শনিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২২

অমিতাভ সরকার

                


।।পোড়া_দাগ।। 
                                       
 
টেবিলের সামনে পুরোনো গোল ঘন্টাটা চাপড় মেরে ডাক্তার'দি বললেন; "পরেরজনকে পাঠিয়ে দাও..."  
“কেমন আছেন গো দিদি?” এক গাল হেসে দরজা খুলে ঢুকলেন একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা, সঙ্গে চকলেট রঙের বোরখা পরা একজন। চেম্বারে ঢুকে মুখের ওপর কাপড় সরাতেই দোলনচাঁপা রঙের ঢলঢলে ডাগরচোখের একটি মুখ দেখা গেল। খুব চেনা চেনা মনে হলো ডাক্তার'দির। কোথায় যেন দেখেছি… কোথায় যেন দেখেছি… ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে গেল, কিছুদিন আগেই দেখেছে তাকে। তখন অবশ্য কনের সাজে ছিল মেয়েটি। 
“ভালো আছি গো। ছেলের বউ না? প্রথমে ঠিক চিনতে পারিনি!” হাসলেন ডাক্তার'দি। 
“হ্যাঁ গো দিদি, আপনি তো গিয়েছিলেন…” 
 # 
ডাক্তার'দি এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে সপ্তাহে দু'দিন এই চেম্বারে বসেন। বেশিরভাগ মানুষের, বিশেষতঃ আশপাশের অঞ্চলের মহিলাদের ভরসা এই ডাক্তার'দি। এমবিবিএস পাশ করে পরিচিত একজনের সুত্রে এই অঞ্চলে এসে প্র্যাকটিস করা শুরু করেন তিনি। তারপর সকলের ভালোবাসায় বাঁধা পড়ে যান। প্রায় কুড়িটা বছর নানান প্রলোভন সত্বেও চলে যাওয়ার কথা ভাবেননি। এলাকার মানুষও আপন করে নিয়েছেন তাঁকে। বাড়ির সবজি বাগানের প্রথম ফলন, উৎসবে সিমাই-পায়েস, পিঠে-পুলি, তালের বড়া ডাক্তার'দিকে না দিলে মন ভরে না তাঁদের।   
ডাক্তার'দি এখান থেকে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার দূরে জেলা সদরে থাকেন। স্বাভাবিক ভাবে ইচ্ছে থাকলেও প্রতিদিন আসা সম্ভব হয় না। এই দুইদিন সকালে চেম্বার খোলামাত্র নাম লেখা শুরু হয়। জেলা শহর থেকে ডাক্তার'দির আসতে আসতে প্রায় সকাল দশটা-সাড়েদশটা বেজে যায়। সারাদিন রুগী দেখা শেষ করে রাত্রি সাতটার আগে বেরতে পারেন না।  
এলাকাটি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের সংখ্যাধিক্য। মহিলারা নিছক দায়ে পড়া ছাড়া দেখান না পুরুষ ডাক্তারদের। সেরকম প্রয়োজন হলে মহিলারা এই ডাক্তার'দিকে দেখানোর জন্য জেলা সদরে বাড়িতে হাজির হন। 
#
ডাক্তার'দি সাদরে মহিলাকে উল্টোদিকের চেয়ারে এবং পুত্রবধূকে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন;
“বলুন বৌদি, এবারে কার সমস্যা? আপনার, না ছেলের বৌয়ের?”  
“না দিদি, আমারই। বেশ কিছুদিন হলো…”। প্রাথমিক সমস্যা এবং উপসর্গ জানার পর ডাক্তার'দি পাশের ছোট্ট এন্টিচেম্বারে অবজারভেশন টেবিলে শুয়ে পড়তে বললেন ভদ্রমহিলাকে। পর্দাটা টেনে দিয়ে ভদ্রমহিলার সামনে এসে পেট থেকে কাপড় সরিয়ে মন দিলেন পরীক্ষায়। পেটের উপর একটা হাতের তালু রেখে তার ওপর আর এক হাতের তালু দিয়ে চেপে টিপে টিপে  দেখতে দেখতে হঠাৎ পেটিকোটের কাছে দাগটা দেখতে পেলেন! পুড়ে যাওয়ার মতো কালচে দাগ! এটা কিসের দাগ? এতো সন্তানধারনের দাগ নয়, তাহলে…?  
“এটা কিসের দাগ? ভালো করে দেখি…"। পেটিকোটটা নামাতে যেতেই চকিতে উঠে বসলেন ভদ্রমহিলা। 
“ও কিছু নয় দিদি, ওটা অনেকদিনের…”। ডাক্তার'দিদি ভদ্রমহিলার আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করলেন। প্রায় জোর করে আবার শুইয়ে দিলেন তাঁকে। বেশ কিছুক্ষণ বুঝিয়ে, কাউকে বলবেন না কথা নিয়ে শোনালেন বিবাহের পরের সেইসব দিনের কথা। 
#
আঠারো বছর পেরোতে না পরোতেই পাশের গ্রামের অবস্থাপন্ন যৌথ পরিবারে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। একবছরের মধ্যেই গর্ভে সন্তান এসেছিল। পরিবারে খুশীর হাওয়ায় যত্নআত্তির কোনো ত্রুটি ছিল না। নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের দাইকে ডেকে বাড়িতেই ভুমিষ্ট হল সন্তান। সন্তান জন্মানোর পরই সকলের ব্যবহার গেল পাল্টে। পরিবারের মানুষজন অনেক আশা করেছিলেন, পুত্রসন্তান হবে তাঁর। কিন্তু সকলকে হতাশ করে কন্যাসন্তান হল তাঁর। এরপর থেকে ধীরে ধীরে রান্না করা, বাসন মাজা, কাপড় ধোয়া… একে একে সংসারের সব কাজ চাপতে লাগল তাঁর ঘাড়ে। কাজের চাপে খাওয়ার সময় হত না তাঁর। পরিবারের কেউ, এমনকি স্বামীও তাঁকে খাওয়ার কথা বলার সাহস করেননি কোনোদিন। ভেবেছিলেন আব্বুজানের কাছে চলে যাবেন। কিন্তু কন্যাসন্তানের কথা ভেবে আব্বুজানের কাছে যাওয়া হয়নি। এখানেই কিছু একটা করতে হবে তাকে। অনেক ভেবে একটা ফন্দি বের করলেন তিনি। সারাদিনের মধ্যে দুই থেকে তিন বার কন্যাসন্তানকে দুধ খাওয়ানোর জন্য সামান্য সময় বরাদ্দ ছিল তাঁর। সকাল, রান্নাবান্নার পর দুপুরে আর রাতে । দুপুর আর রাতের সেই সময়টাকে কাজে লাগালেন। 

