রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২০

সোহেল ইসলাম

                                         

   


এই সপ্তাহের কবি সোহেল ইসলাম।জন্মঃ ১৯৮৫ ১লা মে । ২০০১ থেকে লেখা শুরু। প্রথম লেখা ব্যাক্তিগত না পাওয়া থেকে।তারপর দেখেছেন শুধু নিজে নয় হাজার হাজার মানুষ না পাওয়ার পুকুরে গলা জলে ডুবে যাচ্ছে,ডুবে আছে, তাদের কাছে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য লেখা। কবির মতে লিখলে ,না বলা গুলো, না বোঝাতে পারা গুলো বলতে পারেন। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "সবাই প্রতিরোধ শিখুক,প্রতিবাদ শিখুক,নিজের দাবি নিজেরাই জানাতে শিখুক।কেউ কারুর কান্না কেঁদে দেয় না।রাজস্থানের গ্রামে রুদালি ভাড়া পাওয়া যায়,কিন্তু আমাদের রুদালি আমরাই হব।কাউকেই এক ছটাক জমি ছাড়বো না।" প্রিয় কবিঃ রঞ্জন আচার্য। প্রিয় বই : সম্পর্ক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - আব্বাচরিত(প্রথম প্রকাশ : নভেম্বর, ২০১৮।দ্বিতীয় প্রকাশ : এপ্রিল,২০১৯ প্রকাশক : নাটমন্দির)।লেখা 'উত্তর দক্ষিণ' পত্রিকাতে শুরু,আজও সে পত্রিকার সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন।আসুন পড়ি তার কবিতা I

সাতে সমুদ্র
সোহেল ইসলাম
১.
যেদিন দুজনে নদী পার করলাম
পায়ে বালি নিয়ে
নতুন ঠিকানার নেশায়,
আড়চোখে তাকাল পৃথিবী
হলুদ আলোটা ধরতে যাবো যেই
বিকেল লুকিয়ে নিল

আমাদের এক হওয়ার উৎসবে
অন্ধকারে শুধু সাঁতার কাটলাম
২.
আবৃত্তি শেখা স্কুলের গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছি
পাশ দিয়ে রিক্সা পার হল
রিক্সার চাকায় পিষে গেল অপেক্ষা

কাপড়ের তারে উড়ে এল দুটো পাখি
মাঝখানে আধভেজা কাপড় আমাদের
বাঁধের রাস্তাটা দেখছে,
ওই রাস্তাতেই
আলাদা হতে হতে মুখ ফিরিয়েছিল
ছায়া ―
        যেন হারমোনিয়ামের দুটো রিড

একটা সাদা                 একটা কালো
৩.
ভাঙা সাইকেলের ছায়া শান বাঁধান পুকুরের মত
শরীরে খয়েরি রঙের শেওলা
অথচ,লোহার কঙ্কালে একদিন জীবনের শিস ছিল
যমুনার স্রোত ছিল 

আজ,
বাজারের ব্যাগ
এতদিনকার চলা পথ
পথের হিসেবেই শুধু বেঁচে থাকা
খোঁজ খবরে আকুল কোনও কাপড়
ঝাড়পোছ করে না
বিশ্বকর্মার ফুল সিঁদুরও পড়ে না কতকাল

নিজের ছায়াকে দূরে পাঠানো
আর কাছে টেনে আনাই এখন তার কাজ
৪.
খন গানের আসরে
সীতার নুপুর খুলে গেছে
রামচন্দ্র ঝুঁকে বসছে মাটিতে
হ্যাজাক লণ্ঠনের আরতিতে
মায়ার হিড়িক―
এ দৃশ্যটা উলের কাটায় আসনে তুলেছিলি,
যত্নে আছে,
কাঁসার থালায় আমন ধানের দুঃখ নিয়ে খেতে বসি

দশভূজা,তখন তুই কোন আসনে 
আমাকে খুঁজিস ?
৫.
সমস্ত কিছু চুলোয় যাক
এভাবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে
ভুলে যাওয়া ঢের ভালো
কিন্তু পারছি না
এর বেশি জানানোর নেই আপাতত

রাস্তা দিয়ে তাকাতে তাকাতে যাই
ফেরার সময়ও তাকিয়ে থাকি
বারান্দায় ফাঁকা টুল
তোমাকে দেখি না

এর সব কিছু
থেকে যাবে―
দেওয়ালের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেড়ে ওঠা
বট পাঁকুড় হয়ে,
শুধু,তুমি আমি থাকব না
৬.
মনে মনে চাইছি
তুমুল বৃষ্টি নামুক
মাঝের গর্ত ভরে যাক জলে
তখন না হয়
সাঁতার কেটে এক হওয়া যাবে
৭.
তুমি যেই মুখ ফেরালে
আমি কলম তুলে নিলাম
কিছু একটা ছিল বলেই না
এই চাওয়া
তুমি মানতেই চাইলে না
সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেট পার করে গেলে
শামুকের খোলা মুখের দিকে ফিরেও তাকালে না

কি আশ্চর্য,এই সম্পর্কের ওঠানামা

রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২০

শীর্ষা মণ্ডল



আমাদের এই সপ্তাহের কবি শীর্ষা মণ্ডল ৷জন্ম বীরভূমে। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলজিতে স্নাতকোত্তর এবং গবেষণা। বর্তমানে মধ্যপ্রদেশে একটি কলেজের অধ্যাপিকা। শখ কবিতা-গল্প-উপন্যাস পড়া এবং টুকটাক লেখা। লেখালিখির সূচনা স্কুলজীবনের সাহিত্যসভা থেকে। একমাত্র বই 'তারাফুলের শবযাত্রা' (২০২০)।


উদযাপন এবং বেহালা

রঙ উঠে যায় বিকেলের জামার,
ফিকে হয়ে আসে মাঠের ওপর
গা-গড়ানো আলস্য রোদ,
বেলফুলের সাদাটুকু সক্রিয় হয়ে ওঠে –
অদৃশ্য মাদকতা দিয়ে আলোর
অভাব মুছবে বলে


মধ্যযামের কথা পশুর স্মরণশক্তি মাত্র।
কিংবা মধ্যযাম নিজেই পশুটির ছিন্নমস্তা দাঁত –
অদ্ভুত অলৌকিক দিয়ে প্রতিটি শব্দকে যে
কিনে ফেলতে পারে অনায়াসে


প্রতিটি ছেদ-পরবর্তী গোঙানি শুনেছিল বেলফুল,
বেলফুলে বসা ভ্রমর তার গুনগুন দিয়ে ঐকান্তিক কথা
চালান করেছিল সাদা পাপড়ির কানের মমতায় — বলিপ্রথা সাঙ্গ হলে
মমতার সাদা তাই নিজে থেকে
কাঁধে তুলে নিল মৃতকে সাজানোর
অভিযান।


রঙ উঠে যায় রাত্রির অন্তর্বাসের
কালোর পোঁচ জলধোওয়া হতে হতে
সাদাকে ডেকে আনে –
চড়ুইয়ের ফুড়ুৎ ওড়ে, রান্নাঘরে
ফুট-ফুট চা পাতার গান বেজে ওঠে – যেন কিছুই হয়নি!
যেন চা গাছ আর মানবী একটিই শব্দ –
মৃত্যুর ঘুমহীন উদযাপনকে প্রতিদিন
বেহালা বাজিয়ে শোনানোর গুরুদায়িত্ব নিয়েছে



অস্থির-বাস 
*
অসহ্য বিকেল
ঝাড়ুদার বিকেল
জংধরা বিকেল
সন্ধ্যাহীন
না-
ফুরোনো
বিকেল
এমন একটা বিকেলের জন্য
আমি মন্দিরে রোজ
ঘুষ দিতে যাই

*
পেরেকের বর্ম পরে পার হয়ে গেল শীতকাল
ঠুঁটো শীতকাল, জগন্নাথ শীতকাল – জানতেই পারল না অজস্র
চোখহারানোর অন্ধত্বে গাছ কেমন ছটফট করে মরে রাতদিন,
ব্যথার আলজিভে চুমু খায় –
দুটি পাখি তার শরীরে এসে ঘর করবে বলে

*
পৌনে চারটের কাঁটায় গুছিয়ে রেখেছি
দেখা করা –
এভাবে আমি তোমাকে নয়
প্রেমকে নয়
অভ্যাসকেও নয়,
শুধু মহাকালের কাছেই নতশির
জমা রেখেছি – ঋজুতা

