শনিবার, ১০ জুলাই, ২০২১

অমিভাভ সরকার

 

                                         


বেজন্মা ( অষ্টম পর্বের পর)

# 

বোলপুর সিনেমাতলা নেমে একটা হোটেলে লাঞ্চ করে নেয় কৃষাণ। ভেবেছিল একদিন এখানে থেকে শান্তিনিকেন ঘুরবে… আম্রকুঞ্জ… ছাতিমতলা… সংগ্রহশালা…। কিন্তু রাবেয়ার চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে…। কিচ্ছু ভালো লাগে না তার। এখন অনেক কাজ তার। ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে একবার আলোচনা করতে হবে। সিংজীদেরও বলা দরকার। বড্ড স্নেহ করে তারা। আত্মীয় পরিজন বলতে তো এরাই। বোলপুর স্টেশনের দিকে এগোয় কৃষাণ…।        


স্টেশনে পৌঁছে পরিচিত স্টেশনমাস্টারের খোঁজ করে। জানতে পারে তাঁর এখন সেকেন্ড নাইট ডিউটি চলছে, তাই রাত্রি ছাড়া পাওয়া যাবে না তাঁকে। তাদের কাছ থেকে খবর নিয়ে তিনটে নাগাদ রামপুরহাট-শিয়ালদহ এক্সপ্রেসে রওনা হয়। ট্রেনে বেশ ভীড়, সকলের কপালে সিঁদুর দেখে মনে হলো অধিকাংশ তারাপীঠ থেকে ফিরছে। দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়াল কৃষাণ। মাত্র দুটো দিন, এই দুটো দিনেই কেমন করে যেন উলটপালট করে দিল তার জীবন। একটা সুর শুনে পাশ ফিরে তাকায় কৃষাণ। একটু দূরে ট্রেনের দোলার গেরুয়াবসনে এক প্রবীণ বাউল ঘুংঘুর পায়ে একতারা হাতে গাইছেন;   

‘মনের ভেদ মন জানে না, 

একি কারখানা।

এ মন ও মন করছে ওজন,

কোথা সেই মনের থানা।


মন দিয়ে মন ওজন সই হয়

দুই মনে এক লেখে খাতায় 

তাইবি ধরে যোগসাধনে 

কর গো মনের ঠিকানা…।। 

মন এসে মন হরণ করে 

লোকে ঘুম যায় বলে তারে

কত আনকা নহর, আনকা শহর

ভ্রমিয়ে দেখায় তৎক্ষণা ।।    


শুনতে শুনতে আচ্ছন্ন হয়ে যায় কৃষাণ কেমন একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। ‘বর্ধমান’…, গান শেষ করেন বাউল। ওয়ালেট বের করতেই একশো টাকা উঠে আসে হাতে। একটু ভেবে বাউলের হাতে একশো টাকার নোটটাই গুঁজে দেয়। “মন ভালো রেখো গোঁসাই”। ‘মনের ভেদ মন জানে না, একি কারখানা। এ মন ও মন করছে ওজন…’। আপন মনে গুনগুন করতে করতে বর্ধমানে নেমে যান প্রবীণ বাউল।             

 

ট্রেন ব্যান্ডেল আসতে নেমে পড়ে কৃষাণ। সেখান থেকে লোকালে হাওড়া হয়ে আন্দুল। আন্দুল স্টেশনে নেমে কাউকে না পেয়ে চায়ের দোকানের মালিকের কাছে খোঁজ নেয় নিত্যযাত্রী বোসবাবুর। তারপর স্টেশন থেকে বাইরে এসে হাইরোডের দিকে এগোয়। রাত্তিরে থাকার জন্য সিংজীর ধাবায় একবার বলে আসা দরকার। এখন আর স্টেশনে থাকা যাবে না, এতদিন পরে জিআরপি-র লোকজন চিনবেও না তাকে।             


বেশ কিছুক্ষণ সিংজীর সঙ্গে খাটিয়ায় বসে পুরনো দিনের গল্প করে কৃষাণ। রাত্রি ন’টা নাগাদ সিংজীকে থাকার কথা বলে স্টেশনের দিকে এগোয়…। এবারে একে একে হকার বন্ধুরা কাজ সেরে আসবে। স্টেশনে আসতেই মানিক’দার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। স্টেশনের এক প্রান্তে এক বেঞ্চিতে গিয়ে বসে দুজনে। একে একে বাদরুল, ওরফে বিল্লু, শ্যাম, নান্টা সকলে হাজির হয়ে যায়। কৃষাণ সব কথা খুলে বলে তাদের।  

“আরিব্বাস!! কৃষাণ, তুই প্রেম কচ্ছিস…? 

“এই চুপ করত, সবসময় ফাজলামি”। মানিকদার ধমকে চুপ করে যায় বিল্লু।  

“দেখ, যা পরিস্থিতি শুনিলাম, তাতে শুধু রাবেয়াকে নিয়ে আসলে হবে না। সব চাপ গিয়ে পড়বে পিসিমার ওপর। আর মেম্বার কালীবাবু কিছু করতে পারবেন বলে মনে হয় না, না হলে…”।       

“ও আর কী করবে, শালাদের কাছ থেকে পয়দা খায় যে…”। বিল্লু তার টিন থেকে মুড়ি মেখে সকলের হাতে দেয়।  

“সেটা হতে পারে, তাই হয়তো সব জেনেও সোজাসুজি প্রতিবাদ করতে পারেন না তিনি। তবে, উনিও বোধহয় চান না বাবেয়া বদমাইশদের পাল্লায় পড়ুক”।     

“চল, সকলে মিলে যাই…” মানিকদা থামিয়ে দেয় বিল্লুকে। 

“দাঁড়া, আগে একটু ভাবতে দে, খুব প্ল্যান করে এগোতে হবে… নে, আগে চা খা…” সকলকে চা দিয়ে আনমনে চুপচাপ বিড়ি টানে মানিকদা।  

আলোচনায় শেষে ঠিক হোল, আগামীকাল শামসুদ্দিনকে বলবে তার বাবার সঙ্গে কথা বলতে। বলবে ভিসা করে এখানে চলে আসতে। তাঁকে নিয়ে লাভপুরে নিয়ে যাবে কৃষাণ। কয়েকজন একটা সুমো ভাড়া করে যাবে বোলপুর বেড়াবার আছিলায়। তারপর সুযোগ বুঝে তাদের নিয়ে লাভপুর হয়ে সোজা এখানে। ততদিনে একটা বাড়ি ভাড়া ঠিক হয়ে যাবে।   

“সে তো অনেকদিনের ব্যাপার…!” মানিকদার কথা শুনে কৃষাণ বলে।   

দেখ, তাড়াহুড়ো করলে সমস্যা আরো বাড়বে। তুই তাড়াতাড়ি কাজে জয়েন কর। শামসুদ্দিনের আব্বা আসার ব্যবস্থা হয়ে গেলে, তুই ছুটি নিয়ে চলে আসবি। তোদের অফিসারকে তোর বিয়ের জন্য ছুটির আবেদন করে রাখ। আজকে কোথায় থাকবি? চল, আমার বাসায় চল। না কোনও লজে উঠবি?” 

“দূর, লজ-টজ ভালো লাগে না আমার। ঠেলায় না পড়লে… তোমাদের সঙ্গে থাকার চেয়ে ভালো কিছু নেই। কত বছর কাটিয়েছি তোমাদের সঙ্গে...। একটু আগে সিংজীর সঙ্গে গল্প করছিলাম। আসার সময় আমি সিংজীকে বলে এসেছি।     

“কৃষাণ, তুই বরং আমার সঙ্গে চল। তোর বৌদি তোকে দেখলে খুশী হবে। আজকেই তোর কথা হচ্ছিল”।    

“না রে বিল্লু, আজ সিংজীর ধাবায় থাকি। আগামীকাল যাওয়ার আগে বৌদির সঙ্গে দেখা করে আসবো” ।  

“তাহলে দুপুরে ওখানেই আমাদের সঙ্গে খাস। আমি সকালের কাজটা সেরেই ফিরে আসবো”। সকলে মিলে কৃষাণকে সিংজীর ধাবা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। তাদের দেখে সিংজী জোর করেই চা আর পাঁপড় ভাজা খাওয়ায়।       

“কৃষাণ, আভি রাতমে ঠান্ড হোতা হ্যায়। তেরে লিয়ে অন্দর বিস্তারা কিয়া। খানা খাকে শো যা”। সিংজী কাউন্টারে যেতেই কৃষাণ শরীর টানটান করার জন্য ধাবার সামনে পড়ে থাকা খাটিয়াতেই করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন পরিশ্রম, টেনশনে চোখ বুজে আসে…।       

ঘুম ভাঙ্গে সিংজীর ডাকে। তাকিয়ে দেখে একটা থালায় রুটি আর তরকা নিয়ে খাটিয়ার বসে সিংজী…। ঘড়িতে প্রায় রাত বারোটা। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে কৃষাণ। 

“স্যরি সিংজী, আঁখ লাগ গিয়া থা”। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে পড়ে কৃষাণ।        

“তেরে লিয়ে আমি বানায়েছি। তেরা তো তরকা ভালো লাগে, তাই…। খা লে বেটা, বহুত রাত হয়ে গেল”। সত্যি, এখানে সকলেই যেন একটি পরিবারের সদস্য…। এঁদের ঋণ সারা জীবনেও শোধ হবার নয়। কথায় বলে ‘যার কেউ নেই, তার ঈশ্বর আছে’। আর মানুষের মধ্যেই যে ঈশ্বরের বাস, তা এদের সঙ্গে না থাকলে বিশ্বাস করবে না কেউ।   

#  

ভোর চারটায় ঘুম ভেঙ্গে গেল কৃষাণের। ধাবার লোকজন তখনও ঘুমিয়ে…। মুখ-হাত ধুয়ে স্টেশনের দিকে পা বাড়ায়। সকাল পাঁচটায় মেদিনীপুর লোকাল ধরে মানিকদা আর বিল্লু। স্টেশনে পৌঁছতেই বিল্লু আর মানিকদাকে স্টেশন কাউন্টারের একদিকে বসে থাকতে দেখে। মানিকদার কেটলী থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে…। পাশে মুড়ির টিন নিয়ে বসে বিল্লু। পেছন থেকে দুজনের গলা ধরে মাঝখানে বসে পড়ে কৃষাণ। প্যাসেঞ্জারেরা মানিকদার কাছে চায়ের জন্য দাঁড়ায়। কৃষাণ মানিকদার সঙ্গে হাতে হাতে যাত্রীদের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। মাইকে ট্রেনের খবর বলতেই বিল্লু মুড়ির টিনের চার পাশে লাগানো স্টিলের গ্লাসে চানাচুর, কাটা পেঁয়াজ, লঙ্কা, তেল, মশলা গুছিয়ে নেয়। ভোর পাঁচটা নাগাদ মেদিনীপুর লোকাল ঢুকতেই  মানিকদা আর বিল্লু উঠে পড়ে…। মানিকদা ট্রেনে স্টোভ-কেটলী রেখে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়।   

“এলাম রে সন্ধ্যায় দেখা হবে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো”।       

 “আমি চলি রে…, বারোটার মধ্যে ফিরে আসছি। দেরী করিস না…”। ট্রেন ছাড়তেই চিৎকার করে বলে বিল্লু। 

মেদিনীপুর লোকাল ছেড়ে যেতেই হাঁটতে হাঁটতে সিংজীর ধাবার দিকে এগোয়…। ইতিমধ্যে ধাবার লোকজন উঠে পড়েছে, চুল্লীতে আগুন ধরানো হয়েছে, এলোমেলো হাওয়ায় ধোঁয়া ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশ। এখন শামসুদ্দিনের ডিউটি অফ হবার কথা, ফোন করবো? ভাবতে ভাবতে ফোন করে কৃষাণ।     

“হ্যালো… শামসুদ্দিন? আমি কৃষাণ… এখন কথা বলা যাবে…?” গতকাল রাত্রে বন্ধুদের সাথে আলোচনার কথা, জানায়। সব শুনে শামসুদ্দিন বলে যে, ‘আব্বুর বয়স হয়েছে, এই সব ঝামেলার মধ্যে তাঁর না পড়াই ভাল। তাছাড়া কোনও সমস্যা হলে বাংলাদেশী হিসাবে আব্বু বিপদে পড়তে পারে। তার চেয়ে বরং কৃষাণ নিয়ে আসুক, আব্বু পরে দেখা করে আসবে। সব শুনে খাটিয়ায় চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কৃষাণকে ঐ অবস্থায় দেখে এগিয়ে আসে সিংজী।      

“ক্যায়া হুয়া কৃষাণ? কোই প্রবলেম? ক্যায়া হুয়া আমাকে বোল …”। কৃষাণের পাশে বসে সিংজী মাথায় হাত রাখে। কৃষাণ সিংজীর হাত চেপে ধরে। সব শুনে সিংজী চাপড় মারে কৃষাণের কাঁধে।      

