রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০
তুষ্টি ভট্টাচার্য
সাইকেল
প্রথম পর্বের পর
২)
সামুয়েল কাঁধ ঝাঁকাল অদ্ভুত ভঙ্গি করে। যেন ও নিজেই ঠিক বুঝতে পারছে না—মন খারাপ লাগছে কিনা। এই বরবরুয়াদের গ্রামটাকে সামুয়েলের খুবই ভালো লেগে গেছে। আর সেই ভালো লাগার মাশুল গুণছে এখানে আটকে পড়ে। ভাগ্য যে এভাবে ওকে আসামের প্রত্যন্ত এক গ্রামে এনে ফেলবে, এনে ফেললেও এখানেই সাময়িক আস্তানা গড়ে দেবে ওর, কে জানত! এই বাচ্চাদুটো ওর খুব ন্যাওটা হয়ে গেছে। একজনের ক্লাস থ্রি, একজনের টু। বড়টার নাম রুবাই আর ছোটটাকে সামুয়েল ডাকে মাদাম বলে। আসলে ও সবার মুনিয়া। রুবাই ওর সাইকেলে উঠে প্যাডেলে পা পৌঁছনোর চেষ্টায় মত্ত। আর মাদাম এখন গিটারে টুংটাং করছেন। মেয়েটার তেলমাখা খোঁচা খোঁচা চুলে হাত বুলিয়ে দিল ও। আদর পেয়ে একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করল ও। তারপর আবার গিটারে মন দিল। যেন এই মুহূর্তে জি শার্পে গিয়ে সে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। এটুকু প্রশ্রয় ওদের দেয় সামুয়েল। শুধু এই দুটি না, আরও কয়েকজন এসে জোটে ওর কাছে। বরাবর ছোটদের পছন্দ করে ও। ওদের পালস্ বোঝে, আর তাই যেখানেই যাক, ছোটরা ওকে ঘিরে রাখে। এই বরবরুয়া গ্রামে এসে ওদের ভাষার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল প্রথমটা। তারপর আকারে ইঙ্গিতে বোঝাতে চেয়েছে, ভাঙা ইংরেজিতে বস্তুর নাম বলে বোঝাতে পেরেছে কিছুটা। এভাবেই চলেছে দুপক্ষের ভাষা শেখার খেলা। এখন তো অসমীয়া, স্প্যানিশ আর ইংরেজির সহাবস্থানে গ্রামের বিকেলগুলো মুখর হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতে একটা ছোট্ট স্কুলের মতো তৈরি হয়ে গেল এভাবে। ইচ্ছে থাকলে কী না হয়!
জুন, জুলাইয়ের এই ভরা বর্ষায় অবশ্য মাঠেঘাটে ওদের স্কুল বসতে পারে না। কারুর ঘরে, বারান্দায় মায় পরিত্যক্ত গোয়াল বা রান্নাঘরেও চলে ওদের পাঠ। আজ তিনমাস হয়ে গেল এখানে এসে। তিন মাস তো না, যেন এক যুগ! গত বছর আগস্টে স্পেন থেকে উড়ান দিয়েছিল সে জাপানের উদ্দেশ্যে। সঙ্গী ছিল তার সাইকেল। সেই জাপান থেকে সাইকেলে চড়ে একে একে কোরিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, তাইল্যান্ড, মায়ানমার হয়ে মণিপুরে। তারিখটাও মনে আছে! ২৭ জানুয়ারি। কারণ আর কিছু না, সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। বাড়িতে বাবামায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য সে এক সাইবার কাফেতে গিয়েছিল সন্ধেবেলা। ততক্ষণে আশেপাশের অনেকেই জেনে গেছে সাইকেলধারী এই বিদেশী পর্যটকের কথা। অনেকেই আলাপ করছে, হাত মেলাচ্ছে, এরই মধ্যে যখন বাবামায়ের সঙ্গে ও কথা বলছিল স্কাইপে, উচ্ছাস হয়ত বেশি হয়ে পড়েছিল ওর। জন্মদিনে ওঁদের স্নেহ, ভালোবাসা থেকে দূরে থাকলেও আজ এভাবে জাপান থেকে ইন্ডিয়ায় আসতে পারবে, নিজেও ভাবেনি কখনও। সেসময়েই এক যুবকের সঙ্গে চোখচোখি হয় ওর। সে নিজেই হাত বাড়িয়ে দেয় আলাপের জন্য। শিক্ষিত অসমীয়া এই যুবকের নাম অভিজিৎ বরবরুয়া। কী এক প্রাণের টানে বন্ধু হয়ে যায় ওরা খুব সহজেই।