*
তুমি কি পারবে তেত্রিশ কোটি মুখের ভাঁজওলা প্রান্তর
পেরিয়ে আসতে, আমার গলা যদি ডাকহরকরা সেজে ওঠে?
যেখানে ডাহুকের দুঃখ ঘুমিয়ে থাকে জীবনান্দের মৃত পাতায়,
সেইখানে বসে কুব কুব করে গান বেঁধে দিতে পারবে, স্বরলিপি ছাড়াই?
কিংবা ফল্গুনদীর ঢেউ দিয়ে একটা সোনালী মাছের চোখ এঁকে দিতে?
যার উজ্জ্বল মণিতে অর্জুনের পেশীসৌষ্ঠব আঁকা?
এটুকুও না পারলে আর কেঁদো না তুমি সারা রাত,
বরং একটা মহাকালের একক কান্নার পদ্য লিখে নামশূন্য লেফাফায়
পাঠিয়ে দিও আমাকে

*
চাঁদের সাদা মুগ্ধ করেছিল আমাদের।
জল দিয়ে, নুন দিয়ে গড়া মই দেখাল
সুদৃশ্য শ্যাওলা কতখানি বেকুব বানাতে পারে –
ঘরবাড়ির অশরীরী কালো ছায়ার মতো


রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২০

তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়


এই সংখ্যার কবি তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়I জন্ম- ১/০৯/১৯৯৬। ২০১৯  প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হয়েছেন। ২০১৫ থেকে সক্রিয়ভাবে লেখালিখির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা ছোটোপত্রিকায় লেখালেখি করেন। ২০১৮ তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম বই 'ঘুম দাও ঈশ্বর', পেয়েছেন 'সোনাঝুরি কবি সম্মান-২০১৯'।তার ১০টি কবিতা পড়া যাক।

১) সুখের আগে নাইবা 'অ' লিখলাম
------  
কবি ফিরে এসে লিখলেন,
বুকে এখন পয়েনসেটিয়া গাছের নিবিড় চলাচল!  
এদিন ওদিক দোলাচ্ছে মাথা!
ওখান থেকে কয়েকটি পাতা রেখে যাব ডায়েরিতে
 কারণ
উপহারকে কখনো শেষ বলতে নেই...

অথচ চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, 
তাঁর হৃৎপিন্ডে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।         

২) অমোঘ
----- 
স্বপ্নে,
আমাকে বিদায় বলে
অতঃপর, তারাটি মিলিয়ে গেল!
 সাবধানে হেঁটে গিয়ে জানলাম,
সে আমার কপালের টিপ ছিল এককালে।

কোনো চুম্বনবিহীন সঙ্গমের পর,
তাকে রেখে এসেছিলাম প্রেমিকের স্নানঘরের আয়নায়। 


৩)  আংশিক
------ 
নদীতে পাথর ছুঁড়ে দেখেছি,
সে কখনো চিৎকার করেনি!
 শব্দ করে বুঝিয়েছে,
  স্নিগ্ধ হাসি!    
একেকদিন ভাল বিক্রির পর
যে হাসি দেখা যায়
ক্লান্ত ফেরিওয়ালার ঠোঁটে।   

৪) সেমিকোলন 
---- 
সন্ধের দিকে পা বাড়ালে 
সকাল অভিমান করে না!
কিন্তু
তোমার দিকে পা বাড়াতেই এক নারী
সহসা এগিয়ে এল কাছে...
মুখে তার অজস্র দাগ!   
যেন বালিকা জীবনের ভেতর
 ধরে রেখেছে বার্ধক্য কুসুম!

পরিচয় জিজ্ঞাসা করতেই আকাশবাণী হল,
এই আমার ছায়া,
জন্ম থেকে সঙ্গে সঙ্গে আছে।    


৫) ভিক্ষা শেষ হলে
----
আমার গর্ভ শূন্য করে
 যে সন্তানটিকে নিয়ে গেলে
সে একদিন দস্যু হবে!
 তরবারি দিয়ে অসহ্য অক্ষর ছিঁড়ে
 সন্তান আমার,
তোমাদের চোখের মণির মধ্যে চেপে ধরবে হাঁটু! 

অন্ধ তোমরা,
 হাত তুলে বিলাপ করতে করতে বলবে -
'পারে,
 নিশ্চিত, 
একটি কবিতা করতালি ছেড়ে 
মঞ্চের পিছন দিকে অন্ধকার আলোয় 
বিমর্ষ মানুষের বুকে গেঁথে যেতে পারে।'





(সিরিজ)

সর্পদংশনে 
----- 

(১) 
বিষ উগড়ে দিচ্ছে মুখ। 
সে মুখে চুম্বন কতখানি অপেক্ষার বিষয়
তা  নিয়ে কাটাছেঁড়া করছে ছটফটে তরুণ।
তরুণের ঠোঁট 
এর আগে আরও বেশি বিষ পানে খ্যাত... 

(২) 
নারীর স্তনের মত আকাশে
ধবধবে বক উড়ে যায়।
শ্যাওলা ধরা দেওয়ালের পাশে 
আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে যাওয়া মিলনদৃশ্য 
বুঝে নিচ্ছেন পরিচালক,
যিনি কিনা সাহিত্যে কাঁচা!  



(৩)
লিপি আঁকড়ে থাকে সাপ
সাপের গতি বাড়ে ফেনিল সমুদ্রে।
সমুদ্রে ঝিনুক কুড়াতে গিয়ে তাই
হারিয়ে গিয়েছিল মেয়েটি
মা...  

(৪)
ঘড়ায় মোহর ভরা আছে।
ঘরে আছে কৃষকের লাঙল। 
লাঙলের ফলা থেকে জন্ম নেবে কর্ষিত সীতা এবং মানসকন্যারা।
অথচ মনের কোনো লিঙ্গ নেই,
নেই যোনিমুখ। 

(৫)   
সর্পকাব্য পড়, 
ফিরে পাবে হারানো প্রেমিক।
প্রেমিক ভুলিয়ে দেবে দুঃখ,তাপ,জরা। 
কান্নায় মিশে যাবে একা একা খেলার দুপুর।

সর্পকাব্য পড় সন্তর্পণে!
দংশন স্থানে রেখে দেখ আঙুল!
ইতিহাস জানে সাপে আর অগ্নি গহ্বরে
কতখানি ভাব,ভালবাসা!       


তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়
যোগাযোগ -৯০৬৪৭৫৯৯২৭  


রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২০

শানু চৌধুরী



" সৃজন" ব্লগজিনের এই সপ্তাহের শানু চৌধুরী ৷ জন্ম ১৯৯২ সালের জানুয়ারী। ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতক। শানুর লেখালেখি শুরু ২০১৫ সাল নাগাদ। এখনও পর্যন্ত একটি কবিতার বই ‘আলো ও আত্মহত্যা’, প্রকাশিত হয়েছে ২০১৯ সালে। কবিতার পাশাপাশি গদ্য ও প্রবন্ধ লেখায় পারদর্শী৷ পড়া যাক তার কিছু কবিতা।




১.
রঙ থেকে বেরিয়ে গেলে আরেকটা রঙ হয়
যে রঙের আগে সময়ের স্পৃহা লেগে যায়

আমি সময় দেখি অতল থেকে মাংসের দাগে
জ্বালের আকাশে কাঁচাতেল ও গন্ধের শিখা

এত নাবিক হল, সমুদ্র তবু টোপ বুঝলো না
আঙুল ক্ষয়ে যেতে যেতে পায়ের রেখা

নুনের মতো দামী হয়েছে কি কোনোদিন?

বীজ ঝরে যাওয়ার আগে যন্ত্র থেকে যে শব্দ হয়
আমাদের ঢাল বরাবর বরাদ্দের চাষ হয়নি তা এযাবৎ

২.
চাবি খুলে নেওয়ার আগে পড়ে গেছে শিশির
বিষন্ন হেলের খোলস ছাড়ার আগে একবুক
দিয়ে দেখি ইন্দ্রপতন!

এভাবেই উচ্চতার আগে দ্বিধার নিকটে
উড়ে এসে বসে জ্যান্ত মধু-র ইউলিসিস

যার শবে রাখা আছে একদানা ঋতুর সেতার

৩.
বিকেলের আগে হিপোক্রেসি করেছে
আমাদের নিতান্ত চা বাগান
অতএব একটা আফিমের সরল বীজে
আমাদের ক্ষয়ে যাওয়ার কথা ছিল

আমি দেখেছি চড়ুইভাতির সাথে
চড়াইয়ের সম্পর্ক নেই
শুধু খাবারের দানা ঘাসে ঢুকে গেলে
পদাতিক হয় সামান্য ঈশ্বর!


৪.
দুধ দোয়ার আগে পৃথিবী থেকে চাবুক হল একটানা হিম
যে পাতার আগে মিহিন বসেছিল তার রুক্ষতা
অনায়াসে মেলে দিল প্যাগান ও প্রার্থনার নিরাকার লিঙ্গগুলি

তবুও শ্রমের কাছে নগর ছিল
পেরেকের কাছে ছিল ভাষাবোধ
           তুলসীপাতা ওষুধ হওয়ার আগে
বর্ণময় লাল শালুতে ঢাকা হয় আমাদের গ্রন্থসভা

৫.
ফোটন বুঝতে গিয়ে দেখি চরিত্র বদলে যায়
যে দেখায় বসে আছে নিকট ইন্দ্রিয়
তাকে দেখে কি অবাক হবো না?