“আরে এহি বাত, কোই চিন্তা নেহি, তেরা সাথ এ গুরুবক্স সিং হ্যায়। ম্যায় লে আউঙ্গা বহুকো। আজ রাত আট বাজে সব কো ইধার বুলাও, আজ সবকা সাথ বাতচিৎ করেঙ্গে…। ‘আরে… মেরা বেটাকে লিয়ে চা লে আও’। কিচেনের এক ছোকরাকে উদ্দেশ্য করে হাঁক দেয় সিংজী।                

#  

ধাবায় একপাশে চৌবাচ্চায় স্নান করে জামাকাপড় পরে দুটো রুটি আর ডিমের ভুজিয়া খেয়ে নেয় কৃষাণ। কাউন্টারে সিংজীর কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে বিল্লু এসে হাজির হয়। কৃষাণের ফোন বেজে ওঠে… রাবেয়ার ফোন। কৃষাণ এক পাশে সরে দাঁড়ায়। বেশ কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কথা হয়। কৃষাণ রাবেয়াকে বলে, একসপ্তাহের  মধ্যেই যেন গোছগাছ করে নেয়। মুরগী আর ছাগলের ঘরের চাবি পড়শিদের কাউকে দিয়ে আসে। বিশেষ করে যাবতীয় দলিল, কাগজপত্র, সার্টিফিকেট যেন সঙ্গে নিয়ে নেয়। আর পিসিমাও যেন তৈরি থাকে, এখানেই তাদের রেজিস্ট্রি হবে। আকবর চাচা দেখা করতে এখানে আসবেন। শামসুদ্দিনের ফোন নম্বর ম্যাসেজ করে রাবেয়াকে।         


রাত্রি আটটার মধ্যেই ধাবায় হাজির হয় সকলে। সিংজী পুরো পরিস্থিতিটা সকলের সামনে রাখে। মানিকদা বলে, ‘শামসুদ্দিন ঠিকই বলেছে। যদি কোনও পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে যেতে হলে বাংলাদেশী ফরেনার হিসাবে শামসুদ্দিনের বাবাকে সমস্যায় পড়তে পারেন। তাছাড়া ওনার বয়সও হয়েছে। এত চাপ না দেওয়াই ভাল। যা কিছু আমাদেরকেই করতে হবে’। বিল্লু বলে, ‘এই অবস্থায় দেরী করা ঠিক নয়’। নান্টা বলে, ‘তাদেরকে নিয়ে আসার আগে থাকার জন্য একটা ঘর ঠিক করা দরকার। এখানে এসে উঠবেন কোথায়?’ এতক্ষণ সিংজী সকলের কথা  চুপচাপ শুনছিলেন। সকলের কথা শোনার পর তাঁর মতামত দিলেন।   

“আরে কয়েকদিন আমার বাড়িতেই থাকতে পারে। কোনও মতে ঠিক হয়ে যাবে”। বিল্লুর কথা সিংজী সমর্থন করে। 

“বিল্লু ঠিকই বলা, কুছদিন কে লিয়ে হামলোককা ঘর মে হো জায়গা। হামারা ভি একঠো বড়াঘর তো খালি হ্যায়, উখানে আরাম সে থাকতে পারে। হামরা তো দোজন আছি, তেরা ভাবি কা ভি সঙ মিল জায়গা।  

“কৃষাণ, আমার মনে হয় সেটাই ভালো হবে। এক-দুইদিনের তো ব্যাপার নয়”। সিংজীর প্রস্তাবে সায় দেয় মানিকদা।   

“ভাইলোক, ইস বারেমে মেরা কহনা হ্যাঁ কী, আজ শুক্রবার, সোম ইয়া মঙ্গলবার হামলোক ইখান থেকে যাব…। কৃষাণ, ম্যায়, মানিক, বিল্লু অউর বিল্লুকা বিবি। এক জনানা ওদের জন্য দরকার আছে। তো হামলোক হুয়া পাঁচ…। আগর তুমলোগ রাজী হো তো, ব্যবস্থা হো জায়গা। একবার সোচ লো”। সিংজীর প্রস্তাব সকলে সমর্থন করে। যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে একযোগে আপত্তি করে ওঠে শ্যাম ও নান্টা। 

“সব ঠিক আছে। কিন্তু আমরা যাবো না? আমরা বাদ? এটা কিন্তু ঠিক নয় সিংজী…” এদের ভাব দেখে হেসে ফেলে সিংজী…।   

“আরে ভাই, টাটা সুমো ইয়া স্কোরপিও মে বেইঠনেকা লিয়ে হ্যায় সাত আদমী হবে। তার বেশী কী করে হবে, একবার সোচো”। শ্যাম আর নান্টার অবস্থা দেখে বিল্লু প্রস্তাব দেয়…।     

“তোদের মধ্যে কে যাবি বল? তাহলে আমি যাব না। আরে এখানেও তো অনেক কাজ আছে। ওনাদের থাকার জন্য ঘর ঠিক করা, বিছানাপত্র, রান্নার বাসন কেনা…। এগুলি কে করবে শুনি?  

“বিল্লু ঠিকই বোলা…। মগর বিল্লু, তেরা বহু’কো তো যাতে হবে…, তু নেহি জানেসে…”।  

“ঠিক আছে বিল্লু’দা তুমি যাও, বৌদি যাচ্ছে, তোমার যাওয়া দরকার, না হলে বৌদি বোর হবে। আমরা এ দিকটার ব্যবস্থা করছি”। কৃষাণ এতক্ষণ সকলের কথা শুনছিল আর ভাবছিল, কত ভাগ্যবান সে।  

“আমি বলি কী, একটা বাজেট করলে আমার সুবিধা হয়। আমিও এটিএম থেকে কিছু টাকা তুলে রাখতে পারি।”।  

“আরে বেটা উসব বাদমে দেখা যাবে। তু এক কাম কর, শ্যাম অউর নান্টাকে সাথ বইঠকর এক লিস্ট বানা লে। অউর, সামান খরিদ করনে কে লিয়ে ওদের কুছ রুপিয়া দে দেও।     

(ক্রমশঃ)

শর্মিষ্টা দত্ত

                             


খোঁজ  (একাদশ পর্বের পর)
(১২)

অরুণ ফিরে আসার দিনকয়েকের মধ্যে মেয়ের  বাড়িতেই একদিন ঘুমের মধ্যে নিঃশব্দে চলে গেলেন যোগমায়া l সেরিব্রাল অ্যাটাক l কোমরভাঙার পর বার্ধক্যজনিত সমস্যায় শরীরের কলকব্জা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল l ইদানিং ওষুধের ঘোরে সারাক্ষণই ঝিমোতেন l জাগতিক বোধও লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল l তাঁর সংসারে যে কত বড় বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে যাওয়ার আগে তা টেরও পেলেন না l নীরবেই পৃথিবী থেকে মুছে গেল একটা প্রজন্ম l সন্তানদের কাছে অবাঞ্ছিত হওয়ার শুরুতেই তাঁদের মুক্তি দিলেন যোগমায়া l কোনো কোনো মৃত্যু নিকটজনের কাছেও স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে l বিশেষত সংসারের এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে যোগমায়ার জন্য শোকতাপের অবকাশও ছিল না কারুর l অরুণ জ্যেষ্ঠ সন্তান হলেও মাতৃদায় উদ্ধার করার মত অবস্থায় নেই l অলোক ঘোরতর কমিউনিস্ট, সে এই সব শ্রাদ্ধশান্তির অনুষ্ঠানে বিশ্বাস করে না l রাজশ্রী নিজেই দাহকাজ থেকে শুরু করে পারলৌকিক সব কাজই সামলে নিলেন l  যোগমায়ার সামান্য কিছু চিহ্ন পড়ে রইল তাঁর ঘরে l অরুণকে নিয়ে নিয়মিত হাসপাতালে যাওয়া, পরিচর্যা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছিলেন অপর্ণা l তাঁর নিজের শরীরও ভালো নয় l কাজকর্ম মিটে যাওয়ার পর একদিন রাজশ্রী এসে খাটের তলা থেকে মায়ের ট্রাঙ্কটা বের করলেন l বাক্সের ভিতর অপাংক্তেয় কিছু জিনিস l কয়েকটা সাদা থান,  আর টুকরো কাপড়ে বাঁধা অল্প কয়েকটা খুচরো পয়সা আর নোট l ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো ঝাপসা কাচের ভিতরে প্রায় সাদা হয়ে যাওয়া যোগমায়া আর তাঁর স্বামীর বিবাহকালীন ফটো l এছাড়াও স্বামীর ব্যবহৃত একটি নিকেলের চশমার ফ্রেম একটা ছোট বাক্সে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা l আরো কিছু টুকিটাকি l যোগমায়ার গচ্ছিত সম্পদ বলতে এটুকুই l অনেকদিন পরে শাশুড়ির ঘরে খাটের ওপর বসে সেই সাদা থানে হাত রেখে কেঁদে ফেললেন অপর্ণা l এই মানুষটির সঙ্গে কোনোদিনই হৃদ্যতা গড়ে ওঠেনি তাঁর l দুজনের মানসিকতার বিস্তর ব্যবধান, সম্পর্কের মধ্যে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে রেখেছিলেন নিজেই l তবু এই মুহূর্তে শাশুড়ির জন্য চোখের জলটুকু মিথ্যে নয় l এভাবেই  সংসারে প্ৰিয় - অপ্রিয় সবকিছুই কখন যেন  জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে l  

অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই চিকিৎসায় একটু একটু করে সাড়া দিতে শুরু করলেন অরুণ l চিকিৎসা ও ওষুধের প্রভাবে, বাড়ির পরিবেশ আর পরিবারের সান্নিধ্যে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে লাগলেন l এখন অল্পস্বল্প কথা বলেন অপর্ণার সঙ্গে l হ্যাঁ অথবা না বলে মতামত দিতে পারেন l একমাত্র অপর্ণা ছাড়া আর কাউকেই বোধহয় চিনতে পারেন না l চোখের দৃষ্টিটাই যেন পাল্টে গেছে, বড্ড ভয় করে শর্মিলার l বাবার সামনে যায় না বড় একটা l অলোক, শবনম নিজেদের কাজে ব্যস্ত l এক বাড়িতে থেকেও ওদের বৃত্তটা ক্রমশ আলাদা হয়ে যাচ্ছে l রান্নার লোক পুষ্প ছাড়াও মালতী নামে একটি মেয়েকে সারাদিন কাজের জন্য রাখা হয়েছে l মুনমুনের দিকে এখন আর তেমন নজর দিতে পারেন না অপর্ণা, মালতীর মূল কাজ মুনমুনকে দেখাশোনা করা l তাছাড়াও  শবনমের মাও রোজই দুপুরে এসে মুনমুনের কাছে থাকেন l মুনমুন বেশিরভাগ সময় দিদার সঙ্গে নীচের ঘরেই থাকে l আগের মত আর শর্মিলা বা অপর্ণার কাছে ঘেঁষে না l অবশ্য অপর্ণার সময়ও নেই, তবু কষ্ট হয় খুব l মেয়েটা তো তাঁকে এখনও মা বলেই ডাকে ! 
রাজশ্রীও প্রায় রোজই আসেন এ বাড়িতে l শর্মিলার পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন l রোজ বইপত্র নিয়ে বসলেও পড়ায় মন বসে না l এরমধ্যেই টেস্টের রেজাল্ট আউট হল l বাড়ির এই বিপর্যয়ের মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে  কোনোরকমে টেস্টে অ্যালাও হলেও ফাইনালের রেজাল্ট অবধারিতভাবে খারাপ হবে এটা যেন ধরেই নিয়েছে শর্মিলা l অবচেতনে মনের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয় l ক্রমশ নিজের ভিতরে গুটিয়ে যেতে থাকে l রাজশ্রী বিষয়টা নিয়ে খুবই চিন্তিত হয়ে শর্মিলাকে বললেন 
-- মুন্নি, এবাড়িতে থাকলে তোর পড়াশোনা হবে না l তুই বরং আমার সঙ্গে ও বাড়িতে চল l 
--তোমার তো স্কুল আছে পিসি...একা একা থাকলে আমার আরোই পড়া হবে না l 

এসব বলে তখনকার মত কাটিয়ে দিল শর্মিলা l নিজের বাড়ি ছেড়ে, মাকে ছেড়ে কোনোদিন কোথাও থাকেনি ও l পিসির কোলেপিঠে বড় হয়ে উঠলেও ওই বাড়িটাকে কিছুতেই আপন মনে হয় না ওর l বিকেলে পড়তে গিয়ে মৈত্রেয়ীকে সেকথা বলতেই ও বলল 
-- পিসি ঠিকই বলেছে l ও বাড়ির পরিবেশে তোর পড়াশোনা হবে না l  তুই বরং পরীক্ষার কটা মাস আমাদের বাড়িতে থেকে যা l আমিও  সারাদিন তোর ওপর নজর রাখতে পারব l
 শর্মিলাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ও কাবেরীকাকিমাকে পাকড়াও করে তখনই ছুটল শর্মিলাদের বাড়ি l কাবেরী অপর্ণাকে বললেন 