অভিজিতের মূল আগ্রহ ছিল ওর পর্যটনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা। আর তাই দুজনের মধ্যে ভাব হতে সময় লাগেনি। নাহ খিদে পাচ্ছে খুব। ওরা হয়ত বসে আছে ভাত নিয়ে। অভিজিতের মাকে ও কাকিমা বলে। অনেকবার বোঝানো সত্ত্বেও কাকিমা ওরা দুজনে না খেলে খায় না। এখন আর আকাশকুসুম ভেবে দেরি করলে চলবে না। উঠে পড়ল ও। পুঁচকে দুজন বিদেয় নিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। গিটারটা পিঠে ঝুলিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিল ও। আর গলা দিয়ে অজান্তে বেরিয়ে এল-
Hoy en mi ventana
brilla el sol
Y el corazón se pone triste
contemplando la ciudad
Porque te vas ……
(আজ আমার জানলায় রোদ এসে পড়েছে,/ আর মন হয়ে রয়েছে বিষণ্ণ/ এই শহরকে অভিযুক্ত করছি আমি/কারণ তুমি চলে যাচ্ছ…)
সূর্য এখন আর ভোরের নেই। দুপুর গড়িয়ে সে খর হয়ে উঠেছে। কেউ এ শহর ছেড়ে আপাতত চলে যেতেও পারবে না লকডাউনের কারণে। ফলে দুঃখের কিছু নেই তার। গান তো এমনিই গাওয়া। এমনিই…তার অভ্যেস। আর দুঃখ কি কিছু আছে ওর? মনখারাপ? সে সত্যিই বোঝে না এসব। সামুয়েলের মন একটা আলগা পালকের মতো ভাসতে থাকে সব সময়। তুলোর মতো পেঁজা মেঘে ঢেকে আছে এখনকার আকাশ—ঠিক এরকম। যখন খুব মেঘ করে, আকাশ কালো হয়ে আসে, সামুয়েলের খুব ভয় লাগে। মনে হয় কারুর নরম বুকে মুখ লুকিয়ে যদি বেঁচে থাকা যেত নির্ভয়ে…
)
অরিত্র চ্যাটার্জী
|
এই সংখ্যার কবি অরিত্র চ্যাটার্জী।জন্ম ১১ এপ্রিল, ১৯৯৪। পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বর্তমানে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে গবেষণারত। কবিতা লেখার সুত্রপাত স্কুল জীবনের শেষ দিকে। প্রকাশিত কবিতার বই একটি , "ঝরা পাতার সমাহার" (প্রকাশক - ৯ নং সাহিত্য পাড়া লেন, সন- ২০১৯)।
মবলগে মনোলগ
১
( ডিমেনশিয়া )
কে তুমি
জটিল জ্যামিতিতে
ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে এসেছ
অনুজ্জ্বল ধ্বনির ভেতর
খসে পড়ে
যৌগ অক্ষরছবি
বিলীয়মান গেরস্তপ্রপাত
ও সন্নিহিত মুখেদের ভিড়ে
আমি আবারো
গুছিয়ে নিতে ভুলে যাই
যত ছিল বিগত দশকের স্খলন …
২
( পোর্ট্রেট অফ ভেনাস )
রাখা আছে নির্জন আপেল আর আমার এই শাদাটে তনুদেশ, একে তোমরা আরোহণ করবে ভাব, দড়ি ও কম্পাস সহযোগে তোমাদের এহেন নিষ্ফল অভিযান প্রতিবার উপত্যকার খাঁজে এসে থেমে যায় হায়, আর আমি অপেক্ষা করি, অপেক্ষা করি কবে কেউ পেরিয়ে আসবে নীলচে ঠোঁটের সানুদেশ আর যাবতীয় প্রজননবেলা ক্রমে বয়ে গেলে, প্রতি রাতে কিভাবে আরেকটু বেশি করে মরে যাই, ওহ্ মৃত্যু, সেকথা কারুক্কে বোলোনা কখনো!