যে পায়ের আগে ঘুম লেগে থাকে
তার চাকায় নদীভাগের দাগ
এই কোয়ান্টাম অথবা হাইপোথিসিস
                   হাস্যরোলের আগে খুঁজে নেয়
জ্যামিতির আকারে মাপসই জুতো

যেখানে আমাদের সমুদ্রগুলি সিন্থেটিক হয়ে গেলে
পাথর আর প্রতিমার ফারাক থাকে না

৬.

রোদের গোড়ায় বৃষ্টি পড়ছে আর স্বাস্থ্যগুলো
ভেঙে যাচ্ছে পেয়ালা বরাবর
যে দৌড়গুলোতে বুক ফুলে গেছিল আমাদের
তাকে আজকাল প্রশিক্ষণ বলে ডাকো

   মারা যাওয়ায় ল্যাটিন দর্শন থাকে
        যেখানে
কাচের শিশুরা আজ অবধি ছাত্র হলো না আমার
অথচ গাছের নাম জানতে চেয়ে
গতজন্ম মাপতে চেয়েছি বারবার

৭.
মুঠোর ভিতর স্তন্যপায়ীর রূপক
আমি ছাড়িয়ে এসেছি মেধাহীন জলে
এভাবে বাচ্চাদের দেখতে দেখতে
মেহফুজ গল্প লিখে ফেলে ঈশ্বরের হাতে

উন্মাদ হয়ে কেউ ঝাঁট দেয় সকালের উঠোন
আর খাটাল থেকে শুনি শ্লেষভরা দুধের আওয়াজ

কীভাবে ঘোরালে নিলাম?
এসব ভেবে দেখি বিস্ময় আর জিজ্ঞাসায়
আটকে আছে মোষের তেল মাখানো দেহ

আর অস্থিরভাবে কারও পেটের ভিতর
ধরে যাচ্ছে
বিষাক্ত রেডিওর গান.

৮.
খালকে কাজে লাগিয়ে জমে যাচ্ছে
খালের
মা
এভাবে ঋতু থেকে দূরে দাঁড়িয়ে
বিভ্রম হয় শালিখের ডানা
শা
দা

জল খেতে গিয়ে যাদের ভিজে গেছে ডানা
তাঁদের রক্তে দেখি
কবিতার ঝাঁঝ বয়ে নিয়ে যেতে
পারেনি সন্ত্রাস

৯.
হাসি টপকে যাওয়ার আগে
অভিশাপ নিয়ে খেলেছিল হীরের ছাদ

আমার ভুলে আমি যেভাবে মনীষা
সেভাবে পাথর হল না

ভালবাসছি ঈর্ষা দিয়ে
কবিতা লিখতে
লালসা দিয়ে নয়

এভাবে ভাতের হাঁড়িতে
চাপা পড়ে যায়
সভ্যতার অধিক হ্যাঁচড়
১০.
রুচি থেকে বিরতি নিলে
নিজেকে টাটকা লাগে না কখনও
এভাবে আঁশফলের বাগানে
ছেঁয়ে থাকে পোকার কাচ

আমি দেখেছি
ওরা ফিরে যায় আগুন থেকে
চোখের শান্তিকে রেহেলে বসিয়ে

ঝুনো হয়ে যাওয়াকে কি পুরনো বলা যায়?
জুন থেকে গড়িয়ে এসে ধাক্কা মারে আকাঙ্ক্ষার ব্যথা

এভাবে শতাব্দী ও সুচারু গাছ
সংক্রামক কোণে বসে থাকে
ঝরঝরে নাভিকে ধুয়ে নেয় স্যালোর জলে
এভাবেও মহৎ হয় অশ্বের বেদ
যেখানে বৃষ্টি আটকে দিয়েছিল রোদের কুঠার




রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

জয়াশিস ঘোষ




"সৃজন " ব্লগজিনের এ সপ্তাহের কবি জয়াশিস ঘোষ৷তার +জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৬ শে জানুয়ারি। পেশায় সরকারী আধিকারিক। নেশা ঘুরে বেড়ানো ও লেখালেখি। তাঁর লেখায় বারেবারে উঠে আসে মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষদের জীবনকথা। লেখা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, কৃত্তিবাস, তবুও প্রয়াস, শুধু বিঘে দুই, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম, সৃষ্টি, কোলাজ সহ অনেক ম্যাগাজিন ও ওয়েবম্যাগে।

প্রকাশিত বই পাঁচটি। বৃষ্টি আসার আগে (নীলকন্ঠ প্রকাশনী), বৃষ্টি বাই লেন ( অপদার্থের আদ্যক্ষর ও গ্রন্থালোক) এবং চুল্লী (রংছুট প্রকাশনী) কবিতার বই। অপদার্থের আদ্যক্ষর থেকে কলকাতা বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত হয়েছে বিষয়ভিত্তিক গদ্যের বই 'ডার্ক চকোলেট ও অন্যান্য'। সৃষ্টিসুখ থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত 'বৃষ্টি বারোমাস' লেখকের প্রথম গল্পের বই।



আবহাওয়ার খবর


চলে যাওয়ার দিন বৃষ্টি আসবেই

একটা একগুঁয়ে কুকুর আপনার চৌকাঠে
বসে থাকবে। বিস্কুট দিলে আপনার দিকে তাকিয়ে
মুখ সরিয়ে নেবে

চলে যাওয়ার দিন খবরের কাগজওয়ালা বলবে
একটা লটারির টিকিট কাটবেন স্যার? বাড়িতে ছেলেটার
খুব অসুখ…

চলে যাওয়ার দিন আপনি অনেকক্ষণ ধরে
গাছে জল দেবেন। নতুন পাতায় হাত বুলিয়ে বলবেন
ভালো থাকিস

হারিয়ে যাওয়া কোন বন্ধু দুম করে মেসেজ পাঠাবে
পাশের বাড়ির যে মেয়েটিকে লুকিয়ে দেখেন
সে নারকেলের বড়া দিয়ে যাবে এক বাটি

পড়ে থাকা রেডিওটা সস্তায় বিক্রি করে দেওয়ার আগেই
অনেক দিনের মৌনতা ভেঙে
বলে উঠবে বিবিধ ভারতী

চলে যাওয়ার দিন খবরে বলবে
আবহাওয়া আগামী তিনদিন খারাপ থাকবে
                                 সমুদ্রে যাওয়া মানা...



খিচুড়ি


খিচুড়ি বসানোর আগেই বাসগুমটি নদী হয়ে গেল

কাজলদা ছুঁয়ে গেছে যেখানে
সেখানে এখন জেদী মেঘ। যেন টোকা পেলে
ঝরবে খিচুড়ির হাঁড়িতে

দূর থেকে রেলগাড়ির কু-ডাক আসে
মেঘ হাতে করে এক দৌড়ে জানালায়

খিচুড়ির হাঁড়ি থেকে ভাজা পেঁয়াজের গন্ধ লাগে
আপাদমস্তক ভিজে যায়

কিশোরীর কপালে শাঁখের দাগ

আজ এই ভীরুলগ্নে যদি কাজলদা আসে,
যদি ক্ষিদে পায়

সমস্ত সিঁড়ি ভেঙে ছুটে যাবে
             খিচুড়ি বেড়ে দেবে অঙ্কের খাতায়...




দর্জি

ফিরবো না আর -
এই বলে একটু দূরে নারকেল গাছের নীচে
বসে আছে বউটি। ভেঙে ফেলেছে কাচের চুড়ি
                        আধখাওয়া সিঁদুর

ঝড় আসবে জেনেও
মাঝিটি বসে আছে নৌকার পাশে
তারপিন তেল দিয়ে মুছে দিচ্ছে দাঁড়ের চোখ

ফিরতে ফিরতে দল থেকে একা হয়ে যাচ্ছে পাখি

অঙ্কের মাস্টার বসে আছে বাসস্টপে
যদি কিশোরী মেয়েটি বাড়ি ফেরার সময়
                        নামতা ভুলে যায়

আর এদের থেকে একটু দূরে
তুমি অপেক্ষা করছ একজন দর্জির

            যে ভুল বোতাম সেলাই করেছিল…
ইনটু দ্য ওয়াইল্ড


নদী পেরোনোর সময় মনে রেখো
ফেরার সময় জল বেড়ে যেতে পারে
সমস্ত ইতিহাস রেখে আসো নদীর ওপারে

এখানে শুধু ঘাসের দিন
একটি পরিত্যক্ত বাস, যার গায়ে মরিচের দাগ
শুকিয়ে আছে, গোপন ব্যথাটির মত

তোমার অপেক্ষায় কেউ নেই
কেউ ছিল না কোনদিন, শুধু
একমুঠো ধুলো আসার সময় বলেছিল

আর কিছু না নাও, বাঁশি নিয়ে যেও

এখানে ঘাসের বুকে অনন্ত সঙ্গীত ফুটেছে
সমস্ত পশুপাখি শিকার ভুলে শুনছে
               তোমার আশ্চর্য সুর

তোমার গায়ের চামড়া সবুজ হয়ে যাচ্ছে
চুল থেকে ঝুরি নামছে
চোখের পাতায় পিঁপড়ের সংসার

আজ থেকে অনেকদিন পরে যদি কেউ এসে
হাত রাখে তোমার কপালে

জানতেও পারবে না
মানুষ কতটা একা হলে গাছ হয়ে যায়..