--অপর্ণা আমি তোমার দিদির মত, সেই অধিকারে বলছি শর্মিলাকে পরীক্ষা অবধি অন্তত আমি আমার কাছেই রাখব l মৈত্রেয়ীর সঙ্গে থাকলে সারাদিন পড়াশোনার পরিবেশে থাকতে পারবে l সেটা এখন ওর জন্য খুব দরকার l দেখো, এমনিতেই ওর পড়াশোনার যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে গেছে l এবাড়িতে ও কিছুতেই পড়ায় মন বসাতে পারবে না l  ইন্টেলিজেন্ট মেয়ে, এই দু - আড়াইমাস আদা- জল খেয়ে পড়লে নিশ্চিত ভালো রেজাল্ট হবে l 

অপর্ণাও বিলক্ষণ বুঝেছিলেন এভাবে চললে মেয়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার l এইমুহূর্তে শর্মিলার জন্য এটাই সবথেকে ভালো ব্যবস্থা l 

--তুমি আমায় বাঁচালে কাবেরীদি l এ কটা দিন বরং মুন্নির দায়িত্ব তুমিই নাও l আমি তো আজকাল ওকে দেখতেই পারি না l 

রাজশ্রী একটু মনঃক্ষুন্ন হলেও মুখে বললেন 

--এটাই বরং ভালো হল l মুন্নি তোর জামাকাপড়, বইখাতা গুছিয়ে নে l এ কটা দিন মন দিয়ে পড় l দেখবি ঠিক ভালো হবে রেজাল্ট l মাঝেমাঝে দু - চারদিন পরপর একবার এসে একটু মাকে দেখে যাস l 

মৈত্রেয়ীর বাড়িতে আসার পরে একটু একটু করে আবার পড়াশোনার মধ্যে ডুবে যেতে লাগল শর্মিলা l মৈত্রেয়ী নিজে পড়তে পড়তেও ওর পড়ার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখে l কাবেরীকাকিমা ঘড়ির কাঁটা ধরে ওদের খাবার খাওয়ান l না খেলে নিজের হাতে খাইয়েও দেন l ওরা টেস্টপেপার সলভ করে, উনি রাত জেগে ওদের সঙ্গে বসে থাকেন l মাঝেমাঝে কফি বানিয়ে এনে দেন l বড্ড স্নেহময়ী মানুষটি, নিজের সন্তানের থেকে বেশীই যত্ন করেন শর্মিলাকে l আদরে, শাসনে শর্মিলার সারাটা দিন ভরে থাকে l এ বাড়ির আশ্চর্য মায়াময় পরিবেশে একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণাটা ক্রমশ ফিকে হতে থাকে  l পড়াশোনা করার ইচ্ছেটা একটু একটু করে ফিরে আসে l নিজের প্রতি আস্থাও বাড়ে l রিজ্জুদার মুখটা ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে l সপ্তাহে এক - দুদিন অল্প কিছুক্ষণের জন্য বাড়ি এলে মায়ের মুখটা আলোয় ভরে ওঠে l 

--মুন্নি, কাবেরীদির এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না l উনি আমাদের দুঃসময়ে যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন ! তুমি কিন্তু কক্ষনো কাবেরীদির অবাধ্য হয়ো না l 

বাবার চাকরি নেই, জমানো টাকাও তেমন নেই l সংসারখরচের বেশিরভাগটা বাবাই দিতেন l  চিকিৎসার খরচ যদিও বেশিরভাগটাই পিসি দেয়, ছোটকাও দেয় কিছুটা l এখন সংসারটাও অলোকদের টাকাতেই চলে l সেজন্য মরমে মরে থাকেন অপর্ণা l সবই বুঝতে পারে শর্মিলা l উপর্যুপরি আঘাতে হঠাৎই যেন অনেকটা বড় হয়ে গেছে ও l ছোটকা-কাম্মার নিস্পৃহ আচরণ মাকে কতখানি পীড়া দেয় সেটাও বোঝে l সময় আর পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন বদলায়, বদলে যায় সম্পর্কের সমীকরণও l শর্মিলা নেই, একা একা যুদ্ধ করতে করতে মা ক্লান্ত l মায়ের চোখের তলায় কালি, দৃষ্টিতে গভীর অবসাদ l ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে যেতে শর্মিলাকে খড়কুটোর মত আঁকড়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করে মা l নিজেকে মনে মনে ইস্পাতের মত ধারালো করে তোলে শর্মিলা l ভালো রেজাল্ট করতেই হবে ওকে l নিজের জন্য তো বটেই, মায়ের জন্যও l কাবেরীকাকিমার বাড়িতে ফিরে আবার ডুবে যায় পড়াশোনার মধ্যে l 
পরিমলকাকু ব্যস্ত মানুষ l পুলিশের চাকরিতে ছুটি পান না বললেই হয় l তবু বাড়িতে থাকলে এক এক দিন সন্ধ্যেবেলা ওদের ডেকে হই হই করে গল্প করতে বসেন l মৈনাকদা থাকলে সেও যোগ দেয় আড্ডায় l গ্রূপ করে ক্যারম খেলা হয় l কাকিমা চায়ের সঙ্গে নানারকম জলখাবার বানিয়ে আনেন  l এম বি বি এস পাশ করে সরকারি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছে মৈনাকদা l বাড়ি কাছে হলেও হোস্টেলেই থেকে যায় বেশিরভাগ সময় l ওর বন্ধু -সহকর্মী কল্লোলদাও আসে l কল্লোলদাকেও খুব ভালোবাসে কাকিমা l সবসময় বলে
-- কল্লোল আমার আর একটা ছেলে l 
কল্লোলদার বাড়ি আসানসোলে, মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে মৈনাকদার সঙ্গেই থাকে l ভালো কিছু রান্না করলেই কল্লোলদাকে ডেকে পাঠায় কাকিমা l  এ বাড়ির পরিবেশটা অনেক খোলামেলা, অনেকটা শর্মিলার চন্দননগরের দাদুর বাড়ির মত l.ঘণ্টাখানেকের আড্ডার পর ফ্রেশ হয়ে আবার পড়তে বসে ওরা l 
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অনেকটাই আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল শর্মিলা l মৈত্রেয়ীর ধারেকাছে না হলেও প্রিপারেশন একেবারে খারাপ হয়নি l অন্তত পাশ করার চিন্তাটা নেই l এই ক মাস ক্রমাগত টেস্টপেপার সলভ করিয়ে আর নিজে পরীক্ষা নিয়ে মৈত্রেয়ী ওকে অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছে l ভাগ্যিস মৈত্রেয়ী আর কাবেরীকাকিমা ছিল ! ঈশ্বর আছেন কি নেই জানে না শর্মিলা l তবে তিনি বোধহয় কাবেরীকাকিমার মতই দেখতে ! 

ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয় l ওদের সিট পড়েছে তালতলার একটা স্কুলে l পরিমলকাকু গাড়ি করে ওদের পরীক্ষার সেন্টারে ছেড়ে দিয়ে আসেন l প্রতিদিন দুটো করে পেপার l মাঝখানে টিফিন ব্রেকে কাবেরীকাকিমা আসেন l জোর করে ডাবের জল, মিষ্টি খাইয়ে দেন l প্রিপারেশন অনুযায়ী পরীক্ষা ঠিকঠাকই হচ্ছে শর্মিলার l নিজের সম্পর্কে এর থেকে আর খুব বেশি কিছু আশা করে না ও l বিকেলে ফেরার সময় ওরা হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরে l পরীক্ষা দেওয়ার পর মৈত্রেয়ী আর পেপার নিয়ে কোনো আলোচনা করতে দেয় না l অ্যাডিশনাল বায়োলজি পরীক্ষার দিন হল থেকে বেরিয়েই ওরা দেখল কল্লোলদা দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের বাইরে l 

(চলবে )

রবিবার, ৪ জুলাই, ২০২১

শুভাশিষ সিংহ ,পারমিতা চক্রবর্ত্তী

                                                      



লকডাউন ডায়েরী-১


ইদানিং 

খিদের ভিতরে দলা পাকিয়ে আছে প্রতিবেশীর  মুখ 


যে ভাবে  দিন বিরক্তি  উপহার পাঠায় 

অ্যাম্বুলেন্সের  তীক্ষ্ণ  রিংটোনে

তার থেকে অনেক বেশি  আরামদায়ক  

নগর কীর্তনে মাখামাখি জনপদ 


এখন এই হলদে  বিকেল ক্ষতচিহ্ন হীন 

প্লাটফর্মে আছড়ে পড়ে  না  ক্লান্তির জলপ্রপাত 


 তোমাকে যে  ছুঁয়ে দেখবো নিঃশ্বাস

এই সাহসিকতাকেও  ভয় দেখাচ্ছে কেউ 

জয়তী রায় মুনিয়া

                                    



নিন্দার ফান্ডা 



নিন্দা অপবাদ সহ্য করতে হয়নি এমন মানুষ বিরল। কোন জগতে নেই? এই সেদিন আমাদের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে জানতে পারলাম, শঙ্খ ঘোষের মত মানুষের নামে প্রবল কুৎসা রটনা চলছে। জীবিত কালেও ছিল এবং এখন তাঁর মৃত্যুর পরে! লেখার ভুল ধরা থেকে চারিত্রিক কলঙ্ক ... কিছু বাকি নেই। যারা ওখানে প্রতিবাদ করতে গেছে তাদের তুলোধনা করা হচ্ছে। 

একদল লোক সর্বদাই মজা লোটার জন্য কুৎসায় অংশ গ্রহণ করে, তারা সবচেয়ে ঘৃণিত। ইধার এবং উধার এই রকম চরিত্র কোনো জায়গায় ঠাঁই পায়না। 


 এবার বলি, আমাদের আশ্রয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। সারাজীবন জ্বলেছেন তিনি। লেখার সমালোচনা থেকে চরিত্র... জীবিত এবং মৃত কোনো অবস্থায় রেহাই দেওয়া হয়নি তাঁকে। কি হত? যদি কলম নামিয়ে রাখতেন? আজ কোথায় থাকত বাঙালি? সামনে তেল মেরে পিছনে নিন্দে করতে এতটুকু লজ্জা বোধ হয়নি বাঙালির!

🔥🔥🔥🔥🔥


    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আপামর চিত্ত চেতনার প্রতিটি কোষ ঝঙ্কৃত হয় এই একটি নামে। শোক দুঃখ আনন্দ,প্রেম বিরহে বিষাদ... যখন যেমন মনে হয়, হাত বাড়ালেই আছেন তিনি।  আজো পর্যন্ত কত মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে তাঁর জন্য। রোদ ঝড় জল ... তিনি আছেন ...আশ্রয়ের মত। 

   এখন ২০২০ সাল। করোনা আক্রান্ত পৃথিবী। তার মাঝেও মহাসমারোহে  পালন করা হয় রবিঠাকুরের জন্মদিন। 

‌ভাবলে অবাক লাগে , আজ যাঁকে ঘিরে এই উন্মাদনা , একদিন তাঁকে নির্মম ভাবে সহ্য করতে হয়েছিল নিন্দুকের চপটাঘাত। বিষ  নিন্দার আঘাতে জর্জরিত রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন --    :এমন অনবরত , এমন অকরুণ, এমন অপ্রতিহত অসসম্মাননা আমার মত আর কোনো সাহিত্যিককে সইতে হয় নি! ( ১৩৩৮ সাল/ নোবেল পুরস্কার লাভ করার পরে)

‌🙏🙏🙏🙏

।          মহৎ সৃষ্টি করতে গেলে গোলাপ পাঁপড়ি বিছিয়ে রাখা পথ থাকে না কোথাও। প্রত্যেকে তাদের নির্মম অভিজ্ঞতা থেকে জানেন কিভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হয় কাঁটার আঘাতে। অযথা কুৎসা অযথা মিথ্যা রটনা  ভয়ংকর আক্রমণ ... বারবার আছড়ে পড়ে সুনামির ঢেউয়ের মত। নিজের চেনা বৃত্ত হতেই আঘাত আসে বেশি।  নিজের কাছের লোকের হাতে লকলক করে ঈর্ষার ছুরি। 

    আজকেও যারা চেষ্টা করছেন দুর্দিনে বাংলা বই মাথা তুলে দাঁড়ায় যেন, কত ভাবে হেনস্থা হচ্ছে তারা!    