৩
কি প্রচণ্ড নির্বিকার
এই সারিসারি ধড় ও মুখোশরাশি
আমাকে লক্ষ্য করে
পুঞ্জীভূত ধোঁয়ার আড়ালে
অনায়াস সরিয়ে নেয় পাটাতন
আর
পতনোন্মুখ আমাকে
টেনে তোলে
আরেকটা অবাঞ্ছিত স্বপ্নের ভিতর
৪
বিক্ষিপ্ত কিছু সত্য উদ্ঘাটনের হেতু আমি অবশেষে সেই ধর্মযাজকটির সন্নিকটে গেছিলাম এবং তাঁর লোল করতল স্পর্শ করে অভিবাদন জানিয়ে আমি বলতে শুরু করেছিলাম যা কিছু সত্য বলে মনে হয় সেইসব অনাকাঙ্খিত সংশয়ের কথা, পর্ণমোচীর বাগানে সেই বৃদ্ধ ধর্মযাজক আমার কথার ভেতর সহসা জানতে চেয়েছিলেন পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কিত আমার মতামত এবং আমাদের কথোপকথনের সাময়িক নীরবতা ভেদ করে সকাতরে একটি পাখি ডেকে চলেছিল এবং ধর্মযাজক চোখ বুজে সেই সকরুণ সুরের ভিতর সুখবোধ কিভাবে মানুষকে এড়িয়ে চলেছে অনন্তকাল সে কথা বলে চলেছিলেন, এবং এমতাবস্থায়, তাঁর পশ্চাতে ডালা সাজিয়ে জনৈকা যুবতী এসে দাঁড়িয়েছিল, ধর্মযাজকের কথার ফাঁকেফাঁকে যার সুডৌল উরুদ্বয় আমি একাগ্র চিত্তে দেখেছিলাম…
৫
যে তুমি মনোলোভা,
এই আশ্চর্য নাচবুদ্ধি
জ্যামিতিভঙ্গিমা দেখব বলে আমরা পেরোই
সাড়ে আট, সাড়ে আট কৈশোরের কাঁটাতার
আর তুমি উঠে আসো অনাবিল বিভঙ্গে
কোন সামুদ্রিক পিপে হতে
সাইরেনদের গানে দোল খাও যেন সহস্র সাপিনী
যাজকের হাঁসফাঁস, যা কিছু বীতংস তা ছুঁয়ে
কাকে বলে রক্তাল্পতা
সে মুহূর্তে জেনেছি আমি
৬
দুঃখ,
প্রতিটি ঠাণ্ডা আত্মার
অনভিপ্রেত শীতঘুম ভাঙ্গানোর
পর্যাপ্ত বারুদের
রসদ না থাকার…
৭
( সোয়ান সং)
‘হিপোক্রিসি ‘কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ আছে অনেক
তবু সচেতন ভাবে আমি এই শব্দটা ব্যবহার করি
‘হিপোক্রিসি’ শব্দটা ভারীবিশেষ, যেন বাটখারার মতন
যা ছুঁড়ে মারলে সামনের লোকটার কপালে লাগে
আর সেইসব আহত শ্রোতাদের থেকে তিন সেকেন্ড বেশী সময় পাওয়া যায়
বিজয়ীর মত দাঁড়িয়ে থাকার অথবা পরবর্তী শব্দসমুহ সাজানোর
মনু, এইটুকু ছাড়া আর কি বা পারি বল ঠিকঠিক করে
তোমাদের শব্দাঘাত করা আর সময়ে পরে নেওয়া লুকনো মুখোশ
তোমাদের সুখ দুঃখ আর সত্যিই নাড়ায় না আমায়
লঘু পায় আমি পেরিয়ে যাই মাটিদেশ,নগর,বন্দর
আর আমার পেছনে পড়ে থাকে সারিবদ্ধ সিরিয়া আর আমলাশোল
আর আমার পেছনে পড়ে থাকে শ’পাঁচেক নব্য শারুক্ষান
আর এইসব ছেড়ে আমি ফিরে যাই নিজ্স্ব সুড়ঙ্গে
যেখানে সযত্নে সাজানো একান্ত ব্যক্তিগত সমস্ত দুঃখ
যেমন করে প্রিয় ক্ষত চেটে নেয় সমস্ত কুকুর
প্রত্যেকটি বিষাদ আর প্রত্যাখ্যান জড়িয়ে আমি সুখনিদ্রা যাই
আর স্বপ্নে এই ছোট্ট দেহ, অন্ধকার কুঠুরি এই সব ছাড়িয়ে
অনেক অনেকটা বড় হয়ে ছেয়ে থাকি তোমাদের শহরের ওপর
মনু, এইটুকু ছাড়া আর কি বা পারি বল ঠিকঠিক করে