জ্বর


প্রতিটি জ্বরের দিনে সমুদ্রপারে বসে থাকি

আবহাওয়া প্রতিকূল। সমুদ্রে যাওয়া মানা
তবু সংসার গুছিয়ে নেয় কতিপয় জেলে

একাকী শাঁখের গায়ে জ্বর
ফেরার অপেক্ষায়
             বালির হৃদয় খুঁড়ে ফেলে

আমি তার ঘুমের ভেতর ঢুকে পড়ি
আশ্চর্য আলো নেচে ওঠে ঢেউয়ের মাথায়
যেন খুঁজতে এসেছে এক দল ঘোড়সওয়ার

রাত জেগে লিখি ফুল ছিঁড়ে ফেলার কাহিনি

যে মেয়েটি বলেছিল যেদিন একা হবে, এসো

মনে পড়ে
             তাকে শাঁখের দাম দিতে পারিনি

দুঃখ


যে লোকটা ঈষৎ ঝুঁকে পেছন পেছন আসত
আমি তাকে দুঃখ বলে চিনি

লোকটার সাথে বনিবনা নেই। অথচ
মাছের বাজারে, অফিসের গেটে
যেখানেই দেখা হত
অসহ্য হেসে আমাকে জিজ্ঞাসা করত,
'ভালো আছ তো'?

এই তো সেদিন, হঠাৎই পেছন থেকে
কাঁধে হাত রেখেছে
হাত সরাতে গিয়ে দেখি আঠার মত এঁটে গেছে

তারপর তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি

সেই থেকে
দুঃখ বসে আছে পাশে কাঁধে হাত দিয়ে
                          হাসিমুখ


রচি মম ফাল্গুনী



চোখ ফেরাতে পারিনি

মিনিবাসে চলে গেছে বিকেল
দুটো ফিঙে জাপটাজাপটি করে
গুছিয়ে নিয়েছে সংসার

তার মধ্যে এক বিন্দু জল
স্বর্গ থেকে নেমে এসেছে তোমার কপালে
যে আলো অন্ধ করে দেয়
আমি তার কাছে ঋণী

সে আলোয় দেখেছি তোমার
উপেক্ষা কতটা নরম হতে পারে
বৃষ্টি নামলে

উঠোনে জমেছে জল
আমার চোখের উপরে পা রেখে
হেঁটে যাও অতল
আশ্চর্য মিনিবাসের দিকে

চোখের কথা আর কে শুনেছে কোথায়
এক উঠোনে এত জল আটকে রাখা যায়!

রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

অনিরুদ্ধ সাঁপুই


এই সপ্তাহের কবি  অনিরুদ্ধ সাঁপুই।কলা বিভাগের ছাত্র।জন্মস্থান— আমতলা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। জন্মসাল— ১৯৯১, মার্চ। প্রায় ৫ বছর ধরে পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করছে ।


*ঠিকানা*

 #১
জলের কাছে এসে আমি যে ডানাটা কুড়িয়ে 
নিয়ে গেছিলাম, তার আত্মায় আকাশ ফুটেছে
মা বলেছে—মুখ দেখা যায়। হাসি, দাঁত, জিভের আগায়
শস্যের স্রোত।
সেদিন অনেক বিকেলে
      ঢেউ গুনতে যাওয়া হয়েছিলো। 
আর ফিরে আসা হয়নি। কোন্‌ দেশের জাহাজ ক্লান্ত কুকুরের 
মতো শ্বাস ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলো, আর পাখিরা তার পেছনে 
মিলিয়ে গেলো অনর্গল।
এখন উৎসবের সময় চলে এলো কাছে
পুরোনো তুলি তারপিনে ডুবিয়ে রেখে রঙ
কিনতে গেছে ছবিওলারা।

#২
পড়শীরা মধু খায়। 
তাদের কুলুঙ্গি ভরে ভ্রমরের চাষ,—দু'একবার হুল ফোটে
আবার সমতলে নেমে আসে চামড়া হাড়গোড়ের কাছাকাছি
       তারা তাকায়, চোখে তাদের সর্ষের খেত
নখের কোলে খাদ্যের স্মৃতি নিয়ে
বুক নাচিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
তাদের সর্বাঙ্গে মধু ও বিষ
ছাদের টবে যে গাঁদা ফুটেছিলো, তা অগত্যা 
একদিন ভয় পেয়ে ঝরে যায় নীচের পাথরে; পাশে রানী 
মৌমাছিটির শবদেহ।

#৩
আমাদের পরিবারে আগে পাঁচজন মানুষ…..
একজন গলায় দড়ি নিয়ে, একজন শিরা কেটে
আর একজন জমিতে দেওয়া বিষ খেয়ে মরে।
আমি আর মা এখোনো মরিনি। আমরা বাঁচবো বলে 
মরিনি।
 এখন প্রত্যহ মৃতদের ছবি এড়িয়ে যাই
এবং,
        তাদের কথা ভাবি—যারা মরে গেলো।
এভাবে ভাবতে ভাবতেই আমরা আর 
বাঁচতে পারিনা মরতেও পারি না—
কিন্তু আমরা জীবিত।

#৪

বর্ষার দিনে আমাদের সবুজ 
জানলাটা বেশ গাঢ় হয়। ফাঁক-ফোকরে দুচার 
পাখি আশ্রয় নেয়। তারা গমের দানা খুঁটে খায় হাত থেকে
সরাসরি, মাঝেমধ্যে হাত খুঁটেও খায় দানা শেষ হয়ে এলে।

বৃষ্টি থামলেও তারা বসে থাকে
দানা যে পাবে না, তা তারা জানে।
হয়তো প্রেম জমিয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের অন্তরালে, যাতে 
পুনরায় এলে না তাড়িয়ে দিই। কিন্তু মানুষের কি আর অত মনে থাকে! তার ওপর সব পাখিই রুপে এক গুনে এক হিসেবে মানুষের কাছে বিবেচিত
তাছাড়া কখন কে মরে—কেই বা জানতে পারে!

#৫
বাড়িটা ছেড়ে যাবো ব'লে দিন গুনি।
আসবাবপত্র সব ছড়িয়েই আছে।
সব খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছি যেভাবে ছড়িয়ে থাকার কথা
যেখানে যা, তা শেষপর্যন্ত সেখানেই থাকছে কিনা
তারপর হুট করে বেঁধে ছেঁদ নেওয়া হবে।
অন্তত ঘাড় ঘুড়িয়ে ফাঁকা মানচিত্রের মতো কয়েকটা রেখা 
দেখতে হবে জেনে কিছু জিনিস রেখেই যাওয়া হচ্ছে।
বেপাড়ার বেড়ালটার জন্যে মাখা ভাত 
আর দেওয়ালে ঘষা কাঁচের আয়না রইল—যদি আবার ফিরে আসা হয় তখন দেখে নিতে হবে মুখটা এখনের মতোই হবে নাকি আকাশে যেমন কিউমুলোনিম্বাস!