     ❤️❤️❤️      রবীন্দ্রনাথ আক্রান্ত ছিলেন যাঁদের হাতে, সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে সেই সময় খ্যাতির শিখরে আছেন তাঁরাও। মানুষ তাঁদের মান দিচ্ছে। তাঁদের রচনা ছড়িয়ে পড়ছে দেশে বিদেশে। নাহ্। তাতে শান্তি নেই। ঠাকুর পরিবারের ওই রবি নামতেই হবে নিচে। নামতেই হবে নোংরা পাঁকে। অদ্ভুত এই বিকৃত মানসিকতার শিকার ছিল তৎকালীন সমাজের বহু বিখ্যাত লোক। কিন্তু কেন? কেন বহন করে মানুষ নিন্দা নামক বিষ? এর কারণ জানতে হলে, একটু আলোচনা করা যাক অন্যদিক দিয়ে। 

 এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন:

‌

‌   :পরনিন্দা পৃথিবীতে এত প্রাচীন এবং ব্যাপক যে, সহসা ইহার বিরুদ্ধে যে সে মত প্রকাশ করা ধৃষ্টতা হইয়া পড়ে। .....

‌

       ‌বস্তুত নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কী থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, সে ভালো কাজের দাম কী! একটা ভালো কিছু লিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে! ...‌কেবল, প্রার্থনা এই যে, এরূপ নিন্দা যাহার স্বভাবসিদ্ধ সেই দুর্ভাগাকে যেন দয়া করিতে পারি।🙏


‌      দীর্ঘ উক্তি তুলে ধরলাম। কতখানি রক্তাক্ত হৃদয় থেকে তিনি এমন কথা বলেছেন। সহ্য করেছেন কত মিথ্যা লাঞ্ছনা! 

‌১৯২২ সাল। বসন্তকুমার চট্টোপাধ্যায়  নিজের লেখা গ্রন্থ :রবীন্দ্রছন্দ: 

  তার ভূমিকায় লিখলেন: 

‌      :রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ উপহাস কুৎসা কটু বাক্য গালি গালাজ করিতে দেশে অপরিমিত মূলধনে একটি স্বদেশী যৌথ কারবার স্থাপিত হইয়াছে।


   যৌথ করবার এই মুহূর্তে , লকডাউনের অলস বাজারে এমন যৌথ কারবার রমরম করে চলছে। তবে, বিন্দাস থাকুন। আপনি অন্যায় না করলে কেউ কিছু করতে পারবে না। কুৎসার এত শক্তি নেই যে সরল সৎ মানুষের চুল স্পর্শ করার  আরো উদাহরণ দিতে পারি। কুৎসা রটনা কারি এখন সব কোথায়?

    ‌১৮৮৮ সাল। কালীপ্রসন্ন কাব্য বিশারদ একটি ব্যাঙ্গাত্মক ছড়ার বই প্রকাশ করেন। বইটির নাম -- মিঠেকড়া।

    প্যারোডি করে লিখলেন সেই অযোগ্য কবি: 

‌ উড়িসনে রে পায়রা কবি

‌ খোপের ভিতর থাক ঢাকা

‌  তোর বকবকমম আর ফোঁস ফোঁসানি

‌তাও কবিত্বের ভাব মাখা।...

‌

‌ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ 

‌ বঙ্গের আদর্শ কবি 

‌ শিখেছি তাহারে দেখি

‌  তোরা কেউ কবি হবি? 


‌ পাঠক! এখুনি চমকে যেও না। আরো অজস্র তীর আসছে ছুটে। বিখ্যাত কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। এমন সব কটূক্তি করতেন যে, কানে আঙ্গুল দিতে হয়। 

‌আনন্দ বিদায় 

   নামক একটি ব্যঙ্গ নাটিকায় তাঁর ( ডি এ ল রয়) আক্রমণের ভাষা স্তম্ভিত করে। 

‌:একাধারে কবি, অধিকারী , ঋষি কিবা ত্যাগ, কিবা দান

‌ পরিষৎ জল ছিটিয়ে দিলেই ( কবিবর) স্বর্গে উঠিয়া যান।  ‌সুহাসচন্দ্র রায়। তিনি সমালোচনা বিজ্ঞান প্রথম ভাগ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। 

‌" রবি পরম গুরু। তিনি হেলিলে হেলিবে। দুলিলে দুলিবে।"

      ‌ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। দেশবন্ধু সম্পাদিত নারায়ণ পত্রিকায় বিরোধিতা হত রবীন্দ্রনাথের!

‌বহুলোক এই ধরণের মন্তব্য করতে পিছপা হত না যে, বড়লোকের ছেলে। এত প্রতিপত্তি। কথায় কথায় বিলেত যান। দরকার কি ছিল বাংলা সাহিত্য চর্চা করার? ছড়া বাঁধা হল: 

‌🔥 আয় তোরা কে দেখতে যাবি।

‌ঠাকুর বাড়ির মস্ত কবি

‌হায়রে কপাল হায়রে অর্থ

‌ যার নাই তার সকল ব্যর্থ। 

🔥🔥🔥🔥

‌

‌ হায়!  মানুষের চরিত্র। ধনীর সন্তান । তাই অধিকার নেই সাহিত্য চর্চার! কী অদ্ভুত বিচার! 

‌*********

‌ এই প্রসঙ্গে আলোচনা করি, ঈর্ষা নামক মানসিক ব্যাধির কথা। অপরের সব ভালো, আর আমার কিছু হচ্ছে না, এই মনোভাব থেকে যে মানসিক জ্বলন , ভালো না লাগা , রাগ__সেটাই ঈর্ষা। ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে যখন সেই মানুষটির ক্ষতি কামনা করা হয় এবং আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় ক্ষতি করতে, তখন সেটা পরিণত হয় হিংসায়। এবং , ধীরে ধীরে স্ফুলিঙ্গের থেকে জ্বলে ওঠে দাবানল। 

‌একজন মনস্তত্ত্ববিদ হিসেবে জানি, ঈর্ষা থেকে হার্টের অসুখ হতে পারে। নার্ভাস ব্রেকডাউন হতে পারে। বদ হজম , ডিপ্রেসন, মাথা ব্যাথা__কিছুটা হলেও, এসব রোগের মূল কারণ মন এবং মনের মধ্যে জেগে ওঠা বিকার। ঈর্ষা হোক। হোক মহতের তরে। মহৎ লাভের আশায় ঈর্ষা করলে, জীব ও জগতের উপকার। 

‌***

‌ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথের কথায়। ঋষিকল্প মানুষটি কিভাবে সহ্য করেছিলেন এইরকম বিষের জ্বালা?  সম্ভব হত কী? কবির কথায় দেখে নি একবার: 

‌ " কেবল এই কথাটা আমি 

‌বুঝিবার ও বুঝাইবার চেষ্টায় ছিলাম যে সাধারনত মানুষ নিন্দা করিয়া যে সুখ পায়,। তাহা বিদ্বেষের সুখ নহে। বিদ্বেষ কখনোই সাধারণভাবে সুখকর হইতে পারে না। এবং বিদ্বেষ সমস্ত সমাজের স্তরে স্তরে পরিব্যাপ্ত হইলে যে বিষ হজম করা সমাজের অসাধ্য। 

     নিন্দা বিরোধ গায়ে বাজে না, এমন কথা অল্প লোকই বলিতে পারে। 

‌যাহার হৃদয় বেশি তাহার ব্যথা পাইবার শক্তিও বেশি।

‌

‌    কতখানি জমাট বাঁধা অভিমান থেকে এমন কথা কবি বলেছেন, ভাবতে গেলে মন ভরে ওঠে গভীর বিষাদে। মানুষ অদ্ভুত। মাথায় তুলে নিতেও দেরি নেই। নিচে ফেলে গুঁড়িয়ে দিতেও পিছপা হয় না। 

‌


(তথ্যসূত্র: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ক বিভিন্ন বই। 

রবীন্দ্র বিদুষণ ইতিবৃত্ত: আদিত্য অহদেদার ব্যাখ্যা : নিজস্ব।)


শেষে একটা ফুটনোট দেব: 

যত নিন্দা তত সমৃদ্ধি।


শনিবার, ৩ জুলাই, ২০২১

তুষ্টি ভট্টাচার্য

                                                    



সাইকেল ( অষ্টম পর্বের পর)

 #৯

Para bailar la bamba
Para bailar la bamba
Se necesita una poca de gracia
Una poca de gracia
Pra mi pra ti
Ay arriba, arriba
Ay arriba, arriba
Por ti sere, por ti sere, por ti sere

Yo no soy marinero
Yo no soy marinero
Soy capitan
Soy capitan
Soy capitan

Bamba, bamba
Bamba, bamba
Bamba, bamba
Bamba, bamba

(বাম্বা নাচতে গেলে

বাম্বা নাচতে গেলে

চাই একটুখানি কৃপার,

চাই একটু দয়া

আরও একটু বেশি

আরও আরও বেশি

তোমার জন্য জন্য আমি আছি, তোমারই জন্য আছি

 

আমি নাবিক নই,

আমি নাবিক নই

আমি ক্যাপ্টেন

আমি ক্যাপ্টেন

আমি ক্যাপ্টেন

 

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা

বাম্বা বাম্বা )

এইরকম একটা দুরন্ত ছন্দের গান গাইতে গাইতে সামুয়েল প্রায় নাচছিল। গান, নাচ শেষ হলে সমবেত কচি হাসির রোল উঠলে চমকে তাকালো সে। বিচ্ছুগুলো আসলে যায়নি। কাছেপিঠেই ছিল। ওর গিটারের আওয়াজ শুনে আড়াল থেকে সব শুনছিল এতক্ষণ। এরপর ওকে ঘিরে ধরে সবাই হইচই শুরু করল। ওদের বক্তব্যের মূল সুর একটাই—গান শেখাও আমাদের। আমরাও তোমার মতো গাইতে চাই। সামুয়েলও এক পায়ে রাজি। ঠিক হল, কাল স্কুলের শেষে গান শেখানোর ক্লাস শুরু হবে। গিটারও শেখানো হবে। গিটার শেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল বুলবুল। ওর জন্যই প্রধানত গিটার শেখার ক্লাস। বাকিরা গান শিখতে চাইলে শিখবে।

বুলবুল আনন্দে ফুটছে একরকম। ঘরে এসেই স্নান খাওয়াদাওয়ার পর্ব মিটলে সামুয়েলকে ধরল। ‘একবার গিটার ছুঁতে দাও! কিভাবে ধরে একটু দেখিয়ে দাও। আঙুলে আংটির মতো কী পরে ওদুটো?...’ এইসব হাজার বায়নাক্কায় অস্থির হয়ে পড়ল সামুয়েল। ওকে শান্ত হতে বলেও পার পেল না। শেষে একটু বিরক্ত হয়েই সামুয়েল বলল, ‘এই গিটার যদি আমার হৃদয়, তবে ওই সাইকেল আমার মস্তিষ্ক। আমার সাইকেলে বাচ্চাগুলো ওঠে, আমি মুখে কিছু বলি না ঠিকই, কিন্তু আমার বুক ফেটে যায়। আর গিটার আমি কাউকেই ছুঁতে দিইনি এখনও। আশা করি তুমি বুঝবে…’ থমথম করে উঠল চারিদিক হঠাৎ করেই। পিনপতনের শব্দ শোনা যাবে এমন এক নিস্তব্ধ আবহাওয়ায় বুলবুল আচমকা ডুকরে উঠে চলে গেল। আর সামুয়েল কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে কি একটু বেশিই কর্কশ হয়ে পড়েছিল বুলবুলের প্রতি? এতটা কঠিন স্বরে ওকে বলা বোধহয় উচিত হয়নি। কিন্তু ছোঁড়া তির আর বলা কথা কি আর ফিরিয়ে আনা যায়? অগত্যা থম মেরে বসে রইল সামুয়েল।

পরদিন স্কুলের জন্য সকলে হাজির হলেও বুলবুল এলো না। ওর মাকে জিজ্ঞেস করায় জানালেন, ওর নাকি শরীরটা ভালো লাগছে না। সামুয়েল সমস্ত বুঝেও চুপ করে রইল। স্কুল শুরু হল সময় মতো। কিন্তু বাচ্চারা বুঝতে পারছিল, তাদের সামুয়েল দাদার মন ঠিক নেই আজ। সেই প্রাণোচ্ছল মানুষটার কী যেন হয়েছে। আজ তাই স্কুলশেষে গান শেখা হল না ওদের। সামুয়েল সাইকেল নিয়ে ধীরে ধীরে কোথায় যেন চলে গেল। এমনকি দুপুরেও খেতে এলো না সে। অভিজিৎ ফোন করার চেষ্টা করল বেশ কয়েকবার। প্রত্যেকবারই আউট অফ রিচ্‌ বলছিল। বুলবুল চুপচাপ রয়েছে এসব দেখেশুনে। রাগ আরও বেড়ে যাচ্ছিল সামুয়েলের ওপর। স্কুল যেতে কি ও বাধ্য নাকি? নাকি এই স্কুলে পড়লে, পাস করলে রেজাল্ট পাওয়া যায়? এ তো এমনি এমনি স্কুল। খেলাচ্ছলে শেখা। আর তাই তো ও গিটার শিখতে চেয়েছিল। কী এমন দোষ হয়েছে তাতে? ও কি সামুয়েলের গিটার নষ্ট করে ফেলত? বাচ্চা নাকি ও? রাগ, অভিমান মিলে মিশে জমাট বাঁধছিল বুলবুলের বুকে। যে মেয়ে সারাদিন বকবক করে সে সকাল থেকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে—এও তো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। বুলবুলের মা ওকে চেপে ধরল এবার। ‘নিশ্চই তুই ছেলেটাকে উল্টোসিধে কিছু বলেছিস! নইলে তো ও এমন নয়। তোর আর বুদ্ধি হবে না। একটা ছেলে পরিবার ছেড়ে বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে আছে…আর তুই ওকে কোথায় দেখভাল করবি, তা না!’ মায়ের বকা খেয়ে বুলবুলের রাগ, অভিমান গলে কান্না হয়ে ঝড়ে পড়ল। অভিজিৎ ওকে টেনে নিয়ে গেল ওর ঘরে। তারপর বোনের থেকে গিটারের কাহিনী জেনে নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হল। মনে হয়, সামুয়েল এই গ্রাম ছেড়ে যাবে না। অন্তত যাওয়ার আগে তাকে কিছু না কিছু বলে যাবে। আছে কোথাও এদিক, ওদিক।