পঞ্চব্যঞ্জন রান্না করার পর হাঁড়িতে ভাত করতে হত তাঁকে, বাড়ির এটাই দস্তুর। ভাতের হাঁড়ি উপুড় করে কন্যাসন্তানকে বুকের দুধ খাইয়ে এসে সকলকে খেতে দিতেন। কন্যাকে খাওয়াতে যাওয়ার আগে সকলের অলক্ষ্যে দুমুঠো গরম ভাত, সামান্য সবজি আর একটু লবন কোঁচড়ে নিয়ে তলপেটে বেঁধে নিতেন। প্রথম প্রথম গরমভাতের স্পর্শে তলপেটে জ্বালা হলেও পরে সয়ে গিয়েছিল। আসলে ক্ষিদের জ্বালা থেকে বড় জ্বালা কিছু নেই। প্রায় একবছর পর তাঁর কোলে এলো দ্বিতীয় সন্তান, পুত্রসন্তান। বংশধরকে পেয়ে পরিবারে খুশির হাওয়ায় সকলে ভুলে গেলেন সব।

এতক্ষণ বাকরূদ্ধ হয়ে ভদ্রমহিলার কথা শুনছিলেন ডাক্তার’দি, কোনো কথা বলতে পারছিলেন না। কি নিদারুণ  যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হয়েছিল ভদ্রমহিলাকে! একটু হেসে শাড়ি ঠিক করতে করতে উঠে পড়লেন তিনি। ডাক্তার’দির পেছন পেছন পর্দা ঠেলে বাইরে এসে বসলেন। ডাক্তার’দি আড় চোখে সদ্য বিবাহিত পুত্রবধূকে দেখলেন তিনি। খুব জানতে ইচ্ছে করল, তাকেও হয়তো এইভাবেই সহ্য করতে হবে, যদি...। পরিবারের পরিস্থিতি কি পাল্টেছে আদৌ? প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে একবার তাকিয়ে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসা করে ফেললেন ডাক্তার’দিদি। প্রশ্ন শুনে একটু ইতস্তত করলেন ভদ্রমহিলা, বললেন; 
“না দিদি, আমি যেভাবে যন্ত্রণা সয়েছি, আমার বৌমাকে অতটা সইতে দেব না। ‘অতটা’! ডাক্তার’দিদি কৌতুকের হাসি হেসে একবার তাকালেন সদ্য বিবাহিতা কন্যাটির দিকে। মনে হল হিজাবের মাঝে তার নিষ্পাপ ঢলঢলে মুখমণ্ডলে চকচকে চোখ আর ম্লান হাসি যেন কিছু বলতে চায়।
                      .....................................