তোমরা যাকে ‘হিপোক্রিসি’ বল সেইসব দ্বিভাব আমার মধ্যে প্রকট
কাঁপা হাতে জনপ্রিয় শব্দ সাজাই, নিঃশব্দে চিৎকার করি
লুটেপুটে নেই বিস্কুটের মত তোমাদের ছুঁড়ে দেওয়া সহানুভূতি
মনু, এইটুকু ছাড়া আর কি বা পারি বল ঠিকঠিক করে
পারলে তোমাদের কথা ভেবে স্বপ্নের ভিতর একদিন ঠিক মরে যেতাম।
নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ভাবনা
১
১৯৬২ সালের অগাস্ট মাসে একদিন বেমালুম উবে গেল একটা লোক।
তারপর কেটে গেল নির্ঝঞ্ঝাট সাত সাতটা বছর। তারপর একদিন আদালত তাকে ঘোষণা করে দিলে মৃত। এই নিয়ে একটা গোটা উপন্যাস লিখে ফেললেন জাপান দেশের লেখক কোবো আবে। অথচ যতটা নির্লিপ্ত ভাবে এতদূর বললাম আদতে কিন্তু সেরকম নয়।
একবিংশ শতাব্দীর আমি ১৯৬২-র উপন্যাস পড়ি। ক্রমশ দ্বিধাগ্রস্ত হই। হারিয়ে যাওয়া তো হামেশাই ঘটে, নিরাসক্ত আবে লেখেন, প্রতি বছর জাপানে ফেরার হয় শয়ে’শয়ে মানুষ। বিগত ৫০ বছরে সফল ভাবে নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রক্রিয়া কি হারে জটিল হয়ে উঠেছে, এই বিষয়ে আবের সাথে আমার বিতর্ক চলে। তারপর সমীক্ষা খুঁজে দেখতে পাই ২০১৯ সালে জাপানে নিরুদ্দিষ্ট সাতাশি হাজারের সামান্য বেশি কিছু লোক। অথচ যতটা সহজে এই তথ্যটুকু লিখলাম আসলে কিন্তু তা নয়।
ভাবি অনায়াস প্রস্থান করব, তবু জোর করে কালো পোশাকের মানুষ। বালি চাপা রেখে যেতে বলে প্রত্নচিঠি ও বিগত ছাব্বিশ বছরের স্মারকসমূহ। বালিয়াড়ির ওপার থেকে দিকনির্দেশ করে সাতাশি হাজার নিরুদ্দিষ্ট হাত। সাতাশি হাজারের ভিড়ে আরও একজন হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে হঠাৎ-ই মনে পড়ে, এখন আমার নিরুদ্দেশের জন্য অপেক্ষা করে নেই আর কোন লেখক, ঔপন্যাসিক।
২
দূর থেকে দেখতে আমার সচরাচর বেশ ভাল লাগে।
রাস্তায় পরিচিতদের দেখলে আমি ইদানীং নিজে থেকে ডাকি না;
তাদের আত্মমগ্নতা উপভোগ করি
দেখেছি বৃষ্টির ফোঁটা কি সহজ প্রকারে পুকুরের জলে লীন হয়; হাত বাড়িয়ে
সেই পরিণতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে ইচ্ছে করে না আমার,
মনে আছে প্রিয় নারীরা যখন মৃদু হেসে এক এক করে তলিয়ে যাচ্ছিল
তাদের চিৎকার করে বাধা দিতে গিয়ে আবিষ্কার করেছি
এখন আমার গলায় কোন আওয়াজ নেই…
৩
প্রায় ছাব্বিশ বছর আগে , শেষ বসন্তের এক বিকেলবেলায় আমার জন্ম হয়েছিল । অদ্ভুত কিছু নয়, তবু একটা ডুবন্ত সূর্য আর রাশি রাশি নিরুদ্দিষ্ট পাখিদের নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে খানখান করে একটি সদ্যোজাত শিশু কাঁদছে; এ দৃশ্যের কল্পনা আমায় আজও অভিভূত করে …
রবিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২০
তুষ্টি ভট্টাচার্য