বুলবুল চোখ মুছে দাদাকে জানাল, ‘তুই একবার বাইক নিয়ে ওই পাহাড়ের দিকে যা। সামুয়েলদা নিশ্চই ওখানে গিয়ে বসে আছে’। অভিজিৎ ব্যস্ত হয়ে বাইকে স্টার্ট দিল তখনই। আর বুলবুলের প্রত্যাশা মতো টিলার দিকে একটা বড় পাথরের আড়ালে সামুয়েলের সাইকেলটা দেখতে পেল ও। চেনা বাইকের আওয়াজে সামুয়েলও বেড়িয়ে এলো কোনো ফাঁক থেকে। অভিজিতকে দেখতে পেয়ে যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে ওকে টেনে নিয়ে গেল জঙ্গলের দিকে। সেখানে তখন একঝাঁক প্রজাপতি ওড়াউড়ি করছে। রঙের খেলা দেখতে দেখতে নাকি ওর দুপুরে খাওয়ার কথা মনে নেই। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল অভিজিৎ।

দূর থেকে অভিজিতের পিছন পিছন সামুয়েলকে সাইকেলে আসতে দেখে বড় করে শ্বাস নিল বুলবুল। থাক বাবা! আর গিটার শিখে তার কাজ নেই। সামুয়েল চলে গেলে কী হত? সারাদিন ছেলেটা খায়নি বলে সন্ধেবেলা অভিজিতের মা পরোটা আর নারকেল দিয়ে ঘুগনি বানিয়েছিল। তৃপ্তি করে খেলে সামুয়েল। ওর খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কতখানি খিদে ছিল ওর পেটে। রাতে যথারীতি গিটার নিয়ে বসে টুংটাং করছিল ও। বুলবুলকে ঘুরঘুর করতে দেখেই ডাক দিল। ‘এই মেয়ে! এদিকে এসো। আমার কথায় রাগ করেছ? এসো। আজই তোমাকে গিটারের প্রথম পাঠ শেখাই’। বুলবুলের সব রাগ, অভিমান জল হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। খুব মনোযোগ দিয়ে সামুয়েলের কাছ থেকে গিটার শিখতে শুরু করল ও। দুচারদিনের মধ্যেই বুলবুলের শেখার ক্ষমতা আর এত সহজে গিটারের প্রাথমিক কলাকৌশল আয়ত্ত্ব করতে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল সামুয়েল। আর তাই মনে মনে এক প্রতিজ্ঞা করল নিজের কাছে।  

অমিতাভ সরকার

                                     


  বেজন্মা ( সপ্তম পর্বের পর)


# 

“পিসিমা…, রাবেয়া…” দাওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দেয় কৃষাণ। দুজনেই বেরিয়ে আসে। কৃষাণ মিষ্টির প্যাকেট এগিয়ে দেয়।

“গতকাল আনতে পারিনি, আপনাদের খুঁজে পাবো কিনা, বুঝতে পারিনি, তাই…”।    

“এই সব কেন আনতে গেলে বাবা। দাঁড়াও একটু চা করি”। বলতে বলতে রান্নাঘরে ঢোকে ভদ্রমহিলা। কৃষাণ রাবেয়ার দিকে তাকায়। বিছানার এককোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে চাদরে ওপর হাত বোলায় রাবেয়া, যেন কথা বলার জন্য বিষয় খুঁজছে সে। কৃষাণই নিরাবতা ভাঙে…।    

“আজ তোমার দাদার সঙ্গে কথা বললাম। কথা বলবে…? মাথা নাড়ায় রাবেয়া।  

“আমি তো কোনদিন দেখিই নি, কী বলবো?    

“জানো গতকাল বিকেলটা খুব আনন্দে কাটালাম তোমার সঙ্গে…। যখনই মনে হবে ফোন করো। অবশ্য সবসময় আমাকে নাও পেতে পারো। ডিউটিতে থাকলে পাবে না, তবে মিসড কল হয়ে থাকলে, পরে সময় মতো ফোন করে নিতে পারি”। কথা বলতে বলতে চা নিয়ে ভদ্রমহিলা ঢোকে। কৃষাণ শামসুদ্দিনের বাবাকে ফোন করে। ভাগ্যক্রমে একবারেই ফোন লেগে যায় কৃষাণের।   

“হ্যালো… হ্যাঁ, আমি কৃষাণ বলছি চাচা। এই নিন আপনার বোনের সঙ্গে কথা বলুন”। ফোনটা ধরিয়ে দেয় রাবেয়ার মা’কে।   

“হ্যালো…ভাইজান…” শামসুদ্দিনের বাবার গলা শুনে কেঁদে ফেলেন ভদ্রমহিলা। কথা বলতে গলা ভার হয়ে যাচ্ছিল তাঁর। কয়েক মিনিট কথা পর আঁচলে চোখ মুছে মোবাইল ফেরত দিতে উঠে দাঁড়ায় কৃষাণ…।        

“পিসিমা, রাবেয়াকে ফোন নম্বর দিয়েছি, প্রয়োজনে ফোন করবেন। যদি সে রকম প্রয়োজন হয়, আমি চলে আসতে পারি। এখন থেকে মনে রাখবেন, আপনারা একা নন, আপনার এই ছেলে আছে”। ভদ্রমহিলাকে প্রণাম করে দাওয়ায় নেমে আসে কৃষাণ।  

“রাবেয়া এখানে একটু থাক, আমি কৃষাণকে এগিয়ে দিয়ে আসি”। গায়ে একটা সাদা ওড়না জড়িয়ে চটি পরে কৃষাণের সঙ্গ নেয় ভদ্রমহিলা।    

“কৃষাণ, একটা দিনেই কত আপন হয়ে গেছো তুমি। গতকাল ফিরে এসে রাবেয়া শুধু তোমার কথাই বলেছে।" 

“আমার কাছেও একটা দিন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এত যত্ন জীবনে কোথাও পাই নি। রাবেয়া খুব ভালো মেয়ে। পড়াশোনা করে আত্মনির্ভর হতে চায় সে। বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনা করতে দিন। আমার ফোন নম্বর তো রইল রাবেয়ার কাছে, কিছু যদি দরকার হয় জানাবেন”।   

“জানিই না কতদূর পড়াতে পারবো। মেয়ে বড় হয়েছে, লাভপুরের অবস্থাপন্ন কয়েকজন বারবার এসে জ্বালাতন করে। সবারই ঘরে বিবি রয়েছে, তবু…” একটা দীর্ঘ নিশ্বাস পরে ভদ্রমহিলার। কী বলবে বুঝতে পারে না কৃষাণ।   

“একটা কথা জিজ্ঞাসা করব কৃষাণ? কিছু মনে করো না… 

“বলুন না পিসিমা, এত দ্বিধা করছেন কেন? আমি তো মাকে দেখিনি কোনদিন, আপনার মধ্যেই আমি মা’কে দেখেছি”। 

“বলছিলাম কি… তুমি তো হিন্দু…? কথাটা শুনে হেসে ফেলে কৃষাণ। 

“আমার কোনও জাত নেই পিসিমা। তাই পদবিও নেই। এই ধর্মই তো যত নষ্টের মূল। ধর্মের ধ্বজাধারীরা বাধা দেয় আমাদের এক হতে। তাই ওসবে আমার বিশ্বাস নেই। হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন পিসিমা?”    

“মানে, তুমি যদি রাবেয়ার দায়িত্ব নাও, তাহলে ওই শয়তানদের হাত থেকে মেয়েটা বাঁচে। আমিও নিশ্চিন্তে মরতে পারি। অবশ্য তোমার যদি কোনও আপত্তি না থাকে”। ভদ্রমহিলার কথায় কৃষাণের কালীপ্রসন্ন বাবুর কথা মনে পড়ে গেল… ‘বন্ধুকে বলুন এঁদের এখান থেকে নিয়ে যেতে, মেয়ে বড় হচ্ছে…পরিস্থিতি ভালো নয়’, উনি কী বলতে চাইছিলেন?’ 

“ঠিক আছে পিসিমা, একটু ভেবে নেই, একবার শামসুদ্দিনের সঙ্গেও কথা বলা দরকার। আর তা ছাড়া আমার সব কথাও রাবেয়ার জানা দরকার। রাবেয়ার মতামতটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।   

“ওর আবার কিসের মতামত? তোমার মতো ছেলে…”।  

“না পিসিমা, এটা ঠিক নয়। রাবেয়ার মতামতই আগে দরকার। ভবিষ্যতের কত কী ভেবে রেখেছে সে। তার সঙ্গে আগে কথা বলুন, তারপর আমাকে জানাবেন। ও হ্যাঁ, একটা ফোন নম্বর দিন, যেখানে আমি আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি”।    

“আমাদের তো ফোন নেই বাবা, আমি বরং দিন সাতেক পর তোমাকে ফোন করবো”। কথা বলতে বলতে তারা গ্রামে ঢোকার পথে বটগাছ তলায় এসে পৌঁছায়।   

“অনেক দূরে চলে এসেছেন, এবার আপনি ফিরে যান পিসিমা। চিন্তা করবেন না, আমি অবশ্যই আপনাকে জানাবো” ভদ্রমহিলাকে বিদায় দিয়ে দ্রুত পায়ে এগোয় কৃষাণ। সব শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। রাবেয়ার জন্য দুশ্চিন্তা মাথায় জমা হয়। “কৃষানদা…” মহিলা কন্ঠে ডাক শুনে পেছনে তাকায় কৃষাণ। দ্রুত সাইকেল চালিয়ে আসছে রাবেয়া।  কৃষাণের সামনে এসে সাইকেল থেকে নেমে হাঁপাতে থাকে…।      

“বাব্বা, এত জোরে হাঁটেন যে, ধরতেই পারি না…”।  

“কী ব্যাপার কোথাও যাবে নাকি?”

“না, এমনি এলাম। ভাবলাম, চলে যাবেন, একটু এগিয়ে দেই। বলা যায় না, আর হয়ত দেখা হবে না, তাই…”  

“কেন দেখা হবে না কেন? আমি তো তোমাকে বলেছি ফোন করতে। দরকার হলে আবার আসব বৈকি…”।   

“আম্মু’র কাছে সব শুনলাম। ঐ প্রস্তাবের পর কেউ আর ফিরে আসে? আম্মুকে নিয়ে আর পারা যায় না। যতদিন যাচ্ছে, আমাকে তাড়ানোর জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে…”। শেষদিকটা স্বগতর মতোই শোনালো…।    

“এই ভাবে বলো না, মা তো মেয়ের জন্য চিন্তা করবেই। আর তা ছাড়া, যা পরিস্থিতি শুনলাম…”।   

“বুঝেছি, ঐ সব শয়তানদের কথা বলছেন তো? এক পা কবরে দিয়েও শখ যায় না…” নিজের মনে গজরাতে থাকে।     

“ছেড়ে দাও ওসব কথা। সবই যখন শুনেছো, তখন আমার সব কথা তোমার জানা দরকার।” কৃষাণ তার জীবনের সব কথা খুলে বলে রাবেয়াকে। কথা বলতে বলতে একটু উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অন্তরের সেই ঘা যেন আরো ক্ষতবিক্ষত হতে থাকে। পুঁজ আর রক্ত ছড়িয়ে পড়ে তার শরীর। 

“তুমি শুনে ঘেন্না করবে আমায়। আমি প্রকৃত পক্ষে একটা ‘বেজন্মা’। তোমাদের পৃথিবী আর আমাদের পৃথিবী এক নয়”। কাঁপতে থেকে কৃষাণ। রাবেয়া কিছু না বলে কৃষাণের হাত নিজের হাতে তুলে নেয়। রাবেয়ার স্পর্শ পেয়ে শান্ত হয় কৃষাণ। যেন রাবেয়ার হাতের স্পর্শ শীতল প্রলেপ পড়ছে ক্ষতস্থানে।  

“সব তো শুনলে রাবেয়া, এবার তোমার মতামত বলো”। কৃষাণের মনে হলো এতদিনের পুঞ্জীভূত অব্যক্ত কথা রাবেয়াকে জানিয়ে যেন হালকা লাগছে নিজেকে।   

“আমি আবার কী বলবো…? আমি মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখি”। বাকুল মোড় পেরিয়ে লাভপুরে লজের কাছাকাছি আসতে এটিএম বুথের খোঁজ করে। এটিএম বুথ থেকে বেরিয়ে একটা মোবাইল ফোনের দোকান থেকে একটা ফোন কিনে বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা দেয়।  

“এখনো কিন্তু তোমার মত পেলাম না রাবেয়া। আমি কী শামসুদ্দিনের সঙ্গে কথা বলবো?” 