মুক্তগদ্য:


*উজর ব্যাথা*
--------------------------------- 


বহুক্ষণ প্লাবন উপযুক্ত মন দেওয়ালগামী দৃষ্টি নিয়ে পথ হারালো। একটা মোমআলো তার গর্ভধারিণী দেহ নিঃশ্বেস করে আকণ্ঠ আত্মদহনে যে আঁধার ছুঁড়ে দিয়েছে সেইদিক সততই একটা সিল্যুট এবং মানুষ কল্পনার ভূত মাথায় নিয়ে ফেরে তাই চোখ একপ্রকার মায়া। এক বিশাল ক্যানভাসে তিরতির কম্পমান পুরাণ ছবির মতো দৃশ্যপট একে অপরে মিশছে। আমি এখানে দর্শক সেই প্রাচীন প্রস্তর যুগ থেকে দণ্ডায়মান আসলে বহুক্ষণের নির্যাস যেন বিভ্রম তৈয়ার করে গতি ক্ষয় অথবা সঞ্চয়শীল উপচার প্রভূত। মগ্নতার ভেতর মুহুর্মুহু নৃত্যরত অকপট সেই আলো মোমদ্বারা গঠিত যেন তিনি আমার দিক হতে আলোকিত- এই কথা! এক্ষেত্রে যদিও অনেক আগে কচি রোম আবর্তিত ঠোঁটের নোনতা স্বাদ একদিন জ্ঞাত করেছিলো সে আমার বয়ঃসন্ধি সেই তখন আমার একক ইন্দ্রিয় যা কর্ণকুহর সম্বন্ধিত যে- শব্দের কী মহিমা। এবং আমার একান্ত দ্রষ্টব্য এই একপ্রকার উচ্চকিত যা আমাকেই যে মড়া মানুষও শব্দরহিত নয়। এক্ষণে টিকটিকির কিককিক ধ্বনি পর্দা করে যেন মঞ্চের আলো নিভলো আর সে মানুষ যে কিছুদূরে হতাশার ঘোরে দর্শকাসনে আপনাতেই যাত্রা করছিলো নিজেরই ইতিহাসের দিকে এবং হঠাৎ মোহ ভেঙে উজ্জীবিত হয়, তেমনই বৃষ্টি তার বহুবর্ণিল আঘাতে খানখান করে দেয় আপন জাগর। সে কিছু নয় যতটা হৈ হৈ রবে চারপাশে আকুল মানুষ সিক্তের মতো।




রবিবার, ২৮ জুন, ২০২০

কস্তুরী সেন









এই সপ্তাহের কবি কস্তুরী সেন ৷ প্রথম দশকের কবি।  স্নাতকোত্তর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । বিষয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। লেখালিখির শুরু স্কুলজীবনে। পত্রিকাপ্রকাশ ২০১৬য় প্রথম। প্রথম বই, ধীরে বলো অকস্মাৎ, ২০১৭, ধানসিড়ি প্রকাশন। পেয়েছে 'সহজ' সাহিত্য সম্মান। দ্বিতীয় বই নাম নিচ্ছি মাস্টারমশাই, ২০১৯, ধানসিড়ি প্রকাশন। পেয়েছে 'কথাস্বপ্ন পত্রিকা' পুরস্কার এবং 'একুশে' সৃজন সম্মান। নিয়মিত লেখালিখিতে কৃত্তিবাস, বৃষ্টিদিন, কবিসম্মেলন, আবহমান ইত্যাদি পত্রিকা এবং ঐহিক, বাংলালাইভ, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম সহ নানা ওয়েবজিনে। পেশা শিক্ষকতা। তার কিছু কবিতা পড়া যাক ৷
১/  #আয়ু

আমরা কি মেপে রাখব দোরে আয়ু 
উঠোনে বাঁধন
আমরা কি ভরে উঠব স্রোতজলে 
আর সেই জল কাটব আল খুঁড়ব সুবচনীপয়ে
আমরা কি রোগ পার হব 
আর হয়ে বলব -
যা তোমার মারীতেষ্টাইচ্ছেতীব্রনীল
এত কষ্ট সোয়ো না গো, 
দাও দাও অশ্রুমতী গ্রাম

দাও মৃত শস্যগাছ দাও ক্লিষ্ট নভোতলস্বাদ
বিষাদ ও চ্ছলচ্ছল দাও ঋতু সুফসল হবে-
আমাদের দৃঢ়বর্ণ
আমাদের  অন্ধপাঠশালা!
মেপে রাখা ধাতু...
বন্ধু আমরা তো জিহ্বাগুণে এতদূরও
একাকী এলাম!



২/ #ভাঙন
     

বিষাদ লিখব না বলে
দুপুরের পর গিজার, 
বিষাদ লিখব না... 
দেখি আজ নিয়ে তিনদিন ক্যাজুয়াল, 
শীতকাল বিশ্রি লাগে, 
বিষাদ লিখব না, শুধু মেঘ চাই, 
বন্ধু হে পরবাসী, 
মানবেন্দ্র শুনব একা ঘরে...
বিষাদ লিখব না, আজ সকালেই তো কথা হয়েছে...
বন্ধুকে বুঝিয়ে বলব 
ডিপ্রেসড করে দিও না, 
দ্যাখো আমরা এইরকমই!
দ্যাখো আমরা দুপুরবেলা, 
ফ্রিজে সবজি, 
আনন্দবাজারের হেডলাইন

দ্যাখো আমরা এই নিয়ে কতবার, ও কিছুই না

পায়ের তলায় জল, জলের তলায় মাথা তুলি

বিষাদ লিখব না, 

দ্যাখো এরও বেশি আরও কত ভিটে উপড়ে
ভেসে গেছে ছেষট্টির জলে!

৩/ #সহজ
     
 দুর্দিনের এই খুদকুঁড়ো খুব সহজ নাকি...
নদির অতই নিকটে আবার
নিষিদ্ধ ফুল ফুটে উঠবার
অলীক নিয়ম!
মানুষ হয়েই একটি জীবন 
মানুষের কাছে এই বেঁচে থাকা,
সহজ নাকি
জাগ্রত সব রাত্রির পরে অখণ্ড ঘুম
শরীরস্নাতক ভোর, আয়ু, 
ফুল ছিঁড়বার নেশা

বনদেবতার সে নির্বাসন...

সহজ ছিল না
তোমাকে চিনেছি সকলরকমে,
এমন আমার মিথ্যাভাষণ!

৪/ #সুরস্থান
    

অলীক ও অলীক দ্যাখো এত স্মৃতিমাত্র হলে চলে
ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি বান্ধবীর 'আর জানিস কাল মাঝরাতে ও...' ইত্যাকার কথার উত্তরে!
আর দেখেছ অলীক, দ্যাখো 
এইসব খিলখিল এইসব বৃত্তাকার মধুগন্ধী অক্ষরেরা যত 
এসে কে কাকে বলছে পড়ো অমুকের লেখা 
শোনো অমুকের গান, 
গান, ও অলীক দ্যাখো তোমাকেই বলি উফ এত কি দ্রুততা হলে চলে?
এত কি ফাল্গুনমাত্র, ফুটপাথমাত্র, 'আমি কিন্তু পৌঁছে গেছি'
'দাঁড়া দুমিনিটমাত্র!' হলে চলে, 
'এ গান যেখানে সত্য'...সেইখানে তুমি তো জানোই
কোন্ জুলাইমাসের রাত্রি, 
সারারাত্রি সারারাত্রি অন্তরাসঞ্চারী ছাদ আর 
আমি
আমিই তো প্রতিবার দাঁড়াচ্ছি এসে, 
দাঁড়াবই, 
তোমার সমস্ত ফেলে আসা 
তোমার সমস্ত আগামীরও শ্রীপঞ্চমীস্তবে...

৫/#পলাতক_ও_অনুসরণকারী
  

আর এই দরজা ঠেলে ঢুকলেই 
কেমন সকালবেলার রোদে আমার কিশোরী ছোটদিদা যে গান গেয়েছিলেন সেই গান!
সেই ছোটদিদা যাঁরও ডাকনাম ছিল হাসি 
আর প্রায় সেই থেকে তিনি তো আমাদের উমা বসুই, 
উমা বসু হয়ে পরের মোড় ঘুরতেই 
দ্যাখা পাবার কথা ছিল দিলীপকুমারের 
অথচ পরের মোড়ে কিন্তু আর গান নেই কোনও, 
সকাল নেই, সবে বৃষ্টি থেমে গেছে রথের বিকেলে, অঙ্কখাতার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে 
দোতলার জানলা থেকে উড়িয়ে দিচ্ছে ওই যে স্কুলভীতু বালক, 
ওই বালকটি কি আমার বাবার সাতবছর বয়স, 
ভাবতে ভাবতেই পরের বাঁকে হই হই করে ঢুকে পড়ল যারা, তাদের পায়ে ভোরবেলার ময়দান, 
আমেদ ভাল না ধনরাজ ভাল তর্কে তর্কে 
গলার শির ফুটে উঠছে যে কঠিন ছেলেটির 
সন্ধেবেলায় সেই তো মিনতি নামের মেয়েটিকে বলবে ব্রহ্মপুত্র ছেলেবেলার গল্প 
আর মিনতি, মেজজ্যাঠাইমা, 
এই সেদিন অবধি নাম গুলিয়ে ফেললেও 
যিনি একলহমায় বলে ফেলতে পারতেন আত্মীয়স্বজনের বিয়েথা, উৎসব আয়োজনের সব তারিখ, 
তাঁর জন্যও না থেমে এই গান যে শেষপর্যন্ত যাবেটা কোথায়, গিয়ে থামবে কোন চুরাশি সালের সপ্তমীর দিনে 
কিংবা কলামন্দিরের একক সুমনে 
সেসব তো আর এই লেখার হাতে নেই, 
না থাকুক, আমরা যারা অবাক হতে জন্মেছি
বরং ব্রত শুনবার মত করে হাতে তুলে নিই এই আশ্চর্য পানের পাতা 
আর দেখি, অসুখবিসুখ ধারদেনা
মন্দিরমসজিদের ফাঁক গলে
কী অবিশ্বাস্য উপায়ে এক্কাদোক্কা খেলার মতো করে 
এগিয়ে যাচ্ছে একা বেইমান সুর
আর খুব কাছ থেকে না হোক, কিন্তু দূর থেকেই 
চিরদিন সেই পলাতককে অনুসরণ করে যাচ্ছে 
এই লেখার যত 
অক্ষরের পর অক্ষরের পর অক্ষরের পর অক্ষর...