শর্মিষ্ঠা দত্ত

              




অভিসার  



(১)



গত রাত থেকেই বৃষ্টি । প্রথমে রিমরিম থেকে শেষে ঝমঝম l বৃষ্টির তিরতিরে সুখ বুকে নিয়ে দিব্যি ঘুমিয়েছে পল্লবী । ফুলশয্যার দাগ এখনও মুছে যায়নি তার শরীর থেকে l বুকের গোপন ভাঁজে এখনও লেগে রয়েছে মেঘের স্পর্শ l বউমা, কাকিমা, বৌদি  ডাকগুলো এখনও ভাল ভাবে রপ্ত হয়নি l পল্লবীর চারপাশটা এখন বড্ড বেশী রকমের রঙিন ।


 


মাত্র এক মাস আগে মেঘের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে পল্লবীর l অ্যারেঞ্জড  ম্যারেজ l বিয়ের আগে বাড়িতে আর কফিশপে মাত্র দু - তিনবার মিট করেছে মেঘের সঙ্গে l ফলে মেঘকে সঠিক চেনা ফুলশয্যার রাতেই l এই কদিন দেখে তাকে যথেষ্ট কেয়ারিং আর রেস্পন্সিবল বলেই মনে হয়েছে পল্লবীর l এরমধ্যেই সে ভালোবেসে ফেলেছে তার জীবনের প্রথম পুরুষটিকে l ভালো পরিবার এবং ভালো ক্যারিয়ার দেখেই মেয়ের সম্বন্ধ ঠিক করেছিলেন অমিতবাবু l সম্বন্ধের বিয়েতে এর থেকে বেশী জানা সম্ভব ছিল না l নরম, লাজুক, অন্তর্মুখী মেয়েটির জন্য তাই খুব চিন্তা ছিল তাঁর l কিন্তু কথায় বলে "জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে ---তিন বিধাতা নিয়ে l" সুতরাং মেয়ের বাবা হিসেবে এই রিস্কটুকু নিতেই হয়েছিল অমিতবাবুকে l নাহ ! এখন পল্লবীকে মেঘের হাতে সঁপে দিয়ে  তিনি স্বস্তির নিশ্বাসই  ফেলেছেন l



(২)



নরম ভালোলাগার সঙ্গে তেতো বিরক্তি, মিষ্টি সুখের সাথে কান্না ভেজা নোনতা দুঃখ ---এসব নিয়ে তৈরি হয় জীবনের কোলাজ l সেটা এখন বেশ ভাল করে বোঝে পল্লবী l স্বপ্নে দেখা রাজ্যপাটের  সঙ্গে বাস্তবজীবনের কোনো মিলই থাকে না l শরীরে গৃহবধূর তকমা লেগে গেলে একঝটকায় অনেকটা  বড় হয়ে যায় মেয়েরা l অলিখিত অনেক দায়িত্ব, কর্তব্যের বোঝা চেপে বসে কাঁধের ওপর l ইচ্ছে না থাকলেও "পারব না" অথবা "করব না" বলার অবকাশই থাকে না কোনো l পল্লবীর শাশুড়ি মা মানুষটা এমনিতে খারাপ নন, তাকে ভালোওবাসেন l কিন্তু বাঁধাধরা কিছু সংস্কারের মধ্যেই তাঁর বসবাস l একমাত্র ছেলের বৌ হিসেবে সেসবই তিনি চাপিয়ে দিতে থাকেন পল্লবীর কাঁধে l আসলে একসঙ্গে সংসার করতে করতে একটা মানুষের ঝলমলে চরিত্রের আড়ালে অন্ধকার দিকগুলোও বেশ নজরে পড়ে l এবং ক্রমে তা গা-সওয়াও হয়ে যায় l ছটফটে হাসিখুশি মেঘের চট করে রেগে যাওয়া, অথবা ধৈর্যহীনতা এবং শাশুড়ির অর্থহীন সংস্কার ও নিয়মকানুনের সঙ্গে তাল দিতে দিতে নিজের অনেক ভালোলাগার অভ্যেস ছাড়তে হয়েছে পল্লবীকে l বিয়ের আগে মা শিখিয়েছিলেন মেনে নেওয়া আর মানিয়ে চলার নামই সংসার, আজ তাই আর অতটা কষ্ট হয়না তার l



সময়ের পালাবদলে অভ্যস্ত হয়েছে সে, বিয়ের তিন বছর পরে নতুন বউ থেকে পল্লবী এখন রীতিমত গৃহিনী l নতুন স্বামী থেকে মেঘ এখন পল্লবীর জীবনের সেই অনিবার্য পুরুষটি, যাকে ভাললাগার অভ্যাসটা জারী রেখেই চলতে হবে জীবনের বাকি কটা দিন l মনের মানুষটির সবকিছুই মনের মত হয় না, সম্বন্ধের বিয়েতে কোন অপশন  থাকে না  একথা ভালোমতই জানে পল্লবী । 



(৩)



