন্য আসবো আপনার ওখানে? আপনাকে একবার জড়িয়ে ধরেই পরের প্লেনে ফেরৎ আসবো, পারমিশান দেবেন এই জঘন্য লোকটাকে। বড্ড ছুঁতে ইচ্ছে করছে ঊশ্রী। তোমার ঘাড়ের কাছের লালচে তিল আর...

আর দাঁড়ায়নি দেবপ্রিয়া ঘরে চলে এসেছে। সারা শরীর জুড়ে ভীষণ অতৃপ্তি তাকে ভেতর থেকে নিংড়ে নিয়েছে বারবার। আজ ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে কেবল সে রাতের কথাগুলোই মনে পড়ছে। কোনো মানুষের বিশেষ আগ্রহের কারণ হয়ে বেঁচে থাকায় কী ভীষণ তৃপ্তি। কতদিন কতদিন হল সে বৃষ্টিভেজে না! পাহাড়ের যে বাঁকটায় ধাপে ধাপে চা বাগান শুরু হয়েছে। সেখানেই রোজ চুপ করে বসে থাকে। যতদূর চোখ যায় সবুজ মনোরম শোভা। এখানেই একসাথে থাকবে কথা ছিল দুজনে। তবু অনুজ কিসের টানে সব ছেড়ে চলে গেল কে জানে সে কথা? সবাইকে যে ভালোবাসে তাকে ভালোবাসার মত যোগ্যতা হয়ত দেবপ্রিয়ার ছিলনা। আর ঐ যে এক কিশোর তাকে আজো বাঁচিয়ে রেখেছে তাকেই বা সে ভালোবাসতে পারেনি কেন? কে জানে এই উত্তর? জীবন বয়ে চলে নিজের ছন্দে। আকাশ জুড়ে মেঘ আসে আপন খেয়ালে। একা মানুষী মধ্য যৌবনে হেঁটে যায় এই আশায় শ্রাবণের ধারার মতো কারো ভালোবাসা অঝোরে ঝরবে তার কল্পনায়। সে প্রেম বাঁচিয়ে রাখবে সে অক্ষরে অক্ষরে। নিজের সবটুকু অতৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে। ভালো থাকুক অনুজ, ভালো থাকুক মরুণকিশোর। ভালো থাকুক ঊশ্রী ভালো থাকুক তার সদ্য প্রেম। দেবপ্রিয়া হেঁটে যায় পাহাড়ি পথের বাঁকে একা।