৬/#ফাঁদ
   

এসব কিছুই নয়, অক্ষরবৃত্তগুলি গুনে গুনে দ্যাখা
এসব কিছুই নয় মাত্রা সব এলোমেলো মাপি
এসব কিছুই নয়, বলে ওঠা কী অসহ্য শেষের কবিতা
এসব কিছুই নয়, মুখভার কেন তুমি গিয়েছ বেপাড়া!

শুধু প্রাণ ঝলসে উঠবে, শুধু এই মাত্রাস্থানে ছোঁয়াবে আঙুল
শুধু ভুল ধরে দেবে, শুধু বলবে কী যে বন্দি জীবন হতাশ!

তোমাকে গোপন ক'রে শুষে নেব সেই ঝলসে ওঠা
ভোর নামবে, আমার সমস্ত জুড়ে নতুন কবিতা হবে, তাই
এতেক ঘটিয়ে তুলি অবলার বলে!
অক্ষরে অক্ষরে আমি তোমারই তো নাম নিই মাস্টারমশাই!

৭/ #দোষ
    

ভাষা তো শীতল জল, 
সহসা উতল হয়, বুদ্ধনাটকগানে 
মনের শরীর! 
ভাষা তো কর্পূরগন্ধ, একটি কাঁসার গ্লাসে
লিখে রাখে নামধামছবি...
ভাষা তো গোপনপথ
কে পালায় দিনমানে, 
চিতা থেকে অব্যাহতি গত শতকের!
ভাষা তো প্রেমের কথা, দোষ পায়
কী নাছোড় তবু কিন্তু
আজীবন লিখে যায় কবি!



রবিবার, ২১ জুন, ২০২০

শুভম চক্রবর্তী


এই সপ্তাহের  কবি শুভম চক্রবর্তী ৷তার  লেখালেখির সূত্রপাত ২০১০ সাল নাগাদ অর্থাৎ প্রথম দশকের কবি বলা যায়৷ বাণিজ্যিক-অবাণিজ্যিক নানান পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। এখনো পর্যন্ত তিনটি কাব্যগ্রন্থ আছে - শব্দের বিহ্বল ডানা (২০১৭), শরীরপরব (২০১৮),  আয়াত (২০১৯)। 
কবি ২০১৭ সালে পেয়েছেন 'উতল হাওয়া সাহিত্য সম্মাননা', ২০১৯-এ 'শরীরপরব' কাব্যগ্রন্থের জন্য মাসিক কবিতাপত্র পত্রিকার পক্ষ থেকে 'কবি জয়দেব বসু পুরস্কার'। 
সম্পাদিত পত্রিকা - 'কর্ষণ', 'অনপেক্ষ'।       




অনুচ্চারিত
-------------------



বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর ঝড়
শব্দ করে দরজা খুলছে, বন্ধ হচ্ছে
মেঘ ডাকার রেশ লেগে থাকছে সারা আকাশে
বৃষ্টি ধোয়া বিদ্যুৎ-এর আলোয় আলোকিত সব
এরকম মুহূর্তই তোমার দিকে নিয়ে যায়
স্মৃতি-বিস্মৃতির পরম্পরা টপকে, আদুল হয়ে,
মাছ ধরছে ছেলেরা, পথেই
স্মৃতির মধ্যে ঢুকে যাওয়া এইসব গ্রামজীবনের খণ্ড চিত্র 
পেট ফোলা ব্যাঙ, লুকোনো সাপ, গুরুতর বিদ্যুৎচমক, ছায়া ও অন্ধকারও ঢুকে পড়ে
পুকুরের পাড় ভেঙে জল ঢুকে যায় গ্রামে
পুকুরের পাড় ওঠা দিয়ে জন্মতারিখ নির্ধারণ হওয়া আশি নব্বই বছরের প্রাচীন গ্রামছবির সঙ্গে তোমার স্মৃতি সংযুক্ত হয়ে গেল
খণ্ড খণ্ড জগৎছবি মেশালাম কিঞ্চিৎ  শুশ্রূষা সহযোগে 
এবার আমরা আরশিনগরের দিকে চলে যাব
দুদিনের হোটেলবাস, পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়া, অনাথ আশ্রমে থাকা কিছু দিন
আমাদের মধ্যে আর আলাদা আলাদা ভাবে উচ্চারিত হবে না কখনও
বাইরে ভীষণ বৃষ্টি আর ঝড়, বিদ্যুৎ চমক
কী যেন ধুয়ে, মুছে এক করে দিল


মৃত্যুকে যেমন দেখায় 
---------------------------------

বর্ণ ও বর্ণহীনতার ছড়িয়ে পড়া, অভিযাত্রা এমনই
যেন সকাল থেকে মা ডেকে তুলছে আর কেউ উঠছে না
যেন ভোরের পাখি ডাকা ডাকা আকাশ কবলিত তোমার স্নিগ্ধ মুখ, বিনুনির ওম পৃথিবীর নৈরাজ্য-পীড়িত এলাকার দিকে উড়ে গেল
আর তাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়ে কেউ একটা ছুটে গেল ভেতরের দিকে
সেখানে ছোটেনি কেউ, কেউ আর স্থির হয়ে নেই
ইতস্তত হাওয়ায় কাঁপছে বর্ণদীপখানি
সে আলো সারা গায়ে মেখে ঘুমিয়ে রয়েছে একটি পাগল, প্রশান্ত ঘুমের দেশে, এত জবাফুল




তারারাত্রি
-----------------



তারারাত্রির আকাশে ছড়িয়ে দিলাম মদ, ছড়িয়ে দিলাম মাংসকুচি
রক্তাভ আবেদন ছড়িয়ে পড়লো নিভৃত সর্বাঙ্গে
খুব উট উট পেল আমার
গাভিন কামদুঘার মৌনব্রত পেল
রাত্রি রঙিন খানকির মতো আবেদনময়ী এবং স্থূল
এইসব মেদ, মাংস, পচুই মদের সান্দ্র কুহক ভাসমান হয়ে রইলো আকাশে


মাকড়সার জালের ধারণায় সংকীর্ণ প্যাঁচপয়জারময় আকাশের দিকে তাকালাম
ধোঁয়া তার জাগতিক পাথেয় শুষে মহাজাগতিক কুয়াশায় বুঁদ
ধীরে, মোটা গ্যাদগেদে মেঘে, সিঁদুরমাখানো মথ ঠ্যাং উলটে পেচ্ছাপ করছে
তাকে মানবী অবয়ব দাও
দিগন্তে, লাট খেতে খেতে, ঘুড়িবিপন্নতায়, অস্থির প্রশ্নচিহ্নে, দানবীয় ধর্ষকাম তার চরিতার্থ হবেই
এই নিগূঢ় দ্যোতনাটুকু
সংকীর্ণ প্যাঁচালো মশারিতে ঝালর, আকাশধারণা 


ফিরে এলাম
সঙ্গী কিছু অনুচ্চারিত কথার খুচরো
গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে রয়ে গেল ভেতরে
আর আমি
কাশবন সাঁতরানো দামাল বাচ্চা
সাদা পিষে পিষে পেশি স্ফীত করে তুললাম
স্মৃতি, পলেস্তারা গুঁড়ো 
এতো ঝরে
হাত তুলে তুলে তাকে নাগাল পাব না 

           
 নড়বড়ে হাওয়ায় মৃত্যু-মুহূর্তের যে অনিশ্চয়তা দোলা দিচ্ছে, আমরা তারই পথিক
গাঢ় অন্ধকার রাতে
বিজ্জলতা মাখানো শরীরে
উলোটপালোট গ্রীবায় 
একে অপরের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে
অনিঃশেষ খুবলে খুবলে নিচ্ছি আলো, জাদুপরত



দিনলিপি
-------------- 

চাঁদ খুব ঘোলাটে, নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে এইমাত্র দেখলাম
পর্দাহীন জানলার ফাঁক দিয়ে  বিছানার দুলে ওঠা দেখলাম
বাকিটা সঙ্গম, ঝগড়াঝাটি বা শিশুর দুলে ওঠা  ভাবনারা এসে পূর্ণ করে দিল
চাঁদ খুব ঘোলাটে, বাদামি রঙের ধুলোর আস্তরণ সারাগায়ে
দূরে, ব্যালকনিতে, ঝুকে কেউ ফুলগাছে জল দিচ্ছে
ঘন অন্ধকার জল
এই দৃশ্যকে মনে রেখে কালকের দিনটা শুরু করব।