“তোমার যা খুশী…” রাবেয়া কৃষাণের হাতটা চেপে ধরে। কৃষাণের মনে হলো, রাবেয়া যেন তার কাছে সমর্পণ করল নিজেকে। বাসে ওঠার আগে ফোনের বাক্সটা রাবেয়ার হাতে তুলে দেয় কৃষাণ।  

“সিম ভরা আছে…। আজ বিকেলে তোমার ডকুমেন্ট দোকানে জমা করে সিমটা অ্যাক্টিভেট করে নেবে। সকালে আমাকে ফোন করবে, আমি আজ রাতে বোলপুরে থাকব। তোমার ফোন পেলে আমি চাচার সঙ্গে কথা বলব। দুশ্চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাব… আমি ফিরে আসব…”। বাস ছাড়ার সময় জানলা দিয়ে হাত বাড়ায় কৃষাণ। একটু দৌড়ে এসে শক্ত করে হাত ধরে রাবেয়া। রাবেয়ার দিকে তাকায় কৃষাণ। তার কালো দিঘীর মত গভীর চোখে জল উপচে পড়বে যেন।       

( ক্রমশঃ) 

শর্মিষ্টা দত্ত

                                       




দশম পর্বের পর 
খোঁজ (১১)

ইলেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে বেশ কয়েকদিন সর্দিজ্বরে ভুগল শর্মিলা l রেজাল্টও খুব একটা ভালো হল না l খাতায়কলমে শরৎকাল এসে গেলেও সেদিন দুপুর থেকেই ঘোর বর্ষা l ফিজিক্সের লাস্ট  প্রাকটিক্যাল ক্লাসদুটো হল না, দু পিরিয়ড আগেই স্কুল ছুটি হয়ে গেল l মৈত্রেয়ী অ্যাবসেন্ট, ওর জ্বর হয়েছে l শম্পার আরো আগে ছুটি হয়ে গেছে l একাই স্কুল থেকে ফিরছিল  শর্মিলা l সকাল থেকেই কেমন আনমনা হয়েছিল l বেশ কিছুদিন ধরেই রিজ্জুদার চিঠিপত্র বেশ অনিয়মিত l গতমাসে কলকাতায় আসেওনি l অফিসে নাকি খুব কাজের চাপ l কাল রাত্তিরে খাবার টেবিলে বসে কানে এল, কাম্মা খুব উত্তেজিত হয়ে ছোটকাকে বলছে রিজ্জুদাকে  নাকি অফিস থেকে ট্রেনিংএ বিদেশে পাঠাচ্ছে l আগামীমাসেই অন্তত বছরখানেকের জন্য জার্মানি চলে যাবে রিজ্জুদা l অফিসে কাম্মাকে ফোন করে জানিয়েছে l আজ সকালে মুনমুনও বলল 
--জানিস দিদিভাই, মামু না অনেক দূরের একটা দেশে চলে যাবে l 
অথচ আশ্চর্য ! শর্মিলাকে এ বিষয়ে বিন্দুবিসর্গও জানায়নি ! মৈত্রেয়ীদের বাড়িতে তো মাঝে মাঝে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলে l ওখানে কি একবারও ফোন করতে পারত না ! অভিমানে চোখে জল এসে গিয়েছিল  শর্মিলার l ক্লাসে পড়ায়ও  মন দিতে পারেনি l কেন এমন করল রিজ্জুদা ! অন্যমনস্ক হয়ে না দেখে রাস্তা ক্রস করার সময় একটা সাইকেল হঠাৎ করেই সামনে চলে এল l হুমড়ি খেয়ে মাঝরাস্তায় পড়ে গেল শর্মিলা l মুহূর্তে  জামাকাপড় জলকাদায় মাখামাখি l
--এই শর্মিলা, কি করছ ! এভাবে কেউ রাস্তা দিয়ে হাঁটে ! 
শর্মিলা তাকিয়ে দেখল কল্লোলদা, মৈত্রেয়ীর দাদা মৈনাকদার বন্ধু l মেডিকেল কলেজে পড়ে l ওদের পাড়াতেই থাকে, হোস্টেলে l কল্লোলদাই পৌঁছে দিল ওকে বাড়িতে l হাঁটুতে, কনুইয়ে একটু কেটে ছড়ে গিয়েছিল l জোর করে ওষুধ লাগিয়ে দিল l  এভাবেই শরীর -মনের ব্যথা নিয়ে কেটে গেল কয়েকটা দিন l সপ্তাহখানেক পরে রিজ্জুদার চিঠি এল l মন দিয়ে পড়াশোনা করার দীর্ঘ উপদেশ আর ছোট্ট করে জার্মানি যাওয়ার খবর l যেন এই খবরটার কোনো গুরুত্বই নেই l প্রথম বিদেশ যাওয়ার সুযোগ, সেজন্য কোনো উত্তেজনা নেই l দীর্ঘ একটা বছর, হয়ত বা তারও বেশি দেখা হবে না, সেজন্য কোনো  দুঃখবোধও নেই l খুব উদাসীনভাবে যেন অন্য কারুর প্রবাসে যাওয়ার  কথা লিখেছে l যেন রিজ্জুদা থাকা না থাকায় শর্মিলার কিছু যায় আসে না ! এভাবে একতরফা আবেগে কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠে ! আজকাল রিজ্জুদাকে অনুভূতিহীন পাথর মনে হয় ওর l সত্যিই কি শর্মিলার প্রতি ওর কোনো অনুভূতি নেই ! শর্মিলা কি একাই এই সম্পর্কটা নিয়ে সিরিয়াস ! নিজের ভিতরে ক্রমশ গুটিয়ে যেতে থাকে শর্মিলা l আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে l 

কয়েকদিন পরে রিজ্জুদা কলকাতায় এল l বিদেশ যাওয়ার আগে অপর্ণা একদিন ওকে রাতে  নেমন্তন্ন করলেন, সকলের উপস্থিতিতে শর্মিলার সঙ্গেও  দেখা হল l নেহাতই সৌজন্য সাক্ষাৎ l ও আলাদা করে শর্মিলার ঘরে এসে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখাল না, শর্মিলাও না l রিজ্জুদা যাওয়ার আগেই মাথা ধরেছে বলে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল l ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেলেও ইগোর লড়াইতে কোনোমতেই হারবে না শর্মিলা l মৈত্রেয়ী বলল 
--যে তোকে গুরুত্ব দেয় না, তাকে তুই কেন গুরুত্ব দিবি বল তো ! রিলেশনশিপকে যে রেজাল্টের মাপকাঠিতে মাপে সে এমন ব্যবহারই ডিজার্ভ করে l তুই যা করেছিস, একদম ঠিক l রিজ্জুদা যদি কোনোদিন সত্যিসত্যি মিস করে তোকে, তাহলে তোর ইমোশনকে ইম্পর্টেন্স দেবে নিশ্চিত l ও তোর ভালো রেজাল্ট দেখতে চায় তো ! সেটাই করে দেখা l তারপর দেখ না কি হয় ! 

মৈত্রেয়ী যত সহজে কথাটা বলতে পারল, পড়াশোনা করাটা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াল শর্মিলার কাছে l 
আগস্টের শেষ রবিবার দমদম এয়ারপোর্ট থেকে দিল্লির উড়ান ধরল রিজওয়ান l শর্মিলার বুকের ভিতরটা যেন খালি হয়ে গেল l ফাঁকা নিস্তব্ধ বাড়ি l অলোক, শবনম  আর মুনমুন গিয়েছে এয়ারপোর্টে l সন্ধ্যাবেলা ঘর অন্ধকার করে নিজের ঘরে শুয়েছিল শর্মিলা l পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙার পর যোগমায়া কিছুদিন ধরেই মেয়ের  বাড়িতে রয়েছেন l অপর্ণার শরীর বিশেষ ভালো নেই l হাই ব্লাডপ্রেশার ছাড়াও কার্ডিয়াক কিছু সমস্যায় এখন আর বেশী পরিশ্রম করতে পারেন না l বাবলু - টুবলু এখন ইংল্যান্ডে l রাজশ্রীর বাড়িটা প্রায় খালিই পড়ে থাকে, তাই রাজশ্রী  মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন l সেখানেই সকাল - বিকেল দুজন সেবিকা  তাকে দেখাশোনা করে l সন্ধ্যেবেলা অরুণ মাকে দেখতে গিয়েছেন l  চারদিকে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার l অপর্ণা এসে বসলেন মেয়ের মাথার কাছে l 
--মুন্নি, তুমি তো আমার হেরে যাওয়ার মেয়ে নও ! যা ধরে রাখা যায় না, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা কোরো না কখনও l এই ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্তি দাও মা ! 
মায়ের কোলে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে ফেলল শর্মিলা l ওর মাথায় হাত রেখে মা আস্তে আস্তে বলতে থাকলেন 
 
--"আমারে সাহস দাও, দাও শক্তি, হে চিরসুন্দর,
দাও স্বচ্ছ তৃপ্তির আকাশ, দাও মুক্তি নিরন্তর
প্রত্যহের ধূলিলিপ্ত চরণপতনপীড়া হতে,
দিয়ো না দুলিতে মোরে তরঙ্গিত মুহূর্তের স্রোতে,
ক্ষোভের বিক্ষেপবেগে। শ্রাবণসন্ধ্যার পুষ্পবনে
গ্লানিহীন যে সাহস সুকুমার যূথীর জীবনে--
নির্মম বর্ষণঘাতে শঙ্কাশূন্য প্রসন্ন মধুর,
মুহূর্তের প্রাণটিতে ভরি তোলে অনন্তের সুর,
সরল আনন্দহাস্যে ঝরি পড়ে তৃণশয্যা 'পরে,
পূর্ণতার মূর্তিখানি আপনার বিনম্র অন্তরে
সুগন্ধে রচিয়া তোলে, দাও সেই অক্ষুব্ধ সাহস,
সে আত্মবিস্মৃত শক্তি, অব্যাকুল,সহজে স্ববশ
আপনার সুন্দর সীমায়, দ্বিধাশূন্য সরলতা
গাঁথুক শান্তির ছন্দে সব চিন্তা, মোর সব কথা।"

দেশজুড়ে তখন খালিস্তানি আন্দোলনের ঢেউ l স্বাধীন শিখরাষ্ট্রের দাবিতে সোচ্চার সমগ্র শিখসমাজ l অপারেশন ব্লু-স্টারের আঁচ কলকাতার বাঙালিদের ঘরেও এসে লেগেছে l তারস্বরে টিভির খবর চলে আর পার্টিঅফিস বা পাড়ার চায়ের দোকানের তর্ক উঠে আসে শর্মিলাদের বসার ঘরে l বাবা অফিস থেকে ফিরলে পাশের বাড়ির সমীরণকাকু রোজ সন্ধ্যেবেলা আড্ডা দিতে আসেন এ বাড়িতে l ছোটকা থাকলে শুরু হয় তুমুল তর্কবিতর্ক l রাজনৈতিক তরজায় মুখর হয়ে ওঠে বাঙালির অন্দরমহল l বছরখানেক আগে সমীরণকাকু অর্থাৎ শম্পার বাবা আর্মি থেকে রিটায়ার করে কলকাতায় চলে এসেছেন, মেডিসিনের ডিলারশিপ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন ইদানিং l কেয়ামাসিদের  জমি কেনা হয়েছে  বেলেঘাটায় l কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ি করে চলে যাবে ওরা l 
প্রিটেস্ট হয়ে গেছে l এবারেও শর্মিলার রেজাল্ট তেমন ভালো হয়নি l একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়েই বইখাতা খুলে বসে থাকা l বাড়িতে থাকলে বইয়ের সমস্ত অক্ষরগুলোই দুর্বোধ্য ঠেকে l কোনো অঙ্কই মেলে না, মাঝপথে এসে আটকে যায় lআত্মবিশ্বাস ক্রমশ তলানিতে l এখন মনে হয় আর্টস পড়লেই ভালো হত l এভাবে চললে হয়ত পাশই করতে পারবে না শর্মিলা, ভালো রেজাল্ট তো দূরের কথা l আজকাল প্রায় রোজই মৈত্রেয়ীর বাড়িতে গিয়ে ওর কাছে পড়ে শর্মিলা l মৈত্রেয়ী নিজে পড়তে পড়তেও কড়া চোখে ওর পড়ার দিকে নজর রাখে l বারবার পড়া বুঝিয়ে দেয়, অঙ্ক প্র্যাক্টিস করায় l