সাইকেল
১)
সাইকেলটা সামনের গাছে ঠেস দিয়ে রাখা। উলটোদিকে অন্য এক গাছের গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে এক যুবক। দুধারে সবুজ ধানক্ষেতে দোলা লেগেছে আচমকাই। একটা ঠান্ডা ভিজে হাওয়া এসে দুলিয়ে দিয়ে গেল সেই যুবকের মনও। গ্রাম বলতে যা ছবি আমাদের চোখের সামনে এসে যায়, অবিকল সেরকমই একটা পিকচার পোস্টকার্ডের ছবি তার চোখের সামনে। খেতের মাঝখান থেকে একফালি পাকা, বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে দুদিকে। কোথাও কোনো বাড়তি আবর্জনা নেই এই গ্রামে। যখন তখন বর্ষা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে এই উত্তর পূর্ব সীমান্ত এলাকার গ্রামে। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা দূরেই, ফলে এই অঞ্চলে তেমন জল জমে না। কাদা জমে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে না চারদিক। আর সবুজ যে এত ঘন, নরম আর মোলায়েম হতে পারে এই ছেলেটির তেমন জানা ছিল না আগে। ছোটো ছোটো বাড়িগুলোর বেশিরভাগই পাকা, খড়ের বা টিনের চালে ছাওয়া, নয়ত পাকা ছাদ। ছাদের মাথায় লাউ, কুমড়ো শাক শনশন করে বেড়ে উঠছে এই তেজী হাওয়ায়। যুবক এখন লাউশাক, কুমড়ো শাকের ঘন্ট খেতে শিখেছে, খেতে শিখেছে ভাত, ডাল আর নদীর মাছও। সাইকেল এসবের সাক্ষী। ওর দিকে চোখ গেল তার। সাইকেলটা যেন চোখ মটকে কী একটা ইঙ্গিত করল ওকে। একটু কি আরক্ত হল যুবকের মুখ? সাদা রঙে তামাটে ছোপ পড়লেও তার টকটকে গালে লজ্জার ছাপ। লজ্জা পাওয়ার যে সহজাত বোধ, সেও কি এখানে এসে সে শিখে ফেলল এই ক’মাসে?
অলস বসার ভঙ্গী ঝেড়ে ফেলে দিয়ে এবারে সোজা হয়ে বসল সে। পাশে রাখা গিটারে টুংটাং বোল তুলতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর আবার দ্বিধা নিয়ে সুর তুলল, গেয়ে উঠল দু কলি-
No puede ser
no soy yo
me pesa tanto el corazón
por no ser de hielo cuando el cielo me pide paciencia
আর সেই সময়েই যেন মাটি ফুঁড়ে দুটি শিশু হাজির হল ওর সামনে। ওদের দেখে গান থামাল সে। কিন্তু শিশুদুটি সমস্বরে বলে উঠল, আবার গাও, আবার গাও। মানে কী এই গানের?
সে এখন মোটামুটি বোঝে ওদের ভাষা। নিজের ক্ষমতায় যেটুকু কুললো, তাতে বলল, ‘মানে? মানে জেনে কী করবি তোরা? গানের সুরই হল সব। আর কথারও প্রয়োজন আছে বৈকি! তবে তার মানে যেমন খুশি ধরে নিলেই হবে। ওই যে আকাশ দেখছিস, ও আমাকে জিজ্ঞেস করছে—কেন তোমার মন এত ভারি হয়ে আছে আজ? আমি ওকে বললাম—না, না এ আমি নয়, আমি হতেই পারে না। অন্য কেউ, যার মনে বরফ জমেছে, সে আমি নয়, অন্য কেউ, অন্য কেউ……’
এক ক্ষুদে কোলের কাছে ঘেঁষে এল যুবকের। ‘তোমার কি মন খারাপ করছে দেশের জন্য?’