দীর্ঘ একবছর  ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে গত মাসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন শাশ্বতীদেবী, পল্লবীর শাশুড়িমা l একটা বছর ধরে পল্লবী অক্লান্ত সেবা করেছে তাঁর l শেষ সময়টায় পল্লবীর ওপরেই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তিনি l কিন্তু অনিবার্যকারণেই মারণরোগের সঙ্গে অসম লড়াই একদিন থেমে গেল l এই প্রথম এত নিবিড়ভাবে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করল পল্লবী l 



হসপিটালের বিল মেটাতে পার্সোনাল লোনের বোঝা কাঁধে নিয়ে  মেঘ এখন  আর্থিক ও মানসিক ভাবে অসম্ভব বিপর্যস্ত l একে মাতৃশোক, তার ওপর এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসায় তার যাবতীয় সঞ্চয় প্রায় তলানিতে l মেডিক্লেম থাকা সত্ত্বেও জলের মত অর্থব্যয়ের ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তার প্রভাব স্পষ্টতই তার ব্যবহারে দৃশ্যমান l আজকাল সামান্য ব্যাপারেই বড্ড তীব্রভাবে রিয়্যাক্ট করে মেঘ l বিয়ের পরে যে মিশুকে, অমায়িক মানুষটাকে  একটু একটু করে আবিষ্কার করেছিল পল্লবী... এ যেন সে নয় l  



 (৪)



জীবন  তার নিজের গতিতে চলে l শোক-দুঃখ , কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয় l মানুষ তার অতি প্রিয়জনকে ছাড়াই জীবনের সঙ্গে সমঝোতা করে নেয় l 


শাশ্বতী মারা গিয়েছেন প্রায় পাঁচ মাস হতে চলল l মেঘ এখন অনেকটা স্বাভাবিক l পরিবর্তিত  পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে l আস্তে আস্তে  আর্থিক সংকটও কাটিয়ে উঠেছে অনেকটা l  আসলে সংসারের রুক্ষ পথে চলতে চলতে পল্লবী এখন অনেক পরিণত l সে জানে কোন পরিস্থিতিতে কেমনভাবে চলতে হয়, কিভাবে হিসেব করে সংসার চালাতে হয় l পল্লবীর উপর নির্ভরতাও ক্রমে বাড়ছে মেঘের l সে জন্য অবশ্য  পল্লবীকেও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে  দিনের পর দিন l 



জীবনের ফিকে হয়ে যাওয়া রংগুলো আবার একটু একটু করে গাঢ় হচ্ছে l অনভ্যস্ত তুলির টানে তাদের  ফিরিয়ে আনতে পারছে পল্লবী l


 (৫)



দিনকয়েক হলো নতুন ফ্ল্যাটের পজেশন পেয়েছে পল্লবীরা l সাবেকি বাড়িটার জায়গায় নতুন আবাসনে ওদের পরিবারের সবাই একটা করে ফ্ল্যাট পেয়েছে l নতুন রঙের গন্ধটা এখনও লেগে আছে এ ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণায় কোণায়, আসবাবপত্রের গায়ে l সমস্ত মলিনতা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে আবার নতুন করে সেজে উঠেছে পল্লবী আর মেঘের সম্পর্ক l সুখের তানপুরাটা ক্রমাগত রিনরিন করে বাজছে পল্লবীর বুকে l একটু একটু করে  নিজের মনের মত পল্লবী  গুছিয়ে নিচ্ছে তার নতুন সংসার l তার আর মেঘের স্বপ্নের নীড় l 



দাদাশ্বশুরের তৈরি সাবেকি বাড়িতেই নতুন বউ হয়ে পা রেখেছিল পল্লবী  l মেঘ শাশ্বতীর একমাত্র সন্তান হলেও  একই বাড়িতে জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাইবোনদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগ করে, যৌথ পরিবারের আবহেই বড় হযেছে l যেহেতু পল্লবী একটা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সন্তান, অমিতবাবুর একমাত্র আদরের মেয়ে তাই যৌথ পরিবারের কনসেপ্টটা এখন শুধু  টিভি সিরিয়ালেই সীমাবদ্ধ, এটাই ভেবেছিল সে l মেঘের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই মনের মধ্যে যে সুপ্ত আশঙ্কাটা ছিল, জয়েন্ট ফ্যামিলিতে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে কি না, এ বাড়িতে পা দিয়েই শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলোর আন্তরিকতায় এক নিমেষে উধাও হয়ে গিয়েছিল সেটা l  আস্তে আস্তে কখন যে ওদেরই একজন হয়ে উঠেছিল, টেরই পায়নি l 