 সর্পিলাকার বিপন্নতা  ১
----------------------------------

শুভম চক্রবর্তীকে নিয়ে শুভম চক্রবর্তীর সংশয় গেল না ! 
ছ'হাতের কাছাকাছি একটা সাপ বারবার পায়ের পাতায় ছোবল 
কিন্তু গিলছে না...
অন্ধকারের যাবতীয় ইন্তিবিন্তি ঘেঁটে যাদের সর্পিলাকার বিপন্নতা একটু লম্বা হয়েছে 
তাদের পাশ সড়সড়িয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে হাওয়া 
এই পাতা এই বৃত্তাকার উপবৃত্তাকার আলোছায়া 
এই দাবানল গোছের কিছু সোঁদা অবসাদ 
তাকে লাট খাওয়াচ্ছে আকাশে কিন্তু হচ্ছে না ভোকাট্টা
কত কত নৌকো চলে গেল
জাহাজও নোঙর ফেলছে
পথিমধ্যে দেহাতী খালাসিরা আঙুল বাড়িয়ে দেখাচ্ছে
দ্যাখ ব্যাটাকে, সমুদ্র চেনে না
দ্যাখ ব্যাটাকে, অকুল ছপাছপ গায়েই মাখেনি
সে শেষতম মৃত ছিল, হয়তো
শেষতম জীবিত 
হয়তোর আগুন ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে কোত্থাও পৌঁছায়নি সে, এখনও
সংশয় গেল না !



সর্পিলাকার  বিপন্নতা  ২
------------------------------------

সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
রোঁয়া রোঁয়া শরীর মেলে শুয়ে আছে
ভোরবেলাকার স্বল্প আলোয় তার শ্বাসের ওঠানামা হাড়সর্বস্ব দুলিয়ে দুলিয়ে তাৎক্ষণিক ভাবে অন্ধকারকে আরও গাঢ় করে তুলছে
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
হাঁ-ক্লান্ত বিকেল শেষে, রাতে, ঘুম জমাট বেঁধেছে দেরি করে
সারারাত সে অনিদ্রার সঙ্গে খেলেছে 
খেলেছে পাশে খুলে রাখা এলোমেলো পোশাক নিয়ে 
কোনো শরীর ছিল না
অন্ধকার লাল আলোর টানেল 
একটার পর একটা পেরিয়ে পেরিয়ে যাওয়া
ঝাঁপিয়ে 
গড়াগড়ি 
অন্তর্গত অন্ধকার   ছায়া  খোলাজানালা    ইশারাহীনতা
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ 
গৎ এখনও পড়েনি
পড়লেই আবার ঠেলে ঠেলে পৌঁছনো
কোথায় কোথায়
লোমশ ভুঁড়ি কুৎসিত কদাকার চা করে দেব সকালে
আমরা বিকেল হচ্ছি না সকাল
সকাল হচ্ছি না বিকেল
তার সিঁধেল পাঁয়তারা পাশে ছড়িয়ে রাখা ছতিচ্ছন্ন জামা ও কাপড় 
মনস্তাত্ত্বিক  চোরা বাঁক 
অন্ধকারকে গাঢ় করে তুলছে
ঝিঁঝি রব আরে গ্রামেই থাকে
তার যাবতীয় ভঙ্গিমা সৃষ্টি পেঁয়াজি সে খুলবে খুলবে করে খোলেনি 
বিছানায় ভুঁই-এ মজা পুকুর চলে এলো
ব্যাঙের কোকরকোকর আর অন্তহীন ঝিঁঝিরব
বলাৎকার 
জ্যোৎস্নারাত
মা গো 
সামনেই একজন ঘুমন্ত মানুষ, ঘুমোবে কখন 
না ঘুমোলে আমি যে ভিতর নিয়ে জাগতে পারছিনা !


সর্পিলাকার বিপন্নতা  ৩ 
------------------------------

পায়ু ও অণ্ডকোষের মাঝামাঝি যে স্থান সেখানে আমার সব রোমহর্ষ স্থির হয়ে ছিল
তুমি তুমুল জাগাতে...
জিভ দিয়ে, জিঘাংসা দিয়ে
ঘেঁটে তুলতে থিতিয়ে যাওয়া ওয়াক
সব সাপ হয়ে যেত, বড় সাপ সাপ হয়ে যেত সব
তারপর কত যে উল্টেপাল্টে আর সোজা করে নিয়ে
গতানুগতিকতার পুটকি মারতাম 
আজ তুমি নেই স্থিরবৎ জলের সপসপে
বুড়ি, কোমল মনের ভালো মাগি
কুণ্ডলিনী ফেটে যাক ফেটে যাক যা কিছু কঠিন



রবিবার, ১৪ জুন, ২০২০

সেলিম মণ্ডল


এই সপ্তাহে কবি সেলিম মণ্ডল ৷ তার কবিতা আমাদের কাছে খুবই পরিচিত ৷  কবিসত্ত্বার পাশাপাশি সম্পাদক ও প্রকাশক রূপে চূড়ান্ত সফল ৷

‘তবুও প্রয়াস’ পত্রিকা নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন তিনি। বর্তমানে ওয়েব ও প্রিন্টেড দুই মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়।  লোকসংস্কৃতির ওপর কাজ করার আগ্রহ আছে তার।

তার দুটি কাব্যগ্রন্থ ‘মায়াজন্ম’ ও ‘লবণ খেতের জোনাকি’ প্রকাশিত । প্রকাশিতব্য কাব্যগ্রন্থ ‘কাঁচা মাংসের বাড়ি’ও সম্পাদিত গ্রন্থ ‘ছাদ পেটানোর গান’l


সেলিম মণ্ডলের কবিতা


বেদনাবীথি

৫৮
বসন্ত ঠুকরিয়ে ঠুকরিয়ে বর্ষা আনল। বৃষ্টি হল নিঃসঙ্গতায়। ছাতা পারল না, ঠোঁট দিয়ে মেঘ ধরতে। মেঘ বাড়ির ভিতর, তোমার ভিতর, আমার ভিতর একই শীতকাল হয়ে লেপ মুড়িয়ে আছে।

৫৯
ওই লাল সাইকেল করে কি ফেরি করো? সন্ধ্যার পথ তোমার নাভির ভিতর হারিয়ে বেজে উঠবে কি ক্রিং ক্রিং করে?

কেরিয়ারে অলস যে ঘুঘু, ফাঁদ পাতবে বলে ইশারা করে চলেছে নিয়মিত, তার ডিম…

৬০.
তুমি বলো ছায়া হও, ছায়া হও। আমি ছায়া হতেই চেয়েছি। তবে দীর্ঘ  নয়। ছায়া দীর্ঘ হলেই অন্ধকার নেমে আসে। আমি জানি, অন্ধকার তুমি ভয় করো।

দু-জনে


একই স্বপ্নে দু-জনের ঘুম ভাঙল।
স্বপ্নে, দুজনই‍‍‍—
একটি পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো হাঁ দেখে আঁতকে উঠেছিলাম।

দাগগুলো ছিল‍‍‍— মানুষের মুখের মতো।


দু-জন কেউ কারো নয়। কথা হয় গাছের পাতায়।
গাছ গেছে ঝড়ে ভেঙে।
মাটিতে কোলাহল। মাটিতে পোকার সহবাস‍‍‍—
এমন বৃষ্টিদিনে‍‍‍— নিমফুলের মধু নিয়ে
মৌচাকে রেখেছি হাত

গাছ কথা কয় না, ঝুলে পড়া গাছে আমিই আদিম কচ্ছপ!