(ক্রমশঃ)
সমিধ গঙ্গোপাধ্যায়
এই সংখ্যার কবি সমিধ গাঙ্গুলি। ইতিহাসে স্নাতকোত্তর হওয়ার পর আপাতত সরকারি চাকুরে।পেশাগত সময়টুকু বাদ দিলে বাকি সময় ইতিহাস আর কবিতা নিয়েই কাটে।কবিতা সংক্রান্ত যে-কোনো আলোচনায় নিবিড় শ্রোতার ভূমিকায় নিজেকে দেখতে ভালো লাগে।
আর ছুটিছাটায় পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়াটা সোনামুগের
সঙ্গে আলুপোস্তর মতই অবশ্যম্ভাবী।
সুষুপ্তির জেব্রা ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে
----------------------------------------------
১.
তার বিহনে পাগলাঝাঁপ ছুটি
দিনের শুরু, নিছক বাড়ি ফেরা
মহুয়াভীরু দাওয়ায় খুনসুটি
রোদে মিশছে পাহাড়বালকেরা
ভাল্লাগেনা বিরহী বিস্কুট
চুমুর আগে ঠোঁটের গলে যাওয়া
তোমার হাতে অচেনা মনছুট
আমার কাছে ধুলোর মত হাওয়া
আস্কারার জামায় মোছা ঘাম
সন্ধ্যেবেলা লুকিয়ে বাড়ি ফেরা
মেঘলা হ'লে পায়রা ওড়াতাম
রোদ শেখাত বিষাদপালকেরা...
২.
বাস্তুহারা বিগত সংসার
ইস্ত্রিহীন উঠোনে তানপুরা
আদায় করা ম্যাপের অধিকার
অভিনয়ের শর্ত আনকোরা
লাগাম যদি আগুনে বশ থাকে
শৌখিনতা কাহারবায় বুঁদ
শান্ত চাঁদ ঘুমোলে মৌচাকে
ঢিলের কাছে ব্যর্থতার সুদ
আগলে রাখা বেহুঁশ ক্যাথিটার
ঘোলাটে হয় বধির কানকোরা
আদায় জানে লাভের অধিকার
শিরদাঁড়ার শর্ত আনকোরা...
৩.
ক্যাকোফোনির বেহাগে আংরাখা
মগজরঙা হ্রদয় কাঁদে না
গুমটি। মাঠ। সদ্যোজাত পাখা।
মেজাজী ধোঁয়া জীবন বাঁধে না
দশমিকের বাঁ পাশে রাখা বিষ
দেরাজ খোলে আনপাড়ার ঠেকে
মেহফিলের মাহুত আনুবিস
পূর্বাভাস বুঝিয়ে সংক্ষেপে
উঠে দাঁড়ায়। প্রজাতিহীন চাকা
হেঁচকি তোলে নরম ছাঁদে না
দিঘি।বাগান। মেদুর। পটে আঁকা।
মাসকাবারি জীবন সাধে না...
৪.
শিশুআঙুল মগ্নতাকে ছুঁলে
খিচুড়িভোগে অনাদি তরী বাওয়া
গৃহপালিত জাবনা খুঁড়ে তুলে
জরুরী ছিলো তোমার কাছে যাওয়া
শুকনো চোখা মরসুমের দাঁড়ে
চশমাওয়ালা গর্জনের চাষ
নুনছালের শীলিত টংকারে
মাখানো ঝরা পাতার নির্যাস
অক্ষরের উলটো বাহুমূলে
মন্ত্রপূত অন্ধ হতে চাওয়া
কাফের,তবু ভেজা আগুন ছুঁলে
জরুরী হয় তোমার কাছে যাওয়া...
৫.
এবং থাকো গোপন শিরাপথে।
মজা পেলেই গুছিয়ে নাও খাট
ধর্ম লেখে যে যার প্রিয় গতে
মানুষ পাওয়া ভীষণ ঝঞ্জাট
এবং থাকো মোহিনী বিদ্যায়।
কেতাবী রুচি তোমার পরাধীন
ডুবতে পারো যে কোনো বন্যায়
প্রস্তাবনা পাঠাবে মরফিন
এবং দ্যাখো মাকাল,প্রতি বাঁকে
হাওয়াই চটি।চালাকি,রাজপাট।
বর্ম পেলে যে যার মতো থাকে
মানুষ হওয়া নোংরা ঝঞ্জাট...
৬.