কিন্তু সংসার তো সকলেরই ক্রমবর্ধমান ! পুরনো বাড়িতে  স্থানাভাবের জন্য আলাদা বাসস্থানের চিন্তা শুরু করেছিল সবাই l এমনকি মেঘও l কিন্তু এ বাড়িটা ছিল শাশ্বতীর প্রাণ l এ বাড়ি জুড়ে ছিল তাঁর বৈবাহিক জীবনের অজস্র  সুখস্মৃতি l তাই এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না l আর এই ঘর, দালান, ছাদ, চিলেকোঠা আর বাড়ি ঘিরে ফলফুলের বাগান কোনো প্রোমোটারের হাতে তুলে দেওয়া তো ছিল  তাঁর স্বপ্নের অতীত l অসম্ভব মায়ার ডোরে বেঁধে রেখেছিলেন ভাসুর-দেওরের ছেলেমেয়েদেরও l তারা সবাইকেই তিনি নিজের সন্তানের মতই ভালোবাসতেন l অনেক অসুবিধে সত্ত্বেও তাই সবাই থেকে গিয়েছিল এই বাড়িতেই l শাশ্বতী যতদিন বেঁচে ছিলেন তাঁর সেন্টিমেন্টের মর্যাদা দিয়েছিল বাড়ির সকলেই l কিন্তু পার্থিব প্রয়োজনের কাছে সেন্টিমেন্টও ক্রমে মূল্যহীন হয়ে পড়ে l তাছাড়া আজকাল এত বড় প্রপার্টির মেন্টেনেন্সের খরচও তো কম নয় ! 



সব দ্বিধা কাটিয়ে অবশেষে  সবাই মিলে বাড়িটাকে প্রমোটারের হাতেই তুলে দিয়েছিল l বিনিময়ে পেয়েছিল সেই একই ছাদের তলায়  মিলেমিশে থাকার আশ্বাস l



(৬)



মেঘের দেওয়া উপহার লাল-সোনালী কম্বিনেশনের নতুন ব্যাঙ্গালোর সিল্কটা পরে  ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিল পল্লবী, মেঘেরই  অপেক্ষায় l ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ, ঝিরঝিরে হাওয়া মাঝে মাঝে  এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে পল্লবীর শরীর l বুকের ভিতরে তিরতিরে সুখ l আজ ওদের পঞ্চম বিবাহবার্ষিকী l আজই প্রেগন্যান্সি টেস্ট করেছে পল্লবী l পরিষ্কার করে না বললেও ফোনে মেঘকে একটা সারপ্রাইজ দেবে বলে জানিয়েও দিয়েছে  l 



আজ ওদের  ডিনারে যাওয়ার কথা l একটু আগেই মেঘ ফোন করেছিল l পল্লবীকে রেডি থাকতে বলেছে l  অফিস থেকে আজ একটু তাড়াতাড়িই বেরোবে ও l



পল্লবী বাইরের খাবার খুব একটা পছন্দ করে না l রান্নাটা ওর শখ l তবুও মাঝেমধ্যে হ্যাংআউটে যেতে মন্দ লাগে না ওর l পাঁচবছরের অভ্যস্ত দাম্পত্যে একটা বিশেষ দিন একান্তে একটু  অন্যরকমভাবে সেলিব্রেট করা হবে ওর নিজস্ব পুরুষটির সান্নিধ্যে l আপন মনে "ভালবাসি ভালবাসি"---গুনগুন করে উঠল পল্লবী l 



কলিং বেলটা বেজে উঠল না ! নিশ্চয়ই মেঘ ! দৌড়ে এসে দরজা খুলল পল্লবী l দরজার বাইরে অন্ধকার মুখে  দাঁড়িয়ে দাদাভাই , সুনন্দদা  আর ভাইয়া l মেঘের জেঠতুতো দাদা ,জামাইবাবু  আর  খুড়তুতো ভাই l 



 (৭)



শ্মশান থেকে ফিরে ওদের শোবার ঘরের বিছানায় শুয়েছিল পল্লবী, মেঘের বউদি শ্রীলেখার কোলে মাথা রেখে l ঘরভর্তি আত্মীয়স্বজন l অমিতবাবু ও তাঁর স্ত্রী এসে পৌঁছলেন এইমাত্র l আজ ভোরেই  কোচবিহারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে শিলিগুড়ি এসে বিকেলের  ফ্লাইটে এতক্ষণে কলকাতা  এসে পৌঁছেছেন l 



কাল সন্ধ্যেবেলা অফিস থেকে ফেরার সময় রানওভার  হয়েছিল মেঘের গাড়ির l মেঘ নিজেই ড্রাইভ করছিল l অবশ্য বরাবরই নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে মেঘ l দুর্ঘটনা তো রোজ রোজ ঘটে না ! পোস্টমর্টেমের পর আজই বিকেলবেলা বডি রিলিজ করে দাহ করা হয়েছে l 



বাবার  ডাকে চোখ খুলে তাকালো পল্লবী l দৃষ্টিতে গভীর  শূন্যতা l তাঁর আদরের মেয়েটাকে মেঘের  হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন অমিতবাবু l ঈশ্বর আর স্বস্তিতে থাকতে দিলেন কই ! মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তাঁর l


 (৮)