সাড়ে তিন ফুট দূর থেকে হাত নাড়িয়ে
চলে গেছ‍‍‍— আদিম লড়াইয়ে

দু-জনের কালো নৌকা, লাল হতে হতে
ঢুকে গেল বাড়ির ভিতর

বাড়ির জল ঘোলা হোক; বিপদজনক নয়

ভাঙা দাঁড়ে ফুল বেঁধে সবাই ভেবেছে এটা

আমাদের গল্প


বিধবার ভাতা নিয়ে ভোর আসে।
নিকটে, অতিনিকটে পড়ে থাকে সিঁদুর।
আমাদের গল্পে জানাজায় বিয়ে হয়
পাত পেতে একসঙ্গে খায় সাপ ও অলস ময়ূর।


আমাদের গল্পে মরা ইঁদুর পড়ে থাকে।
কাকে খাক চাইনি আমি এবং তুমি
পচেগলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। তবুও তার ঝকঝকে দাঁতে
তুলে দিই আগামীর সঞ্চয়। মাঠভরা। আমাদের মাঠভরা সবুজ
ইঁদুরের গর্ভে ছিল। সে করেছিল অগাধ নালিশ।


গল্পের গল্প যেন দুধে মাখা সাদা ভাত।
শিশুর মুখে তুলে দেবে মা।
হাঁটিহাঁটি পা পা: টলমল খসে পড়ে নুপূর।
গল্পে রাত আসে না। এই গল্প শুধুই
খাঁ খাঁ। বাঞ্চোত দুপুর।

চিঠি, সাপ ও ময়ূর

একদিন চিঠি এল বাড়ি‍‍‍‍—
"পেখম মেলার আগেই সাপটি খাবে ময়ূর"
আমি সন্তুষ্ট হয়ে দশ টাকা বকশিস দিলাম পিয়নকে

একমাস পর আবার চিঠি এল‍‍‍‍—
"সাপটি ফণা হারিয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়েছে"
আমি আরও সন্তুষ্ট হয়ে কুড়ি টাকা বকশিস দিলাম পিয়নকে

আবারও চিঠি এল একমাস পর‍‍‍‍—
"সাপ ও ময়ূর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না"
এবার আমি আরও খুশি হয়ে ত্রিশ টাকা বকশিস দিলাম পিয়নকে

এরপর একমাস যায়
                    দু-মাস যায়
                           তিন মাস যায়

চিঠি আসে না

একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখলাম‍‍‍‍—
আমার বালিশের পাশে একটা ফণা পাওয়া গেছে
আর আমার খাটের নীচে তৈরি হয়েছে বিরাট গর্ত

দূর থেকে সেই মোটা গোঁফওয়ালা পিয়ন সাইকেলে ক্রিং ক্রিং করে চলে যাচ্ছে‍‍‍‍—
                                                       আমাকে না দেখার ভান করে

আমি মরে গেছি

'আমি মরে গেছি'— এ-কথা
ডাঙা থেকে কুমিরকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না
সে বলতে লাগল: জলে এসো
আমি আমার শরীর নিয়ে জলে নামলাম
কুমির আমাকে ছুঁয়ে বলল: মিথ্যা, মিথ্যা
সারা শরীর কামড়ে দাগ বসিয়ে দিল
কিছুক্ষণ পর জলে ভেসে উঠলাম
এবার সত্যি সত্যি মরে গেছি ভেবে জলের গভীরে চলে গেল কুমির
এখন জলের উপর একা আমি বেঁচে আছি, ভেসে আছি
কাউকে বিশ্বাস করানোর প্রয়োজনবোধ করছি না


ঘটনা

একটি ফুল আত্মহত্যার আগে
একটি ফলের কাছে দুঃপ্রকাশ করে
ফল, বীজের কাছে জানতে চায় সম্পূর্ণ ঘটনা!


জ্বর

সন্দেহ হলে জ্বর আসে
জ্বরের রং নীল

আমাদের শাদায় তৈরী দেওয়াল
ছোট্ট ঘুলঘুলি
কড়ি বরগা
লুপ্তপ্রায় চড়ুই
একে একে ঢুকে যায় থার্মোমিটারে

জ্বর বড়ো হয়
জ্বর কপালে টিপ পরে

জ্বর তার যোনিতে খুলে রাখে একটা থ্যাঁতলানো চোখ


আমি

আসবে জানলে দরজা খুলে রাখতাম

প্রয়োজন হল না।  একটা ঝুল জমা ঘুলঘুলিতে
হারিয়ে যাওয়া কোনো আদুরে চড়ুই
বারবার উচ্চস্বরে বলতে থাকে: একা হও, শক্ত হও
কোনো ধাতুর মতো

আলো জ্বলে ওঠে

দরজায় বসে জোনাকির মেহফিল

আর আমিই হয়ে উঠি এমনই হুজুর যার আল্লা ছাড়াও
একজন 'আমি' আছে

চিৎকারপুর

চিৎকার নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ
চিৎকার ভুলে যে মানুষটি ময়ূরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে
মুখে পুরে নিল সাপ—
সে কোনোদিন হয়ত চিড়িয়াখানায় যায়নি


চিড়িয়াখানা থেকে ফিরে যে মানুষটি
ঠিক করেছিল প্রচণ্ড টক-ঝালের ফুচকা খাবে
সে গরম রসগোল্লার লোভে ঢুকে পড়ল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে
মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে দীর্ঘদিন ছানা নেই! কিছু ঝকঝকে বিড়ালের
তীব্র চিৎকারে সে পালিয়ে এল বাড়ি


মানুষটি বাড়ি ফিরতে চায়নি
ফিরে যখন এল, ভাবল: আর কোত্থাও যাবে না
কারো মুখ দেখব না
ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিল বাড়ি
বাড়িতে ইঁদুর ঢুকল
সে ইঁদুর মারল না, ত্রিপল সেলাই করল
পরপর আরও ইঁদুর ঢুকল
বিরক্ত হয়ে একদিন নিজেই খুলে ফেলল ত্রিপল
ততদিনে নেমে গেছে বর্ষা
সে আবার রওনা দিল—



রবিবার, ৭ জুন, ২০২০

মনোজ দে


"সৃজন " এই সপ্তাহের কবি মনোজ দে ৷

মনোজ এই সময়ের এক প্রতিভাবান কবি ৷১৯৯২  বাঁকুড়ায় জন্ম৷অতিথি অধ্যাপনা পেশা ৷ তার উল্লেখযোগ্য দুটি কাব্যগ্রন্থ " আমি ঈশ্বর ছুঁইনি (২০১৮) এবং শরীরে সংগীত রেখো ( ২০১৯) ৷


অসুখ পেরিয়ে যাওয়া কোনও মিথের সকালে
•••

১.
ছোঁয়াছুঁয়ি সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা আর নেই
এমনই সকালে ঘুম ভেঙে দ্যাখো
সরকার তোমার জন্য ফুল পাঠিয়েছে
হাতে তুলে, শুঁকে নাও 
সেই উদ্ভাসিত আলো ঘরময় ছড়িয়ে পড়লে
                                    আমরা ফের হাঁটতে বেরোব


২.
আলিঙ্গন ফের স্বাভাবিক
উষ্ণ চায়ের পেয়ালা, দ্রিম দ্রিম ওড়ে ধোঁয়া

বৃষ্টি তখনও আসেনি, ঝড় বলতে, শ্বাসাঘাত
                                             ছন্দ ভুলে চুম্বনে মিশেছে


৩.
এতদিন যাকিছু লিখেছ, নিজের ফাঁকফোকর

এসো, দুজনে মিলিয়ে দেখি
আঙুল তো এত সূক্ষ্ম নয়, উপশম ঢালু
                           অভ্যাসে গড়িয়ে দিও শুধু


৪.
জীবনের অপর নাম পাহাড়

হাত ধরো। ফুটম্যাপ বিশ্বাসে ভাসিয়ে দাও
তোমার উন্মুক্ত পিঠ যেন মহৌষধি
ছুঁয়ে আছি, এই বিশ্বাসে, শিহরণ জাগায়


৫.
ওড়না প্রাচীনপ্রবাদ। প্রকাশ্যেই দেখা হবে আমাদের
স্পর্শে কোনও বিষ নেই আর
তোমার আঙুল ছুঁয়েই প্রথম প্রমাণ পেলাম


৬.
কমিউনিটি কিচেন আজ খেলার সামগ্রী
                                            যে যার পেশায় মত্ত

এবার তোমায় পাশে পেতে হলে
ফের নাটকের দরখাস্ত


৭. 
একদিন সন্ধ্যে হয়ে যাবে
বাড়ি ফিরব না কেউ

একদিন কারফিউ থাকবে না শহরে
সারারাত একসাথে দেখব চাঁদ


৮.
রাস্তা যে যার মতই ব্যস্ত

তোমার হাতের প্লেট উড়ে যাচ্ছে 
হওয়ায়, তখনও পকেটভর্তি ক্রাইসিস


আরও একবার একটাই প্লেট ভাগাভাগি করে নেব


৯.
এঁটো নিয়ে তো ছুঁৎমার্গ নেই
শুধু কে প্রথমে মুখে তুলবে

আলতোভাবে আঙুলে কামড়, একটি স্মৃতি
আমাদের প্রথম দিনের কাছে নিয়ে যাবে



১০.
মুষড়ে পড় না প্রিয়
সময় এখানে শেষ নয়
অসুখের আয়ু, জেনে রেখো
মৃত্যু পেরতে পারে না
এই যে স্থাপত্যে মোড়া দেশ
হাজার হাজার প্রিয় গান
তুমিও কিছু তো লিখে রাখো
পড়ে নেব আগামী সকালে



মনোজ দে।
জন্ম - ১৯৯২
ঠিকানা - বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ।
পেশা - অতিথি অধ্যাপক