যেমন কাঁচাকথন ভাতে পাই
লোহাকরুণ আংড়াভাসাতেই
জড়তা ভাঙে বন্ধুদের ছাই
এখনো আছি বাংলাভাষাতেই
মোরগঝুঁটি দোলানো বাস্কেট
বুড়ো হওয়ার দু-মুঠো নষ্টামি
হিয়ার মাঝে জিয়ল সংকেত
শোনো,তোমায় বলতে চাই আমি
জর্দা যদি পানের কিংখাবে
তুমিও শুধু সর্বনাশাতেই
সে-সব ব্যথা কালকে ভাবা যাবে
আজকে থাকি বাংলাভাষাতেই...
৭.
চোখের পাশে তাগড়া আস্তিন
গোটালে তুমি প্রেমিক হতে পারো?
চমৎকার আহত আস্তিক
মাংস নয় আবেগ দিয়ে মারো
জেহাদি পথ,বাঁধাকপির ক্ষেত
সীমানা ঘেরা যৌথ পরিবার
কথকতার বাক্সে রাখা বেত
বড় হলেই বলবে "জমি ছাড়"
আবহমান গোমড়া বাস্তিল
আবহাওয়ায় রসদ পেলে আরও
তিনভাঁজের ব্যহত আস্তিন
চাবুকে নয় পাঁজরে পিষে মারো...
৮.
ফিরতি নায়ে তোমার দেখা পাই
বাঁশরী যদি ভালোবাসায় ধরো
সভ্যতার নিহিত খাইখাই
অফুরবেলা ছিলিম টেনে মরো
বসেই থাকো চৌকাঠের দলে
তন্ত্রে আনো মহাদেবীর ছাঁচ
অপরিমিত বিশ্বাসের মলে
প্রাদেশিকতা রপ্ত করে নাচ
জলের দেহে খাস্তা জমি পেলে
সুজাত রাগ তুমিই সম্বরো
পাকস্থলী নির্বাসনে গেলে
দ্বিধালবণ ধোঁয়ায় কেশে মরো...
৯.
মেধা এখন বিষয়ভিত্তিক
কোন সোহাগে কটা বলদ জোটে
প্রশ্নমালা হাসলে ফিকফিক
অনধিকারচর্চা মজা লোটে
তুমিও প্রভু আমার মতো বেঁচে
থাকতে করো রেশন মঞ্জুর
বিশ্বাসীরা কবেই মিলিয়েছে
বুকে হাঁটার তর্ক কিছুদূর
আগাম কোনো ধৈর্য নেই মোটে
ডিগ্রী বশবর্তী হবে ঠিক
স্বভাবে তবু পঙ্গপাল জোটে
কারণ মেধা বিষয়ভিত্তিক...
১০.
চারুপথ ভুলে যাও ক্রিসেনথিমাম
অ আ ক খ অভ্যাস পাঁশুটে হাওয়ায়
দেহপট সনে মাখো সুবচনী ঘাম
পাথেয় ফুরোতে পারে এটুকু চাওয়ায়
তুমি হবে বর্ণনা অতীতের মতো
ভজনালয়ের পাশে পাহাড়ি মাতাল
ওজনে সমান রেখো হিসেবের ক্ষত
মগজের ভাতঘুমে নিশুতি আকাল
কামিনী অঙ্গ তবু ভাঙে উদুখল
বসন্তে একা বীজগাণিতিক ট্রাম
তোমার বিশদে চেয়ে বসলে অতল
পোশাকটা ধুয়ে নিও ক্রিসেনথিমাম...
রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০
জয়ীতা ব্যানার্জী
রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২০
অনিন্দ্য পাল
সৃজন এই সংখ্যার কবি অনিন্দ্য পাল।
রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২০
মৌমিতা মিত্র
এই সংখ্যার কবি মৌমিতা মিত্র।জন্ম ১৯৯৫ । কলেজ জীবনে কবিতার হাত ধরেছেন।একটা সমস্যার মুখোমুখি ছেলেবেলা থেকেই হতে হতো — তা হল সকলের সাথে মিশতে না পারা। অনেক কথা থাকতো যা হয়তো বলার প্রয়োজন মনে করতেন কিন্তু বলা হয়ে উঠতো না। অনেকটা নিজের জগতে গুটিয়ে থাকা এই কবি কবিতার মধ্যে দিয়ে নিজের না বলা কথাগুলোকে তুলে ধরেছেন। এর পাশাপাশি কবিতায় নিজেকে জানতে চেয়েছেন সবসময়।
সন্ধে নামলে
ঘর
