অপঘাতে মৃত্যু l তিনদিনেই শ্রাদ্ধ - শান্তি মিটে গেল l আরো মাসখানেক থাকার পরে  অমিতবাবু আর বন্দনা মেয়েকে নিজেদের কাছে কোচবিহারে নিয়ে যেতে চাইলেন l কিন্তু পল্লবী তার সিদ্ধান্তে অনড় l এ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না সে l এ বাড়ির প্রতিটি কোণে, খাটে-সোফায়, দেওয়ালে -দরজায় -মেঝেতে মেঘ কি ভীষণ জীবন্ত ! তাকে ছেড়ে কি চলে  যাওয়ার উপায় আছে পল্লবীর ! মেঘ তো  থাকতেই পারে না পল্লবীকে ছাড়া !



তাঁর নরম লাজুক মেয়েটা  যে এমন দৃঢ়ভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত  ধরতে পারে, তা কোনদিন ভাবেননি অমিতবাবু l তাঁর পক্ষে তো নিজের বাড়িঘর ফেলে আর বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়, তাছাড়া  অফিসও  আছে l স্ত্রীকে বললেন মেয়ের কাছে থেকে যেতে l কিন্তু তাতেও রাজি নয় পল্লবী l বাবার বয়েস হয়েছে, মায়ের এখন বাবার সঙ্গেই সবসময় থাকা উচিত l একপ্রকার জোর করেই মাকে বাবার সঙ্গে ফেরৎ পাঠাল সে l তাছাড়া একা থাকার অভ্যেস তো করতেই হবে তাকে l পরিস্থিতির সঙ্গে যেন বড্ড তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছে পল্লবী l



(৯)



আজই অমিতবাবুরা ফিরে গেলেন কোচবিহারে l মেঘের দাদা বৌদি,আত্মীয়রা সবাই আশ্বস্ত করেছে তাঁকে l ওরা  সবাই পল্লবীকে আগলে রাখবে সাধ্যমত l তাছাড়া কলকাতাতেই  একটা জব পেয়েছে পল্লবী l প্রফেশনাল কোয়ালিফিকেশন থাকায় তেমন সমস্যা হয়নি l খুব শিগগিরই জয়েনিং l তাই এ মুহূর্তে পল্লবীর কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাওয়া উচিতও নয় l 



অনেকদিন পর এই ফ্ল্যাটে পল্লবী একা l বিকেলবেলা আকাশ কালো করে ঝড় এলো হঠাৎ  l কালবৈশাখী ঝড় l পল্লবীর হঠাৎ এলোমেলো হয়ে ওঠা জীবনটার মত l ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ঝড়ের তাণ্ডব দেখছিল পল্লবী l কলিং বেলটা বাজল না ! 



এতদিন বাদে নিজের বাড়িতে ফিরছে মেঘ l বরাবরই বড্ড অধৈর্য স্বভাব ওর l সেই সারপ্রাইজটার জন্য ছটফট করছে নিশ্চয়ই ! পল্লবীর শরীরের ভিতরে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে যে ছোট্ট মানুষটা, সেও তো একটুকরো মেঘ ! তার অস্তিত্বের কথা কি মেঘ জেনে ফেলেছে ! দরজা খুলে ঝাপসা চোখে মেঘকে দেখছিল পল্লবী l গ্রীষ্মের প্রখর  দাবদাহের পর আকাশ ছেয়ে এখন শুধুই  ঘন মেঘের রাশি l

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

              



পৃথিবীর শেষ বিন্দু

------------------




জানলা দিয়ে দেখলাম

রাত একটা দুটো তিনটে চারটে পায়ে দাঁড়িয়ে আছে

সময় গেলে পায়ের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে হয়

আসলে রাস্তা দিয়ে যারাই যাচ্ছে

প্রত্যেকেই একটা করে পা রাতের গায়ে বসিয়ে যাচ্ছে

একটা একটা করে বন্ধ হচ্ছে দরজা জানলা

নিজের অন্ধকারেও তারা বেশ ডুবে

সবাই চারদেওয়াল পড়ে আর

ঘরে বাইরে অন্ধকারকে মিলিয়ে দিতে চায়


প্রাচীন ঠাকুমা জল চাইল আর

তৃষ্ণার্ত বাক্যবন্ধটা চারদেওয়ালে ঠোক্কর খেতে খেতে

ছাদের দেওয়াল ফাটিয়ে রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে চলল


লক্ষ লক্ষ বাড়ির ছাদ বিস্ফোরণে উড়ে যাচ্ছে

আর পৃথিবীর কোটি কোটি রাস্তা অলিগলি দিয়ে

ধেয়ে আসছে পাহাড়ী শক্তিতে তৃষ্ণার স্রোত

পা রাখার জায়গা নেই

পৃথিবীর শেষ বিন্দুটাও 

এইমাত্র মহামিছিলে হারিয়ে গেল। 




নিলয় নন্দী

                 



বলো, নেবে তো আমায়? 