অক্টোবরের শেষ দিন, বাতাসে হালকা শিরশিরে টান l স্নান করে মৈত্রেয়ীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছিল শর্মিলা l বাইরে বেরোতেই তুমুল শোরগোল l অপর্ণা ছুটে এসে বললেন 
--মুন্নি তুই এখন বেরোস না l 
--কি হয়েছে মা?  
--টিভির খবরে বলল প্রাইম মিনিস্টার খুন হয়েছেন l ওঁর নিরাপত্তারক্ষী সামনে দাঁড়িয়ে গুলি করেছে ওঁকে l এবার তো শহরে গোলমাল শুরু হবে l তোর বাবা, ছোটকা, কাম্মা সবাই অফিসে বেরিয়েছে l কি হবে এখন?  
--আমি বরং কেয়ামাসির বাড়ি যাই l সমীরণকাকুকে কি বলে দেখি l 
কিছুদিন আগেই কেয়ামাসিরা  বাড়িতে ফোন কানেকশন নিয়েছেন l সমীরণকাকু ওঁর আর্মির বন্ধুদের থেকে খবরাখবর নিচ্ছিলেন l দিল্লিতে নাকি দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে l রাস্তায়-ঘাটে শিখনিধন যজ্ঞ চলছে l কলকাতা শহরেও  বাস এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার বেশিরভাগই শিখ পাঞ্জাবী, তাই ট্রান্সপোর্টের বেহাল অবস্থা l ছোটকাকে অফিসের ফোনে পাওয়া গেল l পরিস্থিতি বুঝে অফিস থেকে বেরোবে l শবনমকে তার এক কলিগ নিজের গাড়ি করে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেলেন l অরুণের অফিসে ফোন করে জানা গেল তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছেন l বিকেল চারটে নাগাদ অলোক ফিরল, কিন্তু অরুণের দেখা নেই l রেডিও টিভিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত গন্ডগোলের খবর  জানা যাচ্ছে l সন্ধ্যাবেলা অলোক, স্বরূপবাবু আর সমীরণবাবু গেলেন মৈত্রেয়ীর বাবা পরিমল রায়চৌধুরীর কাছে থানায় l দিনের পর দিন শহরের সমস্ত হাসপাতাল, থানায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না মানুষটাকে l কর্পূরের মত যেন উবে গিয়েছ শর্মিলার বাবা l অপর্ণা পাথরের মত স্থবির l যন্ত্রের মত সংসারের কাজকর্ম করে যান আগের মতই l শান্তশিষ্ট, একান্ত পরিবারঅন্তপ্রাণ মানুষটি যে সোচ্চার না হয়েও শর্মিলার  কতখানি জুড়ে ছিলেন সেটা টের পাচ্ছিল শর্মিলা l বাড়িতে এতগুলো মানুষের মধ্যে বাবার সঙ্গে দিনে কটাই বা  কথা বলত ! কিন্তু বাড়ির সবটুকু জুড়ে যেন বাবা ছিল l মাও এখন নিষ্প্রাণ একটা মানুষ l পিসি রোজ আসে,  মায়ের কাছে বসে কথা বলানোর চেষ্টা করে, কেয়ামাসিও l মা নির্বাক l ছোটকা নিয়ম করে থানায় যায় l পরিমলকাকু তার নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে বাবার সন্ধান জারি রাখেন l টিভিতে নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণায় রোজই বাবার নাম বলা হয় l কিন্তু অরুণ বসু নামটা ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে l 

দিন যায় l শহর ক্রমশ তার নিজস্ব ছন্দে ফেরে l কিন্তু ওলোটপালোট হয়ে যায় ওদের মা - মেয়ের জীবন l 

মাসদুয়েক পরে তীব্র শীতের মধ্যে কাটোয়ার গঙ্গার ধার থেকে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় একজন  ভবঘুরেকে  উদ্ধার করে নিয়ে আসা হল  কলকাতায় l পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে অলোককে ডেকে পাঠানো হল l দাদাকে আইডেন্টিফাই করে সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে এল  অলোক l ডক্টর বাগচীর নার্সিংহোমে ভর্তি করার পর শারীরিকভাবে খানিকটা সেরে উঠলেন অরুণ l কিন্তু কিভাবে কাটোয়ায় গিয়ে পড়েছিলেন সেটা রহস্যই থেকে গেল l ডক্টর বাগচী গোবরা মেন্টাল হসপিটালে অরুণের ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করে দিলেন l 

(চলবে )



তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

 

                                                                 




এই সপ্তাহের কবি তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়।জন্ম– ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৮; হুগলি জেলার আরামবাগে। বর্তমানে তারকেশ্বরের স্থায়ী বাসিন্দা। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ রবীন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে ইংলিশ অনার্স নিয়ে পাঠরত। 'কবিতা আশ্রম', 'মাসিক কবিতাপত্র', 'রাঢ় বনতলি', 'তবুও প্রয়াস', 'বাক্'-সহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও ওয়েবজিনে লেখা প্রকাশিত হয়েছে। 




ট্রিওলেট
________

১
মাটির প্রতিমার দু-চোখে মৃন্ময়
আকাশ দেখে আমি ক্রমে নীরব হই।
অথচ দৃশ্য তো কথার ঋণ নয়।
মাটির প্রতিমার দু-চোখে মৃন্ময়
আকাশে আন্ধার। কোমল দিন নয়।
দিনের খোঁজ কেউ করল আর কই?
মাটির প্রতিমার দু-চোখে মৃন্ময়
আকাশ দেখে আমি ক্রমে নীরব হই।

২
কোথায় অন্ধের চক্ষু জাগরূক?
অঘোরী স্বপ্নের কোন সে কূট স্থল?
আমরা বিস্ময়ে জন্মাবধি মূক।
কোথায় অন্ধের চক্ষু জাগরূক?
কোথায় স্বপ্নের নিষ্কলুষ বুক
ছুঁচ্ছে নির্বাক চোখের ম্লান জল?
কোথায় অন্ধের চক্ষু জাগরূক?
অঘোরী স্বপ্নের কোন সে কূট স্থল?

৩
তারার বাম পায়ে আমার সন্ধান
ফুরিয়ে গেল আজ। এসব জানে কেউ?
মাতৃমুখ যেন মাঠের পীত ধান!
তারার বাম পায়ে আমার সন্ধান
জানবে উৎসাহে অলীক সন্তান?
সাধনস্রোতে ওঠে মন্দ্র কালো ঢেউ।
তারার বাম পায়ে আমার সন্ধান
ফুরিয়ে গেল আজ। এসব জানে কেউ?

৪
এখন মুখ নয়, মুখের ওম খুঁজি।
কিন্তু সব মুখ ভীষণ ভঙ্গুর!
ক্রমশ উবে যায় সবার রুটি-রুজি।
এখন মুখ নয়, মুখের ওম খুঁজি।
এমন এষণার অর্থ কিছু বুঝি?
বুঝি না, শুধু চাই প্রীত নবাঙ্কুর।
এখন মুখ নয়, মুখের ওম খুঁজি।
কিন্তু সব মুখ ভীষণ ভঙ্গুর!

৫
কে তুমি শত্রুর দুয়ারে ভিক্ষায়
দু-মুঠো চাল চাও, সঙ্গে বরাভয়?
তোমার দীক্ষায় আমার কাল যায়...
কে তুমি শত্রুর দুয়ারে ভিক্ষায়
দু-মুঠো কাল চাও? কাল জগৎ খায়।
তোমার পথ আজ আমার পথ হয়।
কে তুমি শত্রুর দুয়ারে ভিক্ষায়
দু-মুঠো চাল চাও, সঙ্গে বরাভয়?

৬
স্থির ধ্যানের টানে জাগে পৃথুল সাপ।
অভিসারের কামে কাঁপে সহস্রার।
চক্র পার হল। কমছে সন্তাপ।
স্থির ধ্যানের টানে জাগে পৃথুল সাপ।
এ গতি জাগতিক? কেন এমন তাপ?
গূঢ় কুহক যেন জগৎ, সংসার!
স্থির ধ্যানের টানে জাগে পৃথুল সাপ।
অভিসারের কামে কাঁপে সহস্রার।

৭
আমার হাড় দিয়ে দামামা ঠুকতেই
আকাশ কালো ক'রে কত শকুন ওড়ে
হাড়ের অন্দরে শব্দ ঢুকতেই!
আমার হাড় দিয়ে দামামা ঠুকতেই
বুঝেছি বাদ্যের কোনও অসুখ নেই।
কেবল স্তব্ধতা দূরে প্রবল পোড়ে...
আমার হাড় দিয়ে দামামা ঠুকতেই
আকাশ কালো ক'রে কত শকুন ওড়ে!

৮
আবার স্বপ্নের ভিতরে যাই, আর
খুঁজছি একা একা পিতার শৈশব।
শীতল কিশলয়! হাসিটি মুক্তার।
আবার স্বপ্নের ভিতরে যাই, আর
দেখছি শিশু নেই! পিতার সৎকার!
মুহূর্তেই ছাই সবুজ বৈভব।
আবার স্বপ্নের ভিতরে যাই, আর
খুঁজছি একা একা পিতার শৈশব।

৯
স্মৃতি তামস হ্রদ। এখন স্রোত কম।
অযুত মুখ নীচে মাছের চরাচর।
রক্ত ঝরে খুব। রক্ত ঝমঝম।
স্মৃতি তামস হ্রদ। এখন স্রোত কম।
আদপে হ্রদ? নাকি জলের রতি, ভ্রম?
ভাসছে, ভেসে যায় নাছোড় জরা, জ্বর...
স্মৃতি তামস হ্রদ। এখন স্রোত কম।
অযুত মুখ নীচে মাছের চরাচর।

১০
অন্তে মৃত্তিকা। অন্তে প্রতিমার
মাটির চোখে ফের আকাশ খুঁজে পাই।
ক্রমশ আয়ু কমে আমার দ্রাঘিমার।
অন্তে মৃত্তিকা। অন্তে প্রতিমার
মাংস, মেদ জ্বলে। আমার ত্রিসীমার
মধ্যে স্থিত জলে একা তলিয়ে যাই।
অন্তে মৃত্তিকা। অন্তে প্রতিমার
মাটির চোখে ফের আকাশ খুঁজে পাই।




কস্তুরী কর

                                      



কাজিরাঙা (প্রথম পর্ব)

এক বন্ধুর হাতি সম্পর্কিত পোস্ট পড়ে স্মৃতির পাতা উল্টে গেলাম , আমারও কিছু অভিজ্ঞতা আছে । সে বেশ সাংঘাতিক , মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে । তবে ভয়কে শেষ পর্যন্ত জয় করে নিয়েছিল অপরিসীম ভালো লাগা , ভালোবাসার সৌন্দর্য , ভয়ঙ্করের পাশেই যে সুন্দরের অবস্থান।