বহুদিন বৃষ্টি নেই

লুকোনো সেতার থেকে ঝরে পড়ে হিম 

"এইসব কথা এখন বলার মানে কী? "

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ছিল না, বলা হয়নি তাই

বৃষ্টি হলে ভেসে যাওয়ার কথা ছিল

দু চোখ ভরা জ্যোৎস্না বা ঝড় তুফান

প্রাচীন প্লাটফর্ম তীক্ষ্ণ হুইসল ভিজে একশা 

কাপড়জামায় লাবণ্য, তুমিই লাবণ্য 


পূর্বকথনে শীত সুপর্ণা অসমাপ্ত চিঠি আরো কত কী

সেসব সিলিং থেকে খসা প্লাস্টারের মত ঝুলে পড়ে

কবিতা শেষের বা শুরুর, সংলাপ অপর্যাপ্ত।

এখন বলে কী লাভ!  


বাদল মেঘে পাখিরা কেমন ভেসে যেতে পারে

দেখতে দেখতে আমি বোবা হয়ে যাই

আর তুমি মৌসুমী ভৌমিক... 


লাবণ্য নীল সমুদ্র স্নান আবার যেদিন তুমি

মঞ্জুশ্রী চক্রবর্তী

                   



নৈঃশব্দ্য



শব্দময় জগতের কত আয়োজন…

বাতাসের শনশন, কাকলি কুজন,

কত কথা কথকতা আলাপে- প্রলাপে,

বিস্মৃত কিছু তার, অশ্রুত কিছু সংলাপে।

কত পাড় ভাঙে,কত নদী বয়ে যায় বুকে!

কথার ভুবনে কতটুকু তার ধরা থাকে?


নৈঃশব্দ্য বাঙ্ময় হয়, ফুলের পাপড়ি মেলায়,

হৈমন্তী ধানের শিষের ভরন্ত দুধেল দানায়,

গাছে পাতায় আলোর চলনে,

দিগন্তে আকাশের মাটি চুম্বনে,

সূর্য আর ভোরের সাতরঙা অনুরাগে। 

নিঃশব্দে পথে যখন নিশুতি রাত জাগে।


শব্দেরা ছুটেছে কত না আলোকবর্ষ, 

তবু…গাঢ় নিঃশ্বাসে যখন শব্দহীন স্পর্শ

বুলিয়ে দেয় গোলাপ, রজনীগন্ধারা

সেখানে অপাংক্তেয়, আনাড়ি শব্দেরা।

রমা সিমলাই

                       



ভাবীকাল 



তাড়া একটু আছে বৈকি


গুছিয়ে নিতে হবে সব

যত ঋণ রয়ে গেছে আকাশ বাতাস আর

মাটির গভীরে,

সূর্য আর তারাদের ভরন্ত সংসারে

যত কিছু আলো অন্ধকার,

শ্বাপদ জটিলতা, মোহ ক্ষোভ রিরংসা -

সোনার তরী ভরে জমা হওয়া তীব্র শাপ আর

সাপের শীতঘুম। ধুয়ে মুছে ঝকঝকে আত্মপাত্রটিকে

উপযোগী করে যাবো নিশ্চিত প্রয়াণে।


অসূয়া যতটুকু প্রাণঘাতী, ষোলো কলা কামনা ত্রিভুজ

-কৌশলে প্রেমের আয়ুধ, সবটুকু নির্বাসন

বড়ো বেশি সহজ তো নয়


তবু আমিশূন্য স্নিগ্ধ বিকেলে

সুখসায়রের টলটলে জলে

                                          মেঘ এসে পা ধুয়ে যাক


ঋষিদের সামগান মুছে দিক নির্দোষ অন্ধকার


সমাহিত সময়ের কোলে পিঠে শান্তি আর সারল্যের শিশুরা

প্রাণভরে হেসে নিক

                                               দু'দন্ড জিরিয়ে নিয়ে

উত্তরসূরী প্রবালদ্বীপে, মেধাবী পলাকুঞ্জে -


আমি সেথা থাকি বা না-থাকি


বাঁশিতে বাজুক রাধানাম...