           আসাম দিয়ে অরুণাচল যাবো , ফেরার পথে কাজিরাঙা দর্শন -- এমনই কথা ছিল , কথামতো কাজ  ।  অরুণাচল থেকে ফিরে  কাজিরাঙার অতিথিশালায় যখন পা দিলাম তখন প্রায় সন্ধ্যে , শীতকালে তাড়াতাড়ি সূর্য অস্ত যায় , তবু গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটুকু লাল আকাশ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম । বনদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল   জঙ্গলে বেড়ানোর দুটি সময় , এক একেবারে যাকে বলে প্রত্যুষে আর এক দুপুরে । ভোরবেলার ভ্রমণ হাতির পিঠে , দুপুরেরটা জিপে ।
মনে আছে রাত তিনটেতে ঘুম ভাঙতে মনে হয়েছিল মাঝ রাত ,  যাহোক সে অন্ধকারেই আমরা পৌঁছে গেলাম  যেখান থেকে হাতির পিঠে সওয়ার হবো সেখানে । সিঁড়ি দিয়ে একটা একতলা মতোন উঁচু বাড়ির খোলা  ছাদে উঠলাম , ছাদের খোলা অংশটায় এক একটা হাতি এসে দাঁড়াচ্ছে আর মাহুতমশাইয়ের তত্ত্বাবধানে সওয়ারীরা উঠছে , আমাদের আগে দলের অন্য সদস্যরা  হাতির পিঠে বেড়িয়ে গেল , এবার আমাদের পালা , আমাদের জন্য বরাদ্দ হাতিটি এসে ছাদের পাশে দাঁড়ালো , মেয়ের বাবা আগে উঠলেন , উঠে তিনি এবং মাহুতমশাই মেয়েকে ধরে জায়গামতো বসিয়ে দিলেন ( মেয়ে বেশ ছোট ছিল তখন ) এবার আমি ......মাহুতমশাই আমার একটা হাত ধরে আছেন আর একটা হাত দিয়ে বসার জায়গার উঁচু অংশটা ধরে আমি হাতির পিঠে পা রেখেছি কি রাখিনি হঠাৎ হাতিটা একটা হালকা হুংকারের সাথে সাথে একটু চঞ্চল হয়ে উঠলো ফলে ছাদ থেকে তার বেশ খানিকটা দুরত্ব তৈরি হলো  । একে ঐ বৃংহণ যা জীবনে কোনোদিন শুনিনি তাও এতো কাছ থেকে আর হঠাৎ তৈরি হওয়া আমার আর হাতির মধ্যেকার  শূণ্যস্থান আমায়  এতোটাই ভয় পাইয়ে দিল যে দিশাহারা আমি সব ভুলে সেই মাহুতমশাইয়ের জামা খামচে ধরলাম , বিপদ বুঝে তিনিও সঙ্গে সঙ্গে হাত ধরে  আমাকে  ছাদের ওপর  টেনে নিয়েছেন ততক্ষণে , শূন্যে ঝোলা পা নীচে শক্ত স্থান পেতেই মাথায় এলো ঐ হাতির পিঠে আরো দুজন বসে আছে , সেদিকে তাকিয়ে দেখি মুখদুটো শুকিয়ে ছোট হয়ে গেছে , মেয়ে তো কাঁদো কাঁদো । ভীত চোখে ছাদের ধারটা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এখান থেকে নীচে পড়লে হাত , পা ভাঙা বা মাথা ফাটা অবধারিত ছিল , সে তো আমার কিন্তু শুধু মাত্র আমার জন্য পুরো দলটার বেড়ানোর আনন্দ চৌপাট হতো ।  সামান্য প্রকৃতিস্থ হবার পর দেখলাম হাতি আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে এবং অবশ্যই উদ্বিগ্ন মাহুতমশাই কার সঙ্গে অসমিয়া ভাষায় কি সব বলছেন । জানা গেল ঐ হাতিটা মা , তার একটি ছোট ছানা আছে , চঞ্চল ছানাটি মায়ের কাছ থেকে বেশ দূরে চলে গিয়েছিল তাই মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল । ছানা কাছে আসা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করে যখন আবার আমি হাতির পিঠে উঠছি তখন ভোরের নীলচে আলোয় দেখলাম একটি বেশ ছোট  হস্তীশাবক তুরতুর পায়ে এদিকেই দৌড়ে আসছে , ভারি ভালো লেগেছিল তার চলন , কিছুক্ষণ আগের   মারাত্মক ভয়াবহ  অভিজ্ঞতা ভুলে  ভালোবেসে ফেললাম তাকে । তার মায়ের প্রতি কোনো অভিযোগের  প্রশ্নই নেই কারণ সে যে মা , প্রতিটি মা প্রাণীর কাছেই তার সন্তানের থেকে দামী আর কিছু নেই যে । চঞ্চল ছোট্ট ছানা  দুষ্টুমি করলে   মা তাকে ধমকে সাবধান তো করবেই , আর সন্তানের বিপদ আশংকা করে কোন মা স্থির থাকতে পারে ।
            এবার অভয়ারণ্য ভ্রমণ , হাতির পিঠে বসে চলতে চলতে বেশ ভালো লাগছিল , খুব ছোটবেলায় চিড়িয়াখানায় হাতির পিঠে উঠেছিলাম (তখন উঠতে দিতো ) আবার এই । চারপাশের প্রকৃতিতে তখন সদ্য ভোরের আমেজ , আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে , হাতি ধীরে ধীরে জঙ্গলের রাস্তা ধরেছে , বড় বড় গাছের দঙ্গল , কিছু গাছের পাতা ঝরে একেবারে নাগা সন্ন্যাসী আবার কিছুর  বেশ সবুজ আবরণ , যেহেতু শীতকাল তাই জঙ্গল খুব ঘন লাগল না । সুদীর্ঘ গাছের জটলা পেরিয়ে হাতি এবার চলেছে বিরাট বড় বড় ঘাসের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে , এই এলিফ্যান্ট গ্রাস হাতির খুব পছন্দের । সূর্যদেবের সহাস্য ঝলমলে মুখ দেখছি , শীতের মনোরম রোদে প্রকৃতি খুশিতে উজ্জ্বল ,  অনেক রকম পাখি দেখলাম এখানে , লক্ষ্য তো মূলত কাজিরাঙা যার জন্য বিখ্যাত সেই গন্ডারের দর্শন । তো হাতি তার মতন চলছে মাঝে মাঝে মাহুতমশাই মুখে নানারকম শব্দ করে হাতি সামলাচ্ছেন , আর সেই ছোট্ট হস্তীশাবক যার নাম এতক্ষণে জেনে ফেলেছি 'বাবু' , সে কখনো মায়ের সাথে চলছে , কখনো ঘন ঘাসের   ফাঁক ফোঁকরে চলে গিয়ে লুকোচুরি খেলছে , কখনো বা মাকে থামিয়ে দিয়ে দুধ খাচ্ছে , তার শিশুসুলভ আচরণ দেখার মতো বিষয় হয়ে উঠেছিল ,  বেশ মজা লাগছিল । চলতে চলতে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দেখা হলো , এরপর হঠাৎ করে বেশ কাছেই গন্ডারের দেখা পেলাম ,  তবে সে আমাদের পাত্তা না দিয়ে একবার মুখ তুলে দূরের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখলো তারপর গদাইলস্করি চলনে ধীরে ধীরে চলে গেল । এ জঙ্গলে বিস্তর হরিণ আছে , যখন তখনি তাদের সাথে দেখা হয়ে যাচ্ছিল । ঘন্টা দুয়েকের ভ্রমণ একসময় শেষ হলো , ছানা সহ হাতি তার আড্ডায় ফিরলো । আড্ডায় এসে দেখি ছোট্ট বাবুর সাথে সব যাত্রীরাই ভাব করতে চাইছে আর বাবুও খুব মিশুকে , সেও সব যাত্রীদের কাছে যাচ্ছে । দেখলাম অনেকে কলা কিনে এনেছেন বাবু এবং অন্যান্য হাতিদের দিচ্ছেন , এ বিষয় আমাদের অজানা ছিল , একটু আফশোস হলো জানা থাকলে আমরাও কিছু উপহার আনতে পারতাম ওদের জন্য । দুজন বিদেশি বাবুর সাথে ছবি তুললেন । একজন ভদ্রলোক ছোট একটা ব্যাগ থেকে কিছু কিছু করে বিস্কুট নিয়ে বাবুকে দিচ্ছিলেন , আমরা সামান্য দূর থেকে দেখছি , বিস্কুটটা বোধহয় বাবুর বিশেষ ভালো লেগেছিল আর অতো অল্প বিস্কুটে তার বোধহয় ঠিক মন ভরছিলো  না   হঠাৎ সে তার ছোট্ট শুঁড় দিয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে বিস্কুটের পুরো প্যাকেটটাই বার করে নিল , তার কান্ড দেখে সবাই তো হেসে কুটোপাটি  আর যাঁর বিস্কুট , তিনি প্রথমে একটু থতমত হয়ে পরক্ষণে সবার হাসিতে যোগ দিলেন । সবাইয়ের মতো আমিও বাবুর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর জানাতে গিয়ে এক নতুন বিষয়ে অবগত হলাম , বাবুর গায়ের লোম বেশ বড় শক্ত কাঁটার মতো , তার চামড়ায় আমার আঙুল পৌঁছোলো না , একমাত্র শুঁড়ের কাছেই তাকে ছোঁয়া যায় । হাতিদের এই লোমের বিষয়টি আমার  অজানা ছিল । দলের সবাইয়ের নানারকম অভিজ্ঞতার গল্প এবং অবশ্যই বাবুর গল্প  করতে করতে আমরা ফিরে চললাম স্নানাহারের জন্য অতিথিশালার দিকে।          
  
ক্রমশঃ

পিয়াংকী

                                       


পদের নামঃ  লক্ষ্মীদম


                                           


আজ রবিবার।ইনি  সপ্তাহের শুরু না শেষ জানি না তবে এই রবিবাবুর সাথে রান্নাঘরপ্রিয় বাঙালির যাতায়াত সেই প্রাচীন আমল থেকে। রবিবার মানেই রাঁধুনির গায়ের গন্ধ, রবিবার মানেই  'কখন যে দুপুর হবে ',রবিবার মানেই সারা সপ্তাহের অক্সিজেন সিলিন্ডার। বড় কথা হল রবিবার মানে রাত এগারোটায় ঘরের মেঝেতে মায়ের পুরনো রঙচটা  ছাপা শাড়িটা লম্বালম্বি ভাঁজ করে  পেতে বসে জমিয়ে রুটি আলুরদম। এতক্ষণে এসে দম ফেললাম। আজ্ঞে হ্যাঁ। আলুরদমের কথাই বলছি। 


রান্নার জিনঃ  কাশ্মীর প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী সাবেকী একটি পদ হল আলুরদম,যদিও কাঠকড়াই আগুন মশলায় তার সাজ যখন বাঙালির হেঁসেলে তখন সেই রূপে রঙে প্রেমিক তাকে কামড়ানোর আগেই চোখ দিয়ে গিলে নেয় পুরোপুরি। 


রান্নার পেছনের গল্পঃ  আজকে যে আলুরদমের কথা বলব সেটি মা লক্ষ্মী চক্রবর্তী-র নিজস্ব রেসিপি, আজ মা নেই। ভাগ্যিস শিখেছিলাম মা'র থেকে, এক্সপেরিমেন্টাল রান্নায় আজও তাঁকে পাই অভাবের মতো 


পদ্ধতিঃ  আলু।বড় সাইজের হলে চার টুকরো আর মাঝারি সাইজের হলে দুভাগ করে কেটে নুন জলে পনের মিনিট সময় ভিজিয়ে রেখে তারপর আদর মাখিয়ে ভেজে নিতে হবে, এটুকু সবার জানা।


কিন্তু গ্রেভি?কিভাবে হবে? পেঁয়াজ রসুনের চেঁচামেচি নেই, সয়ারেড চিলগ্রিনচিলি সসের দাপাদাপি নেই। তাতে কি?

সবজির ঝুড়ি আছে তো ঘরে।সেখান  থেকে তুলে নিন দুটো গাজর একটা টোম্যাটো সামান্য কড়াইশুঁটি(না থাকলেও চলে, স্বাদে ভেজাল হয় না তেমনভাবে ) দশ বারোটা কাঁচাপাকা লংকা। সবকিছু একসাথে ভাঁপিয়ে নিন পাঁচমিনিটের মতো। এরপর মিক্সিতে ব্লেন্ড করুন 


এবার আসুন মশলাদানীতে।এক চামচ মৌরী চারটে তেজপাতা চারটে কাজুবাদাম এক চামচ চারমগজ সামান্য সাদাতিল আর সামান্য একটু আতপচাল। আপনি মিক্সিতে ব্লেন্ড করতেই পারেন,আমার অবশ্য দু'দিন অন্তর শিলনোড়ার শব্দটা না  শুনলে অসুখ হয় 🙂


যাক আসল কথায় আসি।কড়াইয়ে তেল দিন, অবশ্য  এবং অবশ্যই সরষের তেল।কয়েক দানা চিনি এক পিঞ্চ নুন লবঙ্গ দারচিনি এলাচ  আর একটা শুকনো লংকা ফোড়ন দিন। এবার সমস্ত পেস্ট একত্রিত করে ঢলঢলাঢলঢল। ঢেলে দিন । এইসময় তাপ মাঝারি  থাকবে।রান্নায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কিন্তু সবচেয়ে দরকারী বিষয় । কষিয়ে নিন। তবে বেশি না।যে কোনো দম রান্নায় হিসেব করে হিট না দিলেই ঘেঁটে ঘ হবার চান্স থাকে।কড়াইয়ের মুখের মাপের একটু ডিপ কানাউঁচু একটা থালা দিয়ে রান্না হতে দিন সিম আঁচে। কুড়ি মিনিট খানেক সময় লাগে আড়াই কেজি আলুর জন্য।


 সত্তর শতাংশ রান্না হয়ে গেলে ঢাকনা খুলে ওতে দিন একশো মিলিলিটার মাপের চায়ের লিকার এবং এক চামচ মধু। এটা কিন্তু মধু-ই দিতে হবে। নামানোর আগে অল্প ঘি।


ঢং ঢং ঢং ঢং...ঘন্টা বেজে গেছে।আজ আসি।চুপিচুপি বলে রাখি আমি কিন্তু এই দমের সাথে ঘরে তৈরি রুমালি রুটি দিয়ে পরিবেশন করি। লংকার পরোটা দিয়েও বেশ লাগে


খুঁটিনাটিঃ একবার মা চিকেন কষা রান্নার সময় ভুল করে স্টিলের গ্লাসে রাখা লিকার চা ঢেলে দিয়েছিল। ভয়ে গুটিসুটি হয়ে সেটাই পরিবেশন করল যখন তখন তো বাড়ির সবাই চিকেনের এ হেন রূপ রঙ দেখে অবাক।সেই থেকে মা অনেক রান্নায় চায়ের লিকার  ইউস করেছে।এখন আমিও করি...