সুপম রায় (সবুজ বাসিন্দা)

                   



আজ সকাল থেকে

 


আজ সকাল থেকে -

যে সমস্ত ফুলের সুবাস এসেছে

তার মধ্যে তোমার সেই সুবাস নেই,

যা যা আনন্দের খবর এসেছে

তার মধ্যে তোমার হাসিমুখটা নেই।


যতগুলো পাখি উড়েছে,

দিগন্ত পেরিয়ে হারিয়েছে 

তোমার আপাতকালীন দৃষ্টি

তার মধ্যে একটিও আমার পোষা পাখি নেই।

যতজন ফেরিওয়ালা সারা শহরের 

অলিগলি ঘুরে বেরিয়েছে

অথচ কোনও কিছুই বিক্রি করতে পারল না

তাদের কাছে আমার বাড়ির ঠিকানা নেই।


আজ সকাল থেকে -

যে সমস্ত বিপ্লব-মিছিলের চিৎকার শুনেছি

সেখানে তোমার কন্ঠস্বর নেই,

যে সমস্ত দেওয়াল লিখনের ছবি দেখেছি

সেখানে তোমার নামে কিছু লেখা নেই।


সম্পর্ক বিচ্ছেদের খাতায় যতজনের নাম উঠেছে

তাদের মধ্যে তুমি-আমি নেই,

যতগুলো মৃত্যুর খবর এসেছে

তার মধ্যে তোমার-আমার শরীর নেই।


আজ সকাল থেকে 

দুজনের অনুভূতিটুকু ছাড়া কিছু নেই,

জীবন ছাড়া কিছু নেই।

তনুশ্রী দেবনাথ‌

              



 বিষপাত্র.....


      সময়ের সরণী ধরে চলতে চলতে হাতে তুলে নিই অবহেলার বিষপাত্র, জীবনের বোধহয় নির্দিষ্ট কোন কক্ষপথ থাকে না। মর্জিমাফিক চলা নিয়ম বিরুদ্ধ, অন্যের মতিগতি বুঝে ভাসিয়ে দিতে হয় মান্দাস। চাহিদা যত সামান্যই হোক , না পাওয়ার যন্ত্রণায় মুখ ঢাকে পড়ন্ত যৌবন। নিক্তিতে মেপে কি জীবন চলে? তার চেয়ে ঢের ভালো ইচ্ছা মৃত্যু , দয়া ভিক্ষা বড় বেশি লজ্জাজনক। বাগান ভর্তি ফুল ফুটলে যেমন ভ্রমরের ওড়াউড়ি টের পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি পাতা ঝরার দিনে বাজে বিষাদের স্বরলিপি। কুয়াশা জমতে জমতে ধূসর শীত ভোর খোঁজে সূর্যের রং। আচ্ছন্ন দুচোখে বাষ্প জমতে জমতে কখন যেন নদী হয়ে যায়।।


                     


ঋকতান

                   



খুঁজে নিও প্রিয়।

 


প্রিয় নীল, ভোরের আলোয়

দূর্বা ঘাসের শিশির কণা যেমন টলমল করে

রৌদ্রকরোজ্জ্বল কোনো শীতের সকালে ---

ঠিক তেমনি তোমার মুখোচ্ছবি ভেসে ওঠে

                     আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে।


যৌবনবিদগ্ধ আমার ভালোবাসা টুকু নিও প্রিয়।

তোমার ব্যস্ততা, শত ঝামেলায় যখন ক্লান্ত দুপুর,

নয়তো কোনো অবসরে আমার কথা মনে কোরো।


নীল,হয়তো তোমার ব্যস্ত নগরীতে আজ যানজট,

সেই ভিড় ঠেলে আসতে পারবেনা আমার কাছে ---

তবুও তার ফাঁকে একটিবার আমার কথা মনে কোরো।


রাতের তারারা যখন তোমার আকাশে ভিড় জমাবে

চাঁদও ভরিয়ে দেবে জোছনায় ----

এমন মায়াবী প্রহরে খুঁজে নিও আমায় হে প্রিয় !

উঠোনের করবীফুল যখন ফুটবে শাখায়,

সুবাসিত বাতাস হয়ে লুটিয়ে পড়বো তোমার জানলায়

তুমি আমায় বুকের কাছে টেনে নিও প্রিয়!

হৃদয়ের মধ্যবিন্দুতে রেখো তুমি আমায়,

রাই কে বুকে জড়িয়ে নিতে পারো ---

অজস্র চুম্বনে ভরিয়ে দিও দীপ্ত প্রদীপ শিখায়।।

কেকা মল্লিক

               



ধর্ম



চিনতে চেয়েছিলাম তোমায় 

তাই বিছিয়ে গোলাপ, আলাপ দিলাম জুড়ে,

 বললাম আজ থেকে ভালোবাসাই ধর্ম।


তুমি তখন ধর্ম কি,বোঝাতে এলে। 

ধর্ম! সে তো মানবিকতার সর্বনাম, 

পেটে আগুন জ্বললে ভাত, শিশুর মুখে শুকনো স্তন। মাতৃত্ব জীবনের ধর্ম।


আমি শরীর  বাদ দিয়ে কাঁখে অনাথের ছবি দেখে কঁকিয়ে উঠেছিলাম।

যদি এই রাতে জন্ম নেয় রক্তবীজ!


যৌনতা আর আতঙ্ক,দুয়ের গন্ধ বড় আদিম

থাক; চলো পাশ ফিরে শুই, স্বপ্নে আসুক স্বাধীন শিশুর।